নেহাত জলছাপ


নাহার মনিকা

সমুদ্রের গায়ে নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দেয়া’র পলকা স্বপ্নটার ওজন বাড়ছে, যেন শ্যাওলা, যেন ভাসতে ভাসতে, বয়স বাড়তে বাড়তে গভীর তলদেশে গিয়ে থিতু হওয়া প্রক্রিয়াটার নাম বেঁচে থাকা। অথচ এখনও কোনদিন সমুদ্র দেখা হলো না। ‘এখন সমুদ্র তলদেশও হানিমুনে যাওয়ার উপযুক্ত’- ডিসকভারি চ্যানেল দেখতে দেখতে রায়হান বলে দেয়। কথাবার্তার মতই ওর সঙ্গে আমার ফারাক বেশী। অবশ্যম্ভাবী এ কারণেই হয়তো মজে গেলাম, পরস্পর পরস্পরকে গুনতে গুনতে শুরু হলো সিরকায় ভেজানো আমাদের কাগজী লেবু দিন।

তারপরও কতটা বলা যায়? বলা কি যায় যে -শরীর-মনে ভালোবাসার প্রাকৃতিক বর্ষণের সবটুকু নিয়েও এমন অসামুদ্রিক অন্ত্যজ জীবন কাটায় মানুষ! কী, আর কে এমন দায়ভার নিয়ে সবটুকু নিশ্চিত করে অথবা অনিশ্চয়তার কথাও উচ্চারণ করে! নিবিষ্ট ক’রে তাঁকালে বুঝি কী ভীষণ জীবন একটা মুখ ভর্তি বাতাসের মধ্যে উড়ে যাওয়ার জন্য নড়বড় করছে। যেন একটা টুকরা কাগজ, মাটি, কিংবা ছাই, পানি পেলে অনিচ্ছাতেও দ্রবণযোগ্য। ভাবাভাবির দিব্যি কেউ দেয় না। চাইলে এসব উপকরণে বীজ পুতে গাছ বানিয়ে তাতে কচিপাতা গজানো যায়, না চাইলে চোখ ভরে যায় অগভীর বর্জে, খড়কুটোয়। তবুও, স্বপ্নের জলজ জীবনটা একটা বিস্কুট দৌঁড়ের দড়িতে চোখের সামনে প্রায়ই থির থির কেঁপে দূরে চলে যায়। সেই দড়িতে আমি নিবিষ্ট ঝুলছি। ঝুলছে মুশকি, হুমা আপা, রায়হান আরো কোন কোন অনুচ্চ, কম্পমান নাম। জলছাপের মত ভুস করে স্পষ্ট হয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

নিজের বাড়ির সামনে রায়হানকে বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে আছে। এ পক্ষের কেউ আমাকে চেনে না। আসলে পক্ষ টক্ষ সব আমার মনগড়া। অস্তিত্বের বিশদই অনুপস্থিত, তাতে আবার পক্ষ! হাওয়ার সাথে যুদ্ধ করে গাত্রে হলো ব্যথা! কাউকে দেখিনি, কোনদিন আসিনি, দু’একবার শুধু বাইরে থেকে দেখার আভাস। তেমন পক্ষ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়? আজকে যখন ইন্দিরা রোডের ট্রাফিক জ্যাম হাঁপানির কষ্টে শ্বাস টেনে চলছে, হা করে থাকলেও বাতাস রায়হানের ফুসফুস ছুঁতে পারছে না, বাড়িটা  আবার দেখতে পেয়ে, বলা কি উচিৎ যে নয়ন জুড়ালো! চক্ষু সার্থক করতে গিয়ে শিরদাড়া গরম হয়ে যায় আমার। ঘামের টুপ টাপ বেয়ে পড়া টের পাই। আমি কিনা রিক্সাতেও সোজা হয়ে বসি, এমনভাবে যেন কেউ রিক্সার ব্যাকসাইডে আলকাতরা মেখে রেখেছে, এখন আমার কাঁধের ওপর নড়তে না পারা দণ্ডাদেশ।

-‘ঘর ভেঙ্গে ঘর বানানো আমার কাজ’- প্রথম দেখা হবার দিনে রায়হান বলেছে, আর্কিটেক্ট সে। আদতে ব্যবসায়ী, ডেভেলপার। তারপর ইন্দিরা রোডে ইটালিয়ান লাল ইটের ওপরে ফার্ণে ছাওয়া তে’তলা দেখে ওর কথার মানে বুঝলাম, ঘর সে ভাঙ্গে আবার বানায়, নিজের ঘর ছাড়াও আরো আরো অন্যদের ঘর। সে নির্মাণ কখনো স্থিত, আবার কখনো শুধুই আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোত নিয়ে টলটলায়মান।

সন্ধ্যার আগে আলো-বাতাস যেমন মাটিধোয়া হয় যায়,মন বিষণ্ন করা, তেমন। হাসপাতালে যাওয়ার জন্য এই এম্বুলেন্সে রায়হান শুয়ে আছে,  আমি আছি পর্দ্দার পেছনে, কারণ এম্বুলেন্সটা ওর নিজের বাড়ি থেকে বের হয়নি। আমাকে পর্দ্দার সামনে আনার  জটিলতা পোহাতে চাইনা আমরা কেউই। থাকিই না একটু যাত্রাদলের প্রম্পটারের মত, চরিত্রের প্রয়োজনে ছদ্মবেশ না নিলেও চলে। একটা মলিন আলোয়ান গায়ে অল্প আলোয় ভাঁজ করা কাগজ খুলে অনুচ্চ স্বরে সংলাপ বলতে নিলে এক আধবার সামনের সারির দর্শকরা তা শুনে ফেলে সচকিত হলেও মূল অভিনেতার আকর্ষণে অনুচ্চ সে কণ্ঠস্বর বিস্মৃত হতে সময় লাগে না। রায়হান আজকে অজ্ঞান হয়েছিল, ওর চরিত্রের বিপরীতে। তবু আমি জানি কাউকে এই মুহূর্তে খবর দেয়া নিষেধ। হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি টর্তি হবে, তখন নার্সদের অফিস বা রিসেপশন থেকে জানিয়ে দিলেই হবে- কে এনেছে এ খোঁজ খবর করার তেমন কেউ নেই। ‘সবাই’ রায়হানের বোঝানোর অজুহাত-‘ নিজেকে নিয়ে বিস্মিত, মশগুল’।

