মরণ হ’তে জাগি(শেষ পর্ব)


মরণ হ’তে জাগি (১)   মরণ হ’তে জাগি (২) মরণ হ’তে জাগি (৩)

মূল: হেনরিক ইবসেন
অনুবাদ: কল্যাণী রমা

তৃতীয় অঙ্ক

এক বুনো, ভাঙ্গাচোরা পাহাড়ের চূড়া। পিছনে জলপ্রপাত নেমে গেছে। ডানে, বরফে ঢাকা চূড়াগুলো ভেসে থাকা কুয়াশার আড়ালে প্রায় অদৃশ্য। বামদিকে, স্তূপীকৃত পাথরের মাঝে এক পুরনো, জীর্ণ কুটির। ভোর হচ্ছে, সূর্য এখনো ওঠেনি।
মায়া রুবেক খুব উত্তেজিত হ’য়ে হাঁপাতে হাঁপাতে পাথরের স্তূপের উপর দিয়ে নেমে আসছে। আর উল্‌ফ্‌হাইম কিছুটা রেগে এবং একই সাথে হাসতে হাসতে মায়ার পোশাকের আস্তিন আঁকড়ে ধরে তার পিছন পিছন।

মায়া:(নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা ক’রে) ছেড়ে দাও। আমায় ছেড়ে দাও, বলছি!

উল্‌ফ্‌হাইম: আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, কামড়ে দেবে নাকি? মেজাজ দেখি একেবারে ষোল আনা।

মায়া: (হাতে আঘাত করে) বলছি ছেড়ে দাও! ভদ্র ব্যবহার করতে চেষ্টা কর।

উল্‌ফ্‌হাইম: তা করলে কি আর আমার চলে?

মায়া: তবে আর এক পা-ও তোমার সাথে যাব না। আর এক পা-ও নয়।

উল্‌ফ্‌হাইম: (জোরে হেসে ওঠে) বটে? এখানে এই পাহাড়ের মাথায় আমার কাছ থেকে পালাবে কি করে?

মায়া: (গভীর গিরিখাতের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে) দরকার হ’লে আমি দৌড়ে ওখানে নেমে যাব।উল্‌ফ্‌হাইম: আর নাকমুখ থেঁতলে নিজেকে একতাল মাংসপিণ্ড বানাবে, এই তো? এক চমৎ‌কার সুস্বাদু রক্তাক্ত পুডিং তৈরী হবে। (মায়া-কে ছেড়ে দিয়ে) বেশ, চাও তো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দৌড়ে নামো গিয়ে। তবে কিনা ওটা দেয়ালের মতই খাড়া। নীচে নামার জন্য কেবলমাত্র একটি সরু পথই আছে, আর তা থেকে নরকের দরজা খুব বেশি দূরে নয়।

মায়া: (স্কার্টের ধুলো হাত দিয়ে ঝেড়ে তার দিকে রেগে তাকায়) শিকারের সঙ্গী হিসাবে তুমি দেখছি চমৎ‌কার!

উল্‌ফ্‌হাইম: এখানেই তো খেলার মজা।

মায়া: একে তুমি খেলা বল?

উল্‌ফ্‌হাইম: হ্যাঁ গো রূপসী, যে ধরনের খেলা আমি সবচেয়ে ভালোবাসি।

মায়া: (মাথা ঝাঁকিয়ে) হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে। (এক মুহূর্ত পর) তুমি এখানে শিকারী কুকুরগুলোকে ছেড়ে দিলে কেন?

উল্‌ফ্‌হাইম: (চোখ টেপে ও হাসে) ওদেরকে নিজেদের ইচ্ছেমত শিকার করবার একটা সুযোগ দেওয়ার জন্য।

মায়া: ডাহা মিথ্যা! তুমি মোটেও ওদের সেজন্য ছেড়ে দাওনি।

উল্‌ফ্‌হাইম: (তখনও হাসছে) বটে? তবে কেন দিয়েছি? বলতো!

মায়া: ছেড়ে দিয়েছ, কেননা লারস্‌ এখান থেকে চলে যাক, তাই তুমি চেয়েছিলে। তুমি ওকে কুকুরগুলোর পিছনে দৌড়িয়ে ওদের ধরে আনতে বললে, আর ইতিমধ্যে-

উল্‌ফ্‌হাইম: আর ইতিমধ্যে-?

মায়া: যাক সে কথা!

উল্‌ফ্‌হাইম: লারস্‌ ওদের খুঁজে পাবেনা। তুমি সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পার। আর সময় না হ’লে সে আসবেও না।
মায়া: (রাগত কণ্ঠে) তাতে কোন সন্দেহ

উল্‌ফ্‌হাইম: (মায়ার হাত ধরবার চেষ্টা করবে) লারস্‌ আমার – আমার শিকারের অভ্যাসগুলো ভালোমত জানে, বুঝেছ?

মায়া: (তার নাগাল এড়িয়ে যায়। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নেয়) জান তো উল্‌ফ্‌হাইম, তুমি কেমন দেখতে? ঠিক রূপকথার সেই ‘ফন’-এর মত।

উল্‌ফ্‌হাইম: ‘ফন’? সে তো বোধহয় দৈত্য-টৈত্য কিছু হবে? বনের দানব কিংবা ওই ধরনের কিছু একটা না?

মায়া: হ্যাঁ, ঠিক তোমার মত। ছাগলের মত দাড়ি আর ছাগলের মত পা – ও হ্যাঁ, শিংও আছে।

উল্‌ফ্‌হাইম: হা ঈশ্বর, শিংও?

মায়া: লম্বা একজোড়া শিং, ঠিক তোমার যেমন।

উল্‌ফ্‌হাইম: বলো কি? তুমি আমার শিংজোড়া দেখতে পাচ্ছ নাকি?

মায়া: হ্যাঁ, যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে।

উল্‌ফ্‌হাইম: (তার পকেট থেকে কুকুরের লীশ্‌টা বের করে)হুঁম, তবে তো দেখছি তোমাকে বেঁধে রাখাই ভালো।

মায়া: তুমি কি পাগল হ’লে নাকি? আমাকে বেঁধে রাখবে?
উল্‌ফ্‌হাইম: যদি দৈত্য-দানোই হই, তবে সে ভূমিকা ভালোভাবেই তো পালন করা উচিত। তারমানে এই হ’ল গিয়ে ব্যাপার! তুমি আমার শিংজোড়া বেশ ভালোমতই দেখতে পাচ্ছ, তাই না?

মায়া: (গলার স্বর নরম করে)আহ্‌, উল্‌ফ্‌হাইম। পাগলামো কোরোনা তো। কিন্তু তুমি যে শিকারের কুটিরের কথা এত বলছিলে, সেটা কোথায়? তুমি তো বলেছিলে ধারেকাছেই এখানে কোথাও সেটা আছে।

উল্‌ফ্‌হাইম: (কুটিরটির দিকে সাড়ম্বরে অঙ্গুলি নির্দেশ করে) ঐতো, তোমার চোখের ঠিক সামনে।

মায়া: (উল্‌ফ্‌হাইমের দিকে অবাক হ’য়ে তাকিয়ে) ঐ শুয়োরের খোঁয়াড়টা?

উল্‌ফ্‌হাইম: (চাপা হাসি দিয়ে) এক সময়ে একাধিক রাজকুমারি এখানে থেকে গেছে।

মায়া: তুমি যার কথা বলেছিলে – সেই যে ভয়ঙ্কর লোকটা, ভালুকের ছদ্মবেশে রাজকুমারির কাছে গিয়েছিল – এটাই কি সে জায়গা?

উল্‌ফ্‌হাইম: হ্যাঁ গো, সুন্দরী, এটাই সেই জায়গা। (আমন্ত্রণ করার ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে) আসতে আজ্ঞা হোক।

মায়া: এহ্‌! ওর মধ্যে পা দেওয়া! ছ্যা ছ্যা!

উল্‌ফ্‌হাইম: এখানে দু’জন মানুষ আরামেই একটা গ্রীষ্মের রাত কাটিয়ে দিতে পারে। চাও তো সম্পূর্ণ গ্রীষ্মকালও।

মায়া: ধন্যবাদ, আমার সে রকম কোন ইচ্ছা নেই। (অধৈর্য্য হয়ে) কিন্তু তোমার শিকারের এই অভিযান যথেষ্ট হয়েছে। আমি নিচে হোটেলে চললাম, সব লোকজন ঘুম থেকে জেগে উঠবার আগেই।

উল্‌ফ্‌হাইম: কিন্তু কিভাবে যাবে?

মায়া: সে তুমিই জান। নিশ্চয়ই নিচে যাওয়ার কোন একটা পথ আছে।

উল্‌ফ্‌হাইম: (ষ্টেজের পিছনে অঙ্গুলি নির্দেশ করে) হ্যাঁ, নিচে যাওয়ার একটা পথ আছে বটে, ঐ দিকে।

মায়া: এই তো সভ্যভব্যের মত ব্যবহার-

উল্‌ফ্‌হাইম: যাও না, কেবল একবার চেষ্টা করে দেখ না।

মায়া: (সন্দেহভরে) ভাবছ আমার সাহস নেই?

উল্‌ফ্‌হাইম: সাহস দেখানোর সুযোগই পাবেনা।

মায়া: (অস্বস্তিভরে) ভালো, তবে এসে আমায় সাহায্য করো তো দেখি। তুমি এখানে আছ কি করতে?

উল্‌ফ্‌হাইম: আমি বরং–যদি তোমাকে আমার পিঠে করে নিয়ে যাই-?

মায়া: পাগলামো কোরোনা তো!

উল্‌ফ্‌হাইম: কিংবা আমার কোলে ক’রে?

মায়া: ঈশ্বরের দোহাই, আবার ঐ বিদঘুটে কাণ্ড শুরু কোরোনা তো!

উল্‌ফ্‌হাইম: (রাগ চেপে) একবার এক অল্পবয়েসী মেয়েকে এমন করেছিলাম। ওকে রাস্তার পাশ থেকে তুলে আমার কোলে বয়ে নিয়ে চলেছিলাম। ওকে ঠিক অমনি করে জীবনভর বয়ে নিয়ে চলতাম, যেন সে পাথরে হোঁচট খেয়ে সুন্দর পাগুলোতে ব্যথা না পায়। ওকে যখন পেয়েছিলাম, তখন ওর জুতোগুলো ছিল শতচ্ছিন্ন-

মায়া: আর তুমি ওকে কোলে তুলে নিয়েছিলে?

উল্‌ফ্‌হাইম: ওকে পাঁকের ভিতর থেকে তুলে নিয়েছিলাম, যত উঁচুতে, আর যত সাবধানে সম্ভব, ঠিক তেমনি করে ওকে বয়ে নিয়ে চলেছিলাম। (কর্কশভাবে হাসে) আর জান ও আমাকে কি বলে ধন্যবাদ দিয়েছিল?

মায়া: না। কি?

উল্‌ফ্‌হাইম: (তার দিকে তাকিয়ে হাসে ও মাথা নাড়ে) ও আমাকে দু’টো শিং দিয়েছিল। যেগুলো তুমি এখন দেখতে পাচ্ছ। খুব মজার গল্প, তাই না?

মায়া: হ্যাঁ, বেশ মজার! কিন্তু আমি একটা গল্প জানি, যা আরও অদ্ভুত।

উল্‌ফ্‌হাইম: কি?

মায়া: অনেক, অনেক দিন আগে ছিল একটা অদ্ভুত মেয়ে। বাবা, মা-ও ছিল, কিন্তু তারা ছিল খুব গরীব। তারপর একদিন এক বিশাল আর শক্তিশালী মানুষ তাদের ঐ ভাঙ্গাচোরা ছোট্ট বাড়িটাতে এলো, আর তার দুই হাতে তুলে নিল মেয়েটিকে, ঠিক তোমারই মত। তারপর নিয়ে চলল দূরে, বহু, বহুদূরে।

উল্‌ফ্‌হাইম: সে ঐ লোকটির মত জীবন কাটাতে চেয়েছিল, তাই না?

মায়া: হ্যাঁ, আসলে ও ছিল বোকা, ভীষণ বোকা।

উল্‌ফ্‌হাইম: আর সেই লোকটি নিশ্চয় ছিল লম্বা আর সুদর্শন।

মায়া: না, এমন কিছু সাংঘাতিক সুন্দর সে ছিল না। কিন্তু ও মেয়েটিকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে সে তাকে সবচেয়ে উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাচ্ছে, সবসময় যেখানে সূর্য ঝলমল করে।

উল্‌ফ্‌হাইম: ও পর্বতারোহী ছিল, তাই না?

মায়া; তা বললেও বলা যেতে পারে।

উল্‌ফ্‌হাইম: তাই সে তার সাথে মেয়েটিকে উপরে নিয়ে গিয়েছিল?

মায়া: (মাথা দুলিয়ে) উপরে নিয়ে গিয়েছিল? ও হ্যাঁ! না, সে তাকে ঠেলে দিয়েছিল এক ঠাণ্ডা, স্যাঁতস্যাঁতে খাঁচার ভিতর, যেখানে সূর্যের আলো আর নির্মল বাতাস কখনো পৌঁছাবে না-কিংবা মেয়েটির কাছে এমনই মনে হয়েছিল-যদিও দেয়ালগুলো ছিল চকচকে, যেন গিলটি করা, আর চারপাশে সারি সারি ভুতের মত সব বিশাল পাথর।

উল্‌ফ্‌হাইম: ঠিকই তো করেছিলো, যত্তসব!

মায়া: হ্যাঁ, মেয়েটির জন্য এই-ই উচিত ছিল। তবুও এটা একটা অদ্ভুত গল্প, তাই না?

উল্‌ফ্‌হাইম: (এক মুহূর্তের জন্য মায়ার দিকে তাকিয়ে) এখন আমার একটা কথা শোনো, মায়া-

মায়া: আবার কি?

উল্‌ফ্‌হাইম: এস না, আমরা দু’জন আমাদের এই ছেঁড়াখোঁড়া জীবন দু’টোকে একসাথে জুড়ে দিই?

মায়া: জমিদার এখন দরিদ্রের ত্রাণকর্তা হয়ে উঠলেন না কি?

উল্‌ফ্‌হাইম: ঠিক তাই। আমরা কি চেষ্টা করতে পারিনা, এই ছেঁড়া টুকরোগুলোকে জোড়া দিয়ে, তার মাঝ থেকে একটা নতুন জীবন গড়ে তুলতে?

মায়া: আর ঐসব জীর্ণ টুকরোগুলো যখন একদিন ছিঁড়ে যাবে, তখন?

উল্‌ফ্‌হাইম: তখন আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকব স্বাধীন, অকুণ্ঠিত। আমাদের আসল চেহারায়, বাস্তবে ঠিক যেমন।

মায়া: (হেসে) তুমি তোমার ছাগলের পা-গুলো নিয়ে?

উল্‌ফ্‌হাইম: আর তুমি তোমার-থাকগে যাক।

মায়া: চল, এবার যাই।

উল্‌ফ্‌হাইম: কোথায়?

মায়া: অবশ্যই নিচে, হোটেলে।

উল্‌ফ্‌হাইম: তারপর?

মায়া: তারপর আমি তোমায় ভদ্রভাবে বিদায় জানিয়ে বলব-“ধন্যবাদ মহাশয়, আপনার সাহচর্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।”

উল্‌ফ্‌হাইম: আমি তোমাকে একটা প্রাসাদ দিতে পারি।

মায়া: (কুঁড়ে ঘরটার দিকে দেখিয়ে) ঐটার মতো?

উল্‌ফ্‌হাইম: ওটা এখনও ভেঙ্গে পড়েনি।

মায়া: আর পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্য আর সৌন্দর্য?

উল্‌ফ্‌হাইম: একটা প্রাসাদ, আমি বলেছি-

মায়া: ধন্যবাদ। আমার আর প্রাসাদে কাজ নেই।

উল্‌ফ্‌হাইম: চারপাশে মাইলের পর মাইল জুড়ে চমৎ‌কার শিকারের জায়গা-

মায়া: তোমার এই প্রাসাদটি সমস্ত মহৎ‌ আর মহান শিল্পকর্ম দিয়ে বোঝাই নাকি?
উল্‌ফ্‌হাইম: তোমাকে সে ধরনের কিছু আমি দিতে পারব না, কিন্তু-

মায়া: যাক্‌, শুনে খুশী হলাম।

উল্‌ফ্‌হাইম: তবে কি তুমি আমার সাথে আসবে না?

