শান্তা মারিয়ার ভ্রমণগদ্য: বিশ্বের বিস্ময় সামার প্যালেস

বিশ্বে মানুষের তৈরি যত সুন্দর স্থান আছে তার মধ্যে অন্যতম সেরা হলো বেইজিং এর সামার প্যালেস। কথাটি একা আমার নয়। ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় এই নাম রয়েছে এবং দেশবিদেশের বিশেষজ্ঞরা সেটা জানিয়েছেন।

চীন সম্রাটের এক স্ত্রী অনেকদিন ধরে বাপের বাড়ি যেতে পারেন না। বারে বারে আবদার করেন সম্রাটের কাছে। বলেন, একটিবারের জন্য হলেও নিজের জন্মস্থানে ফিরতে চান তিনি। দেখতে চান সেখানকার চির পরিচিত পথ, নদী, নদীর ঘাট। কিন্তু অনুমতি মেলে না। কারণ তার জন্মস্থান রাজধানী থেকে বহু দূরে। যেতে অনেক দিন লাগবে। অতদিনের জন্য প্রিয়তমাকে কাছ ছাড়া করতে চান না সম্রাট। বহু অনুনয়ের পর অনুমতি মিলল। রানীকে নিয়ে রওনা হলো পালকি। অল্প কিছু দূর গিয়েই দেহরক্ষীদের সর্দার বললেন, ‘নামুন রানীমা, আমরা পৌঁছে গিয়েছি।’ চমকে উঠলেন রানী। সেকি এত তাড়াতাড়ি কিভাবে পৌছালাম সেই দূর শহরে?

পালকি থেকে নামলেন রানী। সামনে তাকিয়ে বিস্ময়ে থমকে গেলেন তিনি। এই তো তার পরিচিত নদীর ঘাট। নদীর তীরে শানথাং রাস্তার পরিচিত দোকানের সারি। সেখানে যারা চলাচল, কেনাবেচা করছে, তারা কথাও বলছে তার জন্মস্থানের আঞ্চলিক ভাষায়। কিন্তু এটি তো তার জন্মস্থান নয়।একি অবাক করা ঘটনা। সুদূর সুচৌ শহরের একটি অংশ কি তবে মন্ত্রবলে হাজির হলো এখানে? হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন সম্রাট। প্রিয়তমার জন্য এটি হলো তার উপহার। রাজ আদেশে সুদক্ষ কারিগররা হুবহু গড়ে তুলেছে সুচৌ শহরের একটি অংশ সানথাংচিয়ে। সেই একই রকম নির্মাণ শৈলী, একই রকম নদীর ঘাট। আর এসব দোকানে কেনাবেচার জন্য লোক নিয়ে আসা হয়েছে সুচৌ থেকে।

বেইজিংয়ের বিখ্যাত সামার প্যালেস পার্ক এর একটি অংশে এখনও রয়েছে সেই সুচৌ স্ট্রিট বা সুচৌ চিয়ে। সামার প্যালেস পার্কে বেড়াতে গিয়ে গল্পটি পড়লাম সেই সুচৌচিয়ের সামনের ফলকে। গল্পটা আমার মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। একবার মনে হয়েছিল সম্রাট খুব প্রেমিক। প্রিয়ার জন্য বহু অর্থব্যয় করে তিনি এমন অভিনব উপহারের আয়োজন করেছেন। আবার মনে হয়েছিল এটা উপহার নয়, একটা নিষ্ঠুর কৌতুক মাত্র। সম্রাটের ‘প্রিয়া’ নামের আড়ালে এক বন্দিনী নারী ফিরতে চাচ্ছে তার জন্মভূমিতে, দেখতে চাচ্ছে তার শৈশবের ফেলে আসা স্থান। আর তাকে এই ‘উপহার’ দিয়ে কৌতুক করছেন নিষ্ঠুর সম্রাট।

