ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৪


 ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ১ ।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ২ ।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৩

কিছুই রূপান্তরের নেই

বাংলা অনুবাদ: নান্নু মাহবুব

 

সাক্ষাকারগ্রাহক: নিজস্ব অভিজ্ঞতা বলে কিছু আছে?

ইউ.জী.: আপনার যে অভিজ্ঞতাই হোক, ইতিমধ্যেই অন্য কারো সে অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। ‘‘আহ্! আমি যেন স্বর্গে,’’ ─এই স্বগতোক্তির অর্থই হলো আপনার আগেই কেউ সেটা অনুভব করে আপনার মধ্যে সঞ্চার করেছে। যে মাধ্যমটা দিয়ে আপনি অনুভব করছেন সেই মাধ্যমের প্রকৃতি যা-ই হোক না কেন, এটা একটা ব্যবহৃত, বহু ব্যবহৃত এবং জীর্ণ অভিজ্ঞতা। এটা আপনার নয়। আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতা বলে কিছু নেই। ওইরকম অভিজ্ঞতা, যত অসাধারণই হোক, তার কোনো মূল্য নেই।

কিন্তু আমরা ওই ধারণাতেই জড়িয়ে যাচ্ছি

অভিজ্ঞতাই আপনি।

আমরা জানতে চাই সত্য কী? বোধি কী?

সেটা আপনি জানেনই। জানেন না বলবেন না। সত্য বলে আদৌ কিছু নেই।

আমি জানি না

আপনি শুধু বলতে পারেন, সত্য নামক একটা হেতুবাক্য আছে এবং আপনার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রাধাকৃষ্ণনের মতো একটা গ্রন্থ লিখতে পারেন─‘‘মাই কোয়েস্ট ফর ট্রুথ’’─‘‘আমার সত্যান্বেষণ’’।

কিন্তু আপনিও এটাই অন্বেষণ করছিলেনতাই না? আপনিও জানতেন না এটা কী

আমার ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

সেটা কেমন ছিল?

ওই পরিস্থিতির ভেতরে আমি নিক্ষিপ্ত হই। ওই তাবৎ ধর্মীয় লোকজন দিয়েই আমি পরিবৃত ছিলাম। বেড়ে ওঠার সমস্ত সময়টাই আমি থিওসফিক্যাল সোসাইটির পরিবেশে কাটিয়েছি। নিজের রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের নিয়ে আমার কিছুই করার ছিলো না। আমি শুধু থিওসফিক্যাল সোসাইটির নেতাদেরকেই চিনতাম। বৃদ্ধ মি. জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি ছিলেন আমার পটভূমির অংশ। আমি তাঁর কাছে যাই নাই। আমাদের বাড়ির প্রত্যেকটি ঘরেই জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তির ছবি ছিলো। তাঁর নয়-দশ বছরের ছবি থেকে শুরু করে তখনকার বয়সের ছবি পর্যন্ত। তখন তাঁর বয়স কত কে জানে! সমস্ত দেবদেবীর ছবিই আমার অপছন্দ ছিলো।

আপনি বলতে চাচ্ছেন ওই পটভূমিই আজকের আপনাকে সৃষ্টি করেছে?

না, না। আমি বলছি, আমার যা ঘটেছে, সেটা ওইসমস্ত কিছু ছাড়াই ঘটেছে। সেটা বোধহয় একটা অলৌকিক ঘটনা। সেই কারণেই আমি নির্দ্বিধায় জোরের সঙ্গে বলি যে, আমার যা ঘটেছে, যেকোনো ঠগবাজ, ধর্ষক, খুনি বা তস্করেরও সেটা ঘটতে পারে। সমস্ত আধ্যাত্মিক লোকেদের মিলিত যে সম্ভাবনা, তাদের প্রত্যেকেরও সেই একই সম্ভাবনা, হয়তো আরও বেশিই। ‘‘তাহলে কি বুদ্ধ একজন ধর্ষক ছিলেন, বা যিশু কি অন্যকিছু ছিলেন?’’─এইজাতীয় প্রশ্ন করবেন না, সেটা কোনো বুদ্ধিমানের মতো প্রশ্ন নয়।

আপনার আগের প্রসঙ্গে আসিআপনার অভীষ্টের অন্বেষণে আপনি কী কী করলেন?

মানবজাতির সমস্ত সাধুসন্ত, পরিত্রাতাদের একটা তালিকা আমাকে দেওয়া হলো। এবার তাঁদের জীবনটা লক্ষ করে দেখুন তাঁরা কী কী করেছিলেন। তাঁরা যা যা করেছিলেন তার সবকিছুই আমি করলাম। কিছুই হলো না। ওইসমস্ত সবকিছুই আমি জানতাম। আমাদের কালের একেবারে শুরু থেকে যত শিক্ষক রয়েছেন, তাঁদের ভেতরে কিছু ছিল কিনা সেটা খুঁজে বার করায় আমি আগ্রহী ছিলাম। আমি দেখলাম যে তাঁরা সবাই নিজেদেরকে প্রতারণা করেছেন এবং প্রতারণা করেছেন আমাদের সবাইকে। তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্যে এমন কী ছিলো যা তাঁরা দুনিয়ার সাথে ভাগ করতে চেয়েছিলেন?

আপনার কী মনে হয়?

কিচ্ছু না। তাঁরা সবাই ভুয়া। ‘‘তাঁরা সবাই-ই ভুয়া হন কীভাবে?’’ বা ‘‘এতকাল তাঁরা টিকে আছেন কীভাবে?’’─এই প্রশ্ন করবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের আইভরি সাবান বা পিয়ার্স সাবান তাদের শতবর্ষপূর্তি উদযাপন করছে। শত বছর ধরে টিকে থাকা মানেই এই নয় যে তাতে কিছু একটা আছে। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন মিথ্যা এবং তাঁদের দীক্ষা আমাকে মিথ্যা বানিয়েছিলো─, এই নিশ্চিতি এমন একটা জিনিস, যা আমি কারো মধ্যে সঞ্চার করতে পারি না। এই হলো সমস্যা। আজ সকালেই যা বলছিলাম, আমার ওইরকম তীব্র ক্ষুধা ছিলো, তীব্র তৃষ্ণা ছিলো। কোনো কিছুতেই সেই ক্ষুধা তৃপ্ত হয় নাই, কোনো কিছুতেই সেই জিজ্ঞাসার সন্তুষ্টি হয় নাই। তো ওই বৃদ্ধ [জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি] আর আমি তিরিশ দিন ধরে সমস্ত ব্যাপারটা অনুপুঙ্খ আলোচনা করলাম, যখনই তিনি সময় পেতেন। আমরা হাঁটতে বেরোতাম। থিওসফিক্যাল সোসাইটির সাথে আমার শেষ দিনগুলিতে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়।

বেশ কয়েক বছর আপনারা ঘনিষ্ঠ ছিলেন

না, না। আমি বুঝতে চেয়েছিলাম তাঁর ভেতরে কিছু আছে কিনা। মঞ্চের ওপর বসে বসে তিনি কিছু একটা বলছিলেন। শেষের দিকে আমি তাঁকে একটা প্রশ্ন করি। ‘‘আমাকে এবং সবাইকে আপনি যে বিমূর্ত ধারণাগুলো শুনিয়ে যাচ্ছেন তার নেপথ্যে আপনার কী আছে? সত্যিই কি কিছু আছে?’’ (এইরকমই ছিল আমার সমস্যা বিহিত করার ধরন।) প্রত্যেকবার তিনি মাদ্রাজে এলে আমি মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনতাম। যদিও তাঁর কোনো কথাই আমি গ্রহণ করি নাই। তারপর খুব অদ্ভুতভাবে সংঘাতটা ঘটলো। আমরা বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করলাম। আমি তাঁকে বললাম, ‘‘শুনুন, চিন্তার কথা যদি বলেন, ভারতবর্ষে তা শিখর স্পর্শ করেছে। ভারতবর্ষ যেসব মহৎ চিন্তাবিদ জন্ম দিয়েছে তাঁদের সঙ্গে আপনার কোনো তুলনাই চলে না। আপনার আসলে কী আছে? আমি এর একটা উত্তর চাই।’’ কিন্তু এরপর আর সম্পর্কটা প্রীতিকর রইলো না। আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘‘আমি কোথাও নেই। আমি এখানে কী ছাই করছি?’’ আমি আর আমার সময় নষ্ট করতে চাইলাম না। তাই আমি বৃদ্ধকে বললাম, ‘‘যাকেই আপনি মনে করেন আপনার দ্বারা উপকৃত হবে তাকেই আপনি সময় দিতে পারেন।’’ এতেই সমস্ত পালা সাঙ্গ হয়ে গেলো। সেটা ১৯৫৩ সালের কথা। এরপর আর কখনো তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয় নাই।

স্যার, এই সমস্তকিছুর [ইউ.জী.র অন্বেষণ এবং তাঁর দুর্দৈব’] অর্থ কি এই দাঁড়ায় যে সেখানে কোনো নির্দিষ্ট প্রোগ্রামিং ছিলো?

সেরকম কিছু থাকলেও আপনাকে ‘মিউটেশন’ বা ‘মৌলিক রূপান্তর’ জাতীয় সব কথাবার্তা বাতিল করতে হবে। আমি ওইসমস্তই বাতিল করে দিই যেহেতু সেখানে রূপান্তরিত হওয়ার মতো কোনো কিছু আমি দেখি না। মৌলিকভাবে বা অন্য কোনোভাবে মনের মিউটেশনের প্রশ্নই আসে না। এ সবই ফালতু কথাবার্তা। কিন্তু এসব জিনিস আপনার সমগ্র প্রাণিসত্তা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াটা আপনার জন্যে খুবই কঠিন। আপনি হয়তো সমস্ত বিষয়টাই অস্বীকার করলেন বা নাকচ করে দিলেন, কিন্তু, ‘‘কিছু একটা হয়তো আছে’’─এই অনুভূতিটা দীর্ঘকাল থেকে যায়। ‘সাহসিকতা’ বলতে পারেন এরকম একটা অবস্থায় একবার যখন আপনি দৈবাৎ জড়িয়ে যাচ্ছেন তখন সমগ্র অতীতটা আপনি আপনার ভেতর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারবেন। জানি না কীভাবে এটা ঘটলো। যা ঘটেছে সেটা এমন একটা কিছু যাকে কোনো সাহসিক কর্ম বলা যাবে না, যেহেতু সবকিছুই, যে যে গুরুদের সাথে আপনি জড়িত ছিলেন শুধু তাঁরাই নন, আপনার আগের প্রত্যেকটি মানুষের, প্রত্যেকটি ব্যক্তির, যা-কিছু চিন্তা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতা, সবই আপনার প্রাণিসত্তা থেকে সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়ে গেছে। যা আছে তা খুবই সাধারণ জিনিস─অসাধারণ নিজস্ব ধীশক্তিসহ দেহ।

স্কুলে আমি অদ্বৈত বেদান্তসহ সবকিছুই পড়লাম। বেদান্ত আমার দর্শন মাস্টার্সে বিশেষপত্র ছিলো। পড়াশোনার একেবারে শুরুতেই আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে মন বলে কিছু নেই।

মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডা. বোস নামের মনোবিজ্ঞানের একজন বিখ্যাত প্রফেসর ছিলেন। ফাইনাল পরীক্ষার মাত্র একমাস আগে আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, ‘‘মনোবিজ্ঞানের ছয়টি মতধারার সবক’টি, সবকিছুই আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। কিন্তু ওইসমস্ত কিছুর ভেতরে আমি আদৌ ‘মনের’ কোনো জায়গা খুঁজে পাই নাই।’’ (ওইসময় আমি বলতাম যে, ‘‘বিংশ শতাব্দীর বিস্ময়কর প্রবঞ্চক হলেন ফ্রয়েড।’’ তিনি যে শত বছর ধরে টিকে আছেন এতে কিছুই প্রমাণ হয় না।) তো আমার সমস্যাটা হলো আমি কোনো মন খুঁজে পাই নাই। আমি আমার প্রফেসরকে বললাম, ‘‘মন বলে কি কিছু আছে?’’ আমার জীবনে আমি যে একমাত্র সৎ লোকটির দেখা পেয়েছি তিনি ঐসব সাধুদের কেউ নন, তিনি এই প্রফেসর। তিনি বললেন, মাষ্টার্স ডিগ্রি চাইলে আমার ওইরকম অস্বস্তিকর প্রশ্ন করা উচিৎ হবে না। তিনি বললেন, ‘‘তুমি বিপদে পড়বে, পোষ্ট-গ্রাজুয়েট ডিগ্রি চাইলে মুখস্থবিদ্যা আউড়ে যাও, তাহলেই তুমি একটা পোষ্ট-গ্রাজুয়েট ডিগ্রি পাবে। আর যদি সেটা না চাও, নিজেই ব্যাপারটা অনুসন্ধান করে দেখ।’’ আমি বললাম, ‘‘গুডবাই।’’ পরীক্ষায় আমি বসলাম না। আমার ভাগ্য ভালো ছিল যে ওই সময়টায় আমি বিপুল অর্থশালী ছিলাম। আমি তাঁকে বললাম, মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর যে রোজগার আমার রোজগার তার থেকে চারগুণ বেশি। এই টাকায় আমি বেঁচে থাকতে পারবো, তাঁকে এইকথা বলে আমি পুরো ব্যাপারটা থেকে বেরিয়ে এলাম।

কিন্তু [মন নিয়ে] আমার সংশয়টা অনেকদিন টিকে রইলো। অত সহজে আপনি এইসব থেকে মুক্ত হতে পারবেন না। আপনার মনে হবে, ‘‘এই লোক (যে-ই মনবিষয়ক কথাবার্তা বলুক) হয়তো জানে যে সে কী নিয়ে বলছে। নিশ্চয় কিছু একটা ব্যাপার তার আছে।’’ পেছন ফিরে দেখলে পুরো ব্যাপারটাই আজ একটা ভয়ঙ্কর তামাশা বলে মনে হয়। জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তিকে আমি বললাম যে ফ্রয়েডের সাথে সাথে তিনিও বিংশ শতাব্দীর একটা ভয়ঙ্কর তামাশা। আমি তাঁকে বললাম, ‘‘দেখতেই পাচ্ছেন, এইসমস্ত যত মেসায়া আর ধর্মতত্ত্বের ধারণা থেকে আপনি নিজেকে মুক্ত করতে পারেন নাই।’’ সবকিছু থেকে তিনি পরিষ্কার বেরিয়ে আসতে পারেন নাই।

আপনার যদি মনে হয় যে তিনি বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক, ঠিক আছে, চালিয়ে যান, আপনার মঙ্গল হোক। মূলগত বা অন্য কোনোভাবেই আপনার ক্ষেত্রে এইসমস্ত রূপান্তর ঘটবে না। এইজন্যে নয় যে আমি আপনার ভবিষ্যৎ জানি, বরং এইজন্যে যে, সেখানে রূপান্তরিত হওয়ারই কিছু নেই, সত্যিই কিছু নেই। আপনার যদি মনে হয় যে, না, আছে, এবং মনে হয় যে আপনার প্রসারিত করতলের ওপর আলুবোখারা এসে পড়বে, আপনার মঙ্গল হোক। আপনাকে এইসমস্ত বলে আমার কী লাভ?

বোধি বলে কিছু নেই। সুতরাং রজনীশ বোধিপ্রাপ্ত না অন্য কোনো ভাঁড় বোধিপ্রাপ্ত সেটা অবান্তর। তিনি যা-ই হোন, আপনিই ভাবছেন যে, তিনিই সেই। আপনার মঙ্গল হোক! কেউ এসে আমাকে বলবে, ‘‘আমিই সেই’’─সেটা হবে বিশাল একটা তামাশা। এইসমস্ত আবোল-তাবোলের কোনো অর্থ নেই। যুক্তরাষ্ট্রে নাকি একটা কোর্স আছে: চব্বিশ ঘণ্টায় বোধি চাইলে এক হাজার ডলার, এক সপ্তাহেরটা চাইলে পাঁচশো ডলার, এইরকম।

আপনি কৃষ্ণমূর্তির কথা বলেন কেন?

চলে আসে জানেন তো। কারো দিকে হয়তো চোখ পড়লো, দেখি ‘জে.কে.ভক্ত’ বসে আছে।

সেটা বোধহয় প্রসঙ্গ নয় 

তাহলে প্রসঙ্গটা কী? বলুন আমাকে। আপনি কি কৃষ্ণমূর্তির ভক্ত নাকি?

ঠিক তা নয়

তাহলে এটা কোনো সমস্যা নয়। আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বলি না জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তিকে নিয়ে বলি তাতে কী এসে যায়? ওই লোককে নিয়ে আমার যা মনে হয় আমি সেটাই বলি।

আপনি চুপচাপ থাকেন না কেন?

চারপাশের এইসমস্ত লোকজন নিয়ে? আমার চারপাশের এইসমস্ত গোলমেলে লোকজন আর হৈ-হুল্লোড় নিয়ে…?

আপনি কি লোকজনের চিন্তা টের পান?

ঠিক যেরকম আপনি বাতাসের আর্দ্রতা টের পান। [হাসি] আমি সবকিছুর অর্থোদ্ধার বা অনুবাদ করতে পারি না। যদি পারতাম আপনি সমস্যায় পড়তেন। যেকোনো বিষয়ে আপনি চান─আমি আলাপ করতে পারি। ব্যাধি থেকে শুরু করে ধর্মশাস্ত্র পর্যন্ত, সবকিছু নিয়েই আমার মতামত আছে। সুতরাং যেকোনো বিষয় নিয়েই আমি আলাপ করতে পারি। আমেরিকায় আমি সবসময়ই শুরু করি হেলথ ফুড নিয়ে। এটাই সেখানকার বাতিক। যখন কোনো কিছুতেই আপনার আর আস্থা নেই, খাদ্য আপনার জীবনে বাতিক হয়ে যাবে। তো আমাদের কী করার আছে?

আপনি বলছেন মনের অস্তিত্ব নেইকীসের অস্তিত্ব আছে?

এটা [নিজেকে নির্দেশ করে] শুধুই একটা কম্পিউটার।

আপনি একে কম্পিউটার বললেন না মন বললেন তাতে কী এসে যায়?

আপনি ওই [মন] শব্দটা ব্যবহার করতে চাইলে আমার কোনো অসুবিধা নেই। মন হলো (এমন না যে আমি মনের কোনো নতুন সংজ্ঞা দিচ্ছি) মানুষের অভিজ্ঞতা, চিন্তা আর অনুভূতির সমগ্রতা। আপনার মন বা আমার মন বলে কিছু নেই। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি আর অভিজ্ঞতার ওই সমষ্টিকে আপনি যদি ‘মন’ বলতে চান আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কীভাবে সেটা বংশপরম্পরায় আমাদের কাছে সঞ্চারিত হয়ে আসে সেটাই হলো প্রশ্ন। জ্ঞানের মাধ্যমে নাকি অন্য কোনোভাবে সেটা বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয়, যেমন, জিনের মাধ্যমে কিনা? এখনো আমরা এর উত্তরটা জানি না। তখন আমরা স্মৃতির ধারণায় আসি। মানুষ কী? মানুষ হলো স্মৃতি। সেই স্মৃতিটা কী? এটা কি শুধুই স্মরণ করা, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জিনিস স্মরণ করার থেকেও বেশিকিছু? এইসমস্ত ক্ষেত্রে আমাদের আরো কিছু উত্তর থাকা দরকার। স্মৃতিকোষ মস্তিষ্কের মধ্যে কীভাবে কাজ করে? সে সমস্তটাই কি একটা অঞ্চলেই থাকে?

সেদিন খুবই তরুণ আর মেধাবী এক নিউরোসার্জনের সাথে কথা হচ্ছিলো। তিনি বলছিলেন যে স্মৃতি, বা বলা যায় স্মৃতিকোষ-ধারণকৃত স্মৃতি, শুধু একটা অঞ্চলে থাকে না। চোখ, কান, নাক, আপনার দেহের পাঁচটি সেনসরি অর্গানের সবক’টিরই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের স্মৃতি রয়েছে। তাঁরা অবশ্য এখনো নিশ্চিত নন। কাজেই আরো মীমাংসা দরকার। আমি যেমন দেখি, সবকিছুই জিনগতভাবে নিয়ন্ত্রিত। তার মানে আপনার কোনো কর্মস্বাধীনতা নেই। ভারতে আমাদের যা শেখানো হয়েছে─এটা সেই অদৃষ্টবাদী দর্শন নয়। যখন আপনি বলছেন যে কোনো কর্মস্বাধীনতা নেই─তার অর্থ, যে জ্ঞান আপনার কাছে সঞ্চারিত হয়ে এসেছে সেই জ্ঞানের মাধ্যমে ছাড়া আপনার সক্রিয়তার কোনো উপায় নেই। সেই অর্থেই আমি বলেছি, চিন্তা ব্যতিরেকে কোনো সক্রিয়তা নেই। চিন্তা থেকে উদ্ভূত যেকোনো ক্রিয়াই (যে চিন্তা হলো জ্ঞানের সমগ্রতার অংশ) একটা রক্ষণাত্মক প্রক্রিয়া। এটা নিজেকেই রক্ষা করছে। এটা একটা আত্ম-চিরস্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া। সর্বক্ষণই আপনি এটা ব্যবহার করছেন। যখনই এই জ্ঞানের মাধ্যমে আপনার কোনো অভিজ্ঞতা হচ্ছে, জ্ঞানটা আরো শক্তিশালী আর দুর্ভেদ্য হচ্ছে। তো যখনই আপনার লোভ বোধ হচ্ছে এবং আপনি এর নিন্দামন্দ করছেন, লোভেরই শক্তি বাড়িয়ে তুলছেন। সত্যিকার লোভ, ক্রোধ, বা বাসনার বিহিত করছেন না। আপনার আগ্রহ শুধু সেগুলো ব্যবহার করায়। ধরুন, বাসনাহীনতা। বাসনা থেকে আপনি মুক্ত হতে চাইছেন। কিন্তু আপনি বাসনার বিহিত করছেন না, শুধু ‘কীভাবে বাসনামুক্ত হওয়া যায়’ এই চিন্তা নিয়ে আছেন। আপনি সেখানে জীবন্ত কোনো কিছুরই বিহিত করছেন না। আপনার আগ্রহ শুধু সেগুলো ব্যবহার করায়। সেখানে যা-ই থাকুক বা যা-ই ঘটুক, সেটা মিথ্যা হতে পারে না। আপনি হয়তো সেটা পছন্দ করছেন না বা সেটার নিন্দামন্দ করছেন যেহেতু আপনার সামাজিক কাঠামোতে সেটা খাপ খাচ্ছে না। বাসনাউদ্ভূত কর্মকাণ্ড সামাজিক কাঠামোতে নাও পড়তে পারে, যে কাঠামো নির্দিষ্ট কিছু কাজ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু কাজ অসামাজিক বলে গণ্য করে। কিন্তু আপনার উদ্বেগ শুধু মূল্যবোধ নিয়ে। আপনি যেটার নিন্দা করছেন, সেটার সাথেই জাপটা-জাপটি করা বা লড়াই করা নিয়েই আপনার যত উদ্বেগ। ওইরকম উদ্বেগের উৎপত্তি হচ্ছে সংস্কৃতি, সমাজ, রীতিনীতি, বা যাই বলুন─সেখান থেকে। রীতিনীতি হলো মিথ্যা এবং সেসব আপনাকে মেকি বানাচ্ছে…

এই প্রক্রিয়াটা, সুবিধার্থে সেটাকে মনই বলি, আরো দক্ষ করে তোলার উপায় কী?

আরে সেটা তো দক্ষই!

আমরা এটাকে আরো দক্ষ করে তুলতে চাই

ওই চেষ্টা করতে গিয়ে আপনি অস্ত্রটাকে শুধু শাণিত করে তুলছেন। ওই অস্ত্রটা [চিন্তা] শুধু প্রাণক্ষেত্রের বাইরে নির্দিষ্ট কিছু ফলাফল অর্জনেই কার্যকর।

মন স্বয়ং কি প্রাণক্ষেত্রের বাইরে?

এটা সম্পূর্ণ মৃত। এটা শুধু ধারণা আর চিন্তা নিয়ে কাজ করতে পারে যা আসলে মৃত।

ধরুন দুইটা নগরী আর তার মাঝখান দিয়ে একটা নদী চলে গেছেএখন আমাদের এই দুইটা নগরীর মধ্যে একটা যোগাযোগ দরকার, এবং আমাদেরকে একটা সেতু বানাতে হবে

হ্যাঁ, সেই প্রযুক্তি তো আপনার আছেই।

না, নেই

আপনার হয়তো নেই, কিন্তু কেউ সেটা আপনাকে দিতে পারে।

ধরুন কেউ দিলও না

তখন আর সেটা আপনার চিন্তার বিষয় নয়। প্রাকল্পিক পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আলাপ করি না। আসল মানুষটা কে ছিলেন, কীভাবে তিনি ওই ধারণাটা পেলেন─ট্রায়াল অ্যান্ড এররের মাধ্যমে কিনা─এইসবে আমাদের কিছু যায় আসে না। ওইপারে যাবার চাহিদা─যেহেতু সমৃদ্ধ একটা দেশ সেখানে রয়েছে─একধরনের তাড়না─টিকে থাকারই তাড়না। ওই তাড়না এই সারভাইভল ম্যাকানিজমেরই সম্প্রসারণ─ ইতিমধ্যেই যা প্রকৃতিতে রয়েছে। কীভাবে খাদ্যান্বেষণ করতে হয়, খাদ্যগ্রহণ করতে হয়, বা টিকে থাকতে হয়, সেটা আপনাকে কুকুর, বিড়াল, শুকর, বা অন্যসব বন্য প্রাণীদেরকে শিক্ষা দিতে হবে না। আমাদের সকল সক্রিয়তা ওই সারভাইভল ম্যাকানিজমেরই সম্প্রসারণ ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় আমরা অস্ত্রটাকে শাণিত করতে সক্ষম হয়েছি। প্রগতি, ইত্যাদি ইত্যাদি, যা-কিছু নিয়ে আমাদের এত গর্ব, সেই সবকিছুই আমরা এই অস্ত্রের সাহায্যেই সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছি। আপনি হয়তো এই রেকর্ড প্লেয়ারটা খুলেটুলে আবার জুড়ে ফেলতে পারবেন। এই ধরনের জ্ঞান ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে প্রেরণ করা সম্ভব, কিন্তু যে সমস্যা সমাধানে আমাদের আগ্রহ─নিত্যদিনের সমস্যা, কারো সাথে বসবাসের সমস্যা, এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকার সমস্যা─সেগুলো জীবন্ত সমস্যা। সেগুলো প্রতিনিয়তই আলাদা। সেগুলোকে আমরা যান্ত্রিক সমস্যার মতই গণ্য করতে চাই এবং ওই জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা [যান্ত্রিক সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে যে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা হয়] জীবন্ত সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করতে চাই। কিন্তু ওইভাবে বোধহয় এটা কাজ করে না। ওইসব অভিজ্ঞতা আমরা কাউকে হস্তান্তর করতে পারি না। তাতে কোনো কাজও হয় না। আপনার নিজের অভিজ্ঞতাই আপনার সবসময় কাজে লাগে না। যেমন আপনি হয়তো মনে মনে ভাবছেন, ‘‘দশ বছর আগে এই অভিজ্ঞতাটা হলে আমার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো।’’ কিন্তু আজ থেকে দশ বছর পরও আপনি ঠিক এই কথাটিই বলবেন, ‘‘দশ বছর আগে এই অভিজ্ঞতাটা হলে…,’’ অথচ আজ আমরা এইখানে দাঁড়িয়ে এবং আপনার অতীত অভিজ্ঞতাগুলো আপনার সমস্যা সমাধানের কাজে লাগে নাই। যান্ত্রিক সমস্যা-বিষয়ক বিদ্যাবুদ্ধি শুধুমাত্র ওই যান্ত্রিক ক্ষেত্রেই কার্যকর, অন্য কোনো ক্ষেত্রে নয়। অথচ জীবনের ক্ষেত্রে আমরা কিছুই শিখি না। আমরা শুধু আমাদের যান্ত্রিক জ্ঞানটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দিই আর তাদের নিজস্ব পন্থায় তাদের সমস্যা বিহিত করার সম্ভাবনাটা ধ্বংস করে দিই ।

সেদিন একজনের সাথে কথা হচ্ছিল, একজন নেতা। আমি তাঁকে চিনি না। তিনি সরাসরি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমাদের সাহায্য করা দরকার।’’ তিনি বলছিলেন যে ভবিষ্যৎটা আসলে তরুণ প্রজন্মের। আমি তাঁকে বললাম, ‘‘কী আবোল-তাবোল বকছেন! কেন আপনি তাদেরকে তাদের ভবিষ্যৎ মোকাবিলায় প্রস্তুত করতে চান? এতকাল ধরে আমরা এই দুনিয়াটার তালগোল পাকিয়েছি, আর আপনি এই জগাখিচুড়ি তরুণ প্রজন্মের কাছে পার করতে চান। তাদেরকে তাদের মতোই থাকতে দিন। তারা যদি সমস্ত জিনিসটা তালগোল পাকায়, তারাই তার মাশুল দেবে। আজ সেটা আপনার সমস্যা কেন? তারা আমাদের থেকে বেশি বুদ্ধিমান।’’ আমাদের ছেলেমেয়েরা আমাদের থেকে বেশি বুদ্ধিমান। প্রথমত, আমরা ওই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত নই। তাই আমরা তাদেরকে এই ছাঁচে ফেলতে বলপ্রয়োগ করি। কিন্তু এতে তাদের কোনো উপকার হয় না।

জীবন্ত প্রাণী এবং চিন্তা, এই দুইটা আলাদা জিনিস। চিন্তা কালক্ষেত্রের বাইরে কোনো কিছু ঘটার সম্ভাবনা কল্পনা করতে পারে না। আধিবিদ্যক অর্থে আমি কাল নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। কাল বলতে আমি বুঝাই গতকাল, আগামীকাল আর পরশু। যে অস্ত্র এই [কালের] ক্ষেত্রে বিপুল বিশাল ফলাফল উৎপাদন করেছে সেই অস্ত্র প্রাণক্ষেত্রে কোনো সমস্যা সমাধানে সমর্থ নয়। বস্তুগত ফলাফল অর্জনে আমরা এই অস্ত্র ব্যবহার করি। একই জিনিস আমরা আমাদের তথাকথিত আধ্যাত্মিক লক্ষ্য অর্জনেও ব্যবহার করি। বস্তুগত ক্ষেত্রে এটা কাজ করে কিন্তু ওই ক্ষেত্রে এটা কাজ করে না। লক্ষ্য বস্তুগত বা আধ্যাত্মিক যা-ই হোক, সেখানে যে অস্ত্রটা আমরা ব্যবহার করি সেটা হলো বস্তু। সেইজন্য তথাকথিত আধ্যাত্মিক লক্ষ্যও মূল্যমানে এবং ফলাফলে বস্তুগত। এই দুয়ের মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। আমি সেখানে কোনো আত্মা খুঁজে পাই নাই। সুতরাং কল্পিত ‘অহম্’ বা ‘আত্মা’র ওপর ভিত্তি করে যে সমগ্র কাঠামোটা আমরা গড়ে তুলেছি, সেটাই ভেঙে পড়ে।

মন কী? এক শ একটা সংজ্ঞা আপনি দিতে পারেন। অথচ এটা শুধুই একটা সরল যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। দেহ সাড়া দিচ্ছে উদ্দীপকে। এটা শুধুই একটা উদ্দীপক-সাড়া প্রক্রিয়া। এর আর কোনো ক্রিয়া জানা নেই। অথচ উদ্দীপককে মনুষ্যনৈতিকতার দিক দিয়ে অনুবাদ করে আমরা প্রাণীটির সংবেদনশীলতা ধ্বংস করে ফেলেছি। আপনি মনের সংবেদনশীলতা নিয়ে কথাবার্তা বলতে পারেন, আপনার পাশের মানুষটার প্রতি আপনার অনুভূতির সংবেদনশীলতা নিয়ে কথাবার্তা বলতে পারেন, কিন্তু তার কোনো অর্থই দাঁড়ায় না।

কিন্তু উদ্দীপক ছাড়াও নিশ্চয় সংবেদনশীলতা আছে

আমি সংবেদজ প্রত্যক্ষণের সংবেদনশীলতার কথা বলছি। কিন্তু আপনি যা নিয়ে আছেন, সেটা হলো ইন্দ্রিয়পরতা। এ দুটো ভিন্ন জিনিস। আছে শুধু প্রাণীটির সংবেদজ সক্রিয়তা। সংস্কৃতি এর ওপর বাড়তি চাপায় অন্যকিছু যা সর্বদাই ইন্দ্রিয়পর ক্ষেত্রের ভেতরে। আধ্যাত্মিকই হোক বা অন্য যেকোনো অভিজ্ঞতাই হোক, এটা ভোগক্ষেত্রের ব্যাপার। তাই স্থায়িত্বের বাসনাটাই আসলে সমস্যা। কোনো সংবেদন ‘সুখকর সংবেদন’ হিসেবে অনূদিত হলেই একটা সমস্যা হয়ে যায়। অনুবাদটা সম্ভব শুধুমাত্র জ্ঞানের সাহায্যে। অথচ দেহ যন্ত্রণা এবং আনন্দ দুটোই পরিহার করে যেহেতু স্বাভাবিক সময়কালের চেয়ে বেশিকাল টিকে থাকা যেকোনো সংবেদন স্নায়ুতন্ত্রের সংবেদনশীলতা ধ্বংস করে দেয়। অথচ সংবেদজ সক্রিয়তার ইন্দ্রিয়পর দিকটিতেই শুধু আমাদের আগ্রহ।

আমরাবলতে আপনি কাদেরকে বুঝাচ্ছেন?

যেহেতু আমরা ‘আমরা’ শব্দটা ব্যবহার করছি, আপনি জানতে চাচ্ছেন, ‘‘‘আমরা’ কারা?’’ ‘‘এটা ব্যবহার করছে যে অহম্ সেটা কী?’’─ইত্যাদি। এটা শুধুই একটা আত্ম-চিরস্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া, এবং এটা এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে। আমি যখন ‘আত্ম’ শব্দটা ব্যবহার করছি, প্রচলিত যে অর্থে আমরা ‘আত্ম’ শব্দটা ব্যবহার করি সেই অর্থে করছি না। এটা বরং কোনো গাড়ির সেল্ফ-স্টার্টারের মতো। এই পুনরাবৃত্ত প্রক্রিয়ায় এটা নিজেকে স্থায়ী করে চলেছে।

সংবেদনশীলতার নমুনা কী?

সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্র উদ্দীপকে সাড়া দিচ্ছে, এই ব্যাপারটা ছাড়া সংবেদনশীলতা বলে কিছু নেই। কাজেই, আপনি যদি অন্য কোনো কিছুর প্রতি সংবেদনশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন বা আচ্ছন্ন হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি সংবেদজ সক্রিয়তা অস্পষ্ট করে তুলছেন। চোখ দেখছে না, কিন্তু আপনি দেখতে শুরু করা মাত্রই সংবেদজ প্রত্যক্ষণের অনুবাদ কাজ করতে শুরু করছে। প্রত্যক্ষণ এবং স্মৃতির মধ্যে সর্বদাই একটা দূরত্ব রয়েছে। স্মৃতি শব্দের মতো। শব্দের গতি খুবই ধীর, যেখানে আলোর গতি খুবই বেশি। এইসমস্ত সংবেদজ সক্রিয়তা বা প্রত্যক্ষণ আলোর মতো। অত্যন্ত দ্রুতিময়। কিন্তু যে কারণেই হোক আমরা ওই স্মৃতিকে পশ্চাৎপটে হঠিয়ে দেবার এবং এইসব জিনিস প্রকৃতিতে যেরকম দ্রুততায় চলে সেভাবে চলতে দেবার ক্ষমতা হারিয়েছি। চিন্তা এসে এটাকে [সংবেদজ প্রত্যক্ষণকে] ধারণ করে বলে যে, এইটা এই অথবা ওই। সেটাকেই বলে শনাক্তকরণ, বা নামকরণ, বা যা-ই এর নাম দিন। যে-মুহূর্তে আপনি এটাকে টেপরেকর্ডার বলে শনাক্ত করছেন, ‘টেপরেকর্ডার’ নামটাও সেখানে রয়েছে। কাজেই শনাক্তকরণ আর নামকরণ দু’টো ভিন্ন জিনিস নয়। আমরা সেদুটির মাঝখানে একটা দূরত্ব সৃষ্টি করতে চাই আর মনে করি যে এই দুইটা ভিন্ন জিনিস। আগে যা বলেছি, ভৌতচক্ষুর পক্ষে নিজে থেকে আপনার জ্ঞানের কাঠামোর মধ্যে ভৌত প্রত্যক্ষণ অনুবাদ করার কোনো উপায় নেই।

কিছুক্ষণের জন্যেও কি এই নামকরণ প্রক্রিয়া মুলতবী রাখা যায় না?

কী জন্যে আপনি এটা মুলতবী রাখতে চান? সেটা মুলতবী রেখে আপনি কী অর্জন করতে চান? আমি সংবেদজ প্রত্যক্ষণের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করছি। মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে একটা উদ্দীপকের প্রতি একটা সাড়া হিসেবেই বলবেন। কিন্তু, এই বিশেষ সাড়াটা যে ঠিক ওই বিশেষ উদ্দীপকেরই, এই সত্যিটা এমন একটা কিছু, যা আপনি অনুভব করতে পারবেন না। এটা একটা অখণ্ড গতিময়তা। উদ্দীপক থেকে সাড়াকে পৃথক করা যায় না। সেগুলি অবিচ্ছেদ্য বলেই সংবেদজ প্রত্যক্ষণ এক জিনিস থেকে অন্য জিনিসে যাবার আগেই অতীত অভিজ্ঞতাবিষয়ক জ্ঞানটা সক্রিয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনাটা প্রতিহত করতে আমরা কিছুই করতে পারি না।

কেন আপনি মন’-এর মতো একটা অনিশ্চিত শব্দ ব্যবহার করছেন? আমরা শুধু মস্তিষ্ক নিয়ে আলাপ করছি, যা দেহের অন্য যেকোনো অঙ্গের মতোই একটা অঙ্গ মাত্রসেক্ষেত্রে আরেকটা শব্দ সৃষ্টি করতে হবে কেন?

যেহেতু বহু লোকের ক্ষেত্রে এইটা একটা জুজু হয়ে গেছে─‘মনের প্রশান্তি’, ‘মন নিয়ন্ত্রণ’, এইসমস্ত।

প্রথমে আমরা মনটা সৃষ্টি করছি, তারপর সেটাকে ভরে তুলছি

‘চিন্তাবিহীন দশা’ বা ‘নিশ্চেষ্ট দশা’ নামের একটা জিনিস আমরা উদ্ভাবন করেছি, কী কারণে জানি না। আমি বুঝি না কেন একজন মানুষ নিশ্চেষ্ট দশায় থাকবে। অথচ নিশ্চেষ্ট দশায় থাকতে, নিশ্চেষ্টভাবে ক্রিয়া করতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেটা খুবই হাস্যকর। নিজেদেরকে কোনো চিন্তাবিহীন দশায় নিতে চিন্তা ছাড়া কোনো উপায় আছে বলে মনে হয় না।

আপনি কি বলতে চান শব্দই বস্তু?

সেটা কোনো ব্যাপার নয়। আমি এই খুশিতে থাকতে চাই না যে, শব্দ কোনো বস্তু নয়। শব্দ যদি বস্তু না হয় তাহলে সেটা কী? শব্দ ছাড়া আপনার আদৌ কোনো কিছু অনুভব করার উপায় নেই। আপনি যাতে তাকিয়ে আছেন বা আপনার মধ্যে যা চলছে, শব্দ বাদ দিলে আপনি সেটা থেকে আলাদা নন। শব্দই জ্ঞান। ওই জ্ঞানটা বাদে, আপনার অনুভূতিটা আনন্দ না বেদনা, সুখ না দুঃখ, একঘেয়েমি না এর উল্টোটা, সেটাও আপনি জানেন না। আমরা সত্যিই জানি না সেখানে কী ঘটছে। ‘‘কী ঘটছে?’’─এই কথা বলার অর্থই হলো ইতিমধ্যেই আপনি সেটা আপনার অভিজ্ঞতাকাঠামোর মধ্যে ধারণ করে ফেলেছেন এবং বিকৃত করে ফেলেছেন।

স্যার, শব্দ কি বস্তুবোধের পর একটা আরোপণ নয়?

বোধ বলে কি কিছু আছে?

যেমন আমি প্রথমে বোধ করছি, এবং তারপর সেখানে একটি শব্দ চলে আসছে─‘ইউ.জী. কৃষ্ণমূর্তিপ্রথমত আমি বোধ করছি এবং তারপর কোনো শব্দের মাধ্যমে একটা আরোপণ হচ্ছে, তাই না?

তার মানে কী বুঝিয়ে বলতে হবে। আমার জন্যে ‘বোধ’ খুব কঠিন একটা শব্দ। আরেকটু সহজ শব্দ বলুন। আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না।

আমার চোখ আপনাকে বোধ করলে

সেক্ষেত্রে, আপনি যা বলছেন সেটা এমন কিছু যা আপনি অনুভব করতে পারবেন না।

নামুক্ত হওয়ার বা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার উদ্দেশ্যে নয়এটা শুধুই একটা ঘটনা

এমনকি আপনি এটাও জোর দিয়ে বলতে পারবেন না যে এটা শুধুই একটা ঘটনা। সেখানে কোনো দুইটা ব্যাপার নেই। চোখের কথা যদি বলেন এটা জানেও না যে এটা দেখছে।

আমি কী দেখবো সেটা আমিই স্থির করতে পারি না

আপনিই ক্যামেরাটা চালাচ্ছেন না। আমরা যে চিন্তা নিয়ে কথা বলছি তার উৎপত্তি ওইখানে নয়। আপনার কোনো ক্রিয়াই স্বয়ম্ভু নয়। ভাষা নিয়েই আসলে সমস্যা। তিনশোটি মূল শব্দেই আমরা চালিয়ে যেতে পারি।

হয়তো আরো কমে

হয়তো আরো কমে। শিশুরা সব আবেগই প্রকাশ করতে পারে। শব্দ ব্যবহার করতে না পারলেও সহজভাবে খুব সুন্দর করে তারা তাদের আবেগ প্রকাশ করতে পারে। তাদের সমস্ত দেহই তাদের আনন্দ প্রকাশ করে, প্রত্যেকে আলাদা আলাদা উপায়ে। অথচ আমাদের শব্দ নিয়ে আমাদের খুব গর্ব যেহেতু আমাদের জন্যে সেটা ক্ষমতার অস্ত্র। জ্ঞান আমাদের ক্ষেত্রে ক্ষমতা। ‘‘আমি জানি, আপনি জানেন না’’ ─এটা আপনাকে ক্ষমতা জোগায়। ‘জ্ঞানের জন্যে জ্ঞান’ বলে কিছু নেই। ‘জ্ঞানের জন্যে জ্ঞান’ বা ‘শিল্পের জন্যে শিল্প’ নিয়ে রচনা লেখা যেতে পারে। সুন্দর বলে কি কিছু আছে? সুন্দর কী? ফ্রেমবদ্ধ হলেই কেবল আপনি সেটাকে বলছেন সুন্দর। চিন্তাই কোনো কিছু ফ্রেমবদ্ধ করছে, সত্যিকার অর্থে যার প্রকৃতি আমরা জানি না। আপনার ভাষায় ‘বোধ করার’ কোনো উপায় নেই। সেখানে কী হচ্ছে না-হচ্ছে সেটাও আমরা জানিনা।

বা অভিজ্ঞতাটা যখন শেষ হয়

না, না। ওই লাইন আমি খুব ভালো চিনি [হাসি]: ‘‘বিষয়টার অভিজ্ঞতার সময় আপনি এতে সচেতন নন’’─সেটা একটা আদর্শলিপির বচন। কিন্তু সেটা সঠিক নয়।

সঠিক নয়যখন বলছেন

আপনি আমাকে কী বলতে বলেন?

একটা কিছু থাকতেই হবে যার পর ভিত্তি করে আপনি বিচার করতে পারেন─ ‘এটা সঠিক নয়এইখানেই হলো সমস্যা

এটা কোনো নৈতিক মূল্যায়ন নয়। ‘অপূর্ব’, ‘ভয়ানক’, ‘জঘন্য’─এইজাতীয় প্রচুর শব্দ আছে। বিশেষণ বা ক্রিয়াবিশেষণের কোনো প্রয়োজনই নেই। এমনকি কোনো ক্রিয়াপদেরও প্রয়োজন নেই। ক্রিয়াপদটাই সমস্যা তৈরি করছে। যোগাযোগের স্বার্থে আমাদের শব্দে আস্থা রাখতে হয়। কিন্তু আমি যখন বলছি, ‘‘সে একটা জঘন্য লোক,’’ সেটা কোনো নৈতিক মূল্যায়ন নয়, বর্ণনামূলক একটা বাক্য মাত্র। এইভাবেই আপনি কোনো ব্যক্তির কাজকে বর্ণনা করছেন বা জঘন্যতা-কাঠামোর সাথে মিলিয়ে নিচ্ছেন। আমাকেও ওই শব্দটাই ব্যবহার করতে হচ্ছে, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা কোনো নৈতিক মূল্যায়ন নয়। এমন নয় যে আমি নিজেকে কোনো উচ্চ বা শ্রেয় স্তরে দাঁড় করাচ্ছি। ‘‘একজন ভালো লোক কী কারণে ভালো?’’ ─আমি জানি না। হতে পারে একজন ভালো লোক সমাজের জন্যে একজন দরকারী নাগরিক, এবং কোনো মন্দ লোকের জন্যে ভালো লোকটা ভালো যেহেতু সে তাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু আমার কথা যদি বলেন, কেন একজন ভালো লোক ভালো, আমি জানি না। ভাষার সমস্যাটা হলো, আমরা নিজেদেরকে যেভাবেই প্রকাশ করতে চাই না কেন, আমরা শব্দকাঠামোর ফাঁদে পড়ে যাই। কোনো নতুন ভাষা বা প্রতিভাষা তৈরিরও কোনো মানে হয় না। চিন্তার নাগপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করা ছাড়া সেখানে আর কিছুই বলার নেই। এবং নিজেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে আপনার ইচ্ছাশক্তি বা প্রচেষ্টা দিয়ে আপনি কিছুই করতে পারবেন না।

কিন্তু আমাদের তো বুঝতেই হবে

কী বুঝার আছে? কোনো কিছু বুঝার জন্যে আমাদের সেই একই অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, যা আমরা আমার সামনের এই যান্ত্রিক কম্পিউটারটা বুঝার জন্যে ব্যবহার করছি। বারবার এটা শেখার বা চালানোর চেষ্টা করে এর ক্রিয়াপদ্ধতি বুঝা যেতে পারে। বারবার আপনি চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। এতে যদি কাজ না হয়, কেউ না কেউ আছেই যে আপনাকে বলতে পারে কীভাবে এইটা চালাতে হয়, কীভাবে এইটা খুলেটুলে আবার জুড়তে হয়। পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়ায় আপনি নিজেনিজেই শিখতে পারেন কীভাবে এটা পাল্টাতে হয়, আরো উন্নত করতে হয়, সংস্কার করতে হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই হলো ব্যাপার। যখনই আপনি এটা [চিন্তা] ব্যবহার করছেন আপনি এটাকে শাণিত করছেন, এই ব্যাপারটা ছাড়া, এই অস্ত্র, বুঝার জন্যে যা আমরা ব্যবহার করে চলেছি, কোনো কিছুই বুঝতে আমাদের সাহায্য করে নাই। একজন আমার কাছে জানতে চাইলো, ‘‘দর্শনশাস্ত্র জিনিসটা কী? নিত্যদিনের এই জীবনে সেটা আমার কীভাবে কাজে লাগে?’’ শুধুমাত্র বুদ্ধি-অস্ত্রটাকে শাণিত করা ছাড়া এটা আপনার আর কোনো কাজে লাগে না। জীবনটাকে বুঝার ক্ষেত্রে এটা কোনোভাবেই আপনার কোনো কাজে লাগে না। সেটা [চিন্তা] যদি উপায় না হয়, এবং যদি অন্য কোনো উপায় না থেকে থাকে, তাহলে কি বুঝার কিছু আছে? ‘ইনটুইটিভ পারসেপশন’ বা ‘ইনটুইটিভ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ ওই একই অস্ত্রের উৎপাদন মাত্র। বুঝার কিছু নেই, পাওয়ার কিছু নেই, যেভাবেই হোক এই উপলব্ধি আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। সত্যি সত্যিই আমি বুঝতে চেয়েছিলাম। নইলে আমার জীবনের উনপঞ্চাশটি বছর আমি নষ্ট করতাম না। কিন্তু একবার যখন ‘বুঝার কিছু নেই’, এই উপলব্ধি কোনোভাবে আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন কোনো কিছু থেকে মুক্ত হতে চাওয়া, এমনকি শারীরিক চাহিদা থেকে মুক্ত হতে চাওয়াও আর সেখানে রইলো না। অথচ কীভাবে এইটা আমার ঘটলো আমি সত্যিই জানি না। সুতরাং এটা আমার আপনার সাথে ভাগ করার কোনো উপায় নেই, যেহেতু এটা অভিজ্ঞতাক্ষেত্রের কোনো জিনিস নয়।

যাদের কাছে শুধু এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকাটাই ব্যাপার, জীবনটা যে কী সেটা বুঝাবুঝির কোনো ঝামেলা নেই, তাদের কথা কী বলবেন? তাদের অবস্থানটা কী?

মোক্ষ, মুক্তি, স্বাধীনতা, রূপান্তর (বা যা-ই নাম দিন) বা মুহূর্তের দুঃখ ছাড়াই সুখ, যন্ত্রণা ছাড়াই আনন্দ, যাতেই আপনি আগ্রহী হোন না কেন, ব্যাপার ওই একই। ভারত, রাশিয়া, আমেরিকা যেখানেই সে থাকুক, মানুষ যা চায় তা হলো, অন্যটা [দুঃখ] বাদে এইটা [সুখ]। অথচ একটা বাদে অন্যটা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। ওই চাহিদার কাছে এই প্রাণীটির টিকে থাকার কোনো গুরুত্ব নেই। এর [প্রাণীটির] একটা বিস্ময়কররকম সজাগতা, ক্ষিপ্রতাগুণ রয়েছে। সমস্ত সংবেদন দেহ বাতিল করে দিচ্ছে। সংবেদনের আয়ু সীমিত, একটা নির্দিষ্ট সময় পরে দেহ আর সেগুলো নিতে পারে না, হয় সে সেটা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে নয়তো সেটা শোষণ করে নেয়। তা নইলে সেসব দেহকেই ধ্বংস করে ফেলে। চোখ ব্যাপারটা দেখতে আগ্রহী কিন্তু সেটা সৌন্দর্য হিসেবে নয়; কান ব্যাপারটা শুনছে কিন্তু সঙ্গীত হিসেবে নয়। কুকুরের ঘেউঘেউ বা গাধার ডাক বলে দেহ কোন শব্দ বাতিল করে দিচ্ছে না। এটা শুধু শব্দে সাড়া দিচ্ছে। এটাকে আপনি যদি বলেন শব্দের প্রতি একটি সাড়া, তখনই আমরা সমস্যায় পড়লাম। এটা যে একটা শব্দ আপনি সেটাও জানেন না। যা-কিছু কর্কশ, যা-কিছু স্নায়ুতন্ত্রের সংবেদনশীলতা ধ্বংস করে দেয়, দেহ সেটা ছেঁটে ফেলে। এটা একটা থার্মোস্ট্যাটের মতো। উষ্ণতা, শৈত্য বা এর জন্যে প্রতিকূল যেকোনো কিছু থেকে নিজেকে কিছুদূর রক্ষা করার পন্থা দেহের আছে। স্বল্পক্ষণের জন্যে এটা নিজেকে রক্ষা করে, তারপর চিন্তা আপনার নিজেকে রক্ষার জন্যে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে বা যে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আপনি পড়েছেন তার থেকে সরে যেতে আপনাকে সহায়তা করে। যে সিমেন্ট মিকশ্চার বিশাল গোলমেলে একটা শব্দ তৈরি করছে এবং আপনার স্নায়ুতন্ত্রের সংবেদনীলতা ধ্বংস করে দিচ্ছে, স্বভাবতই আপনি সেটা থেকে সরে যাচ্ছেন। শব্দটা যেহেতু খারাপ তাই সেটা আপনাকে ধ্বংস করে দেবে বা আপনি স্নায়ুরোগী হয়ে যাবেন, ইত্যাকার ভয়টা হলো আপনার প্যারানয়ার অন্যতম উপাদান।

স্যার, এমন কোনো দশা আছে যে দশায় কেবল গ্রহণ আছে, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই?

আছে শুধু প্রতিক্রিয়া এবং আপনি প্রতিক্রিয়াই করছেন। যদি সেখানে প্রতিক্রিয়া না থাকে, সেটা একটা ভিন্ন ব্যাপার। দুর্ভাগ্যক্রমে সর্বক্ষণই বোধহয় সেটা রয়েছে। সেইজন্যেই আপনি প্রশ্ন করছেন। কিন্তু আমি যে সাড়ার কথা বলছি সেটা আপনি আদৌ অনুভব করতে পারবেন না। যদি বলি যে এই সাড়াটা উদ্দীপকের প্রতি একটা স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া এবং সেটা একটা খাঁটি ক্রিয়া, তখন ওই ক্রিয়াটা প্রচলিত শব্দগত অর্থে কোনো ক্রিয়াই নয়। এটা একটা ঐকিক গতিময়তা। সাড়াটাকে [উদ্দীপক থেকে] আলাদা করা যাবে না। যখনই আপনি সেগুলোকে [উদ্দীপক এবং সাড়া] আলাদা করে বলছেন যে এটাই ওই উদ্দীপকটার সাড়া, ইতিমধ্যে আপনি প্রতিক্রিয়ার উপাদান দৃশ্যপটে হাজির করে ফেলেছেন। ‘স্বতঃস্ফূর্ত, বিশুদ্ধ ক্রিয়া বলে একটা জিনিস আছে’, এইজাতীয় সব আবোল-তাবোল বলে আমরা যেন নিজেদের না ঠকাই।

দুইটা প্রশ্ন, স্যারএক, ধরে নিচ্ছি বিড়ালের একটা কম্পিউটার আছে, একটু ছোট, এবং আমার একটা কম্পিউটার আছে, একটু বড়,, আর কী মৌলিক পার্থক্য আছে

আপনার কম্পিউটারটা আরো জটিল এবং দুরূহ। বিবর্তনের অর্থ দাঁড়ায়─সরল জটিল হওয়া। তাঁরা বলেন যে কোনো উইঢিপির সবক’টি উইপোকার সমষ্টিগত মস্তিষ্কক্ষমতা একজন মানুষের মস্তিষ্কক্ষমতার থেকে অনেক বেশি। মানবদেহের ভেতরে যা-ই থেকে থাকুক সেটা প্রজাতিপরম্পরায় যা সঞ্চারিত হয়ে এসেছে তারই ফলাফল। চিন্তা শুধু আমরা আত্মশ্লাঘাতেই ব্যবহার করি না বরং অহেতুক আমাদের চারপাশের জীবন ধ্বংসেও সেটা ব্যবহার করি। আপনার যা আছে তা হারানোর ভয় বা আপনি যা চান তা না পাওয়ার ভয় থেকে শারীরিক ভয় সম্পূর্ণ আলাদা। ওইটাকে আপনি বলছেন ‘মনস্তাত্ত্বিক ভয়’।

তো সরল জটিল হচ্ছে। বিবর্তন বলে কিছু আছে কিনা আমরা জানি না। অধ্যাত্ম বিবর্তনের কথা বাদ দিন। যারা ধরে নেয় যে স্পিরিট, আত্মা, কেন্দ্র বা যা-ই বলুন, এরকম কিছু আছে, তারা বলে যে সেটাও বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যায় এবং নিজেকে পূর্ণ করে। এবং সেইজন্যেই আপনাকে একটার পর একটা জন্ম নিতে হচ্ছে। কত জন্ম আছে কে জানে, আট কোটি চল্লিশ লক্ষ নাকি ঈশ্বরই জানেন সংখ্যাটা কত!

ওই প্রশ্নে ফিরি যে, বিড়ালটার আছে ছোট একটা কম্পিউটার এবং আমারটা অনেক বেশি জটিল একটা কম্পিউটার

মূলত, তারা উভয়ই অবিকল একইভাবে কাজ করছে।

এখন যদি বিড়ালটার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখি

জানি না বিড়ালটা কীভাবে দেখে। বিড়ালটা সম্রাটের দিকে তাকাতে পারে, গল্পটা যে-ই বলে থাকুক দেখুন, আমাদের কিন্তু সত্যিই সম্রাটের দিকে তাকাবার সাহস নেই [হাসি]।

আপনার নিজের ওইরকম সীমাবদ্ধতা নেই

জানি না। অন্য যেকোনো অনুমান বা জল্পনার মতো এটাও আমাদের দিক থেকে একটা অনুমান যে, বিড়ালটা এইভাবে দেখে। আমি মাঝে মাঝে বলি যে আমি যখন কোনো কিছু দেখি, সেটা একটা কুকুর বা বিড়ালের কোনো কিছু দেখার মতোই…

পার্থক্যটা কী?

আমি কোনো পার্থক্য দেখি না।

কোনো পার্থক্য নেই

কোনো পার্থক্য নেই।

আমরা যে পার্থক্যটা সৃষ্টি করছি সেটা ছাড়া কোনো পার্থক্য নেইএরপর আমরা সেটাতে জড়িয়ে যাচ্ছি

আমি সেটাই বলছি।

হ্যাঁ, আমি একমত

কীভাবে একটা বিড়াল আমাকে দেখে আমি নিশ্চিতভাবে জানি না। আপাতভাবে, বিড়ালটার আমাকে দেখা এবং আমার বিড়ালটাকে দেখা বা যেকোনো কিছু দেখাটা একই। সেই কথা বললে দেখুন, ‘দেখা’ বলেই কিছু নেই। দর্শক ছাড়া কি কোনো দেখা আছে? দ্রষ্টা ছাড়া কি কোনো দর্শন হয়? কোনো দার্শনিক অর্থে আমি এইসব কথা বলি না। দ্রষ্টা ছাড়া কোনো দর্শন আছে কিনা? কোনো দর্শনই নেই। ‘‘কী ঘটছে?’’─এই প্রশ্নটাই অর্থহীন। সবকিছুই আমরা জানতে চাই এবং সেটাই হলো সমস্যা।

সমাধানের জন্যে সমস্যা একটা তৈরি করতেই হবে

হ্যাঁ, কিন্তু সেটা না জেনেও আপনি টিকে থাকতে পারেন।

আমি সেই প্রসঙ্গেই যাচ্ছিলাম

আমরা টিকে থাকতে পারি। এই সমস্ত প্রজাতিই লক্ষ লক্ষ বছর ধরে টিকে রয়েছে এবং আমরা এর ভেতর থেকেই বিবর্তিত হয়েছি। তারা ছাড়া আজ হয়তো আমরা এখানে থাকতামই না। তাহলে কেন এই জানতে চাওয়া?

কী জানতে চাওয়া?

আপনি সুখী, আপনি বোরড, আপনি মুক্ত নন, আপনি বোধিপ্রাপ্ত, আপনি বোধিপ্রাপ্ত নন, সর্বক্ষণ আপনি সুখী হতে পারবেন না, ─এইসমস্ত। এমনকি ‘‘কীভাবে আপনি দৈবাৎ এতে জড়িয়ে গেলেন?’’─এই প্রশ্নটাও ওই একই। আপনি কারণটা জানতে চান। আপনি জানতে চান আমি কী করেছি বা কী করি নাই। এই দুইটার মধ্যে আপনি একটা কার্যকারণ সম্পর্ক দাঁড় করাতে চান। আপনি এটা করছেন কারণ আপনি আপনার নিজের ক্ষেত্রে ‘সেটা’ ঘটাতে চাইছেন।

আপনার পটভূমি আমার পটভূমি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কে যেন বলছিলো আমার পটভূমি, আমার জীবনকাহিনি ভীষণ নাটকীয়। কিন্তু আপনার পটভূমিও সমান নাটকীয়। সেখানে যা রয়েছে তার স্বয়ংপ্রকাশের অসম্ভবতাই হলো সত্যিকার সমস্যা। কী সেটা যা এটাকে অসম্ভব করে দিচ্ছে? কী এই অনন্যতার স্বয়ংপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে, যে অনন্যতা লক্ষ লক্ষ বছরের [বিবর্তনের] ফলাফল? এর [মনের] বয়স মাত্র দু’হাজার বছর। এটা সফল হবে ভাবাটা খুবই মূর্খতা। এটা সফল হবে না। আপনি নিজেকে একজন অনন্য মানুষ বলে বেড়াচ্ছেন তা নয়। সারা দুনিয়া ঘুরে ঘুরে আমি বলে বেড়াই না যে আমি একজন অনন্য মানুষ। না, ব্যাপারটা ওই অর্থে নয়। অথচ আপনি অনন্য। দুইজন অনন্য মানুষ তারা কে কতখানি অনন্য সেটা তুলনা করতেও যাবে না। অনন্য শব্দটা আমাকে ব্যবহার করতে হচ্ছে যেহেতু সত্যিই এটা অনন্য। এমনকি দুইটা মনুষ্যদেহও অবিকল একইরকম নয়। আজ তাঁরা [বিজ্ঞানীরা] এই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, ওই সমস্ত উপলব্ধিই কিন্তু আঙুলের ছাপ থেকে তস্কর শনাক্তকরণের লক্ষ্যে ক্রাইম ল্যাবরেটরিতে যেসব গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, তারই ফলাফল। শুধু আঙুলের ছাপ থেকে নয়, গন্ধ বা চুলের অতি ক্ষুদ্র অংশ থেকেও তাঁরা কোনো মানুষকে খুঁজে বার করতে পারেন। তাঁরা বলেন যে নারীদের চুলে পুরুষদের তুলনায় বেশি স্বর্ণ থাকে। [হাসি]; আপনার লালা আলাদা, আপনার তন্তু আলাদা, এবং আপনার শুক্র আর সবার থেকে আলাদা। কোনো দুইটা মুখ অবিকল একইরকম নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি উদ্ভিদবিদ্যা পড়েছি। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে কোনো পাতা পরীক্ষা করলে দেখবেন কোনো দুইটা পাতা অবিকল একইরকম নয়। প্রত্যেকটি মানুষকে মূর্খতাপূর্ণ উদ্দেশ্যে একটা অভিন্ন ছাঁচে ঢালাই করার আমাদের যে সামগ্রিক প্রচেষ্টা, সেটা সফল হবে না। এতে খুব বেশি চাপ প্রয়োগ করলে আমরা হয়তো নিজেদেরকেই ধ্বংস করে ফেলবো। সেটা অবধারিত, কারণ আমাদের হাতে ধ্বংসের অসামান্য অস্ত্র, তথাকথিত মনের পক্ষে সামলানোর জন্যে সেগুলো অনেক বিশাল।

সেই প্রশ্নটায় আসিধরা যাক, x এবং y দুইটা কম্পিউটারকম্পিউটারগুলো প্রোগ্রামডসবকিছুই প্রোগ্রামডসবকিছুই যখন প্রোগ্রামড তখন প্রচেষ্টা, ইচ্ছাশক্তি, এই সবকিছুই অবান্তর

হ্যাঁ, আমি সেটাই বলছি।

প্রচেষ্টাশব্দটার কোনো অর্থই হয় না

আমি সেটাও বলি… বা কর্মস্বাধীনতা…

ইচ্ছাশক্তি বা এইসমস্তযেহেতু সবকিছুই প্রোগ্রামড

হ্যাঁ, শুধু সংস্কৃতির মাধ্যমে নয়, স্বয়ং প্রকৃতির মাধ্যমেও, সম্ভবত তার নিজেরই টিকে থাকার জন্যে। আমরা জানি না যে এটা [প্রত্যেকটি প্রজাতি] প্রোগ্রামড। সেইজন্যেই আমি বলি যে আদৌ কোনো কর্মস্বাধীনতা নেই। কর্মস্বাধীনতার দাবিটাই অর্থহীন।

আচ্ছা বেশ, হতে পারে যে সেটাও [কর্মস্বাধীনতার দাবিটাও] প্রোগ্রামড, আর সেইজন্যেই লোকেদের দাবিটাও থেমে নেইযাই হোক, বিড়াল এবং মানুষের প্রশ্নে ফিরি, আমার মনে হয়, সেখানে একদমই কোনো পার্থক্য নেই

নেই। ওইভাবেই [জীবজন্তুদের মতোই] থেকে গেলে আমরা হয়তো ভিন্নরকম কোনো প্রজাতি হয়ে যেতাম। তবে সেটা কেবলই একটা জল্পনা।

যখনই আমরা তুষারযুগে বা অন্য কোনো যুগে প্রবেশ করছি, পুরো ব্যাপারটাই আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে, এবং ওই স্তর থেকেই সেটা শুরু হচ্ছে

হ্যাঁ, এখন আমরা একটা পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে ভবিষ্যৎটা খুবই অন্ধকার। যাই হোক সেটা বিষয় নয়।

অন্ধকার হয়তো আরেকভাবে

মনুষ্যপ্রজাতি ধ্বংস হলে আমরাও সেইসঙ্গে বিদায়।

সমস্ত কম্পিউটার ধ্বংস হয়ে যাবে

শুধু কম্পিউটার নয়, সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে।

না, শুধুই কম্পিউটার, যেহেতু সবকিছুই আমি কম্পিউটারে এনে দাঁড় করাচ্ছিআমার দ্বিতীয় প্রশ্ন: অন্তত একটা কারণে আপনি নিশ্চয় ওইসব আধ্যাত্মিক গুরুদের প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ, সেটা হলো, তাঁরা না থাকলে আমরা কেউই ধারণা করতে পারতাম না যে বোধি বলেই কিছু নেই

আপনার কথা বুঝলাম না। আবার বলুন।

যেহেতু তাঁরা একটা পণ্যের মতো করে বোধিবিক্রি করেন আর আমরা এর পিছনে ছুটতে থাকি

এবং তারপর আপনি আবিষ্কার করলেন যে তাঁরা তুচ্ছ জিনিসপত্র বিক্রিবাট্টা করছেন।

হুঁ, কিন্তু তাঁরা না থাকলে আপনি এটাও ধারণা করতে পারতেন না

আমার মনে হয় না তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কিছু আছে।

না, আমি তা বলি নাই

দেখুন, এমন একটা অবস্থায় আপনি পড়ে গেলেন যেখান থেকে আপনার আর পালাবার উপায় নেই। আপনি এর ফাঁদে পড়ে গেলেন। আপনার দিক দিয়ে ‘ফাঁদমুক্ত’ (এইরকম কি কোনো শব্দ আছে?) হওয়ার, বা নিজেকে মুক্ত করার, বা ওই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাটাই আপনাকে সেটার মধ্যে আরো বেশি ডুবিয়ে দিচ্ছে। আমাদের যা আছে তাহলো শুধু কোনো কিছু করার ক্ষেত্রে সামগ্রিক অসহায়ত্ব। কিন্তু তারপরও, দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদের একটা আশা আছে যে আমাদের কিছু করার আছে। আমরা ওই সামগ্রিক অসহায়ত্বেই থেমে যাই না; অচলাবস্থা না আসা পর্যন্ত চালাতেই থাকি। জীবিত গুরুরা আর এখনো-অনাগত গুরুরা জোর করে আমাদের মাথার ভেতর এইকথা ঢুকিয়েই চলেছেন যে তাঁদের কাছেই আছে আমাদের সমস্যার সমাধান, তাঁদের হাতেই আছে সমগ্র পরিস্থিতিটা রক্ষার উপায়।

যেহেতু কোনো প্রশ্নই নেই, উত্তরেরও কোনো প্রশ্ন আসে নাপ্রশ্ন কোথায়?

উত্তরগুলি থেকেই সমস্ত প্রশ্নের জন্ম। যদিও উত্তরগুলি কেউই চায় না। প্রশ্নের সমাপ্তিতেই উত্তরের সমাপ্তি। সমাধানের সমাপ্তিতেই সমস্যার সমাপ্তি। আমরা শুধু সমাধানগুলোরই বিহিত করছি, সমস্যাগুলোর নয়।

আসলে কোনো সমস্যাই নেই, আছে শুধু সমাধান। কিন্তু ওইসবে যে কোনো কাজ হয় না সে কথা বলার সাহসও আমাদের নেই। ওইসবে কোনো কাজ হয় না─এই আবিষ্কারটা করলেও তখন আবার ভাবাবেগ চলে আসে। ‘‘যে মানুষটার ওপর আমার এত বিশ্বাস আর আস্থা, তিনি নিজেকে প্রতারণা করতে পারেন না বা অন্য সবাইকে প্রতারণা করতে পারেন না’’─এই অনুভূতিটাই সমস্ত বিষয়টা জানালা দিয়ে ড্রেনে ছুঁড়ে ফেলার ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সমাধানগুলো সমস্যা হিসেবে থেকেই যায়। আসলে সেখানে কোনো সমস্যাই নেই। প্রস্তাবিত তাবৎ সমাধানের অপ্রতুলতা বা অসারতা আবিষ্কার করাটাই হলো একমাত্র সমস্যা। প্রশ্নগুলির জন্ম হয়েছে স্বভাবতই ধারণা আর উত্তর থেকে, যে উত্তরগুলোকে আমরা প্রকৃত উত্তর বলে ধরে নিয়েছি। কিন্তু আমরা আসলে প্রশ্নগুলির কোনো উত্তরই চাই না, যেহেতু কোনো একটা উত্তরে উত্তরগুলোরও সমাপ্তি। একটা উত্তরের সমাপ্তিতেই অন্য সমস্ত উত্তরের সমাপ্তি। তখন আর আপনাকে দশরকম ভিন্ন ভিন্ন উত্তরের বিহিত করতে হচ্ছে না। তখন আপনি একটাই প্রশ্নের বিহিত করছেন, এবং সেটাই উত্তরের সমাপ্তি ঘটিয়ে দিচ্ছে। তার অর্থ এই নয় যে তখন আপনি একটা উত্তর পেয়ে যাচ্ছেন। বরং তখন আর কোনো প্রশ্নই নেই। একই সঙ্গে প্রকৃতিস্থভাবে চলার জন্যে দুনিয়ার বাস্তবতা যেভাবে আমার ওপর চাপানো ঠিক সেভাবেই সেটা আমাকে মেনে নিতে হবে।

সেটা কি আমাদেরকে আবার উপজাতি পর্যায়ে নিয়ে যাবে না?

উপজাতি পর্যায় থেকে আমরা খুব দূরে সরে যাইনি। [হাসি] গেছি কি? গুহামানবের পক্ষে সারা দুনিয়াটা উড়িয়ে দেবার কোনো উপায় ছিলো না, কিন্তু আমাদের তা আছে। আর পশুরা কোনো ধারণা বা বিশ্বাসের জন্যে কাউকে খুন করে না। আমরাই কেবল সেটা করে থাকি।

স্যার, জৈবিক বিবর্তন ছাড়াও কি কোনো বিবর্তন আছে?

তার মানে আধ্যাত্মিক?

অন্য যেকোনো?

এমনকি জৈবিক বিবর্তনের ব্যাপারেও আমরা নিশ্চিত নই। আমার মতো কিছু নিষ্কর্মা কিছু বিশেষ জিনিস পর্যবেক্ষণ করে কিছু সিদ্ধান্তে এসেছে।

বলুন সেটা

আমি একটা মূর্খ। খুব একটা পড়াশোনাও আমি করি না। বহুকাল আমি কিছুই পড়ি নাই।

আলসেমি করার জন্যে শিক্ষাদীক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই, স্যার! [হাসি]

এমনকি কোনো পর্যবেক্ষণও আমি করি না। বিজ্ঞানীদের অন্তত এই তাগিদটা আছে, [তাগিদ] শব্দটা যদি ব্যবহার করি, পর্যবেক্ষণ করা আর প্রাকৃতিক বিধিগুলি অনুসন্ধান করা।

এ সবই হলো আত্মকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড

এ সবই আত্মকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড। এটা আত্মসিদ্ধির প্রশ্ন। আপনার মনে হতে পারে এইসমস্ত আলাপচারিতার মাধ্যমে, আমাকে ঘিরে-থাকা এইসমস্ত লোকজনের মাধ্যমে আমি আত্মসিদ্ধি করছি। হ্যাঁ, সেকথা আপনি বলতেই পারেন এবং ব্যাপার হয়তো খানিকটা সেরকমও। সত্যিই আমি জানি না। এটা কোনো আনন্দের কিছু নয়। আমার এইখানে ব্যথা আছে [হাসি]─মাথাব্যথা।

তীব্র যন্ত্রণা থেকেও আনন্দের সৃষ্টি হয়

এগুলো একই, স্যার। আমরা সেটা ভুলে যাই। যন্ত্রণা দেহের নিরাময় প্রক্রিয়ার লক্ষণ। সেটাই আমার আবিষ্কার। দেহকে সুস্থ হবার কোনো সুযোগ না দিয়ে আমরা শুধুই ডাক্তারের কাছে দৌড়াই।

এইসমস্ত আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক আসলে

আমরা ছাড়া তাঁরা নেই স্যার।

না, তা নেইমানবজাতিকে তাঁরা এতদূর বিভ্রান্ত করেছেন

তাঁরা আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারেন না। আমরাই বিভ্রান্ত হতে চাই। তা নাহলে তাঁরা আমাদের বিভ্রান্ত করবেন কীভাবে? আমরা এইক্ষেত্রে স্বেচ্ছাবলি।

আমরাই নিজেদের প্রতারণা করছি

হ্যাঁ, আমরা হলাম আহাম্মক। একটা আহাম্মক বিদায় নিলে, তার জায়গায় আরো দশটা আহাম্মক এসে হাজির হয়। আহাম্মকের কখনো ঘাটতি হয় না।

স্যার, ওই প্রসঙ্গটায় আসা যাককোনো বোধিপ্রাপ্ত

দাবিদারদের কথা বাদ দিলে, আপনি কখনো সেরকম কারো দেখা পেয়েছেন?

একজনের দেখা পেয়েছি স্যার, যিনি এখন আমাদের সামনে বসে আছেন [ইউ.জী.কে নির্দেশ করে] [হাসি]

না, না, ওইসব করবেন না। আপনার এর কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো নৈতিক মূল্যবোধেই আপনি আমাকে মেলাতে পারবেন না। আমার জন্যে নৈতিক মূল্যবোধের কোনো প্রয়োজন নেই, এবং আমার নিজেকে কোনো ধর্মব্যবসা বানাবার প্রশ্ন নেই। আমি আপনার থেকে আলাদা─নিজেকে এই কথা বলার কোনো উপায় আমার নেই। আপনি আমার কথা বিশ্বাস করতে পারেন। তারপরও যদি বলেন, ‘‘না, আমরা এটা মানতে পারছি না,’’ আমার কোনোই অসুবিধা নেই। আমি কী করতে পারি?

আমরা একজনের দেখা পেয়েছি স্যার, যিনি আমাদের সামনে বসে আছেনওইসমস্ত মানুষদের চিন্তাপ্রক্রিয়া এবং আপনার ওইসমস্ত ঘটনা ঠিকমতো বুঝতে পারলে সেটা হয়তো আমাদের কাজে লাগতে পারে

কিছুই আমি বুঝি নাই। আমি আপনাকে বলি। কোথাও পৌঁছুনোর জন্যে কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করার নেই। মনে হচ্ছে যেন আমি কিছু পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে গেছি। না যাই নাই। নিজের জন্যে যে লক্ষ্যটা আমি সৃষ্টি করেছিলাম তার পেছনে আমি আমার জীবনের বহু বছর নষ্ট করেছি। জীবনের প্রথম দিকেই যদি বুঝতাম যে বুঝার কিছুই নেই, তাহলে আমার জীবনের ঊনপঞ্চাশটি বছর আমাকে নষ্ট করতে হতো না, সমস্তরকম সংযম করতে হতো না। সোনার চামচ মুখে ঐশ্বর্যের শয্যায় আমার জন্ম হয়। আপনার কি মনে হয় এইসমস্ত জানলে আমি গিয়ে কোনো গুহার মধ্যে শুয়ে শুয়ে যা বুঝি না তাই আউড়ে যেতাম? চৌদ্দ বছর বয়সেই আমি ওইসমস্ত জিনিস মুখস্থ আউড়াতাম আর শাস্ত্রাদি পাঠ করতাম─ যার কোনো অর্থই আমি জানতাম না। এ ভীষণ মূর্খতা। পেছন ফিরে তাকালে আমি বলবো ওই সময়টা আমি অপচয় করে ফেলেছি। কিন্তু কোনোভাবেই আমি আজ যাতে জড়িয়ে গেছি তার সাথে আমি যা করেছি তার তুলনা করার কোনো উপায় দেখি না। আমার এই কথা বলার কোনো উপায় নেই─‘এই সেই ঘটনা’, বা ‘আমি ওইরকম ছিলাম’। এখানে কোনো বিন্দু [নির্দেশক বিন্দু] নেই। যেহেতু কোনো বিন্দুই নেই, আমার ফিরে তাকানোর কোনো উপায় নেই, বলার উপায় নেই─ওটাই হলো সেই বিন্দু। আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, ‘‘আপনি যাতেই জড়িয়ে গিয়ে থাকুন, আপনার সমস্ত কর্ম সত্ত্বেও আপনি তাতে জড়িয়েছেন, এই কথাটা বলছেন কীভাবে?’’ কিন্তু আমাকে এটা ওইভাবেই বলতে হয়, ─‘সত্ত্বেও’, ‘ছাড়াই’, বা যে শব্দটা আপনি ব্যবহার করতে চান। ওইসমস্ত কোনো কিছুই আমাকে এখানে নিয়ে আসে নাই। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন─‘‘কীভাবে আপনি জানেন যে সেটা আপনাকে এখানে নিয়ে আসে নাই?’’ আমি যার মধ্যে দিয়ে গেছি সেটা ওই জানাজানি প্রক্রিয়ার অংশ নয়। আপনি বলতে পারেন, ‘‘কেন আপনি বলছেন এটা একটা না-জানার দশা?’’ আপনি বলতে পারেন, ‘‘জানাজানির দিক দিয়ে আপনি কীভাবে ওই না-জানার দশার কথা বলছেন?’’ আপনি শুধু কোনো উত্তরের জন্যে আমাকে চাপ দিচ্ছেন। আপনার প্রশ্ন, আপনার দাবি এবং দশাটা জানার জন্যে আপনার যে জিদ, তার উত্তরেই আমি বলছি যে, এটা একটা না-জানার দশা; এমন নয় যে সেখানে এমন কিছু আছে যা জানা যায় না। ‘জ্ঞানাতীত’, ‘বাক্যাতীত’ বা ‘অননুভবনীয়’ কিছু আমি বলছি না। ওইজাতীয় কিছুই আমি বলছি না। তাতেও গতিময়তা থাকে। জানাই শুধু বিদ্যমান। যেমন, অজানার ভয় বলে কিছু নেই। অজানা নিয়ে আপনি ভীত হতে পারেন না, যেহেতু অজানা আপনার বক্তব্য অনুযায়ীই অজানা। আপনি যে ভয়ের কথা বলছেন সেটা হলো জানা শেষ হয়ে যাবার ভয়। সেটাই বোধহয় সমস্যা। আমি যখন ‘অজানার দশা’─এই শব্দটা ব্যবহার করছি, সেটা রূপান্তর, মোক্ষ, মুক্তি, ঈশ্বরলাভ, আত্মদর্শন বা যা-ই বলুন, তার সমার্থক নয়।

মানসিকভাবে ভিন্ন লোকজনদের যেখানে রাখা হয় সেরকম একটা জায়গায় যখন গেলাম

মানসিকভাবে ভিন্ন, অসুস্থ, ব্যাধিগ্রস্ত বা…

আমি তাদেরকে বলতে চাই মানসিকভাবে ভিন্ন কারণ তারা মনে করে আমরাই মানসিকভাবে ভিন্ন বা উল্টোটা

সেটা ঠিক।

পার্থক্যটা অতি সামান্যতারা হয়তো আমাদেরকে পরিস্থিতির শিকার হিসেবেই দেখেআমরা আসলেই জানি না কারা ভিন্নঅথচ আমরা উভয়ই জৈবিকভাবেই ক্রিয়াশীল

…অবিকল একইভাবে।

একইভাবেতাহলে তাদেরকে মানসিকভাবে ভিন্ন বলার ভিত্তিটা কী?

যেহেতু আমরা তথাকথিত স্বাভাবিক মানুষ দাঁড় করিয়েছি।

আমি সেটাই বলছিলাম

ব্যাঙ্গালোরের অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অভ মেন্টাল হেলথ থেকে কিছু লোক আমার সাথে দেখা করতে এলেন। তাদের মধ্যে একজন বড় নিউরোসার্জনও ছিলেন। আমি তাঁকে ওই প্রশ্নটাই করলাম, ‘‘কে স্বাভাবিক? কে সুস্থ আর কে পাগল?’’ তিনি বললেন, ‘‘স্ট্যাটিস্টিকলি বললে, আমরা সুস্থ।’’ আমার কাছে উত্তরটা খুব সঠিক মনে হলো। আমি তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘কেন তাদের সবাইকে ওইখানে আটকে রেখে চিকিৎসা করে যাচ্ছেন? আপনি তাদের কতটুকু উপকার করতে পারছেন?’’ তিনি বললেন, ‘‘তাদের শতকরা দুইজনেরও কোনো উপকার হচ্ছে না। আমরা তাদেরকে বাড়ি পাঠিয়ে দিই কিন্তু তাদেরকে আবার ফেরৎ পাঠানো হয়।’’ ‘‘তাহলে ওই নাটক চালিয়ে যাচ্ছেন কেন?’’ আমি বললাম। তিনি বললেন, ‘‘সরকার টাকা দেয় আর তাদের পরিবারও তাদেরকে বাড়িতে রাখতে চায় না।’’

তো আমরা মূল প্রশ্নে আসি, ‘‘কে প্রকৃতিস্থ আর কে অপ্রকৃতিস্থ?’’ ওইরকম বহু লোক আমার সাথে দেখা করতে আসে। এই ইন্সটিটিউটও মাঝে মাঝে আমার কাছে লোক পাঠায়। মারাত্মক খারাপ অবস্থা যাদের, সেরকম লোকেরাও আসে। অথচ তাদের আর আমার মধ্যে পার্থক্যটা অতি সামান্য। পার্থক্যটা বোধহয় এই যে, তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে, যেখানে সমাজের সাথে আমি কোনো দ্বন্দ্বে নেই। আমি এটা গ্রহণ করে নিই। এটাই একমাত্র পার্থক্য। সমাজকাঠামোর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে আমার কোনোও বাধা নেই। সমাজের সাথে আমি কোনো দ্বন্দ্বে নেই। একবার যখন আপনি ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিকের দ্বন্দ্ব থেকে─শব্দটার ব্যবহার আমি পছন্দ করি না─মুক্ত, বা ফাঁদমুক্ত হয়ে যাচ্ছেন, আর কখনো আপনি মন্দ কিছু করতে পারবেন না। যতক্ষণ আপনি শুধু ভালো করতে চাওয়ার ফাঁদে পড়ে আছেন, সবসময় আপনি মন্দই করবেন। কারণ যে ‘ভালো’ আপনি খুঁজছেন সেটা আছে শুধু ভবিষ্যতে। কোনো একসময় আপনি ভালো হবেন এবং ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি একজন খারাপ ব্যক্তিই থাকবেন। তো তথাকথিত পাগলেরা হাল ছেড়ে দিয়েছে আর আমরা তাদেরকে আমাদের এই কাঠামোতে, যা-কিনা নষ্ট হয়ে গেছে, খাপ খাইয়ে নিতে তাদের সবচে’ বড় অনিষ্ট, সবচে’ বড় ক্ষতি করে চলেছি। [হাসি] নষ্ট আমি শুধু বলছি তা নয়, এটা নষ্টই।

সমাজের সাথে আমি যুদ্ধ করি না। এর সাথে আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। এইটা পাল্টানোতেও আমি আগ্রহী নই। নিজের মধ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে চাওয়া আর সেখানে নেই। সুতরাং এই কাঠামো বা সমস্ত দুনিয়াটা পাল্টাতে চাওয়াটাও আর সেখানে নেই। এমন নয় যে মানুষের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি আমি উদাসীন। দুখীর সাথে আমি দুখী, সুখীর সাথে আমি সুখী। অন্যের দুর্ভোগ হয়তো আপনার ভালো লাগে, কিন্তু ধনী লোকটা যখন হম্বিতম্বি করে তখন আপনার ভালো লাগে না কেন? একই তো ব্যাপার! এটাকে বলছেন ভালো-লাগা আর ওটাকে বলছেন ঈর্ষা, বিদ্বেষ। কিন্তু আমি এই দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না। আমি দেখি শুধু দুর্ভোগ। ব্যক্তিগতভাবে আমার কিছুই করার নেই। এবং একইসঙ্গে এই দুর্ভোগ আমি আমার আত্মশ্লাঘা বা আত্মসিদ্ধিতেও ব্যবহার করতে চাই না। সেখানে সমস্যা আছে এবং ওই সমস্যার জন্যে আমরাই ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। তবুও আমরা সমস্যা সৃষ্টির দায়টা মানছি না। সমস্যা প্রকৃতিসৃষ্ট নয়। সমস্যা আমরাই সৃষ্টি করেছি। প্রকৃতিতে রয়েছে বিপুল, অঢেল; কিন্তু আইনত যা সবার, সেটা সরিয়ে ফেলে আমরা বলছি আপনার দয়াদাক্ষিণ্য করা উচিৎ। সেটা খুবই হাস্যকর!

ধর্মীয় লোকেদের মাধ্যমে শুরু এই দয়াদাক্ষিণ্য আসলে সমস্যার সরাসরি বিহিত করাটা অস্বীকার করে। দরিদ্র লোকটা দুর্ভোগে আছে বলে তাকে আমি সাহায্য করতেই পারি। কিন্তু তার থেকে আমার বেশি না থাকলে আমার সাহায্য করার কোনো উপায় নেই। আমার যদি তাকে সাহায্য করার কোনো উপায়ই না থাকে তখন আমি কী করবো? যেখানে আমি সম্পূর্ণ অসহায় সেখানে আমি কী করবো? ওই অসহায়ত্ব শুধু আমাকে তার সাথে বসায় আর কাঁদায়।

 

_________________________________

১. হেতুবাক্য: logically ascertained premise.
২. জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি (১৮৯৫-১৯৮৬), ভারতীয় দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ।
৩. মিউটেশন: mutation; পরিব্যক্তি; রূপান্তর।
৪. বেদান্ত: বেদের শেষভাগ বা জ্ঞানকাণ্ড, উপনিষদ্; বেদব্যাস কর্তৃক রচিত ব্রহ্মপ্রতিপাদক দর্শনশাস্ত্র।
৫. ‘‘আমিই সেই’’: ‘‘That I am’’; (সোহংবাদীরা যেরকম বলে থাকেন, ‘‘আমিই ঈশ্বর’’ বা ‘‘আমিই সত্য’’, ইত্যাদি।)
৬. হেলথ ফুড: health food; কৃত্রিম রাসায়নিক দ্রব্যাদি-মুক্ত পুষ্টিকর খাবার; স্বাস্থ্যকর খাবার।
৭. সেনসরি অর্গান: sensory organ; সংজ্ঞাবহ ইন্দ্রিয়।
৮. প্রাণক্ষেত্র: field of living.
৯. ট্রায়াল অ্যান্ড এরর: trial and error; (বিবিধ প্রক্রিয়া প্রয়াসের পর নিজের ত্রুটিসমূহ থেকে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে কোনও সমস্যা সমাধানের যে প্রক্রিয়া।)
১০. সারভাইভল ম্যাকানিজম: survival mechanism; উদ্বর্তন প্রক্রিয়া।
১১. ইনটুইটিভ পারসেপশন: (মনোবিজ্ঞান) intuitive perception; স্বজ্ঞাত প্রত্যক্ষণ।
১২. ইনটুইটিভ আন্ডারস্ট্যান্ডিং: (মনোবিজ্ঞান) intuitive understanding; স্বজ্ঞাত উপলব্ধি।
১৩. থার্মোস্ট্যাট: (পদার্থবিজ্ঞান) thermostat; তাপস্থাপক। (কোনো আবদ্ধ স্থানের বা আধারের উষ্ণতা স্থির রাখার ব্যবস্থা।)
১৪. প্যারানয়া: (মনোবিজ্ঞান) paranoia; ভ্রম-বাতুলতা। তীব্র মানসিক অসুস্থতা।
১৫. স্ট্যাটিস্টিকলি: statistically; পারিসাংখ্যিকভাবে।

……………………….
[Conversation with U.G. Krishnamurti: 4; এটি No Way Out গ্রন্থের Nothing To Be Transformed পর্বটির বাংলা অনুবাদ। অনুবাদের স্বত্ব সংরক্ষিত।]

 

 

 

 

 

 

Facebook Comments

One Comment:

  1. Pingback: ইউ.জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৭ » সাহিত্য ক্যাফে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *