সুদূর অর্কেস্ট্রা: সালভাদর দালি (চতুর্থ পর্ব)


ফেরদৌস নাহার

চতুর্থ পর্ব                                                                                                      তৃতীয় পর্ব ।।  দ্বিতীয়  পর্ব ।। প্রথম পর্ব

ক.
১৯৩৪-৩৬ এ প্যারিসের বিখ্যাত ইন্টেরিয়র ডেকোরেটর এবং ডিজাইনার জেন মিশাল ফ্রাঙ্কের সঙ্গে দালির পরিচয় হলো। জেন মিশাল বিংশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত  ও বুদ্ধিদীপ্ত ইন্টেরিয়র ডিজাইন লিজেন্ড হিসাবে খ্যাতিমান। যার সুস্পষ্ট প্রভাব এখন পর্যন্ত আসবাব ও গৃহসজ্জা শিল্পে প্রবলভাবে উপস্থিত। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে লেখা বিখ্যাত ডাইরি ‘The Diary of Anne Frank’-এর লেখিকা অ্যানা ফ্রাঙ্কের নিকট আত্মীয়। দালি এই প্রতিভাবান ডিজাইনারের কাজ দেখে এতটাই উদ্বুদ্ধ হলেন যে, গৃহসজ্জার আসবাবপত্রের নানা উদ্ভাবনী ডিজাইন তৈরি করতে শুরু করেন। সে-সময়কার হলিউডের বিখ্যাত ও লাস্যময়ী অভিনেত্রী মায়ে ওয়েস্টের ঠোঁট অবলম্বনে তৈরি করেন Mae west lips sofa । ১৯৩৬ সালে তৈরি এই টকটকে লালরঙ লিপিস্টিকমাখা একজোড়া ঠোঁটের আকৃতিতে নির্মিত সোফাটি প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। যা-কিনা স্যুরিয়ালিস্টিক আসবাব হিসাবে অন্যতম উল্লেখযোগ্য, এবং আসবাব ডিজাইনের ইতিহাসে এক অভিনব ও অনন্য সংযোজন। এ-ধরনের কাজ করতে সালভাদর দালি দিনরাত্রি কাঠমিস্ত্রির সঙ্গে থেকে কাজ করেছেন। নিখুঁতভাবে ঠোঁটের ড্রইং ফুটিয়ে তুলতে সতর্ক থেকেছেন সবসময়। এই সোফাটির সামনে দাঁড়িয়ে অনুভব করতে চেষ্টা করেছি স্যুরিয়ালিস্টিক দ্যোতনার অনুকম্পন কী করে ব্যবহারিক জিনিসপত্রকেও অন্য এক রূপ দিতে পারে।

Space Venus- এর কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ চারদিক থেকে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। উপলব্ধ হয় যে, দেহের সৌন্দর্য্য ক্ষনস্থায়ী, একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সেই দেহ শিল্পের আধার হলে, তা হয়ে উঠবে অবিনশ্বর-অন্তহীন। সৌন্দর্য্যের দেবী ভেনাসকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি ডিম ও একটি ঘড়ি সেখানে বিদ্যমান, যা জীবনের প্রতীক হয়ে এসেছে। নতুন করে জীবন আসবে, থাকবে চলমান এবং ভবিষ্যতের জন্য। এই ভাস্কর্যটি ১৯৭৭ এ গড়েছেন দালি।

Woman Aflame- আগুন ও শিখা এই দুই মিলে দালির একটি প্রিয় অবসেশন। দালির সৃষ্টিতে নারী হয়ে ওঠে সীমাহীন দেহজ সৌষ্ঠব ও প্লাবিত আকর্ষণের কেন্দ্রভূমি। আগুনে পুড়ছে নারীদেহ। কেবল  পুড়ছেই নয়, সারা দেহে ছোট-বড়ো পেরেক মারা। তারই মাঝে কোমর, বুক ও নিতম্ব কেটে তৈরি করা হয়েছে ড্রয়ার। দালি মনে করতেন আগুনের শিখা হলো সেই সৌন্দর্য যার মধ্যে প্রাণ রয়েছে, আছে সম্মোহনের প্রেরণা- যা প্রত্যক্ষদর্শীকে বিমোহিত করে। সেই আগুন নারীদেহের মাঝে প্রবলভাবে বিদ্যমান, তাই প্রেমের আবেগ ও রহস্য নিয়ে বার বার উপস্থাপিত হয়েছে সেই অদম্য-অগ্নি। ঠিক প্রায় এমন আরেকটি ভাস্কর্য Femme Giraffe। দীর্ঘ গলার উপরে বসানো হয়েছে ভেনাসের মুখ। বুক, পেট, নিতম্ব কেটে কেবিনেট ড্রয়ার। সচরাচর ভেনাসের যে মূর্তি দেখা যায়, তারই ফর্ম ভেঙে এইরকম শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন দালি। ঠিক এধরনের বিষয়ের উপর আরো দুটি বিশাল কাজ দেখলাম। যার একটি কালো পাথরের সাথে সবুজ রঙের স্টিলের সংমিশ্রণ এবং আরেকটি ব্রোঞ্জের তৈরি। স্যুরিয়ালিস্টিক শিল্পধারার অনন্য নিদর্শন হয়ে ভাস্কর্যগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে। নারীদেহের মাঝে ভেনাসের প্রতি সালভাদর দালির প্রবল আকর্ষণ। তাই বার বার ভেনাসের ফর্মকে ভেঙেচুরে তৈরি করেছেন শিল্পধর্মী  আসবাব অথবা ভাস্কর্য।

Le Cabinet- ব্রোঞ্জের তৈরি একটি ভাস্কর্য। নারী দেহকে কোমর থেকে বুক পর্যন্ত পাঁচটি ভাগ করে ক্যাবিনেটের ড্রয়ারের নক্সায় নির্মিত করেছেন। ১৯৮২ সালে তৈরি ব্রোঞ্জের এই ভাস্কর্য যেন দেহতত্ত্ব গানের সুর ভাঁজছে। মনে পড়ে গেল লালনের একটি পংক্তি– ‘আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা /মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা /তার উপরে সদর কোঠা /আয়না-মহল তায়…’। এখানে অবশ্য নারীদেহের মাঝে বসানো ড্রয়ারগুলোকে আড়াল করা যৌনতার প্রতীক হিসাবে তুলে ধরেছেন। কোনো কোনো ড্রয়ারের আধাখোলা বিষয়টি দিয়ে গোপনীয়তার আলো-আঁধারি বোঝাতে চেয়েছেন।

এই প্রদর্শনীতে প্রচুর ন্যুড শিল্পকর্মের উপস্থিতি রয়েছে। দালির সৃষ্টিতে যৌনতা এসেছে নানা মাত্রিকতায়। তবে এই উপাদান শিল্পের সৌন্দর্যকে ব্যহত করে না। বহুবর্ণিল রঙের এই যে বিশাল উপস্থাপন তা যেন ভেতরের সব উত্তেজনা, বিক্ষুব্ধতা ও ঝঞ্ঝাময়তাকে সাথে করে একসঙ্গে উদগীরণের পথ খুঁজে নিচ্ছে। সালভাদর দালির হাতে নগ্নতার ব্যবহার ঘটেছে অসম্ভব উদ্ভাসনের মতো। এই নগ্নতা মনে ক্রুরতার জন্ম দেয় না বরং শিল্প খোঁজার উৎসাহ সৃষ্টি করে। দালির সৃষ্টিতে বিজ্ঞানের সঙ্গে কোনো সংঘাত তো নেই-ই, বরং রয়েছে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠ বোঝাপড়া। বিভিন্ন বিষয়-বস্তু এবং নানা মিডিয়া দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মগুলি এক একটি জৈব ও অজৈব ফলাফলের উৎকৃষ্ট উদহারণ।

খ.
Around Dali, everything is real except myself –Salvador Dali

প্রদর্শনী হলের ছাদ বরাবর দেয়ালে দুটি ভিডিও স্ক্রিন। আর তাতে সালভাদর দালির উপর ধারণ করা প্রামান্যচলচ্চিত্র চলছে। সংলাপহীন, তবে আবহসঙ্গীত চলছে বেশ দ্রুতলয়ে। বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে তোলা চলচ্চিত্রগুলো দেখে বেশ মজা পেলাম। বলা যায় এও এক পরাবাস্তব চেতনার চলমান চিত্র। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে উপভোগ করলাম। একটি প্রামান্যচিত্রের একজায়গায় দেখা গেল সালভাদর দালি রাজকীয় পোশাকে ভাস্কর্য গড়ছেন, তার সহযোগী ভৃত্যটিকেও পরিয়েছেন অদ্ভুত পোশাক। এবার ভৃত্যটি একটি ট্রে-তে করে কিছু সরঞ্জাম নিয়ে এলো। কিন্তু তার সেই সাধারণ হেঁটে আসা দালির পছন্দ হলো না। দালি চোখ পাকিয়ে ধমক দিয়ে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলেন– ফিরে যাও এবং আবারো আসো! ভৃত্যটি এবারে তার মনিবের চাহিদা মতো ট্রে হাতে পা ঠুকে ঠূকে নাচের ভঙ্গিতে শিল্পীর সামনে এসে দাঁড়াল, ট্রে নামিয়ে রাখল টেবিলে। এবার সালভাদর দালির মনে ধরল। এছাড়া শিল্পীর আরো কিছু ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি চিত্রয়িত করা হয়েছে। বিশেষ করে দালির চোখ ও মুখের অভিব্যক্তি। যার বেশিটাই রাগ বা ক্রোধের ভঙ্গিতে উজ্জ্বল। আর তা কখনো ক্লোজআপ শর্টে, আবার কখনোবা লংশর্টে ধারণ করা। দালির সদম্ভে হেঁটে বেড়ানোর দৃশ্য রয়েছে বেশ কিছু। মিনিট কুড়ি-পঁচিশের প্রামাণ্যচিত্রগুলো স্ক্রিন জুড়ে অবিরাম চলছেই।

পাশের কক্ষটিতে গেলাম। এটি কিছুটা ছোট পরিসরের। তবে সেখানে রয়েছে মূল্যবান অলংকার, কাচ ও ক্রিস্টালের শিল্পকর্ম। এঘরের প্রতিটি জিনিসই আকারে ছোট, কিন্তু আর্থিক মানের দিকে গগনচুম্বী। সালভাদর দালির নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি গহনাগুলো একেবারে স্বতন্ত্র। এখানে দালির তৈরি কিছু স্বর্ণমূদ্রাও দেখলাম। রয়েছে কাচ-ক্রিস্টালের অসম্ভব আকর্ষণীয় বেশ কিছু ভাস্কর্য, সেগুলো নানা বর্ণের বর্ণচ্ছটায় দৃষ্টিকে করে তোলে সম্মোহিত। ফ্রান্সের বিখ্যাত জুয়েলারি ও ক্রিস্টাল কোম্পানি Daum-এর সহযোগীতায় তিনি তৈরি করেন De`bris d`une automobile, ১৯৬০ সালে তৈরি করা এই ভাস্কর্যটিতে তিনি ক্রিস্টাল ও সোনার সহাবস্থান ঘটিয়েছেন। যার বিষয়– উল্লম্ফিত একটি শ্বেত পাথরের ঘোড়া। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোনার তৈরি শকট চাকা। আরো রয়েছে হ্যাঙ্গারে ঝুলে থাকা বিমূর্ত ঘড়ি। ভেনাসের অবয়ব, মূল্যবান পাথরের উপরে দাঁড় করানো সোনার ময়ূর। কাচের গাছে ক্রিস্টালের পাখি এবং ফুল, প্লেট, সুগন্ধি রাখার বোয়ম, পানপাত্রসহ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক সৃষ্টিকর্ম। যার বেশির ভাগ সালভাদর দালি বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানের অর্ডার অনুযায়ী তৈরি করেছেন।

এই ঘরটি অতিক্রম করে প্রবেশ করলাম আরেকটি বিশাল কক্ষে। এখানেও রয়েছে নানান মাধ্যমে তৈরি অনেকগুলো শিল্পকর্ম। চোখে পড়লো ১৯৫৬-তে গড়া সিমেন্টের সেই বিখ্যাত কাজটি, The last supper। যিশুর বারোজন শিষ্য, বারো মাসের প্রতিচ্ছবি, সেই সাথে রয়েছে ধর্মীয় অনুভূতির বিমূর্ত উপস্থাপন। ঠিক একই নামে পঞ্চদশ শতাব্দীতে বহুমুখী প্রতিভাধর শিল্পী ও বিজ্ঞানী লিউনার্দ দা ভিঞ্চি’র আঁকা মুরাল পেইন্টিং রয়েছে ইতালির মিলান শহরে। এখানে একটি কথা না বললেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনে শিল্পী সালভাদর দালি ছিলেন ধর্মপ্রিয়। যদিও মাঝে মাঝে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে দোদুল্যমানতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, I believe in God but I don’t have faith…। তাই তার ধর্ম বিশ্বাসের রূপটিকেও আমার কখনো কখনো পরাবাস্তব বলে মনে হয়।  ঠিক এই শিল্পকর্মের পাশেই রাখা আছে Christ on the cross। ১৯৫১ সালে তৈরি করেছেন এই পিতলের ভাস্কর্যটির গঠনশৈলী দেখেই বুঝে নেওয়া যায় যে এটি ক্রুশবিদ্ধ যিশুকে নিয়েই গড়া। যদিও ক্রুশটি এখানে অনুপস্থিত, কিন্তু যিশুর দেহের ভঙ্গি দেখে যেমন, দুপাশে ছড়িয়ে থাকা দুটি হাত, নুয়ে পড়া মাথা আর দুইপায়ের একসাথে লেগে থাকা দেখে সহজেই বুঝা যায়, এ আর কেউ নয়– স্বয়ং ক্রুশবিদ্ধ যিশু।

প্রদর্শনী হলের এই কক্ষটির একদিকে বিশাল বিশাল কাচের জানালা। যদিও সঙ্গত কারণে জানালাগুলো এখন বন্ধ, কিন্তু প্রকৃতির প্রচুর আলো ও বাইরের দৃশ্য অবারিত রয়েছে। জানালার ফ্রেমে মাথা রেখে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। এখান থেকে বিশাল চওড়া একটি রাস্তা চলে গেছে টেমস নদীর দিকে। তার দুপাশে বহুকালের পুরানো সব বৃক্ষ। রয়েছে বৃক্ষছায়া, ক্লান্ত পথিকের বিশ্রামের জন্য বেঞ্চি, খানিকটা আরাম দেবার জন্য প্রকৃতির সবুজ আমন্ত্রণ। দেখলাম, সেখানে দাঁড়িয়ে দু’জন নারী এবং পুরুষ ঠোঁটের উষ্ণতা পান করছে। কোনো দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই, তারা যেন এভাবেই পরস্পরকে পান করছে যুগ যুগ ধরে। যদিও এসব দৃশ্য এ-দেশে খুবই স্বাভাবিক। তবু এই মুহূর্তে সালভাদর দালির সৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে দূরের ওই চুম্বনকেও মনে হচ্ছে অলৌকিক, যেন অন্যরকম কোনো শিল্পকর্ম। সালভাদর দালির এই প্রদর্শনী স্থান আর ওই খানিক দূরের চুম্বনদৃশ্য সহসা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।  ভাবনার ঘোড়া কখনো কখনো দৌড় লাগিয়েছে ভাবনাকেই হারিয়ে দেবার জন্য। আর এভাবেই পৌঁছে গেলাম প্রদর্শনীর প্রায় শেষপ্রান্তে। খানিক পরেই এখান থেকে বেরিয়ে যাব। দালির জগৎ ছেড়ে বিশ্বজগতের ভিড়ে মিশে যাব, কিন্তু সাথে করে নিয়ে বেড়াব এমন এক পৃথিবীর গল্প যার কথা জানে আমার চোখ-দৃষ্টি-মন-আত্মা, আর জানালে অন্যেরা।
(চলবে)

ছবির বর্ণনা:

১। ত্রিশ ও চল্লিশ দশকের খ্যাতিমান ইন্টেরিয়র ডিজাইনার জেন মিশাল ফ্রাঙ্ক(Jean Michel Frank)
২। ১৯৩৬শে ডালির তৈরি আসবাব- ঠোঁটাকৃতির সোফা Mae west lips sofa
৩। ব্রোঞ্জের তৈরি ভাস্কর্য Le Cabinet
৪। ক্রুশবিদ্ধ যিশু Christ on the cross

Facebook Comments

2 Comments:

  1. I have never come across with a write up in Bengali on art culture so easy to read and understand, so interesting to go through! This is an extra ordinary task but carried out so well as graspsing and assimilation of Dali to the core was there by Ferdous Nahar. Thus it was possible to communicate it in own language, style and humor to the readers …which made it more enjoyable. The language is so fluid so versatile that it gives a video effect to the readers. The style has “lifting veil after veil” sequence …interesting things are coming up one after another. Then there is lthe ittle curious girl way of looking into things that made the writing more entertaining. Good job.

  2. I suggest adding a facebook like button for the blog!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *