সুধাংশু শেখর বিশ্বাসের ভ্রমণগদ্য: ম্যাকেলিনা

আমরা চললাম ‘মাউন্ট ম্যাকলিং’ ঘুরে দেখতে।  স্থানীয়রা বলে হিল ম্যাকেলিনা। হিলের পাদদেশে গাড়ি থামলো। ডাইনে তাকাতেই চোখে পড়লো সাইনবোর্ড। লেখা ‘আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট’। বিস্ময়ের ঘোর কাটে না আমার। ইরি’র হেড অফিস ফিলিপাইনে তা জানতাম, কিন্তু সেটা যে এই পাহাড় ঘেরা ছোট্ট শহর ‘লস বানোস’-এ, তা জানতাম না।

সুযোগ ছাড়া ঠিক হবে না। তাই বললাম, ইরি ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখা যাবে না?

যাবে না কেন! নিশ্চয়ই যাবে। বলেই আমাদের সুন্দরী গাইড জেসি গাড়ি ঘোরাতে বললো ড্রাইভারকে। দেখলাম, কড়াকড়ি নেই কোন। গেটে যা বলার জেসিই বললো। ঢুকে পড়লাম আমরা ইরি ক্যাম্পাসে। ঘুরে ঘুরে দেখলাম। আড়ম্বরহীন ছোট সাদামাটা ক্যাম্পাস। তবে ছিমছাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারিদিকে।

এখানে বাংলাদেশের একজন রিচার্স ফেলো আছেন। ডঃ ঘোষ। পোষ্ট ডক্টরেট করছেন এখানে। ভীষণ ভালো। বললো জেসি।

তাই নাকি! দেখা করা যাবে? জানতে চাইলাম আমি।

নিশ্চয়ই যাবে। তবে আজ তো সানডে।  উইক ডে তে এলে দেখা পাবে। লস বানোসের সবাই ডঃ ঘোষকে পছন্দ করে। উনি পিএইচডি করেছেন ‘ইউপিএলবি’ থেকে। তারপর জয়েন করেছেন ইরি’তে। পোষ্ট ডক করছেন এখন। উৎফুল্ল হয়ে বললো জেসি।

শুনে মনটা ভরে গেল গভীর আনন্দে আর গর্বে। পরে অবশ্য ডঃ ঘোষ এর সাথে দেখা দেখা হয়েছে। তার বাসায় প্রায়ই সন্ধ্যায় আড্ডা দিতে যেতাম। একেবারে ডিনার সেরে গালগপ্প মেরে অনেক রাতে আমার ডরমিটরিতে ফিরতাম। সে কথা পরে কোন এক সুযোগে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করবো।

‘ইউপিএলবি’ হলো ইউনিভার্সিটি অব ফিলিপাইনস্ এ্যাট লস বানোস। ফিলিপাইনের অন্যতম সেরা ইউনিভার্সিটি। এর ক্যাম্পাস মোট দশটি। তার একটি এই লস বানোসে। এই ক্যাম্পাসের পরিচিতি তাই সংক্ষেপে ‘ইউপিএলবি’ নামে। আমার প্রোগ্রামের কো-অর্ডিনেটর এই ইউনিভার্সিটির এনিম্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান। ওরা অবশ্য বলে ডিরেক্টর।

লস বানোসে এসেছি চল্লিশ দিনের একটা প্রশিক্ষণ কোর্সে। রাজধানী ম্যানিলা থেকে দূরত্ব মাইল ষাটেক। ‘লস বানোস’ শব্দের অর্থ স্বাস্থ্যকর স্থান। এখানকার পাহাড়গুলোতে অনেক প্রাকৃতিক ঝর্ণা আছে। সে সব ঝর্ণা থেকে খনিজ সমৃদ্ধ উষ্ণ জলের প্রস্রবন প্রবাহিত হয়। স্বাস্থসম্মত সেই জলে স্নান করার জন্য উইকএন্ডে ফিলিপাইনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে আসে। একারনে এখানে গড়ে উঠেছে সুইমিং পুলসহ অনেক রিক্রিয়েশন সেন্টার।

ইরি ক্যাম্পাস ঘুরে গেট দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছি হিল ম্যাকেলিনায়। গাড়ি থেকে নেমেই জেসি বলল, সামনের দিকে তাকাও। আমি তাকালাম। ছোট্ট পাহাড়। সূর্যের রোদ পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে আরামের আয়েশে শুয়ে আছে যেন। বেশ লাগছে দেখতে।

দেখেছো? বললো জেসি।

দেখলাম। চমৎকার পাহাড়টা। নামটাও বেশ কাব্যিক— হিল ম্যাকেলিনা।

আর কিছুই দেখতে পাচ্ছো না? আর কি দেখার আছে, ভাবতে ভাবতে আবার তাকাই পাহাড়টার দিকে। চেষ্টা করি ভাল করে দেখার। পাহাড়টা ছাড়া আর কিছু নজরে পড়ে না।

হিল ম্যাকেলিনার একটা  বিশেষত্ব আছে। তার সাথে পাহাড়ের নামেরও যোগসূত্র আছে। ভাল করে দেখ। আমি আবার সাবধানী দৃষ্টি মেলে তাকাই। খুঁটে খুঁটে দেখি। কিন্তু কোন বিশেষত্ব খুঁজে পাই না।

পাহাড়ের মাথার দিকে ভাল করে তাকাও। দেখো, একটা প্রেগনেন্ট মেয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে।

তাই নাকি! বিস্মিত হয়ে বলি আমি।

হ্যাঁ সত্যি। ভাল করে দেখ।

আমি আবার ভাল করে দেখতে থাকি। পাহাড়ের উঁচু নিচু মাথা আর খাঁজ মিলিয়ে সে রকম একটা অবয়ব মেলানোর চেষ্টা করি। জেসি না বললে অবশ্য এই অবয়বকে শুয়ে থাকা একটা প্রেগনেন্ট মেয়ে বলে আমার কখনই মনে হোত না। কিন্তু এখন যত দেখছি ততই যেন স্পষ্ট হচ্ছে শুয়ে থাকা মেয়েটার শরীর।

এখন দেখতে পাচ্ছো?

তা পাচ্ছি। তবে তুমি না বললে পেতাম না।

এর সাথে জড়িয়ে আছে একটা মিথ। লস বানোসের সবাই এই মিথ গভীর শ্রদ্ধার সাথে বিশ্বাস করে।

তাই নাকি? কাহিনীটা বল তো শুনি। উৎসাহ নিয়ে বলি।

মারিয়া ম্যাকলিং  বা  স্থানীয়দের আদরের কন্যা ম্যাকেলিনা অপরূপা সুন্দরী এক কিশোরী। ভোরের শিশিরের মতো স্নিগ্ধ আর নিষ্পাপ। তার অন্তর ছিল ফুলের মতো পবিত্র। হৃদয় ছিল আকাশের মতো উদার। ফুটফুটে ম্যাকেলিনা হেসেখেলে, গান গেয়ে প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে বেড়াত। সবাই ভালবাসত তাকে। পশুপাখিরা তার চারপাশে এসে ভিড় করত। গভীর মমতায় গাছের সাথে কথা বলত সে। ম্যাকেলিনা হাসলে সারা প্রকৃতি হেসে উঠতো, গাছে গাছে ফুল ফুটতো। সে মুখভার করলে বিষন্ন হয়ে যেতো প্রকৃতি। বন্ধ হয়ে যেত পাখির কূজন। সে কাঁদলে আকাশ ভেঙ্গে নামতো বৃষ্টির ধারা। ম্যাকেলিনা ভালবাসায় গোটা লস বানোস পরিনত হয়েছিল স্বর্গপূরীতে।

যৌবনে পা দিয়ে সুদর্শন এক যুবকের প্রণয়াসিক্ত হল সে। সেই প্রেম ছিল স্বর্গীয়। ম্যাকেলিনা তার জীবন যৌবন সব উজাড় করে ঢেলে দিল সেই ছেলেটিকে। ভালবাসার নব উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হয়ে তার প্রাণ চাঞ্চল্য আরো বেড়ে গেল যেন। কিন্তু একদিন, সুদর্শন সেই ছেলে অন্য আর এক মেয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়লো। সেই মেয়েটিকে নিয়ে চলে গেল দূরে কোথাও। খুবই দুঃখ পেল ম্যাকেলিনা। সে এমনই দুঃখ যে, শোকে কাতর হয়ে ম্যাকেলিনা শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল। সে তখন ছিল প্রেগনেন্ট। অনেক ডাক্তার বদ্যি দেখানো হল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেল। জীবনের সায়াহ্নে ম্যাকেলিনা বলেছিল— ভালবাসাহীন জীবন মূল্যহীন। তোমরা সবাইকে ভালোবেসো। আকাশ, বাতাস, নদী, ফুল, পাখি, মানুষ, প্রাণি সকলকে ভালবেসো।

সুদর্শন সেই ছেলেটি খবর পেয়ে ছুটে এসেছিল ম্যাকেলিনার কাছে। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। মৃত্যুশয্যায় ছেলেটি ক্ষমা চাইল। ম্যাকেলিনা তাকে ক্ষমা করে দিল। বলল, কোনদিন কারো মনে কষ্ট দিও না। মন ভেঙ্গে দিও না কারো। তারপর ঢলে পড়লো মৃত্যুর কোলে।

পাখিরা আর গান করে না, বনে বনে ফুল ফোটে না। আকাশে রোদ ঝলমল করে না। কেমন থমথমে নিরবতা চারিদিকে। লস বানোসের সকল মানুষ আকুল হয়ে ম্যাকেলিনার জন্যে কাঁদে। তার আত্মার শান্তির জন্যে পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করে।

কিছুদিন পর পাহাড়ের চুড়াগুলো আস্তে আস্তে বদলে যেতে শুরু করলো। পাহাড়ের মাথায় ম্যাকেলিনার মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকার ছবি একটু একটু করে ফুটে উঠতে থাকলো। এক বছরের মাথায় ম্যাকেলিনার মৃত্যু দিবসে ছবিটি স্পষ্ট আকার পেল। সেইদিন গোটা লস বানোসের মানুষ এসে জড়ো হলো পাহাড়ের পাদদেশে। প্রদীপ জ্বালিয়ে তার জন্যে চোখের জল ফেললো। জানালো শ্রদ্ধা। আর এই পাহাড়ের নাম হয়ে গেল ‘ হিল ম্যাকেলিনা’।

সেই থেকে প্রতি বছর ম্যাকেলিনার মৃত্যুদিবসে এলাকাবাসী বিশেষ করে কুমারী মেয়েরা সাদা পোশাকে আবৃত হয়ে জ্বলন্ত প্রদীপ হাতে সারিবদ্ধভাবে আসে হিল ম্যাকেলিনায়। পাহাড়ের পাদদেশে বসে নিরবে শ্রদ্ধা জানায় অবনত মস্তকে স্বর্গীয় প্রেমের আঁধার ম্যাকেলিনা। তার মতো পবিত্র প্রেম হৃদয়ের গভীরে ধারণ করতে চায় সবাই।

গভীর মনোযোগে ম্যাকেলিনা কাহিনী শুনতে থাকি। কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া সুদুর এই ফিলিপাইনের এক বিরহী মেয়ের করুন কাহিনী আমার হৃদয় আর্দ্র করে তুললো। ম্যাকেলিনার জন্যে মনের কোনে চিনচিন করতে থাকে ব্যথা। শ্রদ্ধায় মাথা নোয়ালাম অজানা সেই ছোট্ট মেয়েটার উদ্দেশ্যে। পাহাড়ের পাদদেশে তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে জ্বেলে দিলাম মোমবাতি।

ফিলিপাইনের সামাজিক মূল্যবোধ আমাদের মতো নয়। পবিত্র ভালবাসা, স্বর্গীয় প্রেম এসব পুরনো ধ্যান-ধারনা নিয়ে তাদের বসে থাকার কথা নয়। জেসিকে বললাম, তোমরা ভেসে যাচ্ছো ফ্রি সেক্সের জোয়ারে। পবিত্র প্রেমের মিথ নিয়ে মাতামাতি করাটা বাড়াবাড়ি নয় কি?

জেসি আমার দিকে তাকালো। দার্শনিকের ভঙ্গীতে উদাস কন্ঠে বলল – ভালবাসা তো ভালবাসাই। যে যেভাবেই চলুক না কেন পবিত্র প্রেম চিরদিনই বেঁচে থাকে এবং থাকবে। পবিত্র ভালবাসাকে তুমি সেক্সের সাথে গুলিয়ে ফেলছো কেন?

ভালবাসা আর সেক্স একে অপরের পরিপূরক মনে করো না তুমি?

অবশ্যই তা মনে করি। তবে ভালবাসা শুধুই দেহ সর্বস্ব হতে যাবে কেন? ভালবাসা শ্বাশত, ভালবাসা উৎসারিত হয় হৃদয়ের অতল গভীর থেকে। ভালবাসার জোরেই টিকে আছে জগৎ সংসার। আমি তাকিয়ে থাকি জেসির মুখের দিকে। খুব আত্মবিশ্বাসী মনে হতে থাকে তাকে। গোধূলির অলৌকিক রূপালি আলো এসে পড়েছে তার মুখে। সেই আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে তার চোখমুখ। আমি মুগ্ধ চোখে দেখতে থাকি জেসিকে।

 

সুধাংশু শেখর বিশ্বাস

জন্ম ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার প্রত্যন্ত বিলের মধ্যে মধুপুর গ্রামে। পড়াশুনা  করেছেন অর্থনীতিতে এমএ। বিসিএস ১৯৮৪ ব্যাচের সহকারী সচিব হিসেবে কর্মজীবন শুরু। মাঠ পর্যায়ে ছিলেন ইউএনও, এডিসি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরডিএ, বগুড়ার পরিচালক। কাজ করেছেন উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। অবসর নিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে। সরকারি কাজে ঘুরেছেন বহু দেশ। অবসর জীবন কাটে ঘোরাঘুরি আর লেখালিখি করে।

প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আঠারো। ভ্রমণ কাহিণি-৬ (সাগিনো ভ্যালি, হোটেল সিয়াম, মস্কোর ঘন্টা, হোয়াইট চ্যাপেল, ঘুরে দেখা আমেরিকা),

ছোটগল্প-১ (স্ট্যাটাস),  

গবেষণা গ্রন্থ-১ (বিলের জীবনঃ নমশূদ্রদের বার মাসের তের পার্বণ), ২ নমসপুত্র আর ৩ নমস উপাখ্যান। এই দু’টি গ্রন্থের জন্য  তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত। 

কিশোর উপন্যাস-১ (সুরুজ দ্য গ্রেট) স্মৃতিগল্প-৩ (সোনালী ডানার চিল- শৈশব, কৈশোর, যৌবন)।

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।