ফেরদৌস নাহার-এর তিনটি কবিতা



জাদুর বাক্সে ঘর সারাদিন জ্বর জ্বর  

জাদুর বাক্স হাতে হেঁটে যায়,কে যায়?
মানুষের অদ্ভুত দুটি পা হেঁটে যায়,
বাক্সে যায় তার সাথে ধুলোর সংসার।
কত কবি নিয়েছে বিদায়
পৃথিবীর কোলাহলে কত কবি করেছে অভিমান
তাদের খবর আছে জাদুর বাক্সে ভরা
গুচ্ছগুচ্ছ অযুথ সংবাদ…

জন্মান্তর ঘুরে বেড়ায়, ঘোরে চোখ নাক মুখ…
আহত বুকের শ্বাস ঘুরে ঘুরে বলে,
এইবেলা ধাঁ ধাঁ ধরি খুব…
মার্চের খা খা রোদে ঘাম মুছে ঘাম জোটে
যানজট ফেটে যায়-বোধের অসুখ
জাদুর বাক্সে ঘর সারাদিন জ্বর জ্বর
আমি কবি লিখে যাই বোধিবৃক্ষের স্মৃতি…

 

কবিতার শুরু এবং শেষে

আমার কবিতাগুচ্ছের শুরুতে একটি ছবি দেয়া হয়েছিল
নির্জন স্টেশন, নীলরঙ ট্রেন, অন্ত্বসত্তা নারী আর তার পেছনে পুরুষ
কী বুঝে দিয়েছিলেন সম্পাদক জানি না, কিন্তু আমার পছন্দ হয়েছিল।

কুয়াশা কুয়াশা ওই লালমাটির স্টেশনে বৃক্ষকে কেন্দ্র করে
নীল সাদা রঙে বাঁধানো বেদী ছিল, সবুজ ডালপালায় জড়াজড়ি
ঘন-সঘন পাতাদের মাখামাখি রৌদ্রকে আড়াল করে
দোল খাচ্ছিল প্লাটফর্মের দুইপাশে
স্টেশন মাস্টারের ঘর থেকে দেখা যায় দূরের রাস্তা, রেলক্রসিং
তারপর থেমে পড়া ট্রেন, মানুষের ওঠা-নামা
তারপর ট্রেনের দুলে উঠা, চলে যাওয়া, ঝিম ঝিম নির্জনতা …।

অন্ত্বসত্তা হেঁটে চলে একা, তার পিছে হেঁটে চলে কেউ
সময়টা কখন হতে পারে ঠিক ঠাহর করতে পারি না
ভর-দুপুরও হতে পারে অথবা কোনো সময়ই ছিল না।
নারী হেঁটে যায়, পেটের সন্তান নড়ে ওঠে- তাকায়
তার আশেপাশে বিড়াল ডেকে ওঠে- মিঁয়াও…
স্টেশন বাচ্চাটাকে ঘুমাতে বলে, বাচ্চাটা নারীকে বলে-
মা থামিস না, পা চালা!

 

সভ্যতা একা গান গাবে

যখন লিখতে বসি
উপকূলে উপকূলে কি ওঠে ঝড়?
বঙ্গোপসাগরের নৌকোগুলো দাঁড়টানা মাল্লার হাত ফসকে
হারিয়ে যায় কি সাগরের চৌতাল মাতাল ঢেউয়ে!
আলবেনিয়া থেকে তিউনিসিয়ার সবুজ পাতালে, ভূমধ্যসাগরে
আরবি ঘোড়ায় চড়ে আসে কি কেউ তুলে নিতে বেসুমার ভোর?

আমি পাতালের মেয়ে, আমাকে জড়িয়ে জন্মেছে
কোটি কোটি বছরের পুরাতন প্রেম, রাজধানী নগর
বিমনা নিবাস, একসহস্র নগরপতির দুঃসহ প্রণয়
বারবার ছেড়ে যেতে চেয়েছে তারা পৃথিবীর একশটি সমুদ্র।
ভালো লাগে না আমার, তাই তাদেরও লাগেনি ভালো
এই ভুল পৃথিবী জগৎ আলো, দুর্জন প্রহরী সময়।

আমি ওদের কেউকেই বলিনি আমার এসব কথা
দুঃখ অমরতা, এমন কী চেনা জানা মানুষের ভণ্ডামি ব্রত।
আজব আকাশ জুড়ে বালু নাচে মরুভূমি ছত্রখান মৌলিক বাতাসে
আহারে রাজার দুলাল পথে পথে ঘুরে মরে আর কতকাল!
কতকাল ব্যাবিলন, পারস্য সভ্যতা হতবাক একা গান গাবে
গুন গুন শ্বাস ফেলে পানপাত্রে ঢেলে দেবে রঙ্গের বাজার
আমাদের ব্যবধান রোজ ভোরে ডাক দেয় কয়েক’শ বছর
বাতি জ্বেলে বসে আছে আগামী জীবন

আমি তার মনের মতো নই,
সেও নয় আমার মতো!

 

Facebook Comments

3 Comments:

  1. অপরাজিতা

    valo laglo. 🙂

  2. আবহমান

    কবিতাগুলো খুব ভাল লেগেছে। কবিকে শুভেচ্ছা

  3. খলিল মজিদ

    কাব্যময় ভাবনা। অনেক শুভেচ্ছা কবি ফেরদৌস নাহার।

Leave a Reply to খলিল মজিদ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *