কবিতা: তাবরেজীর সাথে একটি বিকেল


নান্নু মাহবুব

 

বেলতলার রাস্তায় বেরিয়েই তাবরেজীর সাথে দেখা। গাঢ় হলদে
ছাপা শার্ট গায়ে তাবরেজীও দেখি বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছেন।
আমি তাঁকে ধরে আমাদের বাড়ি নিয়ে আসি। আমাদের বাড়িটা
অন্ধকার-অন্ধকার, খাট-টেবিল বাচ্চা-কাচ্চা কাপড়-চোপড় হৈচৈ’এ
ঠাসা। তাবরেজী অর্ধেক-করে-কাটা মিষ্টির একটা মুখে দেন।
স্বপ্নাকে বলি তাবরেজীকে সে চেনে কিনা। স্বপ্না ঠোঁট টিপে একটু
মুখ বাঁকায়। আমি একটু হতচকিত হয়ে তাবরেজীর দিকে তাকাই।
তাবরেজীও দেখি তাই করেন। তখন আমি স্বস্তি পাই। চা-টা খেয়ে
আমরা আবার বাইরে বেরুই। দেখি সেটা আমাদের বাড়ি ছিলো না।
সেটা ছিলো খুকুদের বাড়ি। আমার বোন খুকু। যে এখন হসপিটালে।
কয়েকদিন আগে যার স্ট্রোক করেছে।

আমি আর তাবরেজী বড় রাস্তা ধরে পাশাপাশি হাঁটি। আমার পরনে
নতুন কেনা লুঙ্গিটা। এখনো অনেকখানি ফুলে আছে। আমি বলি,
কবে এসেছেন যশোরে? তাবরেজী বলেন, পরশু। ক’দিন থাকবেন?
আরো তিনদিন। বুঝি তিনি অফিসের কাজে এসেছেন। তাবরেজী
সন্ধ্যায় মদ্যপান করবেন কিনা ভাবি। একটু পরেই তাবরেজী পকেট
থেকে কিছু একটা বার করে আমার হাতে দেন। দেখি ছোট-বড়
চারটা কয়েন। তামাটে, রুপালি, সোনালি, হালকা সোনালি। আমি
বলি এগুলো আমার ছেলেকেই দিতে পারতেন। ও খুব খুশি হতো।
তবে এই কয়েনগুলো সবই তার আছে। সেকথা তাবরেজীকে বলিনা।

আমরা একটা রিকশা নিয়ে নিউমার্কেট রোড হয়ে ঢাকা রোডের ব্রিজের
উপরে আসি। এই ব্রিজটা দেখি সমুদ্রের উপর দিয়ে চলে গেছে। তবে
সমুদ্রটা একটা বড় নদীর মতোই। আমরা রেলিঙ ধরে ঝুঁকে দাঁড়াই।
ব্রিজের নিচ দিয়ে অসংখ্য বিশাল বিশাল সব মৎস্য চলে যাচ্ছে। আরো
বহু জিনিস ভেসে যাচ্ছে। কিছু বিশাল মাছের শরীরের অল্প-অল্প দেখা
যাচ্ছে। একখণ্ড হালকা জলজ মাঠ আড়াআড়ি ভেসে যাচ্ছে। তাতে ফুল
আছে। কিছুটা লাল শাপলার মতো, তবে তাকে সিঙ্গেল শাপলা বলা যায়।
আমি অথইকে ডেকে দেখাই। অথই (আমার বালক ছেলে) তার এক
ন্যাংটো বন্ধুর সাথে ন্যাংটো হয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। ওই দু’জনও কখন
জানি আমাদের পেছন পেছন চলে এসেছে। ব্রিজের উপর, এদিক-ওদিক,
আরো লোকজন আছে। কলেজ পড়ুয়া ছেলেরাই বেশি। তারা ভালো।
মাছের সাথে সাথে দেখি একটা অদৃশ্য পাটাতনের উপর বিরাট বিরাট
শাদা শাদা আকৃতির হাত-পা-মুণ্ডু-কেডস ভেসে যাচ্ছে। তাবরেজী বলেন,
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বানাইছে। বুঝি এইটা কোনো বিজ্ঞাপন।

আমরা ফেরার জন্যে রিকশাটা খুঁজি। সেটাকে কোথাও দেখা যায় না।
তবে সেটা তেমন কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়।

তাবরেজী দেখি ব্রিজের পাশ দিয়ে নেমে সমুদ্রের পানিতে নেমে গেছেন।
ব্রিজের নিচে ইটবাঁধানো পাড়ের দিকে যে মাছগুলো চলে আসছে
সেগুলোর বেশিরভাগই বিশাল বিশাল বোয়ালের মতো। সেখানেও
দেখি একটা অদৃশ্য পাটাতনের উপর রাখা বিশাল বিশাল সব
মৎস্যআকৃতি ভেসে যাচ্ছে। তার সাথে হাত-পা ইত্যাদির মিল
আছে। তবে এগুলো একটু লালচে ধরনের। আমিও তাবরেজীর
সাথে পানিতে নেমে পড়বো কিনা ভাবছি। মাছগুলো কামড়ে দেবে
কিনা ভাবতে ভাবতেই দেখি তাবরেজী একটা পাঁচ ফুট বোয়ালের
মুখের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে যুদ্ধ করছেন। অনেকক্ষণ যুদ্ধ করার পর
তাবরেজী বোয়ালটার মুখটা দু’হাত দিয়ে বিরাট হাঁ করে ধরেন।
ভেতরে বৃত্তাকার দুইসারি ক্ষুদে ক্ষুদে কালো কালো দাঁত দেখা যাচ্ছে।
তাবরেজী বলেন, এই দাঁতগুলোই সমস্যা। তারপর একটা দা দিয়ে
মাছটার পিঠে একটা কোপ দিয়ে সেটাকে গেঁথে ফেলেন। আমাকে
বলেন, অথইকে বলুন মাছটাকে বাড়ি নিয়ে যেতে। স্বপ্নার যদিও
রাতে মাংস রাঁধার কথা কিন্তু আজ বোয়ালটাও সে রাঁধতে পারবে
ভেবে আমার একটু খুশিই লাগে।

তবে আমি মনে মনে এও ভাবতে থাকি, মাছটা এভাবে নেওয়াটা বৈধ
হবে কিনা। কারণ মাছটা তো সরকারি। এরকম হলে তো এই সমুদ্রে
আর কোনো মাছই থাকার কথা নয়। মুহূর্তেই সব সাফা হয়ে যাবার কথা।

……….

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *