সাবেরা তাবাসসুমের পাঁচটি কবিতা

বহু দিন পরে এ শহরে রাত ক’রে একা

এ শহর জেগে থাকে
কাঁকড়-ভাতে কোনো মতে ধুঁকে ধুঁকে
তোমার-আমার মতো ঘুমখেকো মিনমিনে নয়
মাছের কাঁটার আশা, সাথে প্রভু-ভৃত্যের ভয়
ক্লান্তি-জরা দূর হতে ক্রমশ বিষাদ নেড়ে আসে
সারা রাত থোকা থোকা আলোর সংকেত ভাসে
শব্দে অ-সুর ভ’রে আমাদের বাহনেরা ছুট
নারকেল গাছগুলো ধর্ম-প্রণেতাদের মতো নিশ্চুপ
বাতাস কি বয়? প্রতিবেশী বাতাস কি বয়?
তুমি তো বেঁধেছ বাঁধ, খুঁড়ছো রাস্তা সমুদয়
এ শহর প্রেম নয়, ধর্ষণ দেখে বুড়ো হলো
বাকিটা দেখাক ক্ষয়, নামানো পর্দাটা তোলো!

নেমেছে সবুজ কিছু বাতি

শহরে নেমেছে আজ সবুজ পোশাক পরা বাতি
ঘরে ফিরে যাবে যারা ফিরেছে সহজ সংকেতে
বাকি সব বনসাই ইতিউতি চেয়ে দেখে কাকে
প্রবেশের দরোজায় লেখা নেই ভাঁড়েরা, স্বাগত
কোথায় কে যাবে আজ, সর্বদা বৃষ্টি-পাহারা
দুনিয়া দখল করা হুল্লোড় যেন মহামারী
নীরবতা চেয়ে চেয়ে ঝুঁকেছি দেহের কাছাকাছি
আবছা ছায়াটি বাঁধা কতিপয় মেঘে ও মননে
বিদ্যুৎ খেলে যায় অতিলৌকিক রঙে রঙে
ধূসরতা যার দান কমলা রোদেই তার প্রেম
শীত ঠেলেঠুলে, লালজামা-মেয়েটি এসেছে
ভুলিয়ে ভালিয়ে, করি তাকে মিঠানদী পার
শহর খেলছে বেশ, যাকে আমি বানিয়ে তুলেছি
শহর দেখাবে শেষ, নেমেছে সবুজ কিছু বাতি।

পাখি
(ভাস্কর নভেরা আহমেদ)

পাখির হৃদয় পেতে কে চায়
সকলেই চায় মাংস
কেউ কেউ উড়বার অসীম ডানা
কেউ দূরদৃষ্টির বর
কালো এক বেড়ালের থাবা
তাকে ঠান্ডা মাংসে পরিণত করতে পারে
তবু তিনি পাখি ও বেড়াল ভালোবাসেন
পাখির জন্যে দানা আর
বেড়ালের জন্যে মাংস কিনতে
দুটো বিপরীত বাজারে যেতে হয় তাকে
তবু তিনি বেড়াল ও পাখি ভালোবাসলেন
একের জন্যে অন্যকে
একের বিপরীতে অপরকে
পুষে যান দীর্ঘ দিন
যতক্ষণ না পাখি শেষ ডাকটি ডাকে
যতক্ষণ না বেড়াল থাবার রক্ত চেটে নেয়
পাখির হৃদয়– ছোট্ট গোলক–
পড়ে থাকে পাঁচ দিন হিমঘরে
এক কাঁধে গোলাপ
অন্য কাঁধে মৃত পাখি নিয়ে
ডালাটি বন্ধ হয় তাঁর
ডালা বন্ধ হলে দু পায়ের সমস্ত কাজ শেষ
দু হাত অবশেষে অবসরে
বাগানে তখন পোড়ে ‘বাসনা এক সর্পের নাম’
বাগান তখন দেখে
উড়ছে বিভোর ডানার আশ্চর্য কফিন!

এই কথা পৃথিবীতে কাউকে ব’লো না

এই কথা পৃথিবীতে
কাউকে ব’লো না যেন আর
পৃথিবীর বাইরে চলে গেলে
ভেসে ভেসে শোনাতেও পারো
খুব সঙ্গোপনে
কাউকে কাউকে
যেন শেষ বেলাকার শীত
রোদ সেঁকে ধীরপায়ে
উঠে এসে ধ্যানস্থ হয়
আসন্ন তিমিরে
যে চেয়েছে বিবর্ণ স্থিতি
যে চেয়েছে একরোখা রাত্রিযাপন
তার সঙ্গদান অব্যর্থ হবে কি কখনো
আমার সমাধি-পাশে
যে গল্প শুয়ে থাকে আজ
কাল তার কাকজন্ম
খুঁটে খায় প্রবাদ বাক্য
শীতে ও সততায়
আচারনিষ্ঠ ছিল সে
আমি তার চটচটে ঠোঁটে
ঠেকিয়েছি ব্যথিত আঙুল
পৃথিবীর বাইরে দেখা হলে
অচেনা পরস্পর
দেখা হলে পরস্পর বিভ্রান্ত পথিক
এই কথা প্রেম হয়ে রটে যেতে পারে
এই কথা অপচয় হয়েছে নিশ্চয়ই
আমি তাই মৃতেই সামিল
আমি তাই ভূতপূর্ব তোমার দোসর
পৃথিবীতে এই কথা ভুলে ডুবে যায়
পৃথিবীতে এই কথা তুমি আর কাউকে ব’লো না!

একটা লাইন নিয়ে ফিরে যাচ্ছি বাড়ি

একটা লাইন নিয়ে ফিরে যাচ্ছি বাড়ি
শহরের ধূলায় মিশে থাকে স্মৃতি প্রাক্তন
চাদরের কোণায় ঢাকি ভাব, ঢাকি আড়ি
আমার এক চোখে প্রেম, অন্যটায় ছানি
একটা লাইন নিয়ে ফিরে যাচ্ছি বাড়ি

পুকুরে সাঁতার শেখা আমি ও মাছ
সকল শাসন ফেলে ছোটা কিশোর যৌবন
সাইকেল, লাল সোয়েটার, শস্য রকমারি
আমার এক চোখে ভুল, অন্যটায় ছানি
একটা লাইন নিয়ে ফিরে যাচ্ছি বাড়ি

একটা লাইন নিয়ে ফিরে যাচ্ছি বাড়ি
শহরে নেমেছে শীত, মুদ্রা ও সম্মোহন
আবার অপেক্ষা, প্রস্তর সারি সারি
আমার এক চোখে মৃত্যু, অন্যটায় ছানি
একটা লাইন নিয়ে ফিরে যাচ্ছি বাড়ি!

 

সাবেরা তাবাসসুম


কবিতা লেখা শুরু পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার অনুপ্রেরণায়। পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই ১৪টি। ১৩টি মৌলিক কবিতা এবং একটি হিন্দী ও উর্দু কবি গুলজারের কবিতার অনুবাদ-গ্রন্থ। একমাত্র পুত্রকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটে। চলচ্চিত্রের প্রতি রয়েছে তীব্র টান। সবকিছু্র বাইরে কবিতাই সাবেরার আরাধ্য ভূমি, পাশাপাশি অনুবাদ ও মুক্ত গদ্য লেখা তো আছেই।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।