আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

নর্থ ক্যারোলাইনা

 ২

লাম্বলির খামারের নিচে গোপন রেলওয়ে স্টেশনটি সুনির্বাচিত নানা রঙের পাথরের সংমিশ্রণে সাজানো গোছানো। সামের স্টেশনের দেয়াল ছিল কাঠখণ্ড দিয়ে ঢাকা। চমৎকার চমৎকার সব বোল্ডার কেটে কেটে সাজানো তার দেয়াল। পাথরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাদা, কমলা বা জংধরা রংগুলো কোন মহাজন এমন চমৎকার করে সাজিয়েছেন? চারদিকে এমন সুন্দর পাথরের দেয়ালের মধ্যে দাঁড়িয়ে কোরার মনে হচ্ছিল সে বোধহয় কোন পাহাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

ইঞ্জিনিয়ার দেয়ালের একটা আলো জ্বেলে দিলেন। কাজ শেষ করলেও শ্রমিকরা এখনও এ জায়গা সাফসুতরো করেনি। গোটা স্টেশনটা যেন এখনও একটা ওয়ার্কশপ হয়ে আছে। সর্বত্র নানা যন্ত্রপাতি ছড়ানো। যাত্রীরা বারুদের খালি কার্টুনের উপর বসে। একটা ব্যারেলের পানি মুখে দিল কোরা। ভালই মনে হল। টানেলের মধ্যে যে অবস্থায় সে এসেছে, তাতে তার সারা গায়ে ময়লা আবর্জনা লেগে আছে। তেষ্টাও পেয়েছে খুব। সে অনেক ক্ষণ ধরে পানি খেল। ইঞ্জিনিয়ার তার পানি খাওয়া দেখছিলেন।

“আমরা একন কনে আচি?” কোরা জানতে চায়।

“নর্থ ক্যারোলাইনায়,” তিনি বললেন। এ জায়গাটা সকলের পছন্দ, শুধু এটুকুই আমি বলতে পারি; তার বেশি না।”

“ইস্টিশন এজেন কই?” কোরা জানতে চায়।

“তার সাথে আমার কখনও দেখা হয়নি। তবে তিনি খুব ভাল।”

সামের বাড়িতে যে অভিজ্ঞতা কোরার হয়েছে তার নিরিখে সে এখানে থাকতে চায় না। বলল, “আমি আপনের সাথে যাব কিন্তুক।” তারপরই জিজ্ঞেস করল, “এর পরে কোন ইস্টিশন?”

“সে কথাটাই আমি আপনাকে বলতে চাইছিলাম। আমি আসলে মেইন্টিনেন্স বিভাগের। আমার দায়িত্ব ছিল ইঞ্জিন দেখভাল করা, কোন লোকজন বহন করা না। জর্জিয়া স্টেশন কেন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সেটা আমি সব জানি না; তবে চারদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, এ স্টেশনের খবর জানাজানি হয়ে গেছে। যাই হোক, স্টেশনটা বন্ধ করে দেবার পর সমস্ত লাইন পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে কীভাবে লাইনটা নতুন করে গড়ে তোলা যায়। যে ট্রেনটার জন্য আপনি অপেক্ষায় ছিলেন, সেটা বাতিল করা হয়। পরের ট্রেন কখন আসত তাও জানতাম না। আমার কাজ ছিল লাইনটা সম্পর্কে একটা রিপোর্ট দিয়ে জংশনে ফিরে যাওয়া।”

“পরের স্টেশনে আমারে সাতে নেবেন না?”

লণ্ঠন দিয়ে তাকে দেখিয়ে বললেন, ওইখানে এ লাইন শেষ হয়ে গেছে। এরপর আর কোন লাইন নেই।

দক্ষিণে চলে গেছে এমন একটা লাইন আমরা পিছনে ফেলে এসেছি। আমি এখন ইঞ্জিনে কয়লা ভরব। সেজন্য ডিপোয় যাব।”

“আমি দক্ষিণে যাব না।”

“আমার মনে হয়, স্টেশন মাস্টার আপনাকে সাথে নেবেন। কিন্তু খুব ভাল জানি না।”

তিনি চলে গেলেন।

এখানে আলো আছে, সাথে শব্দও আছে, যা থেকে সাউথ ক্যারোলাইনায় কোরা বঞ্চিত ছিল। রেলের মধ্য দিয়ে ঘোলা পানি গড়াচ্ছে। সে পানি আসছে স্টেশনের ছাদ থেকে।  শ্বেতপাথরে গাঁথা ভল্ট। ছোপ ছোপ রক্তের দাগ সর্বত্র। কাউকে বেদম চাবুক কষে কষে রক্তে ভিজে যাওয়া শার্ট থেকে পাথরের মেঝেয় পড়া ছোপ ছোপ রক্তের দাগ এগুলো। শব্দ শুনে একটু ভাল লাগছে তার। সে এখন বেশ উদ্দীপ্ত। হয়ত কোন সম্ভাবনার দেখা পাবে। এখানে খাবার জন্য পর্যাপ্ত পানি আছে, আছে আলো আর সে এখন গোলামধরাদের চেয়ে বহু দূরে। এ জগতে নর্থ ক্যারোলাইনা অনেক ভাল জায়গা।

কোরা সব ভাল করে দেখতে শুরু করল। টানেলের মধ্যে এটা একটা এখনো অগোছালো স্টেশন। নোংরা পাথরের মেঝে থেকে শক্তপোক্ত একটা খুঁটি উঠে গেছে ছাদ পর্যন্ত। সেটা ছাদের ভার রক্ষা করছে। এ রকম অগোছালো আর নোংরা পরিবেশ তাকে বেশ অবাক করল। পয়লা সে বা দিকটা দেখতে শুরু করল। পাথরের উপর ছাদ থেকে পড়া ময়লা পানির দাগ। সেটা পেরিয়ে গিয়ে দেখে জং ধরা হাতিয়ারের ময়লা সবদিকে। সেগুলো ডিঙিয়ে যেতে হবে পাহাড় কাটা যন্ত্রপাতি যেমন সিচেল, স্লেজ, পিক সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। একটা দমবন্ধকরা পরিবেশ। দেয়ালে হাত দিলে হাতে সাদা সাদা আঠার মত করে রং লেগে গেল। করিডোরের শেষে একটা মই। সেটা একটা পাথরের সাথে শক্ত করে বসানো। এখানে পথটা বেশ সাজানো মনে হল। আলোটা তুলে নিল সে। মইটা কতদূর উঠেছে তা বোঝা যাচ্ছে না। মইয়ের একবারে শেষ প্রান্ত শক্ত করে বাঁধা এটা নিশ্চিত হয়ে সে মই বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল।

কয়েক ফুট উপরে উঠেই সে বুঝে গেল, কেন এখানকার কর্মীরা সব ফেলে রেখে গেছে। এখানে পাথরের খুব সরু একটা গলিপথ। সেটা ময়লা আবর্জনায় মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ভরা। এ কারণে টানেল থেকে পথটা একবারে বিচ্ছিন্ন। গুহার মত এই জায়গার বিপরীত দিকে শত খানেক ফুট দূরে টানেল শেষ হয়েছে। এবার সে ভীষণ ভয় পেল। বুঝল আরও একবার সে ফাঁদে আটকা পড়েছে।

কোরা থপ করে মেঝেয় বসে পড়ে কান্না শুরু করল। ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত অনেকক্ষণ ধরে সে কাঁদল।

স্টেশন এজেন্ট এসে তার ঘুম ভাঙাল।

“ওহ, তুমি এখানে, বাছা?” পরম মমতা ভরা গলায় তিনি কোরাকে জিজ্ঞেস করলেন। গোলাগাল লালচে মুখের লোকটা এসব আবর্জনার মধ্যে একটা ছিদ্রপথে কোরাকে বললেন, “আহা বাছা, তুমি এখানে কী করছ?”

“আমি এক হতভাগী প্যাসেঞ্জার, স্যার।”

“তুমি জান না এ স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে?”

কাঁশতে কাঁশতে সে উঠে দাঁড়িয়ে নোংরা পোশাকটা ঝাড়তে লাগল।

“আহা বাছা, আহা বাছা!”

লোকটার নাম মার্টিন ওয়েলস। দু’জনে মিলে তারা ছিদ্রপথটা একটু চওড়া করার চেষ্টা শুরু করল যাতে কোন রকমে গুঁটিশুটি মেরে কোরা অন্যপাশে ঢুকতে পারে। মার্টিন তাকে সব রকম সাহায্য করলেন। অনেক চেষ্টার পর টানেলের মুখটা একটু হা করানো গেল। অনেকগুলো ঘুরপথ আছে সেখানে। একটা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগল কোরার গায়ে। যেন এক টুকরো স্বর্গীয় বাতাস! উপরে দেখা গেল তারাভরা আকাশ। নীচে সে যে অবস্থায় ছিল তার তুলনায় কী সুন্দর, কী অপরূপ দৃশ্য! কোরা ভাবতে থাকে।

মধ্য বয়েসী স্টেশন এজেন্টের চেহারা ব্যারেলের মত গোলগাল।  আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোডের স্টেশন এজেন্টরা বহিরাগত কাউকে স্বাগত জানায় না। তাতে বিপদের আশংকা থাকে। লোকটা আবার একটু ভীতু স্বভাবের। “তোমার তো এখানে আসার কথা নয়।” ইঞ্জিনিয়ারের কথাটাই যেন তিনি আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিলেন। “এটা খুব বাজে জায়গা।”

মার্টিন তার মতো করে ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছেন। এক হাতে মুখের উপর থেকে ঘামে ভেজা চুল সরাতে সরাতে তিনি কথা বলছিলেন। রাতের পাহারাদাররা সর্বদা সজাগ। কোন এজেন্ট বা প্যাসেঞ্জারকে ধরতে পারলে একেবারে পানিতে চুবিয়ে মারবে। এই অভ্র খনিটা অনেক আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে। ইন্ডিয়ানরাই এটা ফেলে চলে গেছে অনেক আগে। এতদূরের এ খনির কথা মানুষ প্রায় ভুলেই গেছে। কিন্তু হলে কী হবে? এখানে নিয়মিত টহল আর তল্লাসি চালানো হয় কোন কাউলা এর মধ্যে লুকিয়ে পালাতে চেষ্টা করছে কিনা তা দেখতে। ধরা পড়লে রেহাই নেই।

গুহার মত এই গর্তটার অবস্থা রীতিমত ভয়াবহ। কেউ এখানে আসতে চাইবে না। কোরা এর ভেতরেই আত্মগোপন করেছে। নর্থ ক্যারোলাইনা এই রেলপথ বাতিল ঘোষণা করেছে। মার্টিন এখানে এসেছেন শুধু এই খবরটা দিতে যে, এই স্টেশন থেকে আর কোন প্যাসেঞ্জারকে উদ্ধার করা হবে না। এখন কোরা এখানে আসায় মার্টিন বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলেন। তিনি এর জন্য তৈরি ছিলেন না। তিনি কোরার কানে কানে ফিসফিস করে বললেন, “এখানে কোথায় কোন পাকড়াওকারী লুকিয়ে আছে কেউ জানে না।”

মার্টিন তাকে বললেন যে, তিনি একটা ঘোড়ায় ওয়াগন আনার চেষ্টা করবেন। কিন্তু কোরার এ কথা বিশ্বাস হচ্ছিল না। সে ভাবল, মার্টিন হয়ত ফিরেই আসবেন না। তিনি বললেন যে, বেশি দূরে যাবেন না। কেননা ভোর হতে বেশি দেরি নেই। সকাল হলে আর কোরাকে কোথাও সরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। সে মার্টিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাল। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ফিরে এলে কৃতজ্ঞতায় কোরা তার গলা জড়িয়ে ধরল। তারা সেই ভাঙাচোরা ওয়াগনটা ঠেলেঠুলে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করল। তাতে বোঝাই করা বস্তাগুলো তারা নতুন করে সাজালো যাতে মাঝখানে একটা খোড়ল তৈরি করে তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা যায়। শেষবার যখন কোরা লুকিয়ে এসেছিল তখন তারা দুটো ছোট ছোট জায়গা করে নিতে পেরেছিল। মার্টিন তার মালটানা গাড়িটার উপর একটা ত্রিপল বিছিয়ে দিলেন। এরপর গাড়িটা বড় রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে এলেন।

বেশি দূর যাবার আগেই মার্টিন ওয়াগনটা থামালেন। এরপর ত্রিপলটা সরিয়ে দিলেন। এখনই সূর্য উঠবে। “আমি চাই সে দৃশ্যটা তুমি দেখ,” কোরাকে মার্টিন কললেন।

কোরা তার কথার মানে বুঝতে পারল না। গ্রামের রাস্তাটা বেশ ফাঁকা। রাস্তার দু’পাশে গাছপালার সুন্দর খিলান। এখানে এক রকম, কিছু দূরে আরেক রকম। সে ওয়াগন থেকে বাইরে এলো।

গাছে গাছে ঝুলছে মানুষের লাশ। পচা, কোনটার অর্ধেক শকুনে খেয়েছে। কোনটা একেবারে উলঙ্গ। কোনটার গায়ে সামান্য কাপড়। গলায় ফাঁস দেবার সময় কোন কোন কালো ট্রাউজারে লেগে আছে মলমূত্র। আধা-খাওয়া সে সব লাশ দেখতে ভয়ংকর, বীভৎস। একটা মেয়ের লাশ ঝুলছে। পেটটা বেশ উঁচু। তার পেটে বাচ্চা। চোখদুটো বেরিয়ে এসে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। হায়, হায়! কী নারকীয় দৃশ্য!

এই হল মুক্তির মহাসড়ক! এ মহাসড়কে যারা পাড়ি জমায়, তাদের এই পরিণতিই অপেক্ষা করে। তবু মানুষ মুক্তির আশায় বুক বাঁধে। মুক্তির জন্য লড়াই করে। সে লড়াইয়ে কত প্রাণ বলি হয় সে খবর কেউ রাখে না!

মার্টিন আবার ত্রিপল দিয়ে গাড়িটা ঢেকে দিলেন। বললেন, “এই যে মুক্তির মহাসড়ক দেখছ,  শহর পর্যন্ত সারাটা রাস্তা জুড়ে এমনই সব নারকীয় দৃশ্য। এই হল সাক্ষাৎ নরক।”

“হা ঈশ্বর! আমাকে তুমি এ কোন দোজক দেখাতে নিয়ে এলে!” কোরা স্বগোক্তি করে।

এরপর যখন কোরা সে ওয়াগন থেকে উঠে বসল তখন সেটা মার্টিনের হলুদ বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আকাশে ঝলমল করছে দিনের আলো। গাড়িটা যতদূর সম্ভব বাড়ির পিছন দিকে এনে রাখলেন মার্টিন। বাড়ির এত কাছে অন্যদের বাড়ি যে ঘোড়ার আওয়াজ যে কেউ শুনতে পারে। আর সে আওয়াজে কেউ এদিকে তাকালে কোরাকেও দেখে ফেলবে। বাড়িটার সামনে দিয়ে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে। তারপর সবুজ ঘাসের মাঠ। মার্টিন তাকে নেমে আসতে বললে কোরা পিছন দিক দিয়ে বাড়িতে ঢুকল। লম্বা এক শে^তাঙ্গিনী রাতের পোশাক পরে হেঁশেলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। লেমোনেডে চুমুক দিয়ে তিনি গজগজ করতে লাগলেন। কোরার দিকে না তাকিয়েই তিনি ফুঁসে উঠে বললেন, “তুমি আমাদের সবাইকে মারবে, বুঝেছ?”

ইথেল। মার্টিন আর ইথেলের ৩৫ বছরের বিবাহিত জীবন। দু’জনের মধ্যে একটা কথাও হল না। কোরা বেসিনে হাতের ময়লা সাফ করতে লাগল। এরপরই তারা কোরাকে নিয়ে ঝগড়া শুরু করল।

ইথেল কোরাকে উপর তলায় নিয়ে গেলেন। মার্টিন গাড়িটা গাড়িঘরে রাখলেন। কোরা চারদিকে নজর বুলিয়ে নিল। অতি সাধারণ একটি বাড়ি। সাদামাঠাভাবে সাজানো। মার্টিন বৌকে ধমক দিলেন। জোরে জোরে পা ফেলে তিনি সিঁড়ির উপরে উঠে গেলেন। মহিলার এ ধরনের আচরণে কোরা ভয়ই পেল। ওয়াশরুম দেখিয়ে তাকে বললেন, “গায় দিয়ে বুটকো গন্ধ বেরচ্ছে। আগে ভাল করে গা ধোও। তাড়াতাড়ি!”

কোরা কেবল হলঘরের মাঝামাঝি এসেছে, এমন সময় মিসেস মার্টিন তাকে সিঁড়ি দিয়ে চিলেকোঠায় যেতে বললেন। ছোট্ট ঘর, ছাদও বেশ নিচু। কোরার মাথায় প্রায় ঠক্কর লাগে। ঘরটা বেশ গরম। অনেক দিন ঘরটা খোলাও হয় না। এলামেলোভাবে ভাঙাচোরা জিনিসে ভর্তি। তার মধ্যে পুরনো ক’টা ছেঁড়াফাটা, পোকায় কাটা লেপ, ক’খানা ভাঙা চেয়ার। ঘরের এক কোণায় কুঁকড়ানো দুমড়ানো হলদে রঙের কাগজে ঢেকে রাখা একটা পাথরের ঘোড়া।

“যাও, ওখানে এখন লুকিয়ে থাক।” জানালাটা দেখিয়ে ইথেল তাকে বললেন। দেয়াল থেকে ঝুলানো একটা টুল নামিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে ইথেল একটা দোলনা নামালেন। তারপর অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাকে সেখানে আসতে ডাকলেন। তখনও পর্যন্ত তিনি কোরার মুখের দিকে তাকাননি।

কোরা এই মিছেমিছি ছাদে উঠে এক কোণায় নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করল। ছাদটা মেঝে থেকে তিন ফুট উঁচুতে আর লম্বায় প্রায় ফিট পনেরো। ভাঙাচোরা বিভিন্ন জিনিসপত্তর আর কিছু বই সরিয়ে কোরা তার মাঝে একটু জায়গা করে নিল। সিঁড়ি দিয়ে ইথেলের নেমে যাওয়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছে কোরা। ফিরে এসে তিনি কোরাকে কিছু খাবার দিলেন। একটা জগে পানি আর একটা পানির গ্লাস।

এই প্রথম ইথেল কোরার দিকে তাকালেন। মুখটা গম্ভীর করে বললেন, “তুমি যদি কোন আওয়াজ কর আর সে যদি শুনে ফেলে তাহলে আমাদের সবাইকে মরতে হবে, বুঝেছ? আমার মেয়ে তার পরিবারের লোকদের নিয়ে আজই বিকেলে আসছে। তুমি যে এখানে তারা যেন কিচ্ছু টের না পায়, বুঝলে?”

“কতক্ষণ?”

“হাদারাম, একটা কথাও বলবে না। এতটুকু শব্দ করবে না। কেউ যদি টের পায়, তাহলে আমাদের সবাইকে মরতে হবে” এ কথা বলে পর্দাটা টেনে আড়াল করে তিনি চলে গেলেন।

আলো-বাতাসের জন্য রাস্তার দিকে ছোট্ট একটা ফুটো আছে। আস্তে করে হামাগুড়ি দিয়ে কোরা সেদিকে গিয়ে বর্গার নিচে অবস্থান নিল। এখানে আগে একজন লুকিয়ে ছিলেন। খানিকটা আলোবাতাস পাবার জন্য তিনি ভেতর থেকে  এই ছোট্ট ফুটোটা বানিয়েছিলেন। কিন্তু সে লোকটা এখন কোথায়? কোরা বুঝতে চেষ্টা করে।

প্রথম দিনেই পাশের পার্কটা কোরার নজরে আসে। সবুজ ঘাসে মোড়া। বাড়িটার ঠিক পিছন দিকেই রাস্তার ওপাশে পার্কটা। এ বাড়ি থেকে পার্কটা খুব ভাল দেখা যায়। সেই ছোট্ট ছিদ্রে চোখ লাগিয়ে কোরা পার্কের মনোরম দৃশ্য দেখতে থাকে। ছিদ্রপথে পুরো পার্কটাই নজরে আসে। পার্কের চারপাশেই দো-তলা, তিন-তলা বাড়ির সারি। সেগুলো সব কাঠের তৈরি। সবগুলো বাড়িই একই ধাঁচের, একই রঙের। লম্বা লম্বা পোর্চের নীচে বেশ কিছু চেয়ার রাখা। মাঝ দিয়ে চমৎকার বুনুনিতে ইঁটের সুন্দর হাঁটারাস্তা। লম্বা লম্বা গাছের মনোরম ছায়াঘেরা। প্রধান ফটকের কাছে একটা ঝর্না থেকে অনবরত পানি ঝরছে। একটু দূরে দূরে কিছু পাথরের নিচু বেঞ্চ পাতা। তার উপর এসে পড়ছে সকালের সোনাঝরা রোদ। অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে রোদ পোহানোর লোকের ভিড় জমে যায়। রাত বেশ গভীর হওয়া পর্যন্ত ভিড় থাকে।

