সুদূর অর্কেস্ট্রা: সালভাদর দালি (শেষপর্ব)


ফেরদৌস নাহার

শেষপর্ব                 চতুর্থ পর্ব ।। তৃতীয় পর্ব ।।  দ্বিতীয়  পর্ব ।। প্রথম পর্ব

ক.
এই শিল্পীর আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় তা হলো, সালভাদর দালি তার বিশাল সব ভাস্কর্যগুলোর মিনিয়েচার সংস্করণও তৈরি করে গেছেন নিজ হাতে। বলতে গেলে প্রায় সবগুলো লাইফ সাইজ কাজেরই অসংখ্য ছোট ছোট সংস্করণ রয়েছে। হয়তো এক্ষেত্রে কোনো কোনো কাজের মাধ্যম ভিন্ন। যেমন ব্রোঞ্জের তৈরি The Nobility of time-এর মিনিয়েচার ফর্মের কাজটিও দেখলাম, যা কিনা পাথর দিয়ে তৈরি করেছেন। এক সুইডিশ দম্পতি কৌতূহল বশত ছোটটির দাম জিজ্ঞেস করলেন, উত্তর এলো: বিক্রির জন্য নয়। কারণ— বহু বছর আগেই এটি বিক্রি হয়ে গেছে ষোল হাজার পাউন্ডে। বাংলাদেশের টাকায় কতো হতে পারে ভাবতে গিয়ে আমার মতো অংকে কাঁচা মানুষের পক্ষে সাহস করে আর এগুনো সম্ভব হলো না। চমকে ওঠার আগেই থেমে গেলাম। তৃতীয় বিশ্বের এক ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ দেশের শিল্পভূক পর্যটক আমি। শিল্পী সালভাদর দালির অরিজিনাল শিল্পকর্ম দেখতে পাচ্ছি এইতো পরম সৌভাগ্য! আর এই সৌভাগ্য নিয়েই সরে পড়লাম সেখান থেকে। তারচে’ বরং আরো কিছুক্ষণ কাটাই গিয়ে দালির অমর সব সৃষ্টিগুলোর সঙ্গে। দেখে নেই প্রাণভরে ওগুলোর আঁক-বাঁক, ভঙ্গি-রহস্য। অনুভব করি- স্যুরিয়ালিস্টিক শিল্পবোধের চূড়ান্ত সৃষ্টিশৈলী।

ঘড়ির কাঁটা প্রায় সাতটা ছুঁতে চলেছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যই এখান থেকে বেড়িয়ে পড়তে হবে। যেতে হবে রয়েল ফেস্টিভেল হলে। সেখানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ওপেন এয়ার ড্যান্স কন্সার্ট। এতদিন শুনে এসেছি ওপেন এয়ার মিউজিক কন্সার্টের কথা। কিন্তু নাচের উপর ওপেন এয়ার— এই প্রথম শুনলাম। আর আমি আশ্চর্য হলেও একথাও সত্যি যে, এধরনের নাচের প্রোগ্রাম খোদ লন্ডনেও আজই প্রথম অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সে অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবু এসে গেল এই কারণে যে, লন্ডন শহরের রঙ্গ মেলায় কত কিছু যে নিত্য নতুন ঘটে চলছে তার হিসাব আমার মতো দু’দিনের অতিথির পক্ষে রাখা সম্ভব নয়। তাই বা বলি কী করে, যারা এখানে অনেক কাল ধরে আছেন তাদের অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি— তারাও যে সব খবর রাখেন বা রাখতে পারেন তাও নয়। কসমোপলিটন নগরের এটাই বৈশিষ্ট্য।

প্রদর্শনীর শেষ পর্বে পৌঁছে গেছি। এই কক্ষে রয়েছে স্যুভেনির শপ ও কফি পার্লার। পৃথিবীর সবদেশেই মিউজিয়াম, আর্ট গ্যালারি ও দর্শনীয় স্থানগুলোতে ‘স্যুভেনির শপ’ বিষয়টি স্বতঃসিদ্ধ। যে অপূর্বতায় স্যুভেনিরের দোকানগুলো সাজানো হয়, তাও যেন এক একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এবার সেদিকটায় গেলাম। কিন্তু গিয়ে বেশ একটা ধাক্কা খেতে হলো। কারণ এই বিশাল প্রদর্শনীকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সে তুলনায় সালভাদর দালিকে নিয়ে সাজানো স্যুভেনির শপটি একেবারেই আকর্ষণীয় বলে মনে হলো না। খুবই সাদামাটা, বর্ণহীন— হতাশ হলাম । সাধারণত যে কোনো প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে নানা রকমের প্রিন্ট করা ব্যাগ, টি-শার্ট, প্ল্যাস্টিক বা মেটাল আর্ট রেপ্লিকা, কাচের মগ, শো-পিস ও ম্যাগনেট পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে তেমন কিছু চোখেই পড়লো না, অবাক হলাম। কেবল দালির নিজের লেখা বায়োগ্রাফি ও দালিকে নিয়ে অন্য লেখকদের লেখা কিছু বই পেলাম, দাম আকাশ ছোঁয়া। নেড়ে চেড়ে রেখে দিতে হলো। অবশেষে কয়েকটি ভিউ-কার্ড ও পোস্টার কিনে বেরিয়ে এলাম।

খ.
তখনো টেমস নদীতে বিকেল সোয়া সাতটার সূর্যটা জ্বলজ্বল করছে। আমি আর শামীম আপা দু’জনে হেঁটে চলছি চুপচাপ, কারো মুখে কোনো কথা নেই। কোন মহাবিশ্ব প্রদক্ষিণ করে এলাম, উপলব্ধি করতে করতে কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়। ইতিহাস, শিল্প ও হেরিটেজের এই দেশে, সালভাদর দালি যেন তার অসম্ভব দম্ভ নিয়ে শাসন করেছেন সময়কে। সর্বময় শিল্পের অধিকারী এই শিল্পী সারা জীবন ধরে নানা স্বাদের সৃষ্টিতে মেতে ছিলেন। ১৯৪২ সালে নিউ ইয়র্কের দালি প্রেস থেকে প্রকাশ করলেন বিতর্কিত আত্মজীবনী ‘The Secret Life of Salvador Dali’। লুই বুনুয়েলের সঙ্গে কাজ করে অর্জন করেছিলেন ফিল্ম তৈরির অভিজ্ঞতা। ১৯৪৫-এ আলফ্রেড হিচককের স্পেলবাউন্ড ছবির বিখ্যাত স্বপ্নদৃশ্যের সেট নির্মাণ করে দিলেন। নিজের চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লিখেছেন, কস্টিউম ডিজাইন, সেট ডিজাইন করেছেন। ১৯৪৬ সালে আমেরিকায় ওয়াল্ট ডিজনির সঙ্গে এনিমেশন ফিল্মের জন্য কাজ করেন। মঞ্চের জন্যেও বহু কাজ করেছেন দালি। ইংল্যান্ডের খ্যাতনামা নাট্য-ব্যক্তিত্ব ও পরিচালক পিটার ব্রুকের মতো গুণীজনের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। প্রচণ্ড শিল্পের ক্ষুধা নিয়ে জন্মেছিলেন। তাই বুঝি তৃপ্তি খুঁজে পেতেন না কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রেখে। দশহাতে কাজ করে গেছেন। এমন কী দোকানের ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসাবেও ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সমগ্র শিল্প-বিশ্বটাকে চষে বেড়িয়েছেন সালভাদার দালি। লেখালেখিতে কেবল আত্মজীবনীই নয়— নভেল, ফিকশন, স্ক্রিপ্ট, প্রবন্ধ, বক্তৃতা অন্যদিকে তেলরঙ, জলরঙ, ড্রইং, গ্রাফিক্স, ভাস্কর্য, ফটোগ্রাফি, লিথোগ্রাফি, ফিল্ম, অভিনয়, জুয়েলারি— সব যেন অকাতরে ধরা দিয়েছে এই শিল্পীর হাতে, তুলিতে ও কলমে। সবকিছুই যেন চূড়ান্ত এক শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য ও রুচি নিয়ে সফলভাবে প্রকাশিত হয়েছে তার হাতে।

১৯৮২-র গ্রীষ্মে শিল্পী সালভাদর দালির দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী ও স্ত্রী গালার মৃত্যু তাকে স্তব্ধ করে দেয়। জীবনের প্রতি সকল আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তিনি, আগ্রহ হারালেন শিল্প সৃষ্টির প্রতিও। বরং অনেকটা যেন আত্মহননের পথে ঝুঁকে পড়লেন। মানসিকভাবে এতটাই বিধ্বস্ত হয়ে পড়লেন যে, একবার তো শোবার ঘরে  আগুনের মুখোমুখি পর্যন্ত হলেন। এর ফলে তার প্রতি সতর্ক নজরদারের মাত্রাও বাড়াতে হলো। গালার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর তিনি কেবল বলেছিলেন, “…she is not dead, she will never die…”।

শেষ ছবি আঁকলেন ১৯৮৩র মে মাসে, The Swallow’s Tail । তারপর বেঁচে থাকলেন আরো ছয় বছর। হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন, পেসমেকার বসানো হলো। অবশেষে ১৯৮৯-এর ২৩শে জানুয়ারিতে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন শিল্পী সালভাদর দালি। জানি না সেদিন তিনি কী ভেবেছিলেন বা কী বলেছিলেন। শুধু খানিকটা জেনেছি, খুব অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে এসে জীবনের শেষ কটি দিন বার বার রেকর্ডে বাজিয়ে শুনেছেন তার প্রিয় অপেরা Tristan and Isolde-এর গানগুলো। হয়তো সেদিন এভাবেই পরম শান্তিতে নতুন এক পৃথিবীর পথে যাত্রা করেছেন বিংশ শতাব্দীর অসম্ভব প্রতিভাধর এই শিল্পী। সমাধিস্থ করা হলো তারই গড়া মিউজিয়াম Theatro Museo Dali-এর ভূগর্ভস্থ কক্ষে।

পৃথিবীতে দালিই একমাত্র শিল্পী যার প্রতি নিবেদিত হয়েছে দুটি একক চিত্রশালা। যেখানে কেবল তারই সৃষ্টি দিয়ে সাজানো হয়েছে এই মিউজিয়ামগুলো। এর একটি আমেরিকায় ‘দ্য সালভাদর দালি মিউজিয়াম ফ্লোরিডা’, অন্যটি স্পেনে ‘দালি থিয়েটার অ্যান্ড মিউজিয়াম’। যেগুলোতে রয়েছে এই শিল্পীর আঁকা ও গড়া অসংখ্য তেলরঙ, ভাস্কর্য, স্কেচ ও গ্রাফিক্স। এছাড়া সারা বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে তার অসংখ্য শিল্পকর্ম। সালভাদর দালিই অন্যতম সেই শিল্পী যে কিনা তার জীবন কাটিয়েছেন একজন সার্বভৌম স্বাধীন স্রষ্ঠার মতোই।

বিকেলের পথ আমাদেরকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা সাথে করে বয়ে নিয়ে চলছি মহাকালের মহার্ঘ। এই মহার্ঘ যিনি দিয়েছেন সেই মহাবীরের কথা লেখা হয়ে গেছে শিল্পের পুরাণে। তবু এক অতৃপ্তি মনে করিয়ে দিল তারই কথা- Life is too short to remain unnoticed । হাঁটতে হাঁটতে সহসা যেন অনুভব করলাম কেবলমাত্র আমরা দু’জনই নই ইতোমধ্যে আরো একজন এসে যোগ হয়েছেন আমাদের সঙ্গে। রাগী চোখে তাকাচ্ছেন এ-দিক সে-দিক, আর তার তরবারির মতো শাণিত গোঁফ জোড়া তা দিতে দিতে খুব কাছে এসে— একেবারে  কানের কাছে মুখ এনে চাপা স্বরে ফিস-ফিস করে বললেন- Life is aspiration, respiration and expiration… আর বলেই খুব দ্রুত মিশে গেলেন ভিড়ের মাঝে। চমকে তাকালাম চারপাশে! তাকে স্পষ্ট অনুভব করলাম! খুঁজলাম, কিন্তু আর কোত্থাও দেখতে পেলাম না। কখন যে মিশে গেছেন এই ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত জনপদের সীমাহীন সীমারেখায়…।
(শেষ)

ছবির বর্ণনা:

১। বিশেষ ভঙ্গীতে শিল্পী সালভাদর দালি ও গালা দালি
২। দালির নিজের লেখা আত্মজীবনী The Secret Life of Dali
৩। জীবনসঙ্গী ও মেন্টর গালা’র সঙ্গে সালভাদর দালি
৪। ১৯৮৩-র মে মাসে দালি’র আঁকা শেষ ছবি The Swallow’s Tail
৫। দালির আর্ট মিউজিয়াম ও সমাধি ক্ষেত্র Theatre Museum Dali, Spain

Facebook Comments

3 Comments:

  1. আলমগীর ফরিদুল হক

    ফেরদৌস নাহার এর হাত ধরে প্রতিটা প্রদর্শনী কক্ষ থেকে ভ্রমণ শেষে শিল্পী দালির সার-রিয়াল শিল্প প্রকরণ ও ইতিহাস এর রেশ থেকে গেলো । শিল্পী ‘র ব্যাখ্যায় নাহারের শিল্প মননের উদ্ভাসন বেশ মূখ্য রূপ লাভ করেছে। একটা প্রাণবন্ত লেখ্যরীতি’র এই উপহারের জন্য কবি নাহার’কে সাধুবাদ।

  2. লেখককে অনুরোধ করছি রচনাটিতে ব্যবহৃত দালির শিল্প কর্মের ফটো গুলি কি ভাবে সংগৃহিত হয়েছে জানাতে।

  3. The ending is surrealistic…feeling Dali inside and carrying him in the heart..fabulous. I must mention another simple but significant line where Ferdous, in the middle of being overwhelmed with the joy of meeting Dali, did not forget to show her “True colors” — her own identification and historical contentiousness. And the subtle almost unnoticed line is তৃতীয় বিশ্বের এক ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ দেশের শিল্পভূক পর্যটক আমি। Last not the least : In all the episodes we saw Ferdous was rediscovering Dali and carried us with her. But we rediscovered both Dali and Ferdous. We had double bonus. Sure, we are lucky! Aren’t we????

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *