পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

কলি ফুটিতে চাহে, ফোটে না
মরে লাজে, মরে ত্রাসে

আগেই বলেছি আম্মার খুব বাছবিচার ছিল অন্যদের সাথে মেলামেশার ব্যাপারে। যাকে হয়তো শাদা চোখে উন্নাসিকতাই বলা যায়। আমি যেমন হরেদরে সবার সাথেই সমান তালে মিশে যেতে পারতাম বা মিশতামও, তেমনটি পারলেও আম্মা সেটা করত না। আম্মা বরাবরই মিশত নিজের সিলেকটেড মানুষজনের সঙ্গেই। আম্মা যেমন সবার সাথে মিশতে পছন্দ করত না, তেমনি সবার বাসাতেও যেত না।  আম্মা মিশতো স্টেশন-মাস্টারের ওয়াইফের সঙ্গে। ভদ্রমহিলা ছিলেন ইয়া লম্বাচওড়া। পাঞ্জাবী নারীদের মতো বড়সড় শরীরের গড়ন। ধপধপে শাদা ছিল তাঁর গাত্রবর্ণ। মন ছিল উদার। হাহাহোহো করে হাসতেন। কিন্তু তাঁর মনে ছিল চাপা বেদনা। তিনি ছিলেন স্টেশন-মাস্টারের দ্বিতীয়-স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়াতে এই ভদ্রমহিলাকে বিয়ে করেছিলেন মাস্টার। প্রথম পক্ষের ছিল চার-পাঁচজন পুত্র-সন্তান। তাদের সর্ব-কনিষ্ঠের বয়স ছিল ১২/১৪। আম্মা ওই খালাম্মার সাথেই মন খুলে মিশত। উনিও আম্মার সাথেই সিনেমা দেখতে বা মার্কেটে যেতে পছন্দ করতেন। মন বেচাল হলেই আমাদের বাসায় এসে বিকেলের চা খেয়ে যেতেন।  আম্মাও বেড়াতে যেত উনার বাসাতে। আম্মার সঙ্গে আমিও যেতাম। স্টেশন-মাস্টারের ভার্সিটি-কলেজ-ইশকুল পড়ুয়া ছেলেরা উঁকিঝুঁকি দিয়ে যেত। কোনো কোনো বিকেলে আমি প্রথম পক্ষের কনিষ্ঠের সাথে ব্যাডমিনটন খেলতাম। বড়দের সাথে কথাবার্তা তেমন বলতাম না। উনাদের বাসায় সাহেরা নাম্নী এক হাউসকিপার ছিল। যে সংসার দেখেশুনে রাখত। রান্নাবান্নাসহ ঘরদোর গুছিয়ে রাখার কাজও সে করত। এই সাহেরা খালাম্মার অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন ছিল। খালাম্মার হঠাৎ ছোট ছোট টাকাপয়সার দরকার হলে সাহেরা এসে আম্মার কাছ থেকে চুপিচুপি ধার নিয়ে যেত। ফের ফিরিয়েও দিত সেরকমই নিঃশব্দে। খালাম্মা অত্যন্ত সৌখিন প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর সংসার ছিল বড় ও সংসারের খরচও ছিল অধিক। কিন্তু আম্মাকে আমি কোনোদিনই কারো কাছ থেকেই ধারদেনা করতে দেখি নাই। আম্মার সেসবের দরকারও পড়ত না। কারণ আব্বা তাঁর সাধ্যানুসারে আম্মাকে সবকিছু দিয়েই পূর্ণ করে রাখার চেষ্টা করত। তাছাড়া আমরা ছিলাম মাত্র দুই ভাই-বোন। আব্বার আয়ে আম্মা স্বাচ্ছন্দ্যেই গুছিয়ে চলতে পারত। আম্মার কাছ থেকে আমিও এই স্বভাব পেয়েছিলাম— আমার নিজের যা বা যতটুকুই আছে, হোক তা অল্পস্বল্প— আমরা আমাদের এই অল্প নিয়েই তুষ্ট থাকার চেষ্টা করেছি। নিজের সখ-আহলাদ মেটানোর জন্য অন্যের কাছে যখনতখন হাত পেতে চলা আমরা চিরকালই ঘেন্না করেছি।

খালাম্মার বিশাল সংসার, অজস্র লোকজন। বাসার বাউন্ডারির ভেতরেই ফুলের বাগান। ফুলবাগানের পাশ দিয়ে পাকা-রাস্তা, রাস্তার অপজিটে সব্জীর ক্ষেত। বাগানে প্রস্ফুটিত গোলাপ, দোপাটি, জিনিয়া, ডালিয়া, ঝুমকোজবা আর হাসনাহেনা। একটা বালিকা-শিউলি দ্রুত বড় হওয়ার তাড়নার সময়ের পূর্বেই প্রতি মরশুমে কিছু ফুল ঝরিয়ে দিত। সব্জীর ক্ষেতে সবুজ-লেটুসের নয়নকাড়া বিকশিত-হাসি। শীতের ফুলকপি আর লাউয়ের মাঁচান। শিমের বেগুনী-শাদাটে ফুলেদের ঝুলন-খেলা। আর বাঁধাকপির পাতার-ঘোমটা মুড়ে লাজুক ভঙ্গিতে গুটিয়ে থাকা। গ্রীষ্মে ঢেঁড়স আর তরইয়ের বাহার। করল্লা গাছের উচ্চকিত-স্বর। খালাম্মার সংসারে আরও ছিল দুইটা বিশাল বিশাল সিন্ধি-গাই। যাদের দুধের যোগান ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য! খালাম্মা আম্মাকে ছাড়া প্রায় কিছুই খেতেন না। কুমড়োফুলের বড়া থেকে শুরু করে মুষল বৃষ্টির দিনে শুঁটকি-বেগুন-কুমড়োশাকের-ঘন্ট বাটি ভরে সাহেরা দিয়ে যেত আমাদের বাসায়। আম্মাকেও দেখতাম ভুনাখিচুড়ি আর গরুর মাংস টিফিন-কেরিয়ারের ঢাকনা-বন্দী করে পাঠিয়ে দিতে। তখন আদতে এক বাসা থেকে অন্য বাসায় বাটি-ছোঁড়াছুঁড়ির অদ্ভুত এক চল ছিল। ছিল মানুষের সাথে মানুষের অকৃত্রিম আন্তরিকতা। ছিল বিশ্বাস আর বরাভয়ের এক নিশ্চিন্ত-জীবন! এখনকার মতো একে অন্যের সাথে খামাখাই এমন নোংরা প্রতিযোগিতায় কেউ লিপ্ত হতো না। বা অন্যের অনিষ্টের জন্যও কেউ-ই মুখিয়ে থাকত না। ছিল একে অপরকে নির্ভরতা দেয়ার এক অনির্বচনীয়-আনন্দ। ছিল মানুষকে বিশ্বাস করার এক দুর্দান্ত সখ্য-সময়!

এরকম দিনগুলির মাঝে খালাম্মা এসে আমাদের দুপুরের বা রাতের খাবারে শরীক হতেন। এবং একদিন তিনিও আমাকে আর আম্মাকে দুপুরের খাবারের জন্য নিমন্ত্রণ জানালেন। খালাম্মার সাথে আমারও খানিকটা খায়-খাতির জমে উঠেছিল। আম্মা-আব্বা কলোনীর অন্যান্য পরিবারদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ওই খালাম্মার সাথেই আমার একা একা সিনেমা দেখতে যাওয়া বা মার্কেটে যাওয়ার পার্মিশান দিত। তবে খালাম্মার হাতে টাকাকড়ি তেমন থাকতই না। নিজে বিবাহিত হওয়ার পরে বুঝেছিলাম, কেন খালাম্মার হাত টানাটানি থাকত! স্টেশন-মাস্টার মহাশয় হয়তো সারাক্ষণই নিজের পকেট পুলিশি-পাহারায় হেফাজত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। স্ত্রীর কোনো আলাদা সখ-আহলাদ থাকতে পারে, সেসব হয়তো তিনি আমলেই আনতেন না। কত আধুনিক স্বামীদের দেখলাম, স্ত্রীর বেলায় আঁজলা ভরে জল তোলার কাজটিই তারা বেশ পুরুষত্ব ফলিয়ে করে। কারণ আঁজলার জল আঙুলের ফাঁক গলিয়ে গড়িয়ে পড়ে গিয়ে যেটুকু ভেজাভাব থাকে, সেটুকুও স্ত্রীকে দিতে তো তাদের প্রেমিক হৃদয়ে ফাটল ধরে যায়।

খালাম্মা যখন আমাদের দাওয়াত দিলেন, তখন শরত বা হেমন্ত-কাল। এরকম ঋতুর মধ্যাহ্নেই সূর্যদেবকে বড় গরিবি-হালতে দেখা যায়। ভরদুপুরেই সূর্যের আলোতে অন্তিম সময়ের বিষাদ এসে ভর করে। তখন না-চাইলেও মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে! আমিও খানিকটা বিষাদ, খানিকটা সংকোচ পায়ে জড়িয়ে আম্মার পিছু পিছু চললাম দাওয়াত খেতে। স্টেশন-মাস্টারের বাসার এন্ট্রেন্স ছিল দুইটা। আমি আর আম্মা শর্টকাটের রাস্তাটাই বেছে নিলাম। গিয়ে দেখি এলাহী-কারবার। মাস্টারের প্রথম-পক্ষের মাতৃহীন ছেলেরা প্রায় সকলেই উপস্থিত। তাদের মাঝে বড়জন রুয়েট না কুয়েটে— কই জানি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। নব্য-ইঞ্জিনিয়ার তার কিউট-চেহারার মাঝে ভিজেবেড়াল ভাবসাব জোর করে লুকিয়ে রেখেছে। খালাম্মার মাস্টার-বেডের খাট খুলে ফেলে ঢালাও বিছানার ফরাশ পাতা হয়েছে। সেই ধপধপে চাদরের উপর বসে সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এবং অদৃষ্ট-দেবতার কূটচালে আমাকে বসতে হলো কিনা ওই কিউট-ভেজাবেড়ালের পাশে। [আজবগজব যত কারবার তো আমার সাথেই ঘটতে হবে,ঘটতই— নইলে আমার নায়িকাজীবন যে বৃথা হয়ে যেত!] এবং শুরু হলো আপ্যায়ন আর কাকে বলে? আমার প্লেটে উড়ে আসতে শুরু করলো আস্ত মুরগীর মোসাল্লাম। কাবাবের প্লেটটা আমার পাতেই উপুড় হতে শুরু করল। কিন্তু আমি তো বরাবরই স্বল্পাহারী। আমার ইচ্ছে থাকলেও মুরগীর আস্ত মোসাল্লাম খাওয়ার উপায় নাই। এবং ওই কিউটি আম্মাকেও আপ্যায়নের চূড়ান্ত করে ছাড়ল। আম্মাও বিব্রত মুখে হাত গুটিয়ে বসে রইল। কারণ এত বেশি খাওয়া আমাদের কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। শেষ পাতে জর্দা খেয়ে আমি উঠে পড়লাম।

আমাদের বালিকাবেলায়, কিশোরীবেলায়, যুবতীবেলায় একটা বিষয় ছিল, সিনেমার নায়ক বা নায়িকাদের সাথে যে কাউকে মিলিয়ে দেখা। হয়তো এটা ছিল এক ধরনের ভালোবাসার প্রকাশ। যেমন আমাকে ইশকুলের বন্ধুদের কাছ থেকে শুনতে হতো ‘শাবানার’ মতো দেখতে। এই কথা বড়চাচিমাও আমাকে বলত। এবং ওই খালাম্মাও। হিন্দি সিনেমার জোয়ারের কাল আসার পরে আমাকে শুনতে হতো ‘জুহি চাওলা’। আমি এসব শুনে বিব্রত বোধ করলেও মনে মনে নিশ্চয়ই খুশি হতাম। আচ্ছা, এক জীবনে নায়িকা হতে কে না চায় বলুন?

নেমতন্ন খেয়ে চলে আসার দিন চারেক বাদে আমি আর আম্মা গিয়েছি বিকেলের-বেড়ানি বেড়াতে। আমি ওই বাসার কনিষ্ঠের সাথে খেলছি ব্যাডমিনটন। এমন সময় ওই কিউট-ভিজেবেড়াল বাইরে থেকে বাসায় এল । তার হাতে একটা ব্যাট। কিন্তু ব্যাটে যে লাইনলের জাল নেই আমি তা খেয়াল করি নাই। মানে ব্যাটের ডাইসটা জালহীন। যা কারো মাথায় ঢুকিয়ে দিলে সে আর ছাড়া পাবে না। [ অতিরিক্ত বাংলা সিনেমা দেখার খেসারত। নায়িকাকে নায়ক ওই জালহীন ব্যাট দিয়েই আটকে দিত কিনা!]। এবং আমি যখন পেছনে সরতে সরতে ফুলবাগানের  বাঁশের বেড়ার গায়ে সেঁটে গেলাম, তখনই ব্যাটের ফাঁস আমার গলায় পড়ল!  কিউটি বলল— এইবার শাবানা!

আমি রেগে গেলেও নড়তে পারলাম না। কঠিন স্বরে বললাম ‘ব্যাট ছাড়ুন’।

সে হাতে ধরে রাখা ব্যাট ছেড়ে দিলো ঠিকই, কিন্তু চাপা স্বরে বলল—

হাসিটাও একেবারে শাবানার।

আমার খেলার পার্টনার সেই কনিষ্ঠ, বড়র পাশে দাঁড়িয়ে হো হো করে হাসতে লাগল। গলা থেকে ব্যাট খুলে নিয়ে আমি প্রচণ্ড রাগে ছুড়ে মারলাম দূরে। ব্যাট ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পড়লো ফুলবাগানে, দুই-চারটা দোপাটি ফুলের গাছকে আহত করে দিয়ে।

 

পাপড়ি রহমান

ব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।