গল্প: কুমুদ ও ঢেউয়ের সংহরণ


পাপড়ি রহমান

তখনো বানের জল এসে ভাসিয়ে দেয় নাই নদীর ডানা। অথচ তুরাগের এই শাখাতে সারিনা ক্রুজ দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। শীত কি গ্রীষ্ম কি বর্ষা নড়নচড়নহীন তার দাঁড়িয়ে থাকা। কোথাও আসা বা যাওয়া নাই। আষাঢ়-শ্রাবণে জল ফেঁপে উঠলে তুরাগ যখন বিস্তীর্ণ জমি, জমিনের আইল বা সামান্য নিচুভূমিকেও প্রায় নদী বানিয়ে ফেলে, সারিনা ক্রুজ তখনো স্থির। এই বান আসার মরশুমে প্রতিদিন অন্ততঃ ত্রিশ থেকে চল্লিশখানা নৌকা তুরাগে ভাসে। কলার মোচার মতো ভাসমান নৌকাগুলোর লগি বা বৈঠা ঠেলা দেয় চিন বা অচিন নানা কিসিমের মাঝি। এই চিন-অচিনের দলে চান্দুমাঝিও আছে। যদিও তুরাগে বৈঠা বা লগি ঠেলার আগে তাকে কেউ মাঝি নামে ডাকে নাই। আর সেও মাঝি হতে চায় নাই। কিন্তু এখন তার এই বৈঠা বা লগি ঠেলার বাইরে আর কিছুতেই মন নাই।

দাঁতমাজরে থাকাকালীনও চান্দু নদীর নিকটবর্তী ছিল। ফলে নদীতে তার ভয় নাই। ডর-ভয় না করেই সে জলে ঝাপ্পুর-ঝুপ্পুর লাফাতে শিখেছিল। লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে একসময় ডাঙর হয়েও গিয়েছিল। চান্দুমাঝির গ্রামের নাম দাঁতমাজর। নদীর নাম ধলেশ্বরী। ধলেশ্বরীতে শাওনে-ভাদ্দরে তুখা স্রোত। এন্তার ইচা-পুঁটি-চেলা। চার ফেলে ছিপ দিলে বোয়াল বা আইড়ও তোলা যেত। ধলেশ্বরীতে সাঁতার কেটে, মাছ মেরে কাদাপানিতে পায়ের আঙুলে ঘা ধরিয়েও সে কখনো মাঝি হতে পারে নাই। অথচ এই তুরাগে নাও ভাসিয়ে, দুই-একদিন লগি বৈঠা টেনেই সে কিনা মাঝি বনে গেল! চান্দুমাঝি। বৈঠা হাতে সাবধানে কুচুরির দঙ্গল পাশ কাটিয়ে নাও ঠেলা দিয়ে রাগে সে দাঁত কিড়মিড় করে–
‘হালার ঢাকার শহর। চোদ্দ পুস্তানে কেউ মাঝি নাম কামায় নাই আর আমি হইলাম মাঝি! এই মাঝি কামে আমি সাত সেলাম দিয়া থুইছিলাম। এহন কিনা এক সেলামেই ভাইসা বেড়াই হাঁসের লাহান।’
তা এখন তার সত্যিই সাত সেলামের দরকার পড়ে না। এক সেলামেই সে মাঝির খেপ মারতে পারে। এই লগি-বৈঠাই তার রুজি-রোজগারের নসীব হয়ে উঠেছে। শাওন-ভাদ্দরে বাদলা নামলো কি তুরাগও ঘেরে বাড়তে শুরু করে। আর বাড়ে মানুষের আনা-গোনা। সেই সাথে বদলাতে থাকে নসীব। তুরাগমাঝিদের নসীব। পকেট ভারি কাস্টমারের এক খেপ মারলেই বড়নোটের লালচে চেহারা। দাঁতমাজরে থাকাকালীন চান্দুমাঝি এই বড় নোট প্রায় দেখেই নাই বলতে গেলে।
তখন টাকাকড়ি ও তামান চিন্তায় তার কপালে তিন-চারখানা ভাঁজ প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে। ওই ভাঁজের ওপর রোদ-বর্ষা-কি শীত সমান তালে দৌড়ে দৌড়ে পাকা তেঁতুলের রঙ বসিয়ে দিয়ে গেছে। চান্দুমাঝির এখন অবশ্য এই রঙচঙ দেখার সময় নাই। সে নিজের চেহারার সামনে আয়না ধরে থাকবে না কাস্টমার সামলাবে। কাস্টমারের কাছ থেকে দূরে থাকার কোনো পন্থাও তার আর জানা নাই। কারণ কাস্টমারের টাকায় কেনা মোবাইলটা যখন তখন টুনটুনিয়ে বেজে ওঠে। চান্দুমাঝি তখন হাতে লগি ঠেলায় ব্যস্ত বা পর্দা দিতে ব্যস্ত। সব সামলে টুনটুনানে বন্ধ করে দিয়ে বলে ওঠে—
‘মামা আইজ কি আসবেন?’
অন্য প্রান্ত থেকে কি বলে নাকি কিছুই বলে না। সেসব শোনা বা বোঝার উপায় নাই। ফলে চান্দুমাঝির কথাই এক তরফা শুনে যেতে হয়। এই নিয়ে বউ মরিয়ম বেগমের গোস্যার অন্ত নাই। তুরাগে বানের জল ঢুকলো কি চান্দু মাঝির আর ফুরসত নাই। সে ঘরে থাকলেই কি আর বাইরে থাকলেই কি, মোবাইল ফোনটা টুনটুনিয়ে বার্তা জানান দেয়। মরিয়ম বেগম প্রায়শ ক্ষেপে ওঠে। কথা দিয়েই গতরের ছাল তুলে নেবার মতো করে বলে—
‘হারাদিনই খালি ফুন ট্যাপেন আর ফুন ট্যাপেন। এত কি প্যাঁচাল পারে কাস্টমার আপনের লগে?’
মেজাজ-মর্জি ভালো থাকলে চান্দুমাঝিও সরস উত্তর দেয়—
‘ক্যান তর কি সন্দ অয় কাস্টমার না হেরা অন্য কেউ?’
মরিয়ম বেগমও ছেড়ে কথা কয় না। পুরু ঠোঁট ভেংচিয়ে বলে—
‘আপনেরে ফির ফুন কেডায় করবো? অ্যামা— এমুন হাউলা চাষার লগে পিরীত করবো কেড়ায়?’
‘আমি কি চাষা আছি রে মইরম? দাঁতমাজরের বেবাক জমির গোয়া মাইরা আইছি! লাঙল দিতে চাইলেও জমি আর পামু কেমতে?’
মরিয়ম বেগম চান্দুমাঝির বেদনা ধরতে পারে। ফলে সে কথা ঘুরিয়ে দিয়ে বলে—
‘আরে ধুর তামশা করলাম। এইবার কন পানি কদ্দুর আইছে? তুরাগের নিশান কি অচিন হইয়া গেছে গা?’
মরিয়ম বেগম তুরাগ বলে আর চান্দুমাঝি কিনা ধলেশ্বরীতে ঢুকে পড়ে।

একেবারে জলে টুবটুবা হয়ে থাকা দাঁতমাজর। পাটগাছের পাতা—মাথা ছাড়া ক্ষেতে আর কিছুই নাই। আম কি বরই গাছের কোমর ছাড়িয়ে জল আরো খানিকটা ধেয়েছে। আর বাপজানের কোষা নিয়ে বৈঠায় হাল ধরে আছে চান্দু। চান্দুর সঙ্গে ছোরমান আর বড়গেদা। ঢ্যাপ খুঁজে খুঁজে ধলেশ্বরীর জল একেবারে ঘোলা করে ফেলেছে তারা। অথচ চান্দুমাঝি কি তুরাগের জলে এমন স্বাধীন ভাবে ভাসতে পেরেছে কখনো? তুরাগ মানেই চান্দুর রুটি-রুজির ধান্ধা। ধলেশ্বরীতে চান্দুর ব্যবসা ছিল না। ধান্ধা ছিল না। ঢ্যাপের লোভে শাপলার ঠেক উজার করে দেয়া। বিস্তর শাপলার পাশে ভাসমান গাঙকলা। পেটের ভেতর খিদা চাপিয়ে উঠলে ওই গাঙকলা তখন খাদ্য। লোভে পড়ে এই গাঙকলার নোনতা-বিজলা স্বাদ মুখ ভরিয়ে দিত। চান্দু বা বড়খেদা তখন ঢ্যাপ না খাওয়ার দুঃখ ভুলে যেত। তবে ঢ্যাপ যে তারা একেবারেই পেত না তেমন নয়। তারাশাপলা ধুয়ে সুগন্ধি ঢেউ ভেসে এলেই ঢ্যাপের সন্ধান অনিবার্য। তারাশাপলার পাছায় পাছায় কলসের মতো ফুলে থাকা ঢ্যাপ। ঢ্যাপের ভেতর কালো কালো সর্ষের মতো দানা।

এই তুরাগে নাও ভাসিয়েও ম্যালা শাপলাই ফুটতে দেখল চান্দুমাঝি। শাপলার পাছায় ফুলে থাকা ঢ্যাপও কি কম দেখল সে? কিন্তু তার সেই ইচ্ছাটাই আর জাগতে দেখল না। ধলেশ্বরীর তুমুল ঢেউয়ে নাও ভাসিয়ে ঢ্যাপ খাওয়ার দুর্মর ইচ্ছা।

চান্দুমাঝির যে আর ইচ্ছা করারও সময় নাই। খালি লগির খোঁচা মার। নৌকা চড়ে আটকা পড়লে বৈঠা বাও। আর নানা পদের কাস্টমার সামলাও। তুরাগের জল মানে আশংকা, শংকা, লোভ আর কৌতুহলের ভেতর ভাসতে থাকা। কাস্টমারের মেজাজ মর্জি মাপতে মাপতেই জলে টান ধরে। তুরাগ তখন শুকিয়ে একসা। মোটা কাছির মতো তার নিস্তেজ শুয়ে থাকা।

০২.
চান্দুমাঝি এতদিনে বেশ আয়ত্ব করে ফেলেছে কাস্টমারদের ধরন-ধারণ। নানান বয়স, চেহারা আর পোশাকের কাস্টমার আসে। এদের হাবভাব দেখেই সে বুঝে যায় কার সাথে কেমন চালাতে হবে। তবে এই বুঝাবুঝির ভেতর থেকেও কথা সে কম বলতে পারে না। গমের দানা খুঁটে খাওয়া পায়রার মতো অনর্গল সে বাকবাকুম করে যায়। তার এই বাচালতায় কাস্টমাররা বিরক্ত হয় কিনা তা চান্দুমাঝি বুঝতে চায় না। নাকি বুঝার দরকার মনে করে না। চান্দুমাঝি ভালো করে খেয়াল করে দেখেছে বেশিরভাগ নৌকাযাত্রীর চেহারা লেগে থাকে কুন্ঠা, ভয় নয়তো অপরাধবোধ। চাঞ্চল্য অথবা নিরবতা। হতে পারে কাস্টমাররা ইচ্ছা করেই এমন প্রলেপ দিয়ে আসে। নতুবা তাদের অনিচ্ছাতেই এমন প্রলেপ পড়ে থাকে। চান্দুমাঝিও এতদিন ঘোড়েল হয়ে উঠেছে— কারা নৌকায় উঠলে পর্দা ফেলতে হবে, কারা উঠলে পর্দা ফেলতে হবে ন— তা সে বিলকুল আয়ত্ব করে ফেলেছে। দুই-তিনশ টাকা বেশি আদায়ের লক্ষ্যে অর্নগল বকবকানি ছাড়াও নানান কিসসাও সে ঝেড়ে দেয়। যেমন একটা ঘটনা তো সে প্রায় সব কাস্টমারকেই বলে। কতবার বলে চান্দুমাঝি তা কিন্তু মনে রাখতে পারে না। তবে এই গপ্পোটা বলার আগে চেহারাটা যতোটা সম্ভব সরল ও ভ্যাবলাকান্ত রাখার চেষ্টা করে।

কোনো কোনো যুগলের লটরপটর সামান্য সন্দেজজনক মনে হলেই সে বেশ কঠিন মুখেই ঘটনাটা বলে।
‘বুঝলেন মামা— হেইদিন আমাগোই জ্ঞাতি মানে বুঝলেন কিনা এই নাও বাওনের কাম করে। হেয় করলো কি আপনেগো মতনই এক কাস্টমাররে এমন সব্বোনাস করলো।’
চান্দুমাঝি এইটুকু বলে খেয়াল দেয়। সামান্য বিরতি দিয়ে ফের খেয়াল দেয় তার এই গপ্পোটা নাওয়ের সওয়ারীরা মন দিয়ে শুনছে তো?

তবে চান্দুমাঝি জানে এইটুকু বলার পর শোনার ইচ্ছা না থাকলেও তার কথা সকলেই শুনবে। ফলে চান্দুমাঝির এই বকবকানি বিফলে যায় না। তার কথা কাস্টমার শোনে—

‘আইচ্ছা মামা এইডা কি কোনো মাইনষের কাম হৈল? তিন-দুই শ ট্যাকা তো আপনেরা খুশি হইয়াই দিয়া যান। ওই শালা হারামখোর তাও করলো কি মামার কাছে যা আছিল সব নিয়া নিল। এই ধরেন গিয়া মুবাইলডা, ট্যাকার ব্যাগ, হাতের ঘড়ি। সব নিয়া কয় কি— ঘাটে আর নিবার পারুম না। এই কোমর পানিতেই নাইমা যান। লগের যে মাইয়াছাওয়ালডা হেয় ছিল ভদ্রঘরের। মামাডাও ভদ্রঘরের। এইডা কি একডা কাম হৈল? হেগো কোমর পানিতে নামাইয়া দিয়া হারামজাদা ভাগলো। হেই মামায় তো শরমে কাউরে কয় নাই। কেমতে কইবো? হেরও তো মান-সম্মান আছে না? হারামজাদা এই আমাগোই জ্ঞাতি ভাই— এইডা কিমুন কাম করলো?’
অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে নতুন বা পুরাতন সব ধরনের কাস্টমারের কাছে চান্দুমাঝি গল্পটা বলে। এমনও হয় যে একদিনে যদি সে চারজোড়া কাস্টমার নাওয়ে তোলে তাহলে চারবারই সে এই গল্প বলে। গল্প বলে কিন্তু ভরসা দিতেও বাকি রাখে না।
নৌকা কোনো চড়ায় আটকে দিয়ে পর্দা ফেলে যেতে যেতে বলে—
‘ডরায়েন না মামা— আমি কাছেই আছি। বেশি দূর যামু না। লাগলে আওয়াজ দিয়েন।’
তুরাগের অন্য মাঝিরও চান্দুমাঝির এই গল্পটা তাদের কাস্টমারদের বলে কি না জানা যায় না। কারণ তাদের নৌকায় তারা কি বলে বা করে তা অন্যেরা জানতে পারে না।
কিন্তু চান্দুমাঝির পুরানো কাস্টমাররা এই গল্প শোনার পরও বারবারই তার নৌকার সওয়ারী হয়। কেন হয় কে জানে? হয়তো চন্দুকে তারা বিশ্বাস করে। অথবা চান্দুর উপর তাদের ভরসা আছে। নতুবা চান্দুকে তারা সামান্য সামান্য মহ্বত করে।
চান্দুমাঝি লগি ঠেলে নিয়ে যায়। বৈঠা মারে। আর বাদলার দিনে তুরাগে বান ডাকে। ফের জল শুকিয়ে খটখট করে। চর পড়ে। সারিনা ক্রুজের ঘাট থেকে কত যাত্রী নৌকায় চড়ে, কত যাত্রী ফিরে আসে তা ঘাটের মহাজন জানে। হয়তো বা চান্দুও জানে। কিন্তু চান্দুর এই তুরাগে কাউরে ঢ্যাপের তালাশে নাও বাইতে দেখে না। অথবা গাঙকলার লোভে কাউকে জলে ঝাপ দিতেও দেখে না।

০৩.
সারিনা ক্রুজ নোঙর করে থাকা এই ঘাট থেকে বাসেত কয়েকবারই নৌকায় উঠেছে। একটা জাহাজ দীর্ঘদিন এইখানে কেন আছে ভেবে সে মেজাজ খারাপ করে ফেলেছে। এত জায়গা থাকতে এই তুরাগের জলে তার নোঙর ফেলা কেন— বাসেত বুঝে উঠতে পারে না। এই যে রাজহংসীর মতো ধপধপা সাদা সারিনা ক্রুজ, সে যদি পাছাটা উঁচু করে জল কেটে তরতরিয়ে চলে তাহলে অপূর্ব দেখাবে। বাসেত যে নারীটিকে সঙ্গে করে নাওরে সওয়ারী হয় সেও অপূর্ব। বাসেতের তাই মনে হয়। চান্দুমাঝিরও এমন মনে হয় কিনা কে জানে। তবে কোনো যুগল এলে সে সরাসরি নারীটির দিকে তাকায় না। আড়েটাড়ে দেখে। চোরা চোখে দেখে। এবং বাসেতের সঙ্গে আসা নারীটিকেও চান্দু এভাবেই দেখেছে। দেখতে দেখতেই বাসেতকে নাকি তার সঙ্গের নারীটিকে, নারীটিকে নাকি বাসেতকে সে ওই পুরানা কিসসাটাও অনেকবার বলেছে—
‘বুঝলেন না মামা— হারামখোর ইচ্ছা কইরাই হাইঞ্জা লাগাইয়া দিল। যাতে আর কেউ হের কম্মটা ধরতে না পারে। ওই কাস্টমার মামাও কিন্তু ধরতে পারে নাই। কেমতে ধরবো কন? হেরা তো বিশ্বাস কইরাই হের নাওরে উঠছিল। মামা তো অপমান হইব মনে কইরা কোনো রাও করে নাই। মামারে সোজা পাইয়া হেরে এমন বিপদে ফেলাইল? আস্তা হারামজাদা ছাড়া আর কি?’
বাসেতকে এই কিসসা চান্দুমাঝি যখন দশমবার বলে তখন তুরাগনদীতে বান থই থই করে। নদী না, তুরাগকে মনে হয় সমুদ্দুর। যার কূল নাই। কিনার নাই। মাথার উপর আর কোনো ছায়াও নাই।

কয়েকটা হিজলগাছ গলা অব্দি জল ডুবোডুবো হয়ে আছে। আর আসমানের সুরুজ যেন বেকায়দায় পড়ে জলের তলায় তলিয়ে গেছে। ফলে সাদা জলরাশি ছাড়া আর কিছুই চক্ষের সম্মুখে নাই। এই রকম খাপছাড়া নদীর চেহারা বাসেতের অসহ্য লাগে। কিন্তু তবুও তাকে আসতে হয়-নির্জনতার খোঁজে, নিজের তাগিদে অথবা কিছু টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে। এক নারীসঙ্গে বাসেত অভ্যস্ত নয়। কিন্তু রাহেলাকে সে ঝেঁড়ে ফেলতেও পারছে না। রাহেলার সঙ্গে চন্দুমাঝিকেও না। চান্দুমাঝির ওই হাজার বার করে বলা গপ্পের রহস্যও বাসেত জানে। কিন্তু এই প্রায় সমুদ্দুর হয়ে যাওয়া তুরাগে উটের কুঁজের মতো জেগে থাকা চিলতে চরে নাও বাঁধার সময়ও সে চন্দুকে কিছু বলে না। রাহেলাকেও না। বাসেতের মনে পড়ে যায়–
‘বুঝলেন মামা হারামখোর ইচ্ছা কইরাই হাইঞ্জা লাগাইয়া দিল…’
তুমুল জলস্রোতের উপর নাও বাইতে বাইতে চান্দুামাঝি হাঁপিয়ে ওঠে। নৌকার ভেতর ঢুকে পড়া অন্ধকারে সে ঠাহর করতে পারে না আজকের সওয়ারীর জোড়ের নারীটি ভেতরে আছে কি নাই?
দুই-চারবার ভাবে সে জানতে চাইবে—
‘মামা— আপনের লগের মানুষডার সাড়াশব্দ নাইক্কা দেখি।’
কিন্তু তুরাগের জল তখন ফুলতে ফুলতে একেবারে পাহাড় সমান উঁচু হয়ে গেছে। হাওয়ার তোড়ে নৌকা বশে রাখাই মুশকিল। চান্দুমাঝি নানান কসরত করতে করতে দেখে তার হাতের বৈঠা আর হাতে নাই। মাথায় প্রচণ্ড জোরে তিন চারটা বাড়ি পড়লে সে তার বৈঠার হদিস পায় না। ফলে প্রায় বিনা প্রতিরোধেরই সমুদ্দুর হয়ে থাকা নদীতে পড়ে যায়। ধলেশ্বরী পার হওয়া চান্দুমাঝি তুরাগের জলঘূর্ণিতে হাবুডুবু খেতে থাকে। তার একবার মনে হয় তারাশাপলার পাছায় ফুলে থাকা ঢ্যাপের সন্ধানে নেমেছে সে। মুখের ভেতর থেকে গ্যাঁজলা বেরুতে শুরু করলে চান্দুমাঝি একবার যেন গাঙকলার স্বাদ পায়। গাঙকলা, ঢ্যাপ না ধলেশ্বরী কিসের খোঁজে চান্দুমাঝি জলের তলা হাতড়াতে থাকে কে জানে!

বাসেত যখন মধ্য তুরাগ সাঁতরে বেড়িবাঁধের উপর ওঠে আসে চান্দুমাঝি তখনো একবারও ভেসে ওঠে না। বাসেত বারবার পেছনে তাকিয়েও কাউকে ভাসতে দেখে না। চান্দুমাঝির লুঙ্গির কোচ থেকে খুলে আনা অনেকগুলো বড়নোট বাসেত যখন গুনতে শুরু করে তখনো চান্দুমাঝির ডুবসাঁতার শেষ হয় না।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *