নান্নু মাহবুবের একগুচ্ছ কবিতা

দুপুরের ঘনরোদে তোমায় আর পাব না

আমি জলাধার, জলটুকু তুমি।

লাল জেলিমাছের মতো ভাসছে প্রহর,
পেতলের সূর্য থেকে ছড়িয়ে পড়ছে আলো,
এ গ্রহের প্রত্যেকটি পাতায়, প্রত্যেকটি টুকরোয়
আমি দেখতে পাচ্ছি তোমায়।

আমি জলাধার, জলটুকু তুমি।
গোপন বৃষ্টির মতো আমি ধরে আছি তোমায়,
অজস্র জলের ফোঁটায়।

 

পফু

পফু এক ভালো লোক।
সে সারাদিন সোয়েটার পরে থাকে।
লোকে তাকে ইঞ্জিনিয়ার বলে ডাকে।

তার বাড়ির সামনে দিয়ে এক হাইওয়ে চলে গেছে।
সে একদিন টের পায় সেই কালো পতঙ্গটি
ছোট হয়ে গেছে এই হাইওয়েটির জন্যেই!

সে আর তার ছেলে ডিম পফু, ২৪ দিন মাটি
ফেলে ফেলে ঢেকে দেয় সেই হাইওয়ে, দিগন্ত অবধি।

কালো পতঙ্গটি আবার আগেকার মতো হয়ে ওঠে।

 

হাত

সেই গল্পটাতো সবারই মনে আছে।

সেই যে কাটাখালি থেকে ফিরছিলাম গভীর রাত্তিরে সিনেমা-টিনেমা
দেখে আর দীর্ঘ নির্জন রাস্তায় রিক্সাটা প্রায় ঝড়ের মতো উড়িয়ে নিয়ে
আসছে আর আমি ভাবছি এত দ্রুত কীভাবে যাওয়া সম্ভব আর
প্যাডেলে চোখ পড়তেই দেখি সেগুলো ঘুরছে বনবন করে প্রায় একটা
গোলাকার ঘূর্ণির মতো। ভালো করে ঠাহর করে দেখি প্যাডেল
ঘোরাচ্ছে দুটি ঘোড়ার পা, আশ্চর্য সহজে, আর তার কালো কালো
খুরের আভাসও দেখা যাচ্ছে।

মধ্যরাত্রিতে শের-ই-বাংলা হলে পৌঁছে টাকা-আধুলি মিলিয়ে
ভাড়া দিতে গিয়ে দেখি তিনি যে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন সেটাও
ওই ঘোড়ারই হাত।

আতঙ্কে অস্থির আমি হলগেটে পৌঁছে দেখি চাদর মুড়ি দিয়ে
গুটিসুটি বসে-থাকা বৃদ্ধ মামা একাকী ঝিমুচ্ছেন আর আমার
শব্দ শুনে উঠে এসে নির্বিকার যে হাতটি তিনি বাড়িয়ে দিলেন
সেটাও দেখি অবিকল একটি ঘোড়ারই হাত। খুর-টুর সবই রয়েছে!

তারপর এতকাল কেটে গেছে। গল্পটা যাকেই বলছি সে-ই তার
হাতটা বাড়িয়ে দিচ্ছে আর আমি ভীষণ অবাক হয়ে দেখছি
তাদের সবারই হাত অবিকল সেই রিক্সাচালকের মতোই।

 

আমার এলিজি

কেন তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে
এই দুঃখ আমাকে ছাড়ে না

জলের গভীরে দ্যাখো ভাসছে জাহাজ
মগ্ন ফিতার মতো উড়ে যাচ্ছে প্লেন আদিগন্ত নীলে
হলুদ ফুলের ওপর এসে বসছে তরতাজা মৌমাছি
সোনার বিন্দু দ্যাখো গেঁথে আছে ঘাসের ডগায়

কেন তুমি
কেন তুমি
কেন তুমি
এই দুঃখ আমাকে ছাড়ে না

 

মারি ও মড়কে

আমরা আমাদের ভালবাসার কথা গোপন রাখতে চাইলাম, কিন্তু
বাদ সাধলো তার হুহুংকার হাসি, আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে
সে গান গাইল আর সে গানের অর্থ হলো, গান গাও, গান গাও আর
প্রকৃতিকে বলো, বেশ তো চলছিল, মারি ও মড়কেও তুমি বেশ্যার
দঙ্গলের দেখা পেয়ে উৎফুল্ল হওনি কি? এই তো বাওড়, শাপলার
অবারিত ক্ষেত, বিপুল সূর্যদেবতা তোমাকে দেখে আশ্চর্য হয়নি কি?
সেই লীলা তুমি শহর ও লোকালয়ের প্রান্তর ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখনি কি?

লেলিহান শিখার মতো প্রজাপতি নিরঙ্কুশ শূন্যতায় অতিমগ্ন একাকীত্বে
একাকী উড়ছে তার প্রলম্বিত পথে, ধানশালিকের দেশে তুমি দেখনি কি
শৈবালের অকথ্য অত্যাচার? তারপরও তুমি তার মুখ চেয়ে কেঁদেছ
একাকী, নিরালায়, চুপিচুপি, অবিকল শৈশবের প্রথম প্রেমের মতো।

 

গ্রেভইয়ার্ড

গ্রেভইয়ার্ডে গেলেই তুমি দেখতে পাবে একজোড়া
নারী ও পুরুষ প্রস্তরবৎ দাঁড়িয়ে রয়েছে।

নারীটির হাতে একটি বোতলভর্তি রজনীগন্ধা আর
পুরুষটির ক্যাম্বিসের জুতোর ওপর বিশ্বকর্মার
লাল বল ড্রপ দিচ্ছে।

বোতলের কী স্নিগ্ধ রং! সবুজাভ তার কাচের ভেতর
গ্রেভইয়ার্ডের নীল মায়া কেবলই স্থির হয়ে আছে।

 

উৎসব

মদ খেয়ে পড়ে আছি।
শাপলা শালুক তোলা হলো কত!
রঙিন বেলুন দেখেছিল সে মানুষের মেলায়।
জলের ওপরে জলচৌকি, তার ওপর সিন্ধুঘোটক।

কী উৎসব! কী উৎসব!

মদ খেয়ে পড়ে আছি অবেলায়।
চারিদিকে উৎসবের জোয়ার উঠেছে।

 

করোনার দিনে

অদ্ভুত সকাল এক পৃথিবীতে আসিয়াছে আজ।

গোলাপি ডলফিনেরা তাদের
কৃষ্ণ ভাইবোনদের সাথে উঠে এসেছে সৈকতে।
এ সৈকত এখন তাদের।

আকাশ খুব নীল। নীল আকাশ তার ক্ষতগুলো
সারিয়ে নিচ্ছে রোদ্দুরে।

সারারাত পাখি ডেকেছে।
আজ সারি সারি কফিন যাবে ক্ষুদ্র কবরালয়ে।

মানুষের রাস্তাঘাট, নীলজট,
সব বন্ধ হয়ে গেছে।

মাছি একা ওড়ে, ক্যাথিড্রাল ঘিরে ঘিরে।

 

ব্রাত্য রাইসু

আর ব্রাত্য রাইসু আপনাকে দেখলেই আমার মনে হয় নির্জন হাইওয়ের
ধারে একটা সুন্দর বাস দাঁড়িয়ে আছে আর তার ভেতরে আরো দু-একজনের
সাথে আপনি বসে আছেন আর সামনে ছায়া ছায়া আরো দু-একটা বাস দাঁড়িয়ে
আছে আর আপনার খুব হিসি পেয়েছে আর আপনি বাস থেকে নেমে বাসের
পেছনে আদিগন্ত ধানক্ষেত-প্রান্তরের ধারে দাঁড়িয়ে হিসি করতে পারছেন না
কারণ কখন বাসটি ছেড়ে দেয় কখন বাসটি চলে যায় আর টেকনাফে যে
পঙ্গপাল দেখা গেছে সেগুলো পঙ্গপাল নয়, বড় বড় ঘাসফড়িঙ, আর এই
কবিতাটির একটা ছবি তুলে রাখব ভেবে চৌরাস্তায় অজন্তা স্টুডিওর কাছে এসে
দেখি ভেজা ভেজা অন্ধকারে সব বন্ধ আর আশ্চর্য, অন্যসব দোকানপাটও সব
বন্ধ আর তখনই আমার মনে পড়ে এখন লকডাউন চলছে তবু রাস্তায় অনেক
লোকজন, আর কেউ কেউ গা-ঘেঁষাঘেঁষি করেও চলছে এবং তখন আমি ফোন
বের করে আমার বুড়ো বন্ধু দীপুকে ফোন দেই, যে বন্ধু কিছুদিন আগে আবার
পাণিগ্রহণ করে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকে আর ফোন করলেই ছুরি ছোড়াছুড়ির
মতো মহাজটিলতা করে আর কিছুতেই কিছু বোঝা যায় না।

তখন আমি পাভেলকে ফোন করি, পাভেল বেশ দয়াপরবশ হয়ে, ঝুঁকি নিয়ে,
তাঁর বাসায় আসতে বলে এবং আমি হেঁটে হেঁটে অস্থির রাস্তায় রিকশা নেব
কি না, রিকশায় ওঠা নিরাপদ হবে কি না ভাবতে ভাবতে আবার সেই রাস্তাতেই
ফিরে এসে দেখি ড্রেনের পাশে কালভার্টের ওপর তরকারির দোকানে বেশ বড়
বড় বিলম্বির মতো কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে আর সেখানে ধনে পাতাও আছে আর
কাছে গিয়ে দেখি স্বাস্থ্যবান পেঁয়াজের কলিও রয়েছে বেশ সস্তা। মনে পড়ে
ছোটবাবু এগুলোই চেয়েছিল তাই খুশি হয়ে সেগুলো কিনতে গেলে একটা দুঃস্থ
মেয়েও সেই দোকানের দিকে এগিয়ে আসে আর একটা মোটাসোটা টোকাই
ছেলে বারবার গায়ের ভেতর চলে আসে আর আমি ভয়ে ভয়ে ‘সামাজিক দূরত্ব’
বজায় রাখতে তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সবজি-টবজি কিছু না কিনেই আবার
আধো-অন্ধকারে ইতিমধ্যে ভাইরাস-আক্রান্ত হলাম কি না ভাবতে ভাবতে
চৌরাস্তার ভিড়ভাট্টার ভেতর গলিপথে হারিয়ে যাই।

 

রঙধনু

আজ ইংরেজী পরীক্ষা। কাল বাংলা ছিল। ভালোই লিখেছি।
সবই বানিয়ে বানিয়ে লিখেছি। আজ যে কী লিখব জানি না।
সিলেবাসে কী ছিল তাও জানিনা। মাঠের ভেতর সারি সারি
গোলগাল এলোমেলোভাবে পাতা বেঞ্চ, ছাত্ররা প্রায় সবাই
বসে গেছে, তার মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে, নিজের সিট খুঁজতে খুঁজতে
এইসব ভাবছি। একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম আমার
সিটটা কোথায় হতে পারে। সে বেশ স্মার্ট আর লক্ষ্মীর মতো
দূরে একটা প্রায়-খালি বেঞ্চ দেখিয়ে দিল। একটা ছোট গাছের
নিচে অ্যাডমিট কার্ড-টার্ড নিয়ে এক তরুণ টিচার বসে আছে।
ভাগ্য ভালো— আমার কার্ডটা দেখি সবার ওপরেই রয়েছে।
ভাবছি কীভাবে দেওয়া যায় আজকের পরীক্ষাটা। বানিয়ে
বানিয়ে লিখতে পারব না? দেখি দুটো মেয়ে আছে আমার
পেছনের বেঞ্চে। ওদের একজনের খাতা দেখে দেখে লিখে
দেব নাকি?

মাঠটা একটা শহরের মধ্যে। শহরের পার্ক-টার্ক যেরকম হয়
আরকি! পাশেই বড় রাস্তা। হর্ন দিতে দিতে বেশ কিছু
গাড়ি-টাড়ি চলে যাচ্ছে। তার ওপাশে বিশাল বড় বড় সব
শপিং কমপ্লেক্স। সেদিকে তাকাতেই দেখি আকাশজুড়ে
বিশাল বিশাল দুটো রঙধনু উঠেছে। না, দুটো না তো, তিনটে,
না তিনটে না, চারটে, পাঁচটা। একি কাণ্ড, কেউ তো খেয়ালই
করছে না!

বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে আমি রঙধনুগুলো ভালো করে দেখার
চেষ্টায় রাস্তার দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াই। রঙধনু তা হলে
খুব কাছ থেকে এরকম হয়! শুরু হয়েছে আমাদের কাছের
ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে আর বিশাল আকাশ ছুঁয়ে দিগন্তের
ওপারে চলে গেছে। খুব স্পষ্ট। শেষ প্রান্তগুলো একটু অস্পষ্ট।
হিমেল কুয়াশার মতো নয়। উজ্জ্বল হালকা হলুদ, পেস্ট, লাল,
কমলারঙের অর্ধবৃত্তাকার বারগুলো আমাদের পাশ থেকেই
উঠে গেছে। একটা কম পাতাঅলা ঝোপালো গাছের ভেতর
থেকে কয়েকটা উঠেছে। কী কাণ্ড! কী কাণ্ড! কয়েকটি
ইঞ্চিআস্টেক বার রঙধনু হতে গিয়ে থেমে আছে গাছের ভেতর।
আমি একটা রঙধনুর টুকরো হাতে উঠিয়ে নিলাম।
পেস্ট কালারের। বেশ বরফঠাণ্ডা, তবে খুব ঠাণ্ডা নয়। হালকা,
অনেকটা ভারি শোলার মতো। হাতে নিতেই আকৃতি পাল্টে,
কমে যেতে লাগল। যেন অদৃশ্য বাতাসে অদৃশ্যে লীন হয়ে যাচ্ছে।

লাকি আর বাবুনির মিশ্র চেহারার একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
দেখছিল। আরও ছেলেমেয়েরা তাকিয়ে ছিল। আমি মিশ্র চেহারার
মেয়েটির হাতে পেস্ট কালারের টুকরোটা দিতেই মেয়েটি বলল,
“রঙধনু আবার হাতেও নেওয়া যায়!”

 

 

নান্নু মাহবুব

জন্ম: ১১ জুন, ১৯৬৪, যশোর। লেখালেখির শুরু ৮০’র দশকে।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ: রাত্রিকালীন ডাকঘর (প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৫)
দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ: পুনরুত্থিত শহর (প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০০৫)
তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ: আজ কী ফুল ফুটিয়েছো, অরণ্য? (প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০১৩)

প্রতিভাস, কোলকাতা থেকে শিঘ্রী প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তাঁর ইউ জী কৃষ্ণমূর্তির
সাক্ষাৎকারভিত্তিক ৪টি অনূদিত গ্রন্থ:মাইন্ড ইজ আ মিথ, নো ওয়ে আউট, থট ইজ
ইয়োর এনিমি, ও মিস্টিক অব এনলাইটেনমেন্ট।
Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।