নৌকা বিষয়ক একগুচ্ছ কবিতা


শিবলি সাদিক

নৌকা-১

তারার আলোর নিচে নৌকার ছইয়ে শুয়ে মনে হল এই সন্ধ্যা ততটা নিকটবর্তী নয়, যেমন নিকটবর্তী নয় নরম তারকারা। নদীজলে তারকাদের ভাষা নেচে ঢেউয়ে ঢেউয়ে উপচায়, আর ক্রমে গ্রাস করে লোকালয়। ভাবি, এই আক্রমণে, এই নাচঘরে রাতভর বসে আমি দেখতে পাব কি অমাজল, যা থেকেই উৎসারিত নদী ও নৌকার গান?

*
কার নৌকা দোলে জলের ওপরে, তার রেখা দেখা যায় কি যায় না দিগন্তের পারে। কাত হয়ে শুয়ে আছি ভাবসমাধির কাছাকাছি, নৌকার ছইয়ে রাতের তারারা শ্বাস ফেলে, নম্রজলে বিলুপ্ত আমার বোধ। স্বাতী, চিত্রা, রেবতী ও অন্য অনেক তারার লেহন জলজ দেহে টের পাই। সে-লেহনে নদীর শরীরে জাগে রূপালি মাছের খেলা। তারার দোহাই গুরু, এই অলৌকিক সমাধির দিকে চোখ রাখ— আমি ক্রমশ তারার নক্সার ভিতরে চলে যাচ্ছি আর জলে মৌমাছির গুঞ্জনের মতো কারো গান শুনে আরো ঘুমিয়ে পড়ছি।

**
ছলছল শব্দ তুলে কত দূরে যায় তরী, কোনোদিকে সীমানা যে নাই! কিছু আগে দিবসে বিভক্ত ছিলাম কত-না আকারে-প্রকারে, বিরোধে, তুলকালাম শোরগোলে। আর এই অন্ধকারের নৌকায় আমরা নদীর জলে ঠিকানাবিহীন ভেসে যাচ্ছি স্রোত ধরে-আসা সব চিহ্ন মুছে দিয়ে। জগতের যত উপাধি-খেতাব, অসহ বিভক্তিরেখা নিভে গিয়ে নৌকা ও জল, সময় ও স্থান এক তারাস্রোতে মিশে কোথায় চলেছে!

নৌকা-২

নদীর নরম জলে পড়ে থাকা নৌকা দোলে
পারানির মাঝি তুমি কই গেলা
রূপালি মাছের আত্মা জল থেকে তুলে
বন্ধু গেলা কার বাড়ি, পীরিতের ঘরে
গহীন জলেতে ডাকে কাটা মাছের দেহ

তুমি কি জানিতে না জলের আদরে
গলে যায় পিরীতের সোনার শরীর
তুমি কি জানিতে না নদীর আছে
ছলাকলা, ছিনালীর মগ্নকলা
নাও থেকে খুলে নিয়ে কাঠ ডুবায়, চোবায়
পিরীতের কোন ঘাটে শেষে কাষ্ঠ ভেসে যায়

কই গেলা কালা মাঝি পদ্ম কানাকানি করে
বাতাসি মাছের লাফ বাতাসে আগুন হানে
জলে বান্ধা আছে দেহ, চারদিকে নাচে ঢেউ
নৌকা দোলে শূন্য জলে, জলের সোয়ারি কই

নৌকা-৩

নৌকা হয়ে শুয়ে আছি, চারিদিকে জলের বিছানা।
নদী থেকে তুলে নেই মা দুর্গার দুই চোখ— যাতে
কালের রহস্য, ভাসানের গান, সব রূপ দেখবার
শেষে আছে নম্র ঘুম। জগতের শূন্যতার সাক্ষী
স্তব্ধ-স্রোত সেই চোখ আঁকি নাওয়ের গলুইয়ে,
আবহমানের শূন্য রূপে জলে ধ্যান করি ঘুম।

বাসনার তরবারি কাণ্ডে আর বিঁধে থাকবে না,
বিপন্ন ফুলের দাহ রৌদ্রে মেলে দিয়ে দাঁড়াব না,
উন্মাদ আকাশ থেকে ছোড়া-তীর বিঁধবে না রাতে।
অজস্র ছুতার জলে রেখে গেছে আগুনের চাকা,
নিভুক এবার অগ্নি, নৌকাজন্মে থেমে যাক পাখা।

তবু প্রভু তথাগত, নির্বাণের বিছানায় শুয়ে
টের পাই— ধীরে ধীরে আমাতে মাছের সংসার
নম্র হয়ে ঢুকে পড়ে, যেরকম রেখে দিলে হাড়
দূরের উঠানে, সান্ধ্য-নক্ষত্রেরা তাকে লেহন করলে
পুরাণপাখির জন্ম হয়, আমি টের পাই, প্রভু,
জলের অভুক্ত স্বপ্ন নম্র গানে আমাকে আরেক
জন্মের ভাসানে ধীরে ধীরে বয়ে নেয়।

নৌকা-৪

নৌকা হয়ে শুয়ে আছি, যাই বয়ে কালান্তর ছুঁয়ে
ত্রিকালের ছায়া এসে ঝুঁকে পড়েছে গাঙের জলে
ফলে ভাবসমাধিতে আজ আমি অঘোর শায়িত
জল জল, শূন্য শূন্য, মাছ মাছ, মেঘে মেঘে রাম
পঞ্চভূত, দশদিক, ভাবঘোরে দেখছি না কিছুই
দশদিকে ভেলা, সাপে-কাটা আমারই আর্তদেহ
রোদনের অথৈ পারাবার, আমার বেহুলানাচ
দেখছি না জল আর জলের অতলে মগ্ন মাছ
ত্রিকালের ছায়া এসে আমার শরীরে ঢালে জল
জন্ম-জন্মান্তর, ভরা কলসে আগুন, সৃষ্টিজল
শূন্য শূন্য, ভনভন তারাচক্র ঘোরে
আমার দেহ, ভাব নৌকা হয়ে, শূন্য হয়ে
সমাধিতে, তারাচক্রে, কালচক্রে যায় বয়ে।

নৌকা-৫

নৌকা, অমানৌকা বয়ে নেয় আমাকে কোথায়
কোন শূন্যচক্রে, ফুলচক্রে, রং রং রংধনুচক্রে
ভনভন তারাচক্রে, কাল কাল কালের অতীত
এত জলে, পারাবারে, আমাকে নামতে দাও, তমা
আমি জ্ঞানশূন্য, আত্মাশূন্য সামলাতে পারছি না।
এই তারাবেগে দশদিক ফুলে ওঠে, কোনদিকে
তারাঝড়, লালঝড়, নীলঝড় ফুঁসে ওঠে তমসায়
এই নৌকা ওই নৌকা হয়ে আমি কোন দেশে
আছি, এত জল, তারাজল ঘোরে শূন্যে শূন্যে
কালের নাভিতে এত মদ, এত ঘোর কালো মদ
তারাজল, নাভিজল, আমাকে নৌকার ‘পরে দাও
ত্রিকাল ত্রিতাল ছন্দ থেকে নেমে এইবার
শূন্যাকারে, শূন্য শূন্য, জল জল হয়ে নৌকা শুই।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *