আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

পর্ব-২

জর্জিয়া

জকির জন্মদিন। জাঁকজমক করে তারা এদিন পালন করতে চেষ্টা করে। চিরকালই তা রোববার, যেদিন তাদের আধবেলা ছুটি। বেলা তিনটায় ঘণ্টা বাজিয়ে কাজের শেষ ঘোষণা করা হয়। নর্দার্ন প্লান্টেশনে বাকি নোংরা কাজগুলো করতে হবে এখন। খড়কুটো খুঁটে নেয়া, ছাদ ঝাড় দেয়া, এখানে সেখানে এক-আধটু মেরামতির কাজ। নিজের তৈরি এটা-সেটা শহরে গিয়ে বেচা-বিক্রি করতে বা বাকি আধবেলা অন্য কোথাও কাজ করতে চাইলে পাস লাগে। শ্বেতাঙ্গ মালিকের কাছ থেকে কোন দাসের পক্ষে জন্মদিনে বিনামুজুরির ছুটি নেবার কল্পনা করাও রীতিমত অসম্ভব। সবাই জানে, নিগারের কোন জন্মদিন থাকতে নেই।

আখ খেতের শেষে বসে হাতের আঙুলে জমা নখের ময়লা সাফ করছিল কোরা। সুযোগ পেলে সে কিছু একটা করে। কিন্তু এবার সে সুযোগ আসে নি। নিচের সরু গলিতে কেউ চেঁচাচ্ছে। বোধহয় নতুনদের কেউ হবে, এখানকার দস্তুর এখনও সব শিখে উঠতে পারে নি। ক্রমে তা ঝগড়ায় রূপ নিল। চিল্লাচিল্লি। রাগের চেয়ে খিস্তি-খেউর বেশি। কনেলি না থামানো পর্যন্ত চলবে এসব। তা বেশ জমবে এবার জন্মদিন!

“তোর জন্মদিন হলে তুই কি নিতিস?”

কোরা তার বন্ধু লভির মুখ দেখতে পাচ্ছে না। সূর্যটা ওর পিছন দিকে। কিন্তু সে কী বলতে চায় সেটা কোরা জানে। লভি খুব সাদাসিধে মানুষ। জন্মদিন পালন করবে আজ রাতে। যে কারো জন্মদিন, বড়দিন বা র‍্যান্ডেলে ফসল তোলার উৎসবে সে সবার সাথে মিলেমিশে কাজ করে। সাহেব সেদিন সবাইকে ধেনো মদে চুর করাবে যাতে সবাই খুশি থাকে। এটা খুব কাজ দেয়। তবে আসল মজা চাঁদনি রাতে। মেয়েটা একজনকে বেহালা বাজিয়ে পয়লা নাচ শুরু করতে বলল। সে কোরাকে সাইডলাইন থেকে টেনে আনতে চাইল। কোরার প্রবল আপত্তি। হাতে হাত ধরে ঘুরে ঘুরে একসাথে নাচবে। লভির ইচ্ছা প্রতি ঘূর্ণনে সেকেন্ডের জন্য একটা ছোকরার চোখে পড়া। কোরা যেন এতে তার সাথী হয়। কিন্তু কোরা তাতে সাই দিল না। বরং জোর করে হাত সরিয়ে নিল। সে বরং নাচ দেখতে থাকল।

“তোকে তো বলিচি, আমি কবে জন্মাইলাম।” এক শীতে তার জন্ম। মা মেবেল তাকে বলেছে, জন্মের সময় মা খুব কষ্ট পেয়েছিল। হাড় কাঁপানো শীত। সেদিন সকালে বে-নজির ভীষণ বরফ পড়ছিল। জানলার সার্সি দিয়ে ঢুকছিল কনকনে ঠান্ডা বাতাস। ক’দিন ধরে স্রাব ভেঙেছিল মার। কিন্তু মরতে মরতে প্রায় ভূতের মত না হওয়া তক কনেলি কবিরাজ ডাকা দরকারই বোধ করে নি। প্রায়ই সেকথা মনে পড়ে কোরার। তার চোখে ভেসে ওঠে মরা কালো দাসদের চেহারা। মরার পর তারাই বুঝি ভূত হয়ে ফিরে আসে! যাদের অনেকেই তাকে ভালোবাসত, আশকারা দিত! মনে পড়ে তাদের কথাও যারা তাকে ঘেন্না করত, কিংবা তার কথাও যে একবার তার খাবার চুরি করেছিল যখন মা বাড়িতে ছিল না।

“তুলো তুলতি যাবি?” জিজ্ঞেস করে লভি।

“না, পারব না,” জবাবে কোরা বলে। “ওটা তোর জন্যি।”

“আগে মন ঠিক কর,” বলে লভি সেখান থেকে দ্রুত চলে যায়।

কোরা পায়ের গোঁড়ালিতে হাত বুলিয়ে মালিশ করতে লাগল। এ সময় পায়ের যত্ন নেয়া খুব দরকার। মোচ্ছব হোক, বা না হোক, কোরা প্রতি রোববারে আধবেলা কাজ করার পর বসে ভাবে নিজের কি কি কাজ সে করতে পারে। নিজের জন্য এ সময়টা সে কাজে লাগায়। ঘাস নিড়ানো, কিছু সবজি তোলা এসব। তাছাড়া কেউ তার এই ছোট্ট এক টুকরো জমির কোন অংশ দখলের মতলবে আছে কি না সেদিকে নজর রাখে। নিজের বিছানাপত্র ঠিকঠাক করে রাখে। সে একবার পায়ে কুড়–লের সামান্য আঘাত পেয়েছিল। পায়ে সেই কাটা দাগ আজও আছে। সেখানে একটু মালিশ করে নেয়।

পায়ে কালো দাগ। সে এক কাহিনী।

তখন আজারি অনেক পথ হেঁটে সবে এ খামারে এসেছে। তাদের থাকার কুঁড়ে ঘরের পিছনের এক টুকরো জমি নানা ভাঙাচোরা জিনিস, আবর্জনা আর নোংরায় ভরা। তারপর একটা মাঠ, তারও পরে একটা জলা। একরাতে নাকি র‍্যান্ডেল একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন একটা সাদা তুলোর সমুদ্রের পাশে। এরপর তিনি নীলচাষ ছেড়ে তুলোচাষ শুরু করেন। নিউ অরলিয়ানসে যোগাযোগ আর ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সহযোগিতায় তার বরাত খুলে গেল। এত টাকা তিনি আগে কখনও রোজগার করেন নি। ইংল্যান্ডে তখন তুলোর আকাল। কারখানা চালু রাখতে হাজার হাজার বেল তুলো দরকার। মজুরদের জন্য সার সার নতুন কুঁড়ে বানানোর জন্য ক্ষেতের গাছ কেটে সাফ করা হল।

কুঁড়েগুলো বানানো শেষ। সেখানে এখন নয়া বসতি। মাঝখানে চোদ্দটা কুঁড়ের মত জায়গা ফাঁকা। পাহাড়ের ঢালে এমন একখণ্ড ফাঁকা জায়গা খুব ভাল লাগল কোরার। ঘন গাছপালায় ঘেরা পাহাড়ে এক চিলতে পাহাড়ি ঝর্না খামারটাকে দু’ভাগ করেছে। তার তীর বেয়ে কুঁড়েগুলো পশ্চিমে সার করে তৈরি। কতকাল এভাবে বয়ে চলেছে ঝর্নাটা। এখানে রয়েছে কত মানুষের কত স্মৃতি। পুরনো আর নতুন কুঁড়ের মধ্যে আর একটু বেশি ফাঁকা জায়গা থাকলে কী এমন ক্ষতি হত!

ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ম্যাপ মেলে ধরে সাদা মানুষগুলো পাহাড়ের বিশাল বিশাল একেক অংশের দাবি নিয়ে মোকদ্দমা লড়ে। দাসদেরও লড়তে হয় নিচে ছোট্ট একটুকরো থাকার জায়গার জন্য। দুটো কুঁড়ের মাঝে হয়ত একটা ছাগল বাঁধা, একটা মুরগির খোঁপ আর একটু সবজি আবাদ করার মত এক ফালি জায়গা আছে। সেখান থেকে সবজি তুলে তা সেদ্ধ করে খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। র‍্যান্ডেল বা তার ছেলেরা যদি তাকে বিক্রি করে দিতে চায়, কথাবার্তা পাকা হবার আগেই কেউ ও জায়গা দখল করতে ব্যস্ত হয়ে উঠবে। কাজশেষে সন্ধ্যায় যদি এই এক ফালি জমির পাশে এসে একটু খুশি মনে দাঁড়ালে, কি আনমনে দু’লাইন গান গুনগুন করতে শুরু করলে তো পাশের লোকের চোখ টাঁটায়। সে মতলব ভাঁজতে শুরু করে কী করে তাকে উচ্ছেদ করা যায়। নালিশ করবে কোথায়? নালিশ করার জায়গা নেই, বিচার তো দূর অস্ত।

“আমার মা কিন্তু কাউকে তার জমি ছুঁতি দেয় নি,” মেয়েকে বলল মেবেল। মাত্র তিন বর্গফুটের মত জমি। “এ জমির দিকি বদনজরে তাকালি মা কিন্তু হাতুড়ি দিয়ে তার মাথা ফাঁটিয়ে দেবে, হু!”

তখন নানীর মুখের চেহারা কেমন হত তা কল্পনা করতে চেষ্টা করে কোরা। একদিন জমিতে কাজ করতে করতে ঠিকই কল্পনায় ভেসে উঠেছিল নানীর মুখ। চারদিক ভাল করে খেয়াল করলেই বোঝা যায় এই এক ফালি জমি কত আলাদা। স্পেন্সারের কাছ থেকে র‍্যান্ডেল এই খামার যখন কেনেন তখন তা বিস্তৃত ছিল উত্তরের দিকে। র‍্যান্ডেল তা পশ্চিমে প্রসারিত করে ভাগ্য ফেরাতে সচেষ্ট হন। তারা দক্ষিণে আরেকটা খামারও কিনে নেন। আর ধানের বদলে শুরু করেন তুলো চাষ। সে জন্য আরও দু’সার কুঁড়ে বানাতে হয় তাদের। নতুন কুঁড়ে বাঁধার জন্য এখানে যে পরিবর্তন করা হয়, তাতে আজারির ফালিটুকুর কোন হেরফের হয় নি। ঠিক মাঝখানে গভীরে পোঁতা অনড় স্ট্যাম্পের মত টিকে থাকে তার জমিটুকু। মেবেল এখানে তার খুশিমতো সবুজ শাঁক বা লতা আলুর আবাদ করত। কিন্তু এখন কোরার সময় বাঁধল ঝঞ্ঝাট।

মেবেল নিখোঁজ হবার পর কোরা বিপদে পড়ে। তার তখন দিশাহীন অবস্থা। তখন তার বয়স দশ-এগারো বছর হবে। কেউ তা ঠিকমত বলতেও পারে না। চোখে অন্ধকার দেখছিল কোরা। ধূসর মনে হচ্ছিল পৃথিবী। পরিবারের এই এক ফালি বাদামি-লাল জমিই তার সম্বল। এই প্রথম সে চারপাশের মানুষ আর এক খণ্ড জমির অর্থ বুঝতে শিখল। সিদ্ধান্ত নিল, যে কোন মূল্যে এ জমিটুকুন সে রক্ষা করবে। যদিও তার বয়স তখন খুব কম আর কেউ নেই তাকে দেখভাল করার। খুব শান্তশিষ্ট মেয়ে মেবেল। সবাই তাকে ভালোবাসতো। আজারির প্রতি সবার শ্রদ্ধাও মেবেলের টিকে থাকতে খুব সাহায্য করে। র‍্যান্ডেলে প্রথম যে সব দাস আনা হয়েছিল তাদের বেশির ভাগই হয় কবরে শুয়েছে নয়ত বিক্রি হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। নানীর কাছের মানুষ কেউ কি আছে এখানে? কোরা গ্রামের সবাইকে মনে মনে খুঁজে দেখল। না, একজনও নেই। সবাই মরে গছে।

একটা গাছে কিছু বিষ-পিঁপড়ে বাসা বেঁধেছে। কোরা সেটা ভেঙে দিল। আর গাছটাও উপড়ে ফেলল। খুব দৃঢ়তার সাথেই কাজটা করল কোরা। তারপর পুঁতে দিল বেশ কিছু লতা আলুর গাছ। উৎসবের দিন যেমন অনড় ছিল তেমনি সাহসিকতার সাথে কোরা এগুলো করে ফেলল।

উটকো এক ঝামেলা এসে জুটল এবার। আভা। কোরার মা আর আভা একই সঙ্গে এই প্লান্টেশনে বেড়ে উঠেছিল। র‍্যান্ডেলে একই রকম অবস্থান ছিল তাদের। তবে, একজনের মনের কন্দরে লুকিয়ে ছিল শ্রেফ শয়তানী। নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য ধান্ধা তৈরিতে কোন জুড়ি ছিল না তার। সব সময় বদ মতলব আঁটাই ছিল আভার কাজ। আভা আর মেবেল তাই একসাথে চলতে পারে নি।

হালকা পাতলা গড়নের আভা বেশ শক্ত সামর্থ্য। দ্রুত হাত চলে তার। দ্রুত তুলো যেমন তুলতে পারে, তেমনি নানা বদকাজেও তার জুড়ি মেলা ভার। তার নজর কোরার ওই এক ফালি জমির উপর। সে ভাবল, তার মুরগি চরার জন্য এটুকু জমি বেশ কাজের হবে। সেখানে সে তার মুরগিঘর বানানোর মতলব আঁটতে শুরু করল। দাঁতে জিভ ঘষতে ঘষতে আভা বলল, “এ জা’গাটা আসলেই কোন কাজের না, বুজলি। তোরা জা’গাটা এমনি এমনি ফেলে রাকিচিস।” আভা আর কোরা পাশাপাশি কুঁড়েয় থাকে। সেখানে আরও জনা আটেক লোক থাকলেও কোরা আভার বদ মতলব ঠিকই ঠাওর করতে পারে। তার বুকভরা বিষ প্রতি নিঃশ্বাসে ঝরে পড়ে। সুযোগ পেলেই আভা হেনস্থ করে কোরাকে।

“তুই তো আগুনের ’পর বসে আচিস রে” এক বিকেলে তুলো বল করার সময় মোজেস কোরাকে বলে। আভার সাথে মোজেসের একটা গোপন কথাবার্তা হয়েছে। কিছু পয়সার লেনদেনও হয়ে থাকবে। কনেলি একজন ওভারসিয়ারের কাছে জমি বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করার পর থেকেই মোজেস আঁড়কাঠি হয়ে বস্তিতে নানা ঘোঁট পাকাতে শুরু করে। কুঁড়েগুলোর যে সারি সেটা বজায় রাখা দরকার। কিন্তু এক শ্বেতাঙ্গের তা পছন্দ নয়। তা দেখে আভার উৎসাহ বেড়ে গেল। কোরা জানে, সে আসলে জিওলের আঁঠার মত পঁচা গাঁদ। কোরা অবাক হয় না। ঝুঁপড়ির দিকে কোরা একটা গুলতি ছুড়ল, যেন কিছু একটা তাড়াচ্ছে। আর কোন অবলম্বন নেই তার। বিচার বলে কিছু নেই এখানে। আইন যখন তখন বদলে যায়।

কার নামে এ ঝুঁপড়ির নাম হব্ রাখা হয়েছিল সে কথা কেউ মনে রাখে নি। এখানে সে হয়ত অনেক দিন আটক ছিল। কেউ কোন অপরাধ করলে ওভারসিয়ার তাকে এখানে রেখে শাস্তি দেয়। পাগল আর কুকুর-বিড়ালের আঁখড়া এখন।

বুড়ো অকর্মণ্য হয়ে গেলে তাদের পয়লা পয়লা এখানে জড় করা হত। তারপর সেখানে এনে রাখা হয় মেয়েদেরও। সাদা কিংবা বাদামী চামড়ার লম্পটরা এখানে মেয়েদের জবরদস্তি ভোগ করে। তাদের বাচ্চা মেয়েরাও রেহাই পায় না। মারধর সাধারণ ঘটনা। কেউ কেউ মরেও যায়। কেউ বা অন্ধকারে মাথা কুটে মরে। তেমন মরে যাওয়া বাচ্চাদের নাম ধরে আজও মায়েরা কাঁদে, ইভ, এলিজাবেথ, ন’থানিয়েল এমন কত হারিয়ে যাওয়া নাম।

কোরা কুন্ডলি পাকিয়ে মেঝেয় শুয়ে। চারদিকে পোকামাকড়। ভয়ে ঘুম নেই। নিজের অক্ষমতাকে নিজেই শাপশাপান্ত করে। নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে অন্ধকার কালো একটা কিছুর দিকে। ফায়ারপ্লেস থেকে আগুনের আভা দেখা যায়, দেয়ালে ঠোকা গজালে একটা বড় ধারালো দা ঝুলছে। জন্ম থেকে এই প্রথম নিজের ঘরের বাইরে অনেক দূরে একটা রাত কাটল তার।

আভা তার মতলব হাসিলে তৎপর। বুড়ো আব্রাহাম তার দোসর। আসলে সে বুড়ো না। কিন্তু লোকে তাকে বুড়ো ডাকে আর মুরুব্বি মানে। আব্রাহামের নিজের এ জমিটুকুর উপর লোভ নেই বটে। কিন্তু সে চায়, এটা না থাকাই ভাল। কোরার নানী নোংরা সাফ সুতরো করে নিয়েছিল বলেই জমিটুকুন তাদের হবে কেন? আজারিকে না হয় সবাই সম্মান করত। কিন্তু এখন তা হবে কেন? বরং এটা নতুন করে ভাগ করা উচিত। এমন মতই অনেকের। আসা-যাওয়ার পথে কোরা অনেকবারই আব্রাহামকে এমন কথা আলোচনা করতেও শুনেছে।

এবার হাজির নতুন একজন, ব্লেক। তরুণ টেরেন্স র‍্যান্ডেল সেবার গরমকালে খামারের দায়িত্ব নেন। তিনি তার ভাইকে নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করেন। ক্যারোলাইনা থেকে তারা কিছু দাস কিনে এনেছেন। দালাল যদি মিথ্যে না বলে থাকে, তাদের মধ্যে ছয় জন ফান্টি আর মেনডিগো উপজাতির। জোয়ান তাগড়া চেহারা জানান দেয় কাজে তারা খুব দড় হবে। ব্লেক, পট, এডোয়ার্ডসহ অন্য ক’জন মিলে র‍্যান্ডেলে তারা এমন জাঁকিয়ে বসল যে মনে হয় তারাই যেন এ তল্লাটের মালিক। টেরেন্স র‍্যান্ডেলও জানিয়ে দিলেন, এরা তার নিজের লোক। আর সবাই যেন তা মনে রাখে সে কথাটা সবাইকে জানিয়ে দেবার দায়িত্ব দেয়া হল কনেলিকে। তারা পথে বের হলে যাবার পথ থেকে সবাই সরে দাঁড়ায়। আর শনিবার রাতে তারা পিঁপে উজাড় করে গিলে আপেল মদ।

বেøক যেন একটা আস্ত ওক গাছ। দু’জনার খাবার একাই খায়। খুব তাড়াতাড়িই সে টেরেন্স র‍্যান্ডেলের এক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সহকারীতে পরিণত হল। এমন কাজের লোকেই তাদের দরকার। তাকে দিয়ে নতুন নতুন বাচ্চা পয়দা করালে লাভ ষোলোআনা। তার সাথে মল্লযুদ্ধে কেউ অবতীর্ণ হলে মুহূর্তে তাকে ধুলায় গড়াগড়ি খেতে হয়। এভাবে অল্পদিনেই সে নিজেকে এক সর্বজয়ী বীর রূপে প্রতিষ্ঠা করে ফেলল। তার বজ্রকণ্ঠ দূর পর্যন্ত সবাই শুনতে পায় আর হুঁশিয়ার হয়ে কাজে লেগে যায়। এক ভয়সঞ্চারী ব্যক্তিত্ব আছে তার। বিশাল বপু থেকে যেন বেরিয়ে আসে বজ্রনির্ঘোষ।

ক’ সপ্তাহ উত্তরের খামারটা ভাল করে দেখেশুনে ব্লেকের মনে হল, তার কুকুরছানা রাখার জন্য কোরার এই ফালিটুকু খুব উপযুক্ত। প্রচুর রোদ, খোলা বাতাস তো আছেই। জায়গাটাও একেবারে তার ঘর লাগোয়া। ঘরের পাশে কুকুরটা বেঁধে রেখে ব্লেক শহরে গেছে। ঘেঁউ ঘেঁউ করে কুকুরছানাটা পুরো জর্জিয়া মাথায় তুলল সারা দিন আর রাতে। ব্লেক কিছু সুতোর মিস্ত্রির কাজ জানে। যেটুকু জানে তাতে তাকে ফাঁকি দেবে এমন কাঠের কারবারি কেউ নেই এ তল্লাটে। কুকুরের জন্য সে একটা ঘর বানাল। বেশ সুন্দরই। কোনদিকে সামান্য কচ নেই, একবারে নিখুঁত আয়তাকার।  কুকুরছানাটার আয়াসের জন্য চেষ্টার কমতি রাখে নি সে। একটা হিঞ্জওয়ালা দরজা, রোদ, চাঁদের আলো আর বাতাসের জন্য পিছনদিকে চমৎকার ছোট ফাঁকও রেখেছে সে।

“তা, কিরাম বানাইচি বল তো এই ঘরডা? খুব সুন্দর না?” বুড়ো আব্রাহামকে জিজ্ঞেস করে ব্লেক । এখানে এসেই ব্লেক বুঝে ফেলেছে আব্রাহামের কদর।

“দারুণ! বেশ একটা শোবার জা’গাও আছে তাইলি?”

ভেতরে খড়কুঁটো ভরে চমৎকার একটা বালিশ সেলাই করেছে ব্লেক এতদিন ব্লেক কোরাকে দেখে নি। কিন্তু এখন কোরাকে দেখতে পাবে। তাকে বলেও দিল, এখন আর লুকিয়ে রাখতে পারবে না নিজেকে।

কোরার মায়ের কিছু দেনা ছিল তাদের পরিচিত কিছু লোকের কাছে। কোরা মায়ের দেনা শোধে ব্যস্ত তখন। কিন্তু তারা সবাই বলল, কোরার মায়ের কাছে তাদের কোন পাওনা নেই। এমনি একজন বিউ। একবার জ্বরে ভীষণ অসুস্থ হয় বিউ। তখন কোরার মা তাকে আপন মেয়ের মত দিনরাত সেবা শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তোলে। নিজে না খেয়ে তাকে খাওয়ায়। বিউ সেটা ভোলে নি। সে বলল, “তুমার মা কজ্জ শোদ করে গেচে।” আসলে কোরার এই দুঃসময়ে সে তার মায়ের সেবার কিছু প্রতিদান দিতে চায়। অন্যরাও একইভাবে বলল, তাদের কোন পাওনা নেই। কোরাকে সবাই ঘরে ফিরে যেতে বলল। প্রফুল্ল কোরার মনে হল পাশেই কেলভিনের সাথে দেখা করবে সে। একবার তার মা কেলভিনকে কিছু যন্ত্রপাতি চুরির অভিযোগ থেকে বাঁচিয়েছিল। কেলভিনের বিরুদ্ধে আনা সে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কনেলি তার সাতছড়ির চাবুক মেরে কেভিনের পিঠের চামড়া তুলে নিত। মেবেল সাক্ষ্য দিয়েছিল যে, সে কখনও কেলভিনকে চুরি যাওয়া কোন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে দেখে নি। ফলে শাস্তি থেকে বেঁচে যায় সে। রাতে খাওয়ার পর কোরা কেলভিনের সাথে দেখা করতে গেল। কিন্তু কেলভিন সে মর্যাদা রাখল না। কেলভিন তাকে দরজা থেকেই দূর দূর করে বিদায় করে দিল। খুব কষ্ট পেল কোরা।

অল্প ক’দিনের মধ্যেই ব্লেক তার ইচ্ছেটা জানান দিল। সকালে উঠে কোরা দেখল ব্লেক জায়গাটা দখলে নিয়েছে। শীতের সকাল। এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকা গোছা গোছা চুলে পড়া শিশির ঝিকমিক করছে। নতুন পাতাকপি সব কেটে সাবাড়। সেগুলো ব্লেকের ঘরের পাশে জড়ো করে রাখা। ভূঁইতে মুথা ছাড়া আর কিছু নেই। জায়গাটা কুকুরের ঘরের জন্য যেন তৈরি এখন। কুকুরের জন্য বেøক যে ঘরটা বানিয়েছে সেটা জমির মাঝখানটায় রাখা। পুরো খামারের মাঝখানে যেন গৌরব ঘোষণা করছে এক ‘সারমেয় প্রাসাদ’।

মাথা বের করে সারমেয় রানী নিজের রাজসিক অবস্থান ঘোষণা করছে। স্থানটা যেন তার কত কালের পরিচিত। কোনদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। ব্লেক তার ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

লোকজনের মধ্যে নানা গুঞ্জন চলছে। কেউ দেখাচ্ছে দরদ, কেউ বা মজা দেখছে। ভেঙচি দেয়ার লোকেরও অভাব হল না। মা নিখোঁজ। তার পাশে দাঁড়ায় এমন কেউ নেই। সাহায্যে কেউ এগিয়েও এলো না। সবাই দূর থেকে মজা দেখছে। কোরার চেয়ে তিন গুণ শক্তিশালী ব্লেক । তাকে ঘাটাবে কে?

কী করা উচিত? কোরা গভীরভাবে ভাবছে। একটা পরিকল্পনা করার চেষ্টা করছে সে। এর আগেও সে নানা ঝামেলা সামাল দিয়েছে। এই হবের মেয়েদের সাথে, আভার সাথে। নানী প্রায়ই বলত, কেউ যদি এ জমির দিকে হাত বাড়ায় সে তার মাথার খুলি উড়িয়ে দেবে। সেটাই ঠিক করল কোরা। এক দৌঁড়ে কুঁড়েয় ফিরে গেল সে। তারপর দেয়াল থেকে হাতে তুলে নিল ধারালো বড় দাখানা। ক’দিন আগে যখন তার ঘুম আসছিল না দেয়ালে এই বড় দার দিকেই তাকিয়ে ছিল সে। কাউকে গ্রাহ্য না করে নিজের জমিতে ছুটল কোরা। ততক্ষণে চারদিকে এসব খবর ছড়িয়ে গেছে। অনেকেই জড় হতে শুরু করেছে। পথ দিয়ে যারা যাচ্ছিল থেমে গেল তারাও। সকলের মধ্যে কী হয়, কী হয় ভয়। সবাইকে পাশ কাটিয়ে প্রচণ্ড ঘূর্ণীর মত ঘুরে দাঁড়ালো কোরা। বুকে তার আগুন জ্বলছে। তার গতি রোধ করতে কেউ সাহস পেল না। এমন দুর্জয় মনোভাব আগে কেউ দেখে নি তার। প্রথমেই সে এ কোপে উড়িয়ে দিল সারমেয় প্রাসাদের ছাদটা। ঘেউ ঘেউ করে লেজ গুটিয়ে কুকুরটা ঢুকে পড়ল নিজের ঘরের মধ্যে। এবার এক কোপে কোরা ধসিয়ে দিল বা’পাশের দেয়ালটা, আরেক কোপে পুরো সারমেয় প্রসাদ ধ্বংস হয়ে গেল।

সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল কোরা। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। দুই হাতে ধরে আছে দাখানা। মাথার উপর দাখানা তুলে বাতাসে কয়েক পাক দিয়ে জানিয়ে দিল ভয় পাবার মেয়ে সে নয়। চোখেমুখে তার আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।

মুষ্টিবদ্ধ হাতে ছুটে এলো ব্লেক । সোজা কোরার দিকে। পিছে পিছে তার সাঙ্গাত ছোকরাগুলো। উত্তজনা চরমে। হঠাৎ থেমে গেল ব্লেক । কী হলো? বিপুল বপুর সুঠাম এক পুরুষ আর শীর্ণদেহী যুযুধান একনারীর মধ্যে কী ঘটল কেউ তা বুঝল না। যারা কিছুটা কাছ থেকে দেখছিল তারা দেখল কী এক অনির্বচনীয় ভয়ে মুহূর্তে শুকিয়ে ব্লেকের মুখ। একটা ক্ষিপ্ত ভীমরুল চাকের সামনে যেন কেঁপে উঠল তার বলশালী দেহখানা। নতুন কুঁড়ের সারির পাশে যারা দাঁড়িয়েছিল তারা দেখল, কোরার চোখ দিয়ে আগুনের ফুলকি ছুটছে, যেন সে একজন নয়, জয় করতে চলেছে এক বিশাল বাহিনীকেই। সে বাহিনী যত বড়ই হোক কোরা তা তোয়াক্কা করে না। জয়ের দুর্নিবার নেশায় মত্ত কোরা। স্থির প্রতিজ্ঞ, “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী!”

সকালের নাস্তার ঘন্টা বাজাল এলিস। না খেয়ে এসব দেখে লাভ নেই। সবাই ছুটল খাবারের জন্য। দিনের কাজ শেষে ফিরে সবাই দেখে পরিস্কার করে জায়গাটা আখের ছোবড়া দিয়ে ঘিরে কোরা নিজের দখল কায়েম করেছে।

আভা বলার আগে জায়গাটা নিয়ে কোরা তেমন কিছু কখনও ভাবে নি। কিন্তু এখন সে বুঝেছে এই ফালিটুকু কত দামী। ক্ষমতাধরেরা অনেককেই ঠকিয়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে পানির দামে সব বিক্রি চলে গেছে অন্য কোথাও। কিন্তু কোরাকে কেউ আর ঘাটায় নি। হবেই আছে কোরা। ফালি জমিটুকু কোরারই রয়ে গেছে।

ভগ্ন সারমেয় প্রাসাদটি এখন কোরার লাকড়ি রাখার ঘর। সেদিনের ঘটনা কিংবদন্তি হয়ে আছে। র‍্যান্ডেল খামারে সবাই সে গল্প বলাবলি করে। ব্লেক, তার সাঙ্গাতরাও। ব্লেকের মনে পড়ে, সে তখন ঘুমাচ্ছিল। ঘরটা ভাঙার শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে এসে দা হাতে কোরার রুদ্রমূর্তি দেখে হতবাক হয়ে যায় ব্লেক । ব্লেকের সবচেয়ে বড় মাস্তান এডোয়ার্ড। সে একবার কোরাকে বাজে ইঙ্গিত করেছিল। কোরা বুক টান করে দাঁড়ায়। জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বুক ফুলিয়ে এগিয়ে গিয়ে একটানে তার জামা ছিঁড়ে ছুড়ে ফেলে। সঙ্গে গর্জে উঠে বলে, “আয় দেখি, কত হিম্মত! এবার তোর মুণ্ডু উড়িয়ে দেব।” এডোয়ার্ড সে কথা ভোলে নি। অনেক মেয়ে এমন গল্পও বলে যে, চাঁদনী রাতে কোরা নাকি একা একা গভীর জঙ্গলে গিয়ে বুনো ছাগল আর বানরের সাথে খেলা করে। এ গল্পটা যারা বলে তারা আসলে তাকে পিশাচ রূপে বর্ণনা করে তাকে এড়িয়ে চলতে চায়।

তিন বছর পর। কোরা তখন পূর্ণ যৌবনা। এডোয়ার্ড, পট এবং দক্ষিণ খামার থেকে আরও দু’জন মিলে তাকে জোর করে ধরে ধূমঘরের পিছনে বলাৎকার করে। কেউ জানতে বা শুনতে পেলেও তাকে রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসত না। তার উপর এমন অত্যাচার করে যে বেশ কয়েকটা সেলাই দিতে হয়েছিল তাকে। একটা মেয়ে সেলাইগুলো করেছিল। ব্লেকের কথামত চেলারা এভাবে বদলা নেয়। কুকুরঘর কাণ্ডের দিন তার রুদ্রমূর্তি দেখে ব্লেক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল, একদিন সে শোধ নেবেই। প্রতিশোধ নেবার পর সে কয়েক সপ্তাহ জলায় লুকিয়ে ছিল। কুকুরের ডাকে টের পেয়ে টহলদাররা তাড়া করলে সে পালিয়ে যায়। (চলবে)

 

আমিরুল আলম খান 

জন্ম যশোর জেলার ভারতীয় সীমান্তলগ্ন শিববাস গ্রামে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ১৫ই অগ্রহায়ণ।
পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে যুক্ত থেকেছেন। যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পরে চেয়ারম্যান ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি অপেশাদার সাংবাদিকতায় যুক্ত গত পাঁচ দশক ধরে। ইংরেজি দৈনিকে নিউ নেশান-এ প্রায় এক দশক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, বণিক বার্তায় কলাম লেখেন।

গ্রামীণ পাঠাগার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে গ্রামোন্নয়নের নতুন মডেল ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম গণপাঠাগার যশোর পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষা, ভাষা, প্রকৃতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থানবিদ্যায় আগ্রহী। এসব নিয়েই তার বই: বাঙলার ফল, অরণ্যের পদাবলী, পারুলের সন্ধানে, কপোতাক্ষ-মধুমতীর তীর থেকে, বিপর্যস্ত ভৈরব অববাহিকা, পারুল বিতর্ক, বাংলাদেশের শিক্ষার স্বরূপ সন্ধান এবং বিদ্যাবাণিজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি।

তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: আফ্রিকান-আমেরিকান উপন্যাস দি স্লেভ গার্ল। হ্যারিয়েট অ্যান জেকব রচিত এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি বোস্টন থেকে প্রকাশিত হয় ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব এ স্লেভ গার্ল শিরোনামে, ১৮৬১ সালে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।