নাহার তৃণার নভেলা: অদ্বৈত পারাবার – পর্ব ২

এ অঞ্চল সম্পর্কে পুষ্পিতা মায়ের মুখে এত শুনেছে যে, প্রথমবার এখানে এলেও, নতুন কিছু দেখার প্রাথমিক ঘোর তাকে সেভাবে ঘিরে ধরতে পারে না। হয়ত গুগল আর্থের হাত ধরে নিজেও বেশ কয়েকবার সে এই শহরের উপর দিয়ে চক্কর কেটেছে বলে অপরিচিতের আড়ষ্টতা নেই খুব একটা। অবশ্য যে কোনো পরিস্হিতিতে পুষ্পিতা চমৎকার খাপ খাইয়ে নিতে পারে। অপরিচিত মানুষের সাথে মুহূর্তে মিশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সে স্বভাবগত ভাবেই ভীষণ সাবলীল। নতুন পরিবেশ কিংবা অপরিচিত মানুষ তাই তাকে খুব বেশি বিচলিত করে না। সেকারণে চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশ তার কাছে খুব অচেনাও বলা যাবে না। এ শহর তার মায়ের স্বপ্নের শহর। অথচ মা জীবনে কখনও পা রাখেনি এ শহরের মাটিতে। আন্তরিক অভ্যর্থনায় এ শহরের কেউ তাকে ডাকেওনি। যুক্তিহীন এক আবেগ মা বহন করে গেছে শহরটার প্রতি। মনে মনে বিরক্ত হলেও মাকে কথা দিয়েছিল, একবার হলেও সে মায়ের হয়ে তার স্বপ্নের শহরে ঘুরে যাবে। পড়াশোনার মাঝ পথে হুট করে চাকরিতে ঢুকে যাওয়া। মা চলে যাবার পর এলামেলো জীবনটা গোছগাছে অনেকটা সময় গড়িয়েছে নিজস্ব গতিতে। এতদিনে ফুরসত হয়েছে এখানে আসার। মা থাকলে কত খুশি হতো! গলার লকেটটা আলতো হাতে স্পর্শ করে পুষ্পিতা। লকেটে পাশাপাশি দুটো ছবি, তার আর মায়ের। হ্যাঁ, তার সাথে এই ভ্রমণে মা’ও আছে বৈকি। ঠোঁটের কোণে বিষণ্ন একটা হাসি খেলে যায় ওর।

অনলাইনেই পুষ্পিতার হোটেল বুকিং দেয়া ছিল। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের গাড়িতেই এসেছে। লালখান বাজারের অ্যাভিনিউ হোটেলে দু’দিনের জন্য উঠেছে সে। এ দেশটা তার মা আর জন্মদাতার জন্মদেশ। কিন্তু এই শহরটা কেবল তার জন্মদাতার। মা তার স্বামীর শহর নিয়ে যতটা বলেছে, সে তুলনায় নিজের জন্ম শহর নিয়ে বলতে একদমই ইচ্ছুক ছিল না। অভিমান, কিংবা নিজের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হবার লজ্জা লুকাতেই হয়ত নিজের অস্তিত্বের প্রিয়তম একটা অংশ, জন্ম শহর ঢাকাকে মেয়ের কাছ থেকে আড়ালে রাখতে চেয়েছে। মনের কোণে গোপন একটা ইচ্ছে ঝুলে আছে পুষ্পিতার। সেটা সে ঝেড়ে ফেলছে না সচেতন ভাবেই। মা বলে না দিলেও, তার খুব ইচ্ছে এই শহরটা পেরিয়ে সে তার মায়ের জন্ম শহরে শুধুমাত্র এয়ারপোর্টের ঘেরাটপে আটকে না থেকে অন্তত একটা দিনের জন্য হলেও শহরটা ঘুরে দেখবে।

পুষ্পিতার কাছে এই দেশ পরিবার পরিজনহীন হলেও অনাত্মীয় নয় মোটেও। ধর্মহীন, পরিজনহীন পুষ্পিতা নিজেকে বিশ্ব নাগরিক ভাবতে ভালোবাসে। মনুষ্যত্বকে নিজের ধর্ম হিসেবে লালন করে।

জর্জের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছে আগেভাগেই, এই ভ্রমণকালীন সময়টুকু তার একান্ত নিজের। ওরা কেউ কাউকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া নক্ করবে না। একদম নিজের মতো করে কয়েকটা দিন এদেশে কাটিয়ে ফিরে যাবে সে তার জন্মভূমিতে।

হাত ঘড়িতে সময় দেখে পুষ্পিতা। নিউইর্য়কে এখন রাত আড়াইটা প্রায়। জর্জকে এত রাতে ফোন করে তার পৌঁছানোর খবরটা জানানো ঠিক হবে না। এমনিতেই বেচারা ইনসমনিয়ায় ভোগে..অতি কষ্টে হয়ত ঘুমের বন্দোবস্ত করেছে সবে…ল্যাণ্ডফোনটা খোলা থাকলেও, সেলটা জর্জ বন্ধ করে রাখে রাতের দিকে। “রিচড হেয়ার সেফলি। লাভ”। জর্জের সেলফোনে তার পৌঁছানোর ছোট্ট একটা মেসেজ দিয়ে রাখে।

দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল পুষ্পিতা কে খুব একটা কাবু করেছে বলে মনে হয় না। এখন তার প্রথম কাজ হলো শাওয়ার সেরে কিছু খাওয়ার ব্যবস্হা করা। চটপট চমৎকার একটা হট্ শাওয়ার নিয়ে পুষ্পিতা রুম থেকে হোটেল লবিতে নেমে আসে। ডাইনিংয়ের খোঁজ করতেই হোটেলের একজন স্টাফ পথ দেখিয়ে দেন।

সযত্নে সাজানো বাগান পেরিয়ে ডান দিকে ডাইনিং হল। এখন লাঞ্চের সময় হলেও লোকজনের তেমন ভিড় নেই। দূরের একটা টেবিল ঘিরে কয়েকজন দুপুরের খাবার খেতে খেতে তুমুল আড্ডা পেটাচ্ছে। দূরে বসেও পুষ্পিতার কানে তাদের খুচরো আলোচনা গড়িয়ে আসতে সমস্যা হয় না তেমন। এখনকার লোকজন প্রয়োজনের চেয়েও বেশি চেঁচিয়ে কথা বলেন। এয়ারপোর্টে নেমেই টের পেয়েছে সে। যদিও নিউইর্য়কবাসী হিসেবে এটা তার কাছে একেবারেই নতুন মনে হয় না। জর্জ মাঝে মাঝে মজা করে ওর সাথে এ নিয়ে। জ্যাকসন হাইটসে বাঙালিদের হইহই আড্ডা আলাপের ভিড়বাট্টায় গেলেই পুষ্পিতার কেমন মাথা ধরে যায়। জর্জের আবার খুব পছন্দ জায়গাটা। ছুটির দিনে প্রায় ওরা ওখানকার বাঙালি রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ কিংবা ডিনার করতে যায়।

লাঞ্চ হিসেবে সামান্য কিছু খেয়ে এক কাপ ধুমায়িত কফি নিয়ে বসে পুষ্পিতা। শহর ভ্রমণের শুরুটা কোন দিক থেকে করবে সেটার একটা প্রাথমিক ছক নোটবুকে টুকে রাখে। মায়ের যেসব জায়গা দেখার বিশেষ আগ্রহ ছিল ঠিক সেই জায়গাগুলোতেই সে যেতে চায়। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের নানা জায়গা দর্শনের চিন্তাটা শুধুমাত্র মাকে মাথায় রেখেই করতে চায়। কেবলমাত্র একটা দর্শনীয় জায়গায় মায়ের ইচ্ছের সাথে তার নিজেরও আগ্রহ মিটিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে একবেলার জন্য যাবে সেখানে। জায়গাটা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। মনে মনে ‘সৈকত’ শব্দটা বার দুয়েক উচ্চারণ করে পুষ্পিতা। ওর ঠোঁট উপচে ছলকে পড়তে চায় অনাবিল হাসির ধারা। এই শব্দটা শেখার পেছনে মায়ের সাথে ওর খুনসুটির স্মৃতিময় দিনগুলো সামনে এসে দাঁড়ায়।

‘সৈকত’ শব্দটা শিখতে পুষ্পিতার বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপার ওরচে’ আরো জটিল শব্দ সে অনায়াসে উচ্চারণে সক্ষম হলেও এই শব্দটা ওকে নাকাল করে ছেড়েছে। কিন্তু হাল ছাড়তে রাজী ছিল না সে। শতচেষ্টাতেও ‘সওকত’ শব্দটার পরিবর্তে ‘সৈকত’ উচ্চারণে ব্যর্থ হচ্ছিল পুষ্পিতা। যতবার সে ‘সৈকত’ এর জায়গায় ‘সওকত’ উচ্চারণ করতো, শবনম হেসে কুটিপাটি হতো। পুষ্পিতা প্রথম প্রথম শিক্ষাগুরু মায়ের ওরকম ব্যবহারে রেগে যেতো। কিন্তু শেষমেশ মায়ের হাসিতে সেও যোগ দিতে বাধ্য হতো।

মা ছিল ওইরকম। মায়ের উপর রাগ নিয়ে বসে থাকা অসম্ভবই ছিল। অনেক ভেবে চিন্তে শবনম একটা বুদ্ধি পায়। মেয়েকে গান শেখাতে বসে। ‘আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পড়ে আছি…’ গানটা প্রথমে ইংরেজিতে পুরোটা বুঝিয়ে দিয়েছিল পুষ্পিতাকে। আশ্চর্য গানের বোলটা শিখতে পুষ্পিতার খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। মেয়েকে বাংলা শব্দ শেখাতে গিয়ে শবনমও কতদিন পর সেবারই শেষ গলা খুলে গেয়েছিল।

এক সময় কত ভালো গাইতো শবনম অথচ হুট করে গানটা ছেড়ে দিলো। কত সাধ্য সাধনা করে শেখা গানের ভাসান দিতে কতটা রক্তক্ষরণ হয়েছিল সে ব্যথাটা শবনম একাই বহন করেছে। মেয়েকেও জানতে দেয়নি। বাবা খুব শখ করে ওকে গান শিখিয়েছিলেন। নিজেই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে ছায়ানটে ভর্তি করিয়েছিলেন। ঘুম কাতুরে মেয়েটা রেওয়াজে যেন ফাঁকিবাজি না করে সেদিকেও কড়া নজর ছিল বাবার। ভোর ভোর মেয়েকে উঠিয়ে নিজের কাজ নিয়ে পাশে বসতেন, মেয়ে রেওয়াজ করতো। ভোরের নরম আলোর সাথে শবনমের মিষ্টি গলা মিলেমিশে কী অসাধারণ এক আবহ তৈরি করতো— ফেলে আসা ওসব দিনের স্মৃতিগুলো গানের সাথে এতটাই লেপ্টে ছিল যে তপনের সঙ্গে বিয়ের পর খুব একটা গান সে গাইতে চাইতো না। পরে যখন তপনের সঙ্গে ওর সম্পর্কের বাঁধনটা ছিঁড়ে গেল তারপর গানকে একরকম নির্বাসনেই পাঠিয়ে দিলো। গান দিয়েই তো মানুষটার সাথে পরিচয়! পুষ্পিতা একটা হিসাব মিলাতে পারতো না।

স্মৃতি বিষয়ে মায়ের কেমন স্ববিরোধিতা ছিল। পুষ্পিতার জন্মদাতার শহর ঘিরে মায়ের আহ্লাদের সীমা ছিল না। স্মৃতি খুঁড়ে একটা অদেখা শহরকে মেয়ের সামনে দাঁড় করাতে কোনো ক্লান্তিই ছিল না তাঁর। অথচ সেই মা কেমন এক অজুহাতে গান ছেড়ে দিলো। লেগে থাকলে মা গানের জগতেও ভালো নাম করতো। মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে শবনম হাসতো কেবল। গান নিয়ে কথাদের গড়াতে দেবার বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখাতো না। বিশেষ করে মায়ের বাবার সাথে জড়িত স্মৃতি বিষয়ে। নিজের বাবা, শৈশব ইত্যাদি বিষয়ে মা কেমন কৃপণতা দেখাতো। নিজের ওই অংশের প্যান্ডোরার বাক্সটা মেয়ের সামনে সেভাবে খুললোই না আজীবন। অথচ স্বামীর শহর, তার শৈশব নিয়ে নিরন্তর বলে যাওয়ায় কোনো ক্লান্তি দেখেনি কখনও। মেয়েরা বড়ো হয়ে গেলে, অন্য পুরুষের জীবনসঙ্গী বনে গেলে যে বাবাদের ভুলে যেতে হয় সেরকমটাও মায়ের আচরণে প্রকাশ পায়নি। হয়ত নিজের সবচেয়ে ভরসার জায়গা থেকে প্রত্যাখাত হবার নিদারুণ ধাক্কাটা মা কে অভিমানের চাদরে ঢেকে দিয়েছিল। সেই চাদরটা সরিয়ে অভিমান উজিয়ে বাবার কিংবা তাঁর সাথে জড়িত স্মৃতির কাছাকাছি যাওয়াতেও তাই এতটা নীরবতা দেখিয়েছে মা।

একবার সেই বাড়িটা দেখতে গেলে কেমন হয়? ও বাড়ির গল্প মা কম করেনি। স্বামীর মুখে শুনে শুনে, আর ছবি দেখে বাড়িটাও যেন মা দেখতে পেতো চোখের সামনে। একদম অদেখা একটা বাড়ির গল্প বলার সময়, মায়ের চোখে মুখে অন্য জগতের আলো খেলতে দেখেছে পুষ্পিতা। ওটা মায়ের শ্বশুর বাড়ি, যে বাড়িতে তার প্রবেশাধিকারই ছিল না। স্বামী যে বাড়িতে জন্ম নিয়েছে, যেখানকার আলো হাওয়া মেখে বেড়ে ওঠেছে, সেসব নিয়ে মায়ের এক ধরনের বোকাটে ভাবালুতা ছিল। মা একটা আবেগ সর্বস্ব বোকাই ছিল আসলে। খামোখাই ভুল মানুষকে ভালোবেসে জীবনভর কষ্ট বয়ে বেড়ালো। নিজের ধর্ম, পরিবার সব ছেড়ে যার হাত ধরেছিল, সেই মানুষটা, শেষ পর্যন্ত স্বামী-সংসারের প্রতি উদাসীনতার অপবাদে মাকে ডিভোর্স দিয়ে ঠিকই তো নতুন করে আবার সংসারে থিতু হয়েছিল। কিন্তু মা বাকি জীবন আর কাউকে স্বামীর জায়গায় বসায়নি। পুষ্পিতাকে আঁকড়ে জীবনের ছুঁড়ে দেয়া সব চ্যালেঞ্জ শেষদিন পর্যন্ত একাই যুঝে গেছে। নিজের প্রতি উদাসীন মায়ের শরীরে ক্যানসার কখন বাসা বেঁধেছিল, সে খোঁজটা পেতে তাদের ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল। দু’ বছর হলো পুষ্পিতার মা শবনম তাবাসসুম জীবনের সব লেনদেন চুকিয়ে পৃথিবী ছেড়েছে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে যত গল্প মা করেছে, তার সবটা জুড়েই থাকতো তাঁকে ত্যাগ করে যাওয়া স্বামী, তপন চৌধুরী।

কে বলে অদর্শনে প্রেম মরে যায়! মায়ের ক্ষেত্রে অন্তত সেটা সত্যি নয়। নইলে যে মানুষ তার ভালোবাসা পায়ে দলে চলে যায়, তার প্রতি কীভাবে সম্ভব হয় আকণ্ঠ নিবেদিত থাকা। অথচ মা মোটেও আত্মসম্মানহীন মানুষ ছিল না। নিজের আত্মসম্মান বাঁচিয়েই তাকে বড়ো করেছে। মানুষ হয়ে ওঠার যতটা দীক্ষা একজন মায়ের পক্ষে সন্তানকে দেয়া সম্ভব তার অধিকই দিয়েছে বরং। নিজে শত কষ্ট সয়েছে। কিন্তু কোনো দিন তার ভালোবাসার মানুষটার উদ্দেশ্যে সামান্যতম কটু কথা শোনেনি মায়ের মুখ থেকে। মায়ের এমন অযৌক্তিক ব্যবহারের কোনো অর্থ পুষ্পিতা খুঁজে পায়নি। লোকটার প্রতি মায়ের অন্ধ ভালোবাসার তীব্রতা যত টের পেয়েছে, ততই আশ্চর্য হয়েছে সে। নিজের ভেতর তীব্র এক বিদ্বেষ থাকায় লোকটাকে কোনো দিন বাবা বলে ডাকতে ইচ্ছে করেনি পুষ্পিতার। ওর জন্মের উপর যেহেতু কোনো হাত ছিল না, তাই লোকটা শুধুমাত্র তার জন্মদাতা হিসেবেই থেকে গেছে। পুষ্পিতার কাছে বাবার অস্তিত্বটা শূন্যই।

নাহ্, যে বাড়ির দরজা তার মায়ের জন্য খোলা হয়নি, সে দরজার সামনে কক্ষনো গিয়ে দাঁড়াবে না পুষ্পিতা। কাজেই ওসব অবান্তর চিন্তা ধুলো ঝাড়ার মতো মন থেকে ঝেড়ে ফেলে।

অ্যাভিনিউ হোটেল পাঁচতারকা না হলেও এখানকার স্টাফদের ব্যবহার অত্যন্ত উঁচুমানের এবং আন্তরিক। আগে জানতো না হোটেলের এত কাছেই সবুজ পাহাড়ের হাতছানি। হোটেলের পাশ দিয়ে সবুজ গাছে ছাওয়া রাস্তা চলে গেছে পাহাড়ের মাঝ দিয়ে। এলাকাটা পছন্দ হয়ে গেল পুষ্পিতার। তাছাড়া তার দেখতে চাওয়া জায়গাগুলো মোটামুটি হোটেলের আশেপাশের দূরত্বেই। তাই পথের যানজট ঠেলে এখানে আসতে হলেও বেশ পছন্দ হয়ে যায় হোটেলটা। ম্যানেজার স্বয়ং এসে তার খোঁজখবর নিয়ে গেছেন। দরকারে পুষ্পিতা যেন দ্রুত তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে সেজন্য নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটিও তাকে দিয়ে রেখেছেন। যে ক’দিন সে এখানে থাকবে তার ব্যবহারের জন্য একটি গাড়ির বন্দোবস্তও করে দিয়েছেন। আগামিকাল সকাল থেকে শুরু হবে পুষ্পিতার চট্টলা ভ্রমণ। একই সাথে তার মায়েরও কি নয়! ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ধরে আশাপাশে খানিকটা হাঁটাহাঁটি করার ইচ্ছায় বেরিয়ে পড়ে।

সকালে ঘুম ভাঙতে খানিক দেরিই হলো পুষ্পিতার। দশটায় ব্রেকফাস্ট সেরে উঠতে না উঠতেই গাড়ির ড্রাইভার এসে উপস্হিত। লোকটা নিজের পরিচয় দিয়ে এই শহর এবং আশপাশের পর্যটনপ্রিয় এলাকা নিয়ে ছোটোখাটো একটা লেকচার দিলেন। বোঝা যাচ্ছে তিনি শুধু ড্রাইভার নন একজন শিক্ষিত অভিজ্ঞ গাইডও। নাম ফরিদুল ইসলাম, চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা। একটু বেশি কথা বলেন বটে, তবে বেশ প্রাণবন্ত। একলা একটা শহর হাতড়ে বেড়ানোর জন্য সাথে এমন একজনকে পুষ্পিতার মন্দ লাগে না।

কোথা থেকে শুরু করা যায়। ফরিদ ভাইকে তার ভ্রমণসূচি জানাবার পর তিনি বললেন সবার আগে কক্সবাজার। এখনি রওনা দিলে সন্ধ্যার পরপর ফিরে আসা সম্ভব। পুষ্পিতা এক মিনিট চোখ বুজে কী যেন ভাবলো। তারপর বললো, ঠিক আছে।

সাড়ে দশটায় রওনা দিয়ে শহরের যানজট ঠেলে ফ্লাইওভার দিয়ে কর্ণফুলী সেতুর কাছাকাছি পৌঁছে গেল আধঘন্টার মধ্যে। কিন্তু সেতুর কাছাকাছি এমন এক বিশ্রী জট পাকানো ছিল যেটা পেরোতে আরো এক ঘন্টা বেরিয়ে গেল। কর্ণফুলী সেতুর উপর উঠে মন ভরে গেল ওপারের সবুজ বনাঞ্চল দেখে। নদীর একূল আর ওকূলে কত পার্থক্য। এরপর টানা তিন ঘন্টায় কক্সবাজার। পথে কিছু পাহাড়ী শোভায় মন ভরে গেল। বাংলাদেশের সব সবুজ যেন এখানে জড়ো হয়ে আছে। পথে পথে নানান জায়গার বর্ণনা দিছিলেন গাইড কাম ড্রাইভার ফরিদ ভাই।

কক্সবাজার শহরে ঢোকার পথে কলাতলী নামের একটা জায়গার মোড়ে গাড়ি ঘোরাবার সময় বামদিকে অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য। রাস্তার শেষে ওই নীল দিগন্ত যে সমুদ্রের একটা অংশ তা বুঝতে সময় লেগেছে তার। সেই প্রিয় সমুদ্র সৈকতের এত কাছে চলে এসেছে সে। মায়ের কাছে এই জায়গার গল্প শুনেছিল। আজকে সে নিজে সশরীরে হাজির হয়েছে। অদ্ভুত এক অনুভূতি শিরশির করে উঠলো সমস্ত শরীর জুড়ে। অবশেষে দেখা হলো মায়ের প্রিয়তম এক গন্তব্য কক্সবাজার। ফরিদ ভাই বললেন, লাঞ্চ করে নিতে, ধানমণ্ডি হয়ে গেছে, পরে কিছু পাওয়া যাবে না। কিন্তু সে ইশারায় ফরিদ ভাইকে থামতে বললো। গাড়ি থেকে নেমে ঘোরগ্রস্তের মতো হাঁটতে থাকলো সমুদ্রের দিকে। সৈকতে ভেঙ্গে পড়ছে হাজারো ফেনিল ঢেউ। আর কোথাও যাবার আগে এখানে একবার পা ভেজাতে চায় পুষ্পিতা। বালির চড়া পেরিয়ে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গেল যেখানে ঢেউ এসে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়ছে। লোনাজল এসে পায়ের তলায় স্পর্শ করতেই একটা সম্মিলিত শিহরণ বয়ে গেল আপাদমস্তকে। মনে মনে বললো- তোমার হয়ে আমিই এই সমুদ্র জলে পা ডোবালাম মা!

কক্সবাজার থেকে ফিরতে ফিরতে রাত নটা বেজে গেল। হট শাওয়ার শেষে কোনোমতে খেয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়ে পুষ্পিতা। ঘুমের অতলে সব ক্লান্তি মুছে নেবার আয়োজনে সঁপে দিলো নিজেকে।

পরদিন সকালে ফয়েজ লেক যাত্রা। বন্ধের দিন বলে শহরে গাড়িঘোড়া কম। দশ মিনিটে পৌঁছে গেল শহরের মধ্যে অদ্ভুত সুন্দর একটা পাহাড়ি রিসোর্টে। গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার পর মনে হয় অন্য একটা জগতে চলে গিয়েছে। এই শহরের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ছিমছাম গোছানো সুন্দর। সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ে ওঠার পথ। খানিকটা উঠতেই কী সুন্দর একটা টলটলে জলের সরোবর। দুপাশে পাহাড় চিরে কতদূর চলে গেছে কে জানে। ফরিদ ভাই বললেন কয়েক মাইল। লেকের মধ্যে রঙিন নৌকা ভাসছে পর্যটক নিয়ে। ঘাটের পাশে একটা কাঠবাদাম গাছ সবুজ ছাতা মেলে দাঁড়িয়ে। নিচে ছোট্ট একটা বেঞ্চ। পুষ্পিতা আলতো পায়ে হেঁটে সেই বেঞ্চে গিয়ে বসলো। এখানে বসে সবুজ হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করার গল্প করেছিল তার মা। ঠিক এখানেই!

দুপুরের আগেই শহরে ফিরলো পুষ্পিতা। ফেরার পথে শাওলিন রেস্তোঁরার নাম বললো ফরিদভাইকে যেখানে পাহাড় থেকে ঝরনা গড়িয়ে নামতো। ফরিদ ভাই জানালেন ওটা উঠে গেছে বহুদিন আগে। সেখানে এখন সিরামিকের শোরুম হয়েছে। তবে তার উল্টোদিকে বাসমতি রেস্তোঁরা আছে, বেশ নিরিবিলি। চাইলে সেখানে লাঞ্চ করতে পারে পুষ্পিতা। ওখানেই গেল সে। কাঁচঘেরা রেস্তোঁরায় বসে উল্টোদিকের সিরামিকের শো রুম দেখা যাচ্ছে। তার পাশ দিয়ে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। ওখানে উঠে যাওয়া শাওলিন রেস্তোঁরার সাথে মায়ের একটা স্বপ্নও চাপা পড়েছে বহুকাল আগে। খেতে খেতে পুষ্পিতার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

বিকেলে আরেক দফা শহর দর্শনে বেরিয়ে নোটবুক থেকে কয়েকটা রাস্তা ও এলাকার নাম বললো। যেখানে সে নামবে না। ফরিদ ভাই যেন গাড়িটা ওসব রাস্তায় ঘুরিয়ে আনে। একে একে সবগুলো রাস্তা ঘুরতে ঘুরতে, ফরিদভাই যখন সবশেষ গন্তব্য বাতিঘরের সামনে দাঁড়ালো, শহরটা তখন সবে ছিপছিপে সন্ধ্যার হালকা আলিঙ্গনে মুখ ডুবিয়েছে। বাতিঘরের সামনে বিশাল একটা লতাঝোপ তোরণের মতো দাঁড়িয়ে, সেখানে অসংখ্য ঘরফেরা পাখি কিচমিচ করে মাতিয়ে রেখেছে সন্ধ্যাকালীন সময়।

কাচের দরজা ঠেলে বাতিঘরে প্রবেশ করতে প্রথমেই মনে হলো সে যেন একটা প্রাচীন জাহাজের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ডানপাশে একটা বাতিঘর দাঁড়িয়ে আছে। উল্টোদিকে গোল গোল জাহাজী গবাক্ষের মতো কাঁচের জানালা। মেঝেটা আগাগোড়া জাহাজের কাঠ দিয়ে তৈরী। বিশালায়তনের বইয়ের সামুদ্রিক জাদুঘর যেন। এই বাতিঘরের গল্প করতে গিয়ে মা কেমন স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের মতো উচ্ছল হয়ে উঠতো। ওর পড়ুয়া জন্মদাতার প্রিয়তম আড্ডার জায়গা ছিল এটা। অদেখা হলেও জায়গাটা নিয়ে বলার সময় তাই মায়ের উচ্ছ্বাসে কমতি পড়েনি। যেন প্রিয় মানুষটার সেসব আড্ডায় মা নিজেও উপস্হিত ছিল। বাতিঘরের খোপে খোপে সদ্য প্রকাশিত বই সাজানো। বাংলা ইংরেজি সব রকমের বইয়ের সমাহার। পুষ্পিতা এগিয়ে গিয়ে একটা বই তুলে নেবার ছলে বাতিঘরের দেয়াল স্পর্শ করলো। কেমন একটা অচেনা মায়ায় তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। এখানেও, ঠিক এখানেও ভেসে এসেছিল তার মায়ের হৃদয়।

ঘোরাঘুরি শেষে রাত আটটার দিকে হোটেলে ফিরে এতটাই ক্লান্ত লাগে পুষ্পিতার যে নিচে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে আসতেও ইচ্ছে করে না। রুমসার্ভিসেই রাতের খাবারের অর্ডার দেয়। খাওয়াদাওয়ার পর আর চোখ খুলে রাখতে পারে না। ঘুমে তলিয়ে যায় দশটা বাজার আগেই। অচেনা অনভ্যস্ত পরিবেশের অস্বস্তি পুষ্পিতার ঘুমে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না। ওর ঘুমন্ত মুখটা দেখে মনে হয় যেন মায়ের কোলে ছোট্ট শিশু পরম নির্ভরতায় মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়েছে।

 

নাহার তৃণা

জন্ম ২ আগস্ট ঢাকায়। বর্তমানে আমেরিকার ইলিনয়ে বসবাস। ২০০৮ সালে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। দুই বাংলার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা এবং ওয়েবজিনে লিখছেন গল্প, প্রবন্ধ, গল্প, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনা। একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ পেন্সিল পাবলিকেশনস প্রতিভা অন্বেষণে তার ‘স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট’ সেরা গল্পগ্রন্থ নির্বাচিত হয়। একইবছর অন্বয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘এক ডজন ভিনদেশী গল্প’। নাহার তৃণার প্রকাশিত বই দুটি এখন বইয়ের হাট প্রকাশনায় অ্যামাজন কিন্ডেলেও পাওয়া যাচ্ছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।