মরণ হ’তে জাগি (৩)

মরণ হ’তে জাগি (১) ।। মরণ হ’তে জাগি (২)

মূল: হেনরিক ইবসেন
অনুবাদ: কল্যাণী রমা

আইরিন: উনি বললেন তুমি নাকি আমার জন্য অপেক্ষা করছ।

রুবেক: আইরিন, তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করেছি বছরের পর বছর। নিজের অজান্তেই।

আইরিন: তোমার কাছে আমি আসতে পারি নি, আর্নল্ড। আমি ওখানে ঘুমিয়ে ছিলাম। এক দীর্ঘ, গভীর ঘুম – স্বপ্নে, স্বপ্নে ভরা।

রুবেক: কিন্তু এখন তো তুমি জেগে উঠেছ, আইরিন।

আইরিন: (মাথা নেড়ে) ঘুমে এখনও আমার দু’চোখের পাতা জড়িয়ে আসছে।

রুবেক: আমাদের দু’জনের জন্যই আবার ভোর হবে, আবার সূর্য ঝলমল করে উঠবে। তুমি দেখে নিও।

আইরিন: বিশ্বাস করি না! কখনো বিশ্বাস করি না!

রুবেক: আমি করি! আমি তা জানি। এই যে এখন তোমাকে আবার খুঁজে পেয়েছি –

আইরিন: জাগরিত।

রুবেক: রূপান্তরিত!

আইরিন: কেবল জাগরিত, আর্নল্ড। রূপান্তরিত নয়।

[রুবেক জলপ্রপাতের নীচে ছোট ছোট পাথরগুলোর উপর পা ফেলে ফেলে আইরিনের কাছে আসতে থাকে। তারপর আবার বসে পড়ে। আইরিন রুবেকের পাশেই আর একটা পাথরে বসে।]

রুবেক: তুমি সারাদিন কোথায় ছিলে, আইরিন?

আইরিন: (দূরে দেখিয়ে) বহুদূরে, ওই দূর মৃত্যুর দেশে –

রুবেক: (কথা বলে মনোযোগ ঘুরিয়ে) তোমার সাথে আজ – আজ তোমার বন্ধু নেই দেখছি।

আইরিন: (হেসে) আমার বন্ধু সব সময়ই আমার উপর নজর রাখছে।

রুবেক: তা কিভাবে সম্ভব?

আইরিন: (চারদিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে) হ্যাঁ, সম্ভব। সে তা পারে। আমি যেখানেই যাই না কেন, ও কখনও আমাকে তার দৃষ্টির আড়াল হ’তে দেয় না, (ফিস্‌ফিস্‌ করে) যতক্ষণ পর্যন্ত না, এক রোদ-ঝলমল সকালে ওকে আমি হত্যা করছি।

রুবেক: তুমি ওকে হত্যা করতে চাও নাকি?

আইরিন: চাই! কেবল যদি পারতাম!

রুবেক: কেন?

আইরিন: কারণ ও একটা ডাইনি। (অলক্ষিতে) জান আর্নল্ড – ও নিজেকে আমার ছায়ায় রূপান্তরিত করেছে!

রুবেক: (ওকে শান্ত করবার চেষ্টা করে) ওহ্‌, এই ব্যাপার! তা আমাদের প্রত্যেকেরই একটা করে ছায়া সাথে না রেখে আর উপায় কি বল?

আইরিন: কিন্তু আমার ছায়া আমি নিজে। (কেঁদে ফেলে) তুমি কি তা বুঝতে পারছ না, আর্নল্ড?

রুবেক: (ভারী গলায়) হ্যাঁ, আইরিন। পারছি।

[রুবেক ছোট নদীটার পাড়ে একটা পাথরের উপর বসে। আইরিন তার পাশে পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়।]

আইরিন: (কয়েক মুহুর্ত পর) তুমি আমার দিক থেকে ওভাবে চোখ ফিরিয়ে বসে আছ কেন?

রুবেক: তোমার দিকে তাকানো…সে সাহস আমার নেই, আইরিন।

আইরিন: কেন আর্নল্ড?

রুবেক: তোমার ওই ছায়া যেমন তোমাকে, আমার বিবেকও তেমনি আমাকে নিরন্তর যন্ত্রণা দেয়।

আইরিন: (খুশিতে চীত্কার করে, যেন মুক্তির আনন্দে) অবশেষে!

রুবেক: (চমকে উঠে) কি ব্যাপার আইরিন?

আইরিন: আস্তে, আস্তে কথা বল! (গভীর এক শ্বাস নিয়ে এমনভাবে কথা বলবে যেন কাঁধ থেকে এক বোঝা নেমে গেছে) এখন সত্যি আমি মুক্ত! অন্ততঃ কিছুক্ষণের জন্য হ’লেও। এখন আমরা দু’জন বসে একটু কথা বলতে পারব, ঠিক যেমনটি আগে বলতাম।

রুবেক: কেবল যদি তা পারতাম!

আইরিন: তুমি ওখানেই বসে থাক। আমি তোমার পাশে এসে বসছি।

[রুবেক আবার বসে পড়ে। আইরিন রুবেকের কাছে এসে আর একটা পাথরে বসে।]
(অল্পক্ষণ নীরবতার পর) আমি এখন এক বহুদূরের দেশ থেকে আবার তোমার কাছে ফিরে এসেছি, আর্নল্ড।

রুবেক: যেন এক অনন্ত যাত্রার শেষে!

আইরিন: ফিরে এসেছি আমার প্রভু, আমার প্রিয়র কাছে –

রুবেক: আমাদের সত্তার কাছে, নিজেদের সত্তার কাছে, আইরিন।

আইরিন: আমার জন্য তুমি দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছিলে, রুবেক?

রুবেক: তোমার জন্য অপেক্ষা করবার সে সাহস আমি কোথায় পাব?

আইরিন: (তির্যকভাবে এক পলক তাকায়) না, আমিও ভাবিনি যে তুমি অপেক্ষা করছিলে। তুমি আসলে কিছুই বোঝ না।

রুবেক: আচ্ছা, এই যে তুমি এমন করে উধাও হয়ে গেলে, তা কি সত্যিই অন্য কারও জন্য নয়?

আইরিন: তা কি তোমার জন্য হ’তে পারে না, আর্নল্ড?

রুবেক: কিন্তু…আমি বুঝতে পারছি না –

আইরিন: আমি তোমায় আমার দেহ, মনপ্রাণ দিয়ে সেবা করেছিলাম – তারপর যখন ভাস্কর্যটি সৃষ্টি হ’ল, তা সমাপ্ত হ’ল – আমাদের সন্তানের জন্ম হ’ল – তুমি তাই বলেই তো ওকে ডাকতে – তখন আমি তোমার পায়ের কাছে সবচেয়ে বড় উৎ‌সর্গটি করলাম – চিরদিনের মত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলাম।

রুবেক: (মাথা নুইয়ে) আমার জীবনটাকে মরুভূমি করে দিয়ে চলে গেলে।

আইরিন: ঠিক তাই। তুমি আবার আর কোনদিন সৃষ্টি কর তা আমি চাইনি। একবার যখন আমাদের এই সন্তান তুমি সৃষ্টি করেছ; আমাদের একমাত্র সন্তান।

রুবেক: কেন? ঈর্ষায়?

আইরিন: (শীতলভাবে) না, আমার মনে হয় ঘৃণায়।

রুবেক: ঘৃণা? আমার প্রতি ঘৃণা?

আইরিন: (অতিরিক্ত জোরের সাথে) হ্যাঁ, তোমার প্রতি। সেই শিল্পীর প্রতি, যে খুব সহজে আর অবলীলাক্রমে তুলে নিয়েছিল এক উষ্ণ, জীবন্ত শরীর, এক তরুণ মানব প্রাণ, আর তার থেকে আত্মাটি উপড়ে ফেলেছিল। কেননা তোমার শিল্প সৃষ্টির জন্য তার প্রয়োজন ছিল।

রুবেক: তুমি এ কথা বলছ? তুমি, যে কিনা তীব্র আকুলতা আর গভীর আবেগে আমার শিল্পসৃষ্টির সাথি হতে, প্রতিটি সকালে যে সৃষ্টি ছিল আমাদের উপাসনা!

আইরিন: (আবার শীতলভাবে) তোমাকে একটি কথা আমার বলতেই হবে, আর্নল্ড!

রুবেক: বল।

আইরিন: তোমার সাথে দেখা হওয়ার আগে পর্যন্ত আমি কখনো তোমার সৃষ্টিকে ভালবাসি নি। এমন কি পরেও না।

রুবেক: কিন্তু – শিল্পীকে, আইরিন?

আইরিন: আমি শিল্পীটিকে ঘৃণা করি।

রুবেক: আমার ভিতরের শিল্পীসত্তাকেও?

আইরিন: তোমার প্রায় সমস্ত কিছুকেই। নিজেকে নগ্ন করে তোমার সামনে যেদিন দাঁড়িয়েছিলাম, সেদিনও তোমাকে ঘৃণা করেছিলাম, আর্নল্ড।

রুবেক: (রূঢ়ভাবে) আইরিন, না তা সত্যি নয়। তুমি কখনই তা করনি।

আইরিন: আমি তোমাকে ঘৃণা করতাম, কেননা এত অবিচলিতভাবে তুমি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে!

রুবেক : (হেসে) অবিচলিত?

আইরিন: কিংবা নিজের উপর এমন এক ভয়ানক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। তার কারণ তুমি ছিলে শিল্পী, কেবল একজন শিল্পী, একজন মানুষ তো নও! (স্বর পরিবর্তন করে, আরো উষ্ণ আর প্রগাঢ় আবেগে) কিন্তু ওই ভেজা আর তাজা মাটির মূর্তিটি, তাকে আমি ভালবেসেছিলাম – যেমনভাবে সে উঠে দাঁড়িয়েছিল ওই আকারহীন, কাদামাটি হ’তে, যেন এক জীবন্ত মানব সন্তান! ও ছিল আমাদের সৃষ্টি; আমাদের সন্তান। তোমার আর আমার।

রুবেক: মননে আর বাস্তবে।

আইরিন: আমার এই দীর্ঘ তীর্থযাত্রা আমাদের সন্তানের জন্যই।

রুবেক: ওই মার্বেলের মূর্তিটির জন্য?

আইরিন: যা খুশী তাই বলতে পারো। আমি ওকে আমাদের সন্তান বলি।

রুবেক: (অস্বস্তিভরে) এখন কি তাকে দেখতে চাও? পরিসমাপ্ত অবস্থায়? আর মার্বেলে, যাকে তুমি সবসময় বলতে এত ঠাণ্ডা?                                                             (আগ্রহভরে) কি জানি তুমি হয়ত জান না। এখন ওই মূর্তিটি রয়েছে বহুদূরের এক বিশাল মিউজিয়ামে।

আইরিন: হ্যাঁ, সেরকম কিছুই যেন শুনেছিলাম।

রুবেক: তুমি সব সময় মিউজিয়ামগুলোকে ঘৃণা করতে। বলতে ওগুলো নাকি সমাধিস্থল।

আইরিন: আমি সেই তীর্থে যেতে চাই যেখানে আমার আত্মা আর আত্মার সন্তান সমাধিতে শায়িত।

রুবেক: তুমি কোনভাবেই ওই মূর্তিটি আর কখনো দেখবে না! অসম্ভব! তোমাকে অনুরোধ করছি, না, কখনো না, আর কখনো তা দেখবে না!

আইরিন: ভাবছ দ্বিতীয়বার আমার মৃত্যু হবে?

রুবেক: জানি না, আমি ঠিক কি ভাবছি। কিন্তু বল, কিভাবে বুঝব যে এই মূর্তির সাথে তুমি তোমার চিন্তাগুলো এমন গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলবে? মূর্তিটি শেষ হওয়ার আগেই তো তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে।

আইরিন: নাহ্‌, ওটা শেষ হয়েছিল। সে জন্যই আমি তোমাকে একা ফেলে চলে যেতে পেরেছিলাম।

রুবেক: (কনুইদু’টো হাঁটুর উপর রেখে বসে। মাথা এপাশ-ওপাশ নাড়াতে থাকবে। হাতদু’টো চোখের উপর) শেষের দিকে মূর্তিটা একটু বদলে গিয়েছিল। একটু অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল, আইরিন।

আইরিন: (নিঃশব্দে ও দ্রুত বুকের ভিতর থেকে একটি পাতলা, ধারাল ছুরি বের করে আনে। ফিস্‌ফিস্‌ করে বলে) আর্নল্ড, তুমি কি আমাদের সন্তানের ক্ষতি করেছ?

রুবেক: (এড়ানোর চেষ্টা করে) ক্ষতি করেছি? আমি ঠিক জানি না, তুমি একে কি বলবে!

আইরিন: কি করেছ তুমি?

রুবেক: হ্যাঁ, তোমাকে বলব। কিন্তু প্রতিজ্ঞা কর যে শান্তভাবে বসে তা শুনবে। আর সে সময় আমার দিকে তাকাবে না।

আইরিন: (ছুরিটি লুকিয়ে রুবেকের পিছনে একটি পাথরের কাছে সরে যাবে) আমি এই এখানে তোমার পিছনে বসছি। এখন বল।

রুবেক: (চোখ থেকে হাত দু’টো সরিয়ে নিয়ে) তোমাকে খুঁজে পাওয়ার সাথে সাথেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তোমাকে কিভাবে ব্যবহার করব। তুমি হ’বে আমার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। আমার তখন অল্প বয়স। জীবনের কোন অভিজ্ঞতাই হয়নি। আমি মানসচক্ষে দেখেছিলাম পুনরুত্থান যেন এমন একটা কিছু যা পরিপূর্ণ আর সুন্দর – এক পবিত্র, কুমারী মেয়ের মত, জীবনের কোন মলিনতাই যাকে স্পর্শ করেনি, আর যে জেগে উঠছে যেন এক স্বর্গীয় মহিমায়।

আইরিন: আর এখন সেভাবেই সেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি?

রুবেক: (অনিচ্ছাকৃতভাবে) না, ঠিক সেভাবে নয়, আইরিন।

আইরিন: ঠিক সেভাবে নয়…? যেমন আমি তোমার সামনে দাঁড়াতাম, ঠিক সেভাবে সেখানে দাঁড়িয়ে নেই?

রুবেক: (সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে) আসলে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পরের বছরগুলোতে আস্তে আস্তে আমি অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, জ্ঞান বেড়েছে। মনে হয়েছে “পুনরুত্থানের দিন” যেন আরও বিশাল, আরও জটিল কোন কিছু। তখন আমি যা প্রকাশ করতে চাইলাম তার জন্য ওই ছোট গোল বেদি, যার উপর তোমার মূর্তিটি একাকী দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে যেন আর যথেষ্ট বড় মনে হ’ল না।

আইরিন: (তার হাত ছুরির দিকে যেতে গিয়ে থেমে যায়) হুঁম, তারপর?

রুবেক: চারপাশের পৃথিবীতে যা দেখতে পেলাম, তার প্রতিকৃতি আঁকলাম। আমাকে তা করতেই হ’ল; আর কোন উপায় ছিল না, আইরিন। বেদি আরও বড় করে তুললাম, আরও প্রশস্ত। তার উপর বসালাম আমাদের এই ফাটলধরা পৃথিবীর এক ছোট প্রতিকৃতি। আর ওই ফাটলগুলোর মাঝ দিয়ে দলে দলে বের হয়ে আসছে মানুষরূপী, মুখোশধারী সব পশু। নরনারী, জীবন থেকে তাদের যেমন জেনেছিলাম।

আইরিন: কিন্তু ওই ভিড়ের মাঝখানে সেই মেয়েটি কি আর দাঁড়িয়ে নেই? মুখে যার সুখী আলোর ছটা? বল, আমি সেভাবেই আছি। সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছি না, আর্নল্ড?

রুবেক: (এড়িয়ে গিয়ে) ঠিক মাঝখানে নয়। আসলে মূর্তিটিকে আমার সামান্য একটু পিছনে সরিয়ে দিতে হয়েছিল – কম্পোজিশনের কারণে; বুঝতে পারছ নিশ্চয়। তা না হ’লে সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে তা যেন বড় বেশি প্রকট হ’য়ে উঠছিল।

আইরিন: কিন্তু এখনও আমার মুখ থেকে বিস্ময় আর আনন্দের সেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে তো?

রুবেক: হ্যাঁ, আইরিন, তা পড়ছে। হয়তো কিছুটা প্রশমিত হ’য়ে। জীবন সম্বন্ধে আমার পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে মিল রেখে!

আইরিন: (নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়) এই নতুন ভাস্কর্যটি – এখন তুমি যেভাবে জীবনকে দেখ – সেভাবেই কি তাকে প্রকাশ করছে, আর্নল্ড?

রুবেক: হ্যাঁ, আমার তো তাই মনে হয়।

আইরিন: আর এখন এই ভাস্কর্যে তুমি আমাকে ভিড়ের মাঝে এক “ব্যাক গ্রাউন্ড ফিগার” করে দেখিয়েছ? (সে ছুরিটি বের করে।)

রুবেক: না, না, ঠিক তা নয়। বড় জোর আমি একে একটি “মিড্‌ল গ্রাউন্ড ফিগার” – কিংবা তার কাছাকাছি কিছু বলব।

আইরিন: (ফিস্‌ফিস্‌ করে) নিজের বিচারের রায় তুমি নিজেই দিলে রুবেক। (ছুরিটি দিয়ে ওকে আঘাত করতে প্রায় উদ্যত হবে।)

রুবেক: (ঘুরে ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে) বিচারের রায়?

আইরিন: (তাড়াতাড়ি ছুরিটি লুকিয়ে ফেলে) আমার সম্পূর্ণ সত্তা – তুমি, আমি, আমরা – আমরা এবং আমাদের সন্তান, আমরা সবাই ছিলাম ওই নিঃসঙ্গ মূর্তিটির মাঝে।

রুবেক: (উত্তেজিত হ’য়ে মাথা থেকে টুপি খুলে নিয়ে কপালের ঘাম মুছে) জান, এই ভিড়ের মাঝে নিজেকে আমি কিভাবে ফুটিয়ে তুলেছি? সামনের দিকে, এক ঝরণার পাশে, বসে আছে একটা মানুষ, পাপের ভারে নত, নিজেকে সে পৃথিবীর কঠিন আবরণ থেকে মুক্ত করতে পারছে না। ও যেন এক তীব্র অনুশোচনার প্রতিভূ – এক পরিত্যক্ত জীবনের জন্য অনুশোচনা। সমস্ত গ্লানি ধুয়ে ফেলবার জন্য ঢেউয়ের মাঝে আঙ্গুলগুলো ডুবিয়ে সে বসে আছে। কিন্তু সে যে তা কোনদিন পারবে না, তা সে জানে, তাই মন তার নিদারুণ যন্ত্রণা আর ব্যথায় ভরে গেছে। সে কখনো, কোনদিন; অনন্তকাল পরেও নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। পুনরুত্থিত হবে না। তাকে চিরকাল থাকতে হবে তার নিজের নরকেই।

আইরিন: (শীতলভাবে) কবি!

রুবেক: কেন এমন বলছ?

আইরিন: কেননা তুমি এত কোমল, এত অসংযমী। আর এ পর্যন্ত যা কিছু করেছ বা ভেবেছ, সেই সব পাপ ক্ষমা করে দিতে সব সময়ই এত প্রস্তুত! তুমি আমার সত্তাকে হত্যা করেছ, আর নিজেকে মূর্ত করেছ প্রায়শ্চিত্ত আর অনুশোচনার এক মূর্তি হিসাবে। (হেসে) আর তোমার দৃষ্টিতে তাতেই তোমার সব কর্তব্য শেষ।

রুবেক: আমি একজন শিল্পী, আইরিন। নিজ চরিত্রের দুর্বলতার জন্য একটুও লজ্জিত নই। তুমি তো জানই আমি একজন শিল্পী হওয়ার জন্যই জন্মেছি, আর কখনও, কোনদিন অন্যকিছু আমি হ’তে পারব না।

আইরিন: (কোমলভাবে)তুমি একজন কবি, আর্নল্ড। (রুবেকের চুলে আঙ্গুল বুলিয়ে দিয়ে)বুড়ো খোকা, সেটা কি তুমি বুঝতে পারছ না?

রুবেক: কিন্তু বারবার আমাকে এমন কবি কবি বলছ কেন?

আইরিন: কেন না এই শব্দটিতে এমন কিছু আছে যা সব পাপ ক্ষমা করে দেয়, আর সব দুর্বলতার উপর এক আবরণ বিছিয়ে দেয়,(হঠাৎ‌ গলার স্বর পরিবর্তন করে)কিন্তু একসময় আমি তাজা রক্তমাংসের মানুষ ছিলাম। আমারও জীবনকে উপভোগ করবার অধিকার ছিল, ছিল তাকে পূর্ণ করার স্বপ্ন। কিন্তু তোমার সেবা করবার জন্য আমি সবকিছু দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। এ ছিল আত্মহত্যা – আমার নিজের বিরুদ্ধে এক ভয়ানক পাপ। আর এমন এক পাপ যার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারব না, কখনো, কোনদিন।
[আইরিন নদীটির পাশে রুবেকের পাশে এসে বসে, দৃষ্টি তার দিকে রেখে। যদিও রুবেক তা দেখে না। আনমনে, সে তাদের চারপাশের ঝোপঝাড় থেকে কিছু ফুল তুলতে থাকে।]

আইরিন: পৃথিবীতে আমি অনেক সন্তানের জন্ম দিতে পারতাম – জীবন্ত সব সন্তান। ওরকম সমাধির মাঝে ঘুমিয়ে থাকা নয়। সেই তো আমার প্রতি জীবনের আহবান ছিল। তোমাকে সাহায্য করা আমার ভুল হয়েছে, কবি!

রুবেক: (স্মৃতির মাঝে হারিয়ে যায়) কিন্তু আইরিন, আমাদের ওই সময়গুলো কী চমত্কার ছিল। বিস্ময়কর সব সময় – আজ যখনই পিছনে ফিরে তাকাই তখনই মনে হয়।

আইরিন: মনে আছে, কাজ শেষে আমাকে তুমি কি বলেছিলে? ছোট একটা শব্দ।

রুবেক: এমন কিছু যা এখনও মনে করে রেখেছ?

আইরিন: হ্যাঁ। তোমার মনে নেই?

রুবেক: এই মুহুর্তে ঠিক মনে করতে পারছি না তো।
আইরিন: তুমি আমার হাত দু’টো নিয়ে মৃদু চাপ দিয়েছিলে। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছিলাম। তখন বলেছিলে,“আমি তোমার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ, আইরিন।” বলেছিলে, “এটা আমার জীবনের এক অনুপ্রেরণার কাহিনী।”

রুবেক: “কাহিনী”? এই শব্দটি ব্যবহার করবার অভ্যাস তো আমার নেই!

আইরিন: হ্যাঁ, “কাহিনী” – ঠিক এই শব্দটিই তুমি ব্যবহার করেছিলে।

রুবেক: (হালকাভাবে কথা বলবার চেষ্টা করে) কি জানি হবে হয়ত – কিন্তু সত্যি যে এটা তাই ছিল! এক কাহিনী!

আইরিন: এই শব্দটির জন্য আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।

রুবেক: যে কোন আঘাতকেই তুমি খুব বড় করে দেখ, আইরিন।

আইরিন: (কপাল মুছে) হ্যাঁ, হয়ত। তুমি ঠিকই বলেছ। যাই হোক, এসব কথা এখন থাক। (একটি পাহাড়ি গোলাপের পাপড়ি নদীটির উপর ভাসিয়ে দেয়) দেখ, আর্নল্ড, আমাদের পাখিগুলি কেমন সাঁতার কাটছে।

রুবেক: ওগুলো কি পাখি?

আইরিন: দেখতে পাচ্ছ না? ওগুলো ফ্ল্যামিংগো। গোলাপের মতো লাল।

রুবেক: ফ্ল্যামিংগো তো সাঁতার কাটে না। কেবল জলের মাঝে হেঁটে বেড়ায়।

আইরিন: ঠিক আছে; তবে ওগুলো ফ্ল্যামিংগো নয়। শঙ্খচিল।

রুবেক: ও হ্যাঁ, লাল ঠোঁটের শঙ্খচিল। (বড় বড় সবুজ পাতা তুলে সে তা জলে ছুঁড়ে দেয়) এখন আমি ওদের পিছনে আমার নৌকা ভাসিয়ে দিলাম।

আইরিন: কিন্তু নৌকার ভিতর যেন কোন শিকারি না থাকে।

রুবেক: না, কোন শিকারি নেই। (আইরিনের দিকে তাকিয়ে হাসে) আচ্ছা, সেই গ্রীষ্মের কথা মনে আছে? যখন আমরা টনিত্জ হ্রদের সেই ছোট্ট খামার বাড়িটার বাইরে এভাবে বসে থাকতাম?

আইরিন: (মাথা নেড়ে) হ্যাঁ, শনিবারের সন্ধ্যাগুলোয়। সপ্তাহের কাজ শেষে।

রুবেক: ট্রেনে করে আমরা সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। রবিবার পর্যন্ত থেকেছিলাম।

আইরিন: সে এক কাহিনী, আর্নল্ড!

রুবেক: (না শোনার ভান করে) তখনও তুমি এমনি করে পাখি বানিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিলে। জলপদ্মগুলোকে –

আইরিন: শাদা রাজহাঁস!

রুবেক: হ্যাঁ, সাদা রাজহাঁস। মনে পড়ে একটা বড় পাতা আমি একটা হাঁসের সাথে বেঁধে দিয়েছিলাম।

আইরিন: তারপর তা লহেংগ্রিনের নৌকা হয়ে গিয়েছিল, রাজহাঁসটি টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

রুবেক: তুমি এই খেলাটা কী ভালোই না বাসতে, আইরিন।

আইরিন: কতবার এই খেলা খেলেছি।

রুবেক: প্রত্যেক শনিবার। সারাটা গ্রীষ্মকাল ধরে।

আইরিন: তুমি বলেছিলে আমিও এমন একটি রাজহাঁস যে কিনা তোমার জীবনের নৌকা টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

রুবেক: বলেছিলাম নাকি? হবে হয়তো। (খেলায় মগ্ন হয়ে) ওই যে দেখ, দেখতে পাচ্ছ, আইরিন, কিভাবে শঙ্খচিলগুলো নদীতে সাঁতার কাটছে?

আইরিন: (হেসে) আর তোমার সব নৌকা চড়ায় আটকে যাচ্ছে।

রুবেক: (আরও পাতা নদীতে ছুঁড়ে দিয়ে) আমার কাছে অনেক নৌকা আছে। (পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর আরও পাতা ছুঁড়ে ফেলে। এক মুহূর্ত পর) আইরিন, আমি টনিত্জ হ্রদের সেই ছোট খামার বাড়িটা কিনেছি।

আইরিন: কিনেছ? তুমি অবশ্য প্রায়ই বলতে, যদি কখনো সামর্থ হয়, ওটা কিনবে।

রুবেক: হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত বেশ পয়সাকড়ি হ’ল। ওটা কিনে ফেললাম।

আইরিন: (তার দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে) তুমি কি এখনও আমাদের সেই পুরানো বাড়িতেই থাক?

রুবেক: না, অনেক আগেই ওটাকে ভেঙ্গে ফেলে সে জায়গায় একটা চমত্কার ভিলা তৈরী করেছি। পাশে একটা পার্কও। সেখানে আমরা –(শুধরে নিয়ে) – ওখানে সাধারণতঃ আমি গ্রীষ্মকালটা কাটাই।

আইরিন: তাহলে তুমি আর – আর ওই মহিলা এখন সেখানে থাক?

রুবেক: হ্যাঁ, যখন আমি আর আমার স্ত্রী বাইরে কোথাও না যাই। ঠিক যেমন এ বছর বেড়িয়েছি।

আইরিন: চমত্কার, টনিত্জ হ্রদে চমত্কার এক জীবন ছিল।

রুবেক: কিন্তু তবুও; আইরিন –

আইরিন: তবুও আমরা ওইসব সৌন্দর্যকে হারিয়ে যেতে দিয়েছি।

রুবেক: (ব্যগ্রভাবে) আবার কি তাকে খুঁজে পেতে পারি না? খুব কি দেরি হয়ে গেছে?

আইরিন: (উত্তর না দিয়ে এক মুহূর্ত নীরব থাকে, তারপর মালভূমির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে) দেখ, আর্নল্ড, পাহাড়ের পিছনে সূর্য ডুবছে! দেখ, গাছপালার উপর কেমন লাল রঙ ছড়িয়ে পড়ছে!

রুবেক: (তার দৃষ্টি অনুসরণ করে)পাহাড়ের গায়ে সূর্যাস্ত দেখি নি, সে আজ বহুদিন হ’ল।

আইরিন: নাকি সূর্যোদয়?

রুবেক: জীবনে কখনো, কোনদিন সূর্যোদয় দেখেছি বলে তো মনে হয় না!

আইরিন: (হেসে) একবার এক আশ্চর্য সুন্দর সূর্যোদয় দেখেছিলাম।

রুবেক: কোথায়? কোথায় দেখেছিলে?

আইরিন: অনেক, অনেক উঁচুতে, মাথা প্রায় ঝিমঝিম করে ওঠে এমন এক উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়। সেখানে তুমি আমাকে লোভ দেখিয়েছিলে। প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে, আমাকে পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য দেখাবে, যদি – (হঠাৎ থেমে যায়)

রুবেক: যদি –? যদি কি?

আইরিন: তুমি যা বলেছিলে, আমি তো তা করেছি। পাহাড়ের ওই চূড়া পর্যন্ত তোমাকে অনুসরণ করেছি। সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে তোমার উপাসনা করেছি। তোমার সেবা করেছি। (এক মুহূর্ত নীরব থেকে, তারপর শান্তভাবে) তারপর দেখতে পেয়েছিলাম সেই সূর্যোদয়।

রুবেক: (দ্বিধাগ্রস্তভাবে) তুমি কি আমাদের সাথে আসবে, আইরিন? আমাদের সাথে থাকবে ওই ভিলায়?

আইরিন: তোমার আর ওই মহিলাটির সাথে?

রুবেক: আমার সাথে। যখন আমরা একাত্ম হয়ে সৃষ্টি করতাম, তখনকার দিনগুলোর মত। আমার ভিতর যত তালা বন্ধ হয়ে গেছে, সব তুমি খুলে দিতে পার। বল আইরিন, আসবে না?

আইরিন: (মাথা ঝাঁকিয়ে) আমার কাছে চাবিটি আর নেই, আর্নল্ড!

রুবেক: তোমার কাছেই আছে, কেবলমাত্র তোমার কাছে। আমায় আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে দাও।

আইরিন: শুন্য স্বপ্ন। অলস, মৃত সব স্বপ্ন। আমাদের জীবন একসাথে, আবার কোনদিন পুনরুত্থিত হ’তে পারে না।

রুবেক: (সংক্ষিপ্তভাবে) তবে এস, আমাদের এই খেলাটাই চালিয়ে যাই তবে।

আইরিন: আমাদের খেলা, হ্যাঁ, সেই ভালো।

[আইরিন আর রুবেক ফুলের পাপড়ি আর পাতা নদীতে ছুঁড়ে দিতে দিতে তাদের ভেসে যাওয়া দেখে। পাহাড়ের উপরে বাম দিক থেকে উল্‌ফ্‌হাইম আর মায়া উঠে আসে। পরনে শিকারের পোশাক। তাদের পিছন পিছন চাকরটি তার কুকুরের পাল নিয়ে এসে ডানদিকে চলে যায়।]

রুবেক: (তাদের দিকে তাকিয়ে) ওই যে মায়া – চলেছে তার ভালুক শিকারির সাথে।

আইরিন: হ্যাঁ, তোমার সঙ্গিনী।

রুবেক: কিংবা তার।

মায়া: (হাঁটতে হাঁটতে চারদিক দেখতে থাকে। তারপর নদীর পাশে দু’টো মানুষের মূর্তি দেখে চীত্কার করে বলে ওঠে) গুড নাইট, প্রফেসর! স্বপ্নেই আমার দেখা পাবে। এক অভিযানে চললাম।

রুবেক: (চীত্কার করেই বলে উঠবে) কিসের সন্ধানে?

মায়া: (আগের চেয়ে কাছাকাছি এসে) জীবন, সত্যিকারের জীবনের খোঁজে। কোন বিকল্প জীবন নয়।

রুবেক: (বিদ্রূপ করে) বাহ্‌বা! তুমিও?

মায়া: হ্যাঁ, আমিও। এ বিষয়ে একটা গান বেঁধেছি, শুনবে? (খুশি মনে গান ধরে)

আমি মুক্ত! আমি স্বাধীন! বন্ধনহীন!
বন্ধন হ’ল ক্ষয়! যেন এক মুক্ত বিহঙ্গ আমি!
স্বাধীন! বন্ধনহীন!

হ্যাঁ, মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত যেন আমিও জেগে উঠছি।

রুবেক: শুনে তো তাই মনে হচ্ছে।

মায়া: (গভীর একটা দম নিয়ে) জেগে উঠবার পর কি এক অপূর্ব, স্বর্গীয় অনুভূতি হয়!

রুবেক: শুভরাত্রি, মায়া, তোমার সৌভাগ্য কামনা করি।

উল্‌ফ্‌হাইম: (উচ্চস্বরে সাবধান করে দিয়ে) খবরদার! আমরা আপনার কোন শুভেচ্ছা চাইনা। দেখতে পাচ্ছেন না, শিকারে যাচ্ছি?

রুবেক: মায়া, শিকার থেকে আমার জন্য কি আনবে?

মায়া: একটা চমত্কার বাজপাখি শিকার করে আনব ভাবছি। মডেল করতে পারবে।

রুবেক: (তিক্তভাবে হেসে) তা পাখি শিকারেই তুমি কিছুটা সিদ্ধহস্ত, তাই না?

মায়া: (মাথা দুলিয়ে) এখন থেকে আমাকে নিজের মত জীবন কাটাতে দাও। (কুটিলভাবে হেসে) এবার তবে আসি। পাহাড়ের শান্ত, সুন্দর গ্রীষ্মের রাতকে উপভোগ কর।

রুবেক: (প্রফুল্লভাবে) ধন্যবাদ! তোমাদের দু’জনের – আর তোমাদের শিকারের উপর দারুণ দুর্ভাগ্য নেমে আসুক!

উল্‌ফ্‌হাইম: (হো হো করে হেসে উঠবে) এইতো, এ ধরনের শুভেচ্ছাবাণীই তো আমার পছন্দ।

মায়া: (হেসে) ধন্যবাদ! ধন্যবাদ! প্রফেসর!

[তাঁরা ডানদিকের ছোট ঝোপের মাঝ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাবে।]

রুবেক: (সামান্য বিরতির পর) পাহাড়ের উপর গ্রীষ্মের রাত! হ্যাঁ, সেই তো সত্যিকারের জীবন।

আইরিন: গ্রীষ্মের একটি রাত কি এখানে কাটাতে চাও? এখানে, আমার সাথে?

রুবেক: (দুই হাত প্রসারিত করে দিয়ে) হ্যাঁ, এস! এস! আইরিন!

আইরিন: প্রিয় আমার! প্রভু আমার!

রুবেক: ওহ্‌, আইরিন!

আইরিন: (হাসতে হাসতে সে ছুরিটি হাতড়াতে থাকে) এটি শুধুমাত্র একটি কাহিনী হয়ে থাকবে। (হঠাৎ‌ ফিস্‌ফিস্‌ করে বলে উঠবে) চুপ! ঘুরে তাকিও না, আর্নল্ড!

রুবেক: (তেমনই মৃদুস্বরে) কি ব্যাপার?

আইরিন: কেউ আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

রুবেক: (অনিচ্ছাকৃতভাবেই ঘুরে তাকায়) কোথায়? (চমকে) আহ্‌!
[নীচের দিকে ডানে যে পথ চলে গেছে, তার মাঝের ঝোপগুলোর ভিতর থেকে নানের মাথা অর্ধেক দেখা যায়। তার চোখগুলো আইরিনের উপর স্থির।]

আইরিন: (উঠে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে) এবার আমাদের বিদায় নিতে হবে। না, নড়োনা, যা বলছি তাই করো। আমার সাথে সাথে এস না এখন। (তার দিকে হেলে ফিস্‌ফিস্‌ করে বলে) আজ রাতে আমাদের দেখা হবে। পাহাড়ের উপরে।

রুবেক: তুমি আসবে, আইরিন?

আইরিন: আসব। এখানে আমার জন্য অপেক্ষা করো।

রুবেক: (পুনরাবৃত্তি করে, যেন স্বপ্নের ভিতর) পাহাড়ের উপর গ্রীষ্মের রাত! তোমার সাথে! (রুবেকের দৃষ্টি আইরিনের দৃষ্টির সাথে মিলিত হয়) ওহ্‌, আইরিন, সেটাই আমাদের জীবন হ’তে পারত। আর আমরা তা নষ্ট করেছি –

আইরিন: আমরা যা হারাই, তা তখনই জানতে পারি যখন – (আকস্মিকভাবে থেমে যাবে)

রুবেক: যখন –?

আইরিন: যখন আমরা মৃতরা জেগে উঠি।

রুবেক: (বিষণ্নভাবে মাথা নেড়ে) তখন কি বুঝতে পারি?

আইরিন: বুঝতে পারি যে আমরা কোনদিন জীবিত ছিলাম না।
[আইরিন পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে থাকে। নান তার জন্য পথ করে দেয় ও তাকে অনুসরণ করে। প্রফেসর রুবেক নিশ্চল হ’য়ে বেঞ্চে বসে থাকে।]

মায়া: [অনেক উঁচু থেকে তার গান শোনা যায়]

আমি মুক্ত! আমি স্বাধীন! বন্ধনহীন!
বন্ধন হ’ল ক্ষয়! যেন এক মুক্ত বিহঙ্গ আমি!
স্বাধীন! বন্ধনহীন!

(চলবে)

 

Facebook Comments

৪ Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।