সন্দীপিত জলপিপি


পাপড়ি রহমান

 

ধূসর বরন মেঘ করেছে তখন
রোদ্দুরে তেজ ছিল না মোটে আর
হাসপাতালের হিমশীতল ঘরে
দেখা হলো বকুল আর বাবার

আকস্মিক এই রোগশয্যার দিনে
কেউ রাখেনি বাবার কোনো খোঁজ
আকাশ ভেঙে পড়লো বুঝি ঘাড়ে
আকুল হয়ে বকুল কাঁদছে রোজ

অক্সিজেনের মুখোশ দিয়ে ঢাকা
অচল বাবার সরল মুখখানি
ঝাপসা স্বরে বলছিল বুঝি কিছু
শেষ বিদায়ের হয়তো কোনো বাণী

শুনতে শুনতে বুকের ভেতর ঢেউ
দু’কূল ভেঙে ছুটিয়া ছুটিয়া আসে
নোনাজলতলে ডুবন্ত এক নারী
খুঁজিয়া না পায় কাউকে তখন পাশে

তাকিয়ে দেখে আঁধার করা দিন
গাছলতাতে তেমনি আছে থেমে
বাবার পাশে মায়ের আর্ত মুখ
তাপানুকূলেও উঠছে কেমন ঘেমে

ঝমঝমিয়ে বিষ্টি নামে প্রবল
সুচের মতো সূক্ষ্ম জলের ধারা
পথের পর পথ ভেসে যায় শুধু
জলপিপিটা ভেজে আত্মহারা

বাবা তখন আবছাভাবে ডাকে
ভ্রমের মাঝেও তেমনি ধ্বনি শুনে
‘বকুল, বকুল, বকুল গেলি কই?’
এমন ডাকের অর্থ সবাই জানে

ওই নামটি অক্সিজেনে ভেসে
বাবার বুকের মধ্যিখানে জমে
ক্লান্ত স্বরটি ধীরে ধীরে ম্রিয়মাণ
বাবার হাতে পাল্সের রেট কমে

বাউকুড়ানি তীব্র ছোবল মেরে
পাতার ফাঁকে ঢুকিয়ে দেয় মাথা
বকুল গোনে ঝড়ের গতিবেগ
বাবা তাহার বলে না আর কথা

জলপিপিটা হঠাৎ করেই যেন
বজ্রপাতে পুড়ে কয়লার ছাই
বিলাপের সুরে জননী তখন কাঁদে
বাবার কণ্ঠে বকুল ডাকটি নাই

এমন তুফান ঝড় ও জলের মাঝে
বাবা তো আর খোলে না তার আঁখি
পায়ের তলায় শুষ্ক মরুভূমি
জলপিপিটা ছিল জলের পাখি

আগুন লেগে পুড়িয়া গেছে হঠাৎ
কুঁকড়ে-মুকড়ে রহিয়াছে তার ডানা
উড়িবার সেই আসমানটাও কাছে
পাখপাখালিও রয়েছে সেথা নানা

কিভাবে যে পরে জাগে আজদহা রাত
অথবা নামে বিরান কোনো দিন
বকুল সেসব জানে না কিচ্ছুটি
পিতৃশোকে তার অবস্থা সঙ্গীন

গোরের মাটি তখনো ভীষণ ভেজা
সবুজতনু গজায়নি কোনো ঘাস
আমের ডালে দোল খেয়ে যায় বাবুই
কার যে হবে কোথায় সর্বনাশ!

গুটিশুটি মেরে এত্তটুকুন হয়ে
ঘুমায় বকুল নিজ বিছানায় কোণে
স্বামী সহসাই দরজা ঠেলে ঢোকে
কুবুদ্ধি কিছু আঁটছে মনে মনে

অঘোরে বকুল ঘুমায় মরার মতো
দুঃখ-শোক আর বেদনায় বেআকুল
পেটের উপান্তে শিরশির হাঁটে সাপ
দংশিতে তার জিভ করে চুলবুল

কাঁচাঘুমখানি চটকায়ে যায় দ্রুত
অন্ধকারে হয় না ঠাহর কিছু
বিষ-উপচানো লকলকে লাল ফণা
কোন ফাঁকে যে নিয়েছে তার পিছু

বরফ দেহ নিস্তেজ পড়ে থাকে
মনে পড়ে তার শোকার্ত সব দিন
সাপটা বুঝি-বা বিষ ঢেলে প্রশমিত
ঘরময় কেউ বাজিয়ে গিয়েছে বীণ

ধর্ষিতা বউ স্বামীর বিকার দেখে
বাবার কবর এখনো অনেক ভেজা
গাছের পাতারা ঝরিতেছে অবিরল
পেটিকোটে দেখ রক্তের দাগ তাজা

অশ্রুজলে মাথার বালিশ ভেজে
শুয়ে যেন-বা সটান কোনো লাশ
বীর্য ঢেলেই উঠে গেছে গৃহস্বামী
ভোরবেলাতেই পিটাইতে যাবে তাস

সেদিন থেকেই বকুল ভীষণ পাথর
ড্রেনের পানিতে বোবাকালা আরশোলা
উড়ে গিয়ে বসে খাটের তলায় চুপ
চোখ দুটি তার কান্নার আঘাতে ফোলা

কলের তলায় পেতে রাখে মাথা-মুখ
জলের শব্দে অঝোরে বকুল কাঁদে
চিলেকোঠার বাধা পেরিয়ে গিয়ে
কান্না কিন্তু  পৌঁছায় না ছাদে

জলপিপিটার পালক গিয়েছে পুড়ে
বুকের খাঁজে নিদারুণ এক ক্ষত
জানটাই শুধু বাঁচার নিয়মে বাঁচে
দশা তার অবিকল কঙ্কালের মতো

শাড়ি ও ব্লাউজে অমনোযোগের ছাপ
যেন কিছুই আর স্পর্শ করে না তারে
চোখের কোণেতে বাসী কাজলের ছোপ
গোপন কথা বলবে সে আর কারে!

স্বামী দেখে রেগেমেগে কাঁই হয়ে ওঠে
‘শিখছো আবার নতুন কীসব ঢঙ?
বাপ তো সবার মরছে প্রতিদিনই
তোমার মতো করছে কে অত রঙ!’

কুয়াশা তখন আরো ঘন হয়ে ঝরে
হঠাৎ করেই ধুলার বাড়াবাড়ি
শীতের হাওয়া লাগিয়ে দেয় কাঁপন
ডাকপিয়নটা কড়া নাড়ে তাড়াতাড়ি

হলদিয়া খামে এসেছে এ কার চিঠি!
হরফগুলো এমন গোটা গোটা
মুখ খুলতেই বেরিয়ে পড়ে খত্
সাদা পৃষ্ঠায় রক্তজবার ফোঁটা

নাম লিখিয়াছে কত-না যতন করে
কোথাকার কোন যুবা নাকি কোনো বুড়ো?
কেমন করে-বা পেল তার ঠিকানাটা
ধরা পড়লেই গৃহকলহের চুড়ো?

হাজার হাজার পাখি ওড়ে আসমানে
শিসিয়ে ওঠে ভাবুক দোয়েল কোনো।
লতা দোল খায় বনস্পতির বুকে
নতুন কথার গানটি সবাই শোনো।

চলছে কথা হুড়মুড়িয়ে হাওয়ায়
ভাসছে যেন জলের ওপর কোষা
হলদিয়া খামে রৌদ্রের রেণু ভরে
পাঠিয়ে চলেছে নিতিদিনকা আশা

জলপিপিটার পালক গজায় ফের
জলের আশায় তাকিয়ে থাকে জল
শালুক ফুলে ঢাকছে যেন দিঘি
নদীর দেহে হাওয়ার কলকল

ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে শুধু
নিজেই যেন-বা অধরা এক ছায়া
ক্ষতের দাহ নিমিষেই হয় উধাও
বকুল ফুলের পাশটিতে কার মায়া!

কাজলরেখা কিনে এনেছিল প্রাসাদে
কঙ্কনের মূল্য দিয়ে নাম কঙ্কদাসী
লীলাপটু সেই দাসী ও কুমার মিলে
কাজলরেখাকে করেছিল বনবাসী

এই বাড়িতেও কঙ্কদাসীর বাস
আয়তি তবুও কিছুই পায় না টের
হলদিয়া সেই পাখির গানের পিঠে
জললিপি লিখে নিজেকেই যেন খোঁজে

আচমকা একদা অসুর অন্ধ স্বামী
পাহাড় কেটে জ্বালিয়ে দেয় আগুন
ষাঁড়ের মতো বাগিয়ে আসে শিং
হিংসা শুধু হিংসা বাড়ায় দ্বিগুণ

‘লাইলীর মতো দিওয়ানা তুই হলি
ভরণপোষণ অথচ সব আমার
বেরো বাড়ি থেকে এক্ষুণি তুই মাগী
হওয়ার আগে ভীষণভাবে চামার’

বিশ মণি এক থাপ্পড় মেরে
স্বামী হুঙ্কার ছাড়ে
‘রাধাচক্কর কাকে বলে
দেখাবোই আজ তোরে’

মারের চোটে লোহু ছোটে
অসুর ফোলায় পেশি
‘হারামজাদির জবর সাহস
বাড় বেড়ে গেছে বেশি।’

মুচকি হেসে কঙ্কাদাসী বলে
‘তুমিই আমার পরমারাধ্য প্রভু
ডাক দিয়ে দেখ আমারে মধ্যযামে,
পানের থেকে চুন খসবে না কভু’

বকুল ফুল এবার তবে দাসী
মাথা কুটিয়া মরে স্বামীর পায়ে
‘কী করেছি আমি এমন দোষ
শাস্তি দিচ্ছ কোন পাপের দায়ে!’

‘বজ্জাত মাগী নখরা করিস
ঢং দেখলেও মরি
হাওয়ার ভেতর প্রেম ধরেছিস
গলায় দে গা দড়ি’

হলুদ খামের ভেতর হলুদ প্রেম
পাণ্ডুর রোগে ধরেছিল তারে নাকি?
উড়ন্ত কোন অবুঝ প্রজাপতি
নাড়তো পাখা এদিক-সেদিক তাকি’

জলপিপিটা পুড়লো যেদিন আঁচে
বাবার মরণ তাকিয়ে দেখে দেখে
আঁধার হয়ে ডাকলো চারিধার
ঝড় বইছিল তুমুল থেকে থেকে

ছোট্ট খামের ফুল্লকুসুম চিঠি
যুবক তাকে লিখত প্রতিদিন
শোনাতো অনেক ঘুমপাড়ানী গান
মনের ভেতর আঁকতো আশার চিন

এমন করেই বাঁচিয়া ছিল বকুল
শুকিয়ে ছিল গোরের ভেজা মাটি
বাবা শুধু ঘুড়ি হয়ে ওড়ে
আর চিঠির ভাষা ছিল শীতলপাটি

টুকরো লেখা, আধেকখানা পাতায়
বকুল তাতেই ভুলতো বিষ যত
অসুর লোকটা তখন ঘাটে-মাঠে
দাবড়ে বেড়ায় গাধা গাভি শত

শ্রাবণ এখন জাঁকিয়ে বসে চোখে
দিবারাত্রি অঝোরে জল ঝরে
বকুল মানেই ঘোর বর্ষার ফুল
বাকি কথা জানাবো আরো পরে।

সম্পূর্ণ কাল্পনিক কাহিনি
রচনাকাল ২৫ জুলাই ২০১১

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *