কবি আজীজুল হকের জীবনে ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’ ছিল এক আলোর মশাল। সারাজীবন এই মশাল জ্বালিয়ে তিনি পথ চলেছেন। যতবার তাঁর সঙ্গে আড্ডায় বসেছি, দেখেছি, ঘুরেফিরে তিনি ৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলতেন। শুরু করতেন পশ্চিম পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর নিপীড়নের প্রসঙ্গ দিয়ে। তারপর স্মৃতিচারণ করতেন ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’ নাটক নিয়ে। নাটকটি মঞ্চস্থ করতে গিয়ে কত যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে, সেসবও বলতেন সবিস্তারে।
বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও পরীক্ষামূলক নাট্যরীতি সর্বদাই একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। সম্প্রতি কবি আজীজুল হকের জ্যেষ্ঠ পুত্রের নিকট থেকে প্রাপ্ত এবং কবির হস্তলিখিত ২১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ নাট্য-পাণ্ডুলিপি ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’ বাংলা নাট্যচর্চায় এক অনন্য ঐতিহাসিক সংযোজন। পাণ্ডুলিপির প্রচ্ছদ পৃষ্ঠায় নাট্যকার শুরুতেই একটি বিশেষ শর্ত নির্দেশ করে লিখেছেন: “ষোলোই ডিসেম্বর অথবা ২১শে ফেব্রুয়ারি ভিন্ন অন্য কোনো উপলক্ষে অভিনয় নয়।“ পাণ্ডুলিপিটি কেবল একটি সাধারণ মঞ্চনাটকের বিবরণ নয়; বরং এটি আলো, ছায়া, প্রজেকশন স্ক্রিন, কোরাস, গান, শব্দ-প্রয়োগ, ঐতিহাসিক স্লোগান এবং রাজনৈতিক রূপকের এক বহুমাত্রিক মেলবন্ধন। ১৭৫৭ সালের পলাশীর ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ১৯৪৮ ও ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং পরিশেষে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের রক্তিম অধ্যায়কে নাট্যকার ছায়ানাট্য ও দৃশ্য-প্রক্ষেপণের মাধ্যমে একটি অবিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক প্রতিরোধ-সূত্রে গাঁথতে চেয়েছেন।
অঙ্কবিন্যাস ও ঐতিহাসিক প্রবাহ
নাটকটির মূল কাঠামো তিনটি অঙ্কে বিস্তৃত, যেখানে প্রতিটি অঙ্কে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনা ও ছায়াদৃশ্যের কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে:
প্রথম অঙ্ক (ঔপনিবেশিক শোষণ ও প্রাথমিক প্রতিরোধ): মঞ্চে ক্লান্ত মিছিল এবং ঝিলিমিলি দুটি পথের দৃশ্যপটের সাথে নেপথ্যে “শোনো ভাইবোন…” গান দিয়ে ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয়। নাট্যকার আলো-ছায়ার কৌশলে জ্যোতিষ্কমণ্ডলী, পৃথিবী ও নর্তকীর ছায়া ফুটিয়ে তোলেন, যার পর রবীন্দ্রসঙ্গীত “মম চিত্তে নিতি নৃত্যে” বাজে। কিন্তু এই আনন্দঘন আবহের পরই প্রবেশ করে ভয়াল করোটির ছায়া, রাক্ষসের অট্টহাসি এবং প্রবীণ সাধুর ছায়া। পরবর্তীতে “জাগো অনশন বন্দী…” গান ও পর্দায় শৃঙ্খলিতদের স্থির চিত্র ফুটে ওঠার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক দমনের সূচনা ঘটে। সিরাজউদ্দৌলা, মীর জাফর ও মোহনলালের ছায়া-সংঘাত পলাশীর ট্র্যাজেডিকে রূপায়িত করে। এরপর দৃশ্যপটে আসে ১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহ, সিপাহীদের জিন্দাবাদ স্লোগান এবং ব্রিটিশ অফিসারের আক্রোশমূলক উক্তি— “Ha! Ha! Hands up! All mutineers crushed! All quick on all… And knock out a few black dogs barking. Hands up!” বন্দীদের ওপর নির্যাতনের মুখেও তারা জাতীয়তাবাদী হুংকার দেয় এবং কাজী নজরুলের “কারার ঐ লৌহ কপাট” গানের মধ্য দিয়ে ‘ব্রিটিশ শাসন ধ্বংস হোক’ স্লোগানে প্রথম অঙ্ক শেষ হয়।
দ্বিতীয় অঙ্ক (১৯৪৮–এর প্রতিক্রিয়া ও মধুর ক্যান্টিন/কমনরুমের বিতর্ক): সরাসরি ১৯৪৭-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে পর্দায় ভেসে ওঠে ১৯৪৮ সালে কার্জন হলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত। শাসকগোষ্ঠীর “Urdu… Pakistan” ঘোষণার জবাবে ছাত্র-জনতা তীব্র ক্ষোভে গর্জে ওঠে “NO! NO! NO!” বলে এবং মিছিল থেকে সোচ্চার দাবি ওঠে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!”। শাসক প্রতিনিধি ছাত্রদের বক্তব্যে বাধা দিয়ে “Stop… Nonsense” বলে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়ে আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল মধুর ক্যান্টিন ও ছাত্রী-বিশ্রাম কক্ষে (কমনরুম) গিয়ে থামে। মধুর ক্যান্টিনে একদিকে প্রগতিশীল ছাত্রদের স্বাধিকারচেতনা, অন্যদিকে পশ্চিমাভাবাপন্ন চাটুকারদের (ডেভী, পল্টু, সামসির) দাম্ভিকতার সংঘাত প্রকাশ পায়; আর উইমেনস কমনরুমে নাহার, ফিরোজা ও নীলা প্রগতিশীল ভাবনা ও আবৃত্তির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শাণিত করে।
তৃতীয় অঙ্ক (অমর একুশে ও ১৯৭১–এর রক্তিম স্বাধীন বাংলাদেশ): রাজপথে ঘন ঘন স্লোগান ধ্বনিত হয় এবং ১৪৪ ধারা ভাঙার আহ্বান জানানো হয়। নেতৃত্বের দ্বিধা কাটিয়ে ছাত্ররা আপসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সিদ্ধান্ত নেয় দশ জন করে মিছিল বের করার। প্রজেকশন স্ক্রিনে বিপরীত কাউন্টডাউন শুরু হয়: ১০–৯–৮–৭–৬–৫–৪–৩–২–১। দশ জনের টুকরো মিছিল রাজপথে নামলে পুলিশ তাদের ধারাবাহিকভাবে গ্রেপ্তার করতে থাকে। নেপথ্যে গুলির শব্দে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং আন্দোলনকারী ছাত্ররা রাজপথে লুটিয়ে পড়ে। আহত ছাত্রের (আরজু) শেষ আকুতি— “ওরা আমাদের মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিলো, এই বুক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে এই কথার স্রোত — কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো লাল লাল কথার স্তবক! মুখের কথা কি বন্ধ করা যায় বন্ধু! কোনো দি–ন–ও যা–য়–না।“ — আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এরপর ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় শহীদ মিনারে খোলা কাগজ থেকে ভাষা শহীদ বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারের নাম উচ্চারণ করে আবৃত্তি পরিবেশিত হয়। ২০ ও ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় ঘটনাপ্রবাহ ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে গড়ায়; যেখানে ‘সাবধান, সাবধান, বাংলার শত্রুরা সাবধান’ গান, বীর সেনানীদের কুচকাওয়াজ, ‘খুনী ইয়াহিয়ার হিংস্র মূর্তি’, কামানের গর্জন, মেশিনগান ও রাইফেলের শব্দ, মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ ও সেনানির আত্মত্যাগের পর জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়ে নাটকের মহাকাব্যিক সমাপ্তি ঘটে।
নাট্যতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণ
কবি আজীজুল হকের ২১ পৃষ্ঠার হস্তলিখিত ছায়ানাট্য ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’ বাংলা রাজনৈতিক নাট্যসাহিত্যে এক অসাধারণ ও বৈপ্লবিক সংযোজন। বার্টোল্ট ব্রেখটের মহাকাব্যিক নাট্যরীতি (Epic Theatre), ঐতিহ্যবাহী ছায়া-কৌশল এবং রাজনৈতিক অ্যাজিট-প্রপের মিলিয়ে রচিত এই নাট্যাংশের একটি নিবিড় সাহিত্যিক ও নাট্যতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পাঁচটি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে যা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শিরোনামের রূপক ও প্রতীকী অর্থ
বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির চেতনায় কৃষ্ণচূড়া ফুলটি সরাসরি ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির রাজপথে ঝরা শহীদদের রক্তের অনন্য প্রতীক। এখানে ‘তৃষ্ণা’ কোনো সাধারণ শারীরিক ক্ষুধা নয়; এটি হলো শৃঙ্খলমুক্তির আকুতি, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য এক চিরন্তন ও ঐতিহাসিক ব্যাকুলতা। এর ১৮ নম্বর পৃষ্ঠায় আহত ছাত্রের উচ্চারণে শিরোনামের এই তীব্রতা সংলাপের অন্তর্নিহিত অর্থ: সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে: “ওরা আমাদের মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিলো, এই বুক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে এই কথার স্রোত — কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো লাল লাল কথার স্তবক! মুখের কথা কি বন্ধ করা যায় বন্ধু! কোনো দি–ন–ও যা–য়–না।“
২. ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও কাঠামোগত বিন্যাস নাটকটি তিনটি অঙ্কের মাধ্যমে বাঙালির দ্বিশতবর্ষের পরাধীনতাবিরোধী সংগ্রামকে একটি অবিচ্ছিন্ন মহাকাব্যিক সূত্রে আবদ্ধ করেছে:
প্রথম অঙ্ক (পৃষ্ঠা ১–৭): বিশ্ব-প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মানব সভ্যতার উদাত্ত বন্দনা দিয়ে নাটকের সূচনা ঘটে। এরপরই প্রবেশ করে শোষক রূপী ‘করোটির ছায়া’ ও ‘অট্টহাসি’। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসকে ছায়ানাট্যের মাধ্যমে ব্যাকগ্রাউন্ডে তুলে ধরে দেখানো হয়েছে যে, ঔপনিবেশিক পরাধীনতা দীর্ঘদিনের শোষণের ইতিহাস।
দ্বিতীয় অঙ্ক (পৃষ্ঠা ৮–১৫): ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর ঔদ্ধত্য চিত্রায়িত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে কার্জন হলে জিন্নাহর ঘোষণার বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন ও উইমেনস কমন রুমে ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক উন্মোচিত হয়েছে।
তৃতীয় অঙ্ক (পৃষ্ঠা ১৭–২১): ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তস্নাত রাজপথ, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ, পুলিশের গুলি বর্ষণ, ছাত্রদের আত্মদান এবং পরিশেষে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিসেনাদের সংগ্রাম ও স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে নাটকটি তার চূড়ান্ত রাজনৈতিক শিখরে পৌঁছায়।
৩. চরিত্র–মানচিত্র, নাট্যরূপ ও নাট্যকারের বৈপ্লবিক মনস্তত্ত্ব কবি আজীজুল হক তাঁর ছায়ানাট্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বিমুখী মেরুকরণ ফুটিয়ে তুলতে চরিত্রগুলোকে পাঁচটি স্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও শ্রেণিসূত্রে বিন্যস্ত করেছেন:
ঐতিহাসিক ও রূপক প্রতীকী চরিত্র: নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মোহনলাল, মীর জাফর, মোহাম্মদী বেগ, ব্রিটিশ অফিসার, সিপাহী বিদ্রোহের সিপাহীবৃন্দ, করোটির ছায়া, শকুনের ছায়া ও জেনারেল ইয়াহিয়ার মূর্তি। নাট্যকার এদের অস্পষ্ট ভয়াল ছায়ায় (Shadow) ব্যাকগ্রাউন্ডে নামিয়েছেন, যাতে দর্শক শোষকশ্রেণিকে একটি দানবীয় ব্যবস্থা হিসেবে ঘৃণা করে।
ছাত্র–যুব গণসংগ্রামের অগ্রদূত (ভ্যানগার্ড): আরজু, কামাল, মুনীর, সিরাজ (১৯৫২-র ছাত্র), ইসরারুল (৩য় বক্তা), কিচলু, মুজবর ও আহত ছাত্র (শহীদ)। ১৭৫৭-র ট্র্যাজিক নায়ক নবাব ‘সিরাজ’-এর নামকে ১৯৫২-র ছাত্র চরিত্র ‘সিরাজ’-এর মধ্যে পুনর্জন্ম দেওয়ার পেছনে আত্মত্যাগের অবিনশ্বরতার বিশ্বাস কাজ করেছে।
প্রগতিশীল নারী আন্দোলনকারী চরিত্র: নাহার, ফিরোজা ও নীলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেনস কমন রুমের সংলাপে নারীদের কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে না রেখে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আনার পেছনে নাট্যকারের মনস্তত্ত্ব ছিল স্বাধিকার আন্দোলনে নারী-পুরুষের সমান অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা।
প্রান্তিক মেহনতি মানুষ ও সচেতন নাগরিক: মধুদা (মধুর ক্যান্টিনের মালিক) ও জালাল। মধুদার মুখে খাঁটি ঢাকাইয়া উপভাষার সংলাপ (“ইসপিসাল চা দিয়া ফালাইছস… আমাগো ডাউন কইরা ফালাইতাছে“) প্রমাণ করে ভাষা আন্দোলন কেবল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এলিট ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, সাধারণ মেহনতি মানুষের দাবির সাথেও তা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল।
পশ্চিমাভাবাপন্ন এলিট ও বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণি: ঘুনু (বিরোধী শ্রোতা), পল্টু, ডেভী, সামসির ও মিস পলি। এদের মুখে ইংরেজি দাম্ভিক উক্তি (“Rubbish, simply rubbish”, “Higher education is not for the poor”) তুলে দিয়ে নাট্যকার শাসকগোষ্ঠীর অনুগত সুবিধাভোগী শ্রেণির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বকে উপহাস (Satire) করেছেন।
৪. প্রয়োগবিদ্যা: আলো–ছায়া, শব্দশৈলী ও ব্রেশটীয় নাট্যরীতি
শোষক শক্তি অস্পষ্ট রূপক ছায়ায় ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রদর্শিত; আর আন্দোলনকারী তরুণ ছাত্ররা প্রসেসিয়াম মঞ্চে রক্তমাংসের বাস্তবে উপস্থিত। ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ১৪টি ভিন্ন খোপে অঙ্কিত চিত্র নির্দেশিকা (কঙ্কাল, মিছিল, শহীদ মিনার) নাটকের দৃশ্যগত আবহ বুঝতে এক অনন্য প্রামাণ্য গাইডলাইন। অডিও-সাউন্ডস্কেপ ও এলিয়েনেশন ইফেক্ট দেখা যায় বিপরীত কাউন্টডাউন (১০–৯–৮…১), বিউগলের করুণ সুর, সিপাহীদের ড্রামবাদ্য, মিলিটারির বুটের শব্দ, কামানের গর্জন, মার্চিং সং (‘সাবধান, সাবধান, বাংলার শত্রুরা সাবধান‘) এবং বিজয়ে বেজে ওঠা জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’-র সুরের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র সাউন্ডস্কেপ তৈরি করা হয়েছে।
৫. কুশীলব ও ঐতিহাসিক নেপথ্য স্মারক
পাণ্ডুলিপিটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে দেখা যায় যে, ছায়ানাটকটিতে কিছু নাম হলো যারা মূলত অভিনয়শিল্পী বা বর্ণনাকারী (Actor/Narrator), আর কিছু নাম হলো সরাসরি নাটকের চরিত্র (Character)। নাট্যকার ব্র্যাকেট বা স্ল্যাশ (/) ব্যবহার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন কোন শিল্পী কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন (যেমন: আরজু / আহত ছাত্র, ঘুনু: বিরোধী শ্রোতা, কিচলু: জনৈক ছাত্র)। এদের অনেকেই আজ বিস্মৃতপ্রায়। নাটকটির আবিষ্কার যেন সে নামগুলোকে সামনে নিয়ে এল, যাঁরা একসময় যশোরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ করতেন।
পাণ্ডুলিপিটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মঞ্চের আলো, শব্দ, গান, স্লোগান এবং ঐতিহাসিক দৃশ্যায়নের সমন্বয়ে এক অসাধারণ অডিও-ভিজ্যুয়াল অখণ্ডতা তৈরি করা হয়েছে। ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় নাট্যকার যেভাবে আলো প্রক্ষেপণের প্রযুক্তিগত ডায়াগ্রাম এঁকেছেন, তা প্রমাণ করে যে তৎকালীন প্রতিকূল রাজনৈতিক আবহাওয়াতেও থিয়েটারকে কতটা কারিগরি ও তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। ১৮ নম্বর পৃষ্ঠায় আন্দোলনরত ছাত্রের শেষ আকুতি— “না–না, মুখের ভাষাকে বন্ধ করা যায় না!” — এবং ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তস্নাত পথ ধরে ১৯৭১-এর স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের চূড়ান্ত রূপায়ণ (পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত) আজও প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে স্বাধিকার রক্ষার অমলিন আলো জ্বালিয়ে রাখে।
আবদুর রব

কবি, অনুবাদক, অনলাইন ম্যাগাজিন সম্পাদক ও অর্থনীতিবিদ। জন্ম ৩০ জুন ১৯৬১ সালে। পৈত্রিক নিবাস যশোর। বর্তমান বসবাস ঢাকায়। একটি আন্তর্জাতিক কন্সাল্ট্যান্সি ফার্মে কর্মরত। ৩৫টি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
শৈশব থেকে লেখালেখির শুরু। এ পর্যন্ত দশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয় যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পূর্ণ প্রাণ যাবো’। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ: কে ঘুমায় কে জাগে (১৯৯৪); রূপান্তরের গান (২০০৩); আপেলসূত্র (২০১৪), বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় (২০২০), নুড়ি পাথরের ছায়া (২০২৩) ও নির্বাচিত কবিতা (২০২৪)। এছাড়া ছোটদের জন্য চীনা গল্পের তিনটি অনুবাদ গ্রন্থও আছে। এগুলো প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। বিদ্যাপ্রকাশ থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় অনুবাদ কবিতার বই ‘বৃষ্টির ভেতর এক গলিপথ’। বেশকিছু ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন তিনি।
