পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

মিষ্টি মুখের দুই কিশোরী

সপ্তম শ্রেনীতে উঠে আমি প্রথম বারের মতন ‘সি সেকশনে’ পড়লাম। কীভাবে সেকশন নির্ধারিত হতো সেসব আগেই বলেছি। তবুও ‘সি’ সেকশনে পড়লে মন কেমন কেমন জানি করে উঠত। আদতে আমি ‘এ’ সেকশনেই পড়তে চাইতাম। কিন্তু যে ‘সি’ তে পড়তো সে অত্যন্ত খারাপ স্টুডেন্ট এরকম কোনো কিছু ছিল না।  কম্বাইণ্ডলি যে ৩য় হতো সে ছিল সি সেকশনের ফার্স্ট, যে ৬ষ্ঠ হতো, সে ছিল সেকেন্ড। যে ৯ম হতো, সে ছিল থার্ড। সেভেন সি তে আমার রোল নাম্বার হলো চার। মানে আমি কম্বাইন্ডলি ১২তম হয়েছিলাম।

এই সেভেন— সি ছিল তিনতলার ওপরে। খুব আলো-রোদ্দুর পরিপূর্ণ একটা ক্লাসরুম। বড় বড় জানালা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে হাওয়া ঢুকে পড়ত। আর টিচারদের ক্লাসে আসতে সামান্য বিলম্ব হলেই আমরা নৃত্যগীতে মেতে উঠতাম। জানালা গলিয়ে ওপাশের রাস্তার লোক চলাচল দেখা যেত। সেভেন-সি র পাশেই একটা বিশাল মেঘশিরিষের বৃক্ষ ছিল। সে গাছের ছায়া অনেক দূর পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। আমাদের ক্লাসের বিল্ডিং থেকে পা বাড়ালেই সবুজ ঘাসের পেলবতা স্পর্শ করা যেত। আর ঘাসের সেই সবুজবন পেরোলেই টলটলে জল পূর্ণ এক পুকুর। পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটলা। আমাদের ইচ্ছে হলে ওই জলে পা ভেজাতে পারতাম।

ক্লাস সেভেনে প্রমোশন পাওয়ার পরে নানান ঘটনাই ঘটল। আমি চিনলাম শিমুল ফুলের মতো রক্তাক্ত আজব এক দুনিয়া। আমার অন্যান্য ক্লাসমেটরাও নিশ্চয়ই আমার আগে বা সামান্য পরে এই অভিজ্ঞতার মাঝখান দিয়েই গেল।

ক্লাস সেভেন— সি তে এক কিশোরীকে পেলাম। যে আমাদের ইশকুলে এসে সদ্য ভর্তি হলো। তার চোখ দুটো চাইনিজ মেয়েদের মতো। নাকও তেমন খাঁড়া নয়। কিন্তু তার চিবুকের নিচে ডিম্পল— তখনকার নায়িকা সুচরিতার মতো। আর সে খুব মায়াবতী। মাথাভর্তি লম্বা-সিল্কিহেয়ার। আমার চুল আমার কাছে চিরকালই বিদঘুটে লেগেছে। আমি কার্লি-হেয়ার অপছন্দ করেছি। আমার পছন্দ সুপারি গাছের মতো স্ট্রেইট-হেয়ার। ছেড়ে দিলেই যেন ঝরঝরিয়ে নিচে ঝরে পড়ে। ওই মেয়ের ছিল তেমনই চুল। নাম জানলাম সায়মা। এই সায়মা আমাকে ওই ছোটকাল থেকেই ভালোবাসতে লাগল এবং আজ অব্দিও তার ভালোবাসা কিনা এক রকমই রইল!

সায়মা নতুন ভর্তি হয়ে এলেও সে হয়ে উঠলো আমার সকল গোপনের সহচর। সায়মা আমার মতোই সামান্য মজাতেই প্রাণখুলে খলখলিয়ে হেসে উঠত। আমাকে টিচাররা বকা দিলে ওর চোখের কোনেও জল জমে উঠত। আজও সে মাঝরাতে ইনবক্সে জানতে চায়—

কেমন আছিস? তোর জন্য ভারি চিন্তা হয়।

আমি কিন্তু জানি, এই ’আমার জন্য চিন্তা করার মানুষই’ এই জগতে অত্যন্ত দুর্লভ! কার এমন কীসের ঠেকা, নিজের খেয়ে অন্যের কুশলাদি জানার? যেখানে সবাই টাকার ঝনঝনানি শোনাতে ব্যাস্ত, কার কত জাকজমক আছে, কত ঠাঁটবাট আছে সেসব প্রদর্শনে উদগ্রীব— সেখানে এমন মানুষ? এমন মানুষই আসলে মানুষরতন!

ক্লাস সেভেনে সায়মা আসার পর আমার নিত্য-দুষ্টুমি উপভোগের মানুষ পেলাম আমি।

আমি যে পড়াশুনা একেবারেই করিনা সেটা সায়মাই সব চাইতে ভালো করে জানতো। পড়াশুনা করলে কী বা কেমন রেজাল্ট করব সেটাও ওর চাইতে বেশি ক্লাসের কেউ-ই আর জানতো না। তেমনি আমিও জানতাম সায়মা পড়লে কী কী হতে পারে? আদতে আমরা দুইজনই নিজেদের পটেনশিয়াল সম্পর্কে ভালোরকম ওয়াকিবহাল ছিলাম। অবশ্য সায়মার মতোই পান্নাও আমাকে জানতো। পান্নার বিসিএস কনফার্ম হওয়ার পরে আমাকে চিঠি লিখেছিল—

তোরও নিশ্চয়ই বিসিএস হয়েছে?

যারা আমার মনের ভেতর ছিল, আমার ছায়ার মতো পাশে ছিল, তারা খুব ভালো করেই জানতো আমাকে, জানতো আমার মেধার দৌড়? আর যারা ভাসা ভাসা ছিল, বহু দূর থেকে আমাকে আবছা-আবছা অবলোকন করত, তাদের পক্ষে আমাকে জানা অসম্ভবই ছিল।

সায়মার সাথে পুরোনো বানির্শের মতো কত সুগন্ধি স্মৃতি যে রয়ে গিয়েছে আমার! কত ভালবাসাবাসি আর নিজেদের খামাখাই অন্যের জন্য অপচয়ের কাহিনী?

সিলেটের ত্বক-জ্বালানো-গরমে আমার সমস্ত শরীরে লাল-লাল-ঘামাচি ফুটে বেরোতো। আর আমি সায়মাকে নিঃসঙ্কোচে বলতাম—

ওই সায়মা, আমার পিঠ চুলকে দে তো।

সায়মা অবলীলায় তার মেনিকিউর করা নখ দিয়ে আমার পিঠ চুলকে দিত। [আমরা তখন নিজেদের মেনিকিউর নিজেরাই করতে পারতাম]

সায়মা আমার মতো তড়বড় করত না, কিন্তু আমার সকল তড়বড়ানির প্রশ্রয় দাতা ছিল সে। আমার প্রথম প্রণয়ের চিঠিও এসেছিল ওদের বাসার ঠিকানায়। আর ওর বড়ভাই সে চিঠি আমাদের হাতে কিছুতেই পৌঁছাতে দেন নাই।

প্রথম প্রণয়ের প্রথম চিঠি না-পাওয়ার দুঃখে আমরা দুইজন একই রকম ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিলাম।

হায় প্রেম! হায় আমাদের উদ্দামতা! আমাদের জীবনের ভুলের কলংকিত ফুলগুলি! আর তাদের মিছে পাপড়ি মেলে দেয়া! ভুলে ভুলে সমস্ত জীবন ক্ষয় করে ফেলে এই শেষবেলায় ক্রন্দনের আর কোনো মানে নাই? মিছে এ ক্রন্দন, মিছে এ জীবনের সমস্ত কলরোল!

ক্লাস সেভেনে পড়তে পড়তে আমি আরেকজন মায়াবতীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম— তার নাম ছিল সোনালি। সে অবশ্য ‘সি সেকশনে’ পড়তো না। সেভেন-এ বা বি তে ভর্তি হয়েছিল। তার ছিল ভাসা-ভাসা ভারি সুন্দর নয়ন যুগল। আর মোটাসোটা দুইবেনীর বাহার।

সোনালিকে আমার স্মরণে ছিল তার বিষণ্ণ-হাসির জন্য। সে আমাদের সাথে আড্ডা দিতো ঠিকই, তার ঠোঁট হাসতো, কিন্তু কিছুতেই মন হাসতো না! তার ভাসা-ভাসা আঁখিদ্বয়ে অশ্রুমঞ্জরির কণা লেগে থাকত। অনেক পরে জেনেছিলাম, ছোটবেলায় সোনালির মা মরে গেছে!

আমাদের সবারই মা ছিল, শুধু সোনালিরই মা ছিলনা। ওর যে মা ছিল না তা আমরা বুঝতে পারতাম ওর বিষাদিত হাসি দেখে। কী করুণ আর বিষণ্ণ-মায়াবী মুখচ্ছবি ছিল সোনালির! আর এমন স্বচ্ছ দৃষ্টি— যেন আমাদের বুকের ভেতরটাও ও স্পষ্ট দেখতে পেতো!

সংসারের কাজকর্ম সেরেটেরে সোনালি ইশকুলে আসত। আমরা গোল হয়ে বসে ওর কাজবাজের ইতিহাস শুনতাম। একদিন এসে বলত—

জানিস, আজ না অনেক মাছ কুটেছি।

শুনে আমাদের চোখ ছাপিয়ে জল আসত। কিন্তু ওর সামনে আমরা কিছুতেই কাঁদতাম না। আমরা কোনো অনুকম্পা সোনালিকে দেখাতে চাইতাম না।

ইশকুল ছুটি হলে সোনালি কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, মাথা নিচু করে, ম্লানমুখে রাঙা-রাজকন্যার মতো বাসায় চলে যেতো। আমরা ওর হেঁটে যাওয়া পথে  এক বেদনার্ত বালিকার ছায়া দেখতাম।

আমি তখনো জীবনানন্দ দাশ পড়ি নাই। তারও বছর তিনেক পরে জীবনানন্দকে পড়েছিলাম। তখন পড়া থাকলে সোনালিকে হয়তো আমি বলতাম—

হায় চিল,সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে/ তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে-উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে!/ তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!/

দিন কয়েক বাদে সোনালি তার রাঙা-রাজকন্যার মতো রূপ নিয়ে আমাদের ইশকুল থেকে হারিয়ে গেল। যারা যারা ইশকুল থেকে হারিয়ে গিয়েছিল— জেনেট, জলি আর সোনালি— এই তিনজনকে আমি জীবনভর খুঁজে ফিরেছি। সোনালিকে মনে রেখেছিলাম, তার অদ্ভুত বিষাদিত অথচ সরল হাসির জন্যে। মনে রেখেছিলাম, তার মোটোসোটা দুই বিনুনির জন্য।

আর কলেজের পর হারিয়ে গিয়েছিল আমার দুই বন্ধু নাজরীন আর কানিজ। আমি এদের দুজনকেও অনেক খুঁজেছি।

বহু বছর বাদে আমি নাজরীনকে খুঁজে পেয়েছিলাম ফেসবুকের কল্যাণে। আর সোনালিকে খুঁজে পেয়েছি নাজরীনের কল্যাণে। জলিকে আর জেনেটকে আজ অব্দি খুঁজে ফিরি আমি! জানিনা ইহজীবনে তাদের আর খুঁজে পাব কিনা? তাদের সাথে আমার আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা?

কানিজের সন্ধান পেয়েছি,কিন্তু ওর সাথে আমার আজও দেখা হয় নাই। অদেখাও কিন্তু একধরনের মৃত্যু। মৃত্যুই! মরে গেলে যেমন আর দেখা হয় না, হারিয়ে গেলেও আর তো দেখা হয় না। সবই চলে যায় কুয়াশা-পর্দার আড়ালে। আমিও চলে এসেছি জেনেট ও জলিকে হারিয়ে ঘন কুয়াশার ঘেরাটোপে। হয়তো এই কুয়াশাচ্ছন্ন পথে হেঁটে হেঁটে একদিন জীবনের বাকি পথও ফুরিয়ে যাবে! আমার সাথে হয়তো আর দেখা হবে না জেনেটের কিংবা জলির। যারা দুজনেই আমার বালিকা-মনে বহু যত্নে মায়াবৃক্ষের বীজ বুনে দিয়ে চলে গিয়েছিল!

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।