সুধাংশু শেখর বিশ্বাসের রম্য স্মৃতিগল্প: মুরগির রান

মুরগির মাংস আমার যে খুব প্রিয় তা নয়। তবে আমাদের ছোটবেলায় হিন্দু বাড়িতে মুরগির মাংস খাওয়ার চল ছিল না। ছিল সামাজিক নিষেধাজ্ঞা। নিষিদ্ধ জিনিসে কৌতুহল বেশি। সে কারণেই মনে হয় মুরগির মাংসের প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহ ছিল আমাদের ভাইবোনদের। আর সেটা যদি হোত মুরগির রান মানে ঠ্যাং, তাহলে তো কথাই ছিল না।
আমাদের বাড়ি ফরিদপুরের প্রত্যন্ত বিলের মধ্যে। গড়াই নদীর এপাড়-ওপাড় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আমাদের বিল। বর্ষায় ভরা বিলে থৈ থৈ করত জল। মনে হোত ছোটখাট সমুদ্র। অথৈ জলের মধ্যে গ্রামগুলো দ্বীপের মতো ভেসে থাকতো। বাড়ির ঘাটে ঘাটে বাঁধা থাকতো নৌকা।

সেই বিলে ছিল শুধুই নমশূদ্র সম্প্রদায়ের বাস। নমশূদ্ররা কৃষিজীবি। হাতে গোনা দু’চারজন বাদে পুরো এলাকায় তখন লেখাপড়ার বালাই ছিল না। ছিল কুসংস্কার আর ধর্মীয় গোঁড়ামি। আমাদের এলাকায় তখন হিন্দুদের মুরগির মাংস খাওয়া তো দূরের কথা, বাড়িতে মুরগি পোষাও ছিল নিষিদ্ধ।

মুরগি পুষতো পাশের গ্রামের মুসলমানরা। সেই ছোটবেলা থেকেই শুনতে শুনতে মনে এই প্রত্যয় জম্মেছিল যে, মুসলমানরা হল ম্লেচ্ছ। যাকে বলে নেড়ে। নেড়েরা কুকড়ো (মুরগি) খায়। পেঁয়াজ, রশুন খায়। মুখ দিয়ে ভকভক করে রশুনের গন্ধ বের হয়। বন্ধুরা একসাথে হয়ে নেড়েদের কে কত বেশি ঘৃণা করে, সেটা দেখানোর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতাম।

হিন্দু বাড়িতে তখন পেঁয়াজ-রশুন ছিল পরিত্যজ্য। তারা খেত পাঠা, কচ্ছপ, হাঁস, ডাহুকের মাংস। পেঁয়াজ-রশুন খেতো না বলে, তার বদলে মাংসের ঝোলে দিতো চালের গুড়ার পিটুলি।

বাবা বলতেন, সবার উপরে মানুষ সত্য। সব মানুষই এক। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টানে কোন ভেদাভেদ নাই। দ্বিধাদ্বন্ধে পড়ে যেতাম। বাবার কথার সত্যতা সময়ের সাথে সাথে হৃদয়ের পূর্ণতা দিয়ে উপলব্ধি করেছি। বেড়ে উঠেছি সেই সত্য ধারণ করেই। চেষ্টা করেছি আমার উত্তরসূরির মনেও সেই বিশ্বাসের বীজ বপন করতে।

এ রকম সামাজিক পরিবেশে এলাকার মধ্যে প্রথম মুরগির মাংস রান্না হল আমাদের বাড়িতে। তাও আবার পেঁয়াজ-রশুন দিয়ে। শুরু করলেন বাবা। বাবা ছিলেন গোটা এলাকার মধ্যে প্রথম সরকারি অফিসার। সাহেব-সুবোদের সাথে উঠাবসা করতে হয়। এক টেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়া করতে হয়। মুরগির মাংস না খেলে মান থাকে না। এমন একটা ধারণা থেকে বাবার মান রক্ষার তাগিদেই হোক, আর আমাদের পারিবারিক প্রভাবের কারণেই হোক, সমাজ একটু একটু করে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল বিষয়টা। তাই বলে সহজেই যে বাড়িতে মুরগির মাংস রান্না শুরু করা সম্ভব হয়েছিল, তা নয়। প্রথমে বাড়ির উঠোনের নিচে পালানের এক কোনায়। সেখান থেকে আস্তে আস্তে একদিন উঠোনে। তারপর এক বৃষ্টির দিনে কোন উপায় না থাকায় মুরগি ঢেঁকিঘরে ঢোকার সুযোগ পেল। রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছুতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল এক যুগেরও বেশি।

মুরগি খাওয়ার আয়োজনও ছিল এক এলাহি ব্যাপার। আমরা দলেবলে মাইল খানেক দূরে মুসলমান পাড়া যেতাম। মুরগি পছন্দ করে বাবা দাম পরিশোধ করে চলে যেতেন। চড়ে বেড়ানো সেই মুরগিগুলো আমরা দাবড়ে ধরতাম। চারিদিকে বেষ্টণী দিয়ে সতর্কপদে এগোতাম। বিপদ বুঝে ওরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করত। আমরা প্রানপণ ছুটতাম তাদের পেছন পেছন।

এরকমই একবার মুরগির পেছনে ধাওয়া করে আমরা ওদের রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিলাম। আমি ছিলাম সবার সামনে। হুটোপুটিতে ভাতের হাঁড়ি উল্টে এসে পড়ল আমার গায়ে। সেই অবস্থায়ই মুরগির পা ধরে ফেললাম। তারপর বিজয়ীর বেশে হাতে ঝুলিয়ে গ্রামের দিকে রওয়ানা দিলাম।

ঝামেলা বাঁধল বাড়িতে এসে। গ্রামময় চাউর হয়ে গেল যে, আমি নেড়েদের ভাতের হাঁড়ি ছুঁয়ে এসেছি। হয়ে গেছে অন্নপাপ। স্নান ছাড়া গৃহ প্রবেশ নিষেধ। সবাই মিলে মহা উৎসাহে আমাকে ধরে টিউবওয়েলের নিচে নিয়ে বসানোর আয়োজন করতে লাগল।

শীতের সন্ধ্যায় স্নান করা কোন যুক্তিতেই সুখকর নয়। ভাতের হাঁড়ি ছোঁয়ার সাথে পাপের সম্পর্ক স্থাপনে তাই মোটেই আগ্রহী হলাম না। বেঁকে বসলাম আমি। মা গিয়েছিলেন পাড়া বেড়াতে। খবর পেয়েই ছুটে এলেন। গ্রামের মানুষকে খুশি করার জন্যে মা আমার মাথায় তুলসি পাতার জল ছিটিয়ে রফা করলেন। আমার মানে লেগেছে বুঝতে পেরে মা বললেন- এতদিনের সংস্কার, একদিনেই কি দূর করা যায়!

মুরগির মাংস রান্নার আয়োজনও ছিল বিশাল। এক কোপে মুরগির গলা নামানো, উনুন কাটা, লাকড়ি জোগাড়, পেঁয়াজ রশুন মশলা বাঁটা- কত কাজ! গ্রামের মানুষ এসে ভিড় করে দাঁড়াতো চারপাশে। রান্নার সুবাস ছড়িয়ে পড়ত বাতাসে। শাস্ত্রমতে ঘ্রাণে অর্ধেক ভোজন। নাকে কাপড় চেপে বিধবা এবং বয়স্ক মহিলারা তাই প্রানপণে জাতরক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যেতেন।

ভরাপরা, ওলাউঠায় মরবি, নিব্বংশ হবি- নাক চেপে নিরন্তর অভিশাপ দিতেন বাল্যবিধবা ধনির মা বুড়ি। যে কোন ছুতোয় রাতদিন সবাইকে গালাগালি করা ছিল বুড়ির অভ্যাস। সেটাকে তাই গ্রাহ্যের মধ্যে নেয়া হত না। এভাবেই শুরু হয়েছিল আমাদের মুরগির মাংস খাওয়া।

আট ভাইবোন আমরা। খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করা ছিল আমাদের নিত্যদিনের ঘটনা। তাই নিয়ে হতো নালিশ। নালিশের পর অবধারিত শাস্তি। বকা খাওয়া, কান ধরা- এসব ছিল পান্তাভাত আমাদের কাছে। শাস্তির পর্যায়েই ফেলতাম না। চড় চাপড়ে ব্যথা লাগত বলে সেটা এড়ানোর চেষ্টা করতাম।

বাবার ছিল বদলির চাকরি। যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, বরিশালের বিভিন্ন থানা, মহকুমা শহরে ছিল পোষ্টিং। আমরাও বাবার সাথে ঘুরে বেড়াতাম সেসব জায়গায়। ছুটির দিনে বাসায় সকালের নাস্তায় থাকতো তিনকোনা পরোটা আর মুরগির মাংস। সে ছিল আমাদের জন্যে রাজসিক ব্যাপার। সে স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।

যেটা নিয়ে কাড়াকাড়ি আর নালিশ হোত বেশি, সেটা হোল মুরগির রান। রান ছিল সবার কাছে লোভনীয়। মায়ের পক্ষপাতিত্ব ছিল সবার বড় দাদা আর সবার ছোট বোনের প্রতি। তাদের পাতে আগে রান তুলে দিতেন মা। গোল বাঁধতো আমরা যারা মাঝখানের ভাইবোন তাদের মধ্যে। একসাথে বড় জোর দুটো মুরগি রান্না হোত। চারটের বেশি রান আর আসবে কোত্থেকে!

লন্ডনে গেলাম পড়াশুনা করতে। ছয়জনে মিলে বাসা ভাড়া নিলাম ইস্ট লন্ডনে বাঙালী পাড়ায় ক্যানন স্ট্রিট রোডে। আমাদের কাছের রেল স্টেশন ‘হোয়াইট চ্যাপেল’। সেই স্টেশনের সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করি। সেদিন বাজার করতে গেলাম সেইন্সবুরি চেইন শপে। মুরগির মাংস কিনতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম। আস্ত মুরগি যেমন আছে, তেমনি আছে ব্রোস্ট, লেগ, উইং। সব আলাদা আলাদা প্যাকেট করা। প্যাকেটের গায়ে দাম লেখা। সবচেয়ে সস্তা হল উইং আর রানের মাংস। বুকের মাংসের দাম প্রায় দ্বিগুন।
পাগল না কি এরা! ভাবতে থাকি অবাক হয়ে। পরে অবশ্য জেনেছি, উইং আর রানের মাংসে নাকি ফ্যাট বেশি। তাই দাম কম।

কথায় বলে ডালের মজা তলে, মুরগির মজা রানে। সেই রানের মাংসই সস্তা! ফ্যাটের তোয়াক্কা না করে কিনে ফেললাম একসাথে চার পাউন্ড। প্রানভরে খেতে হবে রান। একসাথে এত রান চোখে দেখিনি আগে। ছোটবেলার কথা ভীষণভাবে মনে পড়তে লাগল।
বাসায় ফিরে রান্না চাপিয়ে দিয়ে ভাবতে লাগলাম, আহা আজ যদি সব ভাইবোন এখানে একসাথে হতে পারতাম! কি মজাই না হোত। সবাই ইচ্ছেমতো রান খেতে পারতাম। কাড়াকাড়ি করতে হোত না।

বড় বোন থাকে কোলকাতা। ছোট বোন কানাডায়। ছোট বোনকেই আগে ফোন করলাম। সে হাসতে শুরু করল। বলল- আমারও না প্রথম প্রথম অবাক লাগত। আর আপসোস হোত। তবে কি জানিস্ মেজদা, ফ্যাট বেশি বলে এখন আমিও আর রান খাই না। বেশি পয়সা খরচ করে বুকের মাংসই কিনি। বড়বোন বলল – চিকেন খাওয়া ছেড়েই দিয়েছি প্রায়। লেগ তো প্রশ্নই ওঠে না।

যার সাথে ছিল রান নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাড়াকাড়ি, সে আমার পিঠাপিঠি সেজো ভাই। সেও থাকে দেশের বাইরে। হাসতে হাসতে বলল- তাই নাকি! আহা রে.. সেই দিনগুলি যদি ফিরে পেতাম রে মেজদা। বড়ই মজা হোত। আমি তো এখন মাছ-মাংস কমই খাই। ইসকনের দলে নাম লিখিয়ে ভাবছি পুরোপুরি ভেজিটেরিয়ান হয়ে যাব।
রান পাতে সাজিয়ে খেতে বসলাম। ওরা খায় না তাতে কি? আমি খাব। প্রাণ ভরে খাব। কতদিনের সাধ!

কিন্তু রানগুলোর দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা কেমন হু হু করে উঠল। বারবার মনে পড়তে লাগল আমাদের সেই ছেলেবেলার দিনগুলোর কথা।
রান মুখে তুলি। কেউ কেড়ে নিতে হাত বাড়ায় না। ডাইনে তাকাই, বায়ে তাকাই। কাড়াকাড়ি করার কেউ নেই আজ!

বিস্বাদ মনে হতে থাকে সবকিছু। হাতটা আপনা আপনিই নিচে নেমে যায়। আস্তে করে রানটা নামিয়ে রাখি প্লেটের উপর।

 

সুধাংশু শেখর বিশ্বাস

বিসিএস ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা। সহকারী সচিব হিসেবে কর্মজীবন শুরু। মাঠ পর্যায়ে ছিলেন ইউএনও, এডিসি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরডিএ, বগুড়ার পরিচালক। কাজ করেছেন উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। অবসর নিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে। উচ্চতর পড়াশুনা করেছেন লন্ডনে। প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সরকারি কাজে ঘুরেছেন ইউরোপ, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, এশিয়ার বহু দেশ।

অবসর জীবন কাটে ঘোরাঘুরি আর লেখালিখি করে। লিখেছেন নমশূদ্র সম্প্রদায়ের জীবনধারা নিয়ে গবেষণাধর্মী উপন্যাস ‘নমসপুত্র’। পেলেন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। লিখলেন মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায় নিয়ে ‘শরণার্থী’, গণ জাগরণ মঞ্চ নিয়ে ‘দ্রোহের দীপাবলি’। লিখে চলেছেন একের পর এক উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিগল্প, ভ্রমণ কাহিনী।জন্ম ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার প্রত্যন্ত বিলের মধ্যে মধুপুর গ্রামে। বাবার কর্মসূত্রে শৈশব, কৈশোর কেটেছে খুলনা, যশোর, বরিশাল এলাকার বিভিন্ন জেলায়। স্কুল জীবন থেকেই যুক্ত ছিলেন ছাত্র রাজনীতি এবং ‘উদীচী’ ‘খেলাঘর’ এর মতো সংগঠনের সাথে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সসহ মাস্টার্স করেছেন অর্থনীতি বিষয়ে।
প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পনের। উপন্যাস (৪)- নমসপুত্র, নমস উপাখ্যান, শরণার্থী, দ্রোহের দীপাবলি। ভ্রমণ কাহিনী (৬)- ম্যাকেলিনা, হোটেল সিয়াম, সাগিনো ভ্যালি, ঘুরে দেখা আমেরিকা, হোয়াইট চ্যাপেল, মস্কোর ঘন্টা। গবেষণা গ্রন্থ (১)- বিলের জীবন: নমশূদ্রদের বার মাসের তের পার্বণ। ছোটগল্প সংকলন (১)- স্ট্যাটাস। স্মৃতিকথা (৩)- সোনালি ডানার চিল (শৈশব), সোনালি ডানার চিল (কৈশোর), সোনালি ডানার চিল (যৌবন)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।