স্বাধীনতার মাসে সেলিম জাহানের কলাম: বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে এক বিকেল

১৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন।অর্থাৎ বেঁচে থাকলে ২০২১এ তাঁর বয়স হত ১০১ বছর। গত বছরই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী গেলো। ফিদেল ক্যাস্ট্রো একবার বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু আমি শেখ মুজিবুকে দেখেছি’। বিনম্র চিত্তে আমি বলি, ‘আমি হিমালয় দেখেছি, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি।’

আমাদের প্রজন্মের বহুজন বঙ্গবন্ধুকে বহুবার দূর থেকে দেখেছে – জনসভায় তিনি অনলবর্ষী ভাষন দিচ্ছেন, আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন ব্যক্তিত্বপূর্ণ বিভায়, জনতার মাঝে উপস্হিত মায়াময় আচরনে। বড় নমিত চিত্তে বলি, আমি তাঁকে একবার কাছে থেকে দেখেছি – একবারই কিন্ত খুব কাছে থেকে।এবং তিনি আমার সঙ্গে কথাও বলেছেন। স্বল্প ক’টি কথা, তবু বঙ্গবন্ধুর বাক্য তো।

বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ কামাল ছিল আমার সতীর্থ সহপাঠী এবং পরম ঘনিষ্ঠ বন্ধুও। বিভাগ এক ছিল না আমাদের – কামাল সমাজবিদ্যার, আমি অর্থনীতির।কলাভবনের একতলায় সামনের দিকে ওরা, আমরা তিনতলায় পেছন দিকে।তবু নানান কারনে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল, জন্মেছিল ঘনিষ্ঠতাও। সত্তুর দশকের প্রথমার্ধে বহু সময় আমাদের একত্রে কেটেছে গল্পে আর আড্ডায়। আমরা আড্ডা বসাতাম গ্রণ্হাগারের চাতালে, সমাজবিদ্যা বিভাগের সামনের বারান্দায়, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সবুজ মাঠে। নানান বিভাগের বন্ধু-বান্ধবেরা আসত সে সব আড্ডায়।কথা, চা-পানে, তর্কে-বিতর্কে কখন যে সময় পেরিয়ে যেত, তা টেরও পেতাম না।

সেদিনও গ্রণ্হাগারের চাতালে তুঙ্গ আড্ডা দিতে দিতে কখন যে দুপুর পেরিয়ে গেছে টেরও পাই নি। মাটিতে এলিয়ে পড়া বেড়ালের মত নরম রোদের সূর্য্যের দিকে তাকিয়ে আড্ডাধারীরা সব লাফিয়ে উঠলাম। উঠতে হবে এবং যেতে হবে – ছাত্রাবাসে ও বাড়ীতে। প্যান্টের ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে কামাল জিজ্ঞেস করল, ‘হলে গিয়ে তো খাওয়া পাবি না এখন। খাবি কোথায়?’ ‘পপুলারে চলে যাবো’ মৃদুস্বরে বলি আমি। পপুলার রেস্তোরা সময়ে-অসময়ে আমাদের খাবারের অন্যতম শেষ ভরসা। ‘না, এ অবেলায় পপুলারে যেতে হবে না। আমাদের ওখানে চল্, যা আছে দু’জনে ভাগাভাগি কর খাবো।’

এইটাই ভয় করছিলাম। এতো বন্ধুত্ব সত্ত্বেও ৩২ নম্বর রোডের বাড়ীটিতে আমি যেতে চাইতাম না। অন্য কিছু নয়, শুধু মনে হতো, ঐ বাড়ীতে গেলে যদি বঙ্গবন্ধুর সামনা সামনি পড়ে যাই। এবং তখন যদি আমি ঠিকমতো আচার-আচরন না করতে পারি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা এমন পর্যায়ের ছিল যে শুধুমাত্র সমীহতার কারনে আমি এটা এড়াতে চাইতাম। কামাল সেটা জানত। সে এটাও জানত যে আমি তাঁর পিতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ ভিন্ন কখনোই অন্য কোনভাবে সম্বোধন করি নি। বন্ধুর পিতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে আমি কোন সাধারন সম্পর্কের মধ্যে কখনোই বাঁধতে পারি নি।

কিন্তু কামাল সেদিন জেদ ধরেছিল যে আমাকে তার বাসায় নিয়ে যাবেই। কামাল জেদ ধরলে তার থেকে ছাড়া পাওয়া সুকঠিন। সুতরাং তার সাদা ডাটসান গাড়ীতে উঠে বসতেই হল। ‘আমার ঘরেই খাবার আনিয়ে নেবো’, গাড়ী চালাতে চালাতে আশ্বস্ত করতে চাইল সে আমাকে। আমি মুখ গোঁজ করে থাকলাম। ‘তা’ ছাড়া’, কামাল বলে চলে, ‘এ সময়ে আব্বা বাসায় থাকলেও বিশ্রাম নেন। তুই সামনা সামনি পড়বি না। ভয় নেই তোর’, আমাকে স্বচ্ছন্দ করার চেষ্টা তার।কি করে বন্ধুটিকে বোঝাই যে, এর সঙ্গে ভয়ের কোন সম্পর্ক নেই, এটা অন্য ব্যাপার।

৩২ নম্বরে কামালের ঘরে পৌঁছুনোর পরে বোঝা গেল ‘তার ঘরে খাবার আনা’র কোন সম্ভাবনা নেই। তার সে আশ্বাস সুদূর পরাহত।খাবার ঘরেই যেতে হবে। আমার মন বলছিল বিভ্রাট একটা ঘটবেই। হলোও তাই। খাবার ঘরে যাওয়ার জন্যে দোতলার চাতালের মতো জায়গায় পা দিতেই বুঝলাম, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। ঐ বারান্দায় বেতের চেয়ারে উপবিষ্ট বঙ্গবন্ধু তাঁর চিরাচিত ভঙ্গীতে। তাঁর হাতে জ্বলন্ত পাইপ।সামনের দু’টো চেয়ারে বসে আছেন বরিশালের জনাব আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও প্রফেসর মুশাররফ হোসেন।সেরনিয়াবাত সাহেব তখন খুব সম্ভবত: পানিসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী এবং স্যার সদ্য পরিকল্পনা কমিশন ছেড়েছেন।দু’জনের কাছেই আমি পরিচিত – সেরনিয়াবাত সাহেবের কাছে বাবার কারনে ও প্রফেসার হোসেনের কাছে তাঁর ছাত্র বলে।

সেরনিয়াবাত সাহেব আমাকে দেখেই বললেন, ‘আরে, তুমি এখানে?’ তারপর আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই বঙ্গবন্ধুর দিকে ফিরে বললেন,’ আমাদের প্রফেসার সিরাজুল হক সাহেবের ছেলে’।বাবার নামটি শুনে বঙ্গবন্ধু আধা মিনিটের জন্য চোখ বন্ধ করলেন। তারপর চোখ খুলে আমার দিকে বললেন, ‘তোমার আব্বার সিভিকস আর ইকনোমিক্সের ওপরে দুইটা পাঠ্যবই আছে না?’ আমি হতবাক! আমার মুখে কোন কথা ফুটল না।

আমার অবস্হা দেখে স্যার বলে উঠলেন, ‘আমার ছাত্র। খুব ভালো ছেলে।’ এবার কামালের পালা। ‘ইকনোমিক্সে আমাদের ফার্স্টবয়’, বন্ধুগর্বে কামালের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি খেলে যায়। তারপর পাইপের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে স্মিতমুখে আমাকে বললেন, ‘তোমারে একটা কথা জিগাই। ঠিক ঠিক জবাব দেবা কিন্তু।’ ততক্ষনে আমার হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। বুঝলাম না কি প্রশ্ন তিনি করবন। ভাবলাম, যদি ঠিক জবাব না দিতে পারি, তা’হলে বাবার বন্ধুকে, আমার বন্ধুকে ও আমার শিক্ষককে কি একটা লজ্জায় ফেলে দেবো আমি। আর কি অপদস্হ হবো আমি জাতির পিতার সন্মুখে! নিশ্বাস চেপে কোনক্রমে বললাম, ‘জী’।

বঙ্গবন্ধু তাঁর কৌতুকভরা চোখ আমার দিকে তুলে রহস্যভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘বাবা, তুমি তো ইউনিভার্সিটির সেরা ছাত্র। খুব স্বাভাবিক, কামাল তোমার লগে বন্ধুত্ব করতে চাবে। কিন্তু আমারে কও তো ক্যান তুমি কামালের লগে বন্ধুত্ব করতে চাও?’ আমি একমুহূর্ত ভাবলাম। তারপর বঙ্গবন্ধুর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম, ‘বন্ধুত্বে অন্য কোন বিষয়-বিবেচনা গৌণ, বন্ধুতাই মূখ্য’। এ টুকু বলতেই আমার জিভ শুকিয়ে গেল।

আমার জবাব শুনে বঙ্গবন্ধুর মুখ প্রসন্ন হাসিতে ভরে গেলো। স্যারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুখোড় ছাত্র আপনার’। তারপর কামাল আর আমাকে সস্নেহ কণ্ঠে বললেন, ‘যা, তোরা খা গিয়া’। ঘর থেকে বার হতে হতে শুনলাম, তিনি প্রফেসার মুশাররফ হুসেনকে বলছেন, ‘প্রফেসার সাব, পোলাটারে দেইখ্যা রাখবেন।’ তারপর সারাদিন এবং তার পরের দিনগুলো কেমন করে গেল, তা আমার মনে নেই। আমি যেন হাওয়ায় ভাসছিলাম। অপার এক আনন্দে আমার সারা মন ভেসে যাচ্ছিল।

তারপর ৪৬ বছর কেটে গেছে। আজ বঙ্গবন্ধু নেই, আমার বন্ধু শেখ কামাল নেই, নেই বন্ধু খুকীও। নেই ওঁদের বহু নিকটজনেরা। বঙ্গবন্ধুকে যে দিন কাছে থেকে দেখেছি, তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছি, তার এক বছরের মধ্যে ঘাতকের হাতে সপরিবারে নিহত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। সে যে কত বড় কলঙ্ক আমাদের।

আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে সেই হিরন্ময় দিনটির কথা পড়ছে। তাঁকে আমি শুধু একদিনই কাছে থেকে দেখেছি, একদিনই ক্ষণিকের জন্যে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। একদিনই এবং একবারই মাত্র সেটা ঘটেছে। কিন্তু তা’তে আমার দু:খ নেই। ঐ একদিনই তো আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি -যার স্মৃতি আমি চিরদিনই হৃদয়ে বহন করবো।

 

সেলিম জাহান

(সেলিম জাহান ভূতপূর্ব পরিচালক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।)
ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।