মায়া: সবসময় একটা পোষা শিকারি পাখি আমার উপর নজর রাখছে।

উল্‌ফ্‌হাইম: তাকে আমরা শিকার করে আনব, মায়া।

মায়া: এস, তবে আমায় ঐ পথ বেয়ে নিচে নিয়ে যাও।

উল্‌ফ্‌হাইম: (একটা হাত দিয়ে মায়ার কোমর ঘিরে ধরে) হ্যাঁ, এখনই বের হয়ে পড়তে হবে। চারদিকে কুয়াশা ঘনিয়ে আসছে।

মায়া: পথটা কি খুবই বিপজ্জনক?

উল্‌ফ্‌হাইম: পাহাড়ের কুয়াশার মতো অতটা নয়।

(মায়া নিজেকে ছাড়িয়ে, পাহাড়ের কিনারায় গিয়ে, নিচে দেখে কিন্তু চমকে পিছনে সরে আসে)

উল্‌ফ্‌হাইম: (মায়ার কাছে এগিয়ে যায়, হাসে) মাথা ঝিমঝিম করছে?

মায়া: হ্যাঁ, তা একটু…। কিন্তু ঐ নিচে দেখ! ওরা দু’জন পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছে–

উল্‌ফ্‌হাইম: (কিনারার দিকে হেলে দেখে) এতো কেবল তোমার সেই শিকারি পাখি, আর তার অদ্ভুত সঙ্গিনীটি।

মায়া: আচ্ছা, ওরা আমাদের দেখতে পাবেনা এমনভাবে কি নিচে নামা যায় না?

উল্‌ফ্‌হাইম: সে অসম্ভব। আসলে পথটা খুব সরু আর নিচে নামবার অন্য কোনো পথও নেই।

মায়া: বেশ, তবে এখানেই ওদের মুখোমুখি হওয়া যাক।

উল্‌ফ্‌হাইম: এইতো একজন সত্যিকারের ভালুক-শিকারির মতো কথা।
[প্রফেসর রুবেক আর আইরিনকে গভীর, সঙ্কীর্ণ গিরিখাতের কিনারায় দেখা যায়। রুবেকের কাঁধে তার সেই উত্তরীয়টি। আইরিনের শাদা পোষাকটির উপর আলতো করে রাখা একটি ফারের কোট। মাথায় পশমের টুপি।]

রুবেক: এই যে মায়া! আবার আমাদের দেখা হল।

মায়া: তাই তো দেখছি। সোজা উপরে চলে এস!
[রুবেক উপরে উঠে তার হাত আইরিনের দিকে বাড়িয়ে দেয়, আইরিনও উঠে আসে]

রুবেক: (শীতলভাবে, মায়াকে) তাহলে তোমরাও সারারাত পাহাড়ের উপরে ছিলে? আমাদের মতো?

মায়া: হ্যাঁ, শিকার করছিলাম। তোমার অনুমতি নিয়েই।

উল্‌ফ্‌হাইম: (পাহাড়ের কিনারার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে) আপনি কি ঐ পথ দিয়ে এলেন?

রুবেক: দেখতেই পাচ্ছেন।

উল্‌ফ্‌হাইম: আপনার সঙ্গিনীও?

রুবেক: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। (মায়ার দিকে এক পলক তাকিয়ে) আমার সঙ্গিনী আর আমি আর কখনও আলাদা পথে চলব না।

উল্‌ফ্‌হাইম: আপনারা কি জানেন না, এইমাত্র যেখান দিয়ে উঠে এলেন, তা এক মৃত্যু ফাঁদ?

রুবেক: সে যাই হোক, আমরা এসে পড়েছি। আর প্রথমে ওটা দেখে কিন্তু খুব একটা দুর্গম মনে হয়নি।

উল্‌ফ্‌হাইম: প্রথম দেখতে কোনকিছুই কঠিন মনে হয় না; কিন্তু তারপর এসে পৌঁছুতে হয় এমন এক সংকটে, যেখান থেকে এগুনোও যায় না, পিছানোও যায় না। নিশ্চল পাথরের মত আপনারা এখন সেখানেই আটকে গিয়েছেন, প্রফেসর।

রুবেক: (হেসে) অভিজ্ঞতার আলোকে বলছেন বুঝি?

উল্‌ফ্‌হাইম: অভিজ্ঞতার কথা চুলায় যাক! (পাহাড়ের চূড়ার দিকে দেখিয়ে) দেখতে পাচ্ছেন না এখনই ঝড় উঠবে? বাতাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না?

