পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

আসা-যাওয়ার পথের পাশে যুদ্ধের চিন!

মাত্র কিছুদিন আগেই যে আমরা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে গিয়েছি, সেই যুদ্ধের নানা চিহ্ন তখনও সিলেটের নানা জায়গায় বিদ্যমান ছিল। সরকারি অগ্রগামী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে আমাদের ক্লাসরুমগুলিতে তখনও নানান ধরণের পোস্টার সাঁটানো ছিল। ক্লাস ফোর-বি তে একটা পোস্টার ছিল, তাতে কয়েকজন মানুষের ছবি ছাপা ছিল, যারা সবাই দুইহাতে দুই কান চেপে ধরা। নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল–

গুজবে কান দিবেন না, আপনার বন্ধুকেও না করুন!

ক্লাস ফাইভ-এ তে ছিল আরও দুটি পোস্টার। একটাতে লেখা ছিল–

সাইরেন! সাইরেন! সাইরেন!

ওই পোস্টারের চিত্র ছিল, কিছু লোক পড়িমড়ি করে ছুটে চলেছে। যেন সব ফেলে তাদের উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতেই হবে, কারণ হাতে একদম টাইম নাই! এখুনি দৌড়ে গিয়ে টেঞ্চের ভিতর লুকিয়ে পড়তে হবে। না লুকালেই মহাবিপদ! বুলেট ছুটে এসে তোমাকে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিয়ে যাবে। ফলে বন্দুক তাক করার আগেই তুমি ফিরে যাও নিরাপদ স্থানে।

আরেকটাতে বন্দুকের নল কাধের একপাশে রেখে কিছু লোক বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কারোরই অবয়ব তেমন স্পষ্ট নয়! যেন কোনো আবছায়া তাদের আড়াল করে রেখেছে! অবয়ব আড়াল করলেও বিষণ্ণতা আড়াল করতে পারে নাই। আমি তখন থেকেই জেনেছিলাম, কোনো রঙ দিয়েই বিষণ্ণতা আড়াল করা যায় না। কারণ বিষণ্ণতা নিজেই এমন একটি জোরালো রঙ, যা অন্য সব রঙকে ছাপিয়ে ওঠে!

আবছায়ায় দাঁড়ানো লোকগুলির নিচে লেখা বড় বড় কালো হরফে লেখা ছিল

‘জয়বাংলা’।

আমাদের বাসার বড় জানালার সানশেডে একটা বেশ বড়সড় গর্ত–যেন শক্ত-ধাতব কোনোকিছু লেগে কিছু সিমেন্ট-চুন-বালি-সুরকি ঝুরঝুর করে নিচে পড়ে গেছে। তারা নিচে পড়ে যাওয়ার সময় বেশ খানিকটা শেড ভোগলা করে রেখে গেছে! এই গর্ত কেন বা কীভাবে হলো বুঝতে পারতাম না। আব্বা প্রায়ই বলতো–

শালারা, এইখানেও আইস্যা শেল ফালাইয়া গেছে! পাকিগুলা এমুনই ক্ষতি কইরা গেছে আমাগোরে।

শেল যে কি জিনিস সেটাও আমাদের বোধগম্য হতো না। কিন্তু এটা বুঝতে পারতাম, এই শেল কোনো গুলিটুলি বা তেমন কিছুই হবে। তক্ষুণি মনে পড়ে যেত, করটিয়ায় থাকার দিনগুলিতে আমরা কতোই না ছুটাছুটি করেছি! এই গ্রাম থেকে ওই গ্রামে বার কয়েক হিজরত করেছি। আর গোলাগুলির শব্দ শুনলেই ট্রেঞ্চের ভিতর লুকিয়ে থেকেছি। ট্রেঞ্চের ভিতর সকলের জায়গা না হলে দুই ঘরের পাশাপাশি ডোয়ার মধ্যিখানে বসে থেকেছি, যাতে গুলি এসে আমাদের গায়ে না লাগে। আমার অবশ্য আরেকটা অভিজ্ঞতা হয়েছে– মাটির দেয়ালের ভিতর বসে থাকতে অদ্ভুত ভালো লাগে। কেমন অচেনা মিহি হীমে শরীর ক্রমে শান্ত হয়ে আসে। তখন চোখে রাজ্যির ঘুম ঢুকে পড়ে। কিন্তু অমন অপরিসর জায়গায় শুয়ে পড়ার কোনো উপায় নাই। তখন বসে বসে গাছে ঝুলন্ত পাখিদের মতো ঢুলতে হয়। শুয়ে পড়ার উপায় নাই, তাও ওই ডোয়ার আড়ালে কী জানি এক নিবিড় প্রশান্তি রয়েছে। ট্রেঞ্চে বা দুই ঘরের ডোয়ায় আড়ালে লুকিয়ে থাকলে কেমন একটা নিশ্চিত অনুভূতি জাগে– যেন কেউ আমাকে আর দেখতে পাবে না। আমাকে কেউ কোনোদিন আর খুঁজে পাবেনা। পাওয়া সম্ভব নয়। আদতে এসব ছিল বোকার চিন্তা। হয়তো ওই বোকাবয়সে এমনভাবেই চিন্তা করা যায়। কারণ এই পৃথিবীতে লুকিয়ে থাকার খুব বেশি জায়গা মানুষের অন্তত নাই। যেখানেই তুমি লুকাও না কেন, কেউ না কেউ তোমার সন্ধান জেনে যাবে। তবে হ্যাঁ , মানুষ যখন গোরের মাটিতে চাপা পড়ে শুধু তখনই সে চিরতরে লুকাতে পারে। চিরকালের বিশ্রামও বোধকরি তখন তার জোটে।
রিকশা করে ইশকুলে যেতে যেতে আরেকটা ভয়াবহ ধ্বংসের চিহ্নও আমাদের দেখতে হতো। সুরমা নদীর কিনারে, ক্কীনব্রীজের অদূরেই একটা ঘড়িঘর ঘাড়মাথা ভেঙে পড়ে আছে। ঘড়িঘরের গম্বুজের মতো মাথাটা দুমড়েমুচড়ে বুকের কাছে ঝুলে আছে। আর ঘড়ির মাঝখানের কিছু অংশ উধাও হয়ে গেছে। মিনিটের কাঁটাটা তেরছা হয়ে একেবারে পেটে ঢুকে আছে। টিনের ঘরের উপরে গম্বুজের মাথায় একটা বড়সড় ঘড়ির ওইরকম শোচনীয় অবস্থা আমাদের হররোজই দেখতে হতো। আমার খুব ইচ্ছে হতো ওই ঘড়িঘরের ভিতরটা দেখবার দেখে আসতে। কিন্তু সে উপায় ছিল না। ইশকুলের যাওয়ার তাড়াতে ওইখানে একদণ্ডও দাঁড়ানো যেতো না।

তাছাড়া আমার ইচ্ছা পূরণ হওয়ার কোনো উপায়ও ছিলনা। ওই ঘড়িঘরের কোনো দরোজা আমি কোনোদিন খুঁজে পাইনি! আদৌ কোনো দরোজা সে ঘরের আছে কিনা বা ছিল কিনা তা ঈশ্বর মালুম।

অনেক পরে জেনেছিলাম এই ঘড়ির নাম ‘আলী আমজদের ঘড়ি’! কুলাউড়ার পৃত্থিমপাশার জমিদার আলী আহমদ খান এই ঘড়িটি ক্কীনব্রিজের পাশে নির্মাণ করেন। এবং জমিদার আলী আহমদ তাঁর ছেলে আলী আমজদের নামে এই ঘড়িঘরের নামকরণ করেন। বহু বছরের পুরাতন ওই ঘড়ি! ১৮৭৪ সালে মহানগরী সিলেটের প্রবেশ দ্বারে এই ঘড়িটি প্রায় নিঃশব্দে চলতে শুরু করে। তখন এই ঘড়ির ডায়ামিটার ছিল আড়াই ফুট আর কাঁটা ছিল দুই ফুট লম্বা।

আলী আমজদের ঘড়িটি মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত হয়।

এই ঘড়িঘরকে নিয়ে প্রায়ই আমি ক্লাসের বন্ধুদের মুখে ছড়া শুনতাম–

চাঁদনী ঘাটের সিঁড়ি
আলী আমজদের ঘড়ি,
জিতু মিয়ার বাড়ি
বঙ্কুবাবুর দাঁড়ি!

ধারণা করি, তখন হয়তো সিলেটে এসবই বিখ্যাত ছিল। চাঁদনী ঘাটের সিঁড়ি বা জিতুমিয়ার বাড়ি কিংবা বঙ্কুবাবুর ঐতিহাসিক দাঁড়ি দেখার বা সেসবের ইতিবৃত্ত জানার উপায়ও আমার ছিল না।আর আমার বন্ধুরাও ছড়া আওড়িয়েই খালাস ছিল। তারাও সেভাবে জানতো না, জিতুমিয়ার বাড়ি আমাদের ইশকুল থেকে কত দূর? বা বঙ্কুমিয়ার দাঁড়ির খোঁজ একবার অন্তত করা যেতে পারে কি না?

আমরা যখন ঘাড়ভাঙা শালিকের মতো পড়ে থাকা ঘড়িঘরটিকে দেখছি, তখন ওই ঘড়ির প্রায় ১০০ বছর বয়স হয়ে গিয়েছে। এই ১০০ বছরের প্রাচীন ঘড়িটি নাকি একদিনের জন্যও থামে নাই।বন্ধ হয় নাই। কোনোদিনই সে বৃদ্ধ হয় নাই। অর্থাৎ আলী আমজদের ঘড়ির কাঁটা কয়েক সেকেন্ডের জন্যও স্থির থাকে নাই। কিন্তু পাকিস্তানী হানাদাররা ওই চিরচলমান ঘড়িকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছিল!

রিকশার হুড তুলে ইশকুলে যাওয়ার পথে আমি মুখ বাড়িয়ে ভেঙে পড়া ঘড়িটিকে দেখে নিতাম। ইশকুল থেকে ফেরার পথেও দেখতাম। আর মনে মনে ভাবতাম, আচ্ছা এই ঘড়িটা চলে না কেন? চললে আমাদের কতোই না উপকার হয়!

আমরা সঠিক সময় জেনে ঘরে ফিরতে পারি।

তখনো আমাদের হাতঘড়ি পরার বয়স হয়নি। ফলে সময় জানার জন্য ঘড়িওয়ালা কাউকে না কাউকে জিজ্ঞেস করতেই হতো। কিন্তু আমার ইচ্ছেপুরণ করে আলী আমজদের ঘড়িটি কখনই সচল হতো না। ঘড়ির মিনিট বা ঘন্টার কাঁটাটাকে আমি কোনোদিন নড়তে দেখতাম না!তৃষিত নয়নে তাকিয়ে থাকতাম, কিন্তু আলী আমজদের ঘড়ির কাঁটা কিছুতেই টিকটিক করে ডেকে উঠতো না!

মুক্তিযুদ্ধের রেখে যাওয়া ক্ষতের সম্মুখ দিয়ে আমাদের বালিকাবেলা দ্রুত দৌড়ে যেত। সুরমা নদীর ঢেউ এসে আছড়ে পড়তো পারে। কিন্তু ঢেউয়ের শব্দের চাইতে আমাদের কানে যেন স্পষ্ট হয়ে বাজতো গুলির শব্দ। বোম্বিংয়ের শব্দ। আমরা দেখতে পেতাম কিছু বিধ্বস্ত দালান-কোঠা। সানশেডে শেল পড়ার চিহ্ন। আর ঘাড়ভাঙা শালিকের মতো একটা মস্তপানা ঘড়ির মৃত্যু! আমরা অনুভব করতাম, বুঝতে পারতাম, অনেক কষ্টকর একটা যুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই স্বাধীনতা এনেছে! (চলবে)

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।