কবিতা কোনো উত্তর দেয় না, শুধু দৃশ্যের পর দৃশ্যে নিজেদের
উন্মোচিত করে।
১৯৯০ সালে ওকলাহোমার নরম্যানে Neustadt International Prize
for Literature গ্রহণ করার সময় ট্রান্সট্রোমার তাঁর সংক্ষিপ্ত অভিভাষণে
বলেন:
‘‘…একটি কবিতাকে দেখার দুটি উপায় আছে।
প্রথম উপায় হলো, কবিতাকে ভাষার নিজের জীবনের প্রকাশ
হিসেবে দেখা। যেন কবিতাটি যে ভাষায় লেখা হয়েছে, সেই ভাষার
ভেতর থেকে আপনা থেকেই জন্ম নিয়েছে। আমার ক্ষেত্রে, সুইডিশ
ভাষা যেন আমাকে দিয়ে কবিতাটি লিখিয়ে নিয়েছে। এই দৃষ্টিতে
দেখলে কবিতাকে অন্য ভাষায় নিয়ে যাওয়া অসম্ভব।
দ্বিতীয় এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো, দৃশ্যমান কবিতাটি
আসলে আরেকটি অদৃশ্য কবিতার প্রকাশ। সেই অদৃশ্য কবিতাটি
এমন এক ভাষায় লেখা, যা সব প্রচলিত ভাষার আড়ালে রয়েছে।
তখন মূল কবিতাটিও এক ধরনের অনুবাদ হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজি বা
মালয়ালমে অনুবাদ করা মানে সেই অদৃশ্য কবিতার আবার নতুন
করে জন্ম নেওয়ার চেষ্টা।’’
এই অনুবাদগুলো করার সময় আমি আড়ালের সেই অদৃশ্য
কবিতাগুলো নিরন্তর শুনে গেছি।
আরেকটি কথা, এই কবিতাগুলো বাংলাকরণের পেছনে আমাদের
সম্পাদক, কবিতা-অন্তঃপ্রাণ কবি আবদুর রবের অনুপ্রেরণার
কথা না বললেই নয়।
─নান্নু মাহবুব
এয়ারমেইল
একটা ডাকবাক্সের খোঁজে আমি
চিঠিটা নিয়ে সারা শহর ঘুরতে থাকি।
পাথর আর কংক্রিটের বিশাল অরণ্যে
ডানা ঝাপটায় এই পথহারা প্রজাপতি।
ডাকটিকিটের উড়ন্ত গালিচা
ঠিকানার টলোমলো সব অক্ষর
আর আমার খামবন্দি সত্য এখন
সাগরের উপর দিয়ে ভেসে যায়।
আটলান্টিকের হামা দেওয়া রুপো।
মেঘভাণ্ডার। মুখ থেকে ছুঁড়ে ফেলা
জলপাইবিচির মতো মাছ ধরা নৌকো।
আর জলরেখার ম্লান ক্ষতচিহ্ন।
নিচে এখানে কাজকাম সব মন্থর।
মাঝে মাঝেই আমি ঘড়ির দিকে উঁকি দেই।
লোভাতুর নৈঃশব্দ্যের ভেতর বৃক্ষছায়াদের
কালো কালো সংখ্যা।
সত্য মাটির ওপর পড়ে আছে
কিন্তু কেউই সেটা তুলে নিতে সাহস করছে না।
সত্য রাস্তার ওপর পড়ে আছে।
কেউই সেটা নিজের করে নিচ্ছে না।
………….
[Robin Fulton অনূদিত Air Mail থেকে।]
অরণ্যের টুকরো
সেখানে যাওয়ার পথে শুধু এক জোড়া সন্ত্রস্ত ডানার ঝাপটানি, ওইটুকুই। সেখানে
একা একাই যেতে হয়। সেটা হলো উঁচু একটা ভবন যার পুরোটাই ফাটল দিয়ে তৈরি,
এমন একটা ভবন যেটা সারাক্ষণই দুলতে থাকে, কিন্তু কখনোই ধসে পড়ে না। সহস্রসূর্য
তার ফাটলগুলো দিয়ে ভেতরে ভেসে আসে। আলোর খেলায় সেখানে এক উল্টো
মহাকর্ষের রাজত্ব: বাড়িটা আকাশে নোঙর করা, আর যা কিছুই পড়ে, তা উপর দিকেই
পড়ে। সেখানে ফিরে তাকানো যায়। সেখানে শোক করার অনুমতি আছে। সেখানে
সাহস করে কিছু পুরোনো সত্যের দিকে তাকানো যায়, অন্যথায় যেগুলো সবসময় চাপা
দিয়ে রাখা হয়। আমার গভীরের ভূমিকাগুলো সেখানে ভেসে ওঠে আর মেলানেশিয়ার
কোনো প্রত্যন্ত দ্বীপের পূর্বপুরুষদের কুঁড়েঘরে শুকনো খুলিগুলোর মতো ঝুলে থাকে।
ভয়ঙ্কর সেই ট্রফিগুলো ঘিরে শিশুসুলভ একটা আলো। এতই কোমল এই অরণ্য।
…………..
মেলানেশিয়া: দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপাঞ্চল।
[Robin Fulton অনূদিত Place in the Forest থেকে।]
নাবিকের গল্প
কিছু নগ্ন শীতের দিন আছে যখন সমুদ্র পার্বত্য অঞ্চলের
স্বজনের মতো, ধূসর পালকের আবরণে নত হয়ে থাকে,
ক্ষণিক একটা নীল মুহূর্ত, আর দীর্ঘ সময় ধরে ঢেউগুলো
ফ্যাকাশে বনবিড়ালের মতো বৃথাই সৈকতের নুড়িপাথরে
আশ্রয় খোঁজে।
এমন দিনে যেন ডুবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ সমুদ্র
ছেড়ে বেরিয়ে আসে আর খোঁজে তাদের মালিকদের, যারা
শহরের কোলাহলে বসে আছে, আর ডুবে যাওয়া নাবিকেরা
হাওয়ায় ভেসে তীরে ফিরে আসে, পাইপের ধোঁয়ার চেয়েও
হালকা।
(উত্তরে সত্যিকারের বনবিড়ালগুলো ঘোরে, ধারালো নখ
আর স্বপ্নমগ্ন চোখ নিয়ে। উত্তরে, যেখানে দিন বাস করে
একটা খনির মধ্যে, দিনরাত।
যেখানে একমাত্র জীবিত মানুষটি বসে থাকে উত্তুরে
আলোর উনুনের পাশে আর হিমে-জমে-মরা লোকেদের
সংগীত শোনে।)
……………..
উত্তুরে আলো: উত্তর মেরুর আকাশের অলৌকিক রঙিন আলো,
অরোরা বোরিয়ালিস।
[Robin Fulton অনূদিত Sailor’s Yarn থেকে।]
ট্রাফিক
ট্রেলারসহ দূরপাল্লার লরিটা কুয়াশার মধ্যে হামাগুড়ি দিচ্ছিল।
আর সেটা হলো হ্রদের কর্দমাক্ত তলদেশে নড়াচড়া করা
গঙ্গাফড়িঙের লার্ভার বিশাল একটি ছায়া।
ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরতে থাকা একটা অরণ্যে হেডলাইটেরা
মুখোমুখি হলো। কেউ কারও মুখ দেখতে পাচ্ছিল না। পাইনসূঁচের
ভেতর দিয়ে আলোর ঢল বয়ে যাচ্ছিল।
গোধূলিতে সবদিক থেকে আসি আমরা, ছায়ার যানবাহন, সারি বেঁধে
চলি, একে অন্যের পেছনে, একে অন্যকে পাশ কাটিয়ে, চাপা
শোরগোলে সামনে ভেসে যাই─,
উন্মুক্ত প্রান্তরে, যেখানে কারখানাগুলো তা দিয়ে বসে থাকে
আর ভবনগুলো প্রতি বছর দুই মিলিমিটার করে ডুবে যায়─মৃত্তিকা
তাদের গিলে ফ্যালে ধীরে ধীরে।
এখানে স্বপ্ন থেকে উঠে আসা সবচেয়ে চকচকে পণ্যগুলোর গায়ে
অজ্ঞাত থাবাগুলো তাদের ছাপ বসিয়ে দেয়। বীজেরা অ্যাসফল্টের
ভেতর বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে থাকে।
কিন্তু প্রথমেই সেই চেস্টনাট গাছগুলো, তারা খুব বিষণ্ন যেন তারা
সাদা সাদা মঞ্জরির বদলে লোহার দস্তানা ফোটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে আর
তাদের পেছনে
কোম্পানির অফিস─ একটা নষ্ট ফ্লুরোসেন্ট টিউব টিমটিম করছে।
এখানে আছে একটা গোপন দরজা, খোলো সেটা! আর উঁকি দাও
সেই উল্টে রাখা পেরিস্কোপের ভেতর─ নিচের দিকে,
গহ্বরের মুখগুলোর দিকে, সেই গভীর পাইপগুলোর দিকে, যেখানে শৈবাল
গজিয়ে উঠছে মৃতদের দাড়ির মতো, আর ক্লিনার ভেসে যাচ্ছে
তার পিচ্ছিল কাদার পোশাকে,
ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসা সাঁতারের টানে, শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার পথে।
এবং কেউই জানে না এর শেষটি কোথায়, শুধু জানে এই শৃঙ্খল
বারবার ভেঙে যায় আর জুড়ে যায়, নিরন্তর।
………………
পেরিস্কোপ: সাবমেরিন থেকে পানির উপরে দেখার জন্য ব্যবহৃত পর্যবেক্ষণ যন্ত্র।
[Robin Fulton অনূদিত Traffic থেকে।]
গোগোল
কোটটি নেকড়ের পালের মতোই ছেঁড়াখোঁড়া।
মুখটি যেন মার্বেলের একটা টুকরো।
সে বসে আছে তার চিঠিগুলোর বৃত্তে, বিদ্রূপ আর ভুলের
মর্মরে মুখর কুঞ্জবনে,
আর তার হৃদয় এক টুকরো কাগজের মতো প্রতিকূল গলিপথ
দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।
সূর্যাস্ত এখন চুপিচুপি একটা শেয়ালের মতো এই দেশটির
ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে, নিমেষেই ঘাসে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।
আকাশটা ভরে আছে শিং আর খুরে, আর তার নিচে আমার পিতার
আলোকিত আঙিনাগুলোর ভেতর দিয়ে ছায়ার মতো
একটা বারুশ গাড়ি গড়িয়ে যাচ্ছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গ রয়েছে নিধনের একই অক্ষাংশে
(তুমি কি হেলানো টাওয়ারে দেখেছিলে সেই সুন্দরীকে)
আর বরফঢাকা পাড়াগুলোর চারপাশে কোটে মোড়া সেই দরিদ্র
লোকটি এখনও একটা জেলিফিশের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে।
আর এখানে, উপবাসে মোড়া সেই লোকটি, যে একসময়
পরিবৃত থাকত হাসির পাল দিয়ে,
কিন্তু তারা বহু আগেই চলে গেছে বৃক্ষসীমার বহু উপরের অঞ্চলে।
মানুষের টলমলে টেবিল।
বাইরে তাকিয়ে দেখ, অন্ধকার কীভাবে আত্মাদের এক ছায়াপথ
পুড়িয়ে স্থির করে রেখেছে।
তাহলে তোমার অগ্নিরথে উঠে পড়ো, এবং দেশ ছেড়ে চলে যাও!
……………
গোগোল: নিকোলাই গোগোল (১৮০৯-১৮৫২), রুশ ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। তাঁর
“ওভারকোট” (The Overcoat) গল্পের দরিদ্র কেরানি আকাকি আকাকিয়েভিচের প্রতিচ্ছবি
এই কবিতায় অনুরণিত হয়েছে।
বারুশ গাড়ি (Barouche): উনিশ শতকের ইউরোপের এক ধরনের অভিজাত, চার চাকার
ঘোড়ার গাড়ি।
[Robin Fulton অনূদিত Gogol থেকে।]
অন্তর্দেশে নামে ঢল
গাড়িগুলোর ছাদে বৃষ্টি হাতুড়ি পিটছিল।
আকাশে বজ্রের গুরুগুরু। যানচলাচল শ্লথ হয়ে এসেছে।
গ্রীষ্মের এই মধ্যাহ্নেও হেডলাইটগুলো সব জ্বালানো রয়েছে।
ধোঁয়া প্রবল বেগে চিমনিগুলোর ভেতর নেমে আসছিল।
জীবন্ত জিনিসগুলো সব চোখ বুজে গাদাগাদি করে ছিল।
অন্তর্মুখী এক গতি, জীবনকে আরও তীব্র করে তুলছিল।
গাড়িটা প্রায় অন্ধ হয়ে গেল। সে থেমে গিয়ে নিজস্ব
একটা আগুন জ্বালিয়ে ধূমপান করতে লাগল যখন
জানালার কাচ জুড়ে জলের ঢল নামছিল।
অরণ্যের এই রাস্তায়, যেটা একটা পদ্মফোটা হ্রদের
কাছ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে,
আর বৃষ্টিতে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া দিঘল একটা পাহাড়।
উপরের শিলাস্তূপগুলো লৌহযুগ থেকে পড়ে আছে,
যখন এটা উপজাতিদের একটা যুদ্ধক্ষেত্র ছিল,
শীতলতর একটা কঙ্গো
আর বিপদটা পশু আর মানুষগুলোকে সব একসঙ্গে
দাবড়ে পাহাড়চূড়ার দেয়ালের পেছনে, ঝোপঝাড় আর
পাথরের আড়ালে গুঞ্জনমুখর একটা কেন্দ্রে নিয়ে এল।
অন্ধকার একটা খাড়াই, কেউ একজন পিঠে ঢাল
নিয়ে হাচড়ে-পাচড়ে সেই খাড়াই বেয়ে উপরে উঠছে,
─তার গাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সে এইসবই ভাবছিল।
সবকিছু আলোকিত হয়ে উঠতে শুরু করলে সে
জানালা নামিয়ে দিল।
ক্রমশ পাতলা হতে থাকা নিঃশব্দ বৃষ্টির ভেতর একটা
পাখি আপনমনে শিস দিয়ে যাচ্ছিল।
হ্রদের ওপরটা টানটান হয়ে আছে। গুরুগুরু আকাশটা
পদ্মফুলের ভেতর দিয়ে নিচের পলিমাটি অবধি
ফিসফিস করছিল।
অরণ্যের জানালাগুলো ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছিল।
কিন্তু নিস্তব্ধতা খানখান করে বজ্রপাত হলো!
শ্রবণ-বধির করা বিকট একটা শব্দ। আর তারপর একটা
শূন্যতা, যেখানে জলের শেষ ফোঁটাগুলো খসে পড়ল।
নৈঃশব্দ্যের ভেতর সে একটা উত্তর আসতে শুনল।
বহু দূর থেকে। রুক্ষ এক ধরনের শিশু-কণ্ঠস্বর।
পাহাড় থেকে উঠে আসা আদিম একটা গর্জন।
একাকার হয়ে যাওয়া সুরের একটা গোঙানি।
লৌহযুগ থেকে আসা দীর্ঘ রুক্ষ একটা শিঙ্গাধ্বনি।
সম্ভবত তার নিজের ভেতর থেকেই।
……………
[Robin Fulton অনূদিত Downpour over the Interior থেকে।]
ধীরলয় সংগীত
ভবনটি বন্ধ। জানালার কাচ দিয়ে রোদ্দুর ঢুকে ডেস্কগুলোর
ওপরটা উষ্ণ করে তুলছে,
যে ডেস্কগুলো মনুষ্যনিয়তির ভার বইবার পক্ষে যথেষ্ট মজবুত।
আজ আমরা বাইরে, দীর্ঘ প্রশস্ত ঢালে।
অনেকেরই পরনে গাঢ় রঙের পোশাক। রোদ্দুরে চোখ বুজে দাঁড়ালে
মনে হবে তুমি ধীরে ধীরে সামনে ভেসে যাচ্ছ।
আমি খুব কমই জলের ধারে আসি। কিন্তু এখন আমি এখানে,
শান্ত পিঠওয়ালা বড় বড় পাথরগুলোর মধ্যে।
যে পাথরগুলো ধীরে ধীরে ঢেউ থেকে পিছিয়ে উঠে এসেছে।
…………….
[Robin Fulton অনূদিত Slow Music থেকে।]
মাদ্রিগাল
উত্তরাধিকারসূত্রে আমি একটা অন্ধকার জঙ্গল পেয়েছি যেখানে আমি খুব কমই গিয়ে থাকি।
কিন্তু একদিন আসবে যখন জীবিত আর মৃতেরা তাদের জায়গাবদল করবে। জঙ্গলটা সচল
হয়ে উঠবে। আমরা আশাহত নই। বহু পুলিশের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলো
অমীমাংসিতই থেকে যায়। ঠিক একইভাবে আমাদের জীবনের কোথাও রয়ে গেছে বিশাল
অমীমাংসিত এক প্রেম। উত্তরাধিকারসূত্রে আমি একটা অন্ধকার জঙ্গল পেয়েছি কিন্তু আজ
আমি আরেকটা জঙ্গলে হাঁটছি, উজ্জ্বল একটা জঙ্গলে। জীবন্ত সবকিছু গান গাইছে, পাক খাচ্ছে,
দোল খাচ্ছে, হামাগুড়ি দিচ্ছে! এখন বসন্ত আর বাতাসটা খুব জোরালো। আমার বিস্মরণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ডিগ্রি রয়েছে এবং আমি দড়িতে মেলে দেওয়া শার্টের মতোই শূন্যহস্ত।
…………..
মাদ্রিগাল: Madrigal; ১৪শ শতাব্দীতে ইতালিতে বিকশিত এক ধরনের সংগীত,
যা একদল গায়কের মাধ্যমে বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই পরিবেশিত হতো।
[Robin Fulton অনূদিত Madrigal থেকে।]
বাডেলুন্ডার নাইটিঙ্গেল
নাইটিঙ্গেলের উত্তর সীমান্তে সবুজ মধ্যরাত। ভারী পাতাগুলো সব ঘুমঘোরে ঝুলছিল,
বধির গাড়িগুলো বেপরোয়া গতিতে নিয়নরেখার দিকে ছুটে যাচ্ছিল। নাইটিঙ্গেলের
স্বরটা একটুও না দুলে চড়ায় উঠছিল, তীক্ষ্ণভেদী একটা মোরগের ডাকের মতো, তবে
সেটা ছিল ভারি অপরূপ আর অহমিকাহীন। আমি ছিলাম কারাগারে আর সে আমায়
দেখতে এল। আমি ছিলাম অসুস্থ আর সে আমায় দেখতে এল। তখন আমি তাকে লক্ষই
করি নাই, কিন্তু এখন লক্ষ করছি। সূর্য আর চন্দ্র থেকে সময়ের স্রোত নেমে এসে সমস্ত
টিক-টিক-কৃতজ্ঞতাময় ঘড়িগুলোর ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল। কিন্তু এখানে সময় বলে কিছু
নেই। শুধু নাইটিঙ্গেলের কণ্ঠস্বর, সেই রুক্ষ ঝঙ্কারময় সুরগুলো, যা রাতের আকাশের
উজ্জ্বল কাস্তেটাকে শাণ দিয়ে যাচ্ছিল।
………….
নাইটিঙ্গেল: Nightingale; ছোট, সুকণ্ঠী একটি পাখি।
বাডেলুন্ডা: Badelunda; সুইডেনের ভেস্টেরাস শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি গ্রামীণ এলাকা।
[Robin Fulton অনূদিত The Nightingale in Badelunda থেকে।]
সোনালি বোলতা
পা-হীন সেই তামাটে টিকটিকিটা,
শান্ত ও রাজসিক একটা অ্যানাকোন্ডার মতো
বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছিল, পার্থক্যটা শুধু আকারে।
আকাশ মেঘে ঢাকা, কিন্তু সূর্য মেঘ ঠেলে বেরিয়ে আসছিল,
এমনই একটা দিন।
আজ সকালে আমার প্রিয়তমা অশুভ আত্মাগুলো সব তাড়িয়ে দিয়েছে।
ঠিক যেমন দক্ষিণাঞ্চলের কোনো অন্ধকার গুদামের দরজা খুলে দিলে
মুহূর্তেই ভেতরে আলো উপচে পড়ে
আর আরশোলাগুলো কোনা-কানাচ আর
দেয়ালের ওপর দিয়ে
হুড়োহুড়ি করে উধাও হয়ে যায়─যেন তাদের দেখেছ আবার দেখ নাই─
ঠিক তেমনই তার নগ্নতায় অশুভ আত্মাগুলো সব পালিয়ে যায়।
যেন তারা কখনো ছিলই না।
কিন্তু তারা আবার ফিরে আসবে।
অজস্র হাত নিয়ে ফিরে আসবে।
যারা স্নায়ুর সেকেলে টেলিফোন একচেঞ্জে ভুল সংযোগ তৈরি করবে।
আজ পাঁচই জুলাই। লুপিন ফুলগুলো যেন মাথা উঁচু করে
সমুদ্র দেখতে চাইছে।
আমরা মৌনতার গির্জায়, অক্ষরবিহীন ভক্তির ভেতরে রয়েছি,
যেন সেই নির্মম পিতৃপুরুষদের মুখগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না,
আর শিলাপটে ঈশ্বরের নামের ভুল বানানও ছিল না।
আমি টিভির এক অক্ষরনিষ্ঠ ধর্মপ্রচারককে দেখেছিলাম যে
অঢেল টাকা জমিয়েছিল।
কিন্তু এখন সে খুব দুর্বল, আর এখন তার একজন দেহরক্ষীর সাহায্য লাগে─
কেতাদুরস্ত এক যুবক দেহরক্ষী, যার হাসিটি একটা মুখবন্ধনীর মতো টানটান।
আর্তনাদ-চাপা একটা হাসি।
সেই শিশুটির আর্তনাদ─যাকে হাসপাতালের বিছানায় একা ফেলে রেখে
বাবা-মা চলে যাচ্ছে।
দিব্যতা মানুষকে স্পর্শ করে একটি শিখা জ্বালিয়ে দেয়, কিন্তু
পরক্ষণেই আবার পিছিয়ে যায়।
কেন?
আর সেই শিখাটা ছায়াগুলোকে নিজের দিকে টেনে আনে, ছায়াগুলো
চড়চড় করে উড়ে এসে আগুনের শিখায় বিলীন হয়ে যায়─ যে শিখাটা
ক্রমে আরও উঁচুতে উঠে যায় আর কালো হয়ে আসে। আর তার ধোঁয়াটা
ঘোর শ্বাসরোধী হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
শেষমেশ শুধুই কালো ধোঁয়া, শেষমেশ শুধুই ধার্মিক জল্লাদ।
ধার্মিক জল্লাদটা নগরচত্বর আর জনসমুদ্রের উপর ঝুঁকে পড়ে,
যারা একটা দানাদানা আয়না হয়ে ওঠে,
যেখানে সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়।
সবচেয়ে বড় ধর্মান্ধই হলো সবচে বড় অবিশ্বাসী।
সে নিজেও তা জানে না।
সে হলো এই দুই সত্তার এক গোপন সন্ধি, যেখানে একজন
শতভাগ দৃশ্যমান, আর অন্যজন অদৃশ্য।
কতই না ঘৃণা করি আমি এই ‘শতভাগ’ শব্দটা!
যারা নিজেদের বাইরের অবয়ব ছাড়া আর কোথাও থাকতে পারে না,
যারা কখনোই অন্যমনস্ক হয় না,
যারা কখনোই ভুল দরজাটা খুলে সেই অচেনা সত্তার ঝলক দেখতে পায় না,
তাদের পাশ কাটিয়ে যাও।
আজ পাঁচই জুলাই। আকাশ মেঘে ঢাকা, কিন্তু
সূর্য মেঘ ঠেলে বেরিয়ে আসছে,
পা-হীন সেই তামাটে টিকটিকিটা, শান্ত ও রাজসিক একটা
অ্যানাকোন্ডার মতো বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে।
পা-হীন সেই তামাটে টিকটিকিটা, যেন কোথাও কোনো আমলাতন্ত্র নেই।
সোনালি বোলতা, যেন কোথাও কোনো পৌত্তলিকতা নেই।
লুপিন ফুল, যেন কোথাও কোনো ‘শতভাগ’ নেই।
আমি সেই গভীরতাটা টের পাই যেখানে মানুষ একইসঙ্গে
বন্দি এবং শাসক, পার্সেফোনির মতো।
প্রায়ই আমি নিচের ওই শক্ত ঘাসে শুয়ে থাকতাম আর
পৃথিবীটাকে আমার উপরে গম্বুজ হয়ে উঠতে দেখতাম।
পৃথিবীর গম্বুজ।
প্রায়ই, সেটাই আমার জীবনের অর্ধেকটা।
কিন্তু আজ আমার দৃষ্টি আমায় ছেড়ে গেছে।
আমার অন্ধত্বও বিদায় নিয়েছে।
অন্ধকার বাদুড়টা আমার মুখ ছেড়ে গ্রীষ্মের উজ্জ্বল আকাশে
কাঁচির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে।
……………
তামাটে সাপ: Copper snake; সুইডিশে এক ধরনের পা-বিহীন টিকটিকি (slow worm),
দেখতে সাপের মতো কিন্তু সাপ নয়।
লুপিন: (lupin); এক ধরনের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। যার ফুল নীল, বেগুনি, গোলাপি বা
হলুদ হতে পারে।
পার্সেফোনি: Persephone; গ্রিক পুরাণের চরিত্র, দেমেতার-এর কন্যা এবং পাতালের
দেবতা হেডিসের স্ত্রী। তাকে পাতালে অপহরণ করা হলে পৃথিবীতে ঋতুচক্রের পরিবর্তন ঘটে।
তিনি একই সঙ্গে পাতাল ও পৃথিবীর অংশ, আলো ও অন্ধকার, বন্দিত্ব ও ক্ষমতার দ্বৈত প্রতীক।
[Robin Fulton অনূদিত Golden wasp থেকে।]
কোকিল
বাড়িটার ঠিক উত্তরে বার্চগাছে একটি কোকিল ডাকছিল। তার ডাকটা এত জোরালো
ছিল যে প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, কোনো অপেরা-গায়ক কোকিলের ডাক নকল করছে।
বিস্মিত হয়ে আমি পাখিটার দিকে তাকালাম। প্রতিটি স্বরের সঙ্গে সঙ্গে তার লেজের পালক
পাম্পের হাতলের মতো ওঠানামা করছিল। পাখিটি দুই পা একসঙ্গে তুলে লাফাচ্ছিল,
চারদিকে মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ডাকছিল। তারপর মৃদু গজগজ করতে করতে বাড়িটির উপর
দিয়ে বহুদূর পশ্চিমে উড়ে গেল… গ্রীষ্ম বুড়ো হয়ে আসছে, আর সবকিছু একটিমাত্র বিষণ্ন
মর্মরে এসে মিশে যাচ্ছে। Cuculus canorus ক্রান্তীয় অঞ্চলে ফিরে যায়। সুইডেনে তার
সময় শেষ। সেটা খুব দীর্ঘ ছিল না! আসলে কোকিল তো জায়ারের নাগরিক… আমি আর
ভ্রমণ তেমন পছন্দ করি না। কিন্তু এখন ভ্রমণই আমাকে দেখতে আসে। এখন যখন আমি
ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছি, যখন আমার বয়সের বলয়গুলো ঘন হয়ে আসছে, যখন
আমার পড়ার চশমার প্রয়োজন হচ্ছে। সবসময়ই আমাদের বহনক্ষমতার তুলনায় অনেক
বেশি কিছু ঘটতে থাকে! এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এই চিন্তাগুলো আমাকে ঠিক
ততটাই বিশ্বস্তভাবে বহন করে, যতটা সুসি আর চুমা লিভিংস্টোনের মমি আফ্রিকার এক
প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বহন করেছিল।
……………
Cuculus canorus: ইউরোপীয় সাধারণ কোকিলের বৈজ্ঞানিক নাম।
জায়ার (Zaire): বর্তমান Democratic Republic of the Congo; কোকিল
শীতকালটা আফ্রিকার ক্রান্তীয় অঞ্চলে কাটায়।
সুসি আর চুমা: Susi and Chuma; ডেভিড লিভিংস্টোনের দুই আফ্রিকান সহযাত্রী।
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরা তাঁর দেহ বহুদূর বহন করে পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছে দেন।
[Robin Fulton অনূদিত The Cuckoo থেকে।]
যখন আমরা আবার দ্বীপগুলো দেখলাম
দূরের নৌকাটা যখন এগিয়ে আসছিল,
প্রবল একটা বৃষ্টি এসে সেটাকে অন্ধ করে দিল।
পারদের দানাগুলো জলের ওপর কেঁপে উঠল।
নীলচে-ধূসরতা নিচে শুয়ে পড়ল।
কুঁড়েঘরগুলোর ভেতরেও সমুদ্র ছিল।
দেউড়ির অন্ধকারে এক ফালি আলো।
উপরতলায় ভারী ভারী পায়ের শব্দ আর
সদ্য ইস্ত্রি করা হাসিসমেত সব কফিন।
তামার হাঁড়িপাতিলের একটি ভারতীয় অর্কেস্ট্রা।
চোখে সমুদ্রের দোলা নিয়ে একটি শিশু।
(বৃষ্টি মিলিয়ে যেতে শুরু করল।
ছাদের হাওয়ায় ধোঁয়া কয়েকটি
টলমলে পদক্ষেপ নিল।)
এরপর আরও কিছু এল
যা স্বপ্নের চেয়েও বড়।
অ্যাল্ডার গাছের ঝুপড়িওয়ালা সৈকত।
‘‘ক্যাবল’’ লেখা একটা সাইনবোর্ড।
উড়ে আসতে থাকা কারোর জন্যে
পুরোনো হেদারের প্রান্তর জ্বলজ্বল করছিল।
খাড়া পাথরগুলোর পেছনে উর্বর সব ক্ষেত
আর আমাদের প্রহরী সেই কাকতাড়ুয়া
যে রঙগুলোকে নিজের দিকে হাতছানি দেয়।
সর্বদাই এক উজ্জ্বল বিস্ময়
যখন দ্বীপটি একটি হাত প্রসারিত করে
আমাকে বিষাদ থেকে টেনে তোলে।
…………….
অ্যাল্ডার: এক ধরনের গাছ যা সাধারণত জলাশয়ের ধারে জন্মে।
হেদারের প্রান্তর: heather; ইউরোপের উঁচু জমিতে জন্মানো ছোট ঝোপজাতীয় গাছ হেদার
দিয়ে গঠিত বুনো প্রান্তর, যা সাধারণত গ্রীষ্মকালে বেগুনি ফুলে ঢাকা থাকে।
[Robin Fulton অনূদিত When We Saw the Islands Again থেকে।]
ইতিহাস বিষয়ক
১
মার্চের একটা দিনে আমি হ্রদে নেমে কান পাতি।
বরফ ছিল আকাশের মতো নীল। সূর্যের নিচে তা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল।
সেই সূর্য, যা বরফের চাদরের নিচে একটা মাইক্রোফোনে ফিসফিস করছিল।
কুলকুল শব্দে ফেনা তুলছিল। আর বহু দূর থেকে কেউ যেন একটা
বিশাল চাদর ঝাঁকিয়ে যাচ্ছিল।
সবকিছুই ইতিহাসের মতো: আমাদের এই বর্তমানটা। আমরা নিমজ্জিত।
আমরা কান পেতে আছি।
২
সভা-সম্মেলনগুলো উড়ন্ত দ্বীপের মতো ভেঙে পড়ার দোরগোড়ায়…
তারপর: সমঝোতার এক দীর্ঘ কম্পমান সেতু।
সেই সেতু দিয়েই সব যাতায়াত হবে, নক্ষত্রদের নিচে,
অনাগতদের বিবর্ণ মুখগুলোর নিচে, সেই শূন্যে নিক্ষিপ্ত,
চালের দানার মতো, পরিচয়হীন।
৩
আঁদ্রে জিদের ছদ্মবেশে গ্যেটে ১৯২৬ সালে আফ্রিকা গেলেন, এবং
সবকিছুই দেখলেন। কিছু মুখ মৃত্যুর পর যা-ই দ্যাখে তাতেই
তাদের মুখ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন আলজেরিয়ার দিনের খবর
পড়া হচ্ছিল, তখন সেখানে একটা বিশাল বাড়ি ভেসে উঠল,
যার সবকটি জানালাই ছিল অন্ধকার, শুধু একটি বাদে। আর সেখানেই
ড্রেফাসের মুখটা দেখা গেল।
৪
প্রগতিশীল আর প্রতিক্রিয়াশীল অসুখী দাম্পত্যের মতো একসাথে থাকে,
একে অন্যের তৈরি, একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু আমরা যারা তাদের সন্তান, আমাদের মুক্ত হতে হবে।
প্রতিটি সমস্যাই তার নিজস্ব ভাষায় চিৎকার করে ওঠে।
সত্য যেখানে পা রেখেছিল সেখানে একটা ব্লাডহাউন্ডের মতো হাঁটো!
৫
লোকালয়ের কাছেই প্রান্তরে মাসের পর মাস বিস্মৃত একটা খবরের কাগজ
পড়ে আছে, ঘটনায় পরিপূর্ণ।
দিনরাত বৃষ্টি আর রোদে সেটা বুড়িয়ে যাচ্ছে, একটা উদ্ভিদ,
একটা বাঁধাকপি হওয়ার পথে, মাটির সাথে একাকার হওয়ার পথে।
যেমন একটা স্মৃতি ধীরে ধীরে তোমার নিজস্ব সত্তায় পরিণত হয়।
………..
গ্যেটে (Goethe): জার্মান কবি, ঔপন্যাসিক ও চিন্তক (১৭৪৯-১৮৩২)।
ইউরোপীয় মানবতাবাদী চেতনার অন্যতম প্রতীক।
আঁদ্রে জিদ (Gide): ফরাসি সাহিত্যিক (১৮৬৯-১৯৫১)। ১৯২০-এর দশকে
আফ্রিকা ভ্রমণ করেন এবং ঔপনিবেশিক বাস্তবতা নিয়ে লেখেন।
ড্রেফাস (Dreyfus): ফরাসি ইহুদি সেনা কর্মকর্তা আলফ্রেড ড্রেফাস (১৮৫৯-১৯৩৫),
রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত।
[Robin Fulton অনূদিত About History থেকে।]
দীর্ঘ খরার পর
গ্রীষ্ম খুব ধূসর এই অদ্ভুত সন্ধ্যায়।
আকাশ থেকে চুপিসারে বৃষ্টি নেমে
নিঃশব্দে মাটি স্পর্শ করছে যেন
ঘুমন্ত কাউকে পরাস্ত করতে চাইছে।
খাঁড়ির উপরিপৃষ্ঠে ঝাঁক ঝাঁক জলের বলয়
আর সেটাই সেখানে একমাত্র পৃষ্ঠ─
বাদবাকি সবই উচ্চতা আর গভীরতা,
উত্থান আর পতন।
দুটো পাইনের কাণ্ড সোজা উপরে উঠে গিয়ে
দীর্ঘ ফাঁপা সংকেত-ঢাকে মিশে গেছে।
সূর্য এবং শহরগুলো আর নেই।
দিঘল ঘাসের ভেতরে বজ্র।
মরীচিকা দ্বীপে ফোন করা যেতে পারে।
ধূসর কণ্ঠস্বর শোনা যেতে পারে।
বজ্রের জন্যে লৌহ-আকরিক হলো মধু।
নিজস্ব সংকেতেই বেঁচে থাকা যায়।
……………..
সংকেত-ঢাক: signal drums; অরণ্যবাসীদের দূরদূরান্তে সংকেত পাঠানোর ঢাক।
[Robin Fulton অনূদিত After a Long Drought থেকে।]
চার প্রকৃতি
নজরদারি চোখ সূর্যের রশ্মিগুলোকে পুলিশি ব্যাটনে পরিণত করল।
আর সন্ধ্যায় নিচের ফ্ল্যাটের একটা পার্টির হুল্লোড় মেঝে ফুঁড়ে
অপ্রকৃত ফুলের মতো উঠে আসছিল।
গাড়িটা প্রান্তরের ওপর দিয়ে ছুটছিল। অন্ধকার। গাড়িটা যেন একচুলও
এগোচ্ছিল না। নক্ষত্রহীন শূন্যতায় একটি অ্যান্টি-পাখি চিৎকার করে উঠল।
অন্ধকার উত্তাল হ্রদগুলোর উপর শ্বেতকায় সূর্যটা দাঁড়িয়ে ছিল।
*
কর্কশ পাতাসহ উপড়ে যাওয়া একটা গাছের মতো একজন মানুষ আর একটা
সতর্ক বিদ্যুৎ দেখল─ বন্য পশুর গন্ধমাখা একটা সূর্য পৃথিবীর পাথুরে দ্বীপের
উপর অগণিত ডানা-ঝাপটানির ভেতর থেকে উদিত হচ্ছে,
যে দ্বীপটা ফেনার ব্যানারের পেছনে রাত্রিদিন ভেদ করে প্রবল স্রোতের মতো
এগিয়ে যাচ্ছে, যার ডেকের ওপর সাদা সাদা সমুদ্রপাখিরা চিৎকার করছে
আর তাদের সবার কাছেই একটা করে বিশৃঙ্খলার টিকিট।
*
একটু চোখ বুজলেই পরিষ্কার শোনা যায় গাঙচিলেরা সাগরের অন্তহীন
গির্জাপল্লীর উপর দিয়ে রোববারের ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে। ঝোপের ভেতরে
টুংটাং করে একটা গিটার বাজতে শুরু করে আর
মেঘটা অলসভাবে এগোতে থাকে─সামনে জোতা হ্রেষাধ্বনিময় আলোসহ
বরফের ওপর দিয়ে ভেসে আসা, বিলম্বিত বসন্তের সবুজ স্লেজের মতো।
*
জেগে উঠলাম স্বপ্নে বান্ধবীর হিল জুতোর ঠকঠক শব্দে আর
বাইরে শীতের ভুলে যাওয়া গ্লাভসের মতো দুটো তুষারের স্তূপ, যখন
সূর্য থেকে অগুণতি লিফলেট ঝরে পড়ছে শহরের উপর।
রাস্তা কখনো শেষ হয় না। দিগন্ত সামনে ছুটতে থাকে।
গাছের ভেতরে কাঁপে পাখি। চাকার চারপাশে ধূলোর ঘূর্ণি।
মৃত্যুকে অস্বীকার করা ঘূর্ণায়মান সব চাকা!
……………..
অ্যান্টি-পাখি: anti-bird; বাস্তব পাখির বিপরীত, নক্ষত্রময় শূন্যতায় জন্মানো,
বাস্তবতার বিপরীত প্রতিধ্বনি-জাত পাখি।
স্লেজ: sledge; বরফের ওপর চালানো ছোট গাড়ি, সাধারণত ঘোড়া বা অন্য পশুর
দ্বারা টানা হয়ে থাকে।
[Robin Fulton অনূদিত The Four Temperaments থেকে।]
কাজের উপকণ্ঠে
কাজের মধ্যেই হঠাৎ বুনো সবুজের জন্যে আমাদের
তীব্র আকুলতা জেগে ওঠে,
সেই বুনো প্রান্তরের জন্যে, যাকে ভেদ করে গেছে কেবল
কিছু টেলিফোন তারের ক্ষীণ সভ্যতা।
*
অবসরের চাঁদ তার ভর আর ওজন নিয়ে কর্ম নামক গ্রহটিকে
প্রদক্ষিণ করতে থাকে। ─তারা এমনটাই চায়।
যখন আমরা বাড়ির পথে, মাটি তখন কান খাড়া করে। ঘাসের
ডগার মধ্যে দিয়ে ভূগর্ভ আমাদেরকে শুনতে থাকে।
*
এই কাজের দিনেও আছে একান্ত এক শান্তি।
ধোঁয়ায় ঢাকা কোনো ভেতরদেশে একটি খাল বয়ে যাওয়ার মতো:
যানপ্রবাহের মাঝখানে হঠাৎ দেখা দেওয়া একটি নৌকা,
কিংবা কারখানার পেছন থেকে ভেসে আসা, সাদা এক ভবঘুরে।
*
এক রবিবার আমি রং না-করা নতুন একটা বাড়ির পাশ দিয়ে
হেঁটে যাই, যা দাঁড়িয়ে আছে এক ধূসর জলরাশির সামনে।
বাড়িটা অর্ধনির্মিত। তার কাঠের রঙ স্নানরত কারোর ত্বকের
মতোই হালকা।
*
বাতির বাইরে সেপ্টেম্বরের রাতটা পুরোপুরি অন্ধকার।
চোখ সয়ে এলে, প্রান্তরের ওপর হালকা আলো ফুটে ওঠে,
যেখানে বড় বড় শামুকেরা ধীরে ধীরে এগোতে থাকে,
আর মাশরুমগুলো তারকাদের মতোই অগণিত।
…………..
সাদা এক ভবঘুরে: সমাজের প্রান্তিক স্তরে থাকা ভবঘুরে মানুষ; এখানে
কারখানা-পরিসরের ভেতর দিয়ে ভেসে আসা এক মানবিক, প্রায় ভূতসদৃশ উপস্থিতি।
[Robin Fulton অনূদিত On the Outskirts of Work থেকে।]
ইউরোপের গভীরে
দুটো স্লুইস গেটের মাঝখানে ভাসমান আমি এক অন্ধকার জাহাজকাঠামো,
হোটেলের বিছানায় শুয়ে আছি, যখন আমার চারপাশের শহরটা জেগে উঠছে।
নিঃশব্দ অ্যালার্ম আর ধূসর আলোর প্রবাহ এসে
আমাকে ধীরে ধীরে পরবর্তী স্তরে, প্রভাতে উঠিয়ে আনে।
আড়িপাতা দিগন্ত। তারা কিছু বলতে চায়, মৃতেরা।
তারা ধূমপান করে কিন্তু আহার করে না, তারা শ্বাস নেয় না, কিন্তু তাদের
কণ্ঠস্বর রয়ে গেছে।
আমিও তাদেরই একজনের মতো রাস্তা দিয়ে ছুটে যাব।
কালো হয়ে যাওয়া ক্যাথিড্রাল, চাঁদের মতোই ভারী, তোলে জোয়ারভাটা।
…………..
স্লুইস গেট: জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কৃত্রিম ফটক বা দরজা।
[Robin Fulton অনূদিত Deep in Europe থেকে।]
ধূসর ফারের নভেম্বর
আকাশ এত ধূসর হয়ে গেছে যে
মাঠঘাট সব উজ্জ্বল হয়ে উঠতে শুরু করেছে:
লাজুক সবুজে ঢাকা তৃণভূমি,
কালো রুটির মতো গাঢ় আবাদি জমি।
একটি গোলাবাড়ির লাল দেয়াল,
কোনো এক এশিয়ার ঝলমলে ধানক্ষেতের মতো
জলমগ্ন সব মাঠঘাট─
সেখানে গাঙচিলেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করে।
অরণ্যের গভীরে কুয়াশাচ্ছন্ন সব শূন্যতা
ধীরে ধীরে পরস্পরের প্রতি মিহি ঝংকার তোলে।
নিভৃত সেই অনুপ্রেরণা, নিলস ড্যাকে’র
মতো অরণ্যে পালিয়ে যায়।
…………….
নোবেল ফার: Noble Fur; (SWE: Ädelt pälsverk); মিঙ্ক, সামুর বা ফক্সের মতো
দামি পশম।
কালো রুটি: পাল্টব্র্যড; (SWE: paltbröd); সুইডেনের একধরনের গাঢ় রঙের ঘন
ও পুরোনো রুটি।
নিলস ড্যাকে: (Nils Dacke); (১৬শ শতাব্দী) দক্ষিণ সুইডেনের কৃষক বিদ্রোহের নেতা।
পরাজয়ের পর তিনি দীর্ঘদিন স্মোল্যান্ডের (Småland) অরণ্যে আত্মগোপন করে ছিলেন।
[Robin Fulton অনূদিত November with Nuances of Noble Fur থেকে।]
মধ্যযুগীয় মোটিফ
আমাদের মোহনীয় মুখভঙ্গির নিচে সর্বক্ষণ অপেক্ষায়
আছে করোটি, ভাবলেশহীন। যখন সূর্যটা
ধীরে ধীরে আকাশে গড়াতে থাকে।
আর দাবাখেলা চলতে থাকে।
ঝোপ থেকে নাপিতের কাঁচির মতো কিচকিচ শব্দ আসে।
সূর্যটা ধীরে ধীরে আকাশে গড়াতে থাকে।
দাবাখেলা অমীমাংসিতভাবে থেমে যায়। রঙধনুর
নৈঃশব্দ্যের ভেতর।
………………
[Robin Fulton অনূদিত Medieval Motif থেকে।]
একটা শিশুর মতো
তুমি যেন একটা শিশু, আর ভয়ঙ্কর একটা অপমান
তোমার মাথার ওপরে একটা বস্তার মতো পরিয়ে দেওয়া
হলো; যে বস্তার বুনুনির ভেতর দিয়ে তুমি সূর্যের আভাস
দেখতে পাচ্ছ আর চেরি গাছের গুনগুন শুনতে পাচ্ছ।
তাতে কোনো লাভ হলো না, সেই বিশাল অপমানটা
তোমার মাথা, শরীর আর হাঁটুদুটো ঢেকে দিল আর তুমি
বিক্ষিপ্তভাবে নড়াচড়া করতে লাগলে কিন্তু বসন্তে
কোনো আনন্দই পেলে না।
হ্যাঁ, ঝলমলে টুপিটা তোমার মুখের ওপর নামিয়ে আনো
আর তার বুনুনির ভেতর দিয়ে তাকিয়ে থাকো।
খাঁড়ির ওপর নিঃশব্দে জড়ো হচ্ছে ঝাঁক ঝাঁক জলের বলয়।
সবুজ পাতারা পৃথিবীটাকে অন্ধকার করে দিচ্ছে।
………………
[Robin Fulton অনূদিত Like Being a Child থেকে।]
অনিশ্চয়তার রাজ্য
আন্ডার-সেক্রেটারি সামনে ঝুঁকে একটা ক্রসচিহ্ন আঁকলেন
আর তাঁর কানের দুলগুলো ডেমোক্লেসের তরবারির মতো দুলছিল।
মাটির ওপর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া একটা চিত্রল প্রজাপতির মতো
দানবটা খোলা সংবাদপত্রটির সঙ্গে মিশে ছিল।
কেউ প’রে নেই এমন একটা হেলমেট ক্ষমতা দখল করেছে।
মা কচ্ছপ জলের গভীরে উড়ে পালিয়ে যায়।
…………….
ডেমোক্লেসের তরবারি: Sword of Damocles; প্রাচীন গ্রিক উপকথার
একটি প্রতীক; ক্ষমতার সঙ্গে সর্বদা ঝুলে থাকা আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত।
[Robin Fulton অনূদিত National Insecurity থেকে।]
বহু পদক্ষেপ
আইকনগুলো মাটির তলে উপরমুখী করে
শোওয়ানো হলো, আর মাটি পিষ্ট হতে লাগল
চাকা আর জুতোর তলায়, হাজার হাজার পদক্ষেপে,
দশ হাজার অবিশ্বাসীর ভারী পদক্ষেপে।
স্বপ্নে আমি পাতালের এক উজ্জ্বল জলাশয়ে নেমে যাই,
এক উত্তাল উপাসনা।
কী তীব্র আকুলতা! কী নির্বোধ দুরাশা!
আর আমার ওপর লক্ষ লক্ষ অবিশ্বাসীর পদদলন।
…………..
আইকন: icon; খ্রিস্টীয় চার্চে ব্যবহৃত ধর্মীয় প্রতিচিত্র, সাধু বা যিশুর মুখচ্ছবি।
[Robin Fulton অনূদিত Many Steps থেকে।]
একটি শীতের রাত্রি
ঝড় বাড়িটার গায়ে মুখ রাখে আর
সুর তুলতে হাওয়া দিতে থাকে।
আমি অস্থিরভাবে ঘুমিয়ে ছিলাম, পাশ ফিরে,
চোখ বুজে ঝড়ের লেখাজোখা পড়ছিলাম।
কিন্তু অন্ধকারে শিশুটির চোখদুটি বড় বড় হয়ে গিয়েছিল।
আর ঝড়টা শিশুটির জন্যে আর্তনাদ করে যাচ্ছিল।
তাদের উভয়েরই দুলন্ত বাতিগুলো খুব পছন্দ ছিল।
তারা উভয়েই ভাষার মাঝপথে ছিল।
ঝড়ের ছিল শিশুসুলভ হাত আর ডানা।
কারাভান উন্মত্তের মতো ছুটে যাচ্ছিল লাপল্যান্ডের দিকে।
আর বাড়িটা তার দেয়ালগুলোকে একত্রে ধরে রাখা
পেরেকের নক্ষত্রপুঞ্জকে টের পাচ্ছিল।
আমাদের মেঝেটার ওপর রাত্রিটা ছিল শান্ত
(যেখানে সমস্ত বিলীন পদক্ষেপ একটি
পুকুরের তলে ডুবে যাওয়া পাতার মতো বিশ্রাম নিচ্ছিল।)
কিন্তু বাইরে রাত্রিটা ছিল উন্মত্ত!
দুনিয়ার ওপর দিয়ে আরও গুরুতর একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।
সেটা আমাদের আত্মায় মুখ রাখছিল আর
হাওয়া দিয়ে সুর তুলে যাচ্ছিল। ভয় হচ্ছিল
ঝড় আমাদের একেবারে শূন্য করে দেবে।
……………….
লাপল্যান্ড: Lapland; ফিনল্যান্ডের একটি জায়গা।
[Robin Fulton অনূদিত The Winter Night থেকে।]
থোরোর জন্যে পাঁচটি স্তবক
আরও একজন এই অতিকায় নগরীর বুভুক্ষু পাথরের
বলয় ছেড়ে চলে গেছে। আর স্ফটিকস্বচ্ছ লবণজল
সত্যিকারের সব আশ্রয়প্রার্থীর মাথার চারপাশে এসে
আছড়ে পড়েছে।
নৈঃশব্দ্য এখানে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে খুব ধীরে ধীরে
পাক খেতে খেতে উঠে এসেছে, শেকড় গেঁড়ে বেড়ে
উঠে লোকটির রৌদ্রতপ্ত চৌকাঠের ওপর তার ঝোপালো
মুকুটের ছায়া ফেলবে ব’লে।
*
পা একটা মাশরুমে আনমনে লাথি মারে।
দিগন্তে বজ্রমেঘ ফুলেফেঁপে ওঠে। তামার শিঙ্গার মতো
গাছেদের বাঁকা বাঁকা শেকড়গুলো সুর তুলতে থাকে
আর পাতারা সব আতঙ্কে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়।
শরতের বন্য উড়ালই হলো তার হালকা আলখাল্লা,
যেটা ঝাপটাতে থাকে, যতক্ষণ না হিম আর ভস্ম থেকে
ঝাঁক বেঁধে আবার শান্ত দিনগুলি আসে আর ঝর্ণাজলে
তাদের নখরগুলোকে অবগাহন করায়।
*
যে একটা গিজার দেখেছে, কেউই তাকে বিশ্বাস করে না,
থোরোর মতো যে একটা পাথরের কুয়ো থেকে পালিয়ে
এসেছে, আর যে জানে কীভাবে নিজের ভেতরের সবুজে
গভীরভাবে মিলিয়ে যেতে হয়, চতুর আর আশাবাদী।
……………..
থোরো: Henry David Thoreau; মার্কিন লেখক, দার্শনিক (১৮১৭-১৮৬২)।
গিজার: geyser; ভূগর্ভস্থ তাপে সৃষ্ট উষ্ণ প্রস্রবণ, যা হঠাৎ গরম জল ও বাষ্প
আকাশের দিকে উদ্গীরণ করে।
[Robin Fulton অনূদিত Five Stanzas to Thoreau থেকে।]
প্রারম্ভিকা
জেগে ওঠাটা হলো স্বপ্ন থেকে একটা প্যারাসুট জাম্প।
শ্বাসরোধী আবর্ত থেকে মুক্ত হয়ে অভিযাত্রী ভোরের
সবুজ অঞ্চলের দিকে নামতে থাকে।
সবকিছু জ্বলে ওঠে। কম্পমান লার্ক পাখির অবস্থান থেকে সে
বৃক্ষদের সেই বিপুল শেকড়তন্ত্রের ভূগর্ভস্থ দুলন্ত বাতিগুলোর
কথা টের পায়।
কিন্তু মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে উদ্ভিদরাজি─সবুজের
এক গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্লাবন─উদ্বাহু হয়ে তারা কান পেতে আছে এক
অদৃশ্য জলকলের স্পন্দনে। এবং সে গ্রীষ্মের দিকে ডুবে যেতে
থাকে, অত্যুজ্জ্বল তার জ্বালামুখের ভেতর নামতে থাকে,
সূর্যের টারবাইনের নিচে কম্পমান সবুজ স্যাঁতসেঁতে
যুগের খাদের ভেতর নামতে থাকে।
তারপর মুহূর্তেই তার এই নিম্নমুখী অভিযাত্রা থেমে যায়,
আর তার ডানার বিস্তার প্রবহমান জলের উপর
বাজপাখির মতো স্থির হয়ে ভেসে থাকে।
ব্রোঞ্জযুগের শিঙ্গাধ্বনির নির্বাসিত সুর
অতল গভীরতার উপর
ঝুলে থাকে।
দিনের প্রথমভাগে হাতের মুঠোয় একটা রৌদ্রতপ্ত
পাথরের মতো চেতনা জগতকে আঁকড়ে ধরে।
অভিযাত্রী বৃক্ষের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্যুর আবর্তের
ভেতর পতনের পর, মাথার উপরে তার বিপুল এক
আলো উদ্ভাসিত হবে কি?
………………
[Robin Fulton অনূদিত Prelude থেকে।]
অর্গান কনসার্টে এক সংক্ষিপ্ত বিরতি
অর্গান থেমে যায় আর গির্জার ভেতর মৃত্যুর নিস্তব্ধতা নেমে আসে,
কিন্তু সেটা মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্যে।
তারপর বাইরের রাস্তাঘাটের সেই বৃহত্তর অর্গানের ক্ষীণ গুঞ্জনটা
ভেতরে ঢুকে পড়ে।
হ্যাঁ, আমরা যানপ্রবাহের ক্ষীণ গুঞ্জনে পরিবৃত হয়ে আছি, যা কিনা
ক্যাথিড্রালের দেয়াল ঘেঁষে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
সেখানে বাইরের জগতটা স্বচ্ছ একটা চলচ্চিত্রের মতো ভেসে যাচ্ছে,
যেখানে ছায়াগুলো পিয়ানিসিমোর সুরে লড়াই করে চলেছে।
আর রাস্তার কোলাহলের মধ্যে আমি যেন নৈঃশব্দ্যে স্পন্দিত
আমারই কোনো নাড়ির স্পন্দন শুনতে পাচ্ছি।
আমি আমার রক্তপ্রবাহ শুনতে পাচ্ছি, আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা
সেই জলপ্রপাত, যা আমি সঙ্গে নিয়ে চলেছি,
এবং যা আমার রক্তের মতোই ঘনিষ্ঠ, আবার চার বছর বয়সের
কোনো দূর অতীত স্মৃতির মতো।
একটা লরির চলে যাওয়ার গর্জন শুনতে পাচ্ছি, যা ছ’শো বছরের
পুরোনো দেয়ালগুলোকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
এখানে মায়ের কোলের মতো কিছুই নেই, তবু এই মুহূর্তে
আমি যেন একটা শিশু,
যে বহু দূরে বড়দের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছে, বিজয়ী আর পরাজিতের
কণ্ঠস্বর মিলেমিশে যাচ্ছে।
নীল বেঞ্চগুলোতে অল্প কিছু উপাসক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে।
আর পিলারগুলো অদ্ভুত গাছের মতো উপরে উঠে গেছে:
তাদের কোনো শেকড় নেই (শুধু অভিন্ন এক মেঝে) এবং তাদের
কোনো মুকুট নেই (শুধু অভিন্ন এক ছাদ)।
আমি আবার সেই স্বপ্নে ফিরে আসি। যেন আমি একটা গোরস্থানে
একলা দাঁড়িয়ে আছি। যতদূর চোখ যায় সর্বত্র হেদার ফুল
জ্বলে আছে। আমি কার জন্যে অপেক্ষা করছি? এক বন্ধুর জন্যে।
সে কেন আসছে না? সে ইতিমধ্যেই এখানে।
মৃত্যু ধীরে ধীরে নিচ থেকে, মাটি থেকে, আলোটা বাড়িয়ে তুলছে।
হেদারের প্রান্তর ক্রমেই আরও উজ্জ্বল বেগুনি হয়ে উঠছে─ না,
এমন একটা রঙ হয়ে উঠছে যা কেউ কখনো দেখে নাই… যতক্ষণ
পর্যন্ত না ভোরের ম্লান আলো চোখের পাতা ভেদ করে হু হু করে
ঢুকে পড়ছে
আর আমি সেই অটল ‘হয়তো’র মধ্যে জেগে উঠছি, যা আমাকে
টলমলে পৃথিবীর ভেতর দিয়ে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে
আর জগতের প্রতিটি বিমূর্ত ছবিই একটা ঝড়ের নকশা আঁকার
মতোই অসম্ভব।
বাড়িতে বইয়ের তাকে দাঁড়িয়ে থাকত সর্বজ্ঞ বিশ্বকোষ, এক মিটার
জায়গা জুড়ে, আমি তাতেই পড়তে শিখেছিলাম।
কিন্তু প্রতিটি মানুষের জন্যেই লিখিত রয়েছে তার নিজস্ব বিশ্বকোষ,
যা প্রতিটি আত্মার মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
জন্ম থেকেই সেটা লেখা শুরু হয়ে যায়। শত-সহস্র পাতা
একে অপরের গায়ে চেপে দাঁড়িয়ে থাকে, তবু তাদের মাঝে
থাকে হাওয়া। কোনো অরণ্যের কম্পমান পাতাদের মতো।
স্ববিরোধের গ্রন্থ।
সেখানে যা লেখা রয়েছে তা প্রতি মুহূর্তে বদলে যায়, ছবিগুলো
নিজেরাই নিজেদের ঠিকঠাক করে নেয়, শব্দগুলো ঝিলমিল করে।
উত্তাল এক ঢেউ সমস্ত লেখার ভেতর দিয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে,
তার পিছু পিছু পরের ঢেউটা আসে, তারপর তার পরেরটা…
………….
পিয়ানিসিমো: pianissimo; সংগীতের পরিভাষা। গির্জায় বাজানো অর্গান বা
কোরাল সংগীতে (choral music) খুব আস্তে, প্রায় নিঃশব্দে বাজানো সুর।
হেদার: heather; ইউরোপীয় বুনো ফুল, বেগুনি রঙের ঝোপঝাড়জাতীয় উদ্ভিদ।
[Robin Fulton অনূদিত Brief Pause in the Organ Recital থেকে।]
শ্রদ্ধাঞ্জলি
প্রতিকাব্যিক দেয়াল বরাবর হাঁটি।
ডি মাউয়ার। ওইপারে তাকিও না।
এটা আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনকে ঘিরে রাখতে চায়,
রুটিন শহরে, রুটিন দৃশ্যপটে।
এলুয়ার একটা বোতাম স্পর্শ করলেন
আর দেয়ালটা খুলে গেল
এবং বাগানটা দেখা দিল।
আমি দুধের বালতি নিয়ে বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতাম।
চারদিকে বেগুনি বৃক্ষকাণ্ড।
মানতের ক্ষুদে জাহাজের মতো সুন্দর একটা
পুরোনো কৌতুক ঝুলে থাকত সেখানে।
গ্রীষ্ম পিকউইক পেপার্স পড়ত।
ভালো জীবন, শান্ত একটা বগি,
উত্তেজিত ভদ্রলোকে ভরা।
চোখ বোজো, ঘোড়াগুলো পাল্টাও।
সংকটে শিশুতোষ চিন্তারা আসে,
আমরা রোগশয্যার পাশে বসে প্রার্থনা করছিলাম,
আতঙ্কের মধ্যে একটুখানি বিরতির জন্য,
এমন একটা ফাটলের জন্য
যেখান দিয়ে পিকউইকেরা ঢুকতে পারে।
চোখ বোজো, ঘোড়াগুলো পাল্টাও।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা খণ্ডগুলোকে
ভালোবাসা সহজ। গির্জার ঘণ্টায় লেখা লিপি,
আর সাধুদের গায়ে লেখা বাণী,
আর হাজার হাজার বছরের পুরোনো বীজ।
আর্কিলোকাস! ─কোনো উত্তর নেই।
পাখিরা সমুদ্রের লোমশ পিঠ ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছিল।
আমরা সিমেননকে নিয়ে ঘরে নিজেদের আটকে
রাখতাম আর মনুষ্যজীবনের গন্ধটা টের পেতাম
যেখানে সব ধারাবাহিক কাহিনি গিয়ে শেষ হয়।
সত্যের গন্ধ নাও।
এখানে বৃক্ষচূড়াগুলোর সামনে
খোলা জানালাটি এসে থেমে গেছে।
আর সন্ধ্যার আকাশের বিদায়পত্র।
মৃত্যুর ব্ল্যাকবোর্ডে জীবনের চক হাতে
শিকি, বিয়র্লিং আর উনগারেত্তি।
সেই কবিতা, যা সম্পূর্ণ সম্ভব।
ডালপালা দুলে উঠলে আমি উপরে তাকালাম।
সাদা গাঙচিলেরা খাচ্ছিল কালো কালো চেরি।
…………
শ্রদ্ধাঞ্জলি: Hommages; বিভিন্ন কবি, লেখক ও শিল্পীকে নিবেদিত সম্মানজ্ঞাপন।
ডি মাউয়ার: Die Mauer; বার্লিন প্রাচীর; ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনকে
পৃথককারী প্রাচীর।
এলুয়ার: Paul Éluard (১৮৯৫-১৯৫২); ফরাসি সুররিয়ালিস্ট কবি; প্রতিরোধ আন্দোলনেরও
গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ।
মানতের জাহাজ: The Pickwick Papers; স্ক্যান্ডিনেভীয় গির্জায় মানত বা কৃতজ্ঞতার
স্মারক হিসেবে ঝোলানো ক্ষুদ্র জাহাজের মডেল।
পিকউইক পেপার্স: The Pickwick Papers; চার্লস ডিকেন্সের হাস্যরসাত্মক উপন্যাস
(১৮৩৬-৩৭); পিকউইক ক্লাবের সদস্যদের বিচিত্র ভ্রমণ ও অভিযানের কাহিনি।
আর্কিলোকাস: Archilochus; খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীর গ্রিক গীতিকবি; প্রাচীর গ্রিসের
অন্যতম ব্যঙ্গকবিও।
সিমেনন: Georges Simenon (১৯০৩-১৯৮৯); বেলজীয় ঔপন্যাসিক, কমিসনার মাইগ্রে
গোয়েন্দা-উপন্যাসের স্রষ্টা।
শিকি: Masaoka Shiki (১৮৬৭-১৯০২); জাপানি কবি, আধুনিক হাইকু ও টাঙ্কার অন্যতম
নবায়নকারী।
বিয়র্লিং: Gunnar Björling (১৮৮৭-১৯৬০); ফিনল্যান্ডের সুইডিশভাষী আধুনিকতাবাদী কবি।
উনগারেত্তি: Giuseppe Ungaretti (১৮৮৮-১৯৭০); ইতালির আধুনিকতাবাদী কবি;
হারমেটিক কবিতার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।
…………….
[Robin Fulton অনূদিত Hommages থেকে।]
লিফলেট
নিঃশব্দ ক্রোধ দেয়ালের ভেতরের দিকে আঁকিবুঁকি কাটে।
ফলগাছগুলো ফুলে ভরে গেছে, কোকিল ডাকছে।
এটা হলো বসন্তের মাদকতা, কিন্তু নিঃশব্দ ক্রোধ গ্যারেজের
ভেতরে তার স্লোগানগুলো উল্টো করে আঁকে।
আমরা সবই দেখি এবং কিছুই দেখি না, কিন্তু আমরা
ভূগর্ভের লাজুক ক্রুদের চালিত পেরিস্কোপের মতো
খাড়া হয়ে আছি। এটা হলো মুহূর্তগুলোর যুদ্ধ। গনগনে সূর্যটা
হাসপাতালের উপর দাঁড়িয়ে আছে, দুর্ভোগের পার্কিং লট।
আমরা জীবিতরা─ সমাজে ঠুকে দেওয়া পেরেক!
একদিন আমরা সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে যাব।
আমাদের ডানার নিচে অনুভব করবো মৃত্যুর হাওয়া
আর এখানকার চেয়ে আরও নম্র, আরও বন্য হয়ে উঠব।
…………..
[Robin Fulton অনূদিত leaflet থেকে।]
ক্যারিলোঁ
ম্যাডাম তার অতিথিদের ঘেন্না করেন কারণ তারা তাঁর
জীর্ণ হোটেলটাতে থাকতে চায়।
দোতলার কোণার ঘরটা আমার: বিশ্রী একটা বিছানা,
ছাদে একটিমাত্র বাল্ব।
অদ্ভুতরকম ভারী ভারী সব পর্দা, যেখানে আড়াই লক্ষ
ধূলিকীটের অদৃশ্য মিছিল।
বাইরে একটা পায়ে-চলা রাস্তায় ধীরগতির পর্যটক,
দ্রুতগামী স্কুলছাত্র, ঝনঝনে সাইকেল ঠেলে চলা
কাজের পোশাক পরা লোকজন।
যারা বিশ্বাস করে যে তারাই পৃথিবীটাকে ঘোরাচ্ছে, আর যারা
বিশ্বাস করে যে তারা অসহায়ভাবে পৃথিবীর মুঠোয় ঘুরপাক খাচ্ছে।
যে রাস্তায় আমরা সবাই চলি, সেটা কোথায় গিয়ে মেশে?
ঘরের একমাত্র জানালাটি অন্য কিছুর দিকে মুখ করে আছে:
সেই বুনো চত্বর,
ফেঁপে ওঠা মাটি, বিশাল থরথর একটা প্রাঙ্গণ,
কখনো জনাকীর্ণ, কখনো নির্জন।
আমার ভেতরের সবকিছু সেখানে মূর্ত হয়ে ওঠে,
সমস্ত ভয়, সমস্ত প্রত্যাশা,
সমস্ত অকল্পনীয়─অথচ যা ঘটবেই।
আমার সৈকতগুলো খুব নিচু, মৃত্যু বিশ সেন্টিমিটার উপরে উঠলেই
আমি তলিয়ে যাব।
আমি ম্যাক্সিমিলিয়ান। সালটা ১৪৮৮। আমাকে এখানে
ব্রুগে শহরে আটকে রাখা হয়েছে
কারণ আমার শত্রুরা হলো দিশেহারা, অশুভ আদর্শবাদী,
এবং বিভীষিকাময় পেছনের আঙিনায় তারা যা ঘটিয়েছে
সেটা আমি বর্ণনা করতে পারি না,
রক্তকে আমি কালিতে রূপান্তর করতে পারি না।
ওই কাজের পোশাক পরা লোকটাও আমি, যে নিচের রাস্তায় তার
ঝনঝনে সাইকেল ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।
ওই যে লোকটা, ওই পর্যটকটাও আমি, যে হাঁটে আর থামে, হাঁটে আর
থামে, আর পুরোনো চিত্রকর্মগুলোর চাঁদেপোড়া ফ্যাকাশে মুখ আর
ঢেউখেলানো পোশাকের ওপর চোখ বুলিয়ে নেয়।
আমি কোথায় যাব সেটা কেউই নির্ধারণ করে না, অন্তত আমি তো নই-ই,
তবু আমার প্রতিটি পদক্ষেপ যেখানে পড়ার কথা সেখানেই পড়ে।
ফসিল হয়ে যাওয়া যুদ্ধগুলোর ভেতর দিয়ে হাঁটি, যেখানে সবাই-ই
আঘাতের অতীত কারণ সেখানে সবাই-ই মৃত!
ধূলিধূসর পাতার স্তূপ, ফাঁকফোকড়ওয়ালা দেয়াল,
বাগানের পথ, যেখানে শিলিভূত অশ্রুগুলো
গোড়ালির নিচে মরমর করে…
আমি যেন আচমকাই একটা ফাঁদের তারে পা দিয়ে ফেলেছি,
অচেনা টাওয়ারে ঘণ্টার খেলা শুরু হয়ে গেছে।
ক্যারিলোঁ! যেন একটা থলি সেলাই বরাবর ফেটে গিয়ে
সুরগুলো ফ্লান্ডার্সের ওপর দিয়ে উপচে পড়ছে।
ক্যারিলোঁ! ঘণ্টার লোহার কূজন, স্তোত্র আর লোকপ্রিয় গান
সব একাকার হয়ে যায়, আর বাতাসে তার সেই কাঁপা-কাঁপা লেখা।
কাঁপা হাতের ডাক্তারটি একটি প্রেসক্রিপশন লিখেছিলেন যার
পাঠোদ্ধার করা যায় না, কিন্তু হাতের লেখাটি তার চেনা যায়…
ছাদ আর চত্বর, ঘাস আর ফসলের উপর দিয়ে,
জীবিত আর মৃতদের উদ্দেশ্যে ঘণ্টা বাজতে থাকে।
খ্রিস্ট আর খ্রিস্টবিরোধীদের আলাদা করা কঠিন।
ঘণ্টাগুলো শেষমেশ আমাদের উড়িয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনে।
এখন তারা থেমে গেছে।
আমি আবার হোটেলের ঘরে ফিরে এসেছি: সেই বিছানা, বাতি, পর্দা।
এখানে অদ্ভুত একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে, বেসমেন্ট যেন
সিঁড়ি বেয়ে নিজেকে টেনে উপরে তুলছে।
আমি দু’হাত ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে আছি।
আমি এমন একটা নোঙর, যা নিজেকে গভীরে গেঁথে নিয়েছে আর
উপরে ভাসমান সেই বিপুল ছায়াটাকে শক্ত করে ধরে আছে,
বিশাল সেই অজানাকে, আমি যার একটি অংশ এবং যা
অবশ্যই আমার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাইরে পায়ে-চলার সেই রাস্তাটি, যে রাস্তায় আমার পদক্ষেপগুলো
মিলিয়ে যায়, আর আমার লেখাও মিলিয়ে যায়,
আমার নৈঃশব্দ্যের মুখবন্ধ, আমার উল্টো স্তোত্র।
…………
ক্যারিলোঁ: Carillon; টাওয়ারে ঝোলানো একধরনের ঘণ্টাবাদ্য। এতে অন্তত
২৩টি বা তার বেশি ঘণ্টা থাকে, যেগুলো ক্রোম্যাটিক স্কেলে সাজানো থাকে এবং
কীবোর্ড বা লিভারের সাহায্যে বাজানো হয়। বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস অঞ্চলে
এর দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
ম্যাক্সিমিলিয়ান: Maximilian; ম্যাক্সিমিলিয়ান প্রথম, পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের
ভবিষ্যৎ সম্রাট। ১৪৮৮ সালে ফ্ল্যান্ডার্সের বিদ্রোহের সময় তাকে ব্রুগে শহরে বন্দি
করে রাখা হয়েছিল। ব্রুগে বেলজিয়ামের ফ্ল্যান্ডার্স প্রদেশের একটি শহর।
……………….
[Robin Fulton অনূদিত Carillon থেকে।]
ভ্রমণ
আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন।
অনিমেষ এক মৃত আলোয়
অনেক প্লাকার্ডের মধ্যে মানুষের ভিড়।
ট্রেনটা এসে মুখ আর ব্রিফকেসগুলো
তুলে নেয়।
পরের স্টেশন─অন্ধকার। বগির ভেতরে
আমরা মূর্তির মতো বসে ছিলাম,
বগিগুলো বিশাল এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের
ভেতর দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
জবরদস্তি, স্বপ্ন, জবরদস্তি।
সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচের স্টেশনগুলোতে তারা
অন্ধকারের খবর বিক্রি করছিল।
ঘড়ির ডায়ালের নিচে লোকজন
বিষণ্নমুখে নিঃশব্দে চলাফেরা করছিল।
ট্রেনটা বাইরের পোশাক-আশাক আর
আত্মা বহন করছিল।
পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে
আমরা চারদিকে তাকাচ্ছিলাম।
এখনও কিছুই পাল্টায়নি।
কিন্তু ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি আসতেই
মুক্তিভ্রমরের গুঞ্জন শুরু হলো।
আমরা মাটি থেকে উঠে এলাম।
দেশটা আমাদের নিচে একবার তার
ডানা ঝাপটে স্থির হয়ে গেল,
বিস্তীর্ণ এবং সবুজ।
প্ল্যাটফর্মে শস্যের শীষ
উড়ে আসছিল।
শেষ স্টেশন! আমি শেষ স্টেশনের পরেও
এগোতে লাগলাম।
সঙ্গে আর কয়জন ছিল?
চার-পাঁচজন, তার বেশি নয়।
ঘরবাড়ি, পথঘাট, আকাশ,
নীল খাঁড়ি, পাহাড়,
তাদের জানালা খুলে দিল।
……………
[Robin Fulton অনূদিত The Journey থেকে।]
রাত্রিখাতার পাতা
মে মাসের এক রাতে
হিম এক জ্যোৎস্নায়
আমি তীরে পা রাখি, যেখানে
ঘাস আর ফুলগুলো ছিল ধূসর
কিন্তু গন্ধটা ছিল সবুজ।
বর্ণান্ধ সেই অন্ধকারে আমি
ঢাল বেয়ে ভেসে উঠি,
যখন সাদা সাদা পাথরগুলো
চাঁদকে সংকেত পাঠাচ্ছিল।
একটা সময়কাল,
কয়েক মিনিট দীর্ঘ,
আটান্ন বছর চওড়া।
এবং আমার পেছনে
সিসাধূসর ঝিলমিলে জলের ওপারে
ছিল অন্য তীর,
আর তারা, যারা রাজত্ব করত।
মানুষ, মুখের জায়গায় যাদের ভবিষ্যৎ।
………….
[Robin Fulton অনূদিত A Page from the Nightbook থেকে।]
ঘুমপাড়ানি গান
অরণ্যের নীল কফিনের ভেতর আমি এক মমি শুয়ে আছি, মোটর আর
রাবার আর অ্যাসফল্টের অবিরাম গর্জনের ভেতর।
দিনের সব ঘটনা তলিয়ে যায়, বাড়ির কাজ জীবনের চেয়ে ভারী হয়ে ওঠে।
ঠেলাগাড়িটি তার একটিমাত্র চাকার ওপর ভর করে গড়াতে থাকে আর আমি
আমার ঘূর্ণায়মান মনের ওপর ভর করে ঘুরতে থাকি, কিন্তু এখন আমার
চিন্তারা তাদের ঘূর্ণন থামিয়ে দিয়েছে আর ঠেলাগাড়িটিও তার ডানা পেয়ে গেছে।
শেষমেশ যখন কালো হয়ে আসবে মহাকাশ, একটি এ্যারোপ্লেন আসবে।
যাত্রীরা নিচে গথদের স্বর্ণের মতো ঝলমলে শহরগুলো দেখতে পাবে।
………….
গথদের স্বর্ণ: Gold of the Goths; ইউরোপের প্রাচীন গথ জনগোষ্ঠীর স্বর্ণশিল্প।
[Robin Fulton অনূদিত Berceuse থেকে।]
১৯৭২’এর ডিসেম্বর সন্ধ্যা
এই যে এসেছি আমি, অদৃশ্য মানুষ, সম্ভবত কোনো এক
মহাস্মৃতির দ্বারা নিয়োজিত, শুধু এই মুহূর্তে বেঁচে থাকার জন্যে।
আর আমি গাড়ি চালিয়ে পার হয়ে যাচ্ছি সেই তালাবদ্ধ সাদা গির্জাটা─
যার ভেতরে এক কাঠের সাধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে হাসছেন,
যেন কেউ তাঁর চশমাটা ছিনিয়ে নিয়েছে।
তিনি বড় একা। বাদবাকি সবকিছুই এখন, এখন, এখন। মহাকর্ষ
দিনে আমাদেরকে
কাজের দিকে আর রাতে আমাদেরকে শয্যার দিকে টেনে নেয়। যুদ্ধ।
…………..
[Robin Fulton অনূদিত December Evening 1972 থেকে।]
কালো পোস্টকার্ড
১
ক্যালেন্ডারটা পূর্ণ হয়ে গেছে, ভবিষ্যৎ অজানা।
ক্যাবলটা দেশহীন এক লোকগীতি গুনগুন করে।
সীসানিথর সাগরের ওপর তুষারপাত। জেটির ওপর
ছায়াদের মল্লযুদ্ধ।
২
জীবনের মধ্যাহ্নে মৃত্যু এসে মানুষের মাপজোক
করে। আমরা সেই আগমনটা ভুলে যাই এবং
জীবন চলতে থাকে। কিন্তু নিঃশব্দে চলতে থাকে
কাফনের সেলাই।
………….
[Robin Fulton অনূদিত Black Postcards থেকে।]
নীল হেপাটিকা
মন্ত্রমুগ্ধ হওয়া─এর চেয়ে সহজ কিছু নেই। এটা হলো মাটি আর বসন্তের প্রাচীনতম
জাদুগুলোর একটা: নীল হেপাটিকা। তারা যেন খানিকটা অপ্রত্যাশিত। তারা গত
বছরের শুকনো বাদামি পাতার মর্মর থেকে মাথা তোলে, এমন সব অবহেলিত জায়গায়,
যেখানে এমনিতে কারও নজর পড়ে না। তারা জ্বলে আর ভাসে, হ্যাঁ, সত্যিই ভাসে,
এবং সেটা তাদের রঙের জন্যেই। সেই ব্যাকুল বেগুনি-নীল রঙটার এখন আর কোনো
ওজন নেই। এখানে উচ্ছ্বাস আছে, কিন্তু ছাদটি নিচু। এখানে ‘ক্যারিয়ার’─ অপ্রাসঙ্গিক!
‘ক্ষমতা’ আর ‘প্রচার’─হাস্যকর! তারা তো নিনেভেতে একটা বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন
করেছিল। তুমুল ধুমধাম আর বিকট কোলাহল। উঁচু ছাদ─ সবার মাথার উপর কাচের
শকুনের মতো ঝুলে ছিল স্ফটিকের ঝাড়বাতি। এমন অতি-অলঙ্কৃত আর শোরগোলময়
অন্ধগলির বদলে নীল হেপাটিকারা সত্যিকারের উৎসবের দিকে এক গোপন পথ খুলে
দেয়, যা মৃত্যুর মতোই নিস্তব্ধ।
…………..
নীল হেপাটিকা: Hepatica; সুইডেনের বসন্তে ফোটা এক ধরনের নীল বুনোফুল।
নিনেভে: Nineveh; প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার এক সমৃদ্ধ নগরী, বাইবেলে যা রাজকীয়
আড়ম্বর ও বিলাসিতার প্রতীক।
[Robin Fulton অনূদিত The Blue Wind-Flowers থেকে।]
চূড়া
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিফটগুলো নাজুক পোর্সেলিনের মতো
বহুতল ভবনগুলোর ভেতর দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করল।
বাইরে অ্যাসফল্টের ওপর আজকের দিনটি হবে তপ্ত।
ট্রাফিক সাইনের চোখের পাতাগুলো ঢুলুঢুলু।
দেশটা হলো আকাশের দিকে উঠে যাওয়া খাড়া একটা ঢাল।
চূড়া আর চূড়া, প্রকৃত ছায়া নেই কোনো।
তোমার খোঁজে আমরা উড়তে থাকি,
সিনেমাস্কোপের গ্রীষ্মের ভেতর।
আর সন্ধ্যায় আমি আলো নিভিয়ে একটা জাহাজের মতো
শুয়ে থাকি, বাস্তবতা থেকে যথাযথ একটা দূরত্বে,
যখন নাবিকেরা তীরের পার্কগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
…………..
[Robin Fulton অনূদিত Crests থেকে।]
নান্নু মাহবুব

জন্ম: ১১ জুন, ১৯৬৪, যশোর। লেখালেখির শুরু ৮০’র দশকে।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ: রাত্রিকালীন ডাকঘর (প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৫)
দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ: পুনরুত্থিত শহর (প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০০৫)
তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ: আজ কী ফুল ফুটিয়েছো, অরণ্য? (প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০১৩)
প্রতিভাস, কোলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ইউ জী কৃষ্ণমূর্তির
সাক্ষাৎকারভিত্তিক ৪টি অনূদিত গ্রন্থ:মাইন্ড ইজ আ মিথ, নো ওয়ে আউট, থট ইজ
ইয়োর এনিমি, ও মিস্টিক অব এনলাইটেনমেন্ট।
……….
