শিবলি সাদিক-এর কবিতা – ১


চল মন

নদীর কিনারে যত মাঠ আছে, তার কাছে চল মন
পশু আর পতঙ্গের কাছে কিছু দিন ঘুরে আসা যাক
বায়ুসেবনের পর নতুন ভাষায় সব পুরাতন কথা
ভাবা যেতে পারে, মনে হতে পারে সভ্যতার সব ছেড়ে
মাছ আর পাখিদের সাথে ভাগ করে নিই এ জীবন
যাই মেঘ আর বিদ্যুতের কাছে, ফের শেখা শুরু করি
সৌন্দর্য ও বিষ নিয়ে কথা, যত প্রথা বাতিল করে দিই
আর কোনো মাঠে গিয়ে দেহ নিয়ে পুনরায় আজ ভাবি
শস্য ও ভূমার কাছে জেনে নেই গত জীবনের কথা
মাত্র কিছু দিন আগে পদ্ম হয়ে নদীজলে ভেসে গেছি
কত দেহে কত রূপে আকুল আকারে সদা ফুটে গেছি
গত ফুলজন্মে আমি শিশুর মুগ্ধতা নিয়ে সর্বদা ছিলাম
বিষাদের কথা সব দেশে দেশে মানুষেরা ভেবে যায়
তুলে ধর শস্য ও বীজের কথা, আজ ভোর হোক
মাঠে গিয়ে নত হয়ে বীজের আধারে কথা শুনি
চল মন নদী হয়ে সব রূপে সদানন্দ বয়ে যাই

 

শালপাতার কাছে যাই

কম বেশী দুইশ বছর পর আজ গাছে উঠি
জলে নামি, ফল ধরি, আমার দুহাত পূর্ণ বলে
মনে হয়, তাই যাই কুমড়া শাকের কাছে দ্রুত
ঔষধি গাছের কাছে নত হয়ে শলাপরামর্শ করি
বনে গিয়ে খুঁজে দেখি শালপাতায় কী লেখা আছে

বনের আদেশ, তাই বীজের আধারে আজ যাই
নিশ্চিত কোথাও আছে, মাটিতে আকাশে জলে
কামিনী ফুলের কাছে, নিশ্চিত ঔষধি আছে বনে

আজ যাই চালতা ফুলের কাছে বাদাবনে নত হয়ে
গ্রামে ঘন কচুবনে যাই শরীরের স্বাদ খুঁজে যাই
আশ্চর্য হলুদ বুনো ফুলে শিশুর মুগ্ধতা নিয়ে যাই
লাফাতে লাফাতে যাই পশু হয়ে, হাঁস হয়ে জলে
বুকে হেঁটে পার হয়ে দেহের রঙিন নক্সা-আঁকা মাঠে
তাঁতঘরে যাই বনে, তরমুজের রঙের কাছে বসি

ধান দুর্বা তিল ফুল বেলপাতা শস্যসহ যাই
সকল ইন্দ্রিয় আজ বাগানে ফেরত দিয়ে বলি
একে কর তুমি ফের ফুলের বাগান, দাও গান

দেহ খাঁটি, দেহ সব— পাশ দিয়ে বাঘ চলে গেলে
হতবুদ্ধি বনকর্মী নিমেষেই তত্ত্ব কথা বুঝে
আজ আমি সব বুঝে নদীর কিনারে বসে বসে
দেহতত্ত্ব পাঠ করি, মাঠে যাই কাকতাড়ুয়ার বেশে
শস্য পাহারার ছলে শরীরীকে আকাশের নিচে পেতে
যাই জলে হাঁসগুলি জলের সীমানা পার হয়ে গেছে

 

পাখি

সব কিছু কেন যে উড়ে না, তার ব্যাখ্যা নেই, তবু
গাছে গাছে কবিতা টাঙ্গানো দেখে মনে হয়,
স্থিতি মন্দ খুব নয়, না হলে ভার্টিগো হতো,
ফল ও পাতার রং, হরফ হতো না পাঠ করা,
শিশুদের হাতে রংধনু, চকোলেট দিয়ে কী করে আমরা
আর বড় থাকতাম, শিশুরা শিশুই থেকে যেতো,
সকাল বেলার রোদে কীর্তিনাশার জলেতে দেখতাম
স্রোত আর মাছ লুকোচুরি খেলছে অবাক না হয়ে।

তবু আজো যাবতীয় স্থিতির ছকেই
ডানার উদ্ভাস হয়ে থাকে,
দেখা যায় কিছু কিছু পাখি
ফুল ও পাতার সব রঙিন বিন্যাসে ওড়ে।
খনিজ-ফসলে দগ্ধ হয়ে ফুল-বিকাশের কালে
যাবতীয় গাছ থাকে এক উড়ালের মধ্যে,
ভূমিপৃষ্ঠে যাবতীয় আঁকাজোকা থেকে ক্ষণে ক্ষণে
কিছু ডানা সব এলোমেলো করে উড়ে যায়
সব রহস্যজালের জটাজটিল জ্যামিতির আলো ছুঁয়ে।

সেই সব ডানা দেখে আজ খুব রহস্যমদির হয়ে আছি।

 

ফল

ফল দেখে বিস্ময়ে আহত হই, উত্তেজিত হই
এ কেমন আপেল যা এক দিক শস্যময় বস্তুময়
আর অন্যদিকে তার সব ঋতু উঁকি দিচ্ছে টকটকে লাল
এক সম্ভাবনা বরাবর, বহু রোদ আর কুয়াশার কথা মনে হয়
কত ছায়া একে যত্ন করে নিখিলের অন্য অনেক বিকাশ হতে
রক্ষা করে, তার আর কত রকমের সম্ভাবনা ছিল, লাল রং
আর স্বাদু ফলময়তা ছাড়াও কত কিছু হয়ে যেতে যেতে
হয় নি, যেমন পাখা নিয়ে কিছু বীজ উড়ে পাখি হয়ে যায়
কত রং হাঁস হয়ে সরোবরে ঘোরে, মুক্তা হয়ে যাবার তাবৎ
শর্ত থাকা সত্বেও তো এই সব হাঁস আরামপ্রদ নরম উষ্ণ হয়
আর তার-ও আগে বস্তু কত লীলা করে আর-ও কত রূপ ধরে
ফল হতে গিয়ে আর হয় নি, মাছের আকারে বিকারে ভরে
গেছে সংসার, অধিবিদ্যা, তাই ফল দেখে এই সব স্বভাব ও
সম্ভাবনা বোধ করি, উত্তেজনা হয়, দেখি সব ঋতু উঁকি দিচ্ছে
টকটকে লাল এক সম্ভাবনা বরাবর

 

বীজ

১.
ফলবতী গাছ দেখে নতজানু হয়ে বুঝে যাই
বীজের গভীরে আছে আশ্চর্য উনুন
খাদ্য আর জীবনের অত্যাশ্চর্য বোঝাপড়া
কুমড়াফুলের দেশে যত পাখি গান করে
তাদেরও লক্ষ্য থাকে গাছে গাছে ফল
শর্করা ও আমিষের টানে জিভে জল আসে
অদিতির তবু লক্ষ্য যেন বীজ উড়ে
যায় ঠোঁটে ও পালকে, মধু রঙে মাখামাখি হয়ে
আগুন ছড়ায় বনে, দাবানলের মতন ছোটে
বসন্তে পাহাড়ে তার গান ওঠে, ঝর্না বয়
উপত্যকা জুড়ে গান শোনে গাছ ফলবতী হয়,
খাদ্য ও খাদকের ছলে সেই গান পরম্পরা ছুঁয়ে
বীজ থেকে বয়ে চলে অদিতির কণ্ঠস্বর।

২.
বীজ উড়ে যায় দূরে, তার আছে পাখা
সহায়ক বায়ু আছে নৃত্যরত চাষা
দূরের নক্ষত্র চায় অভিজ্ঞতা হোক
জীবনের আগুনে তাদের ছায়া জ্বলে
মেঘ এসে ছায়া দেয় বৃষ্টি দেয়
গান করে ‘ঘুম-পাড়ানি মাসি পিসি …’
বীজের ভিতরে পাখা জাগে,
জন্ম-মৃত্যু ভেদ করে উড়ে যায় গান

 

শস্য

কতদিন যে এবার মাঠে মাঠে বেড়ালাম, কত শস্যে, ফলে ফের ঢুকলাম,
বুঝলাম আদি কৃষিসভ্যতার শিল্পবোধ আজ আর আমাদের জানা নেই—
কোনো আসিরীয় নারী একদিন তার নাভি পুঁতে দিয়েছিল মাঠে,
ধর্মমন্দিরে বেদীতে অনেক সভ্যতা পার হয়ে তার অর্চনায়
আজ আমাদের পক্ষে নাভির বেদনা বুঝা কী করে সম্ভব,
আমরা তো নেহায়ত হাইব্রিড হয়ে আদি দেহ ভুলে গেছি,
তবু কেন মাটি জল শষ্য রোদ ধানের সোনায় জ্বলে-ওঠা
ধর্মশ্লোক পাঠ করে, সেই সব মন্দিরের আরতির মধ্যে
ঘুরে ফের মনে হয়, আমাদের যৌথস্মৃতি হচ্ছে শস্য
আমাদের ধর্মবোধ বাংলার, বেবিলনের প্রান্তরে
জন্ম আর মুক্তি হয়ে শস্যে কবে ফুটে উঠেছিল!
কৃষিসভ্যতার কাছে, বীজ ও শস্যের সাথে আজ আর
কথা বলা সম্ভব কি জন্মের নতুন ভাষা শিখে নিতে?

 

কবি

বাড়ি নয়, তার ছাদ ভালো লাগে, ভালো লাগে
লাল ঘুড়ি যদি উড়ে চৈত্রের বাতাসে
সব লাল ঘুড়ি নিয়ে একদিন উড়ে যাব
কমলালেবুর প্রতি ভালোবাসা ছাড়া আর
কিছু মনে রাখব না, কারণ আমাকে
সমস্ত জীবন এক মদের পিপার কাছে
বেঁধে রাখা হল উপযুক্ত কারণ ছাড়াই

আমাকে পড়তে দেয়া হল না ডুবুরির স্বপ্ন
অনেক কাঠের বাক্স, মুক্তার গহনা, নীল সাপ
আমি কাগজের নৌকা ছেড়ে দেই জলে
তারা যদি কোনো দিন সব পার হয়ে যায়
তাহলে আমার লেখা কেউ পড়ে নিবে
অবাক বালক কোনো লাল বেলুন বাতাসে
ছেড়ে দিয়ে মশগুল হয়ে হাততালি দিবে
এটুকু প্রাপ্তির আশা নিয়ে অসময়ে বাঁচি


রূপনারাণের জলে ছায়া দেখে ফিরে এসে
ছায়া হয়ে এক লোক রূপের পিছনে ঘোরে
যেমন চাঁদের পিছে রাত ছুটে সব জলাশয়ে
সমুদ্রের পিছে ছুটে যায় রঙিন মাছের ঝাঁক
মধুগন্ধা ঋতুর পিছনে ছুটে উন্মাদ বাতাস
প্রতিমার রূপ খোঁজে কুমারের অন্ধ চোখ
সারা দিন সারা রাত, সমস্ত জীবন কবি
ছায়া হয়ে অন্ধ হয়ে রূপের পিছনে ছুটে
কখন প্রকৃত ছায়া তার জ্বলে ওঠে রূপে
রূপান্তরে, প্রতিমায়


জলধির পাড়ে বসে রূপশিখা দেখে যারা মরে যায়
তারাই প্রকৃত কবি, তারা জলাশয়ে ছন্দ পাঠ করে

আর বাড়ি ফিরে যায় এক ভূত
যার হাতে মানচিত্র সোনার খনির
ফিরে গৃহিনীর কাছে গল্প করে দূর দেশে
তারা যাবে, যেখানে টাকার গাছ আছে
গৃহিনী গোপনে জানে লোকটির মাথা ঠিক নেই
তাকে যাদু করে রাখে রহস্য-বিড়াল করে

মাছের কাঁটার লোভে এরপর থেকে এই বিড়ালটি বেঁচে থাকে
অন্যদিকে কবি জলাশয়ে জ্বলে, মাঝে মাঝে তার আলো দেখা যায়

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *