১৯৯৫ সালে বরিশাল শিক্ষক সমিতি আব্বাকে বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছিল যখন, তখন আমার এইচ এস সি পরীক্ষা দেয়া সম্ভবত শেষ। আব্বাকে ঘিরে নানা আনুষ্ঠানিকতায় আমিও অংশ নিয়েছি। মানপত্রের সাথে দুটি অমূল্য গ্রন্থ উপহার পায় সেদিন আব্বা। প্রথমটি রবীন্দ্রনাথের কবিতা সংকলন সূর্যাবর্ত এবং দ্বিতীয়টি কেতকী কুশারী ডাইসনের প্রবন্ধ সংকলন ভাবনার ভাস্কর্য। বইয়ের পাতায় তারিখটা লিখে রেখেছিলাম— ২৯-৫-’৯৫ ইং। ৩৬, সদর রোড, বরিশালের ওরিয়েন্টাল বুক ডিপো থেকে কেনা কেতকী কুশারী ডাইসনের বইটি আমার আত্মার এত কাছের হয়ে যাবে, ভাবিনি। তাঁর নামের সাথে সেই প্রথম পরিচয়।
তখন কেবল গালে হাত দিয়ে উদাস হয়ে বসতে শিখেছি। কবিতা পেয়ে বসেনি পুরোপুরি। তাই রবীন্দ্রনাথের কবিতা সংকলন সূর্যাবর্ত সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে গেল। ভাবনার ভাস্কর্য ছিল একটু দূরেই। প্রবন্ধ নামক জিনিসটিতে তখন আমার ভারী ভয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর একরকম জোর করেই পাতা উলটে পড়তে বসা। ব্যস্, ধীরে ধীরে সখ্য হলো তাঁর সাথে। কেতকী কুশারী ডাইসন— আমার প্রবন্ধ পাঠ করার যাবতীয় ভয়ভীতি উবে গেল তাঁর কল্যাণে। সরস গদ্যের প্রবাহ ভাসিয়ে নিয়ে গেল বিচিত্র বিষয়ের দুনিযায়। কবি ও কবিতা, চিঠি, ভ্রমণ, নারীবাদ, ধর্ম, প্রযুক্তি ও সামাজিক প্রভাব, মঞ্চ নাটক প্রভৃতি বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলাম। রস আস্বাদনের সাহস বাড়লো একটু একটু করে। কেতকী কুশারী ডাইসনের সাথে একত্রিশ বছরের বসবাস আমার। যতদিন বাঁচি, আমার সঙ্গে থাকবেন তিনি। ভালোবাসি তাঁকে।
প্রিয় লেখক বা ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করার পর্ব এলে মন ঘন হয়ে আসে। জমে যায় আকাশে মেঘ। তবু কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনে হয় আমার সামান্য অনুভূতি না জানালে অকৃতজ্ঞ রয়ে যাই যেন। ঋণ স্বীকার করাটা খুব জরুরি। কেতকী কুশারী ডাইসনের মতো বিদগ্ধজনকে স্মরণ করা আমার কম্ম নয়। তবু মনে হলো, তাঁর কল্যাণেই তো জেনেছি, সাহস এবং শৃঙ্খলা দুইই লাগে শিল্পে এবং জীবনে। সিলভিয়া প্লাথ্, আনা আখভাতোভা, মারিনা ৎসভেতায়েভা, এডিট স্যোডারগ্রান, ইজাক দিনেসেন, অ্যান স্টিভেনসন, কবিরুল ইসলাম, অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘বিনু’কে জেনেছি যাঁর লেখনীতে; নারী কবি ও লেখকদের নিরন্তর লড়াই নিয়ে যাঁর তীক্ষ্ণ স্পষ্ট বক্তব্য আমাকে সাহসী করেছে, তাঁকে আমার দু’চারটে আনাড়ি কথায় ধরে রাখিই না। কী এমন ক্ষতি তাতে?
ভাবনার ভাস্কর্য। তেইশটি সুখপাঠ্য প্রবন্ধের সংকলন যার ভেতর দিয়ে সন্ধান পেলাম এক অদেখা অজানা বিশ্বের। সাবলীল ঝরঝরে গদ্যে কতোটা গভীরে পাঠকের অনুসন্ধিৎসু মনকে ছেড়ে দেয়া যায় সে শিল্পকৌশল ভালো করেই আয়ত্ব করা কেতকী কুশারী ডাইসনের। তাঁর বিশ্লেষণধর্মী স্বাদু গদ্যে কোনো কবি এবং তাঁর কবিতা কেবল গ্রন্থালোচনায় সীমিত থাকেনি, স্বতন্ত্র স্বরের পরিচিতি নিয়ে পাঠকের মনে ও মননে আসন করে নিয়েছে। এই বইটির বেশিরভাগ প্রবন্ধ কলেবরে বেশ বড়। তাতে বোঝা যায়, একেকটি বিষয়ের পেছেনে কাতোটা খাটনি আছে তাঁর। কেতকীর প্রবন্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, নিজের মতামত বা সিদ্ধান্ত পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেন না লেখার মাধ্যমে। কোনো ডেড এন্ড নেই, উন্মুক্ত রাখেন আলোচনার পরিসর। জনমত তৈরির ঝোঁক নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, সেটি তাঁর কাজ নয়। এ প্রসঙ্গে টানতে পারি তাঁর শিল্পসাহিত্য সম্পর্কিত চিন্তাধারার কথা যা অন্নদাশঙ্কর রায় সৃষ্টচরিত্র বিনুর ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত। কেতকী বলছেন—সমাজকে বদলে দেয়া যেমন সাহিত্যের উদ্দেশ্য নয়, তেমনি আমাদের জ্ঞানের সীমাকে বাড়িয়ে দেয়াও নিশ্চয়ই সাহিত্যের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়: সৃষ্টির মুখ্য উদ্দেশ্য সৃষ্টিই। কিন্তু সেই মুখ্য উদ্দেশ্যকে সফল ক’রেও সাহিত্যিক বিচারে সার্থক সাহিত্য হয়েও মহৎ সাহিত্য যেমন সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে (যা বিনুও জানে), তেমনি পাঠকদের জ্ঞানের সীমাকেও নানাদিকে প্রসারিত, দূর বিস্তৃত ক’রে দিতে পারে। এগুলো আমাদের বাড়তি লাভ।
কেতকী কুশারী ডাইসনের জীবন আদ্যপান্ত কবির জীবন। তাঁর ‘আমার কবিজীবন প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধ পাঠে অনুধাবন করি, সমগ্র জীবনই কবির প্রস্তুতি এবং পারফরম্যান্সের সমন্বয়। তাঁর বেড়ে ওঠা, পঠন-পাঠন, পারিপার্শ্বিকতা, সাহচর্য সবটাই ভীষণ জরুরি মন ও মনন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। কেতকীর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় সাত বছর বয়সে। শৈশবে মেহেরপুরের গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন তিনি। সেখানকার এসডিও ছিলেন তাঁর পিতা। পরবর্তীকালে মেহেরপুরে থাকার অভিজ্ঞতাকে তিনি দেখেছেন অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীতে। স্বীকার করেন তাঁর পিতা-মাতার জীবনের প্রতি উদার মনোভঙ্গীর কথা। কী করে তাঁরা কেতকীকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন সেকথা বিধৃত রয়েছে ’আমার কবিজীবন প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধটিতে। কবিতা নিয়ে কেতকীর ভাবনার খানিকটা উদ্ধৃত করছিএখানে—
আমার একটা মননশীল দিক অবশ্যই আছে, যেটা আমি আমার গদ্যে-পদ্যে কখনোই গোপন করিনি, কিন্তু কবিতায় মননের অত্যধিক বাড়াবাড়িও আমার ভালো লাগে না, যে কারণে আধুনিক পশ্চিমের কিছু কবিতা আমাকে আনন্দ দেয় না। মাথা আর হৃদয়ের মিলিত কাজই আমাকে আকর্ষণ করে, এবং বুদ্ধির সঙ্গে আবেগ ও অন্তর্দৃষ্টির সমন্বয়সাধনই আমার প্রার্থিত। এ প্রসঙ্গে কেতকীর একটি কবিতা এখানে জুড়ে দেয়া যায় নিশ্চয়ই।
উত্তর অজানা
(সুমনের একটি গানের সম্প্রসারণ)
ক’বার প্রেমে পড়লে তবে প্রেমিক বলা যায়,
ক’বার মার খাবার পর মানিয়ে নেয়া মানা,
কত আগাছা নিড়ালে কাউকে মালিনী বলা যায়,
প্রশ্নগুলো কঠিন আর উত্তর অজানা।
কত যুগের হয়ে ওঠায় গোলাপ হয় গোলাপ,
কতটা অপমানের পর রাগ দেখানো ঠিক,
কতটা চুপ করার পর চলতে পারে প্রলাপ,
কোন্ বদলটা দ্রুত আর কোনটা আকস্মিক!
কত রাতের কাজের পর বারনারীর ছুটি,
কত করিডোরের পর কক্ষের নিশানা,
কত অনশনের পর সদ্য সেঁকা রুটি,
কতটা পথ পেরোলে মেলে মৃত্যুর ঠিকানা?
কেতকী কুশারী ডাইসন প্রয়াত হলেন। এ সূত্র ধরেই, জানি না কেন, হঠাৎ কবি প্রাবন্ধিক ফেরদৌস নাহারকে হিংসা করতে ইচ্ছে করলো খুব। লেখায় পড়ে যে কেতকীকে জেনেছি, সেটাই যেন মূর্ত হয়ে সামনে এলো। মনে হলো ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বরটা আমারও তো হতে পারতো। কেন যে লেক অন্টারিওর ধার ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে প্রিয় লেখকের সাথে অন্তরঙ্গ আলাপটা আমার হলো না! দেখলাম না তাঁকে, শুনলাম না তাঁকে! পরক্ষণেই ভাবি, হবে কী করে? আমি তো ফেরদৌস নাহারের মতো কবিজীবন যাপন করিনি। একটা জীবন কী করে কবিতার জন্যে উৎসর্গ করলেন তিনি, বিস্ময় নিয়ে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি। তাঁর প্রবন্ধের বই পশ্চিমে হেলান দেয়া গদ্য’য় যখন কেতকী কুশারী ডাইসনের সাথে সাক্ষাৎকারটা পড়ি, ঘটনাগুলো চোখের সামনে জ্যান্ত হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত তথ্যের ফাঁকে ফাঁকে একজন অদম্য লড়াকু লেখকের পরিচয় পাই। কেতকী ও ফেরদৌস— দু’জনের কাছেই আমি ভীষণভাবে ঋণী। প্রবন্ধ নিয়ে ভয় ভাঙাতে, প্রবন্ধকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে কেতকী আর প্রবন্ধ-নিবন্ধের দিকে আমার কলমকে ঠেলে দিয়েছে, বলতে গেলে ঘাড় ধরে লিখতে বসিয়েছে ফেরদৌস। দু’জনেই স্বাদু গদ্য লেখেন যা পাঠকের সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে দারুণভাবে সক্ষম। দু’জনের গদ্যই আমার খুব প্রিয়।
ফেরদৌস নাহারের নিবন্ধধর্মী প্রবন্ধটির নাম কেতকীর সঙ্গে একদিন। এটি সম্পর্কে একটু বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। ফেরদৌসের চমৎকার গতিশীল গদ্যে আমিও ছুটেছি উইলিয়াম ডু অডিটোরিয়ামের রবীন্দ্র উৎসব থেকে উডবাইন বিচে, চীনা খাবারের রেস্তোরাঁয়। জেনেছি, কেতকীকে নিয়ে, নারীর অধিকার ও জীবন নিয়ে তাঁর লেখা নিয়ে বাঙালী ভদ্রলোকদের পদ্য-পরিহাস চালু ছিল বেশ—
গদ্যে পদ্যে ধোপদুরস্ত
কেতকী কুশারী ডাইসন
ফেমিনিস্ট তিনি জবরদস্ত
ত্রস্ত পুরুষ বাইসন…
পড়তে পড়তে আমার প্রিয় ক্যাফের নীরবতা ভেঙে হো হো হেসেও উঠেছি। কত আগে থেকে লৈঙ্গিক সমমর্যাদার লড়াই চলে আসছে আর এখনও তা কত প্রাসঙ্গিক! কেতকীর কাছে লেখক হওয়ার শর্ত হলো সোশ্যাল রিয়ালিটি সম্পর্কে পুরোপুরি জানা। জেনেছি আধুনিক বৈদগ্ধ লেখক হওয়ার জন্য তাঁকেও করতে হয় লড়াই লৈঙ্গিক ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আর লেখার স্বাধীনতার সাথে সাথে লেখার দায়িত্বও নিতে হয় একজন লেখককে।
বহুমাত্রিক ডায়াসপোরা লেখক, রবীন্দ্র গবেষক, কেতকী কুশারী ডাইসনের কাছে প্রিয় সত্তা হলো তাঁর কবি সত্তা। জেনে আপ্লুত হয়েছি ভীষণ। এত হেলাছেদ্দার কবিজীবন নিয়ে কী গভীর ভালোবাসা তাঁর! চিরকাল শক্তি ও সাহস ধারণ করেছেন তিনি। কেতকী কুশারী ডাইসনের লেখায়, কাজে, ভাবনায় অনুপ্রাণিত হই, উদ্বুদ্ধ হই। সাহস পাই— শিল্পের অভিশপ্ত পথে হেঁটে যেতে, কবিতাকে ভালোবাসতে। বরেণ্য লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, বাংলায় লেখা যেন তিনি কখনো ছেড়ে না দেন। কেতকী সে-কথা রেখেছেন আমৃত্যু। এমন মহৎপ্রাণকে জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।
সাবেরা তাবাসসুম

পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার হাত ধরেই কবিতার সাথে আজন্ম সখ্য। কবিতা, অনুবাদ,
প্রবন্ধ/নিবন্ধ, সংগীত, সিনেমা ও চিত্রকলা নিয়েই তার সৃষ্টিশীল জগৎ। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের
সংখ্যা সতের। চৌদ্দটি মৌলিক কবিতাগ্রন্থ এবং তিনটি অনুবাদগ্রন্থ।

খুব ভালো লেখা। প্রাণ ছোঁয়া, আন্তরিক ও ঋদ্ধ। আগামীতে সাবেরার আরও গদ্য পড়ার আগ্রহ রইলো।