বিমানযাত্রীর চতুর্দশপদী


অংকুর সাহা


কোমরবন্ধনী বেঁধে বসে আছি সংকীর্ণ আসনে
শুধু সামীপ্যের জন্য দক্ষিণী, অচেনা ব্যক্তিটিকে
বন্ধু বলে মনেহয়— যেন কত কাল ধরে চিনি;
অন্যধারে গৃহিনী সে মগ্ন, নিমজ্জিত মেনুকার্ডে

হিন্দু মিল বলে দিলে ভাল হত, দ্যাখো কী সুন্দর
পোলাও এর গন্ধ ভাসে শীতাতপ-নির্ভীক বাতাসে—
খুব কম ঝাল দেওয়া ভেড়ার মাংসের মৃদু কারি,
নিরামিষাশীর জন্য ঢ্যাঁড়শ তরকারি আর ছোলে।

আমাদের জন্যে আছে হয় ক-অক্ষর, নয় মাছ
টোমেটো রসুন দিয়ে বিষণ্ন স্যামন এক চাকা;
রোজমেরি দিয়ে রান্না আলু, মুলো, গাজর, জুকিনি
এক কোণে স্যালাড, রুটি, আদা ও লেবুর লিংগুইনি।

বোয়িং কোম্পানির সাতশো সাতচল্লিশ মেগাটপ—
ছত্রিশ হাজার ফুটে ঈশ্বরের খুব কাছাকাছি।


চোখের দেড়ফুট দূরে বোকা বাক্স মৃদু মৃদু হাসে
রিমোট কন্ট্রোলের গায়ে কর্ডলেস টেলিফোন
ক্রেডিট কার্ডের জাদু— ডলারের মোহিনী মায়ায়
চলন্ত বিমান থেকে পৃথিবীতে ফোন করা যায়।

হঠাৎ তন্দ্রার ঘোরে দেবদূতীর কণ্ঠ কানে আসে
উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ, ভুরু কেন ওভাবে এঁকেছে?
কার্ট ঠেলতে ঠেলতে আসে লাস্যময়ী, লঘু নিতম্বিনী—
“উড য়্যু লাইক সাম অরেঞ্জ জুস, টি অর কফি?”

আমাকে পানীয় দিয়ে মুচকি হেসে চলে যায় মেয়ে
হংকং শহরে তার সুদীর্ঘ দিনের কাজ শেষ;
তারপর বাড়ি ফিরবে কিংবা কোন হোটেলে বিশ্রাম
আবার তিনদিন পরে পাড়ি দেবে প্রশান্তসাগর।

উইচিটা শহরে বসে বানিয়েছে বোয়িং কোম্পানি
সাড়ে পাঁচশো মানুষের মিলন সংগম মহাকাশে।


সিংগাপুর শহরের গাছেরাও ভয়ে ভয়ে থাকে
পাতা খশালেই যদি সরকার ফাইন করে দেয়?
পাখিরা শৃংখলা মানে, ইস্কুলের শিশুর মতন
অন্তত তিনবার ভাবে গাড়িতে কুকর্মের আগে;

প্রতিদিন বৃষ্টি পড়ে নিরক্ষরেখার এই দেশে
কিন্তু ফের থেমে যায় সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী;
যতখুশি খাও পিও, মন খুলে দোকান বাজার
করো, কিন্তু চেয়ো নাকো গণতন্ত্র, ব্যক্তি স্বাধীনতা|

ভোগ্যপণ্য যত চাও উচিত মূল্যেই পেয়ে যাবে—
জাপানি ক্যামেরা, টিভি, ফরাশি সুগন্ধ, চিনে সিল্ক;
কফি টেবিলের বই— জাভা, বালি ও বোরোবুদুর—
মাশুলহীন আপণে, এই চাংগি বিমানবন্দরে…

পৃথিবীর ভালো ভালো রকমারি দ্রব্য দিয়ে মোড়া
সাড়ে ছশো বর্গকিলোমিটারের বিস্তৃত দোকান।

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *