নান্নু মাহবুবের অনুবাদ: মাৎসুয়ো বাশোর হাইকু

বাংলা রূপান্তর: নান্নু মাহবুব

হাইকু একখণ্ড আশ্চর্য ছবির মতো। এই ছবিতে সচারচর দু’টি ইমেজ। দু’টি আপাতসম্পর্কহীন ইমেজ। এই দু’টি পরস্পরসম্পর্কহীন ইমেজ হাইকু পাঠকের মনের অন্তর্বিন্দুর শূন্যতায় বিদ্যুচ্চমকে মিশে গিয়ে একটি অনবদ্য সর্বরূপময় অনুভূতি তৈরি করে। অতিসাধারণ দু’টি ইমেজের মিথস্ক্রিয়ায় আকস্মিক, জগতাতীত একটা রূপের সৃষ্টি হয়। সেটি ঘটে যেন কোনও বাস্তব কালে নয়, বরঞ্চ বলা যায় একটি কাল্পনিক কালে, যুক্তিশীল উত্তেজনাপ্রবণ মনের বাইরে একটি নিঃশব্দ এপিফ্যানির মতো, অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে।

সবসময় যে এরকমটিই ঘটে তা নয়, বিভিন্ন কবিতে তার চারিত্র পাল্টে পাল্টে যায়, তবে দু’টি কমবেশি-দূরবর্তী ইমেজের পাশাপাশি অবস্থান হলো হাইকুর মূলগত গঠন।

হাইকুবিশ্ব উপমা রূপকের বিশ্ব নয়; কিংবা উল্টোভাবে বলা যায় হাইকুবিশ্বে জগতসমগ্রই হলো রূপক। খুঁটিনাটি, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, আণুবীক্ষণিক দৃশ্যমানতা হাইকুতে সংক্ষিপ্ত, অনবদ্য সরলতায় বর্ণিত হয়।

হাইকু চিন্তাপ্রসূত নয়, বরং তাৎক্ষণিক, মুহূর্তনির্ভর, প্রবুদ্ধ দশার ফল। এবং অবশ্যই তা শুধু শব্দ। শব্দ এবং শব্দাবলী ছাড়া এই জগতের আর কোনও অস্তিত্ব নেই, হাইকুভুবনে তা স্পষ্ট হতে থাকে।

হাইকু হলো কবিতার আত্মা।

.. .. .. .. ..
মাৎসুয়ো বাশো (১৬৪৪-১৬৯৪) জাপানের কবি। জাপানের এডো যুগের (১৬০৩-১৮৬৮) সবথেকে বিখ্যাত কবি বাশো।

বাশোর বাবা ছিলেন একজন নিম্নপদস্থ সামুরাই। বাশোর জীবন চালিত হয় ভিন্ন পরিক্রমায়। দারিদ্র আর সঙ্কটের ভিতর দিয়েও ধীরে ধীরে বাশোর জীবন হয়ে ওঠে অনবদ্য একটি কবিতা।

আজ বাশোর নাম এবং তাঁর জীবন ‘হাইকু’ শব্দটির সমার্থক হয়ে গেছে। শুধু জাপানি সাহিত্যে নয়, সারা পৃথিবীর সাহিত্যে বাশোর প্রভাব ব্যাপক।

জীবনের শেষ দশ বছরে বাশো একাধিক দীর্ঘ পর্যটন সম্পন্ন করেন। আজকের আধুনিক জাপানের তুলনায় মধ্যযুগের জাপান তুলনা করা মুশকিল। পর্যটন ছিলো তখন গভীর বিপৎসঙ্কুল। বাশোকে একজন আমৃত্যু পর্যটক বলা যায়। ‘দ্যা ন্যারো রোড থ্রু দ্যা ডিপ নর্থ’ ট্রাভেলগটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে ধরা হয়।

বাশোর কবিতা অপরূপ সহজতায় বিশিষ্ট। ঋতু, পাহাড়, সাগর, উপত্যকা, কীট-পতঙ্গ, মর্নিং গ্লোরি, চেরি, মন্দির, মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি, অশ্ব, হিম, বর্ষণ, তুষারপাত বাশোর কবিতায় জাগিয়ে তোলে এক অন্য পৃথিবী, চাঁদ আর একাকীত্বে সেই পৃথিবী নির্জন।

বাশোর কবিতায় যে ইমেজগুলি স্ফুট থাকে সেগুলো খুব বেশি পরস্পর-দূরান্বয়ী নয়। তাতে এই কবিতাগুলো হয়ে ওঠে আরও স্পন্দিত এবং অন্তর্গতরূপে গতিময়।

………………………

*

সাগর আঁধার হয়ে আসে;
বুনো হাঁসেদের স্বর
ক্ষীণ শাদা

*

বয় শরতের হাওয়া:
এখনো সবুজ
বাদামের খোসাগুলি

*

শীতের উদ্যান,
চাঁদ ক্ষীণ এক সুতো,
পতঙ্গেরা গায় গান

*

বিদ্যুচ্চমক─
সারসের তীক্ষ্ণ ডাক
আঁধারে বসায় ছোরা

*

বিদ্যুচ্চমক:
আধো-আঁধারে বয়ে যায়
বকের ক্রন্দন

*

গোধূলির বরিষণে
এই উজ্জ্বলরঙ জবা…
এক অপরূপ সূর্যাস্ত

*

স্মৃতির ঝোড়োমাঠে
শুকনো করোটি এক,
ছুরিকার মতো হানে

*

বর্ষণ এত ভারি
মাঠের ওপরে অশ্বশালা
হয়ে আসে ঘোর

*

প্রাচীন পুকুর─
একটি ব্যাঙের ঝাঁপ,
জলের শব্দ

[বাশোর এই হাইকুটি সবথেকে বেশি বিখ্যাত এবং অনূদিত।

শেষ লাইনে ‘জলের শব্দ’, ‘শব্দের জল’ও ভাবা যেতে পারে।
ব্যাঙের যে ঝাঁপ, সেটা কি শব্দের জলেও নয়?]

*

কাপাস তুলোর মাঠ─
চাঁদ যেন ফুটে আছে
ফুলে ফুলে

*

বসন্ত:
নামহীন পাহাড় এক
ভোরের কুয়াশায় অবগুণ্ঠিত

*

শীতের নির্জনতা─
একরঙা এক পৃথিবীতে
বাতাসের ধ্বনি

*

শীতের অঝোর ধারা
ঝরে গোয়ালের ওপর
ডাকে একটি মোরগ

*

মাছওলার হাঁক,
মিশে যায়
কোকিলের চিৎকারে

*

আছি এক সরাইখানায়
বারনারীরাও ঘুমুচ্ছে যেইখানে─
শুঁটিঝোপ আর চাঁদ

*

আমি ছাড়া আর
কেউ নেই এই পথে,
শরৎ গোধূলি এই

*

আত্মার উৎসব,
আজও উড়ছে ধোঁয়া
শ্মশানের থেকে

*

মর্নিং গ্লোরিও
দেখা গেল
বন্ধু নয় সে আমার

*

শীতের চন্দ্রমল্লিকা চলে গেলে
মুলো ছাড়া আর
লেখার নেই তো কিছুই

*

ফড়িঙ
ঠিকঠাক পারে না নামিতে
ওইখানে ঘাসের ডগায়

*

এই পুরাতন গ্রাম─
পার্সিমনবৃক্ষ-ছাড়া
নেই বাড়ি একটিও

[পার্সিমন: দীর্ঘজীবী প্রাচ্যদেশীয় বৃক্ষ। বৃক্ষ পনেরো থেকে
ষাট ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। ফল বৃহৎ টম্যাটোর মতো, লাল,
হলুদ, কমলা রঙের, মিষ্টি।]

*

ওক গাছ:
কোতুহল নেই কোনও
চেরি ফোটায়

*

বসন্তবৃষ্টি
ছাদ থেকে পড়ে চুঁয়ে চুঁয়ে
বোলতার বাসা থেকে ফোঁটা ফোঁটা

*

প্রথম তুষার,
ঝরে
অর্ধ-নির্মিত সেতুর ওপর

*

তেরছা চাঁদের আলো
ঘন বাঁশঝাড়ে;
ডাকে একটি কোকিল

*

ঝিলমিল এক মরীচিকা
মৃত তৃণদল থেকে
ইঞ্চি দু’এক উপরে

*

মৌমাছি এক
টলমল এলো বেরিয়ে
পিওনিফুলের থেকে

*

শরতের শুরু
সাগর আর পান্নারঙ ধান
একই সবুজ

*

শীতের প্রথম ধারা─
বানরও চায় যেন
একখানা বর্ষাতি

[বর্ষাতি: raincoat.]

*

তুষারময় এক সকাল─
শুকনো স্যামন
চিবাই আমি

*

যাবো এক ভ্রমণে;
ম্লান মরুর ওপর
ঘোরে স্বপ্নেরা আমার

*

ওড়ে নুড়ি,
আসামা পাহাড়ের পথে;
শরতের হাওয়া

*

বছরের পর বছর,
বানরের মুখের ওপর
বানরের মুখোশ

[এই কবিতাটিতে একটা তিক্ততার ছোঁয়া রয়েছে, যা বাশোর
স্বভাবসুলভ নয়। তিনি তাঁর কাজের (এবং সম্ভবত তাঁর কিছু ছাত্রের)
অগ্রগতির ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না।]

*

ভোরের চায়ে ভিক্ষুর চুমুক
প্রশান্ত চারদিক
ফোটে চন্দ্রমল্লিকা

*

নিস্তব্ধতা─
সিকাডার তীব্র নিনাদ
কুরে কুরে ঢোকে প্রস্তরে

[সিকাডা: উষ্ণ অঞ্চলের লাফিয়ে-চলা বড় পতঙ্গবিশেষ। আমরা
যাকে ঘুঘরো বলি। মাথার দুই দিকে এর বৃহৎ দু’টি চোখ। সিকাডা
শিরা-উপশিরাময় স্বচ্ছ ডানাযুক্ত। পুরুষ সিকাডা এক রকম একটানা
উচ্চস্বর নিনাদ সৃষ্টি করে। খোসা পরিত্যাগ করা সিকাডার একটি বৈশিষ্ট্য।
জাপানি হাইকুতে এই পতঙ্গটি বারবার ঘুরেফিরে আসে।]

*

একটি সিকাডার খোলস;
গায় সে গান
অন্য কোথাও

*

রিক্ত এক শাখার ওপর
থিতু হয় এক কাক
শরৎ গোধূলি

*

আমার ক্রন্দিত স্বর
কাঁপায় কবর
শরতের হাওয়া

*

শুঁয়োপোকা এক
গভীর এই শরতে─
হয়নি এখনো প্রজাপতি

*

জেগে আছি রাতে;
মৃদু লণ্ঠন
জমে আসে তৈল

*

শরৎ হলো শুরু
সাগর আর অঙ্কুরিত ধানক্ষেত
একই সবুজ

*

প্রথম বসন্তদিন─
ভাবতে থাকি
শেষ শরতের কথা

*

একটি আশ্চর্য ফুল
পাখি আর প্রজাপতিদের তরে…
শরৎ আকাশ

*

জেগে আছি রাতে─
ঠাণ্ডায় চড়চড়
জলের কুঁজোর শব্দ

*

একটুখানি ঘুম,
পা দুটি নিবদ্ধ এক
ঠাণ্ডা দেয়ালে

*

শরৎজ্যোৎস্না─
খোঁড়ে এক পোকা নিঃশব্দে
বাদাম গভীর

*

জ্যোৎস্নার বরইবৃক্ষ─
করো অপেক্ষা,
আসিবে বসন্ত

*

শীতের নির্জনতা─
জীর্ণ সেই খুঁটিতেই
আছি হেলান দিয়ে বসে

*

কী ভাবে মাছেরা,
কী ভাবে পাখিরা, জানি না─
শেষ হয়ে আসিছে বরষ

*

পেঁয়াজের কলি
সদ্য ধোয়া শাদা─
কেমন শীতল!

*

মাঝে মাঝে আসে মেঘ
চাঁদ দেখা থেকে
মেলে অবকাশ

*

তরমুজের শীতলতা,
ভোরের শিশিরে তার গায়ে
কাদার ফুটকি

*

অপরূপ এই বাটিতে
এসো সাজাই এই ফুল…
যেহেতু অন্ন নেই কোনও

*

চন্দ্রমল্লিকার সুগন্ধ…
আর এই নারায়
সুপ্রাচীন সব বুদ্ধ

[নারা অঞ্চলটি জাপানের প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র।
এর রাজধানী হলো নারা নগর।]

*

উজ্জ্বল লাল
নির্দয় এই সূর্য─
শরতের হাওয়া

*

ঘোর এই রাত্রিতে
ওই ঈগলের চোখ ঘোরতর…
তিতিরপাখির কুজন

*

ঝোপের মুনিয়া:
ফেলেছে পুরিষ,
পিঠায়, বারান্দার গরাদে

*

দেখিতেছি চাঁদ,
উৎসবে নয় কারো মুখ
এত অপরূপ

*

মাঝমাঠ
কোনও কিছুতেই নয় জড়িত
ভরতপাখি গায় গান

*

সবুজ সালাদের বালুতে
শিরশিরায় দাঁত─
হচ্ছি বুড়ো

*

চাঁদটি কোথায়?
মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি যেন─
সমুদ্রে গেছে ডুবে

*

মেয়ে প্রজাপতি
সুগন্ধী করে ডানা
ভেসে ভেসে
অর্কিডের ওপর

*

হলুদ পাহাড়ি গোলাপের
পাপড়িরা কাঁপে─
গর্জায় খরস্রোতা নদী

*

ক্ষুদে কীট, উকুন,
বালিশের পাশেই আমার
মোতে একটি ঘোড়া

*

বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায়
উইলোর ওপর প্রজাপতিটি
তার জায়গাটি পাল্টায়

*

মন্দিরের ঘণ্টা মিলায় দূরে
ফুলের গন্ধ রয়ে যায়
নিখুঁত গোধূলি এক!

*

প্রাচীন শহর নিস্তব্ধ ..
ভাসে পুষ্পের সৌগন্ধ..
আর গোধূলির ঘন্টা

*

পুষ্পিত শাদা চেরির উপরে
কুয়াশার শাদা মেঘ…
প্রভাতোজ্জ্বল পর্বত

*

জাগো! আকাশ হলো আলো!
চলো যাই পথে বেরোই আবার…
সাথী প্রজাপতি!

*

শিশির, তোমার
ক্ষণিক মধুর জলে
ধুয়ে নিতে দাও…
জীবনের এই কালো হাত

*

খোদিত দেবতারা
চলে গেছে কত আগে…
মৃত পাতা শুধু জড় হয়
মন্দির দেওড়িতে

(খোদিত দেবতা: carven gods; মন্দিরের দেয়ালে উৎকীর্ণ ভাস্কর্য।)

*

কোনও এক তপোবনে:

শীতল শরৎরাত্রি এক─
রাত্রির আহার, আমরা ছাড়াই
খোসা… বেগুন আর শশা

*

সমুদ্র অশান্ত আজ রাতে…
সাদো দ্বীপের উপর বিস্তৃত
তারকার নিস্তব্ধ মেঘরাশি

*

দেখ: জীবিত সূর্যেরা ঘোরে
পূর্বপুরুষের গোরে…
শ্মশ্রুল, বাঁকা যষ্টি হাতে

*

হিমেল রাত্রি: বুনো হাঁস,
পীড়িত, পড়ে আকাশ থেকে
আর ঘুমায় কিয়ৎকাল

…………

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।