আবদুর রব
[হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর বিখ্যাত সৃষ্টি ‘দ্য অরিজিন্স অফ হাফ-হিউম্যান, হাফ-অ্যানিম্যাল ক্রিচার্স’ (The Origins of Half-Human, Half-Animal Creatures)-এর সেই অদ্ভুত প্রাণীদের নিয়ে লেখা আমার চারটি (সেন্টর, মিনোটর, সাইরেন, স্ফিংস) কবিতার একটি সিরিজ।]
সেন্টর
অর্ধেক অশ্বশক্তি, অর্ধেক মানুষের নিউরোসিস—
জ্যামিতি ভেঙে গড়ে ওঠা এক অদ্ভুত কোলাজ।
রাজার কামনাবাসনা থেকে জন্ম,
অথচ এখন ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা এক পথচারী।
সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে সে দেখল সেখানে
কথা বলা নিষেধ সবকিছু নীরবতা আর
ইঙ্গিতে প্রকাশ করা হয়।
তার খুরগুলো যখন কিবোর্ডের কংক্রিটে আছড়ে পড়ে,
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে বিভাজনের সূত্র।
মনে আছে, স্প্যানিশ অশ্বারোহী যখন সেই
ঘোড়া থেকে পড়ে যায়,
সভ্যতার মায়াজালও দুই ভাগে ভাগ হয়।
সে কোনো মিথলজি নয়, সে হলো
প্রযুক্তির সাথে মাংসের প্রথম হাইব্রিড চুক্তি।
২. মিনোটর
বাড়িটি অন্তহীন এক মেগাসিটির গোলকধাঁধা,
মানুষ সেখানে ঢুকে নিজের ঠিকানা ভুলে যায়।
আর তার কেন্দ্রে বসে আছে
কিউবিক মনস্টার—মিনোটর।
সে কোনো ষাঁড়ের মাথাওয়ালা মানুষ নয়,
কংক্রিট জটলার একাকী বাসিন্দা, এক টেক্সচুয়াল গ্যাপ,
সেখানে শূন্যস্থানগুলোই মানুষকে সক্রিয় করে তোলে।
নির্মাতা ইচ্ছা করে সবকিছু বলে দেননি,
কিছু জায়গা ফাঁকা রেখেছেন— যাতে মানুষ তার
নিজস্ব ট্র্যাজেডি, স্মৃতি আর নিঃসঙ্গতা
বসাতে পারে সেখানে।
থিসিউসের হাতে আজ কোনো সুতোর দলা নেই,
তার জিপিএস ট্র্যাকার হারিয়ে গেছে,
নেটওয়ার্কহীন করিডোরে।
মিনোটর হাসে; কারণ সে জানে, বেকেটের
নাটকের সংলাপের ব্যর্থতাই তার ভাষা,
এই না-বলা কথাগুলোর ফাঁকেই
লুকিয়ে আছে মেগাসিটির আসল ঠিকানা।
৩. সাইরেন
তারা কখনো সোনালী ডানার পাখি,
কখনো রুপোলি মাছের লেজ— বিজ্ঞাপনের
বিলবোর্ডের মতো প্রতিনিয়ত বদলে যায় তাদের অবয়ব।
স্ক্রিন থেকে ভেসে আসে তাদের মায়াবী সুর—
চিহ্ন আর তথ্যের অতিরিক্ততা, অর্থকেই আড়াল করে দেয়।
শব্দের এই মহাসমুদ্রে তাদের শব্দের কোনো অভাব নেই,
তবুও এক নতুন নীরবতা জন্ম নেয়;
শূন্যতার নয়, অতিরিক্ততার নীরবতা।
নাবিকেরা কানে মোম গুঁজে বাঁচার চেষ্টা করে,
কিন্তু মায়াজাল মাস্তুলের বাঁধন কেটে দেয়।
একদা ওয়েলসের কোনো এক গির্জার ব্যাপ্টিস্ট সাইরেন
ডাইকের ভাঙা জলপথে এসে সুতো কাটতে শেখে
মানুষের ফ্যাক্টরিতে ।
তবু অবাক হয়ে শুধু শুনে যায় ঈশ্বরের গান,
যা কোনো শূন্যতা নয়, এক অপার্থিব পূর্ণতার শেষ পরিণতি।
খোঁজে পরম সত্যের আত্মবিলোপ—
যেখানে ‘আমি’-র সীমাবদ্ধতা মুছে গিয়ে নীরবতা
নিজেই উপস্থিতির গভীরতম রূপ হয়ে ওঠে।
সমুদ্রের নীল জলেই আছে সে তবু যেন
সাবমেরিন ক্যাবলের অন্ধকারে বন্দী অপটিক্যাল ফাইবার।
তার গানে ট্রয়ের যুদ্ধ নেই, আছে বিবিসি, সিএনএনের
চব্বিশ ঘন্টার সংবাদ।
স্ফিংস
কার্নাকের ধুলোবালি মেখে সে দাঁড়িয়ে আছে রাজপথে,
সিংহের থাবায় লুকিয়ে রেখেছে নারীর স্তন আর পাখির ডানা।
মিশেল ফুকো এসে তার ডানায় লিখে দেন ক্ষমতার কঠিন সমীকরণ—
কোন কথাটি বলা যাবে আর কোনটি যাবে না,
সেই লাইসেন্স তো স্ফিংসেরই হাতে।
রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সে এনআইডি (NID) দেখতে চাইত,
মানুষের গলায়, ধাঁধা জিজ্ঞেস করত আর উত্তর
দিতে না পারলে নিমেষেই গিলে খেত,
যখন সে ছুঁড়ে দেয় জীবনের সেই অমোঘ প্রশ্ন,
ইডিপাস তার নির্ভীক উত্তর দিয়ে দেয়:”মানুষ”!
শুধু মানুষ বলায় যে ধাঁধা তৈরি হয়,
থমাস ডি কুইন্সি এসে সেই ধাঁধাটিকে ডিকনস্ট্রাক্ট করলেন ।
শিশুর হামাগুড়ি, দুপায়ে ভর করে চলা যৌবন আর
শেষ বয়সে লাঠিতে ভর দিয়ে তিন পায়ে চলার কথা বলেন।
ধাঁধার এই চরম উত্তরটি শোনামাত্র স্ফিংস পাহাড় থেকে
লাফিয়ে পড়ে;
সে আত্মহত্যা করে ঠিকই, কিন্তু মরে না,
কারণ মিথ কখনো চিরতরে মরে যায় না।
স্ফিংসের সেই দৈহিক মৃত্যু তার বিলুপ্তি নয়, বরং
মানুষের মনের ভেতরে ঢুকে বসে থাকা।
মনও সে রকম, ফ্রয়েডীয় অবচেতনে প্রতিনিয়ত
আমাদের দিকে নানারকম মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন, দ্বন্দ্ব আর ট্রমা ছুঁড়ে দেয়।
আমরা যখন তার উত্তর খুঁজে পাই না, তখন বিষণ্ণতায় ভুগি।
হয়তো স্ফিংসেরও ছিল একাকীত্ব, বিষণ্ণতা, নীরবতা;
তাই সে শুধু একটি ‘ধাঁধা’ বা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে চুপ হয়ে যেত ।
তবে প্রান্তিক মানুষেরও আছে নিজস্ব নীরবতা,
ইতিহাসের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ। তাদের
প্রেম আর প্রতিরোধের এই সত্যগুলো কোনো
এনআইডি কার্ড কিংবা উচ্চারিত বাক্যে থাকে না;
তারা আজীবন চিরস্থায়ী আশ্রয় খুঁজে নেয়,
স্ফিংসের অনুচ্চারিত ব্যাকরণে।
১/৬/২০২৬
আবদুর রব

কবি, অনুবাদক, অনলাইন ম্যাগাজিন সম্পাদক ও অর্থনীতিবিদ। জন্ম ৩০ জুন ১৯৬১ সালে। পৈত্রিক নিবাস যশোর। বর্তমান বসবাস ঢাকায়। একটি আন্তর্জাতিক কন্সাল্ট্যান্সি ফার্মে কর্মরত। ৩৫টি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
শৈশব থেকে লেখালেখির শুরু। এ পর্যন্ত দশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয় যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পূর্ণ প্রাণ যাবো’। অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ: কে ঘুমায় কে জাগে (১৯৯৪); রূপান্তরের গান (২০০৩); আপেলসূত্র (২০১৪), বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় (২০২০), নুড়ি পাথ রের ছায়া (২০২৩) ও নির্বাচিত কবিতা (২০২৪)। এছাড়া ছোটদের জন্য চীনা গল্পের তিনটি অনুবাদ গ্রন্থও আছে। এগুলো প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। বিদ্যাপ্রকাশ থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় অনুবাদ কবিতার বই ‘বৃষ্টির ভেতর এক গলিপথ’। বেশকিছু ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন তিনি।
