সেলিম জাহানের মুক্তগদ্য: ধর্মের মতি, কর্মের গতি

‘তোর ধর্ম-কর্মে মতি নেই কেন?’ — অনেকটা উত্তেজিত হয়েই জিজ্ঞেস করলো বন্ধুটি। বাল্যবন্ধু সে আমার —তুই তোকারি সম্পর্ক। সুতরাং আক্রমনাত্মক প্রশ্ন সে করতে পারেই বই কি। অনেকদিন পরে তার সঙ্গে দেখা— সে যে অনেকটাই পাল্টে গেছে, তা শুধু তার চিন্তা-চেতনা নয়, তার বদনে-লেবাসেও সুপরিস্ফুট। কথা-বার্তা ভালোই চলছিল। হঠাৎ করে সে আমাকে আসামীর কাঠ-গড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল।

মনে হল ‘মতির’ কথাতে ‘সংশয় তিমির মাঝে’ থেকে বলি, ‘চঞ্চল বিষয়ে মতি হে’। তারপর ভাবলাম, নাহ্, ঐ রকম বেমক্কা ঠাট্টা সে নিতে পারবেনা। তারচেয়ে ওর সঙ্গে বরং একটা রগড় করা যেতে পারে। গম্ভীর গলায় বললাম,’ তা কি বলতে চাইছিস তুই? পরিস্কার করে বল্, কোনটায় মতি নেই। ধর্মে মতি নেই, নাকি কর্মে মতি নেই? ধর্মের কর্মে মতি নেই, নাকি কর্মের ধর্মে মতি নেই? কোনটা জানতে চাইছিস?’ আমার বন্ধুটি আরেক কাঠি সরেস। বললো, ‘সব কটা’।

‘বেশ’, শুরু করি আমি। ‘কর্মে মতি নেই, এটাতো বলা যাবে না। ঘরে-বাইরে নিত্য কত কাজ করছি’, ব্যাখ্যা করি ওকে আমি। ‘দাপ্তরিক দায়িত্ব ছাড়াও বাংলা-ইংরেজী দু’ভাষাতেই লেখালেখির কাজ, বক্তৃতার কাজ, স্বদেশে- বিদেশে সভা-সমিতিতে যোগ দেয়ার কাজতো পেশাগত দিক থেকে এবং পেশার বাইরেও করছি। সামাজিকতা রক্ষা করছি এবং ঘর-সংসারের যে দেদার কাজ করছি প্রতিদিন, তার তালিকা করলে তো কয়েক পৃষ্ঠা লেগে যাবে’, দম নেই আমি।

‘এই সব কাজেই তোর মতি আছে – ভালোবেসেই সব কাজ করিস্ তুই?’, জিজ্ঞাস্য তার। ‘তা’ কি করে বলি? সব কাজই কি মনের মতো হয়, ভাই? কাজের মতো মন করে নিতে হয়’, খোলাসা করি ওকে। তারপর দ্বিরুক্তি না করেই চলে যাই দ্বিতীয় বিষয়ে।

‘তারপর ধর্ গিয়ে কর্মের ধর্ম। সে তো মেনে চলি সর্বদাই,’ আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি সখাটিকে আমার। ’কাজের যে নৈতিকতা, যে নিয়ম-কানুন, তা লঙ্ঘন করি না কখনো। সময়ও নষ্ট করি না। নিয়মনিষ্ঠ ও সময় মেনে কাজ করি। এমন কাজ করি না, যা মনুষ্যত্ব বিরোধী, যা মানবিকতার পরিপন্হী, যা অন্যের জন্য ক্ষতিকর’। বন্ধুটি চুপ করে শোনে। ‘কৃত সব কর্ম যেন মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে, সৃজনশীল কিছু হয়, যৌথতার সুর যাতে থাকে তাতে, সে ব্যাপারে সচেষ্ট থেকেছি সর্বদা, প্রতিনিয়ত’, বলি তাকে। ‘আসলে কর্মকেই তো বহুভাবে ধর্ম করে নিয়েছি রে’, স্বীকার যাই তার কাছে।

‘কিন্তু ধর্ম, ধর্ম বিষয়ে তোর মতি? সেটার কি হবে’? কড়া গলায় শাসানোর সুরে আমার বাল্যবন্ধুটি ফিরে আসে তার আদি প্রশ্নে। জানতাম, এটা সে করবে। সে ছাড়ে না তার মূল প্রশ্ন – নাছোড়বান্দা কিসিমের লোক। অনেকটা ঐ এ্যারোফ্লোট বিমানের মতো— পৃথিবীর যেখানেই যাক না কেন, সে বিমান মস্কো হয়ে যাবেই। আমার সখাটিও যাই বলুক না কেন এবং তাকে যাই বলা হোক না কেন, সে তার আদি প্রশ্নে যাবেই।

‘ধর্ম আসলে কি বোঝায়’? শুরু হয় আমার বক্তব্য, ‘আমি যা ধারণ করে আছি, এবং আমাকে যা ধারন করে আছে, তা’ই হচ্ছে আমার ধর্ম’। ‘মানে?’, অবাক হওয়ার পালা তার, ধর্মের এমন অদ্ভুত সংজ্ঞা শোনেনি সে কোথাও। ‘ আমাকে ধারণ করে আছে আমাদের পরিপার্শ্ব, আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি।আমি ধারন করে আছি আমার পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ, আমার জ্ঞান, আমার অভিজ্ঞতা। এ সবই তো আমার ধর্মের অংশ।’, ব্যাখ্যা করি তাকে।

‘কিন্তু, বিশ্বাস? বিশ্বাস কোথায় যাবে?’, আতঁকে ওঠে সে। ‘যেতে হবে কেন বিশ্বাসকে অন্য কোথাও? বিশ্বাস তো ঐ ধারনেরই অংশ। যা সব আমি ধারণ করে আছি, বিশ্বাস তো তারই একটি দিক’ আশ্বস্ত করি বন্ধুটিকে। ‘মানুষের ওপরে বিশ্বাস, মানবতার প্রতি বিশ্বাস, প্রকৃতির প্রতি বিশ্বাস, এ সবই তো আমি ধারণ করে আছি। এবং এ সব বিশ্বাস তো আমার ক্রিয়া-কান্ডের মধ্য দিয়ে আমি জগৎ সংসারকে দেখাতে পারি’। আমি নিজেকে ব্যক্ত করি।

‘না, না, তা নয়, সে বিশ্বাস নয়’, হাহাকার করে ওঠে সে, ‘আমি একটি চূড়ান্ত শক্তির, মানে ঈশ্বরের ওপরে বিশ্বাসের কথা বলছি’। ‘সে বিশ্বাস তো বড় উচ্চস্তরের এবং বড় ব্যক্তিগত হে’, আমি থামাই তাকে। ‘সে বিশ্বাস তো ঈশ্বর আর আমার মধ্যকার লেন-দেন। সে শুধু আমি জানি আর সেই চূড়ান্ত শক্তি জানে। সে বিশ্বাস তো দেখানো যায় না, আর দেখানোরও নয় অন্য কাউকে। সে বিশ্বাস মানুষে-মানুষে বলা-কওয়ার উর্ধে’। কথা থামাই আমার।

‘কিন্তু মানুষের ওপরে তোর যে বিশ্বাস তার কথা তো আমাকে বললি তুই’, একটু উদ্ভ্রান্ত মনে হয় তাকে।’ওমা, তা বলবো না কেন?’ অবাক হই আমি। ‘আমার ঐ বিশ্বাস তো মানুষ—সম্পৃক্ত মাত্র, সুতরাং ওটাতো আরেকজন মানুষকে আমি বলতেই পারি। মানুষের ওপরে আমার বিশ্বাসের কথা কি আমি একটি গরুকে বলতে যাবো?’, সহাস্য অনুযোগে ক’য়ে উঠি আমি।

‘তুই কি আমাকে গরু বললি?’, চোখ সরু হয়ে যায় আমার বাল্যবন্ধুটির। ‘না, না’, গরু কেন বলব তোকে’? আমার আগের কথার সূত্র ধরে হৈ হৈ করে উঠি আমি, ‘মানুষের ওপরে আমার বিশ্বাসের কথা তোকে — মানে আরেকজন মানুষকে যে বললাম — তা’তেই তো বোঝা যায় যে আমার কাছে তুই মানুষ হিসেবে স্বীকৃত’। তার চোখের সরুত্ব কমেছে বলে মনে হয় না, মুখটাকেও গোঁজ করে রাখে সে।

‘কিন্তু ধর্মের কর্ম? সে ব্যাপারে কি বলবে তুমি’? বন্ধুটির ঐ ‘তুমি’ সম্বোধনেই বুঝতে পারি যে ঔ গরু বিষয়ে রাগ তার পড়ে নি তখনো। ‘ধর্মের কর্ম?’ এক মুহূর্ত ভাবি আমি। ‘তা শাস্ত্রে যে সব সুকর্মের কথা বলা হয়েছে, তা’তো করার চেষ্টা করি আমি – এই যেমন, মানুষের ক্ষতি নয়, মঙ্গল করা, মানুষকে ভালোবাসা, সর্বজীবে দয়া, সত্য কথা বলা, ন্যায়ের পথে থাকা’। এবার সে আমাকে থামিয়ে দেয়, ‘কিন্ত ধর্মের যে ক্রিয়া-কলাপ আছে, সেগুলোতে মতি আছে তোর’?

‘ও, শাস্ত্র-বিধিত কর্ম-কান্ড তো? কিন্তু সে সব বিধান মানছি কি মানছি না, তা’ও তো আমার এবং ঈশ্বরের মধ্যেকার লেন-দেন। সেই চূড়ান্ত শক্তির কাছে আমার নিমগ্নতার বিষয়। কিন্তু ভাই সেগুলো তো অন্য মানুষের কাছে প্রদর্শনের বিষয় নয়, লোক দেখানোর বিষয় নয়। আর অন্য মানুষের তা জিজ্ঞাসা করাও উচিত নয়’। আমি থামি।

তারপর দু’জনেই কেন যেন চুপ করে যাই। একটা নিশ্চুপতা নেমে আসে সারা ঘরে। কি একটা আমরা দু’জনেই যেন ভাবতে থাকি। কেমন যেন ঘন হয়ে আসে পরিবেশ। এ পর্যায়ে ঐ অস্বস্তিকর নিস্তবদ্ধতা কাটিয়ে চারপাশটা হাল্কা করার জন্য আমি জোরে হেসে উঠি। তারপর ঠাট্টার গলায় বলি, ‘কি রে, উত্তর পেলি তোর প্রশ্নের? বোঝাতে পারলাম তোকে কিছু?’

আমার বাল্যসখাটি চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে এই প্রথম পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় আমার দিকে। তারপর বলে, ‘তুই যা যা বললি, তার পুরোটাই বুঝলাম। কিন্তু তা’তে কি? তুই আসলে গুলিয়ে দিয়েছিস আমার চিন্তা-ভাবনাকে।’ কথা শেষ করেই সে পা বাড়ায় সামনের দিকে কোন বিদায় সম্ভাষন ছাড়াই। আমার মুখে মৃদু হাসি খেলে গেল। তারপর ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, ভাবনা কি? গুলিয়ে দিলেই তো এক সময় সব কাদামাটি থিতিয়ে আসে, আর ওপরে উঠে আসে স্বচ্ছ্ব জল।

 

সেলিম জাহান

(সেলিম জাহান ভূতপূর্ব পরিচালক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।)
ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।