রুবেক: (শোনে) –এ শব্দ যেন পুনরুত্থানের দিনের পূর্বাভাস।

উল্‌ফ্‌হাইম: মহাশয়, এ শব্দ পাহাড় থেকে বয়ে আসা বাতাসের। দেখুন কিভাবে মেঘগুলো ফুলে ফেঁপে উঠছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এগুলো চারপাশ থেকে আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরবে।

আইরিন: আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরবে! সে যে কেমন অনুভূতি আমি তা জানি!

মায়া: (উল্‌ফ্‌হাইমের হাত টেনে) চল নেমে পড়ি, তাড়াতাড়ি।

উল্‌ফ্‌হাইম: (রুবেককে) আমি একজনের বেশি নিয়ে নামতে পারব না। আপনারা ঐ কুঁড়ে ঘরটির ভিতর ঢুকে পড়ুন। আর যতক্ষণ ঝড় শেষ না হয়, ওখানেই থাকুন। তারপর আমি আপনাদের উদ্ধারের জন্য লোক পাঠাব।

মায়া: আমাদের উদ্ধারের জন্য! না, না!

উল্‌ফ্‌হাইম: (কর্কশভাবে) যদি প্রয়োজন হয় জোর করে টেনে নিচে নামানো হবে। এটা জীবন মরণের প্রশ্ন! (মায়ার দিকে) এসো, ভয় পেওনা, আমার উপর আস্থা রাখতে পারো।

মায়া: (তাকে আঁকড়ে ধরে) ওহ্‌, আমায় নামিয়ে দাও, নিরাপদে নিচে নামিয়ে দাও!

উল্‌ফ্‌হাইম: (পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে শুরু করে অন্যদের দিকে চিৎ‌কার করে বলে) আপনারা কুঁড়েঘরটিতে অপেক্ষা করুন তো! যতক্ষণ না উদ্ধারের জন্য দড়িদড়াসহ লোকজন আসছে।

[উল্‌ফ্‌হাইম মায়াকে তুলে নিয়ে, তাড়াতাড়ি কিন্তু সতর্কভবে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে থাকে।]

আইরিন: (রুবেকের দিকে ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে) আর্নল্ড, শুনলে? ওরা আমাকে ধরতে উপরে উঠে আসছে। মানুষগুলো-এখানে আসছে-!

রুবেক: শান্ত হও, আইরিন।

আইরিন: আর সে, ঐ কালো পোষাক পরা মহিলাটি, সেও আসবে। বহুদিন ধরে সে নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজে ফিরছে। ও এসে আমার হাতগুলো ধরবে, আর্নল্ড! আর আমাকে ঢুকিয়ে দেবে পাগলদের আটকে রাখবার ঐ শক্ত, আঁটো পোষাকের ভিতর। ওর কাছে একটা অমন পোষাক আছে, ওর ট্রাঙ্কের ভিতর। আমি দেখেছি।

রুবেক: কেউ তোমাকে ছুঁতে পারবে না।

আইরিন: (হেসে) হ্যাঁ, পারবে না। ওদেরকে থামানোর একটা উপায় আমার আছে।

রুবেক: কি বলতে চাচ্ছ?

আইরিন: (ছুরিটি বের করে) এইটা।

রুবেক: (ছুরিটি নিয়ে নিতে চেষ্টা করে) ছুরি?

আইরিন: সবসময়, রাতদিন এই ছুরিটা আমার সাথে সাথে থাকে, এমন কি, বিছানাতেও।

রুবেক: আইরিন, ছুরিটা আমাকে দাও।

আইরিন: তোমার জন্যই এটা এনেছিলাম, আর্নল্ড।

রুবেক: আমার জন্য?

আইরিন: যখন আমরা কাল রাতে ওখানে বসেছিলাম, টনিৎজ হ্রদের কাছে-

রুবেক: টনিৎ‌জ হ্রদ?

আইরিন: খামার বাড়িটার বাইরে। রাজহাঁস আর জলপদ্ম নিয়ে খেলছিলাম-

রুবেক: বলে যাও-।

আইরিন: আমি তোমাকে বলতে শুনলাম-বরফের মত শীতল, স্বচ্ছ, কবরের মত ঠাণ্ডা সে স্বর- তুমি বললে যে আমি তোমার জীবনের একটা কাহিনী ছিলাম মাত্র-

রুবেক: আইরিন, তুমিই তা বলেছিলে, আমি না।

আইরিন: (কথা চালিয়ে যাবে) তখন আমার ছুরিটি বের করেছিলাম। সেটা আমি তোমার পিঠে বসিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।

রুবেক: কেন বসালে না?

আইরিন: হঠাৎ‌ বুঝতে পারলাম, তুমি এরই মধ্যে মারা গেছ। তুমি বছরের পর বছর ধরে মৃত।

রুবেক: মৃত?

আইরিন: মৃত। আমার মতো। আমরা সেখানে টনিৎ‌জ হ্রদের পাশে বসেছিলাম, দুটো স্যাঁতস্যাঁতে শবদেহ, একসাথে খেলছিলাম আমাদের সেই খেলাটা।

রুবেক: একে আমি মৃত্যু মনে করি না। কিন্তু তুমি আমাকে বুঝতে পারছ না।

আইরিন: তবে কোথায় তোমার সেই জ্বলন্ত কামনা, যার বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধ করছিলে, ঠিক যখন তোমার সামনে আমি নগ্নরূপে দাঁড়িয়েছিলাম-মৃত্যু থেকে জাগ্রত এক নারী হয়ে?

রুবেক: আমাদের প্রেমের মৃত্যু হয়নি, আইরিন।

আইরিন: সেই প্রেম যা ছিল পৃথিবীতে আমাদের জীবনে-সেই অপূর্ব, অসাধারণ, চমৎকার জীবন যা পূর্ণ ছিল প্রহেলিকা আর হেঁয়ালিতে-সেই প্রেম, সেই প্রেম আমাদের দু’জনের মাঝেই আজ মৃত।

রুবেক: আমি বলছি আইরিন, সেই প্রেম এখনও আমায় তীব্র কামনায় দগ্ধ করছে-ঠিক যেমন করেছে চিরদিন!

আইরিন: আর আমি? তুমি কি ভুলে গেছ, এখন আমি কে?

রুবেক: তুমি যেই হও না, যাই হওনা, আমার কাছে তুমি কেবল সেই নারীই-তোমাকে আমি ঠিক যে রূপে স্বপ্নে দেখি।

আইরিন: আমি মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে শত শত লোককে আমার এই নগ্নদেহ প্রদর্শন করেছি। যখন থেকে তুমি-
রুবেক: আমি অন্ধ ছিলাম, তোমাকে এ জীবনের দিকে আমিই ঠেলে দিয়েছি। আমি মাটির ঐ মৃত মূর্তিটিকে স্থান দিয়েছিলাম জীবন, সুখ আর ভালোবাসার উপরে।

আইরিন: খুব দেরি হয়ে গেছে আর্নল্ড, ভীষণ দেরি হয়ে গেছে।

রুবেক: এ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে তাতে আমার চোখে তোমার মূল্য একটুও কমে যায়নি।

আইরিন: (মাথা তুলে বলে) তোমারও না।

রুবেক: তবে, আইরিন! আমরা মুক্ত! এখনও আমাদের জীবনকে উপভোগ করবার মতো সময় আছে!

আইরিন: (বিষণ্নভাবে রুবেকের দিকে তাকায়) আমার বেঁচে থাকবার ইচ্ছা মরে গেছে, আর্নল্ড! একজন আমি মৃত্যু থেকে জেগে উঠেছি, তোমাকে দেখবার জন্য, তোমাকে খুঁজে পাবার জন্য। কিন্তু দেখলাম তুমি মৃত-ঠিক যেমনটি আমি ছিলাম।

রুবেক: না, তুমি ভুল করছ! ভুল করছ! আমাদের দু’জনের মাঝে-আর আমাদের চারপাশে, জীবন চিরদিনের মতোই এখনও আনন্দময়-দুর্বার আবেগে উন্মত্ত।

আইরিন: (হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে) যে নারীকে তুমি সৃষ্টি করেছিলে, মৃত্যু থেকে জাগ্রত করেছিলে, সে জীবনকে দেখতে পাচ্ছে শীতল। তার কাছে জীবন শায়িত যেন এক শবযানে।

রুবেক: (শক্তভাবে তার হাত দিয়ে আইরিনকে জড়িয়ে ধরে) তবে এস, আবার মৃত্যুর গহ্বরে ঢুকে যাওয়ার আগে, আমরা দু’জন মানুষ জীবনকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও পূর্ণভাবে উপভোগ করি–

আইরিন: আর্নল্ড।

রুবেক: কিন্তু এখানে এই আধো অন্ধকারের মাঝে নয়! এখানে নয়, যেখানে বীভৎ‌স, স্যাঁতস্যাঁতে মৃত্যুর আবরণ আমাদের চারপাশ ঘিরে ডানা ঝাপটাচ্ছে!

আইরিন: না, না! ঐ উর্দ্ধে, আলোর মাঝে, যেখানে সমস্ত সৌন্দর্য আর ঐশ্বর্য ঝলমল করছে, ঐ প্রতিশ্রুত পাহাড়ের চূড়ায়।

রুবেক: ঐ উঁচুতে আমরা আমাদের মিলনোৎ‌সব পালন করব, আইরিন, প্রিয় আমার!

আইরিন: (গর্বিতভাবে) সূর্য আমাদের চেয়ে দেখবে, আর্নল্ড।

রুবেক: আলোর সমস্ত তেজ আমাদের দিকে চেয়ে দেখবে। এবং অন্ধকারের সমস্ত শক্তিও। (আইরিনের হাতটা চেপে ধরে) তুমি কি এখন আমার সাথে আসবে না? ওগো আমার অনাদিকালের বঁধু?

আইরিন: (যেন রূপান্তরিত) অবাধে ও স্বেচ্ছায়, প্রিয় আমার, প্রভু আমার!

রুবেক: (আইরিনকে পথ প্রদর্শন করে) অবশ্যই আমাদের এই কুয়াশা পেরিয়ে যেতে হবে, আইরিন। আর তারপর-

আইরিন: হ্যাঁ, কুয়াশা পেরিয়ে। আর তারপর উঁচুতে আমাদের ঐ মিনারের চূড়ায় – যেখানে তা ঝলমল করছে সূর্যের আলোতে।
[দৃশ্যের উপরে কুয়াশা ঘন হয়ে ঘনিয়ে আসে। রুবেক আর আইরিন পরস্পরের হাতে হাত রেখে ডানে পাহাড় বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে যায়। আর তারপর অদৃশ্য হয়ে যায় মেঘের আড়ালে। তীব্র দমকা হাওয়া বাতাসের মাঝ দিয়ে কেঁদে কেঁদে ফেরে।
নান বামদিক থেকে এসে পাথরের স্তূপের কাছে থেমে নিঃশব্দে চারদিকে তাকায়। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি।]

মায়া: (গভীর গিরিখাতের বহু নীচ থেকে ওকে খুশিমনে গান গাইতে শোনা যায়।)
আমি মুক্ত! স্বাধীন! বন্ধনহীন!
বন্ধন হ’ল ক্ষয়! যেন এক মুক্ত বিহঙ্গ আমি!
স্বাধীন! বন্ধনহীন!

[হঠাৎ‌ এক বজ্রের মত গর্জন শোনা যায় – বরফ ছাওয়া চূড়ার উপর থেকে, যা তীব্রবেগে ঘুরতে ঘুরতে নীচে নেমে আসে। রুবেক আর আইরিনকে বরফের মধ্য দিয়ে দ্রুত আবর্তিত হয়ে পড়ার সময় এক মুহূর্তের জন্য দেখা যায়। তারপর ওরা চাপা পড়ে যায় বরফের নীচে।]
নান: (আইরিন আর রুবেকের দিকে হাত দু’টো বাড়িয়ে তীব্র আর্তনাদ করে ওঠে) – আইরিন! (এক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে, বাতাসে ক্রুশচিহ্ন এঁকে দিয়ে বলে) শান্তি বর্ষিত হোক!
[মায়ার গান শোনা যেতে থাকে-পাহাড়ের ঢাল বেয়ে, দূর থেকে বহুদূরে।]
(শেষ)

Facebook Comments

One Comment:

  1. কৌশিক ভাদুড়ী

    সব কটা কিস্তিই পড়লাম, খুব প্রাণবন্ত অনুবাদ, লেখিকাকে ধন্যবাদ সুন্দর ও দুরূহ অনুবাদের জন্য.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *