অ্যান কারসনের কবিতার জগৎ: রূপ ও অরূপের সন্ধান

আবদুর রব

একটি কবিতায় প্রথমে তিনটি ঋতুর কথা, অথচ তারপরই এসে পড়ে চতুর্থ বসন্ত। একটি ছেলেকে পুরাণ বলে দিয়েছে তার মৃত্যু অনিবার্য; ছেলেটি খাতা খুলে নিজের গল্পের নতুন শেষ লেখে। আর এক নারী বড়দিনের নিঃসঙ্গতায় হেগেল পড়তে পড়তে হঠাৎ উঠে দাঁড়ান, বেরিয়ে যান তুষারে ঢাকা বনের দিকে। তিনটি দৃশ্যের মধ্যে একটা মিল আছে। সব কটিতেই যা জানা, বলা কিংবা নির্ধারণ করা আছে, তার বাইরের অন্য কিছু বা ভিন্ন মাত্রা লক্ষ করা যায়। কবি অ্যান কারসনের লেখায় এটাই ঘটে থাকে বারবার।

২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বাংলা পাঠকের কাছে কারসনের নাম এখন অনেক বেশি পরিচিত। বলা হচ্ছে, তিনি কবিতা ও গদ্যের সীমানা ভেঙেছেন, প্রাচীন গ্রিক পুরাণকে নতুন করে লিখেছেন, এবং তিনি শোক ও বিচ্ছেদের শিল্পী। এসব সত্যি। কিন্তু তাঁর বই খুলে পড়তে বসলে মনে প্রশ্ন জাগে: এত নতুন নতুন রূপের প্রয়োজন কেন? মানুষের অভিজ্ঞতায় এমন কী থাকে, যা একটি গল্প, একটি ছবি, একটি বাক্য বা একটি কবিতার ছাঁচে সম্পূর্ণ ধরা দেয় না? এই প্রবন্ধে ‘অরূপ’ বলতে কোনো অতিলৌকিক সত্তা নয়, বরং অভিজ্ঞতার সেই অধরা অংশকে বোঝানো হচ্ছে, যার কাছে পৌঁছাতে গিয়ে সাহিত্যকে বারবার নিজের রূপ বদলাতে হয়।
বাংলায় কারসন-চর্চা একেবারে নোবেল ঘোষণার পর শুরু হয়নি। ২০১৯ সালে রাজ রিডারের অনুবাদে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবরে তাঁকে নিয়ে পরিচিতি, অনুবাদ ও সমালোচনার একটি নতুন পরিসর তৈরি হয়। শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবিতার ধ্রুপদী দুষ্টুমি’ পাঠকের চোখে তাঁর মিশ্রমাধ্যমের বিস্ময় তুলে ধরে; অনন্ত মাহফুজ ‘দ্বৈতাদ্বৈত নন্দনতত্ত্ব’ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন কবিতা ও গদ্য, অতীত ও বর্তমানের সম্পর্ক; বাংলা ট্রিবিউনের ‘নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের অসমাপ্ত পৃথিবী’ শোক, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাকে সামনে আনে। এগুলো কারসন-পাঠের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

তবু তিনটি শব্দ—‘ঘরানা’, ‘নিরীক্ষা’, ‘অসম্পূর্ণতা’—বারবার উচ্চারিত হলেই কবির স্বর আমাদের কাছে ধরা পড়ে না। একটি গ্রিক পাণ্ডুলিপির হারানো শব্দ, মৃত ভাইয়ের অজানা জীবন, প্রত্যাখ্যাত প্রেম এবং তুষারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা শরীর—এসব কি একই ধরনের অভাব? নিশ্চয়ই নয়। কারসনের লেখার শক্তি তাদের এক নামে ডেকে ফেলার মধ্যে নয়; বরং প্রতিটি অভিজ্ঞতার জন্য আলাদা ভাষা, আলাদা ছন্দ, কখনো আলাদা বইয়ের শরীর খুঁজে নেওয়ার মধ্যে। তিনটি লেখাই মূল্যবান; বিশেষত শেষের দুটি ভাষার সীমা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে—সুতরাং বিষয়টি বাংলায় একেবারেই অনালোচিত, এমন দাবি ঠিক নয়।

১৯৯৭ সালে জন ডি’আগাটাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কারসন একটি চমৎকার কথা বলেন। লেখার আগে ঠিক কী বলতে চান, সে বিষয়ে অতিরিক্ত নিশ্চিত হয়ে পড়লে অনুসন্ধান থেমে যায়। তাঁর কাছে প্রবন্ধ কিংবা কবিতার রূপ তৈরি হয় অজানার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে। আবার এটাও বলেন, লেখা শুরু করতে একটি রূপের ধারণা তাঁর দরকার হয়। অর্থাৎ তাঁর লেখালেখি কোনো নিয়মহীন স্বতঃস্ফূর্ততা নয়; খুঁজে পাওয়ার সঙ্গে গড়ে তোলার অবিরাম কথোপকথন।

এই বক্তব্য কারসনের নিরীক্ষাকে বুঝতে সাহায্য করে। তিনি শুধু কবিতার সঙ্গে প্রবন্ধ জুড়ে চমক দিতে চান না। কখনো ইতিহাসের একটি ভাঙা টুকরো, কখনো প্রেমের একটি অস্পষ্ট সম্পর্ক, কখনো শরীরের এমন অনুভব—যার নাম জানেন না—তাঁকে ভাবায়। বিষয়টিকে যত কাছে টানেন, তত বোঝেন পরিচিত ভাষা যথেষ্ট নয়। তখন রূপ বদলায়। রূপ তাই তাঁর কাছে তৈরি পোশাক নয়; অনুসন্ধানের পথে মাপ বদলাতে থাকা এক ধরনের নির্মাণ।
কারসনের ‘Essay on What I Think About Most’ কবিতার প্রথম শব্দটি একা দাঁড়িয়ে আছে: ‘Error’—ভুল। আমরা সাধারণত ভুলকে লজ্জা, ব্যর্থতা কিংবা অক্ষমতার প্রমাণ ভাবি। কারসন অ্যারিস্টটলের রূপকতত্ত্ব থেকে আরেকটি সম্ভাবনা তুলে আনেন। পরিচিত বাক্য হঠাৎ অন্য অর্থের দিকে ঘুরে গেলে প্রথমে মনে হয় কিছু একটা ঠিক নেই; তারপর সেই বিচ্যুতির মধ্যেই অচেনা সত্যটি চোখে পড়ে।

এবার তিনি আনেন প্রাচীন গ্রিক কবি আলকম্যান (Alkman)- এর এক টুকরো কবিতা। সেখানে তিনটি ঋতুর কথা বলে বসন্তকে চতুর্থ ঋতু হিসেবে দেখানো হয়েছে। সংখ্যার এই গরমিলের শেষে আসে খাদ্যের অভাব। শীতের পর বসন্ত এসেছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতির সমৃদ্ধির খবর ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরায়নি। এইখানে কারসনের সংক্ষিপ্ত পঙ্‌ক্তি:

Hunger always feels / like a mistake.
ক্ষুধা সব সময় যেন এক ভুলের মতো লাগে।

ভুলটি শুধু অঙ্কের নয়; মানুষ যে পৃথিবীতে বাস করে, তার হিসাবেও যেন কোথাও অসংগতি। ঋতু বদলায়, অথচ অভাব থেকে যায়। কারসন অবশ্য দাবি করেন না যে আলকম্যান সচেতনভাবে অঙ্কে ভুল করেছিলেন। কবিতাটি খণ্ডিত; যে অংশ হারিয়ে গেছে, সেখানে হয়তো ব্যাখ্যা ছিল। কিন্তু হারানো অংশ নিজের ইচ্ছামতো পূরণ না করে তিনি এই অনিশ্চয়তাকে আমাদের চিন্তার সামনে রেখে দেন।

তারপর আসে কবিতার সেই ছোট্ট দুষ্টুমি। আলকম্যানের কবিতায় তিনটি ঋতুর পরে যেমন অপ্রত্যাশিতভাবে চতুর্থ ঋতু এসে পড়ে, কারসনও ঠিক তেমন একটি কাণ্ড ঘটান। প্রথমে ঘোষণা করেন, আলকম্যানের কবিতায় তাঁর তিনটি বিষয় ভালো লাগে। একে একে তিনটি বিষয় আলোচনা করেন। তারপর হঠাৎ লেখেন—

The fourth thing I like
অর্থাৎ, ‘চতুর্থ যে বিষয়টি আমার ভালো লাগে…’

পাঠক বুঝতে পারেন, কারসন নিজেই আলকম্যানের আপাত ভুলটির পুনরাবৃত্তি করলেন। তবে এটি ভুল করে ভুল করা নয়, জেনেশুনে তৈরি করা অসংগতি। যে বিষয়টি নিয়ে তিনি এতক্ষণ আলোচনা করেছেন, সেটিই এবার নিজের কবিতার মধ্যে ঘটিয়ে দেখালেন। ফলে ভুলের সৃজনশীল ক্ষমতা নিয়ে তাঁর বক্তব্য কেবল ব্যাখ্যা হয়ে থাকল না, কবিতার শিল্পকৌশলে পরিণত হলো। কবিতার শেষদিকে কারসন অবশ্য বাস্তবকে ভুলে যান না:

Alkman is probably no less hungry. … Yet something has changed.
আলকম্যানের ক্ষুধা সম্ভবত মেটেনি। তবু কিছু বদলেছে।

এখানে কী বদলেছে? কবির খাবার নয়, পাঠকের দেখার চোখ। কবিতাটি অনাহারের সমাধান দেয় না; অনাহারকে নতুনভাবে অনুভব করার পথ খুলে দেয়। কারসনের এখানে বড় কাজটি ‘ভাষা অসম্পূর্ণ’—এই ঘোষণা নয়। তিনি কবিতার বাক্যেই এমন একটি ঘটনা ঘটান, যেখানে ভুল আমাদের বোঝার অভ্যাসকে নড়িয়ে দেয়।

কারসনের If Not, Winter: Fragments of Sappho (২০০২) বইয়ে প্রাচীন কবি স্যাফোর লেখা আমাদের কাছে আসে ভাঙা পাণ্ডুলিপির টুকরো হয়ে। কারসন অনুবাদ করতে গিয়ে হারানো শব্দের জায়গায় সাদা স্থান বা বন্ধনী রেখে দেন। এই ফাঁক কেবল নান্দনিক সাজসজ্জা নয়। কিছু শব্দ সত্যিই আর পাওয়া যায় না—কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। সেগুলো নিজের কল্পনা দিয়ে ভরে দিলে হয়তো লেখা সুন্দর শোনাবে, কিন্তু ইতিহাসের ক্ষয় ঢাকা পড়ে যাবে।

অন্যরকম অনুপস্থিতি আছে Nox (২০১০)-এ। মৃত ভাইয়ের চিঠি, ছবি, স্মৃতির টুকরো আর লাতিন শোকগাথার অনুবাদ পাশাপাশি রেখে কারসন যেন প্রশ্ন করেন: কত তথ্য জড়ো করলে একজন মৃত মানুষকে সম্পূর্ণ জানা যায়? অভিধান শব্দের অর্থ দেয়, কিন্তু ভাইয়ের অজানা দিনগুলোর উত্তর দেয় না। এখানে শোক মানে শুধু কাঁদা নয়; প্রিয় মানুষটির জীবন যে আমার ব্যাখ্যার চেয়ে বড়, সে-কথা মেনে নেওয়াও।

প্রেমের ক্ষেত্রেও দূরত্ব অন্যভাবে কাজ করে। Eros the Bittersweet (১৯৮৬)-এ প্রেমিক, প্রিয় মানুষ এবং তাদের মাঝখানের ব্যবধান—এই তিনটি মিলে আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক তৈরি করে।

ক্রিস জেনিংস দেখিয়েছেন, কারসনের অনুবাদ ও সাহিত্যিক রূপেও এমন সম্পর্ক কাজ করে: গ্রিক ও ইংরেজি একে অন্যকে ছোঁয়, কিন্তু এক হয়ে যায় না। অনুবাদের একটি অর্থ বেছে নিতে গিয়ে অন্য সম্ভাবনাগুলো রয়ে যায় আড়ালে। সব অনুপস্থিতি তাই এক নয়; কোথাও ইতিহাসের ক্ষতি, কোথাও মৃত্যু, কোথাও আকাঙ্ক্ষার সক্রিয় দূরত্ব।

এখানে আলবেয়ার কামুর কথা মনে পড়ে। The Plague (১৯৪৭)-এ মহামারিতে বিচ্ছিন্ন মানুষের বহু দিনের ভালোবাসা দশ শব্দের টেলিগ্রামে নেমে আসে; বারবার লেখা চিঠির শব্দও একসময় অনুভূতি বহন করতে পারে না। জোসেফ গ্রাঁ আবার নিখুঁত প্রথম বাক্য খুঁজতে গিয়ে একই বাক্য বারবার বদলান। আর The Myth of Sisyphus (১৯৪২)-এ মানুষ অর্থ খুঁজতে থাকে এমন এক পৃথিবীতে, যা সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। ভাষা কিংবা অর্থের এই সংকট তাই কারসনের একার আবিষ্কার নয়। তবে তাঁর বিশেষ কৌশল হলো, অনিশ্চয়তাটিকে শুধু বর্ণনা না করে কবিতার গঠনেই পাঠককে তার অভিজ্ঞতা দেওয়া—আলকম্যানের ভুল কিংবা স্যাফোর ফাঁকা স্থান তার উদাহরণ।

Autobiography of Red (১৯৯৮)-এ লাল ডানাওয়ালা গেরিয়ন গ্রিক পুরাণের দানব হয়েও আধুনিক এক সংবেদনশীল কিশোর। খাতায় সে নিজের ‘তথ্য’ লিখতে শুরু করে। পুরাণের কাহিনিতে হেরাক্লেসের হাতে তার মৃত্যু নির্ধারিত। কিন্তু স্কুলে একদিন প্রশ্ন ওঠে, সে কি কখনো সুখের সমাপ্তি লেখে না? গেরিয়ন খাতা ফিরিয়ে নেয়। তারপর কাগজে লেখে:

New Ending.
নতুন সমাপ্তি।

এই দুই শব্দে বিরাট এক পরিবর্তন ঘটে। পুরাণের অতীত সে মুছে দিতে পারে না, কিন্তু অন্যেরা তার জীবনের শেষ কথা বলবে—এটিও মেনে নেয় না। তার নতুন লেখায় পৃথিবীর চারদিকে লাল বাতাস হাত ধরাধরি করে বয়ে চলে। ঘটনার সত্যের পাশে কল্পনার আরেকটি সম্ভাবনা দাঁড়ায়। এখানে ভাষা ‘অরূপ’-কে পূর্ণ আকারে বন্দি করে না; বরং নির্ধারিত কাহিনির বাইরে আরেকটি রূপের অধিকার তৈরি করে।

গ্রন্থের অন্যত্র গেরিয়নের আত্মজীবনী আলোকচিত্রের দিকে যায়; কিন্তু আমাদের সামনে প্রকৃত ছবি আসে না, আসে ছবির ভাষাগত বিবরণ। ছবি যা ধরে রাখে, শব্দ তা পুরোপুরি পারে না; শব্দ যা উসকে দেয়, ছবিও তা একা পারে না। নিজেকে জানা তাই একটি অসমাপ্ত অনুবাদের মতো—এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যাত্রা, যেখানে কিছু পাওয়া যায়, কিছু থেকে যায় অদেখা।

কারসনের The Glass Essay-এ প্রেমিকের বিচ্ছেদের পর এক নারী এমিলি ব্রন্টির লেখা পড়তে পড়তে নিজের নিঃসঙ্গতাকে নতুনভাবে বোঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু শুধু সাহিত্য নয়, মায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও এই আত্ম-অনুসন্ধানের অংশ। মা সব সময় মেয়ের কষ্ট বুঝতে পারেন না। কখনো তাঁর শোক ও মনোচিকিৎসা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। অথচ মেয়ে যখন বলেন, ‘I prevail!’—‘তবু আমি টিকে থাকি!’—মা হেসে উত্তর দেন, ‘Yes you do’—‘হ্যাঁ, তুমি তা-ই করো।’ এই কঠোরতা ও ভালোবাসার সহাবস্থানই সম্পর্কটিকে বিশেষ করে তোলে। ব্রায়ান টিয়ারের বিশ্লেষণে, ব্রন্টির সাহিত্য তাঁকে নিজের জীবন বুঝতে সাহায্য করে, আর মায়ের সমর্থন দেয় সেই জীবনকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। অন্যের লেখা আমাদের জীবন বোঝায়, কিন্তু বাস্তব সম্পর্কের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না।

এই জায়গা থেকে Merry Christmas from Hegel গদ্যকবিতাটি বিশেষ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ভাইয়ের মৃত্যুর বছর। বড়দিন। উত্তরে বসবাসকারী কথকের চারপাশে প্রায় কেউ নেই। একা বসে তিনি হেগেল সম্পর্কে পড়ছেন। দর্শনটি কতটা ঠিক বুঝছেন, সে বিষয়ে তাঁর নিজেরই সংশয় আছে। তবু একটি ধারণা তাঁকে আনন্দিত করে: বাক্যের শব্দগুলো কি পাশাপাশি থেকে পরস্পরের অর্থ বদলে দিতে পারে না?

হঠাৎ তিনি কোট-বুট পরে বেরিয়ে যান তুষারের মধ্যে দাঁড়াতে। শৈশবের পর এমনভাবে দাঁড়ানো হয়নি। বনে বাতাস নেই; দূরের যানবাহনের শব্দ স্তরে স্তরে মিলিয়ে যায়। শোনা যায় ডালের খসখস, পাখির ডাক, কাঠবিড়ালির ছোট্ট শব্দ। বরফে ছায়াগুলো একে অন্যের ওপর সরে যায়। প্রচণ্ড ঠান্ডায় শরীরের উপরিভাগ কেঁপে ওঠে, অথচ ভিতরে অনুভূত হয় উষ্ণতা। এই অভিজ্ঞতাকে বোঝাতে কথক ব্যবহার করেন দুটি শব্দ:

ravishing peace
অভিভূত করে ফেলা এক শান্তি। 

শব্দটি তাঁর নিজের কাছেও একটু অতিরিক্ত মনে হতে পারত; অথচ ঠিক এই অনুভূতির কাছে পৌঁছে সেটিই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে জরুরি হলো, এই শান্তি শরীর ও ইন্দ্রিয় থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। চোখ, কান, ত্বক—সব মিলিয়ে পৃথিবীর সঙ্গে এক নতুন সম্পর্ক। মৃত ভাই ফিরে আসেন না। বড়দিনের নিঃসঙ্গতাও মিথ্যা হয় না। কিন্তু একটি কঠিন দার্শনিক ভাবনা তাঁকে বইয়ের পাতা থেকে বনের মধ্যে পৌঁছে দিয়েছে; পড়ার অভিজ্ঞতা রূপ নিয়েছে বাঁচার অভিজ্ঞতায়।

এখানে গদ্যকবিতার রূপটিও অর্থবহ। Float (২০১৬)-এ প্রকাশিত লেখাটি পরে জেরেমি নোয়েল-টড সম্পাদিত The Penguin Book of the Prose Poem: From Baudelaire to Anne Carson (২০১৮)-এ স্থান পায়। বোদলেয়ার থেকে বর্তমানের গদ্যকবিতার দীর্ঘ ধারায় একে পড়লে বোঝা যায়, কবিতার কাজ সব সময় পঙ্‌ক্তি ভাঙায় নয়; কখনো গদ্যের দীর্ঘ নিশ্বাসেও ভাবনা, দৃষ্টি আর অনুভব একসঙ্গে প্রবাহিত হয়।

‘ভাষা দিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করা যায় না’—এই উপলব্ধি কারসনের একার নয়। কামুসহ বহু লেখকই ভাষার এই সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন। ‘কবিতা ও গদ্য মিশিয়ে লেখা যায়’—এ কথাটিও কারসনের আগে অজানা ছিল না। তাঁর স্বাতন্ত্র্য এই দুটিকে ঘোষণা করার চেয়ে নির্দিষ্ট লেখায় কাজ করানোর মধ্যে। আলকম্যানের কবিতার ভুল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজেও ভুল করেন। গেরিয়নকে দিয়ে নিজের শেষ আবার লিখিয়ে নেন। স্যাফোর হারানো শব্দ ঢেকে না রেখে দেখান। হেগেলের দুর্বোধ্য বাক্যকে পৌঁছে দেন শীতের বনের অনুভবে। পাঠক শুধু এই ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানেন না; পড়তে পড়তেই কিছুটা তাদের ভিতর দিয়ে যান।

তবু সব নতুন আঙ্গিক যে সফল, এমনও নয়। Autobiography of Red-এর পদ্যবিন্যাস কতখানি প্রয়োজনীয়, আর কতখানি গদ্যকে ভেঙে সাজানো—তা নিয়ে সমালোচনা আছে। An Oresteia অনুবাদেও বিভিন্ন গ্রিক নাট্যকারের পৃথক স্বর যথেষ্ট স্পষ্ট হয়েছে কি না, প্রশ্ন উঠেছে। এই আপত্তিগুলো মনে করিয়ে দেয়, দুর্বোধ্য হলেই গভীর নয়, রূপ বদলালেই নতুন শিল্প হয় না। রূপকে তার প্রয়োজন প্রমাণ করতে হয় পাঠের ভিতরেই।

অ্যান কারসনকে নিয়ে আলোচনার একটি বিপদ আছে। তাঁর কবিতার অভিনবত্বে মুগ্ধ হয়ে আমরা সহজেই তাঁকে ‘ঘরানা ভাঙা’ কিংবা ‘দুর্বোধ্য’ কবির পরিচয়ে আটকে ফেলতে পারি। অথচ তাঁর সাহিত্য আমাদের আরও কঠিন একটি কাজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। একটি বাক্য কেন অসম্পূর্ণ থেকে গেল, একটি ভুল কেন সংশোধন করা হলো না, একটি স্মৃতি কেন বারবার ফিরে আসে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কবিতার কাছে ফিরে যেতে হয়। তাঁর রচনার আকর্ষণ শুধু চমকে দেওয়ার ক্ষমতায় নয়, পাঠককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করার মধ্যেও।

বাংলা ভাষায় কারসনকে নিয়ে আলোচনা তাই কেবল তাঁর সাহিত্যিক নিরীক্ষার প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দেখতে হবে, তাঁর কবিতা আমাদের চেনা পাঠাভ্যাসকে কতটা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আমরা কি প্রতিটি কবিতার একটি নির্দিষ্ট অর্থ খুঁজি? অসংগতিকে কি ত্রুটি বলে সরিয়ে দিই? যা বুঝতে পারি না, তাকে কি দ্রুত দুর্বোধ্য বলে চিহ্নিত করি? কারসন এই অভ্যাসগুলোর সামনে অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখেন। তাঁর কবিতা পড়ার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্ভবত এখানেই—তিনি শুধু নিজের সাহিত্যজগৎ উন্মুক্ত করেন না, আমাদের পড়ার চোখটিকেও পরীক্ষার মুখে দাঁড় করান।

 

উৎস ও পাঠসূত্র

[১] The Nobel Prize in Literature 2026, NobelPrize.org; আরও দেখুন, Reuters, ৮ অক্টোবর ২০২৬।  অনলাইন সূত্র

[২] রাজ রিডার, ‘অ্যান কারসনের একগুচ্ছ কবিতা’, প্রথম আলো, ৯ অক্টোবর ২০২৬; মূল অনুবাদ সংকলন: ‘অনুবাদে আধুনিক মার্কিন কবিতা’ (চিত্রা প্রকাশনী, ২০১৯)।  অনলাইন সূত্র

[৩] শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘কবিতার ধ্রুপদী দুষ্টুমি’, রোববার, ৯ অক্টোবর ২০২৬।  অনলাইন সূত্র

[৪] অনন্ত মাহফুজ, ‘অ্যান কারসনের সাহিত্যে দ্বৈতাদ্বৈত নন্দনতত্ত্ব’, সংবাদ, ১৫ অক্টোবর ২০২৬।  অনলাইন সূত্র

[৫] ‘নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের অসমাপ্ত পৃথিবী’, বাংলা ট্রিবিউন, ৮ অক্টোবর ২০২৬।  অনলাইন সূত্র

[৬] John D’Agata and Anne Carson, “A ___ with Anne Carson,” The Iowa Review 27, no. 2 (1997): 1–22; সংযুক্ত সাক্ষাৎকার।  অনলাইন সূত্র

[৭] Anne Carson, “Essay on What I Think About Most,” Men in the Off Hours (Knopf, 2000), পৃ. ৩০–৩৬; সংযুক্ত মূল কবিতা ও প্রকাশকের পাঠ-নির্দেশিকা।  অনলাইন সূত্র

[৮] Anne Carson, If Not, Winter: Fragments of Sappho (Knopf, 2002)।  অনলাইন সূত্র

[৯] Anne Carson, Nox (New Directions, 2010)।

[১০] Chris Jennings, “The Erotic Poetics of Anne Carson,” University of Toronto Quarterly 70, no. 4 (2001): 923–936; সংযুক্ত গবেষণাপত্র।  অনলাইন সূত্র

[১১] Albert Camus, La Peste / The Plague (1947); বিশেষত টেলিগ্রাম ও জোসেফ গ্রাঁর প্রথম বাক্যের প্রসঙ্গ।  অনলাইন সূত্র

[১২] Albert Camus, Le Mythe de Sisyphe / The Myth of Sisyphus (1942); অ্যাবসার্ড ও মানবিক প্রতিক্রিয়ার আলোচনা।  অনলাইন সূত্র

[১৩] Anne Carson, Autobiography of Red: A Novel in Verse (Knopf, 1998), “VI. Ideas”; সংযুক্ত মূল পাঠ।  অনলাইন সূত্র

[১৪] Brian Teare, “Reading Carson Reading Brontë RE: The Soul’s Difficult Sexual Destiny,” in Anne Carson: Ecstatic Lyre, ed. Joshua Marie Wilkinson (University of Michigan Press, 2015), পৃ. ৩০–৩৫; সংযুক্ত অধ্যায়।  অনলাইন সূত্র

[১৫] Anne Carson, “Merry Christmas from Hegel,” Float (2016); মূল কবিতার পাঠ।

[১৬] Jeremy Noel-Tod (সম্পা.), The Penguin Book of the Prose Poem: From Baudelaire to Anne Carson (Penguin, ই-বুক ২০১৮; পেপারব্যাক ২০১৯)।  অনলাইন সূত্র

[১৭] Adam Kirsch ও Emily Wilson-এর সমালোচনা, ব্যবহারকারীর সংযুক্ত “Anne Carson is a poet” নথির সংকলিত আলোচনা; Wilson, “Violent Grace: Anne Carson’s An Oresteia,” The Nation (2009)।  অনলাইন সূত্র

আবদুর রব

কবি, অনুবাদক, অনলাইন ম্যাগাজিন সম্পাদক ও অর্থনীতিবিদ। জন্ম ৩০ জুন ১৯৬১ সালে। পৈত্রিক নিবাস যশোর। বর্তমান বসবাস ঢাকায়। একটি আন্তর্জাতিক কন্সাল্ট্যান্সি ফার্মে কর্মরত। ৩৫টি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

শৈশব থেকে লেখালেখির শুরু। এ পর্যন্ত দশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয় যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পূর্ণ প্রাণ যাবো’। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ: কে ঘুমায় কে জাগে (১৯৯৪); রূপান্তরের গান (২০০৩); আপেলসূত্র (২০১৪), বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় (২০২০), নুড়ি পাথরের ছায়া (২০২৩) ও নির্বাচিত কবিতা (২০২৪)। এছাড়া ছোটদের জন্য চীনা গল্পের তিনটি অনুবাদ গ্রন্থও আছে। এগুলো প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। বিদ্যাপ্রকাশ থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় অনুবাদ কবিতার বই ‘বৃষ্টির ভেতর এক গলিপথ’। বেশকিছু ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন তিনি। 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top