পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

পাঠে আমার মন বসেনা
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে                       

আমার মাথার ভেতর যেন সারাক্ষণই একটা তরতাজা চিংড়িমাছ হেঁটে বেড়াত। যে চিংড়িমাছটা ছিল প্রতি বর্ষার নতুন জলে নতুন করে জন্ম নেয়া। সেরকমই  সবুজাভ-দেহ। সেরকমই অস্থির আর সরু-পা। পাগুলি দিয়ে সে আমার মাথার ভেতর মৃদু ভঙ্গিতে হেঁটে বেড়াত। এই চিংড়িমাছের বিচরণের জ্বালায় আমিও অস্থির হয়ে থাকতাম। ফলত পাঠ্য-বইয়ের পাতায় আমার কিছুতেই মন বসতো না। আমার মন পড়ে থাকত ভিউকার্ডের ব্যালেরিনা নৃত্যরত অতীব সুন্দরী মেয়েদের দিকে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার বা বুঝার চেষ্টা করতাম কোন কায়দায় তারা অনায়াসে পা-জোড়াকে অমন নান্দনিক ভঙ্গিমায় নিয়ে যেতে পারে? আমি দেখতাম চীনের প্রাচীরের ঘোরানোপ্যাচানো রূপ। ভাবতাম, ওইরকম এঁকেবেঁকে কী করে একটা দেয়াল বিভাজন ছাড়া অত দূর পৌছে যায়? আমি দেখতাম মাও সেতুংয়ের ছবি। তাঁর লাল টুকটুকে আপেলের মতো গাত্রবর্ণ। কী এক গভীর-গাম্ভীর্য ভরা তাঁর অবয়ব! দেখতাম— কিমানো পরিহিত জাপানিজ গেইশাদের মাথার উপর চুড়ো করে চুল বাঁধা আর তাদের মখমল কোমল ত্বকের জেল্লা।  রাশান বা চাইনিজ মেয়েদের আপেল তোলার দৃশ্য, ‘উদয়নের’ বর্ণিল পৃষ্ঠা জুড়ে ভেড়া চরানো যুবতীদের স্বাস্থোজ্জ্বল হাসি। দেখতাম আপেল গাছে কী করে রাশি রাশি লালবর্ণের আপেল ঝুলে থাকে? বরফের উপর স্লেজগাড়ির পিছলে চলা। দেখতাম, স্লেজ টেনে নেয়া কুকুরদের লোমে বরফের কুচি লেগে কী অপরূপ দৃশ্যেরই না জন্ম দিয়েছে! এইসবের দিকে মাথার ভেতরের অই সবুজাভ চিংড়িমাছটা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যেত। আমার কাছে তখন হোমটাস্ক হয়ে উঠত জগতের সবচাইতে মন-না-লাগা-কম্ম। চারপাশের এতসব মনোহর দৃশ্যরাজি থেকে মন সরিয়ে বইয়ের পাতায় বসানো আমার জন্য কঠিনই ছিল। কিন্তু আব্বার শাসনের ভয়ে নিয়ম করে পড়ার টেবিলে অবধারিতভাবে বসতেই হতো।

ইশকুলের পড়াশুনা চাঙে তুলে রাখলেও হররোজ ইশকুলে যেতে আমার কিন্তু ভালো লাগত। ইশকুল মানেই তো বিশাল আঙিনা। গভীর পুকুরের কালোজল। আর বন্ধুদের সাথে মচ্ছব করে বেড়ানো। বউছি, ব্যাডমিন্টন খেলা। ক্লাসমেটদের সাথে দুষ্টুমি করতে করতে হাসিতে লুটিয়ে পড়া। গেটের সামনের মালাই-আইসক্রীম। পেঁয়াজ- লংকা আর সর্ষের তেলে চানাচুর গরমভাজা। তেঁতুল-বরইয়ের আচার। ইশকুল ছিল আমার সমস্ত আনন্দের আকর। ইশকুলে আমাকে যেতেই হতো, যেতেই হবে। পড়ার সাবজেক্টের মাঝে আমি অংক আর জ্যামিতি নিয়ে ত্যক্তবিরক্ত থাকতাম। কে অত সময় নিয়ে, ধৈর্য্য ধরে শাদা কাগজের উপর হিসেব নিকেশ করে? তার চাইতে রেডিওতে নতুন বাংলা সিনেমার খবর শোনা অনেক বেশি আনন্দের। কিংবা অনুরোধের গানের আসর ‘গানের ডালিতে’ কান লাগিয়ে রাখা।

সাপ্তাহিক চিত্রালী আর পূর্বাণীর পাতা খুললে নায়িকাদের লাস্যময়ী রঙিন ছবি দেখার সাথে সাথে তাদের ঘরের খবরও অনেক জানা যায়। জানা যায় তাদের প্রেমবিরহ, গোপন অভিসার। আম্মা ‘বেগম’ পত্রিকার নিয়মিত পাঠক। আমি সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও রোববারের। বিচিত্রা ও রোববারের ফার্স্ট টু লাস্ট পাতা আমি বার কয়েক পড়ে যেতাম। আমাদের বাসায় পুরাতন কিছু ভারতীয় সাহিত্য পত্রিকা ছিল। আনন্দলোক, দেশ এরকম আরও কিছু হবে। সেগুলির প্রতিটা গল্প-উপন্যাস আমার একেবারে  ঠোঁটস্থ ছিল। গোলাম মোস্তফার ‘বিশ্বনবী’ আমি কমসে কম আট থেকে দশবার পড়েছিলাম। নতুন/পুরাতন সবকিছু পড়া হয়ে গেলে আমি এই বইটা টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করতাম। বইটা এতটাই ভালো ছিল যে, যে কোনো মহৎ উপন্যাসের সাথে এ বইকে তুলনা করা যায়। ‘বিদায় হজ্ব’ পড়ে আমি বরাবরই কেঁদে ভাসাতাম। ‘বিশ্বনবী’ ছিল করুণ রসের এক আখ্যান। এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে, আমি ওই বই খুলে শুরু থেকেই কাঁদতে শুরু করতাম। নবীজীর পিতৃমাতৃ-বিয়োগজনিত-বেদনা আমার মর্মমূল কাঁপিয়ে দিত। আহারে! একটা মানুষ— যার কীনা দুঃখ-কষ্টের শেষ নাই! যে কীনা এতকিছুর পরও শুধুমাত্র নিজের ধর্মকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

‘বিশ্বনবীর’ সাথে তাকের উপর গুছিয়ে রাখা হতো— বড়পীর সাহেবের জীবনী, রহুল কোরান, মোকছেদুল মোমিনিন, নূরানি পাঞ্জেগানা নামাজ শিক্ষা। বলাই বাহুল্য আমি এসব বইও পড়েটড়ে পুনরায় গুছিয়ে রেখে দিতাম। এসব বই পড়ার ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। এইসব বই ওপেনলিই পড়া যেত।

ইশকুল থেকে ফিরে এসে এক ইয়া লম্বা-চওড়া হজুরের কাছে আমাদের দুই ভাইবোনকে নিয়ম করে কোরান পড়তে বসতে হতো। সেইসাথে ছহি-কায়দায় নামাজের তালিমও নিতে হতো।

কিন্তু ধরাবাঁধা নিয়মের কোনো শিক্ষাই আমার কাছে আকর্ষনীয় মনে হতো না। আমার মন ছিল সদা পালাই পালাই। যে কোনো নিয়মের-দড়িই আমার কাছে ফাঁসির-দড়ি হয়ে উঠতে সময় ক্ষেপন হতো না। বইটই ফেলে আমি হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম ছাতিম গাছের পত্রবিন্যাস। দেখতাম, প্রতিটা পাতা একই ভঙ্গিতে পুস্পানুরূপ হয়ে থাকে কীভাবে? বরই গাছে কীভাবে এমন অজস্র-ফুল ঝেঁপে আসে? কাঁঠালিচাঁপার সবুজ রঙে কেমন করে সর্ষেফুলের হলুদ ঢুকে পড়ে? আর চারদিক সেই পক্ব-ফুলের মৌ-মৌ খুশবুতে ভরে যায়।

আমি দেখতাম, আমাদের নারিকেল গাছে ঝুলে থাকা এন্তার ডাবের ঝোপা। আমড়া গাছের সমস্ত টক পাতা খেয়ে খেয়ে বিছাদের পুরুষ্ঠ লালচে-শরীর।

এসবের মাঝেই আমি একদিন কিনা রয়্যাল-ফ্যামিলিতে ঢুকে গেলাম। ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথের যাবতীয় কিছু পড়েটড়ে জেনে রাখা আমার হবি হয়ে উঠল। আমি প্রিন্সচার্লসকে ও প্রিন্সএণ্ড্রুকে চিনলাম। এঁদের অনুসরণ করতে করতে প্রিন্সেসডায়ানার সাক্ষাত পেয়ে গেলাম। সেই থেকে আমি তাঁর ডাইহার্ড-ফ্যান। ডায়ানার হেয়ারস্টাইল থেকে শুরু করে এক্সেসরিজের দিকেও আমার চোখ থাকত অপলক।

চার্লস-ডায়নার সেই রূপকথার বিয়ে আমি টিভিতে দেখলাম কয়েক-ঘন্টা ব্যাপি। ডায়ানার বিয়ের গাউন কী পরিমান মুক্তা খচিত হয়েছিল তাও আমি আগ্রহ নিয়ে জেনেছিলাম। এবং রয়্যাল-ফ্যামিলির নারীদের অনুসরণ করে আমারও মুক্তা-প্রীতি জন্মেছিল। [হা ভগবান, ওই মূল্যবান রত্নরাজি কেনার সাধ্য আমার ইহজীবনে হলো না! তাতে কী? দুধের সাধ ঘোলেও মেটানো যায়। সেক্ষেত্রে চীনের নকল মুক্তা ছিল আমার ভরসা। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েও কী লাখটাকার স্বপ্ন দেখা যায় না?]

এবং আমার ভাগ্য ছিল প্রসন্ন— আমি চার্লস আর ডায়ানার সেই রূপকথার জাকজমক সম্পন্ন বিবাহের ব্রৌশুয়া আমি হাতে পেয়েছিলাম। [এটা ছিল আসল। এবং আসলই]। আমার এক ক্লাসমেটের বাবা থাকত ব্রিটেনে। উনিই এনে দিয়েছিলেন উনার কন্যাকে। আর উনার কন্যা আমাকে দেখানোর জন্য তা ইশকুলে নিয়ে এসেছিল। আমি যে ডায়ানাকে সদা ফলো করি এটা তাকে আমি বলেছিলাম। এবং সেই অলৌকিক ব্রৌশুয়া আমি টিফিন আওয়ারে ক্লাসের একদম পেছনের বেঞ্চে বসে লুকিয়েচুরিয়ে দেখেছিলাম। [মেয়েটির নাম ভুলে গিয়েছি আজ]। সেই ব্রৌশুয়াতে আমি ডায়ানার যে রূপ দেখেছিলাম তা ডিমেনশিয়া হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিস্মৃত হওয়ার উপায় নাই। আহা! কী মরি মরি তাঁর আঁখিযুগল! যেন স্বচ্ছ কোনো নীল কাঁচ আলতো করে বসে আছে অক্ষিকোটরে! তাঁর সোনালি চুলের রাশি কপালের অর্ধেক ঢেকে সুবিন্যস্তভাবে নেমে গিয়েছে কানের পেছনে। তাঁর কর্ণের বহুমূল্যবান হীরকের ঝিলিক মুখাবয়বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে! দাঁতের সারিতেও লেগে আছে ওই হীরকের অকৃত্রিম-ঔজ্জ্বল্য! আর মাথায় চমৎকার এক ক্রাউন। যা ডায়ানার ঘন চুলের অরণ্যে হারাতে হারাতেও মাথা উঁচিয়ে আছে। যেন সে ঘোষণা করছে নতুন রানীর রুচির আভরণটিকে ।

আমি নায়িকা শাবানা বা ববিতার ফ্যান কোনোদিনই ছিলাম না, ছিলাম প্রিন্সেস ডায়ানার ফ্যান। পরবর্তীতে ফ্যান ছিলাম বোম্বের নায়িকা শাবানা আজমী ও নায়িকা রেখার। ফ্যান ছিলাম সোফিয়া লরেন ও লিজ টেলরের।

পৃথিবীর নানান কিছু নিয়ে মেতে থাকা আমি শুধুমাত্র পাঠ্য-বইয়ে তেমন করে মনোনিবেশ করতে পারি নাই কোনোদিনই। বইয়ের পড়া জপজপ করে মুখস্থ করে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিও নিতে পারি নাই। পরীক্ষার ঠিক দুই কি চারদিন পূর্বে কোনোমতে ফাঁকিজুঁকি দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টিয়েপালটিয়ে দেখেটেখে পরীক্ষার হলে গিয়েছি। ফলত রেজাল্ট যা হবার তাই হয়েছে। অবশ্য প্রথম তিনজনের মাঝে থাকতে না-পেরে আমার কোনোদিন মন খারাপ হয়েছে তেমনটাও কিন্তু নয়।

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।