আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড
মূলঃ কলসন হোয়াইটহেড
বাংলা ভাষান্তরঃ আমিরুল আলম খান

[আমেরিকায় আফ্রিকান দাস ব্যবসা, বর্ণবাদ, দাসদের ওপর সাদা প্রভূদের অকল্পনীয় নির্যাতনের মর্মন্তুদ কাহিনী এবং তা থেকে মুক্তির আশায় কালো মানুষদের অতি গোপনে পালিয়ে যাবার শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড। ]

[আর্চ] কুলসন [চিপ] হোয়াইটহেড (১৯৬৯-)-এর এই আফ্রিকান-আমেরিকান এই উপন্যাস ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়েই বেস্ট সেলার হয়। সে বছরই লাভ করে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড, পরের বছরই পুলিৎজার পুরস্কার। বারাক ওবামার ভাষায় এর কাহিনী “ভয়ঙ্কর”।

 


আজারি

উত্তরে পালিয়ে যেতে সিজারের প্রথম প্রস্তাবে কোরা সোজা সাপটা ‘না’ বলে দেয়।
তার নানীর কাহিনি দিয়ে শুরু। দূর্গের বস্তিতে থাকা কোরার নানী ওইদা বন্দরে রোদঝলমলে এক বিকেলে প্রথম সাগর দেখে। বন্দরে জাহাজ ভেড়ার আগ পর্যন্ত এই বস্তিতে তাদের লুকিয়ে রাখা হয়। দহোমিয়ান ঘোড়সওয়াররা এই লোকগুলোকে জোর করে ধরে আনে। পরের চান্দ্র পক্ষে মেয়ে আর বাচ্চাদের দু’জন দু’জন করে গলায় শেকলে বেঁধে হাটিয়ে নিয়ে তার গ্রামে আসে। কালো দরজা গলিয়ে বাড়ির ভেতর ঢোকার সময় আজারি ভেবেছিল, এখানে হয়ত বাবার সাথে তার দেখা হবে। ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার ঘরে তাদের ঢুকানো হল। যারা বেঁচেছিল, তাদের মুখে সে শুনল তার বাবার খবর। গলায় শেকল পরানো বুড়ো বাবা অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারছিল না। তখন দাস ব্যবসায়ীরা তার মাথায় বারুদ জ¦ালিয়ে তাকে খুন করে। লাশটা ফেলে দেয় পাশের নর্দমায়। ক’বছর আগে তার মাও মারা গেছে।

দূর্গে যাবার এই পাহাড়ি পথে মাত্র ক’টা কড়ি আর কাঁচের পুতির বিনিময়ে কোরার নানীকে কয়েকবার হাত বদল করে দাস ব্যবসায়ীরা। ওইদা বন্দরে দল ধরে কেনা হয়েছিল তাদের। তাই কোরার নানীর দাম ঠিক কত তা জানা কঠিন। দলে ছিল ৮৮ জন। ৬০ ক্রেইট রাম (মদ) আর কিছু বারুদ দিয়ে তাদের কেনা হয়। ইংলিশ কোস্টের নিলামঘরে এই দামে কেনা হয়েছিল তাদের। শক্ত সামর্থ্য পুরুষ আর বাচ্চা পয়দা করতে পারে এমন সোমত্ত মেয়েদের দাম বাচ্চা আর বুড়োদের চেয়ে বেশি। তাই কার দাম কত তা বের করা কঠিন।

লিভারপুল থেকে ছেড়ে আসা ন্যানি জাহাজখানা গোল্ড কোস্ট বরাবর নানা বন্দরে ভিড়ে শেষে এখানে এসেছে। এবারের দাস কেনাবেচায় ক্যাপ্টেন মোটেই খুশি নয়। যাদের সে কিনেছে তারা সবাই দেখতে অনেকটা একই রকম। তেমনি তাদের আচার-ব্যবহারও। কে জানে, কী ঘটতে পারত যদি তারা সাগরে বিদ্রোহ করত! তাদের তো ভাষাও এক! আটলান্টিক পাড়ি দেবার আগে এটাই ছিল তার শেষ বন্দর যেখানে সে জাহাজ ভিড়িয়েছে। আজারিকে হলুদ চুলের দু’জন জাহাজ থেকে নামিয়ে নিয়ে এলো। তাদের গায়ের রং হাড়-সাদা।

জাহাজের দম বন্ধ করা কুঠুরিতে গাদাগাদি করে রাখা মানুষগুলোর চিৎকার-চেঁচামেচিতে আজারির পাগল হবার দশা। তখনও তার বয়স কম। মানুষ-ধরা লোকগুলো তাকে বলাৎকারের চেষ্টা করে নি। কিন্তু এসব কাজে যারা পাক্কা খোলোয়াড় তারা তাকে জোর করে এনে জাহাজের ভিতর দিয়ে চলাচলের পথে ছ’ হপ্তাহ আটকে রাখে। আমেরিকা পাড়ি দেবার পথে দু’বার সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। একবার না খেয়ে, আরেকবার জাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে ডুবে। কিন্তু দু’বারই তার চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় বদমাশগুলো। এসব সামাল দেবার দস্তুর তাদের ভালই জানা। সে খুব শান্তশিষ্ট। পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে এমন কোন মনোভাব কখনও দেখায় নি। কিন্তু নাবিকগুলো এসব ভান ভালই বোঝে। তার বোকা-বোকা স্বভাব আর ‘ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না’ আচরণ তাদের সতর্ক রেখেছিল। হাজার হাজার দাস জাহাজে ভরে সাগর পাড়ি দিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে তাদের। তারা জানে এই ভিজে বিড়ালগুলো কীভাবে অনর্থ ঘটায়। আজারির আত্মহত্যার ইচ্ছা তারা ব্যর্থ করে দেয় কড়া নজরদারিতে। তাদের সবাইকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত একজনের সাথে আরেকজনকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা। এভাবে শেকল বাঁধা মানুষগুলো অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় শুধু কাতরিয়ে মরে।

ওইদা বন্দরে নিলাম পর্যন্ত একসাথে থাকার চেষ্টা ছিল সবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয় নি। বারমুডার মাইল দশেক দূরে ভিভিলিয়া নামের এক ফ্রিগেটে এসে একদল পর্তুগিজ দাস ব্যবসায়ী তাদের পরিবারের অন্যদের কিনে নেয়। বাকিরা প্লেগে মরেছে। কোন উপায় না দেখে কর্তৃপক্ষ জাহাজটায় আগুন ধরিয়ে দেয়। নাবিকরা জাহাজের পুড়ে এবং ডুবে যাওয়া শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। কোরার নানী অবশ্য জাহাজের এসব পরিণতির কথা কিছুই জানে না। সে শুধু জানে, তার জ্ঞাতি ভাইয়েরা উত্তরে কোথাও কোন সজ্জন মনিবের বাড়িতে দাস হয়ে বেঁচে আছে। হয়ত তার চেয়ে ভাল আছে তারা। হয়ত তাদের দিন কাটে সুতো কেটে আর তাঁত বুনে। মাঠের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হয় না তাদের। একবার কান খাড়া করে দু’জন সাদা লোকের কথাবার্তায় সে শুনেছিল, ইসাই আর সিধু মুক্তিপণ দিয়ে নিজেদের মুক্ত করে এখন পেনসিলভেনিয়া শহরে বেশ সুখেই আছে। তারা সেখানে মুক্ত মানুষ হিসেবে বসবাস করে। যখন তার দুঃখের কোন সীমাপরিসীমা থাকে না, তখন আজারি সুখস্বপ্ন দেখে যে, সেও একদিন মুক্তি পাবে। স্বাধীন মানুষ হিসেবে বাস করবে।

স্যুলিভান দ্বীপে থাকা অবস্থায় অন্যদের সাথে তার সাথে অন্যদের এবং ন্যানি জাহাজে মজুদ পণ্য জীবাণুমুক্ত বলে ডাক্তারের সনদ পাবার পর কোরার মাকে আবার বিক্রি করে দাস ব্যবসায়ীরা। এখানে এক পেস্ট হাউজে তাকে রাখা হয় প্রায় এক মাস। নিলাম দপ্তরে আরও একটি ব্যস্ত দিন কাটে তাদের। জমজমাট বড় নিলাম। চারদিকে লোকে লোকারণ্য। চার্লস্টোন শহরে সেদিন উত্তর দক্ষিণ থেকে আসা দালাল আর ফঁড়েদের ভিড়। জাহাজে করে আনা কালো মানুষগুলোকে তারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। চোখ, সন্ধিস্থান, মেরুদÐ সব। দেখছে কোন যৌন রোগের লক্ষণ আছে কিনা। পুড়ানো গরম ভুট্টো চিবুতে চিবুতে এসব দেখছে কিছু উৎসাহী দর্শক। একটা বড় পাটাতনে ন্যাংটা লোকগুলোকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নিলাম চলছে। ক্রেতাদের হাঁকডাকে কান ঝাঁলাফালা অবস্থা। আফ্রিকা থেকে আনা হয়েছে আশান্তি গোত্রের কিছু লোককে। তারা যেমন তাগড়া জোয়ান, তেমনি পরিশ্রমী। বাজারে তাদের চাহিদা বেশি। তাদের নিলামের সময় দরদামের লড়াই রীতিমত জমে উঠল। এক চুন কারখানার ফোরম্যান অনেক দর কাষাকষি করে তাদের কিনে নিল। বেঢপ কিছু লোকের মধ্যে কোরার নানী দেখল একটা ছেলে রক ক্যান্ডি চিবুচ্ছে। কিন্তু সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না ছেলেটার মুখে ওটা কী?
সন্ধ্যার ঠিক আগে এক ফঁড়ে তাকে ২২৬ ডলারে কিনল। তার দাম হয়ত আরেকটু বেশি হত। কিন্তু সেবার অনেক ছুকড়ি মেয়েকে আনা হয়েছে নিলামে বিক্রির জন্য। তাই দাম কম। যে তাকে কিনেছে তার গায়ে ধবধবে সাদা পোশাক। এত সাদা পোশাক সে আগে কখনও দেখে নি। হাতের আঙুলে অনেকগুলো পাথর বসানো আংটি। আলোয় ঝিকমিক করছে সেগুলো। লোকটা কাছে এসে তার স্তন দুটো টিপে দেখল সে দুটো কতটা পুরুষ্ট। এমন পরীক্ষার মুখে তাকে আগেও অনেকবার পড়তে হয়েছে। গা হিম হয়ে আসে। রাতে তাদের নিয়ে দক্ষিণে যাত্রা শুরু হল। পিছন পিছন চলল ফঁড়ের গাড়ি।

গত কয় বছরে কোরার নানী বহুবার বিক্রি হয়েছে; এত বেশি বার যে, মনে হবে সে একটা অপয়া। যে তাকে কিনেছে সে-ই লোকসান গুনেছে। প্রথম যে লোকটা তাকে কিনেছিল সে এক ধাপ্পাবাজের পাল্লায় পড়ে। তুলো ধুনার একটা ধুনচি সে কিনেছিল। সেটা নাকি হুইটনি জিনের মত দ্রুত তুলো ধুনতে পারে। নকসা ছিল ঠিক সে রকমই। কিন্তু কাজের বেলা ঠন্ঠন্। লোকটা দেউলিয়া হয়ে যায় এবং ম্যাজিস্ট্রেট তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করলে অন্যান্য মালপত্রের সাথে তখন তাকেও নিলামে বিক্রি করা হয় ২১৮ ডলারে। তখন পড়তি বাজার। চটজলদি বেচে এর বেশি আশাও করা যায় না। তার নতুন মালিক মৃগী রোগে মারা যায়। তার বিধবা পত্নী বিষয়-আশয় বেচে ইউরোপে নিজের দেশে পাড়ি জমায়। এরপর মাস তিনেক আজারি ছিল এক ওয়েলসবাসীর সম্পত্তি হয়ে। কিন্তু জুয়ায় হেরে আর তিনজন দাসের সাথে আজারিকেও হারায় এই জুয়াড়ি। আজারির কপালটাই এমন!

আজারির দাম নিয়ত ওঠানামা করে। একটা দাস এত বেশি বার বিক্রি হলে ক্রেতারা তার ব্যাপারে খুব হুঁশিয়ার হয়ে, খোঁজখবর নিয়ে তবে কেনে। তবে বারবার এমন বিক্রি হতে হতে আজারি কিছু অন্য দক্ষতা অর্জন করেছে। যে কোন নতুন খামারে এসে সে খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। খামারে যেসব নিগার খাটে তাদের সম্পর্কে খবরাখবর খুব তাড়াতাড়ি সে জেনে ফেলে। মালিকদের মধ্যে কে বদমাশ প্রকৃতির, কে যেকোন কৌশলে বদ মতলব হাসিলে ওস্তাদ, কার আবার আকাশ ছোঁয়া উচ্চাশা তা সহজেই বুঝে ফেলে সে। সে বুঝেছে, কিছু মালিক আছে তারা বেশ শান্তিতে থাকতে চায়। হুড়হাঙ্গামা তাদের পছন্দ নয়। অল্প কিছু সহায় সম্পত্তিতেই তারা খুশি। দু’শ’ আটচল্লিশ, দু’ শ’ ষাট, দু’ শ’ সত্তর ডলার। যেখানেই সে গেছে, সেখানেই তাকে নীলচাষ বা আখের খামারে কঠিন পরিশ্রমের কাজ করতে হয়েছে। মাঝে একবার মাত্র সপ্তাহ খানেক এক তামাকের গুদামে তাকে তামাকের পাতা ভাঁজ করে সাজিয়ে রাখতে হত। আবার সে বিক্রি হয়ে যায়। ক্রেতা লোকটা এই তামাক ব্যাপারির কাছে এসে খোঁজ খবর নিচ্ছিল দেখতে সুশ্রী আর বাচ্চা পয়দা করার সামর্থ্য আছে এমন মেয়ে তার দরকার। আজারি এখন তেমন সোমত্ত মেয়ে। কাজেই সে বিক্রি হয়ে গেল।

ততদিনে আজারি বুঝে গেছে, মালিকের বিজ্ঞানীরা সব মালই খতিয়ে দেখে। আকাশের তারা থেকে মানুষের দেহের কোন অংগের কী দাম, সব। তার কালো দেহের দামও আজারি বুঝে ফেলেছে। সে জেনেছে, সব জিনিসই দামে বিকোয়; কিন্তু অবস্থাভেদে দামের হেরফের ঘটে। পানি রাখার ফুটো লাউয়ের খোলের কোন দাম নেই। আবার বড়শি থেকে ফসকে যাওয়া মাছ যত বড়ই হোক তাতে কারো লাভ নেই। আমেরিকায় মানুষ মানেই মাল। দরিয়ার ধকল সইতে পারবে না এমন বুড়োদের খরচা খাতায় দেওয়াই ভাল। শক্ত সামর্থ্য গোষ্ঠীর জোয়ান মরদদের ধরে আনো, বেশি বেশি মুনাফা পাবে। আর সোমত্ত মেয়ে মানুষগুলো যেন টাকার গাছ। এখানে টাকা ঢালো, টাকা পয়দা হবে। নিজেকে তুমি একটা এমন মাল ভাব। যেমন, একটা গাড়ি, কি ঘোড়া কিংবা একটা দাসী। তুমি যেমন মাল, তেমন তোমার দাম। এভাবে সে নিজে কী তা বুঝার চেষ্টা করে।
অবশেষে জর্জিয়া। র্যান্ডেল প্লান্টেশনের এক ফড়ে তাকে কিনে নিল দু’ শ’ বিরানব্বই ডলারে। বাকি জীবনে সে আর এই র্যান্ডেল দ্বীপের বাইরে যেতে পারে নি।

কোরার নানী তিনবার বিয়ে করেছিল। বৃদ্ধ র্যান্ডেলের মত চওড়া কাঁধ আর লম্বা হাতওয়ালা একজনের প্রতি তার পূর্বরাগ ছিল। কিন্তু মালিক আর এই দাসের মতলব ছিল সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা। অনেক শক্তসামর্থ্য নিগ্রো এখানে কাজ করে। উত্তরের অংশে নব্বই জন আর দক্ষিণের অংশে পঁচাশি জন দাস খাটে। অসুস্থ না হলে প্রায় সারা বছরই সে তুলো তোলার কাজ করে।

তার প্রথম স্বামী ছিল মদখোর। ধেনো মদ খেয়ে মাতাল হয়ে থাকত। ফ্লোরিডার এক আখ খেতের মালিকের কাছে তাকে বিক্রি করে দেয় র্যান্ডেল প্লান্টেশন। তার বিদায়ে আজারির এতটুকু কষ্ট হয় নি। এরপর দক্ষিণ অংশের এক সুদর্শন কালো ছোকরাকে সে বিয়ে করে। কলেরায় সেও মারা যায়। সে পবিত্র বাইবেল থেকে বেশ কিছু কাহিনী শোনাত। তার আগের মালিক ছিলেন বেশ উদারমনা মানুষ। তিনি দাসদের ধর্ম পালনে কোন দোষ দেখতেন না। বাইবেলের সে সব গল্প শুনতে ভালই লাগত আজারির। মন দিয়ে শুনতও। শুনতে শুনতে ভাবত, আফ্রিকানদের সম্পর্কে সাদাদের ধারণা বোধহয় মিথ্যে নয়। অভিশপ্ত হামের হতভাগা সন্তান এরা। কিছু একটা চুরির অভিযোগে তার শেষ স্বামীর কান ফুটো করে দেয়া হয়। সেখানে পূঁজ জমে জমে অবশেষে সে মারা যায়।

তিন স্বামীর ঔরসে তার পাঁচ সন্তান। একই ঘরে তারা জন্মায়। ছোট্ট কুঠুরির একটা তক্তার ওপর। জায়গাটা দেখিয়ে সন্তানদের সে বলত, “ইকেনেই জন্মিচিস, দেখলি, ইকেনে। কথা না শুনলি আমি তোগের ইকেনেই আবার ফ্যালাই দোবো, বুজলি!” সুবোধ সন্তান হিসেবেই সে তাদের মানুষ করে এবং শেখায় কীভাবে মালিকের হুকুম তামিল করতে হয়, তামিল করে টিকে থাকতে হয়, তাও। জ¦রে দু’জনের করুণ মৃত্যু হয়। পায়ে একটা জংধরা লাঙলের ফলা ঢুকে জায়গাটা বিষিয়ে একটা সন্তান মারা যায়। কিছুদিন পর একেবারে ছোটটা মাথায় একটা কাঠের টুকরোর আঘাতে তখখুনি মরে। এক কর্তা তার মাথায় একখÐ কাঠের টুকরো দিয়ে ছুড়ে মেরেছেল। কেন মেরেছিল কেউ জানে না। কোন বিচার চাওয়ার জায়গা নেই। বাচ্চা দুটো ঘটে প্রায় পরপরই। এক বৃদ্ধা তাকে সান্ত¡না দিয়ে বলেছিল, “তোর কপাল ভাল রে ছুড়ি, কপাল ভাল। দুটো বাচ্চাই তোর চোকির সামনে মরেচে। মরার পর তাদের মরা মুক দেকতি পাইচো। বিককির হয়ে যায় নি রে! হাইরেও যায় নি!” সত্যিই, র্যান্ডেলে সাধারণত ছোট বাচ্চাদের বেচে দেয়া হয় না। “তুই ত এটুকুন জানতি পারচি তোর পরানের ধন কুতায় ঘুমোয় আচে, কীভাবে মরেচে।” অন্য সন্তানদেরও কেউ দশ বছরের বেশি বাঁচে নি। একমাত্র যে মেয়েটা বেঁচে ছিল সে মেবেল, কোরার মা।

তুলোর খামারেই আজারির মৃত্যু হয়। নিষ্ঠুর সমুদ্রের ঊর্মিমালার মত তার মাথা ঘিরে শোভা পাচ্ছিল আঁশ ওঠা তুলোর সাদা টুপি। গ্রামের শেষ প্রান্তে তার লাশ ঝুঁলছে। নাক বেয়ে রক্ত এসে ভিজিয়ে দিয়েছে ঠোঁট দুটো। স্বাধীনতা! সে তো অন্যদের খাস তালুক। হাজার মাইল উত্তরে আলো ঝলমল পেনসিলভেনিয়া শহরে যারা বাস করে তাদের জন্য স্বাধীনতা। রাতে তাকে তুলে নেবার পর গত কয়েকদিনে বারবার তার দরদাম ঠিক করছিল শয়তানগুলো। বারবার তাকে তোলা হয় ওজনের পাল্লায়। ‘দেখ, দেখ, তোর দাম কত? খামার থেকে পালানো মানে কানুন না মানা। সেটা কেউ করতে পারে না। যে পালাতে চেষ্টা করে তার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই! তুই পালাতে চাইছিলি, দেখ তার পরিণতি!’

সেদিন রোববার। নানীর এ কাহিনী কোরা সেদিন প্রথম শোনে। আর সেদিনই সিজার কোরাকে চোরাই রেলপথে পালিয়ে যাবার কথা বলে। কোরা রাজি হয় নি।
তিন সপ্তাহ পর সে রাজি হয়। (চলবে)

 

 

আমিরুল আলম খান 

জন্ম যশোর জেলার ভারতীয় সীমান্তলগ্ন শিববাস গ্রামে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ১৫ই অগ্রহায়ণ।
পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে যুক্ত থেকেছেন। যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পরে চেয়ারম্যান ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি অপেশাদার সাংবাদিকতায় যুক্ত গত পাঁচ দশক ধরে। ইংরেজি দৈনিকে নিউ নেশান-এ প্রায় এক দশক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, বণিক বার্তায় কলাম লেখেন।

গ্রামীণ পাঠাগার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে গ্রামোন্নয়নের নতুন মডেল ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম গণপাঠাগার যশোর পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষা, ভাষা, প্রকৃতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থানবিদ্যায় আগ্রহী। এসব নিয়েই তার বই: বাঙলার ফল, অরণ্যের পদাবলী, পারুলের সন্ধানে, কপোতাক্ষ-মধুমতীর তীর থেকে, বিপর্যস্ত ভৈরব অববাহিকা, পারুল বিতর্ক, বাংলাদেশের শিক্ষার স্বরূপ সন্ধান এবং বিদ্যাবাণিজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি।

তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: আফ্রিকান-আমেরিকান উপন্যাস দি স্লেভ গার্ল। হ্যারিয়েট অ্যান জেকব রচিত এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি বোস্টন থেকে প্রকাশিত হয় ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব এ স্লেভ গার্ল শিরোনামে, ১৮৬১ সালে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।