অমৃতা প্রীতমের কবিতা

যখনই তার সাথে দেখা হয়
প্রায়শই এক অলিখিত কবিতা বলে মনে হয়
এই অলেখা কবিতাকে
আমি কয়েকবার লিখে ফেলেছি
কিন্তু সে অলিখিতই রয়ে যায়

অমৃতা প্রীতম— এক নিবিড় প্রেমের কবি, এক টান টান সাহসের নাম। মূলত পাঞ্জাবী ও হিন্দী ভাষায় লিখেছেন তিনি। পাঞ্জাবী সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য নারী লেখক হিসেবে উল্লেখ করা হয় তাঁর নাম। তাঁর সৃষ্টি জনপ্রিয় ভারত ও পাকিস্থানের সাহিত্য মহলে। নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং হচ্ছে তা। তাঁর কবিতা পাঠের পর মনে হয়, তিনি প্রকৃতই যেন তাঁর কবিতার মতো—মনে হয় লেখা হয়ে যাওয়া কোনো কবিতা, আসলে চিরকাল অলিখিতই থেকে গেছেন তিনি।

বাবা শিখ ধর্মযাজক ও কবি কারতার সিং হিতকারী এবং মা স্কুল শিক্ষয়িত্রী রাজ বিবি’র সুযোগ্য কন্যা কবি অমৃতা কাউর। জন্ম ৩১ আগস্ট ১৯১৯শে, চলে যাওয়া ৩১ অক্টোবর ২০০৫-এ। লাহোরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী প্রীতম সিংএর সাথে বিবাহসূত্রে দুই সন্তানের জননী তিনি। পরে এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে নিজের শর্তে বেঁচেছেন বাকি জীবন তাঁর কাজের ভেতর দিয়ে। লিখেছেন দেশভাগ, নারীর অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন নিয়ে কবিতা, উপন্যাস, গল্প, আত্মজীবনী। ভরপুর বেঁচেছেন প্রেমের সাথে। ভূষিত হয়েছেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার সহ আরো বহু পুরস্কার, সম্মাননায়। তাঁকে স্মরণ করি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। অমৃতা প্রীতমের কবিতাজগতে পাঠককে আমন্ত্রণ জানাই।

কুফরি

আজ আমি একটা পৃথিবী বেচলাম
আর একটা দিন কিনে আনলাম
আমি কুফরির কথা বললাম

স্বপ্নের একটা থান কাপড় ছিল
এক গজ কাপড় ছিঁড়ে নিলাম
আর বয়সের জামা সেলাই করলাম

আজ আমি আকাশের ঘড়া থেকে
মেঘের ঢাকনা সরালাম
আর এক চুমুক জ্যোৎস্না পান করলাম

এই যে একটু সময় আমি
মৃত্যুর কাছ থেকে ধার নিয়েছি
গানে গানে তার দাম চুকিয়ে দেবো।

একটি সাক্ষাৎ

আমি চুপ শান্ত আর অটল দাঁড়িয়ে ছিলাম
শুধু পাশের বইতে থাকা সমুদ্রে ঝড় ছিল
তারপর সমুদ্রের না জানি কী খেয়াল হলো
ঝড়টাকে একটা পুঁটুলি বেঁধে আমার হাতে দিলো
আর হেসে সরে গেল একটু দূরে
হয়রান হলাম কিন্তু এই আশ্চর্য বিষয়টি গ্রহণও করলাম
জানতাম এই রকম ঘটনা শতাব্দীতে একবার ঘটে
লক্ষ ভাবনা মাথায় চমকাতে লাগল
কিন্তু দাঁড়িয়েছিলাম এই ভেবে যে
ঝড়ের পুঁটুলি নিয়ে কী করে আমার শহরে যাবো
আমার শহরের সমস্ত গলি সরু
আমার শহরের সমস্ত ছাদ নিচু
আমার শহরের সমস্ত দেয়াল নোনা ধরা
ভাবলাম যদি কোথাও তোমার দেখা পাই
তো সমুদ্রের মত একে বুকের উপর রেখে
আমরা দুটো কিনারা হয়ে হেসে উঠতে পারব
আর নিচু ছাদ আর সরু গলির শহরে বাস করতে পারব
কিন্তু পুরো দুপুরটাই তোমাকে খুঁজতে কেটে গেল
আর নিজের আগুন নিজেই পান করলাম আমি
আমি একাই কিনার হয়ে কিনারাকে ভাঙলাম
আর যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল
সমুদ্রের ঝড়কে আমি সমুদ্রে ফিরিয়ে দিলাম
এখন রাত নেমে এলে আমি তোমার দেখা পেলাম
তুমিও উদাস চুপ শান্ত আর অটল ছিলে
আমিও উদাস চুপ শান্ত আর অটল ‍ছিলাম
শুধু দূরে বহতা সমুদ্রের মাঝে এক ঝড় ছিল।

আমি তোমার সঙ্গে আবার মিলব

আমি তোমার সঙ্গে আবার মিলব
কোথায়, কীভাবে, জানা নেই
হয়তো তোমার কল্পনার প্রেরণা হয়ে
ক্যানভাসে ভর করব
অথবা তোমার আঁকা ছবির এক রহস্যময়
রেখা হয়ে চুপচাপ তোমাকে দেখে যাব
আমি তোমার সঙ্গে আবার মিলব

হয়তো সূর্যের এক আলোকণা হয়ে
তোমার রঙে মিশে যেতে থাকব
হয়তো রঙের আলিঙ্গন হয়ে
তোমার ক্যানভাসে ছড়িয়ে যাব
জানা নেই, কোথায় কীভাবে
কিন্তু তোমার সঙ্গে আমি ঠিকই মিলব

হয়তো এক দৃশ্য হয়ে
যেভাবে ঝরনা থেকে পানি ছলকে আসে
সেই জলবিন্দু তোমার শরীরে মেখে দেব
আর এক শীতল অনুভব হয়ে
লেগে থাকব তোমার বুকে
আমি তো আর কিছু জানি না
শুধু এটুকু জানি
সময় যা কিছু করুক
এই জীবন আমার সাথেই চলে যাবে
দেহ ক্ষয়ে গেলে সব কিছু শেষ হয়ে যায়
কিন্তু স্মৃতির সুতো
মহাজগতের মুহূর্তের মতো
আমি সেই মুহূর্তকে বেছে নেব
সেই সুতোকেই জড়িয়ে নেব আমি
আমি তোমার সঙ্গে আবার মিলব
কোথায় কীভাবে জানা নেই

আমি তোমার সঙ্গে আবার মিলব!!

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।