সর্বত্র পাখির বিষ্ঠায় সয়লাব। প্রবীণ লোকেরা হাতে রুমাল নিয়ে আসেন। বাচ্চারাদের হাতে বল কিংবা ঘুড়ি। আর তরুণ-তরুণীরা আসে প্রেমালাপে মত্ত হতে। একটা বড় সাইজের কুকুর আছে এখানে। বাচ্চারা সেটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে আনন্দ করে। তাকে এক কোণায় নিয়ে যায়। সেও তাদের সাথে এভাবে খেলে মজা পায়। ক্লান্ত হলে কুকুরটা বেঞ্চ কিংবা ওক গাছের নিচে ঘুমিয়ে নেয়। বিশাল বিশাল ওক আর তাদের বিশাল বিশাল ডালপালা এ পার্কের মর্যাদা বাড়িয়েছে। কুকুরটা প্রচুর খাবার পায়। সবাই তাকে খেতে দেয়। কোরা তার নাম দিল মেয়র।

সূর্য মাথার উপর আসতে আসতে পার্কটা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। আর ততক্ষণে লুকানোর এই জায়গাটা যেন উনুনের মতো জ¦লতে থাকে। এখন আর পার্কের দিকে নজর নয়। বরং কোথাও একটা কম গরম জায়গা আছে কিনা হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে তাই খুঁজে দেখা তখন একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এ যেন মরুভূমির মধ্যে এক টুকরো মরূদ্যান খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। সে বুঝে ফেলেছে তার মেজবান দিনের বেলা তার কোন খোঁজ খবর নেবে না। বিশেষ করে যতক্ষণ ফিওনা কাজ করবে। মার্টিন তার স্টোররুমে কাজে ব্যস্ত। ইথেল আসার পর থেকে সামাজিকতায় ব্যস্ত। কিন্তু ফিওনা নীচে সিঁড়ির কাছে রয়েছে তো রয়েছেই। কম বয়েসী মেয়েটা আইরিশ টানে কথা বলে। সে তার কাজে গেল। কোরা ফিওনার হা-হুতাশ শুনতে পাচ্ছে। সে তার অনুপস্থিত মনিবদের মাথা খাচ্ছে। প্রথম দিনে ফিওনা এই চিলেকোঠায় ওঠেনি বটে; কিন্তু এরই কাছাকাছি তার পায়ের শব্দে কোরা চিলেকোঠায় আরও গুটিয়ে থেকেছে। ইথেলের সাবধান বাণী সে ভুলতে পারে না। বরং অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে চেষ্টা করছে।

তার এখানে আসার দিনেই বাড়ি মেহমানে ভরে গেল। মার্টিনের মেয়ে জেন এলো তার গোটা পরিবার নিয়ে। মেয়েটা খুবই ভাল। তার আচার ব্যবহারে মুগ্ধ হতে হয়। মার্টিনের জামাইও একজন হৃদয়বান ব্যক্তি। তাদের দুই মেয়ে চেঁচিয়ে ফাড়িয়ে সারা বাড়ি মাথায় করে রেখেছে। এক সময় তারা চিলেকোঠায় উঠতে শুরু করল। কিন্তু কিছুদূর উঠে তারা আর এগোলো না এই ভয়ে যে চিলেকোঠায় কোন ভুত থাকতে পারে। ভুত নিয়ে তারা নানা কল্পকাহিনী জানে। তাই নিয়ে আলাপ জুড়ে দিল। আসলেই তো সেখানে একটা জ্যান্ত এক ভুত লুকিয়ে আছে, আর সেটা কোরা নিজে ; কিন্তু এ ভুত এমন এক শেকলে বাঁধা যা থেকে যেন তার মুক্তি নেই।

সন্ধ্যায়ও পার্কটা লোকে লোকারণ্য। বড় রাস্তাটা পাশেই হবে, কোরা ভাবতে চেষ্টা করে, যে পথে এ শহরে লোকজন আসে। নীল পোশাকে কিছু বৃদ্ধাকে দেখা যাচ্ছে। তারা কিছু সাদা ও নীল রঙের পতাকা স্টান্ডে লাগিয়ে পার্কটা সাজাচ্ছে। ফুলের মালা আর কমলার পাতা দিয়ে সাজিয়ে তাকে অপরূপ করে তুলছে। মঞ্চের সামনে থেকে লোকজন সরিয়ে সেখানে কম্বল পেতে দেয়া হল। ঝুড়িতে রাখা খাবার নামানো হল। পার্কের আশেপাশে যারা বাস করে তারা জগ আর গ্লাস হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে।

প্রথমে বুঝতে না পারলেও আজ একটি অভিনব বিষয় কোরার নজরে এলো। পাকড়াওকারীদের ভয়ে পলাতক জীবনে সে দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে পার করছে। সে লক্ষ্য করল এখানে যারা জমায়েত হয়েছে তাদের শতভাগই শ্বেতাঙ্গ। এমনটি সে আগে কখনও দেখেনি। আমেরিকায় আফ্রিকানদের ছাড়া শে^তাঙ্গদের জীবন অকল্পনীয় তা সে কালো আফ্রিকান গোলাম কিংবা মুক্ত যাই হোক না কেন। কিন্তু এই প্রথম কোরা শুধুই শে^তাঙ্গদের দেখছে যেখানে একজনও আফ্রিকান নেই। কিন্তু বিষয়টা তার বুঝতে বেশ দেরীই হল। সিজারের সাথে পালানোর আগে কোরা কোনদিন খামারের বাইরে কোথাও যায়নি। তাই সাউথ ক্যারোলাইনায় সে প্রথম দেখল শহরে জীবন সাদা-কালোদের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে। মেইন স্ট্রিটে, দোকানপাটে, কল-কারখানায়, অফিসে সর্বত্র সাদা-কালোরা একসাথে কাজ করে। এটাই আমেরিকায় জীবন, এটাই এখানে রীতি। সাদায়-কালোয় মিলেমিশে চলা ছাড়া এখানে জীবন অকল্পনীয়। মুক্ত অথবা দাস যাই হোক না কেন, আমেরিকার জীবন থেকে কালোদের আলাদা করা অসম্ভব।

কিন্তু নর্থ ক্যারোলাইনায় নিগ্রোদের অবস্থান একেবারে দূরবর্তী।

পতাকা দণ্ডে একটা ব্যানার টাঙাতে দুই যুবক মেট্রনদের সাহায্য করছে। শুক্রবার উৎসবের দিন।

মঞ্চে ব্যান্ডের একটা মহড়াও হল। নিয়মিত যারা পার্কে আসে তারাই এ উৎসবের আয়োজক। অনেকে এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোরা তা দেখতে দেয়ালে চোখ লাগিয়ে রইল। একটা লোক চমৎকার ব্যাঞ্জো বাজালো। কিন্তু বাঁশিওয়ালারা ঠিক সে রকম সুর তুলতে পারল না। কিন্তু লোকে এই বেসুরো বাজনাও বেশ উপভোগ করছে মনে হল। ব্যান্ড শেষ হল খুব পরিচিত দুটো গানের সুরে। পোর্চের  নীচে মার্টিন আর ইথেলের নাতিরা নেচে আর হাততালি দিয়ে তাদের আনন্দ প্রকাশ করল।

নাইলনের জামা পরা একটা লোক স্বাগত বক্তব্য পেশ করল। সংক্ষিপ্ত। পরে মার্টিনের কাছে কোরা শুনেছে ইনি হলেন জজ সাহেব, নাম টেনিসন। এ শহরে মশহুর আর মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। জজ সাহেবের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পর যে কুন শো হল কোরা তার কিছুই বুঝতে পারে নি। এ ধরনের শোর কথা কোরা শুনেছে বটে; কিন্তু কখনও দেখেনি। দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় কালোরা কিছু শো করে; কিন্তু সে একেবারে আলাদা ধরনের। দুজন মুখে কালি মেখে কালোদের বেশ ধরেছে। কিম্ভূতকিমাকার দেখাচ্ছে তাদের। দর্শকরা তাদের দেখে হেসেই লুটোপুটি খাচ্ছে। একেবারেই বে-মিল পোশাক, মাথায় চিমনি-পট উঁচু হ্যাট পরে কালোদের মত কথা বলার কসরত দেখাচ্ছে। তাই দেখেই সবাই হেসে খুন। সবচেয়ে ফাটাফাটি অবস্থা হল যখন একজন একটা ছেঁড়াফাটা বুট পায়ে দিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে এসে বারবার পথ হারাচ্ছিল।

জজ সাহেব ড্রেনে পানি নিষ্কাষণ সমস্যা নিয়ে দু’চার কথা বলার পর ঘোষণা করা হল এবার ফাইনাল শো হবে। মঞ্চস্থ হবে নাটক। নাটকে দেখানো হলো, কোরা অভিনয় দেখে আর সংলাপ যেটুকু বুঝল, একটা কালো গোলাম মনিবের সামান্য বকাঝকায় পালিয়ে উত্তরে যায়। পথে নানা দুর্বিপাকে পড়ে। প্রচণ্ড শীত, অনাহার, অনিদ্রা আর জঙ্গলের বন্যপ্রাণীর উৎপাতে তার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। একজন সুঁড়ি তাকে তার সুঁড়িখানায় নিয়ে যায়। সে চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে বেদম পেটায় আর কথায় কথায় অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে। এর মাধ্যমে কালোদের প্রতি উত্তরের সাদাদের মনোভাব তুলে ধরা হয়েছে।

নাটক শেষ হয় পালিয়ে যাওয়া গোলামের ফিরে আসার মধ্য দিয়ে। মিথ্যা আশ্বাসে প্রলুব্ধ হয়ে সে মুক্ত রাজ্যে যাবার আশায় পালিয়েছিল। এখন সে তার মনিবের কাছে ফিরে এসেছে। আগের কাজে আবার যোগ দিতে চায়। মনিবের কাছে দয়া আর মাফ চেয়ে সে মিনতি করছে। মনিব ধীর ঠাণ্ডাভাবে তাকে বোঝাবার চেষ্টা করছে, সেটা আর সম্ভব নয়। সে এখান থেকে পালাবার পর নর্থ ক্যারোলাইনায় অনেক কিছু বদলে গেছে। মনিব বাঁশি বাজাতেই দু’জন এসে তাকে টেনে হেঁচড়ে বাড়ির এলাকা থেকে বের করে দিল।

দর্শকরা তুমুল করতালির মাধ্যমে নাটক উপভোগ করছে। এই দৃশ্যে তা অন্য সব দৃশ্যকে ছাড়িয়ে গেল। এই কাহিনীর মূল বক্তব্যের সাথে সকলে একমত। সকলের করতালিতে পার্ক যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। সকলের করতালিতে যখন পার্ক মুখর এদিকে তখন পোর্চের নীচে শুয়ে থাকা মেয়রও ঘেউ ঘেউ করে উঠল। শহরটা কত বড় সে সম্পর্কে কোরার কোন ধারণা নেই। তার মনে হল, গোটা শহরের মানুষ এখন এই পার্কে জমায়েত হয়েছে। তারা অপেক্ষায় আছে। আসল মরতবা এবার বোঝা গেল। সাদা ট্রাউজারের উপর উজ্জ্বল লাল কোর্তা পরে এক বিশাল দেহী শে^তাঙ্গ মঞ্চে আবির্ভূত হল। যেমন তার বিশাল দেহ, তেমনি তার কণ্ঠস্বর। ভীষণ বেগে মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জাদুঘরে সাজিয়ে রাখা একটা ভালুকের কথা কোরার মনে পড়ল। একটা হ্যান্ডেলবার সে এমনভাবে দুমড়ে মুচড়ে ফেলল যে দর্শকরা তা দেখে নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। বজ্রনির্ঘোষে এমন স্পষ্টভাবে সে কথা বলছিল যে এই প্রথম কোরা তার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দই বুঝতে পারল।

নিজেকে তিনি জেমিসন নামে পরিচয় দিলেন, যদিও পার্কে উপস্থিত সবাই তাকে চেনে এবং তার নাম জানে। “প্রত্যেক শুক্রবারে আমি নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠি। আমরা জানি, কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা সবাই এখানে জমায়েত হয়ে উৎসবে মেতে উঠব। আমাদের রক্ষায় দরকারী আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত আমি ঘুমোতে পারতাম না।” এরপর তিনি পতাকাদণ্ডের কাছে প্রস্তুত থাকা পঞ্চাশজনের ব্যান্ড পার্টিকে বাদ্য শুরু করতে ইশারা করলেন। জমায়েত হওয়া সকলে হাত নেড়ে আমার মাথা দুলিয়ে তার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করল।

ততক্ষণে জনতাকে তিনি বশীভূত করে ফেলেছেন। “আজ আমি আপনাদের সামনে নতুন একজনকে পরিচয় করিয়ে দেব। তিনি এমন এক যুবক যিনি সদ্য যৌবনে মাত্র এ সপ্তায় নাইট রাইডার খেতাব অর্জন করেছেন। তার নাম রিচার্ড।” এ কথা বলে তিনি রিচার্ডকে মঞ্চে আসার আহ্বান জানালেন যাতে সকলে তাকে দেখতে পারে।

হালকা পাতলা ববছাটা চুলের এক যুবক। বয়সের তুলনায় একটু বেশীই বেড়ে উঠেছে। অন্য সহশিল্পীদের মত তার পরনেও মোটা কাপড়ের কালো ট্রাউজার আর সাদা কুর্তা। ছেলেটা বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল। জেমিসনের কথা থেকে কোরা জানতে পারল যে এই নতুন ছেলেটাকে গড়েপিটে নিতে পার্টি নানা জায়গায় অনুষ্ঠান করবে।

“তুমি দারুণভাবে শুরু করেছ, বাবা।”

ছেলেটা মাথা নাড়ল। ছেলেটার বয়স এবং চেহারা দেখে কোরার সেই তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের কথা মনে পড়ল যে ঘটনাচক্রে তাকে শেষবারের ট্রেনে পৌঁছে দিয়েছিল। তারই মত চামড়ার ফ্যাকাশে রং কিন্তু তারই মত ভীষণ তৎপর একটা ছেলে। হয়ত একই দিনে জন্ম এবং বরাত গুণে হয়ত ভিন্ন কোন পরিবেশে বেড়ে উঠেছে।

“সবাই কিন্তু প্রথম সপ্তাহে ঠিকঠাকমত সব কিছু করতে পারে না। তবে এ ছেলেটার মেধা আছে। দেখি রিচার্ড আমাদের কী উপহার দেয়।”

দু’জন লোক একটা কালো মেয়েকে প্রায় জোর করে ধরে মঞ্চে তুলল। বাসাবাড়িতে কাজ করা মেয়ের মত চেহারা। ভয়ে লজ্জায় সে একেবারে কুঁকড়ে এক কোণায় গিয়ে দাঁড়াল। গায়ে জরাজীর্ণ ঢিলেঢালা পোশাকের সর্বত্র ময়লা ও রক্তের দাগ। মাথাটা বিশ্রিভাবে ন্যাড়া করা।

“টেনেসি অভিমুখি বাষ্পীয় জাহাজে তল্লাসী চালিয়ে রিচার্ড এই মেয়েকে উদ্ধার করে। লুসিয়া তার নাম। পালিয়ে যাচ্ছিল। খামার থেকে পালিয়ে সে একটা জঙ্গলে মাস কয়েক লুকিয়ে ছিল। তার বিশ্বাস সে পালিয়ে যেতে পেরেছে।” এক নিঃশ্বাসে এত কথা বললেন জেমিসন।

লুসিয়া জমায়েতে কত লোক হতে পারে তা বুঝতে চারদিকে তাকাচ্ছিল। নির্যাতনকারীর সংখ্যা অনুমান করা বেশ কঠিন।

আকাশের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে জেমিসন বোঝাতে চাইলেন যে তিনি কিছুই পরোয়া করেন না। রাত যেন তার দুশমন। কোরা ঠিক বুঝল, রাত আর ভুতের মধ্যে ফারাক নেই। তিনি বললেন যে, “অন্ধকারে কালো জানোয়ারগুলো নাগরিকদের স্ত্রী-কন্যাদের উপর চড়াও হয়ে বলাৎকার করে। ভুতুড়ে অন্ধকারে দক্ষিণ দিক একবারে অরক্ষিত থাকে। এমন অবস্থায় এই রাইডাররাই সকলের নিরাপত্তা দেয়। “আমরা সবাই নর্থ ক্যারোলাইনার নিরাপত্তা ও অধিকার সংরক্ষণের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। এজন্য আমরা সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছি যাতে উত্তরের লোকেরা এখানে ঢুকতে না পারে এবং নিচু জাতের লোকেরা পরিবেশ দূষিত করতে না পারে। কালো বদমাশগুলোকে ঠেঙিয়ে বার করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে আমরা বহু বছর আগে তাদের এখানে ঢুকতে দিয়ে যে ভুল করেছিলাম তা শুধরে নিয়েছি। আমাদের রাজ্যের সীমানার ওপারে আমাদেরই স্বজাতি ভাইয়েরা কিন্তু নিগারদের সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে। তারা মনে করে, নিগারদের শিখিয়ে পড়িয়ে নিলে উন্নতি হবে। তাতে সবার ভাল হবে। কিন্তু একটা গাধাকে তবু কিছু শেখানো যায়, নিগার কখনও কিছু শিখতে পারে না।” এসব বলে তিনি লুসিয়ার মাথায় হাত দিয়ে জানতে চাইলেন “রাস্কেল কি কিছু শিখতে পারে? কী করণীয় তা আমাদের বুঝতে হবে।”

রুটিন মাফিক জনতা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল। জেমিসন একটার নেতৃত্ব দিয়ে চললেন। নাইট রাইডাররা মেয়েটাকে টেনে হেঁচড়ে পার্কের মাঝখানে ওক গাছটার কাছে নিয়ে গেল। কোরা  সেদিন পার্কের এক কোণায় একটা চাকাওয়ালা মঞ্চ দেখেছিল। সারা বিকেল ছেলেমেয়েরো তার উপার লাফালাফি করছিল। সন্ধ্যার দিকে সেটা ঠেলে ওক গাছতলায় এনে রাখা হয়েছে। জেমিসন স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালে ছেলে-বুড়ো সবাই মঞ্চের চারপাশে গিয়ে জমায়েত হল। তাকে  মঞ্চে উঠিয়ে দড়ির ফাঁসটা লুসিয়ার গলা বরাবর নামিয়ে আনা হল।  নিপুণ দক্ষতায় মাত্র একবারের চেষ্টায় একজন নাইট রাইডার দড়িটা এমনভাবে নিক্ষেপ করল যে সেটা গাছের একটা মোটা ডালে আটকে গেল।

গতবারেই ঠিক করা ছিল এবার ফাঁসির সময় কে তক্তাটা সরাবে। ভিড় ঠেলে লোকটা এগিয়ে এলো। গোলাপী ছিট লাগানো পোশাকপরা এক যুবক এসে লুসিয়ার পায়ের নিচের তক্তা সরিয়ে দিল।

তাকে গাছে ঝুলানোর আগেই কোরা সে ছিদ্রপথ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। হামাগুড়ি দিয়ে খাঁচার অন্যপ্রান্তে চলে গেল কোরা। খুব দমবন্ধ অবস্থা না হলে পরবর্তী কয়েক মাস কোরা দূরের এই কোণায় গিয়ে রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করেছে। ছোট্ট খাঁচায় বন্দি কোরা এই নারকীয় শহর কিংবা নারকীয় পার্ক থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করে।

শহরটা নীরব হয়ে গেল। জেমিসন তার বক্তব্য শেষ করলেন।

 

আমিরুল আলম খান 

জন্ম যশোর জেলার ভারতীয় সীমান্তলগ্ন শিববাস গ্রামে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ১৫ই অগ্রহায়ণ।
পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে যুক্ত থেকেছেন। যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পরে চেয়ারম্যান ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি অপেশাদার সাংবাদিকতায় যুক্ত গত পাঁচ দশক ধরে। ইংরেজি দৈনিকে নিউ নেশান-এ প্রায় এক দশক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, বণিক বার্তায় কলাম লেখেন।

গ্রামীণ পাঠাগার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে গ্রামোন্নয়নের নতুন মডেল ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম গণপাঠাগার যশোর পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষা, ভাষা, প্রকৃতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থানবিদ্যায় আগ্রহী। এসব নিয়েই তার বই: বাঙলার ফল, অরণ্যের পদাবলী, পারুলের সন্ধানে, কপোতাক্ষ-মধুমতীর তীর থেকে, বিপর্যস্ত ভৈরব অববাহিকা, পারুল বিতর্ক, বাংলাদেশের শিক্ষার স্বরূপ সন্ধান এবং বিদ্যাবাণিজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি।

তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: আফ্রিকান-আমেরিকান উপন্যাস দি স্লেভ গার্ল। হ্যারিয়েট অ্যান জেকব রচিত এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি বোস্টন থেকে প্রকাশিত হয় ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব এ স্লেভ গার্ল শিরোনামে, ১৮৬১ সালে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।