ইউ.জী. কৃষ্ণমূর্তি (আত্মজীবনীপর্ব)


ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ১ ।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ২ ।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৩ ।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৪।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৫

The Mystique Of Enlightenment (Part One)

বাংলা অনুবাদ: নান্নু মাহবুব

[১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬, ভারত ও সুইজারল্যাণ্ডে গৃহিত কথোপকথন থেকে সংকলিত]

লোকজন আমাকে ‘বোধিপ্রাপ্ত’ বলে─আমি ঘৃণা করি এই শব্দটা─ আমার ক্রিয়াশীলতার ধরন বর্ণনা করতে তারা এছাড়া আর কোনো শব্দ খুঁজে পায় না। সেই সঙ্গে আমি এও বলি যে বোধি বলে আদৌ কিছু নেই। সেটা বলি এইজন্যে যে, আমার সারাটা জীবনই আমি অন্বেষণ করেছি এবং চেয়েছি বোধিপ্রাপ্ত হতে, এবং আমি আবিষ্কার করেছি যে বোধি বলে আদৌ কিছু নেই, কাজেই একজন মানুষ বোধিপ্রাপ্ত কি বোধিপ্রাপ্ত নয় সে প্রশ্নই ওঠে না। আজ আমাদের মধ্যে যত দাবিদার রয়েছেন তাঁদের কথা বাদই দিলাম, ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের বুদ্ধকেও আমি একবিন্দু গ্রাহ্য করি না। তাঁরা হলেন একদল সুবিধাবাদী, জনতার সারল্যের ওপর তাঁদের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। মানুষের বাইরে কোনো ক্ষমতা নেই। মানুষই ভয় থেকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেছে। কাজেই ঈশ্বর নয়, ভয়টাই হলো সমস্যা।

… … … …

নিজের জন্যে নিজেই আমি আবিষ্কার করেছি অনুধাবন করার জন্যে কোনো অহম্ নেই─এই উপলব্ধির কথাই আমি বলছি। বিধ্বংসী একটা আঘাতের মতো এটা আসে। একটা বজ্রবিদ্যুতের মতো এটা আপনাকে ধাক্কা দেয়। আত্মোপলব্ধি নামের একটা ঝুড়িতে আপনি সবকিছু বিনিয়োগ করেছেন, এবং শেষমেশ হঠাৎ করেই আপনি আবিষ্কার করলেন যে আবিষ্কার করার জন্যে কোনো অহম্ নেই, উপলব্ধি করার জন্যে কোনো অহম্ নেই─এবং আপনি নিজেকে বললেন, “সারাটা জীবন ধরে আমি কী ছাই করে যাচ্ছি?!” এটাই আপনাকে বিস্ফোরিত করে দেয়।

… … … …

সবকিছুই আমার ঘটেছে─সবরকম অভিজ্ঞতাই হয়েছে। শারীরিক যন্ত্রণাটা ছিলো অসহনীয়রকমের, সেইজন্যেই আমি বলি যে সত্যিকার অর্থে আপনি এটা চান না। আমি যদি আপনাকে এর একটা আভাস, এর একটা স্পর্শও দিতে পারতাম─তখন আর আপনি এটা ছুঁয়েও দেখতে চাইতেন না। আপনি যা খুঁজছেন তার কোনো অস্তিত্ব নেই; সেটা শুধুই একটা মিথ। এর সাথে আপনি জড়াতেই চাইবেন না।

… … … …

ইউ.জী.: আমি জোর দিয়ে বলি─জানি না একে কী বলবেন; বোধি, মুক্তি, মোক্ষ, নির্বাণ, এই শব্দগুলি আমার পছন্দ নয়; এইগুলি সব ভারি ভারি শব্দ, তাদের নিজস্ব গূঢ়ার্থ রয়েছে─আপনার কোনো প্রচেষ্টায় এইটা ঘটবে না; এটা এমনি-এমনিই ঘটে। এবং কেন সেটা কারো ঘটে, কারো ঘটে না, আমি জানি না।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী: এটা তাহলে আপনার ঘটেছিলো?

ঘটেছিলো।

কবে স্যার?

আমার উনপঞ্চাশ বছর বয়সে।

কিন্তু আপনার লক্ষ্যার্জনে আপনি যা-ই করছেন─সত্য বা পরমার্থের অনুসন্ধান বা অন্বেষণ, সেটাই আপনাকে আপনার নিজস্ব দশা থেকে, যার ভেতর সর্বক্ষণ আপনি আছেনই, দূরে নিয়ে যায়। আপনার প্রচেষ্টার একটা ফলাফল হিসেবে অর্জন করতে পারেন, নিষ্পন্ন বা সম্পন্ন করতে পারেন, এটি সেরকম কিছু নয়─সেজন্যেই আমি ‘কারণরহিত’ শব্দটা ব্যবহার করি। কোনো কারণ নেই, অথচ কোনোভাবে অন্বেষণটা শেষ হয়ে গেছে।

আপনার ধারণা সেটা আপনার অন্বেষণের কোনো ফলাফল নয়? এইজন্যে জিজ্ঞেস করছি যে শুনেছি আপনি দর্শনশাস্ত্র পড়েছেন, আপনি ধর্মীয় লোকেদের সংস্পর্শে থাকতেন…

অন্বেষণ আপনাকে আপনার থেকে দূরে নিয়ে যায়─এটা সম্পূর্ণ উল্টো─এর সাথে অন্বেষণের কোনো সম্পর্ক নেই।

এটা ঘটেছে অন্বেষণ সত্ত্বেও, অন্বেষণের কারণে নয়?

সত্ত্বেও─হ্যাঁ, এই শব্দটা। ইতিমধ্যেই যা সেখানে রয়েছে, আপনার যাবতীয় কর্মই তার স্বয়ংপ্রকাশকে অসম্ভব করে দিচ্ছে। সেজন্যেই আমি এটাকে বলি ‘আপনার সহজ স্থিতি’। সর্বদাই আপনি ওই স্থিতিতে। সেখানে যা রয়েছে, সেটার নিজস্ব পন্থায় স্বয়ংপ্রকাশকে যেটা বাধাগ্রস্ত করছে সেটাই হলো অন্বেষণ। অন্বেষণ সর্বদাই ভুল অভিমুখে, সুতরাং যা-কিছু আপনি খুব গূঢ় বলে গণ্য করেন, যা-কিছু আপনি খুব পবিত্র বলে গণ্য করেন, সেটা ওই চেতনায় একটা দূষণ। ‘দূষণ’ শব্দটা হয়তো আপনার খুব পছন্দ হবে না (হাসি), কিন্তু যা-কিছুই আপনি পবিত্র, ঐশী, এবং গূঢ় বলে গণ্য করেন সে-সবই একটা দূষণ।

সুতরাং, আপনার কিছুই করার নেই। এটা আপনার হাতে নয়। ‘কৃপা’ শব্দটার ব্যবহার আমার পছন্দ নয়, কারণ ‘কৃপা’ শব্দটা যদি ব্যবহার করেন, সেটা কার কৃপা? আপনি বিশেষভাবে মনোনীত কোনো ব্যক্তি নন; আপনি এর উপযুক্ত, কেন আমি তা জানি না ।

আমার পক্ষে সম্ভব হলে আমি হয়তো কাউকে সাহায্য করতাম। এটা এমন কিছু, যা আমি দিতে পারি না, কারণ এটা আপনার রয়েছেই। কেন আমি এটা আপনাকে দিতে যাই? যা আপনার রয়েছেই সেই জিনিস প্রত্যাশা করাটা হাস্যকর।

কিন্তু আমি সেটা অনুভব করছি না, আপনি করছেন।

না, এটা অনুভব করার প্রশ্ন নয়, এটা জানার প্রশ্ন নয়; আপনি কখনোই জানবেন না। নিজে থেকে সেটা আপনার জানার কোনো উপায় নেই, এটা স্বয়ংপ্রকাশিত হতে শুরু করে। কোনো সচেতন… কীভাবে এটা বলবো জানি না! আমি কারো থেকে আলাদা, কখনো এই চিন্তা আমার মনে আসে না।

শুরু থেকেই কি ব্যাপারটা এইরকমই, যখন থেকে আপনি নিজের ব্যাপারে সচেতন হয়েছেন?

না, সেটা আমি বলতে পারি না। ধর্মীয় আবহে বেড়ে-ওঠা অন্য যে-কারোর মতোই আমিও কিছু একটার পেছনে ছুটছিলাম─কিছু একটার অন্বেষণে, কিছু একটার সন্ধানে। সুতরাং, ওই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা সহজ নয়, কারণ সেক্ষেত্রে আমাকে আমার সমগ্র অতীতের মধ্যে ফিরে যেতে হবে। হয়তো এটা আসতে পারে, আমি জানি না। [হাসি]

… … … …

নচিকেতার মতো আমিও খুবই জানতে আগ্রহী, নিছক কৌতূহলবশত, ব্যক্তিগতভাবে আপনার কীভাবে ওইসব ব্যাপার ঘটলো, যতটুকু আপনার মনে আছে।

সে এক দীর্ঘ কাহিনি দেখুন; অত সহজ নয়।

আমরা এটা শুনতে চাই।

না, তাহলে আমার সমগ্র জীবনটাই আপনাকে বলতে হবে, ─তাতে অনেক সময় লাগবে। আমার জীবনকাহিনি একটা জায়গা পর্যন্ত এসে থেমে যায়─এরপর আর কোনো আত্মজীবনী নেই।

আমার জীবনী লিখতে আগ্রহী দুইজন জীবনীকার, তাদের দুইজনের দুইরকম পন্থা। একজন জানতে চান আমি কী কী করেছি─ সাধনা, শিক্ষাদীক্ষা, সমগ্র পটভূমিটা─যা আমাকে সেখানে নিয়ে এসেছে। আমি বলি এটা ওইসমস্ত কিছু ‘সত্ত্বেও’ ঘটেছে। [হাসি] অন্য জীবনীকার আমার ‘সত্ত্বেও’─কথাটায় খুব আগ্রহী নন, যেহেতু তাহলে বড় একটা খণ্ড লিখতে তাঁর খুব বেশি জিনিসপত্র থাকে না। [হাসি] তাঁদের ওইখানেই বেশি আগ্রহ। প্রকাশকদেরও ওই জাতীয় জিনিসে আগ্রহ। সেটা খুবই স্বাভাবিক কারণ এমন একটা ক্ষেত্রের মধ্যে আপনি ক্রিয়াশীল যেখানে সারাক্ষণই কার্যকারণ সম্পর্কটা কাজ করে যাচ্ছে─সেজন্যেই আপনি কারণটা খুঁজে বার করায়, কীভাবে এইজাতীয় ঘটনা ঘটে বার করায় আগ্রহী। সুতরাং, আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানেই ফিরে যাচ্ছি, ঘর নাম্বার এক: এখনো আমরা ‘কীভাবে’ নিয়ে চিন্তিত।

আমার পটভূমি মূল্যহীন; কারো জন্যে এটা কোনো আদর্শ হতে পারে না, যেহেতু আপনার পটভূমিও অনন্য। আপনার জীবনের প্রত্যেকটি ঘটনা তার নিজস্ব ধরনে অনন্য। আপনার অবস্থা, আপনার পরিবেশ, আপনার পটভূমি─সমস্ত ব্যাপারটাই আলাদা। আপনার জীবনের প্রত্যেকটি ঘটনাই আলাদা।

আমি দুনিয়াকে দেবার জন্যে কোনো আদর্শ খুঁজছি না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে জানতেও চাচ্ছি না। আমরা যেভাবে চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্র দেখি─এটা ওইরকমই; আপনাকে অনুকরণ করতে চাচ্ছি সেরকম কিছু নয়। হয়তো এটা প্রাসঙ্গিকই, কি জানি! সেইজন্যেই বলছি আমি হলাম এখানে নচিকেতা: আপনার কাছ থেকে সত্য না জেনে আমি বিদায় নেব না।

আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে একজন যম ধর্মরাজ দরকার।

কিছু মনে না করলে আপনিই হবেন যম ধর্মরাজ।

অসুবিধা নেই। হেল্প মি। কোথা থেকে শুরু করবো আমি জানি না, আমি অসহায়। কোথায় শেষ করবো, সেটা জানি। [হাসি] আমাকে বোধহয় আমার জীবনের সমস্ত কাহিনিটাই বলতে হবে।

আমাদের শুনতে কোনো অসুবিধে নেই।

সেটা আসতে চায় না।

আপনার অনুপ্রাণিত হওয়া দরকার।

আমি অনুপ্রাণিত নই, এবং কাউকেই আমি অনুপ্রাণিত করি না। আপনার কৌতূহল মেটাতে আমাকে বলতে হবে, অন্যদিকটা, আমার জীবনের নিকৃষ্ট দিকটা।

[দক্ষিণ ভারতের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম, ১৯১৮ সালের ৯ জুলাই। পারিবারিক পদবী উপ্পালুরি, তাঁর নাম দেওয়া হলো উপ্পালুরি গোপাল কৃষ্ণমূর্তি। জন্মের পরপরই তাঁর মা মারা গেলেন, তারপর তিনি বেড়ে উঠলেন তাঁর মাতৃকুলের দাদুদিদিমার কাছে, মছলিপট্টনমের কাছে গুড়িওয়াডা নামের একটি ছোট্ট শহরে।]

খুবই ধর্মীয় একটা আবহে আমি বেড়ে উঠি। দাদু [মাতামহ] ছিলেন খুবই সংস্কৃতিবান একজন মানুষ। মাদাম ব্লাভাটস্কি [থিওসফিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা] আর অলকটকে তিনি চিনতেন। পরে তিনি দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রজন্মের থিওসফিস্টদেরও চিনতেন, তারা সবাই-ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার দাদু ছিলেন একজন ডাকসাইটে আইনজীবী, অতিশয় ধনী, অতিশয় সংস্কৃতিবান, এবং খুবই আশ্চর্যজনকভাবে খুবই গোঁড়া ধরনের একজন মানুষ। তিনি ছিলেন খানিকটা বিভ্রান্ত একটা শিশুর মতো। একদিকে গোঁড়ামি, প্রথা, অন্যদিকে এর উল্টোটা, থিওসফি আর ওইসমস্ত। একটা ভারসাম্য গড়ে তুলতে তিনি ব্যর্থ হন। এইখানেই আমার সমস্যাটার শুরু।

[ইউ.জী. অনেকবার বলেছেন যে মৃত্যুর আগমুহূর্তে তাঁর মা বলেছিলেন, ‘ও (ইউ.জী.) একটা অত্যুচ্চ অদৃষ্ট নিয়ে জন্মেছে।’ তাঁর মাতামহ একথা খুবই গুরুত্বের সাথে নিলেন এবং ইউ.জী.’র বেড়ে-ওঠা, শিক্ষাদীক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করতে তাঁর আইনব্যবসা ছেড়ে দিলেন। তিনি এবং তাঁর বন্ধুরা মনে করলেন ইউ.জী. আসলে একজন যোগভ্রষ্ট, পূর্বজন্মে যে তার বোধি থেকে সামান্য দূরে ছিলো।]

তাঁর বেতনভূক পণ্ডিতেরা ছিলেন এবং, যে কারণেই হোক তিনি তাঁর জীবনটাকে উৎসর্গ করেছিলেন─পুরো ব্যাপারটার মধ্যে আমি যেতে চাই না─আমার জন্যে প্রগাঢ় একটা আবহ তৈরি করতে, এবং থিওসফিস্ট আর এইসমস্ত দিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাকে ঠিকমতো শিক্ষিত করে তুলতে চাইলেন। তাই প্রত্যেক সকালে ওইসব লোকজন এসে উপনিষদ্, পঞ্চদশী, নিষ্কর্মসিদ্ধি, টীকাভাষ্য, টীকাভাষ্যের ওপর টীকাভাষ্য পাঠ করতো; ওই সমস্তকিছু, ভোর ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত, আর এই ক্ষুদ্র বালক, তখন কতইবা তার বয়স হবে─পাঁচ, ছয়, সাত─ওইসব আবর্জনা তাকে শুনতে হতো। এতটাই শুনতে হতো যে সাতে পা দেবার আগেই আমি ওই সবই প্রায় মুখস্থ বলে যেতে পারতাম, ওই পঞ্চদশীর পর্ব, নিষ্কর্মসিদ্ধি, এটা-সেটা। প্রচুর সাধুসন্ত আমাদের বাড়িতে আসতেন─রামকৃষ্ণ সমাজ, আরো আরো সমস্ত লোকজন; কী নাম বলবো─কোনো-না-কোনোভাবে ওইসব লোকজন ওই বাড়িতে আসতেনই─সমস্ত সাধুসন্তদের জন্যে সেটা একটা উন্মুক্ত বাড়ি ছিলো। এইভাবে আমি যখন খুবই ছোট তখনই আমি একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম যে তাঁরা সবাই ভণ্ড। তাঁরা বলেন একটা কিছু, বিশ্বাস করেন একটা কিছু, কিন্তু তাদের জীবনটা অসার, কিছুই না। সেটাই ছিলো আমার অন্বেষণের শুরু।

দাদু ধ্যান করতেন। (তিনি মারা গেছেন, তাঁকে নিয়ে আমি কোনো বাজে কথা বলতে চাই না) আলাদা একটা ধ্যানকক্ষে তিনি এক-দুই ঘণ্টা ধ্যান করতেন। একদিন একটা ছোট্ট শিশু, দেড়-দু’বছর বয়স হবে, কোন কারণে কান্না জুড়ে দিলো। তিনি এসে বাচ্চাটাকে পেটাতে শুরু করলেন। বাচ্চাটা প্রায় নীল হয়ে গেলো আর দেখুন, ওই লোক, প্রত্যেকদিন তিনি দেড়-দুই ঘণ্টা ধ্যান করেন। “সেকি! এ তিনি কী করলেন?” ওই ঘটনায় আমার ট্রোমাটিক এক্সপেরিয়েন্সের (এই মনোবৈজ্ঞানিক শব্দটা আমি ব্যবহার করতে চাই না, কিন্তু না করেও কোনো উপায় নেই) মতো কিছু একটা হয়ে গেলো─, নিশ্চয়ই সমস্ত ধ্যান ব্যাপারটাতে হাস্যকর কিছু আছে। তাঁদের জীবনটা অসার, অন্তঃসারশূন্য। তাঁরা বলেন চমৎকার, প্রকাশ করেন একটা খুব সুন্দরভাবে, কিন্তু তাঁদের জীবনটা কী? তাদের জীবনে বিকারগ্রস্ত এই ভয়: তাঁরা বলেন একটা কিছু, কিন্তু তাঁদের জীবনে সেটা কাজ করে না। তাঁদের সমস্যাটা কী? এমন না যে আমি ওইসমস্ত লোকেদের তিরস্কার করতে বসেছি।

ঘটনা এইরকম চলতেই থাকলো, কাজেই ওইসমস্ত জিনিসে আমি জড়িয়ে গেলাম: “বুদ্ধ, যিশু, এইসব মহান গুরুদের দীক্ষায় আসলেই কি কিছু আছে? সবাই তাঁরা মোক্ষ, মুক্তি, স্বাধীনতার কথা বলেছেন। কী সেটা? নিজেই আমি জানতে চাই। এরা সবাই অর্থহীন লোকজন, কিন্তু তারপরও নিশ্চয়ই এই দুনিয়ায় এমন কোনো লোক আছেন যিনি এই সমস্তকিছুর একজন মূর্তিমান অবতার এবং দেবদূত। সত্যিই যদি তেমন কেউ থেকে থাকেন, আমি নিজেই তাঁকে খুঁজে বার করতে চাই।”

এরপর বহু ঘটনা। সেইকালে শিবানন্দ স্বরস্বতী নামে একজন লোক ছিলেন─একজন হিন্দুধর্ম প্রচারক। আমার চৌদ্দ থেকে একুশ বছর বয়সের মধ্যে─(অনাবশ্যক অনেক ঘটনা আমি বাদ দিয়ে যাচ্ছি) আমি প্রায়ই তাঁর ওখানে যেতাম, এবং সবকিছুই করতাম, সব ধরনের কৃচ্ছ্রসাধনা। খুবই তরুণ তখন আমি, কিন্তু মোক্ষ বলে কিছু আছে কিনা সেটা আবিষ্কারে আমি ছিলাম দৃঢ়সংকল্প, এবং আমার নিজের জন্যেই আমি ওই মোক্ষ চাইছিলাম। নিজের কাছে এবং সবার কাছে আমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম যে এমন একজন লোকের কোনো ভণ্ডামী থাকতে পারে না─“এরা সবাই-ই ভণ্ড”─কাজেই আমি যোগচর্চা করলাম, ধ্যানচর্চা করলাম, অধ্যয়ন করলাম সবকিছু। শাস্ত্রে যা যা আছে─সমাধি, বিশিষ্ট সমাধি, নির্বিকল্প সমাধি, সমস্ত অভিজ্ঞতাই আমার হলো। তখন আমি নিজেকে বললাম, “চিন্তা তোমার প্রার্থিত যেকোনো অভিজ্ঞতাই সৃষ্টি করতে পারে─মোক্ষ, নির্বাণ, পরমানন্দ, নাস্তিতে বিলীনতা─সব ধরনের অভিজ্ঞতা।” সুতরাং এইটা কোনো ব্যাপার হতে পারে না, যেহেতু আমি সেই মানুষটাই, যন্ত্রের মতো শুধু এইসমস্ত করে যাচ্ছি। আমার কাছে ধ্যানের কোনো মূল্য নেই। এসব করে কিছুই হচ্ছে না।

… … … …

 
সেই সময়, দেখুন, আমার জন্যে, একটা তরুণ ছেলের জন্যে, যৌনতা একটা সাংঘাতিক সমস্যা হয়ে গেলো। “এটা স্বাভাবিক কিছু, জৈবিক একটা ব্যাপার, মানবদেহের একটা কামনা। কেন এইসমস্ত লোকজন সবাই, অন্য কিছু পাবার জন্যে এই যৌনতাকে, যা খুবই স্বাভাবিক কিছু, সমগ্র ব্যাপারটার যা অংশ, অস্বীকার করতে চাইছে, দমন করতে চাইছে? মোক্ষ, মুক্তি আর ওই সমস্তকিছু থেকেও এইটা আমার কাছে অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এইটা একটা বাস্তবতা─আমি চিন্তা করছি দেবদেবীদের কথা অথচ আমার সুপ্তিস্খলন হচ্ছে─আমার এইজাতীয় জিনিস হচ্ছে। কেন আমার অপরাধবোধ হবে? এটা স্বাভাবিক কিছু; এইজাতীয় ঘটনায় আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ধ্যানে আমার কোনো কাজ হয় নাই, অধ্যয়নে আমার কোনো কাজ হয় নাই, আমার নিয়মানুবর্তিতায় আমার কোনো কাজ হয় নাই। আমি কখনো লবণ স্পর্শ করি নাই, মরিচ বা কোনো মশলা স্পর্শ করি নাই।” তারপর একদিন দেখি এই শিবানন্দ লোকটা বন্ধ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমের আচার খাচ্ছে। “এই যে লোকটা কিছু পাবার আশায় সবরকম আত্মসংযম করে যাচ্ছে, অথচ সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম। সে একটা ভণ্ড তপস্বী”─আমি তার সম্পর্কে কোনো বাজে কথা বলতে চাই না─“এই ধরনের জীবন আমার জন্যে নয়।”

 ….  … … …

আপনি বলছেন, চৌদ্দ থেকে একুশ বছরের মধ্যে আপনি যৌনতার একটা বিপুল তাড়না অনুভব করলেন। আপনি কি তখনই বিয়ে করলেন?

না। আমি তাড়াহুড়ো করি নাই; আমি সেটা মেনে নিলাম। যৌন তাড়নাটা আমি অনুভব করতে চাইলাম: “ধরুন আপনি কিছুই করলেন না, তখন সেটার কী হবে?” পুরো এই ব্যাপারটাই আমি বুঝতে চাইলাম: “কেন আমি এইসমস্ত আত্মরতি করতে চাইছি? যৌনতার আমি কিছুই জানি না─তাহলে, কেন আমার ভেতরে সব ধরনের যৌনতার প্রতিরূপ রয়েছে?” এই ছিলো আমার জিজ্ঞাসা, এই ছিলো আমার ধ্যান; পদ্মাসনে বসে থাকা বা নিজের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নয়। “কীভাবে আমি এইসমস্ত প্রতিরূপ কল্পনা করে ফেলছি?” ─আমি কখনো সিনেমা দেখি নাই,… এই যে এখন যতরকম সব পোস্টার, কখনো সেইসব দেখি নাই─“তাহলে এটা কীভাবে হলো? এটা ভেতরের ব্যাপার, বাইরে থেকে প্রবিষ্ট নয়। বাহির উদ্দীপ্ত করছে─উদ্দীপনাটা বাইরে থেকে আসছে। কিন্তু ভেতর থেকে অন্য ধরনের উদ্দীপনা আছে─এইটা আমার জন্যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাইরের সমস্ত উদ্দীপনা আমি সফলভাবে ছিন্ন করতে পারি, কিন্তু ভেতর থেকে আমি এইটা ছিন্ন করবো কীভাবে?” আমি এটাই বুঝতে চাইলাম।

তারপর এই যৌন-অভিজ্ঞতা জিনিসটা কী সেটা দেখাতেও আমার আগ্রহ ছিলো। যদিও তখনও আমার নিজের কোনো যৌন-অভিজ্ঞতা হয় নাই তবুও আমি যেন জানতাম যৌন-অভিজ্ঞতা জিনিসটা কীরকম। এইভাবে চলছে তো চলছেই। কোনো নারী বা কোনো কিছুর সাথে যৌনতা করার জন্যে আমি তাড়াহুড়ো করি নাই; ব্যাপারটাকে তার নিজের মতো করেই ঘটতে দিলাম। তখনই আমি বিয়ে করতে চাইনি। বিয়ে নয়─আমার লক্ষ্য ছিলো একজন তপস্বী, সন্ন্যাসী বা ওইজাতীয় সবকিছু হওয়া, কিন্তু সেটা ঘটে গেলো, এবং আমি মনে মনে ভাবলাম, “এটা যদি কামচরিতার্থতার ব্যাপারই হয়ে থাকে, তাহলে বিয়ে নয় কেন? সমাজটা তো আছে সেই কারণেই। কেন তুমি গিয়ে কিছু নারীর সাথে যৌনতা করবে? বিয়ে করে তুমি যৌনতার স্বাভাবিক রূপটাই নিতে পারো।”

… … … ….

একুশ বছর বয়সে আমি এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়ালাম যেখানে আমি খুব শক্তিশালীভাবে অনুভব করলাম যে, সমস্ত শিক্ষক─বুদ্ধ, যিশু, শ্রীরামকৃষ্ণ, সবাই নিজেকে প্রবঞ্চনা করেছেন, নিজেকে বিভ্রান্ত করেছেন, সবাইকেই বিভ্রান্ত করেছেন। দেখুন, এইটা কোনো ব্যাপারই হতে পারে না─“এইসব লোকেরা যে দশার কথা বলেন, বর্ণনা করেন, সেই দশাটা কোথায়?” আমার সাথে, যেভাবে আমি ক্রিয়াশীল তার সাথে, মনে হয় না ওই বর্ণনার কোনো সম্পর্ক আছে। তাঁরা প্রত্যেকেই বলছেন, “কখনো রাগ কোরো না”─অথচ সারাক্ষণই আমি রেগে আছি। পাশবিক তৎপরতায় আমার ভেতরটা পরিপূর্ণ, অতএব সেটা মিথ্যা। আমার যা হওয়া উচিৎ বলে এইসব লোকেরা বলছেন সেটা মিথ্যা-কিছু, এবং যেহেতু তা মিথ্যা-কিছু, সেটা আমাকে মেকি বানাবে। আমি কোনো মেকি মানুষের জীবনযাপন করতে চাই না। আমি লোভী, আর তারা যা বলছেন সেটা হলো নির্লোভতা। কোথাও কোনো গোলমাল আছে। এই লোভটা আমার কাছে সত্যি-কিছু, স্বাভাবিক-কিছু; তারা যা বলছেন সেটাই হলো অস্বাভাবিক। সুতরাং কোথাও কোনো গোলমাল আছে। কিন্তু নির্লোভ একটা দশায় থাকার উদ্দেশ্যে নিজেকে আমি পাল্টাতে, বিকৃত করতে প্রস্তুত নই; আমার লোভ আমার কাছে একটা সত্যি। এইসব নিয়ে যারা নিরন্তর বকবক করে সেইসমস্ত লোকেদের মধ্যেই আমার বসবাস ছিলো─আমি আপনাকে বলতে পারি, তারা সবাই ছিলো মিথ্যা। তো, যেভাবেই হোক, যাকে বলে ‘অস্তিত্বের বিবমিষা’ (তখন আমি ওইসমস্ত শব্দ ব্যবহার করতাম না, কিন্তু ঘটনাক্রমে এখন আমি ওইসমস্ত শব্দ জানি), যাবতীয় পবিত্র আর ঐশ্বরিক জিনিসের প্রতি বিবমিষা, ধীরে ধীরে আমার মনুষ্যদেহে ঢুকে গেলো এবং সবকিছু দূরীভূত করে দিলো: “কোনো শ্লোক, কোনো ধর্ম, কোনো সাধনা─কিছুই আর সেখানে নেই; কিন্তু এখানে যা আছে তা স্বাভাবিক-কিছু। আমি একটা বর্বর, আমি একটা দানব, হিংস্রতায় আমি পরিপূর্ণ─এটাই হলো বাস্তবতা। বাসনায় আমি পরিপূর্ণ। বাসনাহীনতা, নির্লোভতা, ক্রোধহীনতা─আমার কাছে এইসব জিনিসের কোনো অর্থ নেই; সেসব মিথ্যা এবং মিথ্যা শুধু নয়, তারা আমাকে মেকি বানাচ্ছে।” তাই আমি মনে মনে বললাম, “এইসমস্ত কারবারে আমি আর নেই,” কিন্তু ব্যাপারটা দেখুন অত সহজ নয়।

এরপর একজন এসে হাজির হলো, এবং আমরা এই সমস্তকিছু নিয়ে আলাপ করলাম। সে দেখলো আমাকে প্রায় নাস্তিকই বলা চলে (তবে কোনো সক্রিয় নাস্তিক নয়), যে সব ব্যাপারেই সন্দিহান, আপাদমস্তক সন্দিহান। সে বললো, “এই মাদ্রাজের তিরুভান্নামালাইয়ের কোথাও একজন লোক থাকেন, তাঁর নাম রমণ মহর্ষি, চলো যাই তাঁকে দেখে আসি। তিনি হিন্দু ঐতিহ্যের একজন জীবন্ত অবতার।”

আমি কোনো সাধুকে দেখতে চাইনি। একজনকে দেখলেই তাঁদের সবাইকে দেখা হয়ে যায়। আমি কোনোদিন কোনো খরিদ্দার ছিলাম না, আমি কোনোদিন কোনো মানুষ খুঁজে বেড়াই নাই, আমি কোনোদিন গুরুদের পদতলে বসে বসে কিছু শুনি নাই, কারণ সবাই-ই বলছেন, “এই জিনিসই আরো বেশি বেশি করে করো, তাহলেই তুমি ইহা পাইবে।” আমি যা পেয়েছি তা হলো আরো আরো অভিজ্ঞতা, এবং তারপর ওই অভিজ্ঞতাগুলো চেয়েছে স্থায়িত্ব─এবং স্থায়িত্ব বলে কোনো জিনিস নেই। সুতরাং, “ধর্মীয় লোকগুলি সব তামাশা─তাঁরা শুধু শাস্ত্রের কথাই আমাকে শুনিয়ে যাচ্ছেন। আমিও সেসব পড়তে পারি─ ‘এই জিনিসই বারবার করে করো’ ─এ আমি চাই না। অভিজ্ঞতা আমি চাই না। তাঁরা আমার সাথে কোনো অভিজ্ঞতা ভাগ করতে চাইছেন। অভিজ্ঞতায় আমার কোনো আগ্রহ নেই। যত অভিজ্ঞতাই হোক, আমার কাছে ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সাথে যৌন অভিজ্ঞতা বা অন্য কোনো অভিজ্ঞতার কোনো পার্থক্য নেই; ধর্মীয় অভিজ্ঞতা অন্য যেকোনো অভিজ্ঞতার মতোই। ব্রহ্মার অভিজ্ঞতায় আমার আগ্রহ নেই; পরমার্থের অভিজ্ঞতায় আমার আগ্রহ নেই; সত্যের অভিজ্ঞতায় আমার আগ্রহ নেই। কারো হয়তো তাতে উপকার হতে পারে; কিন্তু আমার তাতে কোনো উপকার হবে না। একই জিনিস আরো আরো করায় আমার কোনো আগ্রহ নেই; আমি যা করেছি তাই যথেষ্ট। স্কুলে কোনো গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে চাইলে আপনি সেটা বারবার করে করছেন─এইভাবেই আপনি গাণিতিক সমস্যাটা সমাধান করছেন, এবং আপনি আবিষ্কার করছেন যে সমস্যাটার ভেতরেই আসলে উত্তরটা রয়ে গেছে। কাজেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে আপনি আসলে কী করছেন? এইসমস্ত দুর্ভোগ পোহানোর চাইতে আগেভাগেই উত্তর পেয়ে যাওয়াটা অনেক সহজ।”

কাজেই অনীহায়, দ্বিধায়, অনিচ্ছায় আমি রমণ মহর্ষিকে দেখতে গেলাম। ওই লোক টানতে টানতে আমাকে সেখানে নিয়ে গেল। সে বললো, “একবার চলো সেখানে। কিছু একটা তোমার ঘটবেই।” এইসমস্ত বলে সে আমাকে একটা বই দিলো, পল ব্রান্টনের সার্চ ইন সিক্রেট ইন্ডিয়া, তো বইটার যে অধ্যায়ে রমণ মহর্ষির বিষয়টা ছিলো সেটা আমি পড়লাম─ঠিক আছে, অসুবিধা নেই, চলো দেখাই যাক। তিনি সেখানে বসে ছিলেন। তাঁর সান্নিধ্যে গিয়ে আমার মনে হলো “সেকি! এই লোক আমাকে কীভাবে সাহায্য করবেন? এই লোক, যিনি কমিক স্ট্রিপ পড়ছেন, তরকারি কুটছেন, এটা-সেটা নিয়ে খেলা করছেন─আমাকে তিনি কীভাবে সাহায্য করবেন? তিনি আমাকে সাহায্য করতে পারেন না।” যাই হোক আমি সেখানে বসলাম। কিছুই ঘটলো না; আমি তাঁর দিকে তাকালাম, তিনিও আমার দিকে তাকালেন। “তাঁর সান্নিধ্যে তুমি নিস্তব্ধ বোধ করবে, তোমার সমস্ত প্রশ্ন উধাও হয়ে যাবে, তাঁর দৃষ্টি তোমাকে পাল্টে দেবে”─এ সবকিছুই আমার কাছে শুধু গল্প হয়ে রইলো, অলীক জিনিস হয়ে রইলো। আমি সেখানে বসে রইলাম। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন, অর্থহীন সব প্রশ্ন─তাহলে তো, “প্রশ্নগুলো অদৃশ্য হয় নাই। দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছি, প্রশ্নগুলো তখনও রয়ে গেছে। ঠিক আছে, তাঁকে কিছু প্রশ্ন করাই যাক” ─যেহেতু ওই সময়টায় আমি খুবই মোক্ষ চাইছি। আমার পটভূমির এই অংশ, মোক্ষই আমার চাওয়া। আমি তাঁকে এই কথা বলি নাই─“আপনি নিশ্চয়ই একজন মুক্ত মানুষ।” আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, “আপনার যা আছে সেটা আমাকে দিতে পারেন?” কিন্তু ওই লোক কোনো উত্তর দিলেন না, তো কিছুক্ষণ পর আমি আবারও ওই একই প্রশ্ন করলাম─, “আমি জানতে চাচ্ছি, ‘আপনার যা আছে সেটা কি আপনি আমাকে দিতে পারেন?’” তিনি বললেন, “দিতে পারি, কিন্তু তুমি কি সেটা নিতে পারবে?” হায়! প্রথমবারের মতো এই লোক বলছেন যে কিছু একটা তাঁর আছে এবং আমি সেটা নিতে পারবো না। এর আগে কেউ এই কথা বলেন নাই, “আমি দিতে পারি, কিন্তু তুমি কি সেটা নিতে পারবে?” তখন আমি মনে মনে বললাম “এই দুনিয়ায় যদি এমন কোনো লোক থেকে থাকে যে এটা নিতে পারে, সেটা হলো আমি, কারণ আমি প্রচুর সাধনা করেছি, সাত বছরের সাধনা। তিনি ভাবতেই পারেন যে আমি এটা নিতে পারবো না, কিন্তু আমি এটা নিতে পারি। আমি এটা নিতে না পারলে কে এটা নিতে পারবে?” ─ওইসময় এরকমই ছিলো আমার মনোভাব─জানেন তো, [হাসি] নিজের ব্যাপারে আমি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম।

আমি কখনো তাঁর সঙ্গে থাকি নাই, তাঁর কোনো বই পড়ি নাই, কাজেই তাঁকে আমি আরো কয়েকটা প্রশ্ন করলাম: “এরকম কেউ কি হতে পারে, যে কখনো মুক্ত, আবার কখনো মুক্ত নয়?” তিনি বললেন, “হয় তুমি মুক্ত অথবা আদৌ তুমি মুক্ত নও।” আরেকটা কী প্রশ্ন করেছিলাম, এখন মনে পড়ছে না। তিনি খুব অদ্ভুতভাবে উত্তর দিলেন: “কোনো পদক্ষেপই তোমাকে সেখানে নিয়ে যাবে না।” তবে আমি এই সবকিছুই উড়িয়ে দিলাম। এইসমস্ত প্রশ্ন আমার কাছে কোনো বিষয় নয়─উত্তরেও আমার কোনো আগ্রহ ছিলো না।

কিন্তু এই প্রশ্ন, “তুমি কি এটা নিতে পারবে?” ─ “কেমন উদ্ধত!” ─এই ছিলো আমার অনুভূতি। “সেটা যা-ই হোক না কেন, কেন আমি সেটা নিতে পারবো না? তাঁর যা আছে সেটা কী?”─এই ছিলো আমার প্রশ্ন, স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন। এইভাবে, প্রশ্নটা স্বয়ং সূত্রবদ্ধ হচ্ছে: “বুদ্ধ, যিশু আর সমস্ত দঙ্গলটা যে দশায় ছিলেন, কী সেই দশা? রমণ সেই দশায়─হতে পারে, আমি জানি না─কিন্তু ওই লোক আমারই মতো একজন মানুষ। আমার থেকে তিনি আলাদা কীভাবে? লোকেরা কী বলে বা তিনি কী বলেন সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়; তিনি যা করছেন সেটা যে-কেউই করতে পারে। সেখানে কী আছে? আমার থেকে খুব বেশি অন্যরকম তিনি হতে পারেন না। তাঁরও জন্ম তাঁর পিতা-মাতার থেকেই। সমস্ত ব্যাপারটা নিয়ে তাঁর নিজস্ব বিশেষ ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে কিছু একটা তাঁর ঘটেছে, কিন্তু তিনি আমার থেকে আলাদা কীভাবে? সেখানে কী আছে: কী ওই দশা?” ─সেটাই ছিলো আমার মূল প্রশ্ন, মূলগত প্রশ্ন─ সেইটা চলতেই থাকলো। “আমি নিজেই বার করবো কী সেই দশা। ওই দশা কেউ কাউকে দিতে পারে না; আমি একাকী। এই অজানা সমুদ্রে আমাকে কোনো কম্পাস ছাড়াই, কোনো তরণী ছাড়াই, এমনকি কোনো ভেলা ছাড়াই পাড়ি দিতে হবে। আমি নিজেই উদ্ধার করবো ওই লোক যাতে রয়েছেন সেই দশাটা কী।” ভীষণভাবে আমি সেটা চাইছিলাম, তা নাহলে আমি আমার জীবন উৎসর্গ করতাম না।

… … … …

 

এই দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারটা আমি বুঝলাম না।

“আমি এটা দিতে পারি, কিন্তু তুমি কি তা নিতে পারবে?”─এই কথা বলে তিনি কী বুঝাতে চাইলেন আমি তার কিছুই জানি না। কিন্তু এটা কোনোভাবে আমার নিজের প্রশ্নটা স্পষ্ট করতে সহায়তা করেছিলো। দেখুন, আজ যদি কেউ আমাকে ওই একই প্রশ্ন করে, আমি বলবো, কারো কাছ থেকেই কিছু পাবার নেই। আমি আপনাকে সেটা দেবার কে? আমার যা আছে আপনারও তাই আছে। আমরা সবাই ২৫, সন্নিধি স্ট্রীটে আছি, আর আপনি আমাকে বলছেন, “২৫, সন্নিধি স্ট্রীটটা কোথায়?” আমি বলছি আপনি সেখানেই আছেন। এমন না যে আমি জানি আমি সেখানেই আছি। আপনি কোথায় আছেন সেটা জানতেই আপনি ওই প্রশ্নটা করছেন।

… … … ….

[ইউ.জী. বলেন, আর কখনো তিনি রমণের সাথে বা “ওইসমস্ত ধর্মীয় লোকজনের” কারো সাথে দেখা করেননি, এবং তাঁর দর্শনশাস্ত্রের পরীক্ষার জন্যে পড়াশোনা করা ছাড়া আর কখনোই কোনো ধর্মীয় পুস্তক স্পর্শ করেননি।]

তখন শুরু হলো আমার আসল অন্বেষণ। আমার যাবতীয় ধর্মীয় পটভূমি আমার ভেতরে ছিলোই। আমি তখন অনুপুঙ্খ অন্বেষণ শুরু করলাম। কয়েক বছর ধরে আমি মনোবিজ্ঞান পড়লাম, দর্শনশাস্ত্র [প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের] পড়লাম, মরমিবাদ, সমস্ত আধুনিক বিজ্ঞান─মানবজ্ঞানের সমগ্র বিষয়, সবকিছু। আমি স্বাধীনভাবে পুঙ্খনাপুঙ্খ অন্বেষণ শুরু করলাম। অন্বেষণ চলছে তো চলছেই, এবং আমার প্রশ্নটা ছিলো, “কী ওই দশা?” এবং প্রশ্নটার নিজস্ব একটা তীব্রতা ছিলো। তো, “এইসমস্ত জ্ঞানে আমি সন্তুষ্ট নই, তাহলে কেন এইসব পড়তে হবে?” এসব পড়ে কী লাভ? দুর্ভাগ্যক্রমে─মনোবিজ্ঞান ছিলো আমার মাস্টার্সের একটা বিষয়─ওই সময় সেটা আমাদের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভূক্ত ছিলো। মনোবিজ্ঞানে আমি আগ্রহী ছিলাম যেহেতু সবসময়ই আমার আগ্রহের বিষয় ছিলো মন: “এই মনটা কোথায়? এই বিষয়ে আমি জানতে চাই। এখানে, আমার ভেতরে, আমি কোনো মন দেখি না, কিন্তু ওই সমস্ত গ্রন্থই মন নিয়ে কথাবার্তা বলছে। দেখা যাক, মন নিয়ে পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানীদের কী বলার আছে। একদিন আমার প্রফেসরকে আমি বললাম, “সারাক্ষণই আমরা মন নিয়ে কথা বলছি। আপনি নিজে কি জানেন, মন কী? বহু বই আমরা পড়ছি─ ফ্রয়েড, ইয়ূং, এ্যাডলার, পুরো দঙ্গলটা। ওই সবকিছুই আমি জানি। ওইসব বইতে যেসব সংজ্ঞার্থ আর লক্ষণব্যাখ্যা আছে সবই আমি জানি─কিন্তু মন বিষয়ে আপনি নিজে কি কিছু জানেন?” তিনি বললেন, “ওইরকম অস্বস্তিকর প্রশ্ন কোরো না। [হাসি] ওইগুলি খুব বিপজ্জনক প্রশ্ন, পরীক্ষায় পাশ করতে চাইলে, শুধু এইসব নোট লিখে দাও, মুখস্থ করো আর উত্তরপত্রে ঢালো─ডিগ্রি পেয়ে যাবে।” ডিগ্রিতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। মন বিষয়টা পরীক্ষণেই আমার আগ্রহ।

[তাঁর মাতামহের মৃত্যু হলো, আর ইউ.জী. ডিগ্রি শেষ না করেই মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করলেন। ১৯৪৩’এ তিনি বিয়ে করলেন।]

তারপর আমি থিওসফিক্যাল সোসাইটিতে জড়িয়ে গেলাম। আমার পটভূমির কারণেই। উত্তরাধিকারসূত্রে আমি থিওসফিক্যাল সোসাইটি, জে. কৃষ্ণমূর্তি আর দাদুর বিপুল পরিমাণ অর্থ পেলাম। তো সেটা আমার জন্যে এই সমস্তকিছুই সহজ করে দিলো: ওইসময় সেটা সেখানে বিপুল অঙ্ক─পঞ্চাশ-ষাট হাজার ডলার─কাজেই এইজাতীয় সবকিছুই আমি করতে পারতাম। একজন প্রভাষক হিসেবে আমি থিওসফিক্যাল সোসাইটিতে যুক্ত হলাম। [এবং অবশেষে ভারতের সোসাইটিতে ইউ.জী. যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন] কিন্তু এতে আমার মন ছিলো না─“এ-সবই হলো পুরোনো প্যাচাল। বক্তৃতা দেবার অর্থ কী?” ওইসময় আমি খুব ভালো বক্তা ছিলাম; কিন্তু এখন আর নই। আমি ছিলাম একজন প্রথম শ্রেণীর বক্তা, সর্বত্র বক্তৃতা করতাম, সমস্ত মঞ্চে। ভারতের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি বক্তৃতা করেছি। আমার কাছে এটা কোনো ব্যাপার নয়। যারই মাথা আছে সে-ই এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করে উগরে দিতে পারে। আমি করছিটা কী? কেন আমি আমার সময় নষ্ট করছি? এটা আমার জীবিকা নয়, এটা আমার রুটিরুজির উপায় নয়। এটা যদি আপনার জীবিকা হয় তাহলে ঠিক আছে। তখন আপনাকে বুঝতে পারি, তোতাপাখির মতো আপনি মুখস্থবিদ্যা আউড়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন, কিন্তু এটা আমার জীবিকা নয়। এবং তারপরও, কিছু একটাতে আমি আগ্রহী, ওইজাতীয় জিনিসেই আমার আগ্রহ।

১৯৪০’এর শেষের দিকে, [থিওসফিক্যাল সোসাইটির সাথে ইউ.জী.’র শেষের দিনগুলিতে] জে. কৃষ্ণমূর্তি দৃশ্যপটে এলেন। তখন তিনি সবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরেছেন আর শুরু করেছেন তাঁর নতুন ধরনের…

কৃষ্ণমূর্তি কি আপনার আত্মীয় সম্পর্কীয়?

কৃষ্ণমূর্তি কোনো পারিবারিক পদবী নয়, এটা কেবল দেওয়া একটা নাম। তাঁর পারিবারিক নাম জিদ্দু, ‘কৃষ্ণমূর্তি’ খুবই সাধারণ একটা নাম মাত্র─জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি।

আমি তাঁর সাথে জড়িত ছিলাম। সাত বছর ধরে আমি তাঁর কথা শুনেছি। যখনই তিনি আসতেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো তাঁর সাথে দেখা করি নাই, কারণ ওই ‘বিশ্বশিক্ষক কারবার’─এইসমস্ত একধরনের দূরত্ব তৈরি করেছিলো। “কীভাবে একজন বিশ্বশিক্ষক সৃষ্টি হওয়া সম্ভব? বিশ্বশিক্ষকের জন্ম হয়, বিশ্বশিক্ষক তৈরি হয় না।” এরকমই ছিলো আমার মনোভাব। সমস্ত পটভূমিটা, সমস্ত ব্যাপারটাই আমি জানতাম। আমি অন্তর্মণ্ডলীর অংশ ছিলাম না: সবসময়ই আমি ছিলাম পরিধিতে। কখনোই আমি নিজেকে জড়াতে চাইনি। ওখানেও ওই একই কপটতা ছিলো, এই অর্থে যে তাঁদের জীবনে কিছুই ছিলো না: তাঁরা ছিলেন ফালতু─ পণ্ডিত, বিদ্বান আর বিখ্যাত সব লোকজন─“কী এটা? কী আছে এর নেপথ্যে?”

এরপর কৃষ্ণমূর্তি এলেন, পরের সাতটি বছর পরিস্থিতি আমাদের একখানে করে রাখলো। প্রতিদিন আমি তাঁর সাথে দেখা করতাম─সমস্তকিছু নিয়ে আলাপ করতাম। তাঁর বিমূর্ত ধারণায় আমার মোটেও আগ্রহ ছিল না। তাঁর শিক্ষা আমাকে মোটেও টানে নাই। একবার আমি তাঁকে বললাম, “আজকাল আপনি মনস্তাত্ত্বিক ভাষাবন্ধে পড়ে গেছেন, আর এই ভাষাবন্ধের মাধ্যমে আপনি কিছু একটা প্রকাশ করতে চাইছেন। রপ্ত করে করে আপনি একটা জায়গায় চলে এসেছেন যেটা আসলে বিশ্লেষণ নয়। এই ধরনের বিশ্লেষণ মানুষকে শুধু পঙ্গু করে দেয়; তাতে মানুষের কোনো উপকার হয় না। এটা আমাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আমার ওই একটাই প্রশ্ন, “আপনার যা আছে সেটা কী? আপনি যে বিমূর্ত ধারণা আমাকে শুনিয়ে যাচ্ছেন, তাতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। এইসব বিমূর্ত ধারণার নেপথ্যে কি কিছু আছে? থাকলে সেটা কী? যে কারণেই হোক আমার মনে হয়─হয়তো সেটা আমার নিজেরই কল্পনা─ (প্রচলিত প্রথাগত উপমায় বললে) মধু হয়তো আপনি দেখেছেন, কিন্তু চেখে দেখেননি। যেভাবে আপনি বর্ণনা করেন তাতে আমার মনে হয় যেভাবেই হোক মধু আপনি দেখেছেন ঠিকই, কিন্তু চেখে দেখেছেন কিনা সন্দেহ আছে।”

তো বছরের পর বছর আমরা যুঝাযুঝি চালিয়ে গেলাম। [হাসি] আমাদের মধ্যে ব্যক্তিগত কিছু পার্থক্য ছিলো। আমি তাঁর কাছ থেকে সরাসরি, সৎ কিছু উত্তর চাইছিলাম, তাঁর নিজস্ব কারণেই যা তিনি দিলেন না । তিনি ছিলেন খুবই রক্ষণাত্মক─কিছু একটা তিনি রক্ষা করছিলেন। “আপনার কী আগলে রাখার আছে? আপনার অতীত, সবকিছু, একটা গাছের ওপর ঝুলিয়ে দিন, লোকজনদের কাছে ছেড়ে দিন। কেন আপনি নিজেকে রক্ষা করতে চান?” আমি চাইলাম তাঁর অবস্থা বিষয়ে সরাসরি সৎ উত্তর, যা তিনি সন্তোষজনকভাবে দিলেন না। এবং তারপর শেষের দিকে, আমি জোর দিয়ে বললাম, “শুনুন, আপনি যেসব বিমূর্ত ধারণা আমাকে শুনিয়ে যাচ্ছেন তার নেপথ্যে কি কিছু আছে?” তখন ওই লোক বললেন, “আপনার নিজের পক্ষে এটা জানার কোনো উপায় নেই।” ব্যাস, শেষ─সেটাই আমাদের সম্পর্কের ইতি, দেখুন─“আমার যদি তা জানার কোনো উপায় না থাকে, এবং আপনার যদি সে ধারণা বিনিময়ের কোনো উপায় না থাকে তাহলে আমরা করছিটা কী ছাই? সাত-সাতটি বছর আমি নষ্ট করেছি। গুড বাই, আমি আর আপনাকে দেখতে চাই না।” এরপর আমি বেরিয়ে গেলাম।

[সম্ভবত এই সময়টাতেই বিশেষ আধ্যাত্মিক ক্ষমতার আবির্ভাবে ইউ.জী. হতবিহ্বল হন।]

আমার উনপঞ্চাশ বছর বয়সের আগে আমার বহু ক্ষমতা ছিলো, বহু অভিজ্ঞতা, কিন্তু সেসবে আমি কোনো গুরুত্ব দিই নাই। কাউকে দেখলেই আমি তার কাছ থেকে কিছু না শুনেই তার সমস্ত অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ দেখতে পেতাম। আমি সেসব কাজে লাগাইনি; আমি তখন বিস্মিত, হতভম্ভ─“কেন আমার এইরকম ক্ষমতা?” আমি কখনো কিছু বললে সেটা ঘটতোই। আমি এই প্রক্রিয়াটার কোনো সুরাহা পাইনি─চেষ্টা করেছি─“এরকম বলাটা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে কীভাবে?” সবসময় ওইরকমই ঘটতো। আমি এটা নিয়ে খেলা করি নাই। এরপর এর পরিণাম হলো খানিকটা অপ্রীতিকর আর কিছু লোকের জন্যে এটা দুর্ভোগ সৃষ্টি করলো।

[তখনও ইউ.জী. সারা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। ১৯৫৫ সালে তাঁর বড় পুত্রের পোলিও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তিনি স্ত্রী আর তাঁর চার সন্তান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন। ১৯৬১ সালের ভেতরে তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে গেলেন, নিজের ভেতরে একটা সাংঘাতিক চাপ বোধ করতে শুরু করলেন, যা তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেন না বা পারলেন না, ছয় বৎসর ধরে সেটা রইলো এবং তার শেষ হলো গিয়ে ‘দুর্দৈবে’ (তাঁর সহজ স্থিতিতে পৌঁছুনোকে তিনি যা বলে থাকেন)। তাঁর বিয়ে ভেঙ্গে গেল। ভারতগামী একটা প্লেনে স্ত্রী-পরিবার তুলে দিয়ে তিনি লণ্ডনে চলে এলেন। একেবারে নিঃস্ব অবস্থায় শহরে নেমে তিনি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। তিন বৎসর তিনি পথে পথে কাটালেন। তাঁর বন্ধুরা দেখলেন তিনি দ্রুত খারাপ অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছেন, কিন্তু তিনি বলেন যে ওই সময় তাঁর জীবন তাঁর কাছে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল। (পরে, ধর্মপ্রবণ লোকেরা ওই দিনগুলোর বর্ণনা দিতে মরমি পরিভাষায় বলেন─ ‘আত্মার নিশুতি রাত’) কিন্তু তাঁর দৃষ্টিতে সেটা “প্রলোভন আর দুনিয়াদারীর সাথে বীরত্বপূর্ণ কোনো লড়াই নয়, বাসনার সাথে আত্মার মল্লযুদ্ধ নয়, কোনো কাব্যিক চরম পরিণতিও নয়, শুধুই এক ইচ্ছাশক্তির বিবর্ণতা।”]

এরপর আমার যেন কোনো মাথাই নেই: “আমার মাথাটা কোথায়? আমার কোনো মাথা আছে না নেই? বোধহয় আছে। কিন্তু এইসমস্ত চিন্তা আসছে কোত্থেকে?”─এই ছিলো আমার প্রশ্ন। মাথা অনুপস্থিত, শুধু এই অংশটা চলাফেরা করছে। কোনো কিছু করার কোনো ইচ্ছা ছিল না: একটা ঝরাপাতা যেন সম্ভাব্য সব জায়গায় উড়ে বেড়াচ্ছে, নোংরা একটা জীবন। এরকম চলছে তো চলছেই। শেষমেশ কী ঘটলো কে জানে─একদিন আমি মনে মনে বললাম, “এই ধরনের জীবনের কোনো অর্থ হয় না।” কার্যত আমি ছিলাম একটা ভ্যাগাবণ্ড। চলছিলাম কিছু মানুষের দানের ওপর এবং কিছু না জেনেই। কোনো ধরনের ইচ্ছাশক্তি ছিলো না─কী করছি তা জানতাম না─আদতে ছিলাম একটা উন্মাদ। লণ্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম─থাকার কোনো জায়গা ছিলো না─সারারাত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম। পুলিশ আমাকে দেখলেই থামাতো: “তোমার কোনো থাকার জায়গা নেই? তোমাকে জেলখানায় পুরে দেবো।” এই ধরনের একটা জীবন কাটাতাম। দিনের বেলায় একখানা টিকিট যোগাড় করে বৃটিশ মিউজিয়ামে গিয়ে বসে থাকতাম। বৃটিশ মিউজিয়ামে গিয়ে কী পড়বো? পড়ায় আমার কোনোই আগ্রহ ছিলো না─কোনো বই-ই আমায় টানতো না─কিন্তু ভান করতাম যেন সেখানে কিছু একটা পড়তে গেছি। ‘গুপ্ত অশিষ্ট ভাষা’র একটা অভিধান টেনে নিতাম─গুপ্ত লোকজন, অপরাধী, সব ধরনের অশিষ্ট ভাষা। খানিকটা দিন পার করার জন্যে ওইটা পড়তাম; রাত্রে কোথাও চলে যেতাম। এইভাবে চলছে তো চলছেই।

একদিন হাইড পার্কে বসে আছি। পুলিশ এসে বললো, “তুমি এখানে থাকতে পারবে না। আমরা তোমাকে বার করে দেবো।” কোথায় যাবো? কী করবো? কোনো পয়সাকড়ি নেই─পকেটে বোধহয় শুধু পাঁচ পেন্স ছিলো। চিন্তাটা মাথায় এলো: “রামকৃষ্ণ মিশনে যাও”, আর কিছু নয়, শূন্য থেকে চিন্তাটা এলো─হয়তো সে-সবই আমার কল্পনা। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিলো না, আর ওই লোকটা আমার পিছু নিলো, কাজেই একটা টিউবে চেপে আমি যতদূর যাওয়া যায় গেলাম। সেখান থেকে মিশনে গেলাম স্বামীজীর সাথে দেখা করতে। তাঁরা বললেন, “এখন আপনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। এখন বাজে রাত দশটা। এখন তিনি আপনার সঙ্গে দেখা করবেন না; এখন তিনি কারো সঙ্গেই দেখা করবেন না।” আমি সেক্রেটারীকে বললাম, “দেখা আমাকে করতেই হবে।” যাই হোক স্বামীজী এলেন। আমি তখন তাঁর সামনে এই স্ক্র্যাপবুকটা রাখলাম─, আমি এই ছিলাম: আমার বক্তৃতা, আমার বক্তৃতা নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের মন্তব্য, আমার ইতিহাস। যেভাবেই হোক ওই খাতাটা আমি নিজের কাছে রেখেছিলাম─স্ক্র্যাপবুক, আমেরিকায় আমার ম্যানেজার আমার জন্যে বানিয়েছিলো। “আমি এই ছিলাম, এবং এখন আমি এই।” তখন তিনি বললেন, “আপনি কী চান?” আমি বললাম, “ধ্যানমন্দিরে গিয়ে সারারাত বসে থাকতে চাই।” “সেটি হয় না। রাত আটটার পর আমরা কাউকেই সেখানে ঢুকতে দিই না।” আমি বললাম, “তাহলে তো আমার যাবার কোনো জায়গা নেই।” তিনি বললেন, “আমি আপনার জন্যে একটা ঘর ঠিক করছি। আজকের রাতটা হোটেলে থাকুন। তারপর আসুন।” তো আমি সেইরাত্রিটা হোটেলে থাকলাম। পরদিন বারোটায় আমি আবার সেখানে গেলাম, পরিশ্রান্ত। তাঁরা তখন লাঞ্চ করছিলেন। আমাকেও তাঁরা লাঞ্চ করতে দিলেন। এই প্রথম আমি প্রকৃত আহার করলাম। তখন আমার কোনো ক্ষুধাবোধও ছিলো না; ক্ষুৎপিপাসা কাকে বলে আমি জানতাম না।

লাঞ্চের পর স্বামীজী আমাকে ডেকে বললেন, “ঠিক আপনার মতো কাউকেই আমি খুঁজছিলাম। আমার যে সহকারী সম্পাদনার কাজ করতেন তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন─হসপিটালে তিনি মারা গেছেন। আমাকে এই যে বিবেকানন্দ শতবর্ষ সংখ্যাটা বার করতে হবে। এই সময় আপনিই আমার জন্যে সঠিক মানুষটা। আপনিই আমাকে সাহায্য করতে পারবেন।” আমি বললাম, “কিছুই আমি লিখতে পারি না, তখন হয়তো আমি সম্পাদনার কাজটাজ করতাম, কিন্তু এখন আমি কিছুই পারি না। আমি শেষ। আমি ওই লাইনে কোনো কাজেই লাগবো না।” তিনি বললেন, “না, না, না, একসাথে আমরা কিছু একটা করতে পারি।” ভারতীয় দর্শন আর ওইসবে পশ্চাৎপট আছে এরকম কাউকে তাঁর ভীষণ দরকার ছিলো। যে-কাউকেই তিনি এই কাজে পেতে পারতেন। কিন্তু তিনি বললেন, “না, না, না, ঠিক আছে, একটু বিশ্রাম নিন, থাকুন এখানে। আপনার দেখভাল আমার।” আমি বললাম, “আমি কোনো লেখাপড়ার কাজ করতে চাই না। আমাকে একটা ঘর দিন, আমি আপনার থালাবাসন মেজে দেবো বা অন্যকোনো কাজকাম করে দেবো, কিন্তু ওইজাতীয় কাজ করতে আমি বিশেষভাবে অপারগ।” তিনি বললেন, “না, না, আমি ওইটাই চাই।” কাজেই আমি কিছু একটা করার চেষ্টা করলাম; নিজের ইচ্ছেয় নয়, তাঁর ইচ্ছাতেও নয়, বরং কোনোভাবে ব্যাপারটা আমরা চালিয়ে গেলাম।

অন্যসব স্বামীজীর মতো তিনি আমাকে টাকাও দিলেন, পাঁচ পাউণ্ড। প্রথমবারের মতো, খরচ করার মতো পাঁচ পাউণ্ড আমার হলো। তো এটা দিয়ে কী করা যায়? টাকার মূল্যসম্পর্কীয় বোধ আর আমার ছিলো না, কারণ আমার কোনো টাকাই ছিলো না। একসময় আমি লক্ষ লক্ষ রূপির চেক লিখে দিতে পারতাম; কিছুকাল পর আমার পকেটে আর একটা পয়সাও ছিলো না; আর এখন আমার হাতে পাঁচ পাউণ্ড। এ নিয়ে আমি কী করবো? তো, ওই টাকা দিয়ে আমি লণ্ডনের সবক’টি সিনেমা দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। মিশনেই আমি থাকতাম, সকালে কাজ করতাম, বেলা ১টায় সেখানে খেতাম তারপর কোনো একটা সিনেমা দেখতে চলে যেতাম। একটা সময় এলো যখন আর আমার কোনো ছবি দেখার ছিলো না। লণ্ডন শহরতলীতে তখন এক শিলিঙে তিনটা ছবি দেখানো হতো বা ওইরকম কিছু, সেইজন্যে সব সিনেমাই আমার দেখা হয়ে গেল।

ধ্যানমন্দিরে গিয়ে বসে থাকতাম, ধ্যান-করা লোকেদের কথা ভাবতাম: “কেন তারা ওইসমস্ত হাস্যকর ব্যাপারটা করে যাচ্ছেন?” ততদিনে সমগ্র ব্যাপারটা আমার মনুষ্যদেহ থেকে দূর হয়ে গেছে। কিন্তু ওই ধ্যানমন্দিরে আমার একটা খুব অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো। সেটা আমার কল্পনা হোক বা যা-ই হোক, ঘটনাটা ঘটলো: প্রথমবারের মতো আমি অদ্ভুত কিছু অনুভব করলাম… চুপচাপ বসে আছি, ওইসমস্ত লোকেদের দেখছি, তাঁদের প্রতি করুণা বোধ করছি: “এই লোকগুলি ধ্যান করছে। তারা কেন সমাধিস্থ হতে চাইছে? তারা তো কিছুই পাবে না─ওই সবই আমি করেছি─তারা নিজেদের প্রবঞ্চনা করছে। এইসব করে করে তারা তাদের সমস্ত জীবনটা নষ্ট করছে, কিন্তু এসব থেকে তাদের রক্ষা করায় আমার কী করার আছে? এটা তাদেরকে কোথাও নিয়ে যাবে না ।” বসে আছি─কিছুই না, মনের ভেতরটা একদম ফাঁকা─ঠিক ওইসময় আমি খুব অদ্ভুত একটা জিনিস অনুভব করলাম: আমার দেহের ভেতরে একধরনের সচলতা। হঠাৎ বুঝলাম কিছু একটা চলতে শুরু করেছে: শিশ্ন দিয়ে উঠে একটা এনার্জি মাথার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে যেন সেখানে একটা ছিদ্র আছে। বামাবর্তে আর ডানাবর্তে ঘুরতে ঘুরতে এনার্জিটা উঠে আসছে। বিমানবন্দরে উইলস সিগারেটের বিজ্ঞাপনের মতো। সেটা এতো ফানি একটা ব্যাপার আমার জন্যে, কোনো কিছুর সাথেই আমি যার তুলনা করতে পারছি না। আমি একটা শেষ হয়ে-যাওয়া মানুষ। কেউ আমাকে খেতে দেয়, কেউ আমার দেখভাল করে, পরদিনের জন্যে কোনো ভাবনা নেই, তারপরও আমার ভেতরে কিছু একটা ঘটে চলেছে: “এটা একটা বিকৃত জীবন, বিকৃতি তার চূড়ান্তে পৌঁছেছে। এর কোনো মানে হয় না।” কিন্তু তবুও, আমার যেন মাথা বলে কিছু নেই─আমি কী করতে পারি? নিরন্তর এরকম চলছে তো চলছেই। তিনমাস পর আমি বললাম, “আমি চললাম। আমাকে দিয়ে আর এইসমস্ত কাজ হবে না।” শেষের দিকে স্বামীজী আমাকে কিছু টাকা দিলেন। চল্লিশ না পঞ্চাশ পাউণ্ড। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম…

তখনও আমার কাছে ভারতে ফেরার একটা এয়ারলাইন টিকিট ছিলো, তাই আমি প্যারিসে চলে গেলাম, টিকিটটা ভাঙিয়ে কিছু টাকা বানালাম। কারণ সেটা দেয়া হলো ডলারে। এই পয়ত্রিশ পাউণ্ডসহ আমার বোধহয় মোট দেড়শো পাউণ্ড হলো। তিনমাস প্যারিসের একটা হোটেলে থাকলাম। আগে যেরকম রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম সেরকমই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। একটাই শুধু পার্থক্য এখন আমার পকেটে কিছু টাকা রয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে ওই টাকা সবই ফুরিয়ে গেলো। তিনমাস পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে ফিরে যেতেই হবে, কিন্তু ভারতে ফিরে যেতে আমার মন সায় দিচ্ছিলো না। কোনোভাবেই আমি ভারতে ফিরে যেতে চাচ্ছিলাম না। পরিবারের কারণে, বাচ্চাকাচ্চাদের কারণে আমি ভারতে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম─তাতে করে অবস্থা খুব জটিল হয়ে যাবে─তারা সবাই আমার কাছে চলে আসবে। আমি মোটেও ফিরতে চাইলাম না; সেটা আমি ঠেকালাম। শেষতক…বছরের পর বছর সুইজারল্যাণ্ডে আমার একটা ব্যাঙ্ক একাউন্ট পড়ে ছিলো─মনে হলো সেখানে আমার এখনো হয়তো কিছু টাকা আছে। সুইজারল্যাণ্ডে গিয়ে টাকাটা বের করে তারপর কী ঘটে দেখাটাই ছিলো আমার শেষ বিকল্প। তো হোটেল থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সিতে উঠে আমি বললাম, “গার দ লিয়োনে নিয়ে চলুন।” অথচ প্যারিস থেকে জুরিখের ট্রেনটা ছাড়ে গার দ লেষ্ট থেকে, অথচ কেন জানি না আমি তাকে গার দ লিয়োনেই যেতে বললাম। তো সে আমাকে গার দ লিয়োনে নামিয়ে দিলো। আর আমি জেনেভাগামী ট্রেনে উঠে বসলাম।

১৫০ ফ্রাঙ্কের মতো নিয়ে আমি জেনেভায় নামলাম। একটা হোটেলে গিয়ে থাকতে লাগলাম যদিও বিল পরিশোধ করার টাকাটাও আমার কাছে ছিলো না। দু’সপ্তাহ পর তাঁরা বিল হাজির করলেন: “টাকা! টাকার কী হবে?” আমার কাছে তো কোনো টাকা নেই! হাত উল্টে দেখালাম। তখন একটা কাজই করার ছিলো তা হলো ভারতীয় দূতাবাসে গিয়ে বলা যে, “আমাকে ভারতে পাঠিয়ে দিন। দেখতেই পাচ্ছেন আমার অবস্থা।” কাজেই ভারতে ফিরে যাওয়াটা যে আমি ঠেকাতে চাইছিলাম সেটা শেষ হয়ে গেলো। তারপর আমি দূতাবাসে গিয়ে স্ক্র্যাপবুকটা বের করে দেখালাম: “ভারতের এযাবৎকালের অন্যতম প্রতিভাবান বক্তা,” আমার মেধা বিষয়ে নরম্যান কাজিনস আর রাধাকৃষ্ণনের মন্তব্যসহ। ভাইস-কনসাল বললেন, “আমরা তো এইজাতীয় কোনো লোককে ভারত সরকারের টাকায় ভারতে পাঠাতে পারি না। আপনি নিজে কী চিন্তা করছেন? ভারত থেকে কিছু টাকা যোগাড় করা যায় কিনা দেখুন, ততদিন আমার সাথে এসে থাকুন।” তো দেখতেই পাচ্ছেন এরকম চলছে তো চলছেই। সেখানেই আমার এই সুইস ভদ্রমহিলার [ভ্যালেন্টাইন দ কের্ভেন] সাথে দেখা। তিনি ছিলেন ভারতীয় দূতাবাসের অনুবাদক, কিন্তু সেদিন রিসেপসনিষ্ট অনুপস্থিত থাকায় বা অন্য কোনো কারণে তিনি রিসেপসন ডেস্কে ছিলেন। আমরা কথাবার্তা বলতে বলতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেলাম। তিনি বললেন, “আপনি চাইলে আমি সুইজারল্যান্ডে আপনার থাকার ব্যবস্থা করতে পারি। ভারতে ফিরতে না চাইলে ফিরবেন না।” মাসখানেক পর দূতাবাস আমাকে বিদায় করে দিলো, তবে আমরা চালিয়ে নিলাম─ভ্যালেন্টাইন সুইজারল্যাণ্ডে আমার একটা থাকার ব্যবস্থা করলেন। তিনি তাঁর চাকরিটা ছেড়ে দিলেন; তাঁর অল্পকিছু টাকাকড়ি ছিলো, তাঁর পেনশনের টাকাটা, কিন্তু ওতেই আমাদের চলে যেতো।

তারপর আমরা গেলাম সানেন। আমার কাছে ওই জায়গাটার কিছু বিশেষ গুরুত্ব আছে। সানেন, ‘৫৩ সালে ওই অঞ্চল দিয়ে পর্যটনের সময় ওই জায়গাটা চোখে পড়তেই আমার ভেতর থেকে কিছু একটা বলে উঠেছিলো, “ট্রেন থেকে নেমে পড়ো, কিছুদিন এইখানে থেকে যাও।” তাই আমি সপ্তাহখানেক সেখানে ছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, “বাদবাকী জীবনটা আমি এখানেই কাটাবো।” তখন আমার হাতে প্রচুর অর্থ। কিন্তু আমার স্ত্রী আবহাওয়ার কারণে সুইজারল্যাণ্ডে থাকতে চাইলেন না। তারপর আরো অনেক কিছু ঘটলো এবং আমরা চলে গেলাম আমেরিকায়। এখন ওই অপূর্ণ স্বপ্ন এইভাবে সত্য হয়ে গেলো। আমরা সানেনেই গেলাম যেহেতু সবসময় আমি সেখানেই থাকতে চেয়েছি, তাই আমি সেখানেই থাকতে শুরু করলাম। এরপর কৃষ্ণমূর্তি সানেন পছন্দ করলেন, যে কারণেই হোক প্রত্যেক গ্রীষ্মে তাঁর সমাবেশ করতে এই লোক সানেনে আসতে শুরু করলেন। তখন আমি সেখানেই থাকি। কৃষ্ণমূর্তি বা কোনো কিছুতেই আমার আগ্রহ ছিলো না। কোনো কিছুতেই না। যেমন আমার উনপঞ্চাশের আগেও কয়েক বছর ভ্যালেন্টাইন আমার সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলতে পারবেন, এইসমস্ত নিয়ে; সত্য, পরমার্থ বিষয়ে আমার আগ্রহ নিয়ে, আমি কখনোই তাঁর সাথে কোনো কথাবার্তা বলি নাই। কখনোই আমি ওইসমস্ত নিয়ে তাঁর সাথে কোনো আলোচনা করি নাই, কারো সাথেই করি নাই। আমার ভেতরে কোনো অন্বেষণ ছিলো না, কোনো কিছুর পেছনে কোনো খোঁজাখুঁজি ছিলো না, অথচ অদ্ভুত কিছু একটা ঘটে যাচ্ছিলো।

ওই সময়টায় (আমি একে বলি ‘ডিম্বস্ফোটন’) সবকিছুই আমার ভেতরে ঘটে যাচ্ছিলো─মাথাব্যথা, একটানা মাথাব্যথা, এইখানে এই মস্তিষ্কের ভেতরে সাংঘাতিক যন্ত্রণা। কত হাজার হাজার এ্যাসপিরিন যে আমি গিলেছি কে জানে। কোনো কিছুতেই স্বস্তি হয় নাই। এটা মাইগ্রেন বা ওইরকম পরিচিত কোনো মাথাব্যথা নয়, কিন্তু সাঙ্ঘাতিক মাথাব্যথা। বাঁচার জন্যে ওই এ্যাসপিরিন ট্যাবলেট আর প্রত্যেকদিন পনেরো-বিশ কাপ করে কফি! একদিন ভ্যালেন্টাইন বললেন, “সেকি! আপনি প্রতিদিন পনেরো কাপ করে কফি খাচ্ছেন। জানেন এর মানে কত টাকা? সেকি! মাসে তিনশো থেকে চারশো ফ্রাঙ্ক!” যাই হোক এমনই কঠিন ছিলো ব্যাপারটা।

সব ধরনের অদ্ভুত ঘটনা আমার ঘটলো। মনে আছে আমি যখন এইভাবে আমার দেহে ঘষা দিতাম, একটা স্ফুলিঙ্গ দেহের ওপর ফসফরাসের আলোর মতো জ্বলজ্বল করে উঠতো। ভ্যালেন্টাইন তাঁর বেডরুম থেকে ছুটে বেরিয়ে আসতেন দেখতে, তিনি ভাবতেন মধ্যরাতে ওই পথ দিয়ে কোনো গাড়ি চলে যাচ্ছে। যখনই আমি বিছানায় গড়ান দিতাম আলোর স্ফুলিঙ্গ দেখা দিতো, [হাসি] আমার জন্যে এটা এতো অদ্ভুত একটা ব্যাপার─“কী এটা?” এটা ছিলো বিদ্যুৎ─সেজন্যেই আমি বলি এটা [দেহ] একটা বিদ্যুচ্চুম্বকীয় ক্ষেত্র। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম আমার নাইলন কাপড় আর স্থির বিদ্যুতের কারণে এটা ঘটছে; আমি নাইলন ব্যবহার করা বাদ দিলাম। আমি ছিলাম অতিশয় সংশয়ী এক বিধর্মী, কখনোই কোনো কিছুতে আমি বিশ্বাস করি নাই; এমনকি চোখের সামনে কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটতে দেখলেও আমি সেটা আদৌ বিশ্বাস করতাম না─এইরকমই এই লোকের মানসিক গঠন। আমার কখনোই মনে হয়নি আমার ক্ষেত্রেই ওইজাতীয় একটা ব্যাপার সৃষ্টি হচ্ছে।

খুব অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যাপার আমার ঘটতে লাগলো, কিন্তু আমি কখনোই ওইসমস্ত ব্যাপার মোক্ষ, মুক্তি বা নির্বাণের সাথে সম্পর্কিত করি নাই, যেহেতু ততদিনে ওই সমস্ত জিনিসটাই আমার মনুষ্যদেহ থেকে দূর হয়ে গেছে। আমি এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছুলাম যেখানে আমি মনে মনে বললাম, “বুদ্ধ নিজেকে বিভ্রান্ত করেছেন এবং বিভ্রান্ত করেছেন সবাইকে, মানবজাতির ওই সমস্ত গুরু আর পরিত্রাতারা ছিলেন আকাট মূর্খ─তাঁরা নিজেদেরকে বোকা বানিয়েছেন─তো আমি আর এইজাতীয় জিনিসে আগ্রহী নই,” কাজেই এটা আমার মনুষ্যদেহ থেকে পুরোপুরি দূরীভূত হয়ে গেলো। এটা তার নিজস্ব পথে চলতেই লাগলো─অদ্ভুত সমস্ত ব্যাপার-স্যাপার─কিন্তু কখনোই আমি মনে মনে বলি নাই, “আহা, [হাসি] আমি সেখানে পৌঁছে যাচ্ছি, আমি সেটার কাছাকাছি চলে এসেছি।” তার কাছে বলে কিছু নেই, তার থেকে বহুদূরে বলে কিছু নেই─তার কোনো নৈকট্য নেই। ভিন্নরকম বা প্রস্তুত বলে কেউই তার নিকটে নয়। ওইটার জন্যে কোনো প্রস্তুতি নেই; এটা কেবল এক টন ইটের মতো আপনাকে ধাক্কা দেয়।

এরপর [এপ্রিল, ১৯৬৭] ঘটনাচক্রে আমি তখন প্যারিসে। জে. কৃষ্ণমূর্তিও তখন সেখানে। আমার কিছু বন্ধু প্রস্তাব করলো, “চলো যাই তোমার পুরোনো বন্ধুর কথাবার্তা শুনে আসি! তিনি এখানে বক্তৃতা দিচ্ছেন।” “আচ্ছা ঠিক আছে, বহুকাল তাঁর কথাবার্তা শুনি নাই─প্রায় কুড়ি বছর হলো─এবার তাহলে যাওয়াই যাক, শোনাই যাক।” সেখানে গেলে তারা আমার কাছে দুই ফ্রাঙ্ক দাবি করলেন। আমি বললাম, “জে. কৃষ্ণমূর্তির কথা শোনার জন্যে আমি দুই ফ্রাঙ্ক দিতে রাজী নই, না, তাহলে চলো ফালতু কিছু করা যাক। চলো কোনো স্ট্রিপটিজ জয়েন্টে যাই, ‘ফোলী বের্জের’ বা ‘কসীনো দ পরী’। কুড়ি ফ্রাঙ্ক দিয়ে চলো সেখানেই যাই।” ‘কসীনো দ পরী’তে আমরা শো’টা দেখতে ঢুকলাম। ওইসময় আমার ভারি অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা হলো: আমি বুঝতে পারছিলাম না─আমিই নর্তকী নাকি অন্য কোনো নর্তকী মঞ্চে নেচে চলেছে। আমার জন্যে সেটা খুবই আশ্চর্য একটা অভিজ্ঞতা: এখানে অদ্ভুত একরকম গতিচাঞ্চল্য, আমার ভেতরে। (এখন এটা আমার জন্যে একটা স্বাভাবিক ব্যাপার।) সেখানে কোনো বিভক্তি নেই: নর্তকীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে সেরকম কেউ নেই। আমিই কি নর্তকীটা নাকি ওই মঞ্চের ওপরে অন্য কোনো নর্তকী রয়েছে, এই প্রশ্নটা আমাকে হতভম্ব করে দিলো। আমার এবং নর্তকীর মধ্যে বিভক্তির অনুপস্থিতির এই অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে কিছুক্ষণ আলোড়িত করলো─তারপর আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম।

“কী সেই দশা?” সাংঘাতিক তীব্রভাবে ওই প্রশ্নটা আমার ভেতরে ঘুরতে লাগলো─সেটা কোনো ভাবাবেগপূর্ণ তীব্রতা নয়─যতই আমি একটা উত্তর পাবার চেষ্টা করছি, ততই আমি উত্তর পেতে ব্যর্থ হচ্ছি, ততই প্রশ্নটার তীব্রতাও বেড়ে যাচ্ছে। তুষের আগুনের মতো (সবসময় আমি এই উপমাটাই দিয়ে থাকি)। তুষের স্তূপে আগুন দিলে ভেতরে ভেতরে এটা পুড়তেই থাকবে; বাইরে থেকে আপনি কোনো আগুন দেখতে পাবেন না, অথচ সেটা স্পর্শ করলেই আপনি পুড়ে যাবেন। ঠিক একইভাবে প্রশ্নটা চলছে তো চলছেই: “কী সেই দশা? আমি সেটা চাই-ই চাই, ব্যাস। কৃষ্ণমূর্তি বলেছিলেন, “আপনার কোনো উপায় নেই,” কিন্তু আমি এখনো জানতে চাই কী সেই দশা, যে দশাটায় বুদ্ধ ছিলেন, শঙ্কর ছিলেন, এবং ওই সমস্ত শিক্ষকেরাই ছিলেন।”

তারপর [জুলাই, ১৯৬৭] আরেকটা পর্ব এলো। কৃষ্ণমূর্তি আবার সানেনে বক্তৃতা দিতে এলেন। আমার বন্ধু আমাকে টানতে টানতে সেখানে নিয়ে গেলেন, বললেন, “এবার তো আর পয়সা লাগছে না, তাহলে গিয়ে শুনবে না কেন?” আমি বললাম, “ঠিক আছে যাবো, শুনবো।” যখন তাঁর কথা শুনে যাচ্ছি তখন হাস্যকর কিছু একটা ঘটলো─আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো যে, আমার দশাটাই তিনি বয়ান করে যাচ্ছেন, তাঁর দশাটা নয়। তাঁর দশাটা আমি জানতে চাচ্ছি কেন? তিনি কিছু একটা বর্ণনা করছিলেন─, একটা গতিময়তা, একটা সচেতনতা, একটা নৈঃশব্দের কথা বলছিলেন─, “ওই নৈঃশব্দের ভেতরে কোনো মন নেই; আছে শুধু ক্রিয়া”─এইজাতীয় সব কথাবার্তা। তো, “আমিই সেই দশায়। এই ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে আমি কী ঘোড়ার ডিম করে যাচ্ছি? এইসব লোকেদের কথা শুনে যাচ্ছি আর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি, তাঁর দশা বা অন্য কারো দশা, বুদ্ধ বা যিশুর দশাটা বোঝার চেষ্টা করছি। আমিই ওই দশায়। এখন আমিই ওই দশায়।” তো আমি তাবুটা থেকে বেরিয়ে এলাম এবং আর কখনো আমি পেছন ফিরে তাকাইনি।

তারপর─খুবই অদ্ভুত ব্যাপার─ওই যে প্রশ্নটা, “কী সেই দশা?” সেটা স্বয়ং আরেকটা প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়ে গেলো। “কীভাবে আমি জানি যে আমিই ওই দশায়, ওই বুদ্ধদশায়, যে-দশাটা আমি ভীষণভাবে চেয়েছিলাম, দাবি করেছিলাম সবার কাছে?” আমিই সেই দশায়, কিন্তু সেটা আমি জানি কীভাবে?

পরদিন [ইউ.জী.’র উনপঞ্চাশতম জন্মদিনে] একটা বৃক্ষের নিচে বসে আছি, যেখান থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর মধ্যে একটি, [সানেনল্যাণ্ডের] সাত পর্বত সাত উপত্যকা দেখা যায়। সেখানে বসে আছি। এমন নয় যে প্রশ্নটা সেখানে ছিলো, বরং আমার সমগ্র অস্তিত্বই ছিল ওই প্রশ্নটা: “কীভাবে আমি জানি আমি ওই দশায়? আমার ভেতরে যেন অদ্ভুত একরকম বিভক্তি: যেন কেউ সেখানে জানে যে সে ওই দশায়। ওই দশা সম্পর্কীয় জ্ঞান─যা আমার পঠনপাঠনে আছে, অভিজ্ঞতায় আছে, তাঁদের সমস্ত কথাবার্তা─এই জ্ঞানই ওই দশাটার দিকে তাকিয়ে আছে, কাজেই, এটা ওই জ্ঞানটা ছাড়া আর কিছুই নয়, যে জ্ঞানটা ওই দশাটাকে কল্পনা করে নিচ্ছে।” আমি নিজেকে বললাম, “দেখ হে বুড়ো, চল্লিশ বছর পরও তুমি এক পাও এগোওনি; সেই এক নাম্বার ঘরেই পড়ে আছো। তোমার মনের কল্পক এই জ্ঞানটাই ওই প্রশ্নটা করে চলেছে। সেই একই জায়গাতে থেকে তুমি সেই একই প্রশ্ন করে চলেছো, “কীভাবে আমি জানি?” যেহেতু ওই জ্ঞানটাই, দশা সম্পর্কীয় ওইসমস্ত লোকেদের বিবরণটাই তোমার জন্যে এই দশাটা সৃষ্টি করেছে। তুমি নিজের সাথে মশকরা করছো। তুমি একটা আকাট মূর্খ।” কাজেই এইসব কিছুই না। কিন্তু তারপরও একধরনের অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিলো যে এটাই সেই দশা।

“কীভাবে আমি জানি যে এটাই সেই দশা?”─দ্বিতীয় এই প্রশ্নটার আমার কাছে কোনো উত্তর ছিলো না─একটা ঘূর্ণাবর্তের ভেতরে কোনো প্রশ্নের মতো সেটা চলছে তো চলছেই, তারপর হঠাৎ করেই ওই প্রশ্নটা উধাও হয়ে গেলো। কিছুই না; শুধু ওই প্রশ্নটা উধাও হয়ে গেলো। আমি মনে মনে এইকথা বলি নাই যে, “ওহ মাই গড! আমি উত্তরটা পেয়ে গেছি।” তারপর ওই দশাটাও উধাও হয়ে গেলো─যে দশাটায় আমি রয়েছি বলে ভেবেছিলাম, বুদ্ধদশা, যিশুদশা─, সেটা উধাও হয়ে গেলো। প্রশ্নটাও উধাও হয়ে গেলো। সবকিছুই শেষ হয়ে গেলো, এবং এই হলো ব্যাপার, দেখুন। তারপর থেকে আমি কখনোই মনে মনে বলি নাই যে─“আজ আমার কাছে ওইসব প্রশ্নের উত্তর আছে।” যে দশাটাকে আমি বলেছিলাম, “এটাই সেই দশা”─সেই দশাটা উধাও হয়ে গেছে। প্রশ্নটাও উধাও হয়ে গেছে। সব শেষ, দেখুন, এটা শূন্যতা নয়, নাস্তি নয়, এটা ওইসমস্ত কিছুই নয়; প্রশ্নটাই হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে, আর কিছু না।

… … … … 

[তার মূল প্রশ্নের অন্তর্ধান, ‘এর কোনো উত্তর নেই’─এই আবিষ্কার, সেটা ছিল একটা শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। ইউ.জী. বলেন, “ভেতরের একটা আকস্মিক ‘বিস্ফোরণ’ যেন আমার শরীরের প্রত্যেকটি কোষ, প্রত্যেকটি স্নায়ু, প্রত্যেকটি গ্রন্থি বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে।” ওই ‘বিস্ফোরণের’ সাথে সাথে, চিন্তার একটা ধারাবাহিকতা, একটা কেন্দ্রবিন্দু, একজন ‘আমি’-কর্তৃক চিন্তার সংযুক্তিকরণ, ওইসব আর সেখানে নেই।]

তারপর থেকে চিন্তা আর সংযুক্ত হতে পারে না। সংযুক্তিটা ভেঙে গেলো, এবং একবার যখন এইটা ভেঙে গেলো এটা শেষ হয়ে গেলো। কোনো এককালে চিন্তা বিস্ফোরিত হয়ে গেছে সেরকম নয়; যখনই কোনো চিন্তার আবির্ভাব হচ্ছে, সেটা বিস্ফোরিত হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এই ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে যায়, এবং চিন্তা তার স্বাভাবিক ছন্দে গিয়ে পড়ে।

তারপর থেকে আমার আর কোনো ধরনের প্রশ্ন নেই, কারণ চিন্তা আর সেখানে দাঁড়াতে পারে না। এখন আমার যে প্রশ্নগুলি আছে সেগুলি খুবই সাধারণ প্রশ্ন (যেমন: হায়দ্রাবাদ যাবো কীভাবে?), এই জগতে ক্রিয়াকর্ম করার জন্যে যে প্রশ্নগুলি দরকার─এবং লোকজনের কাছে এইসব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে। কিন্তু ওইসব প্রশ্নের কারো কাছে কোনো উত্তর নেই─কাজেই আর কোনো প্রশ্নও নেই।

মস্তিষ্কের ভেতরে সবকিছু টানটান─কোনো কিছুর জন্যে আর আমার মস্তিষ্কের ভেতরে কোনো জায়গা নেই। প্রথমবারের মতো আমি ভেতরের সবকিছু ‘টানটান’ আমার মাথাটার ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠলাম। তো এই সব বাসনা (Vāsanā) বা যা-ই বলুন─কখনো কখনো তারা জেগে ওঠার চেষ্টা করে, কিন্তু তখন মস্তিষ্ককোষ এতো টানটান যে তাদের আর আজেবাজে সময় নষ্ট করার উপায় নেই। বিভক্তিটা আর সেখানে থাকতে পারে না─সেটা একটা দৈহিক অসম্ভবতা; আপনার এখানে কিছুই করতে হবে না, দেখুন সেজন্যেই আমি বলি যে যখন এই ‘বিস্ফোরণ’টা ঘটে (‘বিস্ফোরণ’ শব্দটা ব্যবহার করছি কারণ, এটা একটা পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতোই) এটা একটা চেইন রিএ্যাকশন রেখে যায়। আপনার দেহের প্রত্যেকটি কোষকে, অস্থির মধ্যেকার মজ্জার কোষকেও এই ‘পরিবর্তন’ সহ্য করতে হবে─শব্দটা আমি ব্যবহার করতে চাই না─এটা একটা একমুখী পরিবর্তন। আপনার আর ফেরার কোনো প্রশ্ন নেই। এই লোকের জন্যে আদৌ আর ‘পতনের’ কোনো প্রশ্ন নেই। এটা একটা একমুখী ক্রিয়া: একধরনের আলকেমি।

এটা একটা পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো, দেখুন─সমস্ত দেহকে এটা বিধ্বস্ত করে দেয়। এটা কোনো সহজ ব্যাপার নয়; এটাই মানুষের সমাপ্তি─এমন বিধ্বংসী একটা ব্যাপার যে, এটা আপনার দেহের প্রত্যেকটি কোষ, প্রত্যেকটি স্নায়ু চূর্ণ করে দেয়। সেই সময়টায় আমার সাংঘাতিক একটা দৈহিক নিগ্রহের অভিজ্ঞতা হয়। এমন না যে আপনি ওই বিষ্ফোরণটা অনুভব করছেন; বিস্ফোরণটা আপনি অনুভব করতে পারবেন না─কিন্তু এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া, বিকিরণ, সেটাই আপনার দেহের সমগ্র রসায়নটাকে পাল্টে দেবে।

… … … …

তাহলে স্যার, আপনার নিশ্চয়, যদি এইভাবে বলি, একটা উচ্চস্তরের অভিজ্ঞতা হয়েছে…

স্তরের কথা বলছেন? কোনো স্তর নেই, স্তর নেই─মাত্রা নেই। দেখুন, এই ‘বিস্ফোরণ’ বা যা-ই এর নাম দিন তার ফলাফল হিসেবে একটা খুব অদ্ভুত জিনিস আমার ঘটেছে: আমি আপনার থেকে বিচ্ছিন্ন, মুহূর্তের জন্যেও এই চিন্তা এই চেতনায় আসে না। কখনোই না। কখনোই ওই চিন্তা আমার চেতনায় এসে আমাকে বলে না যে আপনি আমার থেকে আলাদা বা আমি আপনার থেকে আলাদা, কারণ এখানে কোনো বিন্দু নেই, এখানে কোনো কেন্দ্রবিন্দু নেই। এবং শুধু ওই কেন্দ্রবিন্দুর সাপেক্ষেই আপনি অন্য সমস্ত বিন্দু সৃষ্টি করছেন।

কোনো-না-কোনোভাবে আপনি নিশ্চয়ই অন্য লোকজনদের থেকে আলাদা।

শারীরবৃত্তীয়ভাবে, হয়তো।

আপনি বলছেন যে, সাংঘাতিক রাসায়নিক পরিবর্তন আপনার মধ্যে ঘটেছে। কীভাবে আপনি সেটা জানেন? আপনি কি কখনো সেটা পরীক্ষা করিয়েছেন; নাকি সেটা শুধুই একটা ধারণামাত্র?

ওইটার [‘বিস্ফোরণের’] পরবর্তী প্রতিক্রিয়া এবং, কোনো সমন্বয়ক বা কোনো কেন্দ্রবিন্দু ছাড়াই এখন যেভাবে ইন্দ্রিয়গুলো কাজ করে যাচ্ছে─আমি শুধু ওইসমস্তই বলতে পারি। আরেকটা ব্যাপার হলো: রসায়নটা পাল্টে গেছে─সেটা বলছি এইজন্যে যে, আলকেমি বা সমগ্র রসায়নটা পাল্টে না গেলে, এই প্রাণীটার চিন্তা থেকে মুক্ত হবার, চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকে মুক্ত হবার কোনো উপায় নেই। কাজেই, যেহেতু চিন্তার কোনো ধারাবাহিকতা নেই, খুব সহজেই আপনি বলতে পারেন যে, কিছু একটা ঘটেছে, কিন্তু আসলে কী ঘটেছে? সেটা আমার আদৌ অনুভব করার কোনো উপায় নেই।

এমনও তো হতে পারে এটা শুধুই মনের একটা খেলা এবং ‘বিস্ফোরিত মানুষ’ ব্যাপারটা শুধুই আপনার একটা কল্পনা।

আমি এখানে কিছু বিপণনের চেষ্টা করছি না। এটা অনুকরণ করা আপনার জন্যে অসম্ভব। যে ক্ষেত্রটাতে, যে অঞ্চলটাতে আমি পরিবর্তনের আশা করেছিলাম, পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, পরিবর্তনটা চেয়েছিলাম, সেটা ঘটেছে তার পরিধির বাইরে, তাই আমি এটাকে কোনো ‘পরিবর্তন’ বলবো না। সত্যিই আমি জানি না আমার কী ঘটেছে। কীভাবে আমি ক্রিয়াশীল, আমি আপনাকে সেটাই বলছি। মনে হয় আপনি যেভাবে ক্রিয়াশীল আর আমি যেভাবে ক্রিয়াশীল তার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে, কিন্তু মূলগতভাবে সেখানে কোনোই পার্থক্য থাকতে পারে না। আপনার আমার ভেতরে কীভাবে কোনো পার্থক্য থাকতে পারে? পারে না; কিন্তু যে পন্থায় আমরা নিজেদের ব্যক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি সেখানে বোধহয় কোনো পার্থক্য আছে। আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা পার্থক্য আছে, এবং কী সেই পার্থক্যটা সেটাই শুধু আমি বুঝার চেষ্টা করছি। এইভাবেই আমি ক্রিয়াশীল।

… … … …

 

[ওই ‘বিস্ফোরণের’ পরের পুরো সপ্তাহ জুড়ে ইউ.জী. তাঁর ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়াপদ্ধতিতে মূলগত পরিবর্তন লক্ষ করলেন। সাত দিনের দিন তাঁর শরীর ‘একটা দৈহিক মৃত্যু প্রক্রিয়া’র (নির্বিকল্প সমাধি) মধ্যে দিয়ে গেল, এবং সমস্ত পরিবর্তনটা স্থায়ী হয়ে গেল।]

তারপর শুরু হলো পরিবর্তন─তার পরদিন থেকে একটানা সাতদিন─প্রতিদিন একটা করে পরিবর্তন। প্রথমে আমি আবিষ্কার করলাম ত্বকের মসৃণ হয়ে যাওয়া এবং চোখের পলক-পড়া থেমে যাওয়া, এবং তারপর স্বাদেন্দ্রিয়, ঘ্রাণেন্দ্রিয় এবং শ্রবণেন্দ্রিয়ের পরিবর্তনগুলো─এই পাঁচটি পরিবর্তন আমি লক্ষ করলাম। সেগুলো হয়তো আগেই হয়ে ছিলো, আমি শুধু প্রথমবারের মতো সেগুলো লক্ষ করলাম।

(প্রথম দিনে) লক্ষ করলাম আমার ত্বক সিল্কের মতো মসৃণ এবং অদ্ভুত ধরনের একটা আভা, সোনালি রঙের। শেভ করছি, শেভ করতে গেলেই রেজরটা পিছলে যাচ্ছে। ব্লেডটা পাল্টে নিলাম, তাতে কোনো লাভ হলো না। নিজের গাল স্পর্শ করলাম। স্পর্শটা অন্যরকম লাগলো। যেভাবে আমি রেজরটা ধরে ছিলাম সেটাও ছিলো অন্যরকম। বিশেষ করে ত্বক─আমার ত্বক ছিলো সিল্কের মতো নরম আর এই আভা। কোনো কিছুর সাথে আমি আদৌ এটাকে মেলাচ্ছি না; আমি শুধু ওইরকম দেখলাম।

(দ্বিতীয় দিনে) প্রথমবারের মতো আমি সচেতন হলাম যে, যাকে আমি ‘নিয়ন্ত্রকশূন্য দশা’ বলি, আমার মনটা ছিলো ওইরকম একটা অবস্থায়। ওপরের তলায় রান্নাঘরে ভ্যালেন্টাইন টমেটোর স্যুপ বানাচ্ছিলেন, আমি তখন সেখানে। সেটা আমার চোখে পড়লো এবং আমি জানতাম না সেটা কী। তিনি বললেন যে এটা টমেটোর স্যুপ এবং আমি চাখলাম আর শনাক্ত করলাম, “টমেটো স্যুপের স্বাদটা এইরকম”। তারপর আমি স্যুপটা গিলে ফেললাম। আর তারপর আমি অদ্ভুত ওই মনোফ্রেমে ফিরে গেলাম─যদিও মনোফ্রেম শব্দটা এখানে খাটে না, এটা ছিলো ‘না-মনের ফ্রেম’─যার ভেতরে আমি আবার সেটা ভুলে গেলাম। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম “কী ওটা?” তিনি আবারো বললেন, “টমেটো স্যুপ।” আবার আমি সেটার স্বাদ নিলাম। আবার সেটা গিলে ফেললাম এবং ভুলে গেলাম। কিছুক্ষণ এই খেলাটা খেললাম, তখন এইটা আমার জন্যে এতই হাস্যকর একটা বিষয়, এই ‘নিয়ন্ত্রকশূন্য দশা’টা। এখন অবশ্য এটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। এখন আর আমি ভাবাবেশে, উদ্বেগে, জল্পনাকল্পনায় বা অন্য কোনো ধরনের ভাবনায়─অধিকাংশ মানুষ যেরকম ভাবনার ভেতরে থাকে, যখন তারা একা একা থাকে─সময় কাটাই না। যখন দরকার শুধু তখনই আমার মন সংযুক্ত থাকে, যেমন আপনি যখন প্রশ্ন করছেন বা যখন কোনো টেপরেকর্ডার ঠিকঠাক করা লাগছে বা ওইরকম কিছু। বাদবাকি সময় আমার স্মৃতিটা থাকে পশ্চাৎপটে এবং যখন দরকার শুধু তখনই এটা কাজ করে, আপনা-আপনি। যখন এর আর দরকার নেই, তখন কোনো মন নেই, কোনো চিন্তা নেই, আছে শুধুই জীবন।

(তৃতীয় দিনে) কয়েকজন বন্ধু ডিনারের নিমন্ত্রণ নিলেন, আমি বললাম, “আমি কিছু একটা রান্না করি।” কিন্তু কোনোভাবেই আমি ঠিকমতো স্বাদ বা ঘ্রাণ নিতে পারছিলাম না। আস্তে আস্তে আমি সচেতন হচ্ছিলাম যে, এই দু’টি ইন্দ্রিয়ই আসলে পাল্টে গেছে। যখনই কোনো গন্ধ আমার নাকে আসছে, সেটা আমার ঘ্রাণকেন্দ্রকে একইরকমভাবে উত্তেজিত করে তুলছে, সেটা সবচে’ দামি সুগন্ধি বা গোবর, যেখান থেকেই আসুক, উত্তেজনাটা একইরকম। এবং তারপর, যখনই আমি কোনো কিছুর স্বাদ নিচ্ছি, শুধু প্রধান উপাদানটার স্বাদ পাচ্ছি─অন্যসব উপাদানের স্বাদ পাচ্ছি পরে ধীরে ধীরে। এরপর থেকে সুগন্ধি আমার কাছে অর্থহীন, মশলাদার খাবারের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ নেই। শুধু প্রধান মশলাটার স্বাদই আমি নিতে পারি─সেটা মরিচ বা যাই হোক ।

(চতুর্থ দিনে) চোখের ক্ষেত্রে কিছু একটা ঘটলো। আমরা ‘রিয়ালতো’ রেস্তোরাঁয় বসে আছি, এমন সময় আমি একটা অবতল দর্পণের মতো বিশাল ধরনের ‘ভিস্তাভিশনে’ সচকিত হয়ে উঠলাম। সবকিছু যেন আমার দিকেই এগিয়ে আসছে, আমার ভেতরেই ঢুকে যাচ্ছে; এবং মনে হচ্ছে যেন আবার আমার ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসছে। সেটা তখন আমার জন্যে বিশাল এক ধাঁধা─আমার চোখ যেন অতিকায় একটা ক্যামেরা, আমার কোনো ভূমিকা ছাড়াই সেটা নিজেনিজেই তার ফোকাস পাল্টে ফেলছে। এখন অবশ্য এই ধাঁধায় আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন আমি ওইভাবেই দেখি। আপনি যখন আপনার মিনিতে করে আমাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন আমি যেন একটা ডলি করতে থাকা ক্যামেরাম্যান এবং বিপরীতদিক থেকে আসা গাড়িগুলো যেন আমার ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে, এবং যে গাড়িগুলো আমাদের অতিক্রম করে যাচ্ছে সেগুলো আসছে আমারই ভেতর থেকে; এবং আমার চোখ যখন কোনো কিছুতে নিবদ্ধ হচ্ছে, এত সম্পূর্ণ মনোযোগে নিবদ্ধ হচ্ছে, যেন সেটা একটা ক্যামেরা। চোখের ব্যাপারে আরেকটা জিনিস: রেস্তোরাঁ থেকে বাসায় ফিরে আসার পর আমি আয়নার দিকে তাকালাম, দেখতে চাইলাম আমার চোখের সমস্যাটা কী, সেগুলো কী ‘অবস্থায়’ আছে। দীর্ঘসময় ধরে আয়নাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, দেখলাম আমার চোখের পলক পড়ছে না। আধা ঘণ্টা বা পয়তাল্লিশ মিনিট ধরে আমি আয়নাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম─তারপরও কোনো পলক পড়লো না। সহজাত পলক-পড়ার ব্যাপারটা আর নেই, এবং এখনো এটা ওইরকমই।

(পঞ্চম দিনে) শ্রবণেন্দ্রিয়ে একটা পরিবর্তন লক্ষ করলাম। যখন কোনো কুকুরের ঘেউঘেউ শুনছি, ঘেউঘেউটার উৎপত্তি হচ্ছে আমারই ভেতরে, গরুর হাম্বা, ট্রেনের হুইসল─সব শব্দই আকস্মিকভাবে আমার ভেতরে সৃষ্টি হচ্ছে─যেন আমার ভেতর থেকে আসছে, বাইরে থেকে নয়─এবং এখনো ব্যাপারটা তাই।

পাঁচদিনে পাঁচটা ইন্দ্রিয় পাল্টে গেল, এবং ষষ্ঠদিনে আমি একটা সোফার ওপর শুয়ে আছি─ভ্যালেন্টাইন তখন রান্নাঘরে─হঠাৎ আমার দেহটা অদৃশ্য হয়ে গেল। কোনো দেহই আর নেই। হাতের দিকে তাকালাম। (উদ্ভট ব্যাপার─আপনি নিশ্চয় আমাকে মেন্টাল হসপিটালে পাঠাবেন) আমি সেটার দিকে তাকিয়ে ভাবছি─ “এটা আমার হাত?” সেখানে কোনো প্রশ্ন-ট্রশ্ন ছিল তা নয় কিন্তু পুরো পরিস্থিতিটাই ছিলো ওইরকম─আমি শুধু সেটাই বর্ণনা করছি। এই দেহটা স্পর্শ করলাম, কিছুই না─শুধু স্পর্শটুকু ছাড়া, সংযোগবিন্দুটুকু ছাড়া সেখানে আর কিছুই অনুভব করলাম না। তখন আমি ভ্যালেন্টাইনকে ডেকে বললাম, “আপনি সোফার ওপরে আমার দেহটাকে দেখতে পাচ্ছেন? আমার ভেতরে কিছুই বলছে না যে এটা আমার দেহ।” তিনি সেটা স্পর্শ করলেন─“এই তো আপনার দেহ।” এই নিশ্চয়তাও আমাকে কোনো স্বস্তি বা সান্ত্বনা দিলো না─“একি অদ্ভুত ব্যাপার! আমার দেহটা অদৃশ্য হয়ে গেছে!” আমার দেহটা অদৃশ্য হয়ে গেছে, এবং এটা আর কখনোই ফিরে আসে নাই। দেহ বলতে আছে শুধু সংযোগবিন্দুগুলি─আর-কিছুই আমার নেই─যেহেতু দর্শনেন্দ্রিয় এখানে সম্পূর্ণতই স্পর্শেন্দ্রিয়-নিরপেক্ষ। কাজেই আমার পক্ষে আমার দেহের একটা সম্পূর্ণ প্রতিরূপ সৃষ্টি করাও আর সম্ভব নয়, কারণ যেখানে কোনো স্পর্শ নেই, চেতনায় সেখানে লুপ্ত বিন্দু।

সপ্তম দিনে আবার ওই সোফাটাতেই শুয়ে আছি, শিথিলভাবে, ‘নিয়ন্ত্রকশূন্য দশা’টা উপভোগ করছি। ভ্যালেন্টাইন ঘরে ঢুকলেন, আমি তাঁকে ভ্যালেন্টাইন হিসেবে চিনলাম; তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন─ব্যাস, শুনশান, কোনো ভ্যালেন্টাইন নেই─“একি! ভ্যালেন্টাইন দেখতে কেমন আমি সেটাও কল্পনা করতে পারছি না।” রান্নাঘরে বাসনকোসনের শব্দ। “আমি কি শুধু নিজের ভেতর থেকে আসা শব্দই শুনবো?” ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। দেখলাম আমার সমস্ত সংবেদন ভেতরের কোনো সমন্বয় প্রক্রিয়া বাদেই ঘটে চলেছে: সমন্বয়ক উধাও হয়ে গেছে।

টের পেলাম ভেতরে কিছু একটা ঘটে চলেছে: দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে জীবনীশক্তি এসে একটা বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। আমি মনে মনে নিজেকে বললাম, “তুমি তোমার জীবনের অন্তিমে এসে গেছো, তুমি মারা যাচ্ছো।” ভ্যালেন্টাইনকে ডেকে বললাম, “ভ্যালেন্টাইন, আমি মারা যাচ্ছি। আপনাকে এই দেহটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। হসপিটালে দান করে দিন─তাঁদের হয়তো কাজে লাগবে। দাহ, সমাধি বা ওইসমস্ত কোনো কিছুতে আমি বিশ্বাস করি না। নিজের স্বার্থেই আপনাকে এই দেহের একটা ব্যবস্থা করতে হবে─একদিন এটা ভয়ঙ্কর গন্ধ ছড়াবে─কাজেই দান করে দেওয়াই ভালো।” তিনি বললেন, “আপনি একজন বিদেশি। সুইস সরকার আপনার দেহ গ্রহণ করবে না। এইসমস্ত বাদ দিন।” এই বলে তিনি চলে গেলেন। আর তখন জীবনীশক্তির ভীতিকর ক্রিয়ার এই পুরো ব্যাপারটা যেন একটা বিন্দুতে চলে আসছে। আমি সোফার ওপরে শুয়েছিলাম। তাঁর শয্যাটা ফাঁকা পড়েছিলো, আমি গিয়ে তখন ওই শয্যার ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লাম, মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হলাম। আমাকে কোনো পাত্তা না দিয়ে ভ্যালেন্টাইন চলে গেলেন। “একদিন বলছেন এইটা পাল্টে গেছে, পরদিন বলছেন এইটা পাল্টে গেছে, তার পরদিন বলছেন এইটা পাল্টে গেছে। এইসব কী?” বলতে বলতে ভ্যালেন্টাইন চলে গেলেন। ওইসব কোনো কিছুতেই তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না─ওইসব ধর্মীয় ব্যাপার-স্যাপারেও তাঁর কখনো আগ্রহ ছিলো না─কখনোই তিনি ওইসব শোনেন নাই। “আপনি বলছেন আপনি মারা যাচ্ছেন, কিন্তু আপনি মারা যাচ্ছেন না, আপনি ঠিকই আছেন, সুস্থ এবং সবলই আছেন।” তিনি চলে গেলেন। আমি তখন নিজেকে বিছানায় ছড়িয়ে দিলাম এবং এইরকম চলতেই থাকলো। সমস্ত জীবনীশক্তিটা কোনো একটা কেন্দ্রবিন্দুর দিকে চলমান─কোথায় তা জানি না। তারপর একটা সময়ে এসে মনে হলো যেন কোনো ক্যামেরার অ্যাপার্চার নিজেনিজে বুজে যাবার চেষ্টা করছে (আমি শুধু এই উপমাটাই দিতে পারি। যেভাবে আমি এটা বলে যাচ্ছি সেটা ওইসময় যেভাবে ব্যাপারটা ঘটেছিলো তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ সেখানে কেউ এইরকম ভাষায় চিন্তা করছিল এমন নয়। নিশ্চয় ওই সমস্তই আমার অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ছিলো, তা নইলে আমি এখন এটা বলতে পারতাম না।) তো নিজেনিজেই অ্যাপার্চারটা বুজে যেতে চাইছে, এবং সেখানে কিছু একটা সেটাকে খুলে রাখতে চাইছে। এর কিছুক্ষণ পর কিছু করার ইচ্ছাটাও আর রইলো না, এমনকি অ্যাপার্চারের নিজেনিজে বুজে যাওয়াটা ঠেকানোর ইচ্ছেটাও আর রইলো না। এটা যেন হঠাৎ করেই বুজে গেলো। এরপরে কী হলো আমি আর জানি না।

৪৯ মিনিট ধরে এই প্রক্রিয়াটা চলে─মৃত্যুর এই প্রক্রিয়াটা। এটা ছিলো একটা দৈহিক মৃত্যুর মতোই। এখনও এটা ঘটে: হাত-পা ভীষণ ঠাণ্ডা হয়ে যায়, দেহটা শক্ত হয়ে যায়, হৃৎস্পন্দন শ্লথ হয়ে আসে, শ্বাসপ্রশ্বাস শ্লথ হয়ে যায়, এবং তারপর শ্বাসের জন্যে একটা হাঁপ ওঠে। তখনও আপনি কোনোভাবে টিকে আছেন, তারপর শেষ নিঃশ্বাসটা নিলেন এবং তারপর আপনি আর নেই। তারপর কী হয় সেটা কেউ জানে না।

যখন এর থেকে বেরিয়ে এলাম, কেউ একজন বললো ফোনে কেউ আমাকে ডাকছে। ঘর থেকে বেরিয়ে আমি ফোন ধরতে নিচে গেলাম। আমি তখন একটা বিমূঢ় দশায়। কী হয়েছে আমি জানি না। সেটা ছিলো একটা দৈহিক মৃত্যু। কী আমাকে জীবনে ফিরিয়ে আনলো জানি না। কতক্ষণ এটা টিকে ছিলো জানি না। এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পরি না, কারণ অভিজ্ঞতাগ্রহণকারীর মৃত্যু হয়ে গেছে: ওই মৃত্যুর অভিজ্ঞতা নেবার আদৌ কেউ ছিলো না… তো, ঘটনা সেখানেই শেষ। আমি উঠে দাঁড়ালাম।

… … … ….

আমি একটা সদ্যোজাত শিশু, অনুভূতিটা সেরকম ছিলো না─বোধিপ্রাপ্তির তো কোনো প্রশ্নই আসে না─কিন্তু ওই সপ্তাহে যে জিনিসটা আমাকে বিস্মিত করলো তা হলো, আমি দেখলাম স্বাদেন্দ্রিয়, দর্শনেন্দ্রিয়, এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের পরিবর্তনগুলো স্থায়ী ঘটনা হয়ে গেছে। এই ব্যাপারগুলোকেই আমি বলি ‘দুর্দৈব’। ‘দুর্দৈব’ বলি কারণ, যারা মনে করে এটা দারুণ কিছু, স্বর্গীয় কিছু, মোক্ষ, প্রীতি, পরমানন্দ, এইজাতীয় সব জিনিসে পরিপূর্ণ, না, এটা হলো দৈহিক যন্ত্রণা─ওইদিক দিয়ে দেখলে এটা হলো দুর্দৈব, আমার কাছে দুর্দৈব নয় কিন্তু তাদের কাছে দুর্দৈব যাদের এরকম একটা কল্পনা রয়েছে যে, অনিন্দ্য কিছু ঘটতে চলেছে। এটা অনেকটা এরকম: আপনি নিউইয়র্ক শহরটা কল্পনা করলেন, সেটা নিয়ে স্বপ্ন দেখলেন, সেখানে যেতে চাইলেন, কিন্তু সত্যিই যখন আপনি সেখানে উপস্থিত হলেন, দেখলেন সেখানে তার কিছুই নেই। সেটা একটা খোদা-না-খাস্তা জায়গা। এমনকি শয়তানও হয়তো ওই জায়গাটাকে পরিত্যাগ করেছে। আপনি যা খুঁজছিলেন, ভীষণভাবে চাচ্ছিলেন, এটা সে জিনিস নয়, বরং সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে কী আছে আপনি সত্যিই জানেন না─আপনার সে-বিষয়ে জানার কোনো উপায় নেই─এখানে কোনো প্রতিরূপ নেই। এই অর্থে আমি কখনোই নিজেকে বা কাউকেই বলতে পারি না─ “আমি একজন বোধিপ্রাপ্ত মানুষ, একজন আলোকিত মানুষ, একজন মুক্ত মানুষ; মানবজাতিকে আমি আলোকিত করবো।” কীসের থেকে মুক্ত? কীভাবে আমি কাউকে মুক্ত করবো? কাউকে মুক্ত করার কোনো প্রশ্ন নেই। সেটা করতে গেলে, আমি একজন মুক্ত মানুষ, এরকম একটা প্রতিরূপ আমার থাকতেই হবে, বুঝতে পারছেন আপনি?

… … … …

তারপর, আট দিনের দিন সোফায় বসে আছি, হঠাৎ এনার্জির একটা ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ হলো─ভয়ঙ্কর একটা এনার্জি সমস্ত দেহটাকে কাঁপিয়ে দিলো, দেহের সাথে সাথে সোফা, শ্যালে আর সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডও যেন থরথর করে কাঁপতে লাগলো। ওই আন্দোলন সৃষ্টি করা যায় না, এটা আকস্মিক। এটা বাইরে থেকে আসছে না ভেতর থেকে আসছে, ওপর থেকে আসছে না নিচ থেকে আসছে আমি জানি না─স্পটটা আমি শনাক্ত করতে পারছি না, সর্বত্রই সেটা রয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই অবস্থা চলতেই থাকলো। সেটা ছিলো সহ্যের অতীত কিন্তু সেটা আমার থামাবারও কোনো উপায় ছিলো না; একটা সম্পূর্ণ অসহায়ত্ব। নিরন্তর এটা চলছেই, দিনের পর দিন, দিনের পর দিন। যখনই আমি কোথাও বসি এটা শুরু হয়ে যায়─মৃগীরোগির ফিট-লাগার মতো বা ওইরকম কিছুর মতোই এই কম্পন। সেটা অবশ্য ঠিক মৃগীরোগির ফিট-লাগাও নয়; দিনের পর দিন এটা চলছেই।

[একটানা তিনদিন ইউ.জী. তাঁর শয্যায় পড়ে রইলেন, ব্যথায় তাঁর শরীর কুঁকড়ে গেছে─তিনি বলেন─তিনি যেন তাঁর শরীরের প্রত্যেকটি কোষে কোষে, একটির পর একটিতে, ব্যথা অনুভব করছেন। পরবর্তী ছয় মাস ধরে যখনই তিনি শুচ্ছেন বা শিথিল হচ্ছেন পর্যাবৃত্তে একই ধরনের এনার্জির বিস্ফোরণ ঘটছে।]

দেহের তখন ক্ষমতা নেই… দেহের শুধুই যন্ত্রণা। খুবই যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া সেটা। খুবই যন্ত্রণাদায়ক। এটা একটা দৈহিক যন্ত্রণা যেহেতু দেহের একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এর একটা কাঠামো রয়েছে, নিজস্ব একটা আকার রয়েছে, কাজেই যখনই কোনো এনার্জির বিস্ফোরণ হচ্ছে, যেটা আপনার আমার বা ঈশ্বরের (বা যা-ই নাম দিন) এনার্জি নয়, সেটা একটা নদীর জলোচ্ছ্বাসের মতো। ক্রিয়াশীল ওই এনার্জিটা দেহের সীমাবদ্ধতা অনুভব করছে না; এর কোনো আগ্রহ নেই; এর নিজস্ব ভরবেগ রয়েছে। এটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক একটা জিনিস। এটা ওই পরমানন্দময়, স্বর্গসুখময়, ওইসমস্ত ছাইপাঁশ বা আবোল-তাবোল নয়! এটা সত্যিই একটা যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার। ওহ্, সেটার পরে আমি মাসের পর মাস দুর্ভোগ সয়ে গেছি; সেটার আগেও। প্রত্যেকেই এইরকম সয়েছেন। রমণ মহর্ষিও এটার পরে সেই দুর্ভোগ সয়েছিলেন।

একটা বিশাল তরঙ্গপ্রপাত─একটা নয়, হাজার হাজার তরঙ্গপ্রপাত─মাসের পর মাস এটা চলছে তো চলছেই। সে এক ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা─এই অর্থে যন্ত্রণাদায়ক যে এনার্জিটার একটা নিজস্ব অদ্ভুত ক্রিয়া রয়েছে। হুঁ, বিমানবন্দরে আপনার ওই উইলস সিগারেটের বিজ্ঞাপনের মতো। একটা পরমাণু: এইরকম রেখায় চলমান। [ইউ.জী. হাত ঘুরিয়ে দেখালেন।] বামাবর্তে, ডানাবর্তে, এবং তারপর আবার এইভাবে, এইভাবে এবং এইভাবে। একটা পরমাণুর মতো এটা দেহের ভেতরে চলমান─শুধু দেহের কোনো একটা অংশে নয়, সমস্ত দেহে। ভেজা একটা তোয়ালে যেন জল বার করতে নিংড়ানো হচ্ছে─সেরকমই আমার সমস্ত দেহটা─এমন একটা যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার। এমনকি এখনও সেটা চলছে। আপনি এটাকে ডেকে আনতে পারবেন না; আপনি এটাকে আহ্বান করতে পারবেন না; আপনি কিছুই করতে পারবেন না। মনে হচ্ছে এটা যেন আপনাকে মুড়িয়ে দিচ্ছে, আপনার ওপর অবতরণ করছে। এটা কোথা থেকে অবতরণ করছে? এটা কোথা থেকে আসছে? এটা কীভাবে আসছে? প্রতিবারই এটা নতুন─খুবই অদ্ভুত ব্যাপার─প্রতিবারই এটা আসছে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে, কাজেই আপনি জানেন না কী হচ্ছে। আপনি আপনার বিছানায় শুয়ে আছেন আর হঠাৎ করেই এটা শুরু হয়ে যাচ্ছে─পিঁপড়ার ধীর চলনের মতো এটা শুরু হচ্ছে। আমি ভাবছি আমার বিছানায় বোধহয় ছারপোকা, লাফ দিয়ে উঠে তাকাচ্ছি─ [হাসি] ছারপোকার কোনো চিহ্নই নেই─তারপর আবার সেখানে ফিরে যাচ্ছি─ আবার সেটা শুরু হচ্ছে…। চুলগুলি সব বিদ্যুতায়িত, ধীরবেগে এটা চলছেই।

সারা দেহে ব্যথা। চিন্তা এই দেহকে এতদূর নিয়ন্ত্রণ করেছে যে, সেটা যখন শিথিল হচ্ছে, সমগ্র বিপাক-ক্রিয়া তখন উত্তেজিত। সমগ্র ব্যাপারটা তার নিজস্ব পন্থায় পাল্টে যাচ্ছে। আমার কিছু-করা ছাড়াই। এরপর হাতের নড়াচড়ার ভঙ্গিটা পাল্টে যাচ্ছে। সচারচর আপনার হাতটা এইভাবে ঘোরে [ইউ.জী. করে দেখালেন]। ছয়মাস ধরে এখানে এই কব্জির গাঁটে গাঁটে তীব্র ব্যথা ছিলো যতক্ষণ না নিজে থেকেই এটা ঘুরে যাচ্ছে, এবং এখন সমস্ত নড়াচড়াটাই ওইরকম। সেজন্যেই তারা বলে যে আমার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা হলো মুদ্রা [মরমি ভঙ্গি]। আগের তুলনায় হাতের এখনকার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা সম্পূর্ণ আলাদা। তারপর অস্থিমজ্জায় ব্যথা। প্রত্যেকটি কোষের পাল্টে যাওয়া শুরু হয়েছে, আর এটা ছয় মাস ধরে চলছে তো চলছেই।

এবং তারপর শুরু হলো যৌন হরমোন পাল্টে যাওয়া। আমি জানতাম না আমি একটা নারী না পুরুষ─এ কী! ─হঠাৎ বামদিকে একটা স্তন। সবরকম ব্যাপার-স্যাপার─এসব খুঁটিনাটিতে আমি যেতে চাই না─এই সবকিছুরই রেকর্ড আছে। এটা চলছে তো চলছেই। এই দেহের একটা নিজস্ব নতুন ছন্দে পড়তে সেটা তিন বৎসর সময় নেয়।

… … … …

সেটা আপনার কীভাবে ঘটলো আমরা কি তা বুঝবো?

না।

আমরা কি বুঝবো আসলে কী ঘটেছিলো?

আপনি কেবল আমার জীবনঘটনার কোনো বর্ণনা পড়তে পারেন, আর কিছু নয়। একদিন, আমার উনপঞ্চাশতম জন্মদিনের কাছাকাছি কিছু একটা থেমে গেলো; আরেকদিন আরেকটা ইন্দ্রিয় পাল্টে গেলো; তৃতীয়দিন অন্য কিছু পাল্টে গেলো… কীভাবে আমার সেসব ঘটেছে তার একটা রেকর্ড রয়েছে। আপনার কাছে এর কী মূল্য আছে? আদৌ কোনো মূল্য নেই। পক্ষান্তরে এটা খুবই বিপজ্জনক কারণ আপনি এর বাহ্যিক অভিব্যক্তি অনুকরণ করার চেষ্টা করবেন। লোকজন এইসব অনুকরণ করার চেষ্টা করে আর বিশ্বাস করে যে কিছু একটা ঘটছে─এইসমস্ত লোকেরা সেটাই করে। আমি স্বাভাবিক আচরণ করি। আমি জানতাম না কী ঘটেছিলো। এটা একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। কোনো রেকর্ড রাখার কিছু নেই─লোকেরা শুধু এইসমস্ত নকল করতে পারে। এই স্থিতিটা হলো একটা স্বাভাবিক-কিছু।

[তাঁর বন্ধুরা লক্ষ্য করলেন তাঁর কবন্ধ, ঘাড় আর মাথার ওপর-নিচে (ভারতীয় সাধুসন্তরা যে জায়গাগুলোকে চক্র বলেন) নানান আকৃতি আর রঙের স্ফীতি মাঝে মাঝেই দেখা দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। তলপেটের ওপর স্ফীতিগুলো আনুভূমিক, চুরুট আকৃতির বলয়। নাভির ওপরে বাদাম-সদৃশ একটি শক্ত স্ফীতি। তাঁর বুকের মাঝখানে বড় মেডেল আকৃতির শক্ত নীল একটা স্ফীতি, তার ওপরের দিকে কণ্ঠমূলে অপেক্ষাকৃত ছোট মেডেল আকৃতির আরেকটা বাদামিলাল স্ফীতি। এই দুইটা মেডেল যেন তাঁর গলার চারপাশের বহুরঙা, নীল, বাদামী আর হালকা হলুদ স্ফীতির রিং থেকে ঝুলন্ত, হিন্দু দেবতাদের ছবিতে যেমনটি দেখা যায়। স্ফীতিগুলোর সাথে ভারতীয় ধর্মচিত্রের অন্যবিধ মিলও রয়েছে। তাঁর কণ্ঠ এমনভাবে স্ফীত যেন তাঁর চিবুক কোনো গোখরোর মস্তকে স্থাপিত, শিবের সনাতন প্রতিমায় যেমনটি দেখা যায়। তাঁর নাকের ওপরে কপালের ঠিক মাঝখানে একটা শাদা পদ্মাকৃতির স্ফীতি; তাঁর সমস্ত মাথাজুড়ে ছোটো ছোটো রক্তবাহী শিরাগুলি স্ফীত হয়ে, কিছু কিছু বুদ্ধমূর্তির মস্তকের ওপরে যেমন উঁচু উঁচু শৈলীবদ্ধ নকশা থাকে, সেরকম আকৃতি নিয়েছে। মোজেস এবং তাও মরমিদের শৃঙ্গের মতো দু’টি বড়ো আকারের শক্ত স্ফীতি পর্যাবৃত্তে দেখা দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। গ্রীবার ধমনীগুলি স্ফীত হয়ে গোলাপি আর নীলবর্ণ সাপের মতো তাঁর মাথার ভেতরদিকে উঠে গেছে।]

আমি প্রদর্শনপ্রিয় হতে চাই না, কিন্তু আপনারা ডাক্তার। ভারতে যে প্রতীক আছে─সেই প্রতীকের মতোই কিছু─গোখরো। স্ফীতিগুলো দেখতে পাচ্ছেন? ─সেগুলো একটা গোখরোর আকৃতি নেয়। গতকাল ছিলো পূর্ণিমা। চারপাশের সমস্ত ঘটমানতা দিয়ে দেহ প্রভাবিত; আপনার চারপাশে ঘটমান কোনো কিছু থেকেই এটা আলাদা নয়। সেখানে যা ঘটছে, এখানেও তাই ঘটছে─শুধুই দৈহিক সাড়া। এটাই হলো অনুরাগ। আপনার দেহ চারপাশের সবকিছু দিয়ে প্রভাবিত; এবং আপনি সেটা প্রতিহত করতে পারবেন না, যেহেতু নিজের চারপাশে গড়ে-তোলা আপনার বর্মটা তখন বিধ্বস্ত, সুতরাং এটা সেখানে ঘটমান সবকিছুর দ্বারাই অতি অরক্ষিত। পূর্ণিমায়, ─চন্দ্রের বিভিন্ন কলায়, এই স্ফীতিগুলো গোখরোর আকৃতি নেয়। সেই কারণেই হয়তো কিছু লোক শিব আর এইসমস্ত প্রতিমাগুলো বানিয়েছে। কিন্তু কেন এটা একটা গোখরোর আকৃতি নেয়? বহু ডাক্তারের কাছে আমি জানতে চেয়েছি কেন এই স্ফীতি, কিন্তু কেউই আমাকে কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেন নাই। জানি না এইসব জায়গায় কোনো গ্রন্থি বা কিছু আছে কিনা।

… … … ….

কতগুলি বিশেষ গ্রন্থি আছে… যেসব চিকিৎসক অনাল গ্রন্থি নিয়ে গবেষণা করেন তাদের সাথে আমি বহুবার আলোচনা করেছি। ওই গ্রন্থিগুলো, হিন্দুরা যাকে ‘চক্র’ বলে থাকেন। হিন্দুরা যেসব জায়গাগুলিতে ‘চক্র’ আছে বলে অনুমান করেন এই অনাল গ্রন্থিগুলির অবস্থান ঠিক সেইসব জায়গায়। এখানে একটা গ্রন্থি আছে যাকে বলে ‘থাইমাস গ্রন্থি’। আপনি যখন শিশু─তখন এটা খুবই সক্রিয়─সেটার অনুভূতি আছে, অসাধারণ অনুভূতি। যখন আপনি বয়ঃসন্ধিক্ষণে পৌঁছুচ্ছেন, এটা হয়ে যাচ্ছে নিষ্ক্রিয়─তারা সেটাই বলেন। আবার যখন এইজাতীয় কোনো ব্যাপার ঘটে, আবার যখন আপনার পুনর্জন্ম হচ্ছে, ওই গ্রন্থিটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে, কাজেই সমস্ত অনুভূতিই থাকছে। অনুভূতি চিন্তা নয়, আবেগ নয়; আপনি কেবল কাউকে অনুভব করছেন। কেউ যখন ওখানে নিজেকে আঘাত করছে, ওই আঘাতটা এখানে অনুভূত হচ্ছে─ব্যথা হিসেবে নয়, কিন্তু একটা অনুভূতি, দেখুন─আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বলে উঠছেন, “আহ্”।

আমরা তখন একটা কফিবাগানে। সত্যিসত্যিই আমার এই ব্যাপারটা ঘটলো: একটা মা তার বাচ্চাকে পেটাতে শুরু করলো, ছোট্ট একটা বাচ্চা। রাগে উন্মাদ হয়ে মেয়েটা বাচ্চাটাকে এমন বেদম পেটাচ্ছিলো যে বাচ্চাটা প্রায় নীল হয়ে গেলো। কেউ একজন আমাকে বললো─“আপনি ওকে ঠেকাচ্ছেন না কেন, থামাচ্ছেন না কেন?” আমি সেখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম─এমন হতভম্ভ হয়ে গেছি দেখুন। “মা বা বাচ্চাটাকে আমি করুণা করার কে?” ─এই ছিলো আমার উত্তর─“এখানে দায়ীটা কে?” দুজনেই তারা অসম্ভব একটা অবস্থায়: মেয়েটি তার রাগ সামলাতে পারছিলো না, আর বাচ্চাটা ছিলো ভীষণ অসহায় আর নিষ্পাপ। ব্যাপারটা চলছেই─একজন থেকে একজনে─আর তখনই দেখি ওইসমস্ত [দাগ] আমার পিঠে। সুতরাং আমিও ওই ঘটনার অংশ। (কেবল কোনো কিছু দাবি করার জন্যে এইটা বলছি না।) এটা সম্ভব কারণ চেতনাকে বিভক্ত করা যায় না। যা-কিছু সেখানে ঘটছে আপনাকে প্রভাবিত করছে─এটাই হলো অনুরাগ, বুঝতে পারছেন? এটা কাউকে বিচার করতে বসার ব্যাপার নয়; ব্যাপারটা ওইরকমই, তাই আপনি সেটার দ্বারা প্রভাবিত। সেখানে যা-কিছু ঘটছে সবকিছুর দ্বারাই আপনি প্রভাবিত।

সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে?

সেটা তো খুবই বিশাল, তাই না? আপনার চেতনামণ্ডলে যা-কিছু ঘটছে। চেতনা অবশ্যই সীমিত নয়। সে যদি সেখানে আহত হয়, আপনিও এখানে আহত হচ্ছেন। যদি আপনি আহত হন, সেখানে তাৎক্ষণিক একটা প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। ব্রহ্মাণ্ড, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে আমি বলতে পারবো না। কিন্তু আপনি আপনার চেতনা পরিমণ্ডলে, সীমাবদ্ধ পরিমণ্ডলে, ওই বিশেষ মুহূর্তে আপনি যে জায়গায় ক্রিয়াশীল, সাড়া দিচ্ছেন─এমন না যে ‘আপনি’ সাড়া দিচ্ছেন।

এবং অন্যসব গ্রন্থি তো আছেই… অনেক অনেক গ্রন্থি; যেমন পিটুইটারি─তাঁরা যেটাকে বলেন, ‘তৃতীয় নয়ন’, ‘আজ্ঞা চক্র’। যখনই চিন্তার হস্তক্ষেপ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন সেটা এই গ্রন্থির দায়িত্বে: তখন এই গ্রন্থিগুলিই দেহকে আদেশ বা নির্দেশনা দিচ্ছে; চিন্তা আর সেটা দিচ্ছে না; চিন্তা আর হস্তক্ষেপ করতে পারছে না। (সম্ভবত সেইজন্যেই তাঁরা এটাকে বলেন ‘আজ্ঞা চক্র’। আমি ব্যাখ্যা বা ওইরকম কিছু করছি না; হয়তো এটা আপনাকে একটা ধারণা দিচ্ছে।) কিন্তু আপনি একটা বর্ম গড়ে তুলেছেন, এই চিন্তা দিয়ে একটা বর্ম সৃষ্টি করেছেন, এবং আপনি পরিস্থিতির দ্বারা নিজেকে প্রভাবিত হতে দিচ্ছেন না।

যেহেতু কেউ কোনো রক্ষণাত্মক প্রক্রিয়া হিসেবে এখানে এই চিন্তাকে ব্যবহার করছে না, এটা জ্বলেপুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। চিন্তার দহনক্রিয়া, আয়নায়ন (যদি আপনার বৈজ্ঞানিক শব্দ ব্যবহার করি) হচ্ছে। চিন্তা কম্পন ছাড়া আর কিছু নয়। তো যখন চিন্তার এই ধরনের আয়নায়ন হচ্ছে, এটা নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, কখনো কখনো সমস্ত দেহকে এটা একটা ভস্মজাতীয় পদার্থে ঢেকে দিচ্ছে। যখন চিন্তার আর আদৌ প্রয়োজন নেই তখন আপনার দেহ ওই ভস্মে ছেয়ে যাচ্ছে। যখন আর আপনি এটা ব্যবহার করছেন না, তখন ওই চিন্তার কী ঘটবে? এটা জ্বলেপুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে─সেটাই হলো এনার্জি─এটা একটা দহনক্রিয়া। কাজেই দেহ উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফল হিসেবে দেহ সাংঘাতিক উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে─আর তাই আপনার ত্বক ছেয়ে যাচ্ছে─আপনার মুখ, আপনার পা, সবকিছুই এই ভস্মের মতো বস্তুতে ছেয়ে যাচ্ছে।

এইটা একটা কারণ যে-জন্যে আমি এটাকে শুধু দৈহিক এবং শারীরবৃত্তীয় পরিভাষায় বর্ণনা করি। আমি যেভাবে দেখি─এর আদৌ কোনো মনস্তাত্ত্বিক আধেয় নেই, কোনো মরমি আধেয় নেই, কোনো ধর্মীয় গূঢ়ার্থ নেই। সেটা আমি বলতে বাধ্য এবং সেটা আপনি মানলেন কি মানলেন না তাতে আমার কিছুই এসে যায় না, আমার কাছে এর কোনো গুরুত্ব নেই।

… … … ….

বহু মানুষের নিশ্চয় এইজাতীয় একটা ব্যাপার ঘটেছিলো। আমি বলি দশ কোটিতে একজনের এটা ঘটে এবং আপনি সেই দশ কোটির একজন। এটা কারো বিশেষভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যাপার নয়। এইজাতীয় ব্যাপার ঘটার জন্যে কোনো পরিশোধন প্রক্রিয়া; কোনো সাধনা, কোনো ধরনের প্রস্তুতি আবশ্যক নয়। চেতনা এতই অনাবিল যে সেটা শুদ্ধ করার জন্যে আপনি যা-ই করেন তাতেই এতে আবিলতা যুক্ত হয়।

চেতনা স্বয়ং বিদূরিত হতে হবে: শুচিতা-অশুচিতার সমস্ত চিহ্ন, সবকিছুই এটা দূর করে দেবে। এমনকি আপনি যাকে ‘পবিত্র এবং ঐশী’ বলে গণ্য করেন, সেটাও ওই চেতনায় একটা দূষণ। আপনার কোনো ইচ্ছাশক্তিতে এটা ঘটবে না; যখনই ওই সীমান্তটা টুটে যায়─আপনার কোনো প্রচেষ্টায়, আপনার কোনো ইচ্ছাশক্তিতে নয়─ফ্লাডগেইটগুলো তখন উন্মুক্ত এবং সবকিছুই তখন বেরিয়ে যাবে। ওই ধুয়েমুছে যাবার প্রক্রিয়াতেই যত স্বপ্নাবিভাব (vision) ঘটতে থাকে। এটা আপনার বাইরের বা ভেতরের কোনো স্বপ্নাবিভাব নয়; হঠাৎ করেই আপনি স্বয়ং, আপনার সমগ্র চেতনাই, বুদ্ধ, যিশু, মহাবীর, মুহম্মদ, সক্রেটিসের আকার নিয়ে নিচ্ছে─শুধু সেইসব মানুষদের আকার নিয়ে নিচ্ছে যারা এই দশায় এসেছিলেন; মহান ব্যক্তিদের নয়, মানবজাতির নেতাদের নয়─এটা খুবই অদ্ভুত─শুধুমাত্র ওইসমস্ত মানুষদের, যাদের এইজাতীয় একটা ব্যাপার ঘটেছিলো।

তাদের মধ্যে একজন ছিলেন অশ্বেতকায় (ঠিক অশ্বেতকায়ও নন), এবং ওইসময় আমি বলতে পারতাম তিনি দেখতে কেমন ছিলেন। তারপর লম্বা চুলের স্তনময়ী কিছু নারী─নগ্ন। শুনেছি এই ভারতে দু-জন সন্ত ছিলেন─আক্কামহাদেবী আর লালেশ্বরী─তাঁরা নারী, নগ্ন নারী। হঠাৎ আপনার এই যুগল স্তন, লম্বা চুল─এমনকি আপনার অঙ্গগুলোও স্ত্রীঅঙ্গ হয়ে গেছে।

কিন্তু তখনও সেখানে একটা বিভক্তি থাকছে─আপনি, এবং চেতনা যে-রূপ পরিগ্রহ করেছে, যেমন বুদ্ধরূপ, যিশুখ্রিষ্টরূপ বা ঈশ্বরই জানেন কার রূপ─তখনও পরিস্থিতিটা সেই একই: “কীভাবে আমি জানি আমি ওই দশায়?” কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ওই বিভক্তি থাকতে পারে না; সেটা অদৃশ্য হয়ে অন্যকিছু চলে আসে। শত শত মানুষজন; সম্ভবত বহু শত মানুষের কিছু একটা ঘটেছিলো। এটা ইতিহাসের অংশ; বহু বহু ঋষি, কিছু পশ্চিমা, কিছু সন্ন্যাসী, বহু বহু নারী, এবং কখনো কখনো খুবই অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার। আপনার আগে যত মানুষের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে সবাই দেখুন আপনার চেতনার অংশ। আমি এইভাবে বলি, “সাধুগণ সার বেঁধে বেরিয়ে গেলেন”, খ্রিষ্টধর্মে স্ত্রোত্রগীত গাওয়া হয়─ “যখন সাধুগণ ঢুকিলেন সার বেঁধে।” তাঁরা আপনার চেতনা থেকে বেরিয়ে যান কারণ তাঁরা আর সেখানে থাকতে পারেন না। কারণ সে-সবই সেখানে একটা অশুচিতা, একটা দূষণ।

আপনি বলতে পারেন (আমি কোনো নিশ্চিত উক্তি করতে পারি না), খুব সম্ভব মনুষ্যচেতনার ওপর এইসমস্ত সাধু, ঋষি এবং মানবজাতির পরিত্রাতাদের বিস্ফোরণের প্রভাবেই আপনার ভেতরে এই অশান্তি, বা সেখানে যাই থেকে থাকুক সারাক্ষণই যেন সেটা বেরিয়ে আসতে চাইছে। হয়তো তাই─আমি এই বিষয়ে কিছুই বলতে পারি না। বলতে পারেন তাঁরা আছেন সেখানে, কারণ তারাই আপনাকে এইখানে ঠেলে দিচ্ছেন, এবং একবার যখন তাঁদের উদ্দেশ্যটা সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাঁদের কাজটাও শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং তাঁরা বিদায় নিচ্ছেন─সেটা শুধু আমার একটা ধারণা। কিন্তু এই ভালোমন্দ, ধর্মাধর্ম, শুচি-অশুচি, সবকিছুর এই বিদূরণটা ঘটতেই হবে, নইলে আপনার চেতনা তখনও দূষিত, তখনও অশুচি। ওইসময় এটা চলছে তো চলছেই─তাঁদের শতসহস্র মানুষজন─তারপর, আপনি দেখুন ফিরে গেছেন চেতনার ওই মৌলিক, আদ্য দশায় । একবার যখন এইটা নিজে থেকে নিজের দ্বারাই শুদ্ধ হয়ে গেছে তখন আর কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না, আর কোনো কিছুই তাকে দূষিত করতে পারে না। সমস্ত অতীতই ওই বিন্দু পর্যন্ত রয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এটা আর আপনার ক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে না।

‘দুর্দৈবের’ পর তিন বছর ধরে এইসমস্ত স্বপ্নাবিভাব আর সবকিছু ঘটেছে। এখন সবকিছু শেষ। চেতনার বিভক্ত দশা আর আদৌ কাজ করতে পারে না। এটা সারাক্ষণই চেতনার অবিভক্ত দশায়─কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে─চিন্তা হতে পারে কোনো ভালো চিন্তা, কোনো মন্দ চিন্তা, লণ্ডনের এক পতিতার টেলিফোন নাম্বার….লণ্ডনে আমার ঘোরাঘুরির সময় গাছে গাছে আমি ওই নাম্বারটা সাঁটা দেখতাম, আমার পতিতালয়ে যাবার কোনো আগ্রহ ছিলো না, কিন্তু ওই ব্যাপারটা, নাম্বারগুলো, আমাকে টানতো। আমার আর-কিছু করার ছিলো না, কোনো বইপত্র পড়ার ছিলো না, শুধু ওই নাম্বারগুলো দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না। একটা নাম্বার সেখানে সাঁটা থাকতো, নাম্বারটা চলে আসতো, বারবার চলে আসতো। সেখানে কী এলো, ভালো, মন্দ, ধর্ম, অধর্ম─সেটা কোনো ব্যাপারই নয়। সেখানে কে বলার আছে─ “এইটা ভালো; ওইটা মন্দ?”─ওই সমস্তই তখন শেষ হয়ে গেছে। সেজন্যেই আমাকে ‘ধর্মীয় অভিজ্ঞতা’ শব্দটা ব্যবহার করতে হয় (আপনি যে-অর্থে ‘ধর্ম’ শব্দটা ব্যবহার করেন সে অর্থে নয়): এটা আপনাকে উৎসে ফেরায়। আপনি ফিরে গেছেন চেতনার ওই আদিম, আদ্য, নির্মল দশায়─সেটাকে আপনি ‘সচেতনতা’ বা যা-খুশি বলতে পারেন। ওই দশাতেই ঘটনা ঘটে চলেছে, এবং সেখানে কেউ নেই যে আগ্রহী, কেউ নেই যে সেসব দেখছে। তারা তাদের মতো আসে যায়, গঙ্গাজল যেরকম বয়ে যায়: সেখানে পয়ঃনিষ্কাশনের জল আসে, আধপোড়া শবদেহ, ভালো জিনিস নোংরা জিনিস─সবই আসে─কিন্তু ওই জল সর্বদাই নির্মল।

… … … …

সমগ্র ব্যাপারটার সবচে’ হতবুদ্ধিকর, অভিভূতকর অংশটা ছিলো, সংবেদজ কর্মকাণ্ডের স্বাধীনবৃত্তি শুরু করার ব্যাপারটা। কোনো সমন্বয়ক আর সংবেদন সংযুক্ত করছে না, কাজেই আমাদের সাংঘাতিক সমস্যা হয়ে গেলো─সমস্ত ব্যাপারটাই ভ্যালেন্টাইনকে সহ্য করতে হয়েছে। হাঁটতে বেরিয়েছি, কোনো ফুলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ওটা কী?” তিনি বললেন, “ওটা একটা ফুল।” আরো কয়পা হেঁটে একটা গরুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ওটা কী?” একটা শিশুর মতো আমাকে সবখানে সবকিছু নতুন করে শিখতে হচ্ছিলো (সেটা ঠিক নতুন করে শেখাও নয়, বরং পুরো জ্ঞানটাই ছিলো পশ্চাৎপটে এবং কখনোই সেটা সামনে আসে নাই, দেখুন)। এই জিনিসটা শুরু হলো─এইসমস্ত ব্যাপার-স্যাপার─আমাকে এই ভাষায় বলতে হয়, “কী এইসব পাগলা কারবার?” অবশ্য এরকম মনে হচ্ছিলো না যে আমি একটা পাগল দশায় আছি। আমি ছিলাম খুবই প্রকৃতিস্থ মানুষ, সুস্থভাবে ক্রিয়াশীল, সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে, এবং তারপরও ওই সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করার এই অসম্ভব ব্যাপারটা─“এটা কী? ওটা কী?” এই, আর-কোনো প্রশ্ন নয়। ভ্যালেন্টাইনও এর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। তিনি জেনেভার এক প্রধান মনোচিকিৎসকের কাছেও গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে ছুটে গিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চাইলেন, কিন্তু একইসাথে তিনি এও বুঝছিলেন যে আমার ভেতরে অপ্রকৃতিস্থ কিছুই নেই। কোনো অপ্রকৃতিস্থ কিছু করলে তিনি আমাকে ছেড়ে চলে যেতেও পারতেন। কখনোই তিনি তা করেননি, শুধু অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন─“ওটা কী?” “ওটা গরু,” “এটা কী?” “এটা এই,” এই জিনিস চলতেই থাকলো এবং এটা আমার আর তাঁর ভেতরে মাত্রা ছাড়িয়ে গেলো। মনোচিকিৎসক ভ্যালেন্টাইনকে বললেন, “লোকটাকে না দেখে আমরা কিছুই বলতে পারবো না, তাকে নিয়ে আসুন।” কিন্তু আমি জানতাম আসলেই ভেতরে অদ্ভুত কিছু একটা ঘটে গেছে─কী ঘটেছে সেটা জানতাম না, কিন্তু তাতে আমার কিছু এসে যেতো না। সেটা একটা গরু কিনা তা জানতে চাচ্ছো কেন? সেটা গরু না গাধা না ঘোড়া তাতে কী এসে যায়? ─দীর্ঘদিন ধরে ওই হতবিহ্বল অবস্থাটা চলতে থাকলো─যাবতীয় জ্ঞানটা ছিল পশ্চাৎপটে। এমনকি এখনও পরিস্থিতিটা তাই, তবে এখন আর আমি ওই প্রশ্নগুলো করি না। যখন আমি কোনো কিছুর দিকে তাকাই─সত্যিই আমি জানি না আমি কীসে তাকিয়ে আছি─সেজন্যেই আমি বলি এটা একটা না-জানার দশা। সত্যিই আমি জানি না। সেজন্যেই আমি বলি, কোনো ভাগ্যে বা কোনো আশ্চর্য দৈবে একবার যখন আপনি সেখানে, তারপর থেকে সবকিছু ঘটবে তার নিজস্ব পন্থায়। সর্বদাই আপনি একটা সমাধির দশায়; এতে ঢোকা বা বেরোবার কোনো প্রশ্ন নেই। আপনি সারাক্ষণই সেখানে। ওই শব্দটা [সমাধি] আমি ব্যবহার করতে চাই না, তাই আমি বলি এটা একটা না-জানার দশা। সত্যিই আপনি জানেন না আপনি কীসে তাকিয়ে আছেন।

… … … …

এ-নিয়ে আমি কিছুই করতে পারি না। আগের জায়গায় ফিরে যাবার বা সেরকম কোনো কিছুর প্রশ্নই আসে না; এটা পুরোপুরি শেষ ─এটা এখন ভিন্নভাবে কার্যরত এবং ক্রিয়াশীল। (‘ভিন্নভাবে’ শব্দটা আমাকে ব্যবহার করতে হচ্ছে এ-বিষয়ে আপনাকে একটা ধারণা দেবার জন্যে।)

কিছু পার্থক্য বোধহয় আছে। যারা আমার সাথে দেখা করতে আসে তাদের সাথে আমার সমস্যাটা হলো দেখুন─কীভাবে আমি ক্রিয়াশীল সেটা বোধহয় তাঁরা বুঝতে অক্ষম, এবং আমিও বোধহয় বুঝতে অক্ষম কীভাবে তাঁরা ক্রিয়াশীল। কীভাবে আমরা কথাবার্তা চালিয়ে যাবো? আমাদের উভয়কেই থামতে হবে। কীভাবে আমাদের মধ্যে কথাবার্তা চলতে পারে? আমি একটা ক্ষ্যাপা পাগলের মতো বকেই যাচ্ছি। আমার সমস্ত কথাবার্তা পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক, ঠিক একটা পাগলের মতো─পার্থক্যটা কেবল চুলপরিমাণ─সেজন্যেই আমি বলছি আপনি হয় তক্ষুণি উল্টে যাবেন নয় উড়াল দেবেন।

কোনো পার্থক্য নেই, একেবারে কোনো পার্থক্যই নেই। কোনোভাবে, দেখুন, কোনো ভাগ্যে, কোনো আশ্চর্য দৈবে, এইরকম ঘটনা ঘটে (‘ঘটে’ শব্দটা ব্যবহার করছি শুধু আপনাকে একটা ধারণা দেবার জন্যে।) এবং সেখানেই সবকিছুর ইতি।

… … … …

‘মোক্ষপ্রাপ্ত’ যারা, তাঁরাও কি একজন আরেকজনের থেকে ভিন্ন?

হ্যাঁ, পটভূমিটা যেহেতু ভিন্ন। পটভূমিটাই একমাত্র জিনিস যা নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। সেটা ছাড়া আর কী আছে? পটভূমিটাই আমার এর অভিপ্রকাশ: যেভাবে আমি সংগ্রাম করেছি, আমার পথ, আমি যে পথ অনুসরণ করেছি, যেভাবে আমি অন্য সবার পথ বর্জন করেছি─ওই সময় পর্যন্ত আমি যা যা করেছি বা করি নাই─কিন্তু সেটা আমাকে কোনোভাবে সহায়তা করে নাই

কিন্তু আপনার (‘আপনার’ শব্দটা ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে দুঃখিত) মতো একজন মানুষ আমাদের থেকে ভিন্ন। আমরা আমাদের চিন্তায় লিপ্ত হয়ে আছি।

তিনি ভিন্ন, শুধু আপনার থেকে ভিন্ন তা নয় বরং যত লোক ওই দশায় আছেন বলে ধরা হয়, তাঁর প্রেক্ষাপটের কারণে তিনি তাঁদের থেকেও ভিন্ন।

যারা এই ‘বিস্ফোরণ’ সহ্য করেছেন তাঁরা সবাই-ই হয়তো অনন্য, এই অর্থে যে তাঁরা প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব পটভূমিই প্রকাশ করে যাচ্ছেন, তারপরও বোধহয় কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

সেটা আমার চিন্তার বিষয় নয়, সেটা হয়তো আপনার চিন্তার বিষয়। আমি কখনোই অন্যকারো সাথে নিজেকে তুলনা করি না।

… … … …

এই হলো ব্যাপার। আমার আত্মজীবনী শেষ, আর কিছু লেখার নেই, কখনো হবেও না। লোকজন এসে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে আমি উত্তর দিই; যদি তারা না আসে সেটা কোনো ব্যাপার নয়। আমি মানুষজনকে মুক্ত করার ধর্মব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত করি নাই। বোধি অর্জনের লক্ষে যতরকম ঐশী পদ্ধতি রয়েছে সবই আবোল-তাবোল এবং সচেতনতার মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক পরিব্যক্তিতে পৌঁছুনোর সমস্ত কথাবার্তাই অর্থহীন, শুধু এই কথা বলা ছাড়া মানবজাতির প্রতি আমার আর কোনো বিশেষ বাণী নেই। মনস্তাত্ত্বিক পরিব্যক্তি অসম্ভব। সহজ স্থিতি ঘটতে পারে শুধুমাত্র জৈবিক পরিব্যক্তির মাধ্যমে।

 

…………………
১. ট্রোমাটিক এক্সপেরিয়েন্স: (মনোবিজ্ঞান) traumatic experience; আঘাতজনিত অভিজ্ঞতা; (trauma: ট্রোমা; কোনো মানসিক আঘাতের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব।)
২. সমাধি: গভীর তন্ময়তা; (চিত্তবৃত্তির নিরোধপূর্বক স্বরূপে অবস্থিতি।)
৩. ‘অস্তিত্বের বিবমিষা’: ‘existential nausea’; (জাঁ পল সার্ত।)
৪. থিওসফিক্যাল সোসাইটি: Theosophical Society. (১৮৭৯ সালে আমেরিকা থেকে আগত মাদাম ব্লাভাটস্কি ও অলকটের নেতৃত্বে মাদ্রাজে প্রতিষ্ঠিত থিওসফিক্যাল সোসাইটি।)
৫. ‘আত্মার নিশুতি রাত’: ‘Dark Night of the Soul’; (কোনো ব্যাক্তির আধ্যাত্মিক জীবনের একটি বিশেষ পর্যায় বর্ণনা করতে ব্যবহৃত বিশেষ একটি শব্দবন্ধ।) 
৬. ‘ডিম্বস্ফোটন’ : incubation.
৭. ‘ফোলী বের্জের’: ‘Folies Bergere’; (প্যারিসের বিখ্যাত একটি মিউজিক হল।)
৮. ‘কসীনো দ পরী’: ‘Casino de Paris’.
৯. বাসনা: ‘Vāsanā’ (वासना); অতীতউদ্ভূত মনঃসংস্কার।
১০. চেইন রিএ্যাকশন: chain-reaction; শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রক্রিয়া।
১১. একমুখী ক্রিয়া: (রসায়ন) Irreversible.
১২. আলকেমি: alchemy; আমূল রাসায়নিক পরিবর্তন; (মধ্যযুগীয় রসায়নশাস্ত্র: অপকৃষ্ট ধাতুকে কীভাবে সোনায় পরিণত করা যায় সেটা আবিষ্কার করাই ছিলো এই শাস্ত্রের প্রধান লক্ষ্য; কিমিয়া।)
১৩. ‘নিয়ন্ত্রকশূন্য দশা’: ‘declutched state’.
১৪. ঘ্রাণকেন্দ্র: olfactory center.
১৫. ভিস্তাভিশন: VistaVision; (৩৫মিমি মোশন পিকচার ফিল্ম ফরম্যাটের একটি উচ্চ রেজলুশনবিশিষ্ট ওয়াইডস্ক্রিন ধরন।)
১৬. অ্যাপার্চার: aperture; ক্যামেরার আলো প্রবেশের রন্ধ্র।
১৭. তাও মরমি: Tao mystic.
১৮. অনাল গ্রন্থি: ductless glands.
১৯. ‘আজ্ঞা চক্র’: ‘আজ্ঞার’ আক্ষরিক অর্থ ‘নির্দেশ’।
২০. দহন: combustion.
২১. আয়নায়ন: (পদার্থবিজ্ঞান) ionization; (ইলেকট্রনের হ্রাস বা বৃদ্ধির দ্বারা কণিকার বিদ্যুতায়ন বা আয়নে রূপান্তরকরণ।)
২২. ফ্লাডগেইট: floodgate; প্লাবনদ্বার।
২৩. মনস্তাত্ত্বিক পরিব্যক্তি: psychological mutation.
২৪. জৈবিক পরিব্যক্তি: biological mutation; (জিনসমূহের প্রকৃতি বদল।)

………………..

[এটি The Mystique Of Enlightenment গ্রন্থটির প্রথম পর্ব ‘U.G.’র বাংলা অনুবাদ। অনুবাদের স্বত্ব সংরক্ষিত]

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *