সেলিম জাহান: আমার মায়েরা

আজ মাতৃ দিবস— যেখানে যত মা’ আছেন, তাঁদের মায়াময় স্বীকৃতি দেয়ার দিন। জানি, অনেকেই এ জাতীয় দিনচিহ্নিতকরণ পছন্দ করেন না, তাঁদের ভাষ্য হচ্ছে, সারাটা বছরের সব দিনই মায়ের ভালেবাসাকে স্বীকার করার দিন। সেই বৃহত্তর চালচিত্রকে একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে সেই স্বীকৃতিটিকে খাটো করা হয়। তাঁদের যুক্তি শক্ত নিঃসন্দেহে, কিন্তু অকাট্য নয়। আমি মনে করি, মাতৃস্নেহ ও কর্মের ভাস্বরতা একটি পূর্বচিহ্নিত দিনে উদযাপন শুধুমাত্র প্রতীকি নয়, বরং এর মাধ্যমে একটি বিশেষ দিনে পৃথিবীর সব মাতৃমূর্তি বিশেষ আচরণে একটি বিশেষ ভালোবাসা প্রদর্শনের মাধ্যমে আমরা মা’দের বিশেষ ভূমিকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি। এর মূল্য কম নয়।

সারা জীবনে ঘরে-বাইরে, দেশে বিদেশে বহু মা’কে আমি দেখেছি। তরুণী মা’কে দেখেছি, দেখেছি বৃদ্ধা মা’কেও, শহুরে মা’কে দেখেছি, দেখেছি পল্লী মাতাকেও। উচ্চশিক্ষিত মাতৃমূর্তি যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি নিরক্ষর মাতাকেও। রাজপ্রাসাদে বহু মানুষ পরিবৃত রানীমাতাকে যেমন প্রত্যক্ষ করেছি, তেমনি নিরীক্ষণ করেছি পর্ণ কুটিরে অনূঢ়া মা’কেও।

সবকিছুর পরে ক’টা জিনিষ খুব পরিস্কারভাবে বুঝেছি। প্রথমত: জগতের সব মা’য়ের মাঝেই একটি অভিন্ন অনন্য রূপ আছে। পৃথিবীর সব মা’ই মা। দ্বিতীয়ত: সন্তানের জন্য মাতৃস্নেহের কোন তুলনা নেই। সে বাৎসল্য দ্ব্যর্থহীন ও স্বার্থহীন। পিতৃস্নেহও তার সঙ্গে তুলনীয় নয়। তৃতীয়ত: পৃথিবীর সব মা’ই অসাধারণ। তবে অসাধারণ মা হওয়ার জন্যে অসাধারণ নারী হওয়ার প্রয়োজন নেই। নারীত্বের অসাধারণত্ব আর মাতৃত্বের অসাধারণ দু’টো ভিন্ন জিনিস। অসাধারণ নারী মাত্রেই অসাধারণ মা হয় না।

পৃথিবীর নানান জায়গায় কতভাবে যে মাতৃমূর্তিকে দেখেছি। কারাকাসের ফুটপাতে রুক্ষ চুলের ছিন্নবসনা যে মা তাঁর শিশুপুত্রকে খেলা দিচ্ছিল, তাঁকে আমার সে মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মাতা বলে মনে হচ্ছিল। কিয়েভের সে বর্ষণমুখর রাতের কথা কি করে ভুলি যেখানে এক তরুণী মাতা নিজে পুরো জলসিক্ত হয়ে তাঁর তিনটি শিশুসন্তানকে বর্ষার জলধারা থেকে বাঁচাবার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল তাঁর গায়ের জীর্ণ কোট আর ভাঙ্গা এক ছাতা দিয়ে। এখনও তো শিউরে উঠে চোখ বুঁজে ফেলি যখন ঐ ছবিটার কথা মনে হয় – যেখানে শ্রমিক মা’টি একটি কাপড় দিয়ে তাঁর শিশু সন্তানটিকে পিঠে ঝুলিয়ে নিয়েছে আর তাঁর মাথার ওপরে এক পাঁজা ইট।

আমার ব্যক্তিজীবনে বহু মায়ের স্নেহ-মমতা ভালোবাসা পেয়েছি। আমার নিজের মা’তো আছেনই, আছে আমার বোনও, সেও একজন জননী। আছে আমাদের মেয়েদের প্রয়াত মাতা, যার চোখের মনি ছিল আমাদের দু’কন্যা। তাদের মা’ই তাদের মানুষ করেছে, আমার ভূমিকা ছিল রাজমিস্ত্রির সঙ্গের যোগালীর। ফলে আমি ‘মেয়ের বাবা’ হলেও তারা কিন্তু ‘বাবার মেয়ে’ হয় নি। তারা তাদের ‘মায়েরই মেয়ে’। আমাদের দু’কন্যার একজন মা হয়েছে -ভারী লক্ষ্মী ‘মা’ আরেকজনের মাতৃমূর্তিও আমাকে মুগ্ধ করে। শামীমকে তাঁর ছেলে-মেয়েরা ‘অসাধারণ মা’ বলে। ‘অসাধারণ মা’ সে নিশ্চয়ই, কিন্তু শামীম এক ‘অসাধারণ মানুষও’ বটে। ঈশিতার মাতৃমূর্তিও আমাকে মুগ্ধ করে। এই সব মায়েদের মায়ায় আমি সিক্ত নিত্যদিন।

আমাদের কন্যাদের মা’য়ের প্রয়াণের পরে নিত্য চেষ্টা করি তাদেরকে মায়ের স্নেহে ভরিয়ে দিতে। না, সেটা সম্ভব নয়, পিতৃস্নেহ কখনোই মায়ের অভাব পূরণ করতে পারে না। তবে তারা কিন্তু আমার মা’য়ের অভাব পূর্ণ করেছে। তারাই আমাকে মায়া, মমতা আর মাতৃস্নেহে ভরিয়ে রাখে। দু’জনেই আমাকে দেখে রাখে—উপদেশ দেয়, সতর্ক করে, বকাও দেয় প্রয়োজন হলে। জীবনের বহু শিক্ষা তো তাদেরই কাছে। আগে রাস্তায় আমি তাদের হাত ধরতাম, এখন তারা আমার হাত ধরে। কি করে নিজের যত্ন নিতে হবে, তা আমাকে বলে দেয়। চলাফেরায় স্হির হতে সতর্ক করে। রাত জাগলে বকা খাই। ঈশিতা শামীমের ‘মাতা’ আর আমার ‘শশ্রুমাতার’ দায়িত্ব পালন করে। মা নেই, তাই কন্যারাই আমার জননী। তাঁদেরকেই আমি ‘মা’ ডাকি।

আজকের মাতৃদিবসে পৃথিবীর সব মা’কে অভিনন্দন জানাই, কৃতজ্ঞতা তাঁদের প্রতি, নমিত হই তাঁদের কাছে। মা বলে তাঁরা যত কষ্ট সয়েছেন, স্বার্থত্যাগ করেছেন; নারী বলে তাঁরা যত বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, যত গঞ্জনা সয়েছেন, যত নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন, তার জন্যে আমি সারা পুরুষজাতির পক্ষ থেকে তাঁদের সবার কাছে ক্ষমা চাইছি। এ সব লিখতে লিখতে আমার বহু বছর আগে চলে যাওয়া মা’কে মনে করার চেষ্টা করছি,

‘মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে শোবার ঘরের কোণে,
জানালা দিয়ে তাকাই দূরে নীল আকাশের দিকে—
মনে হয় মা আমার পানে চাইছে অনিমিখে।
চোখের তারায় ধরে রেখে দেখত আমায় চেয়ে,
সে চাউনি রেখে গেছে সারা আকাশ ছেয়ে।’

 

সেলিম জাহান

(সেলিম জাহান ভূতপূর্ব পরিচালক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।)
ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।