পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

কেন হয়েছিল শুরু
হবে যদি অবসান?

মেয়েটির মুখ যতোটা স্পষ্ট মনে আছে, তার নামটা আমি ততোটাই ভুলে গিয়েছি।  ন্যাড়া করে দেয়ার পর সদ্য-গজানো এক/দেড়-ইঞ্চি চুল ছিল তার  মাথায়। কালো কুচুকুচে চুল! প্রথম দিকে স্কার্ফ জড়িয়ে আসত। চুল সামান্য সামান্য বড় হওয়ার পরে স্কার্ফ পরা ছেড়ে দিয়েছিল। খুব বেশি চপল ছিল না সে। অথচ আমি ছিলাম একেবারে তার উলটা প্রকৃতির! আমি ছিলাম দুষ্টের শিরোমণি, লংকার রাজা টাইপ। হই-চই করে ক্লাস মাতিয়ে রাখতাম। কিন্তু তার সাথে আমার খুব বনিবনা হয়ে গিয়েছিল। আমি সদা-বাচাল বিধায় আমার একটু শান্ত-স্বভাবের মানুষ ভালো লাগে।

আমি সারাক্ষণই নানান দুষ্টমি করে বেড়াতাম বলে ক্লাসের অনেকেই আমাকে খামাখাই ভালোবাসত। পছন্দ করত। অনেকেই হয়তো করত না। কে বা কারা আমায় অপছন্দ করত, সেসব দেখার মতো বা বুঝার মতো টাইম আমার ছিলনা। আমি যদি সেসবই দেখব তাহলে ক্লাসে গল্পের বই পড়বে কে? টিচারের হাতে ধরা খেয়ে ক্লাসের পুরো টাইম দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি ভোগ করবে কে? অথবা পাঠ্যবইয়ের নিচ থেকে গল্পের বই কেড়ে নিয়ে টিচার চলে গেলে কাঁদবে কে?

আহা রে জীবন! এখন এইগুলি ভাবতে গেলে চোখ উপচিয়ে জল নামে।

সামান্য বড় ক্লাসে ওঠার পরে ইংরেজি সেকেন্ড পেপারের টিচার পান্নাআপা অকারণেই আমার উপর ঝাল ঝাড়তেন। আমিও সেসব মনে রেখেছি। আমার ইশকুল বন্ধুরাও মনে রেখেছে। আমাকে খামাখাই তিরস্কার করতেন!

এ্যাই মেয়ে,  এ্যাই মেয়ে চোখে কাজল দিয়ে আসছ ক্যান?

আপা, আমি তো কাজল দেই নাই।

দাও নাই, না? তুমি তো ভ্রূতেও কাজল দিয়া আসছ?

না, আপা আমি ভ্রূতেও কাজল দেই নাই।

আবার মিথ্যা বলে! আবার মুখে মুখে কথা বলে। দাঁড়াও, দাঁড়াও— বলছি। সারা ক্লাস দাঁড়িয়ে থাকবে তুমি।

আমার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় জল ঝরে পড়ত। আমি আপাকে কীভাবে বুঝাই ,আমি কিচ্ছু সাজগোজ করি নাই। সাজগোজ করলে আব্বা পিটিয়ে আমার পিঠের চামড়া তুলে নেবে। এই চোখের কাজল বিধাতাই নিজ হাতে পরিয়ে আমায় পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই ভ্রূ তিনিই এঁকে দিয়েছেন স্বহস্তে।

কোনো কোনোদিন বউচি খেলে ঠোঁট-চোখ লাল করে ক্লাসে এলে পান্না আপা একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ত—

আজ দেখি লিপস্টিক মেখেও এসেছ? এই দাঁড়াও, সারা ক্লাস দাঁড়িয়ে থাকবে। পড়াশুনার নামে নাই সাজগোজের বাহার ষোলআনা!

পান্না আপার উগ্র-মেজাজের সাথে পেরে ওঠা আমার কম্ম ছিল না। তিনি নিজেও ছিলেন অত্যন্ত রূপবতী। তারও ছিল গাঙচিলের পাখনার মতো বাঁকানো ভ্রূ। হলুদাভ গায়ের রঙ। সেসব থাকা সত্ত্বেও তিনি আমার উপর চড়াও হতেন। হতেনই। উনি কেন যেন আমাকে দুই-চক্ষেই দেখতে পারতেন না। আমি যে চোখে কখনও কাজল দিতাম না, ভ্রূতে কোনোদিনই কিছু না— সে কথা উনাকে কে বিশ্বাস করাবে?

আমার বন্ধুরা মন খারাপ করে আমার নাজেহাল হওয়া দেখত। তাদেরও পান্নাআপার ঝাঁজের কাছে মুখ খোলার উপায় ছিল না। সায়মা একদিন পান্নাআপার ক্লাসে আমাকে অযথা বকাবাহ্যির প্রতিবাদ করে বসল। কারণ মুখের উপর সত্য বলার মতো চওড়া-বুকের-পাটা সায়মা ছাড়া আর কারো তেমন ছিল না।

সায়মা উঠে দাঁড়িয়ে বলল—

আপা ও তো কাজল দেয়নি, ভ্রূও আঁকে নাই, ওর চোখ আর ভ্রূ এমনিতেই ঘন আর কুচকুচে কালো। দেখে মনে হয় ও কাজল দিয়ে এসেছে!

তুমারে কিতা সাক্ষী মানছি নি? তুমারে কিতা মাততে কইছি নি? অত কতা বলছ ক্যান? তুমিও দাঁড়িয়ে থাকো। ক্লাসের সারা টাইম দুইজনেই দাঁড়িয়ে থাকো।

আমরা দুইজন মুখ নত করে পুরো ক্লাসের টাইম দাঁড়িয়ে রইলাম।

[আমি আজও আমার সাথে পান্নাআপার অকারণ দুর্ব্যবহারের কারণ খুঁজে ফিরি, কিন্তু নিজের সেরকম কোনো গলতি খুঁজে পাইনা। পরবর্তিতে নিজের পরিবারের অনেকের দুর্ব্যবহার দেখেই বিস্মিত হয়েছি। আজও অনেকের দুর্ব্যবহারেই বিস্মিত হই, আর ঠিক আগের মতোই চোখ জলে ভরে যায়]

যার কথা বলছিলাম, সে-ও ছিল চিনির পুতলের মতো ধবধবে-শাদা। কাজল-কালো-ভ্রূ আর দিঘির টলটলে জলের মতো স্বচ্ছ-আঁখি তারও ছিল। তারও ছিল গোলাপি অধর। একেবারে গোলাপ ফুটে থাকা মুখশ্রী। কিন্তু সেই মুখ ছিল বড় বেশি বিষণ্ণ। কেন তা আমি কোনোদিন জানতে চাই নি। আমার আর জানার সুযোগও হয় নি।

সে আমায় বলেছিল তার বাবা ইঞ্জিনিয়ার। কোনো এক টিলার উপর বা অন্য কোথাও হয়তো ছিল তাদের বাংলো ধরণের বাসাটা। সে ইশকুলে আসত একটা জীপগাড়িতে চড়ে। পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে। টিফিন পিরিয়ডে আমার সাথে মেঘশিরিষের তলায় হেঁটে বেড়াত। তখন সে আমার হাত আলতো করে ধরে রাখত। তার মুঠোর ভেতর আমার হাত ঘেমে উঠত। কোনো কোনোদিন সে আর আমি মিলে মালাই-আইস্ক্রীম কিনে খেতাম আটআনা দিয়ে। আইস্ক্রীমের মাথায় লাগানো থাকত দুধের পুরু সরের মালাই। আমরা ধীরে ধীরে তা কামড়ে খেতে খেতে পাকা রাস্তার উপর পায়চারী করতাম।

সে আমাদের ক্লাসে অনেক পরে এসে ভর্তি হয়েছিল বলে তার রোল নাম্বার ছিল সকলের পেছনে। তাকে  বসতে হতো একদম লাস্ট বেঞ্চে। আমি বসতাম একদম ফার্স্ট বেঞ্চে। কিন্তু টিফিনের ঘন্টা বাজলে দুইজনেই একসাথে বসতাম বা হাঁটতাম। দুজনে কথা বলতাম। আমিই বেশি বলতাম আর সে বিষণ্ণ মুখ করে চুপচাপ শুনে যেতো। কী এমন বেদনা ছিল তার? অইটুকু বয়সেই এত গম্ভীর আর বিষণ্ণ সে কেন ছিল? জানা হয় নাই আমার। জানা হলো না আর কোনোদিন!

তার ব্যাগের ভেতর ফোল্ড করে রাখা ছিল একটা বাহারি-রঙিন-ছাতা। আমরা যাকে বলতাম ‘লণ্ডনি-ছাতা’। একদিন ঝুম বৃষ্টি এলে সে আর আমি সেই রঙিন ছাতার তলায় দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ ভিজলাম। বৃষ্টি আরও ঝেঁপে নামলে সেই ছাতা মাথায় দিয়ে আমরা মাঠময় চক্কর দিলাম। জলে ডুবন্ত দূর্বাঘাসের ডগা-মাথা মাড়িয়ে দিলাম। আমাদের পায়ের পাতা জলে ভিজতে ভিজতে ফ্যাঁকাসে হয়ে উঠল। সাইন্স ল্যাবরেটরির সামনে দিয়ে জল ছিটিয়ে ছপছপ করে হেঁটে বেড়ালাম। আমাদের অতিরিক্ত ফর্সা পা দুটো আরও বেশি ফর্সা দেখাতে লাগলে পান্না জোরে জোরে বলল—

পদ্ম পা!

আমরা উত্তর দিলাম—

বলছে তোরে?

পান্না ফের বলল—

ইস! তোদের পা কী সুন্দর?

আমরা তখন আরও অনেক ঘন-বৃষ্টির ভেতর ছাতা ফুটিয়ে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে রামগুয়া গাছগুলির নিচে গিয়ে দেখলাম, আমরা দুজনই ভিজে চপচপে হয়ে গিয়েছি। আমাদের ইশকুল ইউনিফরম, কোমরে কাপড়ের বেল্ট সবই ভিজে একাকার হয়ে আছে।

বাসায় ফেরার পর আমাদের দুইজনেরই হাঁচি-কাশির সংগে জ্বরের আলামত দেখা দিলো। কিন্তু আমরা পাত্তা না দিয়ে পরদিনই ফের ইশকুলে এলাম! আর দুজনে হাত ধরাধরি করে বহুক্ষণ হেঁটে বেড়ালাম। উপরে তাকিয়ে দেখলাম মেঘশিরিষের গাছটা গোলাপি ফুলে ছেয়ে আছে।

একদিন সে হঠাৎ করে গম্ভীর স্বরে বলল—

আমি আগামীকাল সকালে সিলেট ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমার আব্বা বদলি হয়ে গিয়েছে। আমরা এখন থেকে রাজশাহী থাকব।

শুনে আমি চমকে উঠলাম। ও যে চলে যাচ্ছে তা আমায় আগে জানালো না ক্যান?

আমার গলা থেকে কান্না উঠে আসতে চাইলে আমি নিজেকে সামলে নিলাম। ওর সামনে কাঁদা যাবে না। আমরা শেষবারের মতো হাত ধরাধরি করে মাঠময় ঘুরে বেড়ালাম। ছুটির পরে সে এসে আমার হাত ধরে বলল—

আমি তাহলে যাই। আমাদের আর দেখা হবে না।

বলেই আমার ব্যাগ খুলে কী যেন দেখল! আমি তেমন খেয়াল করলাম না। সে জীপ গাড়িতে উঠে চলে যাওয়ার পরে আমি রিক্সা নিয়ে বাসায় এলাম। সে তার কোনো ঠিকানা আমার কাছে রেখে যায় নাই!

রাতে ব্যাগ ঝেড়ে পরদিনের রুটিন অনুযায়ী বইখাতা গুছাতে গুছাতে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম—

আমার বিছানার উপর কয়েক জোড়া বিদেশী হেয়ারক্লিপ পড়ে আছে! নয়ন জুড়ানো তাদের চেহারা। সোনালি পাতের উপর গোলাপি, কমলা, নীল রঙের ক্রিস্টাল বসানো। সরু, মোটা নানারকমের ক্লিপ! সে আমাকে উপহার দিয়ে গিয়েছে! কিন্তু সে আমাকে বলেও নি যে সে আজই চলে যাচ্ছে!

আমি তার নাম ভুলে গিয়েছি এতদিনে। তার নাম কি ছিল জলি? নাকি জুলি? কিংবা মলি বা মনি? এতদিন বাদে তার নাম আমার আর স্মরণে নাই। কিন্তু তাকে আমি সবসময়ই খুঁজে বেড়াই।

যদি কোনোদিন আমার এই লেখা তোমার চোখে পড়ে তাহলে যোগাযোগ কোরো আমার সাথে। আমি তোমার সাথে আরেকবার বাদলার দিনে সবুজ ঘাসের উপর হেঁটে ছপছপ করে জল ছিটাতে চাই। লণ্ডনি-ছাতা মাথায় দিয়ে দুইজনে একসাথে মুষল বৃষ্টিতে ভিজতে চাই।

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।