ওর কব্জির ওপরে স্যালাইনের সূঁচ, ব্যথানাশক পড়ি মরি করে ছুটে যাচ্ছে শিরা উপশিরায়। আহ, সকল প্রকার বেদনা এই উপায়ে নাশ করা যেতো! হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরী হলেও এই মুহূর্তে গ্রামের ইস্কুলের ছাত্রবিহীন মাস্টারের মত ছাত্রের অপেক্ষায় থাকতে ভালো লাগছে। সে মাস্টার নিজের প্রাক্তনদের কথা ভাবে নিশ্চয়ই।
প্রাইভেট হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স তাও যাহোক সামান্য ইক্যুইপ্ট, টাকাপয়সা আছে।  স্যালাইনটা বন্ধ হয়ে গেলে এ্যাটেন্ডেন্ট লোকটা সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করেছে। তাকে কাৎ করে হাত উলটে দিতে গিয়ে ভালো করে দেখতে পাচ্ছি বাড়িটা।  দোতলার বারান্দা দেখা যায়- এক ঝলক দেখা দিয়ে যায় টিন এইজ একটা মেয়ে, ডুরে সালোয়ার। কে হতে পারে? রায়হানের প্রথম পক্ষের কেউ? ক্ষণকাল তিষ্টিয়ে রাস্তাঘাটের রিক্সা গাড়ির মিছিল দেখলো না! প্যাঁ পু করা এম্বুলেন্সের ভেতর তড়পাতে থাকা রায়হানকে ঘিরে আমার উৎকন্ঠা তাহলে দেখতে পেতো। এত ব্যস্ততা কিসের এদের? পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। ওরা কি আর পরীক্ষা শেষ হ’লে আমাদের মত গ্রামের বাড়ি করে! নেহাৎ বিদেশ টিদেশ গেলে হয়তো যায়, আর না গেলে আবারো কোচিং, পরের বছরের প্রিপারেটরী ক্লাস। এ লেভেল, ও লেভেলের লেবেল গাঁয়ে সেঁটে ওরা দৌঁড়ে প্রথম দ্বিতীয় হতে গিয়ে হাঁটু ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে ভাঙ্গে না। অকারণে আমার জেনারালাইজ করতে ইচ্ছে করে।

আর আমাদের, কত আমোদ ছিল, আহ! আমি আর মুশকি। আমাদের ইস্কুল।  আঠা দিয়ে আটকানো ভেজা, সোঁদা আমাদের শরীকের বাড়ি। মুশকি যখন পাঁচ বছর আগে ওর বছর সাতেকের মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিল দেখাতে, পৈত্রিক ভিটাবাড়ি। সেও বলে উঠেছিল- ‘সিক্স হাউস গ্লু’ড ট্যুগেদার!’

আমরা এক রান্নাঘর থেকে আরেক রান্নাঘরের কথা শুনতাম। মাঝের দেয়াল সিলিং বরাবর না পৌঁছে হাত দু’য়েক বাড়বে না বলে জেদ করলে আমার মা আর মুশকি’র মা নির্বিঘ্নে নিজেদের রান্নাপাতির সুঘ্রাণ পাচার করতো, আর দু’একদিন পর পরই ডিশ,বাটি ভর্তি হয়ে এক শরীক থেকে আরেক শরীকের ঘরে। এপাশে, ওপাশে আরো আত্মীয়ের ভীড়ে আমরা অনাত্মীয়ও দেখি আবার দেখেও দেখিনা।

আমার আর মুশকির ক্লাস সিক্স-সেভেনের ছুটি, দুপুর, সন্ধ্যারাত বারান্দায় বসে কাটে। বারান্দার সিঁড়ির মাঝখানে রেলিং একই রকম ঢালু হতে হতে নিম্নমুখী, বিভক্ত হবার  কষ্টে বিবর্ণ। আমরা দু’পাশ থেকে পা উঁচিয়ে একটুখানি রেলিং পিছলে একের পর এক নেমে আসি। মায়েরা হয়তো বারান্দায় রাখা চৌকিতে তোষক পেতে রেডিও’র আসরে। জোরে কথা বলা মানা, কারণ ব্যাটারীচালিত টেলিভিশনে তখন ছবি দেখা যাচ্ছে না। ঝিঁ ঝিঁ পোকার লাফ ঝাঁপে ত্যক্ত মায়েরা তাই টিভি স্ক্রীন রেখে রেডিও শুনতে বারান্দায়। আমরা সিঁড়ির পায়ের কাছে বসে রাতের গুলতানি দেখি। রাতের হাওয়া ওড়ে।  ছাই ওড়ানো, ঘুম কেড়ে নেয়া, আবার কখনো আগ্রাসী দৈত্যঘুম উস্কে দেয়া রাত। মুশকি বলে রাতও নাকি মুখোশ এঁটে থাকে। আমি কখনো দেখি না!  কতরকম ভাবে নাকি ও ই কেবল দ্যাখে। বিশেষ করে শীতের রাতে ওর আব্বার ডিউটির সময়। কানঢাকা টুপি আর ভারী কোটের ওপরে উলের চওড়া মাফলার জড়িয়ে সন্ধ্যার পরে পরে বড় চাচা বেরিয়ে গেলে আশপাশের শব্দ চাপা পড়ে যায়, তখন মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক সারসের উড়ে যাওয়া দেখে হঠাৎ পূর্নিমা রাতের কথা মনে হলে বোঝা যায় কৃষ্ণপক্ষের শুরু। আকাশের কোনা মাতানো এত্তবড় চাঁদ মাতাল ট্রাকের মত এগিয়ে আসে। মুশকি’র তখন পোয়াবারো! ওর নাকি মনে হয় সারাটা রাত্রি আজকে এই মুখোশ পরেই থাকবে। মুখোশ মানে নিত্য নূতন সাজ আর ভাবভঙ্গী। আজকে দৈত্যাকৃতি তো কালকেই ডাইনী বুড়ির আদল ধরে রাতটা তাকে গিলতে আসবে। তারপরের দিনই বালিকার বেশ, ফুটফুটে ফুরফুরে, একদঙ্গল শিউলীফুল বেমক্কা ছড়িয়ে দিয়ে কোন দুবলা ফিনফিনে কাশবনে এলিয়ে থাকে। তখন বাতাসের গায়ে ভুরভুরে সুগন্ধ, মুশকি’র ইচ্ছে হয় গায়ে মাখে, আদুল, গড়্গড়িয়ে কাশবনের ওপর পিছলে পিছলে নেমে যায় নদীতে। কোন নদী? আদতে কোন নদীই তো দেখেনি সে। বললে লোকে হাসবে? বাঙ্গাল দেশের মানুষ নদী দেখেনি! তবুও নদীর হাজামজা স্বপ্নের মধ্যে মজে থাকে! আসলে আমরা বড়ই তো হলাম আধা শিক্ষিত দালাল টাইপের এক মফস্বলে। একটা অযত্নের ট্রেনষ্টেশন, পাশে গাদাগাদি করা কিছু দোকান ঘর, সাইন বোর্ডের নিচে বেলাজ ফলপাকুড়ের ঝুলে থাকা দেখতে দেখতে স্কুলে যাওয়া। স্কুল পার হয়ে একটু দূরে গেলে তার অবশ্য একটা মাঠ জুটে যায়। আগ্রাসী সেই মাঠের শরীরে তখন আস্তে আস্তে জমা হচ্ছে তাবৎ দিনের শূন্যতা। আমার ভয় করে। চৌদ্দ বছরের মুশকি’র বেদম সাহস। আমি ওর বাহুমূল আঁকড়ে ঝুঁকে থাকি। আমার সদ্য উঠতে থাকা ফুস্কুরির মত স্তনে মুশকির পাতলা পেশী ধাক্কা খেলে চোখের কোন দিয়ে ও কেবল একঝলক আমার মুখ দেখে আবার ঘুরিয়ে মাঠের দিকে নেয়। না দেখা সমুদ্রের স্বপ্নটার অংকুরোদ্গম কি তখন থেকেই?

মুশকি’র সাথে যখন বছর পাঁচেক আগে দেখা হলো – ওর ছেলেমেয়েদুটোকে শুতে পাঠিয়ে দিয়ে বসলাম। আমার তখন বলতেই হলো- ‘ ভয় পেলে কি হবে, আমাকে ঐ জায়গাটা সারাক্ষণ টানতো’।

সে জন্যেই তো প্রতিদিন স্কুল শেষ করে বলতাম- চল যাই

দু’জন বইখাতা বুকের ওপরে চেপে দাঁড়িয়ে থাকি, মাথার ওপরে সূর্যের ছলচাতুরী- ইচ্ছে হলো গনগনে হলো, ইচ্ছে হলো তো লুকিয়ে গেল। দেখলাম আজকের, মানে পাঁচ বছর আগের জোয়ান তাগড়া মুশকিও এই ছলচাতুরীর ঢেউয়ে দোল খায়, একটা ডালে বাঁধা দোলনায় দোলে যেন। জিগাতলায় আমার বাসার সরু বারান্দার ক্রীড়ামোদী বাতাসে তার সোজা চুল পিছলে পিছলে ওড়ে। রায়হানের কেন যেন মুশকিকে ভালো লাগলো না, ওর ঝা চকচকে ত্বকের সঙ্গে গৈ-গেরামের কথা নাকি বেমানান লাগে। মেয়েলী ঢং গলায় ফুটিয়ে বলে- ‘ভড়ং’। আমার মনে হয় ইর্ষা। আমার আর মুশকির সময়গুলিতে মাথা গুজতে না পারার ক্ষেদ।

মুশকি সপ্তাখানেক ছিল, আমরা দু’দিনের জন্য ঢাকার বাইরে গেলাম- ওর ইচ্ছে তার ছেলেবেলার রাতগুলিকে ছিনিয়ে হোক, যেভাবেই হোক ফিরিয়ে আনবে। রায়হান তার মাইক্রোবাস, ড্রাইভার ইত্যাদি ধার দিলো কিন্তু নানান বাহানায় তার অস্বাভাবিক অনুপস্থিতি বজায় রাখলো। আমি তারপর আর কি করি? তাবৎ শৈশব স্মৃতিকে তৎক্ষণাৎ ধোঁয়া উদ্গীরণকারী দৈত্যের মত বোতল বন্দী করে ফেললাম। বোতলটা কেবল সমুদ্রের তলদেশে নোঙ্গরের অপেক্ষায় থেকে থেকে ছটফট করছে।
কিন্তু ঐ মাঠের রাত আমাদের আর দেখা হয়নি। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরায় কার্ফিউ। পরে বুঝেছি, রাতগুলি, মানে যেসব আমি দেখতে পাইনি, মুশকি নাকি শুধু স্বপ্নে দেখেছে। স্কুল ফাইনাল দেয়ার পর আসলে ঐ শহরে তো যাওয়া হয়নি। পুরনো শহরে আর না ফেরা- কেমন অবিভাজ্য সত্য হয়ে আমাদের কাঁধে চেপে বসেছে।
-‘এই এই হাত ভিতরে ঢোকা! বিপদ আছে নাইলে…’ পাঁচ বছর আগের মুশকি নকশী কাঁথা টাঙ্গানো দেয়ালের পেছন ফিরে হঠাৎ শিষিয়ে উঠলে হেসে উঠি আমি। সেই পুরনো গল্প।

পাগলপ্রায় লোকটার হাঁক শুনে হাতটাকে ঢোক গেলার মত ভেতরে নিয়ে আসে  সে। তার হাতে নতুন পাওয়া ক্যাসিও ডিজিটাল ঘড়িতে রাত সাড়ে এগারোটা। ট্রেনের গায়ে আলস্য, কুলাউড়া জংশন পার হচ্ছে। বড়মামা এই মধ্যরাতেও ইত্তেফাকের খেলার পাতায় ডুবে আছে। আমার পাশের অচেনা মেয়ে যাত্রী ওড়নায় মাথা মুখ পেচিয়ে কুঁকড়ে মুকড়ে ঘুম, থেকে থেকে ঢলে পড়ছে আমার দিকে। আর আমি না ঘুমিয়ে মুশকির দিকে, আর মুশকি নিজের ঘড়িতে। ঘড়িটাতে মুশকি নিজের আত্মা বন্দী করে ফেলেছে। খোদ দুবাই নগর থেকে কিনে এনেছে বড়মামা। আমাদের মফস্বলে এই প্রথম পা রাখলেন মাননীয় ঘড়ি। কালো প্লাস্টিকের চকচকে বেল্টের ওপরটা হাতায় মুশকি। টিক টিক করে সৌরচালের সঙ্গে বৌ-ছি খেলছে সংখ্যারা, বাড়ছে-কমছে-বাড়ছে, নিজের হৃদস্পন্দন নিয়ে আশ্চর্য এক বরফ কলের মধ্যে ছটফট করছে যেন। চলন্ত রেলের জানলায় চিবুক চেপে বসা বালকের প্রখর কৌতুহল গতিপথ পালটে ঘড়ির দেয়ালে আটক, মুশকি’র নাকি তাঁকালেই খুশীতে অস্থির লাগে। ভাগ্যিস ওই ফকির মতন লোকটা চিৎকার করে উঠলো, সে হাত না টেনে নিলে- বলা কি যায়, কেউ যদি ঘড়িটা হাইজ্যাক করতো! সেই সঙ্গে হাতটাও মচকে বা ভেঙ্গে দিলে? নাহ, এমন বোকামী করবে না বললে মুশকি ঘড়িটা খুলে হাতের তালুতে নিয়ে দেখে আবার বেল্টের ফুটোয় কালো আংটা ঢোকাতে গিয়ে লজ্জা পায়। পেপারের ওপর দিয়ে মামা চেয়ে দেখছে। আমাকে চেয়ে থাকতে দেখে মুখ ভেংচায় মুশকি। পরে রংপুর থেকে ফিরে গিয়ে মুশকি ঘড়িটা আমাকে দিয়ে দিতে চেয়েছিল। বিপুল শখের ঘড়ি নিজের কাছে থাকবে! আমার একদম আনন্দ হয়নি, নিইনি। কারণ ও তখন আমার পুরো ক্লাস এইট অবসন্ন করে দিয়েছে।

– সেবার রংপুরে বেশীদিন থাকি নাই। মাত্র তের দিন আর সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় কিছু হয়?’ মুশকির কাছে সময় মাপক যন্ত্রটা তখনো ছিল।

মনে করতে চাই- কেন আমরা রংপুর গিয়েছিলাম সেবার? গরমের ছুটিতে, রোজার ছুটিতে সবসময় নানাবাড়ি মানে একমাস। তেরদিনের জন্য কেন গিয়েছি, অথবা তেরদিন পর কোন বিশেষ কারণে বড় মামা আমাদের ফিরিয়ে এনেছে। কি সেটা? মাথার প্রকোষ্ঠ জুড়ে এত এত ঘটনা, বিবরণ আর তাদের উত্তুঙ্গ আভাস ঘূর্নায়মান থাকে যে কোনটা আগে-পড়ে, পেছনের কারণ হঠাৎ হঠাৎ কিছুই মনে পড়ে না। অথচ বেশীদিন আগের কথা না।

– আমরা তাজহাট রাজবাড়ি আর পায়রাবন্দ যাবো বলে দিনও ঠিক করলাম। কিন্তু সেদিন কালবৈশাখী ঝড় হলো। হুমাআপু রান্নাঘরের নীচে চাপা পড়ে ভাঙ্গা কোমর আবারো ভেঙ্গে ফেললো, মনে নাই?’

খুব স্বাভাবিক, পাঁচবছর আগের মুশকির মুখের এক্সপ্রেশন ক্লাস সিক্সের মুশকির চেয়ে হিসেব কষে নির্বাচিত, নির্লিপ্ত। হুমা আপার প্রসঙ্গেও চোখের একটু বাড়তি পলক ফেলল না।  ওর সচেতনভাবে শেইভ করা গালে সবুজ আভা। সেই আমাদের ক্লাস এইটের মত, ওর কানের কাছের হাল্কা জুলফি, সবুজ রং যা দেখে আমি পাগল হয়ে যেতাম।

টোলপড়া গাল ছিল হুমা আপার, আর কোমরছাপানো চুল। যৌবন তার কোমরের কাছে এসে নিঃশ্চুপ হয়ে গেছে। শাড়ি গাছকোমর বেঁধে পোলিও আক্রান্ত পায়ের পাতা, আমরা বলতাম- পেত্নীর পা এমন চেপ্টে যায়- লেপ্টে লেপ্টে উঠানে ভেজা ধান নেড়ে দিতো হুমাআপা। পায়ের ব্যালান্স করতে গিয়ে নাও বাওয়ার মত দেখাতো ধান নাড়ার ভঙ্গিটা । ছোটমামীর ওপর আমার রাগ হতো, আপন বোনের মেয়ে এত কষ্ট নিয়ে ধান সামলায়, সে কেন নিষেধ করে না, থামায় না। আমি আর মুশকি তাকে ‘মামীর চামচি’ বলে ক্ষ্যাপাতাম।

– য়্যাই মুশকি, তোর না চাচী হয়!

বাইশ বৎসরের হুমা আপার একটাই দোষ, ইয়ার্কি বোঝে না। বাৎসল্য দেয়ার বদলে সর্বদা কপাল কুচকে ধানপানের চিন্তায় মশগুল, অথচ হাসিমুখ হলে তার চারদিকে অলৌকিক বৃত্ত তৈরী হয়, সেটা সে জানেই না! এই বয়সেও চটকে আদর করে বলে মুশকি পছন্দ করে না হুমা আপাকে।  তখন থেকেই ওর মধ্যে সব সম্পর্কের জট ছাড়িয়ে ছটফট করে বেরিয়ে যাওয়ার একটা তাড়া। আমি অবশ্য হুমাআপার কাছে ন্যাওটামি করি। আচার আমসত্ত্ব চুরি করতে হয় না। খটখটিয়া যাওয়ার সড়কের কাছে ছোটমামার ষ্টেশনারী দোকান। আমাদের বিস্ময়ের রাজ্য। পাঁচ টাকার নিচে যা চাও সব ফ্রি। তাই বলে আমরা সবকিছু নিয়ে বসি না। জানি, দিলেই হামলে পড়তে নাই। এমনিতেই বড়মামার আশ্রয়ে থাকি- দরকার পড়লেই মা মনে করিয়ে দেয়। জুতো মোজা পরে যেমন পা সোজা করে বসতে হয়, তেমন ভদ্র হতে হয় আর সব ক্ষেত্রেও। তখনো পায়ের ওপর পা তুলে বসার অনুমতি মেলেনি। আমার খুব ইচ্ছে করতো। ছোটমামীর ঘরে একটা নকশাকাটা কাঠের চেয়ার, উচ্চাভিলাষী কোন কাঠমিস্ত্রী একটা চৌকো আল্পনা কাঠের গায়ে খোদাই করতে চেয়েছে। বড়রা কেউ কাছে ধারে না থাকলে আমি সেখানে পায়ের ওপর পা তুলে বসতাম। হুমাআপা বলতো- ‘তোমাক অঞ্জু ঘোষের মতন দেখায়”! তার কন্ঠস্বরে সমীহ। ঝুঁকে কাছে এসে তর্জনীর ডগা আমার কপাল থেকে চিবুক পর্যন্ত একটা নরম টান দিয়ে দেয়। ঠোঁটের কাছে এসে তার আঙ্গুল স্থির হয় একটু, আমি টের পাই। হুমাআপার আঙ্গুলটা তখন দীর্ঘ হয়ে আমার কন্ঠনালী ছুঁয়ে আরো নিচে নামতে চায়। গলার নিচে, বুকের কাছটায়। ভালো লাগে না। বিরক্ত হই। কব্জির কাছে ধরে হাতটা সরাই।

পোলিওয় পা খোড়া হবার পর আর স্কুলে যায়নি হুমা আপা। তার ভেঙ্গে যাওয়া বিয়ে, হতে পারতো শ্বশুরবাড়ি এইসব গল্প আমাদের কিশোর মনে জালে না আটকালেও ভাসা ভাসা শুনি, রাতে খোলা উঠানে চাটাইয়ে শুয়ে গল্পগুজবের সময় বেমালুম ভুলে যাই। হুমা আপা জুম্মাপাড়ায় তার আরেক খালার বাসায়ও থাকতে যায়, দেখে আসে টিভির সিনেমা, বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তার একমাত্র সংযোগের সুতা।

আমার দিকে পেছন ফিরে ব্লাউজ বদলালে আমি হুমা আপার উদোম পিঠ, চড়ের দাগের মত ব্রা’র ষ্ট্রাপের লালচে দাগ দেখি। চোখ সরালেও আটকে থাকে মন। ছোটমামীর ঘরের কোনায় ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় আমার মুখের একপাশ দেখা যায়। যাহ,অঞ্জুঘোষ, মানে বাংলা সিনেমা! বিশ্রী! ক্ষ্যাত! আমরা ঢাকার টিভিই দেখতে পাইনা। আমাদের দূরদর্শন। প্রাদেশিক সিনেমাতে বাংলা –উত্তম সুচিত্রা, প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী। কেন্দ্র থেকে আশা পারেখ, মালা সিনহা। ‘চাহে কোঈ মুঝে জঙ্গলি কাহে’,  ভাগ্য ভালো হলে পূজা ভাট- নিস্পাপ বরফ সুন্দরী- ‘বাদলঅ মে ছুপ রাহা হ্যায় চাঁন্দ কিউ?’ কালে ভদ্রে-সিলসিলা। রেখার কোলে মাথা রেখে অমিতাভের কখনো না পুরানো হওয়া আবৃত্তি –‘ম্যায় অর মেরি তানহাই আকছার ইয়ে বাতে করতে…তুম হোতে তো আয়্যসে হোতা, তুম হোতে তো…

আমাদের গ্লু’ড ট্যুগেদার বাড়িতে মায়েরা অবশ্য ‘জীবন থেকে নেয়া’র ভক্ত। আমি আর মুশকি পেছনের দেয়ালে মই ঠেকিয়ে টালি’র ছাদে উঠে বাঁশের মাথায় বাঁধা এন্টেনা নাড়াই, ঢাকা টিভি সেন্টার ঝিঁ ঝিঁ’র ডাক বাড়ায়, কখনো কমায়। ‘এ খাঁচা ভাঙ্গবো আমি কেমন করে’র দু’লাইন খুব ভালো দেখা যায়, নীচ থেকে নেমে আসার ডাক আসে। আমি আগে, মুশকি পরে। মন আমাদের কয়েক কোটিগুন অসাবধানে নেমে আগেই টেলিভিশনের সামনে বসে থাকে। প্রায় মাটিতে পা ছোঁয়াবো তখন আবার মায়েদের আওয়াজ- ‘নাই নাই, চলে গেছে আবার’। আমরা আবার ওপরে উঠি, নিচে দর্শকেরা মুহূর্তকাল আবার ‘একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে’র অনুরণনে ভেসে যায়। আমরা নেমে আসতে গিয়ে আবার নেমে আসতে পারি না। সিনেমাময় জীবনে আমি আর মুশকি শুধু ছাদে ওঠা আর নামার মাঝখানের এক অসহনীয় আফসোসের ভেতরে আটকে থাকি। মুশকি ততক্ষণে এন্টেনা বেয়ে উঠেই যাচ্ছে ওপরে, ওপর থেকে আরো ওপরে, আকাশ ফুঁড়ে,  জ্যাক এন্ড দ্য বীন ষ্টকের সীম গাছটার মত এন্টেনার বাঁশটা বেড়েই যাচ্ছে-বেড়েই যাচ্ছে। আমার হাত থেকে ওর হাত, অতঃপর ওর পা নাগাল ছাড়া হয়ে গেল! লাগাতার ঘুরিয়েও কেন যেন কোন ছবি হাওয়ায় ভাসিয়ে আনতে পারছি না। ত্যক্ত হয়ে মায়েরাও আবার সিলসিলা’তে ফেরত যায়। তুম হোতে তো আয়সে হোতা! আহা এই ‘যদি তুমি হতে’ সংলাপ জীবন থেকে চকবোর্ডের ওপর ডাষ্টার দিয়ে মুছে ফেলা যায় না?

হুমা আপাকে নিয়ে খিটিমিটি ঝগড়াটা মুশকি’ই শুরু করে। তারপর বছরভর সেটা জিইয়ে রাখার দায় আধা আধি আমারও। আমার কাছে যাকে নিয়ে চেহারা বেঁকিয়ে ঠোঁট ভেংচে হাসিতে একাকার- সেই মুশকি, আমি আড়াল থেকে দেখি বাধ্য, একনিষ্ঠ আঙ্গুল দিয়ে হুমা আপার পিঠ খুঁটে দিচ্ছে। দাঁত কিড়মিড় করা রাগ হয় আমার!
হুমা আপার খোলা পিঠ দেখতে দেখতে আমার ঘোর লাগে। সেকথা বলতেই হুমা আপা ঘুরে দাঁড়ায়। সাদা আলোর দুটো গোল্লা আমাকে ঝাঁপ্টা মেরে শুইয়ে ফেলে! এত সুন্দর হুমা আপা! হুমা আপা এগিয়ে আসতে থাকে আর আমি বেহুশ হতে থাকি। বেহুশেরও একটা সীমা আছে, চক্কর কেটে গেলেও হুমা আপা সামনে থেকে যায় না। আমি ফণা তোলা অজগরের সামনে বসে থাকি, স্থাণু- মন্ত্রমুগ্ধ, প্রস্তরবৎ। তখন তখনই টর্ণেডোর বেগে, দুর্দ্দাড় মুশকি ঘরের ভেতর, হুমা আপা তার আঁচল টানার ফুরসত পাওয়ার আগেই।

ঢেউ তুলে হাঁটার প্রসঙ্গ এলে হুমা আপা বিষণ্ন হওয়ার বদলে হেসে গুড়ো গুড়ো হয়, – আমার জীবনটা খুব সোজা। একদিন জন্ম নিলাম, পরের দিন দুই দিনের হলাম, পরের মাসে দুই মাসের হলাম, পরের বছর দুই বছরের হলাম, তার পরের বছর তিন, তার পরে চার, তারপরে একদিন খোঁড়া হয়ে গেলাম, এত সোজা কারো জীবন, ভাবা যায়!’

পাঁচবছর আগে অনেকদিন পর মুশকিকে দেখে দু’রকম মনে হয়েছে- যায় আবার যায় না।


“দ্যা ওয়ার্ষ্ট পার্ট অফ বিয়িং ওল্ড ইজ রিমেম্বারিং হোয়েন ইউ ওয়ার ইয়াং”, রায়হান ইংরেজী মুভিতে দেখা এই সংলাপ প্রায়ই শোনায় আমাকে। আমার কাছাকাছি থাকলে তার স্মৃতিচারণে সুবিধা হয়। আমার স্মৃতিও যে তাকে বুড়ি ছোঁয়া করে, বুঝতে পারি। সে নাকি একবার হুমা আপাকে দেখেছে, রাস্তায়। লেংচে লেংচে হেঁটে যাচ্ছে। তাই কি হয়? যাহ! হুমা আপার অসূর্যস্পর্শা আভা দিয়ে চারদিকের ট্রাফিক থেমে যাবে না!

-‘পৃথিবীর কোনও নারীর আর সেই দিন আছে নাকি?’ পেট কাঁপিয়ে হাসে স্থপতি রায়হান।

ঠিক এগার বছর পরে হুমা আপাকে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল মুশকি। সে তখন বাইশ আর হুমা আপা তেত্রিশ। মানানসই না হলেও বয়সের গ্যাপ আগের মত প্রশ্ন উদ্রেককারী থাকে না। ঢাকায় বুয়েটে কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল ইয়ার। ছাত্র পড়িয়েও ভালোই টাকা আসে। নিজে বুয়েটের হলেই থাকতো, হুমা আপাকে পলাশীতে কোন বাসায় সাবলেট। হুমা আপার বয়স বাড়ে না, এই কথা রায়হানকে শানিয়ে বলতে বলতে বুঝি, যে ভুল হয়ে গেছে। অবচেতনের বার্ধক্যভীতি নিয়ে সে রাস্তাঘাটে হুমা আপাকে খুঁজে বেড়ায়।

-‘ আমার কাজ ঘর ভেঙ্গে নতুন করে গড়া’- নাটকীয় সংলাপ রায়হানকে মানিয়ে যায় বলে আমার হতভম্ব লাগে। কাঠবাদাম গাছে ছাওয়া একতলা বাড়ি রায়হানদের ফার্মের নজরে পড়বে- এটা কোন বিচিত্র ঘটনা না। আমার চাকরী ছিল না, সেটা জোটে। বাড়িওয়ালা রাজী হলে রায়হানের চোখ আটকে যায় আমাতে। ভাঙ্গার অভ্যাসে আমারও শুরুওয়াৎ হয়! কাঁচের পাত্র, দেয়ালের বাহারী আয়না। ছোটমামীকে তার ঘরের চেয়ারটা কুড়াল দিয়ে কেটে তারপর ভাঙ্গতে দেখেছি হুমা আপার পিঠে। তখন আমরা স্কুল ফাইনাল দিয়ে রংপুরে গেছি। কোথাও যাবার নেই বলে নিজের সব ক্ষমতা আর অপারগতা হুমা আপার গায়ে পিঠে ঢালতো মামী। যে নধর পিঠ কারণে অকারণে খুঁটে দিতো মুশকি।

রায়হানের সঙ্গে আমার কেবল দুপুর যাপন হয়। শুরুর দিকে গৃহাভিলাষি আমাকে ভাঙ্গা গড়ার ঔৎসুক্য নিরসন করতে কোথায় কোথায় নিয়ে গেছে রায়হান! তৈরী হওয়া খালি এপার্টমেণ্ট একটা দারুণ জায়গা! বিশেষ করে যদি আকাশচুম্বি কোন ভবন হয়, নিদেনপক্ষে সাত আট তলা। সংসারী মানুষের পদস্পর্শ না পাওয়া ফাঁকা ঘরে আমাদের নিজেদেরকে আনকোড়া আবিস্কার করতে করতে আমি মানুষের সংরক্ষিত গৃহকোণ কল্পনা করি। মেঝের পাথর কাঠিন্যে তাদের নরম পিঠ ছিলে যায় না। এইসব গৃহকোণে আমি দুপুর কাটিয়ে কল্পিত বাসিন্দাদের রাতের শয্যা, প্রসাধনীর বিলাস ইত্যকার স্বপ্নগুলো দেখতে চেষ্টা করি, যা কিনা রান্নাকরা রেসিপি হয়ে তাদের টেবিলে পরিবেশন যোগ্য। আমার হুমা আপার কথা মনে আসে- সে কি তার সোজা সাপ্টা জীবনে এই রেসিপি’র সন্ধান পেয়েছিল?

শুরুতেই কাঠবাদাম গাছটা কাটা হলো। শেকড় বাকড় শুদ্ধ মাটি উপড়ে বেচাইন হয়ে শুয়ে থাকলে তার পাতা টাতা নেতিয়ে আসে। আঠারো তলার ফাউন্ডেশন। চার দিয়ে আরো গুণাংক আছে। পাঁচ কাঠায় চারটা বাসা খুব স্বাভাবিক। আর্কিটেক্ট হিসেবে রায়হানের নাম ডাক আছে। একটা এপার্টমেন্ট নিজের জন্য রাখে রায়হান, আমার থাকা হয়ে যায়। আমিও তো নিজের। শুধু মঞ্চে ওঠার অনুমতি নাই।  তবু আমার অঞ্জু ঘোষ অবয়ব ঘষে মেজে রাখি। স্পা’তে যাই। ম্যাসাজ করা টান টান ত্বকের মোড়ক খুলতে অহংকার বোধ করি, মালিকানাও। তখন আবারো মুশকি’র গল্প শুরু হয়।