সামার প্যালেস পার্কের বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে রয়েছে এমন অনেক কাহিনি। সামার প্যালেস হলো বেইজিংয়ের একটি অন্যতম প্রধান পর্যটন স্থান। বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা একটি পার্ক। ২.৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা এই পার্কে রয়েছে লেক, দ্বীপ, পাহাড় ও অনেকগুলো প্রাসাদ। ‘লংজিভিটি হিল’, ‘কুনমিং লেক’, গ্রীষ্ম প্রাসাদ, হল অফ ক্লাউডস, লং কোরিডরসহ অনেকগুলো স্থাপনা রয়েছে এখানে। পাহাড় ও লেক দুটোই মানুষের তৈরি। লেক খুঁড়ে যে মাটি বের হয় তা দিয়েই তৈরি হয় পাহাড়টি। সামার প্যালেসের প্রথম স্থাপনা নির্মিত হয় ‘চিন রাজবংশে’র সময় ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দে। এরপর ইউয়ান, মিং ও ছিন রাজবংশের সময় গড়ে ওঠে বিভিন্ন স্থাপনা। এসব তথ্য অবশ্য নেট ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। আমিও ট্রাভেল চায়না, উইকিপেডিয়া আর অন্য কয়েকটা সাইট ঘেঁটে সামার প্যালেস দেখতে যাবার জন্য কোমর বাঁধলাম।

২০১১ সালে চীনে আসার পর থেকেই সামার প্যালেসের নাম শুনছি। আমার থোংউ বা রুমমেট আগাথা সামার প্যালেস ঘুরে এসে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছিল। পোল্যান্ডের নাগরিক আগাথা বড়ই কঠিন মনের মেয়ে। সহজে বিগলিত হয় না। সে যখন এতটা প্রশংসা করছে তখন তো দেখতে যেতেই হয়। অতএব এক ছুটির দিনে আমি যাত্রা করলাম ইহেইউয়ান বা গার্ডেন অব প্রিসারভিং হারমনি ওরফে সামার প্যালেস পার্কের উদ্দেশ্যে।

গ্রীষ্মের সকাল। পার্কে খেলা করছে শিশু রোদ্দুর। বিশাল পার্কের ভিতর ঢুকে রীতিমতো খেই হারিয়ে ফেলার অবস্থা। বুঝতে পারছিলাম একদিনে পুরোটা দেখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রথমে তাই পা বাড়ালাম কুনমিং লেকের দিকে। যেতে যেতেই দেখে নিলাম কয়েকটি ছোট খাটো প্রাসাদ আর ভাস্কর্য।

লেকের তীরে দারুণ বাতাস। যেন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ইচ্ছা হয় বসে থাকি ঘন্টার পর ঘন্টা। কিন্তু টাকা দিয়ে টিকেট কাটতে হয়েছে। সবটা না হোক কিছু জিনিস তো দেখতেই হবে। লেকের পানিতে ছায়া পড়েছে লংজিভিটি হিল ও তার উপরে স্থাপিত প্রাসাদের। এই পাহাড়ের উপর মন্দির রয়েছে। মন্দিরটির নাম টাওয়ার অব বুদ্ধিস্ট ইনসেনস।এগুলো সব মিং রাজবংশের আমলে তৈরি। মিং সম্রাটদের শাসনামলে চীনের শিল্পকলা ও স্থাপত্য চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল। সেই সঙ্গে অবশ্যই বিলাসিতার পরাকাষ্ঠাও দেখা গিয়েছিল।
২০০ ফুট উঁচু পাহাড়। সিঁড়ি রয়েছে চূড়ায় ওঠার জন্য। এই পাহাড় ছাড়াও এই পার্কের মধ্যে আরও অনেকগুলো পাহাড় রযেছে। সবগুলোর চূড়াতেই রয়েছে নানা রকম প্রাসাদ ও মন্দির। এখানকার কয়েকটি প্রাসাদে গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতেন সম্রাটরা। সেই সঙ্গে কোনো কোনো প্রাসাদে বসতো গ্রীষ্মকালীন দরবার। পাহাড়ের চূড়ার মন্দিরে পৌছালে পুরো এলাকাটি দেখা যায়, অসাধারণ সুন্দর সেই দৃশ্য।

সামার প্যালেসের লং কোরিডরও একটা দেখার মতো স্থাপনা। ৭২৮ মিটার দীর্ঘ আঁকা বাঁকা কোরিডর চলে গেছে বাগান ও লেক ঘেঁষে এক প্রাসাদ থেকে আরেক প্রাসাদে। কাঠের অপূর্ব কারুকাজ করা কোরিডরে স্থাপন করা আছে ভাস্কর্য ও পেইন্টিং। রয়েছে বসার ব্যবস্থাও। কুনমিং লেক ছাড়াও সামার প্যালেসের পার্কে রয়েছে বেশ ক’টি লেক। একটিতে অসংখ্য পদ্মফুল শোভা পাচ্ছে। গৌতম বুদ্ধের প্রিয় পদ্মফুল। তাই চীনের অধিকাংশ বৌদ্ধ মন্দির ও প্রাসাদ সংলগ্ন লেকে এই ফুলের শোভা দেখা যায়।

এখানে একটি লেক থেকে অন্য লেকে যাবার জন্য পাথরের কারুকার্যময় সেতু রয়েছে। কুনমিং লেকের মধ্যে রয়েছে একটি দ্বীপ। দ্বীপটির নাম নানহু আইল্যান্ড। সেখানেও রয়েছে প্রাসাদ। দ্বীপের ভিতর সেই প্রাসাদের বারান্দায় বসে মনে হয় স্বর্গ বোধহয় এখানেই। লেকে ভেসে বেড়ানোর জন্য রয়েছে রাজকীয় মার্বেল বোট। এটিও শিল্প নৈপুণ্যের এক অসামান্য কীর্তি।

প্রতিটা প্রাসাদ, হল, মন্দির কাঠের ও পাথরের অসাধারণ সুন্দর কারুকাজে শোভিত। ভাবতে অবাক লাগে কত বছরের কত কারিগরের শ্রমে ঘামে এমন সুন্দর শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব। চীনের সম্রাট কত সম্পদশালী ছিলেন সেটাও বোঝা যায় এসব স্থাপনা দেখলে। চীনা শিল্পী ও কুশলীদের নৈপুণ্য ও সৃষ্টিতে সর্বদাই আমি অপরিসীম বিস্ময় বোধ করি। সামার প্যালেস দেখে সে বিস্ময় আরও বাড়ছিল। আরও ভাবছিলাম জীবনকে ভোগ করার কত বিলাসী আয়োজন, প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে মানুষের রুচিবোধের সমন্বয় কত সুষমভাবে করা হয়েছে এ্খানে। সাধে কি আর বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম সুন্দর স্থাপনা হলো বেইজিংয়ের সামার প্যালেস!

সকালের রোদ এর মধ্যে মিলিয়ে এসেছে বিকেলের মেঘলা আকাশে। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ছোট ছোট টিলা পার হয়ে গেলাম সুচৌও চিয়েতে যার কথা লেখার শুরুতেই বলেছি।

সুচৌচিয়ের একটি দোকানের সামনে কাঠের বারান্দায় বসে জলাশয়ের বুকে জলপতনের খেলা দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম সেই দুঃখিনী রানীর কথা। কত বিলাস, কত প্রেম, কত হাহাকার ঘিরে ছিল রাজপ্রাসাদের সেই সব মানুষদের!

কিন্তু এত কথা ভাবলে চলবে না। ফিরতে হবে একুশ শতকের ব্যস্ত জীবনে। তাই পার্কের ভিতর দিয়ে হেঁটে ফিরে চললাম । এখান থেকে বেরিয়ে তো আবার সাবওয়ে স্টেশন খুঁজতে হবে।

 

শান্তা মারিয়া

২৪ এপ্রিল, ১৯৭০ ঢাকায় জন্ম।
ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় নারী নেতৃত্ব বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।

১৯৯৭ সালে দৈনিক মুক্তকণ্ঠে সাংবাদিকতা শুরু। এরপর জনকণ্ঠ, আমাদের সময়, রেডিওআমার ও চীনআন্তর্জাতিক বেতার এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম-এ সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ আমাদের সময় পত্রিকায় ফিচার এডিটর পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে চীনের ইউননান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার শিক্ষক। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটসহ মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে পেপার উপস্থাপন করেছেন। কবিতা, গল্প ও ভ্রমণকাহিনি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। এ পর্যন্ত ৫টি কাব্যগ্রন্থসহ ১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, চীন, ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল এবং বাংলাদেশের প্রায় সবক’টি জেলায় ভ্রমণ করেছেন। জ্ঞানতাপস ভাষাবিদ ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পৌত্রী ও ভাষাসৈনিক এবং বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী মুহম্মদ তকিয়ূল্লাহর কন্যা। ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। মিথোলজি ও ইতিহাসপাঠ শান্তা মারিয়ার প্রিয় নেশা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।