আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

সাউথ ক্যারোলাইনা

রাতে ভাল ঘুম হয়নি কোরার। আশিটা বাঙ্কে মেয়েরা ভাগাভাগি করে ঘুমায়। এই বিশ্বাস নিয়ে তারা প্রথম রাতে ঘুমাতে গিয়েছিল যে তারা সাদাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত আর তাদের কী করতে, কী হতে হবে সেসব হুকুমও তামিল করতে হবে না। তাদের বিশ্বাস ছিল, তারাই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। কিন্তু এখানেও তাদেরকে ইচ্ছেমত জড়ো করে অন্যের হুকুমবরদার বানানো হচ্ছে। আগে গরু-ঘোড়া নিয়ে স্রেফ ব্যবসা হত, আর এখন তাদের গৃহপালিত পশুর মতো ইচ্ছেমত প্রজনন ও পালন করা হচ্ছে। অনেককে খোজা বানানো হচ্ছে। পুলিশ বা সৈনিকদের মতই তাদের সব খবরই তারা সিন্দুকে পুরে রাখছে।
সকালে অন্য মেয়েদের নিয়ে কোরা নির্ধারিত কাজে গেল। তারা যখন পোশাক পরছিল তখন আইসিস জানতে চাইল, কোরা তার সাথে থাকতে রাজি কি-না। তার খুব খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল চরকার চাকায় মাথা রেখে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারলে ভাল হত। “আমি যদি সামান্য একটু ছাড়া পেতাম। পা লেগে যাচ্ছে। মোটেই দাঁড়াতে পারছি নে।”
এভাবে ছ’হপ্তাহ জাদুঘরে কাজের পর কোরার যেখানে ডিউটি পড়ল সেটা তার বেশ পছন্দ হল। এটা তার ব্যক্তিত্বের সাথে বেশ মানানসই। প্লান্টেশনে যখন দৈনন্দিন কাজ করত তখন সে তার দু’ শিফটের কাজ দুপুরে খাবার পরপরই শেষ করে ফেলত। কিন্তু এই জাদুঘরে আফ্রিকানদের জীবনাচার দেখানোর কাজ সে আদৌ পছন্দ করে না; বরং ঘৃণাই করে। ঘন অন্ধকারে ঢাকা আফ্রিকা থেকে কালোদের ধরে ধরে জাহাজে করে আমেরিকায় প্লান্টেশনে এনে কাজ করানোর এসব দৃশ্য যেন সব ছকে বাঁধা, দেখানোও হচ্ছে দস্তুর মেনে। সব কিছুই সময় মেপে, সব কিছুই যেন স্বাভাবিক! ঘোর কৃষ্ণ আফ্রিকা থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এই শান্ত নদীর ধারে একটা আশ্রয় খুব দরকার। কোরা আইসিসের সাথে থাকতে রাজি হল। তাহলে এ দাসত্ব থেকে অন্তত মুক্তি মিলবে।

মাঠে কাজ করতে হত ওভারসিয়রের কড়া নজরদারির মধ্যে। “মাজা বাঁকিয়ে কাজ কর, এখানে এই সারিতে এটা কর” ওভারসিয়রের এসব হুকুম তামিল করতে করতে জীবন খতম। এন্ডারসনের ওখানে যখন মেজি স্কুলে থাকত, বা তার বন্ধুদের সাথে রেইমন্ড খেলা করত তখন কোরা বেশ নির্ভয়ে কাটাত। কেউ তাকে নজরেও রাখত না, বা তাকেও কোন রকম ভয়ে ভয়ে থাকতে হত না। দিনের মাঝে এটা সত্যিই খুব ভাল সময় কাটত তার। কিন্তু জাদুঘরে যেসব কাজ তাকে করতে হয় তাতে জর্জিয়ার সেই কষ্টের দিনগুলোর কথাই মনে পড়ে কোরার।

একদিন খুব রাগ হয়েছিল কোরার। একটা লাল কেশী শে^তাঙ্গিনী এমন ভাবে মুখ ভেংচে তার দিকে তাকিয়েছিল যে মনে হচ্ছিল এখনি এর একটা বিহিত করে ফেলে। কোরা সেদিন সমুদ্রে জাহাজের ওখানে ডিউটি করছিল। হয়ত সে মহিলার এমন কোন নাবিকের সাথে বিয়ে হয়েছিল যার ইন্দ্রিয় ক্ষুধা ছিল অপরিসীম। সমুদ্রযাত্রায় তার বাজে অভিজ্ঞতা সে আজও ভুলতে পারে না। তার এই পশুসুলভ আচরণ কোরা ঠিক বুঝে উঠতে পারে নি। কোরার দিকে মহিলা হিংস্র চোখে তাকিয়েছিলেন। কোরাও তার চোখে চোখ রেখে জবাব দিয়েছিল যতক্ষণ না তিনি ওই গ্যালারি থেকে এগ্রিকালচার গ্যালারির দিকে চলে যান।
কোরার পরের পালা যখন এলো তখন একদিন ছিল স্কুল ট্রিপ। যারা এসেছিল জাদুঘরে তাদের মধ্যে কোরা একটা পিগটেইল করে চুলবাঁধা মেয়েকে দেখে মেইজিকে চিনল। কিন্তু মেইজি তাকে খেয়াল করেনি। কোরা মেইজির দিকে রুক্ষ্ম চোখে তাকালো। মেইজি কিছুতেই এর মানে খুঁজে পেল না। নিজের আচরণে কোরার নিজের কাছেই ছোট মনে হল। সে দ্রুত পোশাক পালটে ডরমিটরিতে চলে গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় কোরা মিস লুসির সাথে দেখা করল। শ্যামের কাছ থেকে পাওয়া খবর নিয়ে সারাদিন কোরার নাম ছড়িয়ে পড়েছে সব জায়গায়। প্রোক্টর কোরাকে নানা সময় নানাভাবে সাহায্য করেছেন। এ সময় তার পরামর্শ খুব জরুরি।

প্রোক্টরের অফিসে যখন কোরা ঢুকলো তখন তিনি নীল কাগজগুলো সাজাতে ব্যস্ত। তার নাম কি এসব কাগজের কোনটায় লেখা আছে? কিংবা কী লেখা আছে তার সম্পর্কে? না, তিনি কোরার কার্ড সংশোধন করছেন না, এ কার্ডটা বেসির।
“আমার হাতে খুব কম সময় আছে,” প্রোক্টর তাকে বললেন।
“দেখলাম সবাই ৪০ নম্বরে যাচ্চে। কিন্তু সিকেনে তো কেউ থাকত না। তারা কি এখনও হাসপাতালে চিকিচ্চা নিচ্চে?” কোরা জিজ্ঞেস করে।

কার্ডগুলো গুছাতে গুছাতে প্রোক্টর বললেন, “তাদের অন্য শহরে নেয়া হচ্ছে। অনেক নতুন লোক এসেছে। তাদের থাকার জন্য অনেক রুম লাগবে। তাই গার্ট্রুডের মত যারা আছে, যাদের আরও ভাল চিকিৎসা দরকার তাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেখানে তারা উন্নত চিকিৎসা পাবে।”
“তারা কেউ ফিরে আসবে না?” কোরা জিজ্ঞেস করে।
“না, কেউ ফিরবে না। মিস লুসি কোরাকে বললেন। আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছ। তুমি তো খুব স্মার্ট মেয়ে। আশা করি তুমি অন্য মেয়েদের নেতৃত্ব দেবে। যদিও যে অপারেশন তোমাকে করা হবে তুমি সেটা চাও না। কিন্তু এটা তোমার জন্য খুব জরুরি। এটা করালে তুমি তোমার জাতির জন্য অনেক বড় অবদান রাখবে, এটা মনে রেখ।”
“আমার বিষয়ে তো আমি সিদ্দান্ত নেব, না কি? আমি যদি আমার সিদ্দান্ত নিতি পারি তাহলে ওরা পারবে না কেন? খামারে দেকতাম, আমাগের সব ব্যাপারে সিদ্দান্ত নেত মালিক সাহেব। আমাগের কতা কেউ শুনত না। ইকেনেও দেকচি একই ব্যাপার।
“তুমি যদি সুস্থ আর মানসিক অসুস্থ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করতে না পার, সেটা নিতান্ত দুঃখজনক। তাহলে, এতদিন আমি তোমাকে যে রকম জেনেছি আসলে তুমি ঠিক সে রকম নও।”
আমি ঠিক সে রকম মেয়ে নই যা আপনি ভেবেচেন।

এ সময় রোবার্টা নামে এক মহিলা তাদের কথার মধ্যে কথা বলে উঠলেন। এই মহিলা প্লেসমেন্ট অফিসের কাজে সমন্বয় করেন। তিনিই কয়েক মাস আগে কোরাকে এ্যান্ডারসন পরিবারে পাঠিয়েছিলেন। “লুসি, তারা তোমার জন্য অপেক্ষার করছে।”
মিস লুসি বিরক্ত হলেন। একটু অসহিষ্ণু কণ্ঠে সহকর্মীকে বললেন, “আমি তাদের ভালোর জন্য যা যা করার সব করেছি। কিন্তু গ্রিফিন অফিসে রেকর্ডেও সে কথাই আছে। ফিউজিটিভ স্লেভ ল’ অনুযায়ী যারা পালিয়ে এসেছে তাদেরকে ওখানে পাঠিয়ে দেয়ার কথা। তাদের কাজে বাঁধা দিতে পারি না। কিছু দাস পাকড়াওকারীর জন্য আমরা তাদের বিপদে ফেলতে পারি না। কিন্তু আমরা খুনিদের রক্ষা করার জন্যও নই। এক রাশ কাগজ বুকের কাছে নিয়ে তিনি উঠলেন। “বেসি, এসব নিয়ে আমরা কাল ভাবব। আমরা যা বললাম, সে সব নিয়ে ভেবে দেখ।”

কোরা বাঙ্ক হাউসে ফিরে এলো। সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে বসে পড়ল। তারা হয়ত কাউকে কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ডরমিটরি নতুন পালিয়ে আসা মেয়েতে ভরে গেছে। বছরের পর বছর ধরে কত চেষ্টা করেই না তারা পালিয়ে এখানে এসেছে। তারা যে কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

তারা খুনিদের খুঁজছে।

কোরা পয়লা সিজারের ডরমিটরিতে গেল। কোরা সিজারের সিডিউল জানত। কিন্তু এখন এত চঞ্চল মনে সে ঠিক তার শিফটের কথা মনে করতে পারল না। বাইরে সে কোন শে^তাঙ্গকে দেখতে পেল না। বা এমন কাউকে দেখল না যাকে মনে হতে পারে একজন পলাতক পাকড়াওকারী। সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে সে দৌঁড়ে চলে গেল। ডরমিটরিতে কাজ করেন যে বুড়ো লোকটা তিনি জানালেন, সিজার এখনো ফ্যাক্টরিতে। “সিজার না ফেরা পর্যন্ত তুমি কি আমার এখানে অপেক্ষা করবে?”

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। নিজের মনে সে ভাবতে শুরু করল, মেইন স্ট্রিট দিয়ে কি রাতে যাওয়া উচিত হবে?

টাউন রেকর্ডে তার নাম বেসি। পালিয়ে আসার পর তাদের সম্পর্কে যেসব কথা টেরেন্স প্রচারপত্রে ছাপা হয়েছে তা সত্যিই ভয়ংকর। তা পড়ে কোরা এবং সিজারকে সহজেই শনাক্ত করা যায়। সিজার আর শ্যামের সাথে কথা না বলা পর্যন্ত তাই কোরার এতটুকু স্বস্তি নেই। মেইন স্ট্রিটের সমান্তরাল রাস্তা এলম স্ট্রিট। কোরা ড্রিপ্ট ব্লক পর্যন্ত এই এলম স্ট্রিট ধরেই গেল। প্রতি বারেই সে একটা বাঁক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি মাথায় পাগড়ি বেঁধে হাতে একটা আলো নিয়ে সে একটা ঘোড়াই চড়ে যেতে পারত তবে ভাল হত। সন্ধ্যাকালেই ড্রিপ্ট জনাকীর্ণ। তাদের কাউকে সে চেনে, কাউকে চেনে না। স্টেশন এজেন্টের কাছে পৌঁছানোর আগে তাকে অন্তত দু’বার সেলুনের পাশ দিয়ে যেতে হবে। তাই স্টেশন মাস্টার তাকে ঘুরপথে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন।

সেলুনে লোকজন হাসিতামাশায় লিপ্ত। আলো এড়িয়ে সে আবছায়া অন্ধকারে পিছন দিকে চলে গেল। একটা অন্ধকার জায়গায় শ্যাম একটা ক্রেটের উপর বুটপরা এক পা তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। “কীভাবে তোমাকে বলব তা নিয়েই আমি ভাবছি। পাকড়াওকারীর নাম রিজবে। পুলিশের সাথে এখন সে সিজার আর তোমার সম্পর্কে কথা বলছে। তার সাথে আছে আরও দু’জন লোক। আমি তাতের হুইস্কি সার্ভ করেছি।”

এরপর একটা প্রচারপত্র কোরার হাতে দিলেন। ফ্লেচার যেমন তার বাড়িতে বলেছিলেন, এটা ছিল তেমনি একটি প্রচারপত্র। তবে সামান্য আলাদা কিছু তথ্য আছে এটায়। এখন কোরা কিছু পড়তে পারে। প্রচারপত্রে লেখা “মার্ডার” শব্দটি যেন তার কলজেয় তীরবিদ্ধ করল।

বারের ভেতরে লোকজনের ভীড় একটু কমেছে। কোরা গা ঢাকা দিতে আরও ভেতরে একটা অন্ধকার জায়গায় চলে গেল। শ্যাম আরও এক ঘন্টা সময় দিতে পারবে না। এরই মধ্যে যতটা সম্ভব তথ্য সে জানতে পেরেছে তা হল পাকড়াওকারীরা নিশ্চিত হয়েছে কোরা আর সিজার এখানেই আছে। এবং সিজার ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। সবচেয়ে ভাল হয়, যদি কোরা সিজারের বাড়ির দিকে গিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে।

হাতে সময় ছিলই না বলা চলে। রাস্তার পাশ ধরে সে জোরে হাটছিল। এমন সময় কার যেন পায়ের শব্দ শোনা গেল। রাস্তা ছেড়ে কোরা অন্ধকারে দৌঁড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। জঙ্গলের মধ্য দিয়েই সে শ্যামের বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল। হেঁশেলে গিয়ে সে একটা মোমবাত জ্বালালো। কোথাও একটু বসার জায়গা পর্যন্ত নেই। এখানে সে একটা কাজই করতে পারে যা তাকে শান্ত করতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেটাই সে করল। শ্যামের রান্নাঘরের বাসন-কোসন ধোয়া শুরু করল। শ্যাম বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত এই কাজ করেই সে নিজেকে ব্যস্ত রেখে বেশ শান্ত করে ফেলল।
“খবর ভাল না,” স্টেশন এজেন্ট শ্যাম তাকে বলল। “আমরা দুজন কথা শেষ করার পরপরই একজন এসে হাজির। ধরিয়ে দিতে পারলে সে বেশ ভাল টাকা বকশিস পাবে। তার গলায় একটা কানের দুল ঝুলানো। দেখতে অনেকটা রেড ইন্ডিয়ান। আসলেই লোকটা দারুণ পাঁজি। সে বলল, তারা সব জেনেছে, তুমি কখন, কোথায় ছিলে। রিজবে কোন প্রলোভন দেখাতে বাদ রাখে নি। তারা তোমার সত্যিপরিচয় জানে। কিন্তু কীভাবে জেনেছে সেটা বলতে পারব না।”
কোরা ভয়ে হাতের গামলাটা শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল।
তারা দু’জনকেই চিনেছে। আর আমিও সিজারকে কোন খবর পৌঁছাতে পারিনি। আমাদের কথা ছিল সে এখানে অথবা সেলুনে আসবে। সে বোধহয় নিজের পথ ধরেছে।” শ্যাম ড্রিপ্টে যেতে চাইল। তার এখন সেখানে যেতেই হবে।
“তুমার কি মনে হয়, তারা আমাগের একসাথে কতা বলতি দেকেচে?”
“তোমার বোধহয় এখন নীচে প্লাটফরমে চলে যাওয়া ভাল।”
তারা দুজনে রান্নাঘরের টেবিল আর কালচে রঙের কাপড়টা সরিয়ে ফেলল। তারপর দু’জনে মিলে মেঝেয় সাঁটানো দরজাটা খুলল। এটা খুব টাইট করে ফিট করা। দরজাটা খোলার সাথে সাথে হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় মোমবাতিটা নিভে গেল। কিছু খাবার আর একটা লণ্ঠন নিয়ে কোরা দ্রুত নিচে নেমে গেল। ক্যাচক্যাচ শব্দ করে দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল, সাথে সাথে টেবিলটা আগের জায়গায় রাখা হল।

কোরা কালোদের চার্চে যেত না। সে এটা এড়িয়ে চলত। র‌্যান্ডেলে তাদের ধর্মকর্ম করা বা চার্চে যাওয়া নিষেধ ছিল। আর সাউথ ক্যারোলাইনায় এসে সে কোনদিনই কালোদের জন্য নির্ধারিত চার্চে যায় নি। সে চার্চে না যাওয়ায় অনেকে অবাক হত। কিন্তু কোরা এসব তোয়াক্কা করত না। এখন কি তার প্রার্থনায় বসা উচিত? হালকা আলোয় সে টেবিলের ওপর বসল। প্লাটফরম এত অন্ধকার যে কোথা থেকে টানেল শুরু হয়েছে তা বোঝা মুশকিল। সিজার কোথায় কীভাবে আছে তাই বা কতক্ষণে জানা যাবে? কত দ্রুত সে দৌঁড়াতে পারবে? সে জানে এই লোকগুলো কত ভয়ংকর হতে পারে। র‌্যান্ডেলে এদের নৃশংসতা সে দেখেছে। এরাই দাসদের জীবন নরক বানিয়ে দেয়। কোরা প্রার্থনায় বসল না।
অপেক্ষা করতে করতে এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙলে সে হামাগুড়ি দিয়ে সিঁড়ির কাছে সরে এলো। তারপর আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দরজায় কান লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করতে থাকল কোন শব্দ পায় কি না।

ভীষণ খিদে পেয়েছে তার। তেমনি পিপাসা। কাছে থাকা রুটির খানিকটা সস লাগিয়ে খেয়ে নিল। একবার সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা, আমার নিঃশব্দে নেমে যাওয়া এমনি করে করে কয়েক ঘন্টা কেটে গেল। এক সময় তার খাবার শেষ হয়ে গেল। হতাশার সমুদ্রে ভাসতে লাগল কোরা। দরজায় কান লাগিয়ে সে শোনার চেষ্টা করতে লাগল। না, উপরে কোন শব্দ নেই!
উপরে ভীষণ জোরে জোরে শব্দে তার ঘুম ভাঙল। এক দু’জন নয়, অনেক লোক চেঁচামেচি করছে। এটা উল্টায়, সেটা মেঝেয় জোরে আঁছড়ে ভাঙে। এমনি করে তারা সারা ঘর তচনচ করে ফেলল। এত জোরে জোরে চেঁচাচ্ছে লোকগুলো যে কোরা ভয়ে সেঁটিয়ে গেল। সিঁড়ি বেয়ে সে আরও নিচে নেমে গেল আস্তে আস্তে। তাদের কথাবার্তা কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।

দরজা দিয়ে কোন আলো আসার সুযোগ নেই। কোন রকম ধোঁয়ার গন্ধও সে পাচ্ছে না। কিন্তু কাঁেচর শাটার আর কাঠের দরজার ক্যাচক্যাচ শব্দ সে শুনতে পেল।
তারা বাড়িটায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। (চলবে)

 

আমিরুল আলম খান 

ন্ম যশোর জেলার ভারতীয় সীমান্তলগ্ন শিববাস গ্রামে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ১৫ই অগ্রহায়ণ।
পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে যুক্ত থেকেছেন। যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পরে চেয়ারম্যান ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি অপেশাদার সাংবাদিকতায় যুক্ত গত পাঁচ দশক ধরে। ইংরেজি দৈনিকে নিউ নেশান-এ প্রায় এক দশক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, বণিক বার্তায় কলাম লেখেন।

গ্রামীণ পাঠাগার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে গ্রামোন্নয়নের নতুন মডেল ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম গণপাঠাগার যশোর পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষা, ভাষা, প্রকৃতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থানবিদ্যায় আগ্রহী। এসব নিয়েই তার বই: বাঙলার ফল, অরণ্যের পদাবলী, পারুলের সন্ধানে, কপোতাক্ষ-মধুমতীর তীর থেকে, বিপর্যস্ত ভৈরব অববাহিকা, পারুল বিতর্ক, বাংলাদেশের শিক্ষার স্বরূপ সন্ধান এবং বিদ্যাবাণিজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি।

তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: আফ্রিকান-আমেরিকান উপন্যাস দি স্লেভ গার্ল। হ্যারিয়েট অ্যান জেকব রচিত এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি বোস্টন থেকে প্রকাশিত হয় ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব এ স্লেভ গার্ল শিরোনামে, ১৮৬১ সালে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।