‘হুমা আপাকে মুশকি সাবলেটে না রাখলেও পারতো। মোচড় মেরে কাপড় খুলে রাখার মত এত সহজে ছেড়ে যেতে পারতো না’। রায়হানের গলায় নির্দ্বিধায় হুমা আপার জন্য মমতা।…কাউকে ছাড়তে চাইলে আগে থেকে চারপাশে বর্ম তৈয়ার করতে হয়।

আমার চারপাশ জন-মনিষ্যিহীন। কিন্তু ভয়ে ভাবনায় অন্তস্থলের প্রশ্ন চেপে রাখি যে রায়হানের চারপাশ যে ভর ভরন্ত।

মুশকি যখন স্কলারশীপের টাকায় কে এল এমএর ফ্লাইটে সিটবেল্ট বাঁধে, হুমা আপা তখন যৌবন স্থির হওয়া কোমর ঝুঁকিয়ে জানলায় আকুল প্রতীক্ষায়। প্রেমে, অপ্রেমে নারী জন্মকে অতল সমুদ্রের সার্থক শৈবাল করার আকাঙ্ক্ষা ঘিরে থাকে তার স্ফটিক অবয়ব।

রায়হানকে আমি এতবার এ গল্প বলি যে তার একরকম প্রত্যয় জন্মে গেছে যে হুমা আপার জন্য জীবন বাজি রাখা চলে। মুশকি যে তাকে রেখে চলে গেল সেটা অন্যায়। এক অনাবশ্যক শরীর লেন দেনের মুহূর্তে এমনকি এও বলে ফেলে- ‘একটু ক্রিপল্ড মেয়েদের সেক্স অ্যাপিল বেশী থাকে’। আমার অন্তর আবার কুঁকড়ে যায়। ভয় করাও কি একটা নিয়ম?


মুশকি চলে যাবার দিন কয় বাদে হুমা নামের পোলিও আক্রান্ত ঢেউ তুলে হাঁটা মেয়েটাকেই নাকি খুঁজে পেয়েছে রায়হান। আরেকটা পুরনো বাড়ি ভেঙ্গে নতুন করে বানানো চলছে। এখানেও তার নিজের ঘর থাকবে। সেখানে সে হুমা আপাকে রাখবে, স্থির জলপদ্মের মত। হুমা আপাকে নেব নাকি রায়হানকে ছাড়বো- প্রাচীন বিবমিষার মত সংশয় ঠায় দণ্ডায়মান থাকে আমার ঘরের ভেতর। এই ঘর রায়হান বানিয়ে দিয়েছে, ভাঙ্গতেও সে জানে। আমি কিম্ভুতকিমাকার করে সাজাই – একপ্রস্থ বেলুনে বিষ ভরে ঝুলিয়ে রাখি দরজার কোণে। পাশে সূঁচ। ক্রিষ্টালের কারুকাজ করা আতংক দেয়ালের শেলফে শোভা পায়। তবু ভালো- রায়হান হুমা আপাকে এখানে এনে ওঠায়নি। জলতরঙ্গের মত কৌতুহল নির্ণীরোধে বেজে যায় আমার ভেতরে। ঠেলে বের করে দিতে চাইলে ঘরের কোনায় রাখা বনসাই বাঁশঝাড়ে আটকে জটাজটি করে তারা। অপূরণীয় কৌতুক আর কৌতুহলে একসঙ্গে হুমাআপা আর রায়হান আমাকে জালবন্দী করে রাখে দিনরাত। না পেরে নিজের নতুন নাম দিলাম-মেজোপক্ষ। পক্ষ একটা নিতেই হয়। একদম পক্ষপাতহীন থাকে মৃত পাখি। আর সিদ্ধান্ত নিলাম- হুমা আপার সঙ্গে দেখা করতে যাবো। মুশকি বৃত্তান্ত উন্মোচিত হোক। কিন্তু রায়হান আর আমাকে সেখানে নেয় না। আমি যেন রূপকথার রাপঞ্জেল, সুউচ্চ দূর্গের মধ্যে বন্দী, তফাৎ এই যে আমার দীর্ঘ স্বর্ণরেনুর মত কেশদাম নাই। অস্ত্রবিহীন বসে থাকি। এখন রায়হান সপ্তায় একদিন আসে, আর পৃথিবী সম্পর্কিত ভীতি বহির পাতা খুলে রেখে যায়।

আজ দুপুরে রায়হান ত্রস্ত, অন্যমনস্ক। একসঙ্গে ভাত খেলাম। চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করলাম। রায়হান একই রকম- আমার জন্য ভয়বাতিকের পাঠশালা খুলতে চাইল। দুপুরবেলা নিবিড় খেলা খেলতে পারা আমার শোবার ঘর! অথচ রায়হান কেন জানি দুপুরে অনিচ্ছুক।

আর কাঁহাতক! সোফায় আধশোয়া ছিল, ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার ম্যাগাজিনের আড়ালে আমি দরজার পাশ থেকে বিষভর্তি বেলুন একটা নামিয়ে দিলাম সূঁচ ফুটিয়ে। পটপট পটকাবাজির মত একের পর এক বেলুন ফাটছে। ঘর ভর্তি নীল ধোঁয়া। রায়হানের বিস্ময়াকীর্ণ চোখ। মাথা নুয়ে কাৎ হয়ে গেল। নিচে সিকিউরিটি গার্ডকে এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে বলে সব জানলার পাল্লা খুলে দিই। এখন অপেক্ষা করবো, কাজেই আমার নিঃশ্বাস ভারী হওয়া চলবে না।

(গল্পটি ইতিপূর্বে ঈদসংখ্যা সাপ্তাহিক ২০০০-এ প্রকাশিত হয়। সাহিত্য ক্যাফের পাঠকদের জন্য এখানে আবার প্রকাশ করা হল।)

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *