ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমা: পাঠ এবং একজন সাদামাটা দর্শকের ভূমিকা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের জেন্ডার কোর্সের তৎকালীন শিক্ষক রেহনুমা আহমেদ জানালেন কোর্সের টেক্সট হিসেবে আমরা দুটো ছবি পাঠ করতে যাচ্ছি— বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘লাল দরোজা’ আর ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘দহন’। সালটা সম্ভবত ২০০০ / ২০০১। লালমাটিয়ায় শিক্ষকের বাসার চারতলায় বসার ঘরটাতে কোনো এক দুপুরে আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জমিয়ে পড়তে বসি সিনেমা। জানলাম সিনেমার ভাষা, কারিগরি দিক সম্পর্কে শূন্যজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পরও সিনেমাকে পাঠ করা যায়। জীবনে ওই প্রথম সিনেমাকে টেক্সট হিসেবে পড়া। ঋতুপর্ণ ঘোষের সাথে প্রথম দেখা হওয়াও।
চলচ্চিত্রের ভাষা মূলত ক্যামেরার ভাষা। সেটা বোঝা আমার কম্মো নয় কারণ আমি চলচ্চিত্রের হার্ডকোর শিক্ষার্থী নই। কাজেই ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমা নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে ওই পথে আমি হাঁটবো না নিশ্চিত। বিষয়ের বৈচিত্র্যে, গভীরতায়, ভাবনার অনন্যতায় ঋতুপর্ণ ঘোষ আমার কাছে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। আগ্রহটা আমার ওই সবখানে। আমার সবচে’ কাছের মানুষ মু মানে কাজী শুসমিন আফসানা যিনি পেশাগত দিক থেকে রাজশাহী নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক এবং একজন লেখক এবং এই মুহূর্তে ঋতুপর্ণ ঘোষের কাজ নিয়ে গবেষণারত, ঋতুপর্ণের সিনেমা ও ব্যক্তি ঋতুপর্ণকে নিয়ে একদিন আমাদের আড্ডায় প্রসঙ্গক্রমে বললেন, “ঋতুপর্ণ ঘোষ আমার কাছে একজন আধুনিক মানুষ। চলচ্চিত্রকার ঋতুপর্ণ এবং ব্যক্তি ঋতুপর্ণকে দেখে আমি শিক্ষিত হয়ে উঠি।” ভেবে দেখলাম অন্তরাত্মা দিয়ে আমিও এইটে মানি। ব্যস, কথাটা মেরে দিলাম। মানে কোনো শিল্প সাহিত্যের আড্ডায় ঋতুপর্ণ ঘোষ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটলে সুযোগ পেয়ে আমি কথাটা চাউর করি। বিশ্বাস করুন, করতে ভালো লাগে। ক্রমে ক্রমে আমি এই কথাটির সাথে আরো একটি বাড়তি লাইন যোগ করি- একজন সভ্য মানুষ বলতে যে চেহারাটা ভাসে আমার মনশ্চক্ষে, সে ঋতুপর্ণ ঘোষ। মনের মত কাউকে পাওয়া কঠিন। ঋতুপর্ণ তার দহন সিনেমায় ঠাম্মি চরিত্রের মুখ দিয়ে তা বলিয়েও নিয়েছেন— “ঠিক তোর মনের মতো কাউকে দেখেছিস দিদি? তুই কাউকে দেখেছিস যে ঠিক তোর মনের মতোন? তোর বাবা, মা, ছোটন, আমি, ঠিক তোর মনের মতোন? তুই নিজে কি ঠিক তোর মনের মতোন, দিদি?” তবু কেউ কেউ বেশ খানিকটা মনের মত হয়ে যান। ঋতুপর্ণ আমাদের কাছে, আমার কাছে মনের মত এক ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁর সিনেমা নিয়ে একটি বাক্য লিখতে গিয়ে খাবি খেলেও এক ধরনের নির্ভার বোধ আমাকে ঘিরে থাকে। যেন যেখানেই থাকুন, কোমল একটা নির্ভরতা দিয়ে রেখেছেন আমাকে।

আমাদের মধ্যশ্রেণির সাহস-ভীরুতা-কৌতুহলের সীমাগুলো একটা আরেকটাকে ওভারল্যাপ করে ভীষণ ভাবে। যে কারণে ঠিক করে ওগুলোর চেহারা চেনা মুশকিল। তবে উৎপাতটা টের পাওয়া যায় ভালোই। ‘স্বাভাবিক’ মূল্যবোধ, মতাদর্শ বলে পরিবার, সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র যা কিছু চাপিয়ে দেয় ব্যক্তির ওপর তার সবটাই ‘নিরীহ’ ‘স্বাভাবিক’ নয়। এই ব্যাপারটা ঋতুপর্ণ তার সিনেমা দিয়ে দর্শকদের বুঝিয়ে দিয়েছেন বেশ করেই। দহনের উদাহরণ আবার দেই— “৯ নম্বর গলফ ক্লাব রোড… আমার শ্বশুরবাড়ির অ্যাড্রেস… আমার নতুন ঠিকানা… ১২/১৪ ফুটের একটা সিকিউরিটি”। ঋতুপর্ণ ঘোষ সোজাসাপ্টা বলতে পারে একটা ‘সোশ্যাল সিকিউরিটি’ কত প্রলেপ মেখে চেপে বসে আছে জীবনে, মামদো হয়ে। আর এভাবেই অনেক প্রথা, নিয়ম-কানুন স্বাভাবিক করে ভেবে নেয়ার অভ্যাস করে যায় নারী। আবার একই সঙ্গে মানুষের মনোজগত ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও ঋতুপর্ণের গভীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে নির্মাতা হিসেবে। দোসর সিনেমার কথাই ধরুন। স্বামীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা যখন জানতে পেরেছে কাবেরী তখন স্বামী দূর্ঘটনার কবলে আর তার প্রেমিকা মৃত। মৃত প্রেমিকা মিতার স্বামী তার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে হতবিহ্বল। স্ত্রীর প্রেমিকের স্ত্রীকে তার বাসায় গিয়ে নিজের যৌনকর্মীর সংসর্গে যাওয়ার কথা বলেন। তারপর এক সময় বলে চলেন, “একটা মানুষ বেঁচে থাকলে তার সঙ্গে ঝগড়া করা যায়, রাগ করা যায়, কৈফিয়ত চাওয়া যায়। মরা মানুষের সাথে কী ঝগড়া করবেন, বলুন?” উত্তরে কাবেরী বলে,“আর একটা মানুষ যদি বেঁচে থাকে? আর ২৪ ঘণ্টা অন্য একটা মানুষের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকে, তাহলে? এ আলোচনার কোনো শেষ নেই। নদীর এপার ওপারের মতো।” আত্মপরিচয়গত সংকটকে নানা দিক থেকে দেখেছেন ঋতুপর্ণ। তা নইলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রাঙ্গদার এ ক্রাউনিং উইশ-এর মত এমন ইন্টারপ্রিটেশন কী করে দাঁড় করালেন তিনি। বললেন, “যার যেটা স্বভাব সেটাই তো স্বাভাবিক, না? স্বভাবেরও তো একটা ইচ্ছে আছে।” নৃবিজ্ঞানের একটা প্রচলিত টার্ম আছে যেটি বাজারে ভীষণ চালু— হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ। সোজা ভাষায় যে কোন বিষয়কে সামগ্রিক দিকে থেকে দেখার বোঝার চেষ্টা। আমার সামান্য পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে এটির সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন ঋতুপর্ণ তার সিনেমা ভাবনায়। তিনি জেনেছেন সত্য’র কোনো একটা অ্যাবসল্যুট চেহারা নেই। আছে অনেকগুলো কাঙ্ক্ষিত সত্য, চেষ্টিত সত্য। যেমন করে সত্যকে নির্মাণ করলে আমাদের সুবিধা হয়, শোষণটা লাভজনকভাবে বজায় থাকে, তেমন করেই আমরা সত্যকে পেতে চাই। সে কারণেই নানা রকম কায়দা-কানুনের উৎপত্তি ও বিস্তার। তারপরও মহাভারত, উপনিষদ এবং রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত ঋতুপর্ণ শাশ্বতের সন্ধানে, শুদ্ধি মুক্তির সন্ধানে ব্যাপৃত হন। আর এ কারণেই তার নির্মিত সিনেমাগুলো কোথাও না কোথাও মমতামণ্ডিত থাকে।

দহন চলচ্চিত্র দিয়ে পরিচয় হবার পর ঋতুপর্ণের সাথে একটু একটু করে আলাপ বাড়লো। তারপর আগপিছু করে উনিশে এপ্রিল, বাড়িওয়ালী, উৎসব, তিতলি, শুভ মহরত, অন্তরমহল, চোখের বালি, রেইনকোট, দ্য লাস্ট লিয়ার, খেলা, আবহমান, সব চরিত্র কাল্পনিক, দোসর, নৌকাডুবি, চিত্রাঙ্গদা। পরীক্ষার খাতা থেকে ততদিনে ঋতুপর্ণ চলে এসেছে মনে মননে। পর্দা থেকে সোজা বুকের ভেতর। আর ব্যক্তি ঋতুপর্ণকে দেখে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে মানুষ স্বাধীন। ঢের খেসারত দিয়ে হলেও মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পায়। হজম করে একাকীত্বের কষাঘাতও।

সহজে কিছু তৈরি হয় না, সহজে কিছু নড়েও যায় না। তারপরও ভাঁজ খোলার সাহস ঋতুপর্ণ তার চলচ্চিত্র দিয়ে দেখিয়েছেন সেটা বলতে হয়। ঋতুপর্ণের ছবি আড়ালের বিষয়গুলোকে সামনে আনে। আপাত সাধারণ-স্বাভাবিক কথার আড়ালে চিন্তা আর চিত্তের অবস্থান পষ্ট করে চেনানোর মত আর কাউকে পাই নি ঋতুপর্ণ ছাড়া। খোলাখুলি বললে ঋতুপর্ণ একজন সৎ ও সাহসী চলচ্চিত্র নির্মাতা। বিষয় এবং পরিবেশন রীতি উভয় দিক থেকেই তা প্রযোজ্য বলে আমার মনে হয়। প্রণম্য চলচ্চিত্র সমালোচক চিদানন্দ দাশগুপ্ত’র একটা কথা তুলে দিই এ প্রসঙ্গে—“সমস্ত বাধাবিঘ্ন সত্ত্বেও সৎ চলচ্চিত্র যে কেবল টিকে আছে তা নয়, চলচ্চিত্রে শিল্পীর কণ্ঠস্বর এখনো এই বিরাট বাজারে সমাবেশের মধ্যে যথেষ্ট শুনতে পাওয়া যায়, এটাই আশ্চর্যের বিষয়। এবং সৎ চলচ্চিত্রেই এই মাধ্যমের প্রকৃত ইতিহাস ও পরিচয়; কেননা উদ্ভাবনী শক্তির উৎস এখানেই, এবং শিল্পীজনের উদ্ভাবন থেকে ধার নিয়েই চলচ্চিত্রের ব্যবসায়ী-সত্তা বেঁচে থাকে।” দেখুন, ঋতুপর্ণ মানুষকে চেনায়। যা আমরা সভ্যতার নামে প্রথার নামে প্রচ্ছন্ন রাখি, ঋতু তার প্রকাশ ঘটান। আর ঋতুর প্রকাশ নান্দনিক। মনে হয় মধ্যশ্রেণির দর্শকেরা সুন্দরকে নতুন করে চিনল। ঋতুপর্ণ’র সিনেমা সৎ সিনেমা। একজন শিল্পীর সিনেমা। ঋতুর সিনেমা ব্যবসা করে, ঋতুর সিনেমা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়। আমরা তার সিনেমার নানা দৃশ্যে, দৃশ্যান্তরের গল্পে ঘুরে বেড়াই শ্রেণিবদ্ধ অন্দরমহলে, ঠাকুর বাড়ির অনাবিষ্কৃত দরোজা ঠেলে ভেতর বাড়ির উঠোনে, ভেঙে পড়ার আগের যৌথ সংসারগুলোর সংকটে, রৈ রৈ উদযাপনে, গলি-ঘুপচি পার হয়ে ঢুকেছি আমাদের অন্তরমহলেও। ঋতুর সিনেমায় নারীর প্রতি রয়েছে প্রগাঢ় যত্ন, মমতা। নারীর বঞ্চনা, বেদনা, সমঝোতা, লড়াই, অর্জন, ত্যাগ তার প্রতিটি সিনেমায় কোনো না কোনো প্রাধান্য নিয়ে দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয়। উচ্চকিত স্বর নয়, ঋতুর উচ্চারণ কবিতার মত। অনুভূতির কদর এতে একটা বাড়তি মাত্রা যোগ করে অবশ্যই।

ঋতুপর্ণের ছবিতে সম্পর্কের ‘ডিফিউশন নেট’ ঠিকঠাক বোঝা যায়। ‘ডিফিউশন নেট’— যা ব্যবহৃত হত সিনেমার প্রধান চরিত্র বিশেষ করে নায়ক-নায়িকার ইমেজকে কোমল মোহময় করে তুলতে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেটি হলো মায়া। অস্পষ্টতা আর জটিলতার ভেতর সুন্দরকে সাজানোর যে চেষ্টা সেটা ফুটিয়ে তোলে ঋতুপর্ণের ছবি। তার চরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিয়েছেন— “জোর করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করো না, চেষ্টাটা দেখো যাচ্ছে।” আমাদের দৈনন্দিন সম্পর্কের প্রাত্যহিক চেষ্টাগুলো ঋতুপর্ণ ঘোষ নান্দনিক চিত্রকল্পে ফুটিয়ে তোলেন। যেন আমাদের বাঁচা খানিকটা অর্থবহ হয়, সম্পর্কের সহজতাগুলো নজরে আসে। তাই, ঋতুপর্ণ ঘোষ ও তার সিনেমা ‘জাজ’ করতে বসে যায় না কোনো চরিত্র বা সম্পর্ককে। আর কোথাও না কোথাও তার শাশ্বতের নিভৃতসন্ধান জারি থাকে। ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার একজন সাদামাটা পাঠক হিসেবে আমি আহ্বান করব আর সব পাঠকদের তার চলচ্চিত্রের দর্শক হতে। আমাদের প্রশ্ন করবার, সহজ দৃষ্টিভঙ্গী প্রয়োগ করবার প্রয়োজন বড় বেশি করে দেখা দিয়েছে। ভেতর-বাইরের পৃথিবীর নির্মমতা, তারস্বর অন্তত তা-ই বলে।

 

সাবেরা তাবাসসুম


কবিতা লেখা শুরু পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার অনুপ্রেরণায়। পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই ১৪টি। ১৩টি মৌলিক কবিতা এবং একটি হিন্দী ও উর্দু কবি গুলজারের কবিতার অনুবাদ-গ্রন্থ। একমাত্র পুত্রকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটে। চলচ্চিত্রের প্রতি রয়েছে তীব্র টান। সবকিছু্র বাইরে কবিতাই সাবেরার আরাধ্য ভূমি, পাশাপাশি অনুবাদ ও মুক্ত গদ্য লেখা তো আছেই।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।