সাবেরা তাবাসসুমের সিরিজ কবিতা: ফোবিয়া

এক.

কী এমন ক্ষতি
একটা বা দুটো
ছোটোখাটো
ভীতি বা দুর্বলতা
যদি থেকেই থাকে
এই আমার
না হয় দশপদ আমি
দশ মুখের আমি
সব মুখোশ ফেলে
আচমকা
ঝুলিয়ে দিই চোয়াল
বিস্ফারিত নেত্রে
বিশাল শরীর কাঁপিয়ে
উঠে যেতে চাই উঁচুতে
মানে, টেবিল, চেয়ার,
খাট বা আরো উঁচুতে
যেখানে পা দুটোয়
ঘষা খাবে না কোনো
পেলব রোমশ শরীর
আপাত নরম হাড়
শ্রবণে কোনো হ্যাংলা
আদুরে আবদার
শ্রবণে তুচ্ছ মশকরা আর
মুচড়ে মুচড়ে হাসা
বিরক্ত, আতংকিত
মুখ দেখব কেন, বলো
কারণ আমি তো
চুরি করিনি কোনো
রেস্তরাঁর কাঁটা চামচ
বিশুদ্ধ ন্যাপকিন
নেই দলবেঁধে খুনেদের
প্রকাশ্য রাজকর্মে
কিংবা আবায়ার
লম্বা হাতায় লুকিয়ে
নিচ্ছি না কোন ঘুষও
আঁতকে উঠলেও
আমি দয়ালু
সকল ক্রূরতা
পেয়েও আমি দয়ালু
আমার ভীতির উৎস দেখে
বিবমিষা জেগেছে ঠিক
আমি সংকুচিত
হতে গেছি ঠিকই
তবু চাই নি কখনো
নেমে আসুক কোনো
প্রবল আঘাত
হিংস্র গেরস্থালি মার
বরং আঘাত করেছে
সরু চোখ বাঁকা ঠোঁট
তোমার, তোমার
এবং তাদের, তার
শীতের রাস্তায় ওদের
মরে পড়ে থাকা
বেলচায় তুলে সৎকার
দেখেছি মমতা নিয়ে একা
তাই, কী এমন ক্ষতি
একটা দুটো ভীতি
বা দুর্বলতা নিয়ে
যদি দূরে থাকতে চাই
হ্যাঁ, দূরে থাকতে চাই
ধুরন্ধর নয়
খেয়াল মাফিক নয়
এক পাহাড় সমান নয়
সামান্য ভীতি
সামান্য ইচ্ছে
ইতস্তত সমন্বয়।

 

দুই.

আমাকে বলতে পারে সে হেসে হেসে
তার এক ভক্ত প্রণয়ী বেড়াল ভালোবাসে
শরীর খুলবার আগে দুজনে পান করে
গরম তরল আর চোখে চোখে
যোগাযোগ তৈরি হতে থাকে
বলছিল, সেদিন প্রিয় বেড়াল তাকে
উসকে তুলছিল বেশ
বিছানার শিল্পকৌশল ভাবতে ভাবতে
তার দিকে বাড়িয়ে দেয়া কফির মগে
ঠোঁট ছোঁয়াতেই চোখে পড়ে
তাতে ভাসছে দু তিনটে অনিবার্য লোম
তার প্রণয়ীর সাধের বেড়াল
ঝরিয়ে দিয়ে গেছে এক ফাঁকে
অবশেষে তাকে আমার কিছু বলার থাকে না
সে আমাকে হেসে হেসে বলতে পারে
চোখে কৌশল রেখে বলতে পারে
আর সব হয়েছিল, শুধু কফিটাই খাওয়া হলো না।

 

তিন.
বারান্দায় ফুটেছে তারা
তাদের কামনা, হুটোপুটি
সবুজ চোখের প্রেম, শীৎকার
মড়া সেজে বিছানায়
সেঁধিয়ে যেতে যেতে
তিন ইঞ্চি দেয়ালের এপাশে
ভাবি, আমার ভীষণ রাগ
বমি চাপতে চাপতে ভাবি
আমার অনেক ঘেন্না
এক কোপে দুটোর মুণ্ড
নামিয়ে দিবি কেউ
ভয়ে রি রি হতে হতে
ধড়হীন দেহের আস্ফালনে
পুরো বারান্দা রক্তে ভরাবি কেউ
সাবধানে তাতে আছাড় না খেয়ে
শুকিয়ে যাওয়া মলের গুঁড়ো
না মাড়িয়ে, থিতিয়ে আসা শরীর
বস্তায় পুরে, ফেলে আসবি কেউ
আয়, আহা, রাত্রির মধ্যযামে
কেউ তো ঘুম ভেঙে আয়
শক্ত শরীর, অশক্ত মন বিধি সম্মত
কেউ আয়, শুকিয়ে লবণদানা হওয়া
চোখ বুজিয়ে দিতে, শ্রবণে কোনো
লুলাবাই ঢেলে দিতে, কেউ আয়
প্রশান্ত হই, আমি প্রশান্ত হই
জানি, ঋতু, মার্জারাতঙ্ক ছাড়া
তোমার আমার আর কোনো মিল নেই
এই ভেবে প্রশান্ত হই, হতে চাই
শেষ জোরটুকু গলায় ঢেলে
অশক্ত মন শার্শি ফাটিয়ে চিৎকারে
তাই বলে ওঠে, ওদের কেউ পোষ্য নিয়ে নাও,
দয়া করে ওদের কেউ তো পোষ্য নাও
দুধে-মাছে কেউ রাখো, আমার
বারান্দাকে, আমার আত্মাকে মুক্তি দাও!

 

সাবেরা তাবাসসুমের পরিচিতি


সাবেরা তাবাসসুম। কবিতা লেখা শুরু পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার অনুপ্রেরণায়। পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই ১৪টি। ১৩টি মৌলিক কবিতা এবং একটি হিন্দী ও উর্দু কবি গুলজারের কবিতার অনুবাদ-গ্রন্থ। একমাত্র পুত্রকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটে। চলচ্চিত্রের প্রতি রয়েছে তীব্র টান। সবকিছু্র বাইরে কবিতাই সাবেরার আরাধ্য ভূমি, পাশাপাশি অনুবাদ ও মুক্ত গদ্য লেখা তো আছেই।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।