সুধাংশু শেখর বিশ্বাসের ভ্রমণ গল্প: দশরথের ঢোল

দশরথকে চিনতাম না আমি। নামও শুনি নি কখনও।

এককালে সংস্কৃতি জগতে একটু আধটু বিচরণ ছিল বটে আমার। ছাত্রজীবনে ‘উদীচী’, ‘খেলাঘর’ এসব সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু কর্মজীবনে প্রবেশ করে আস্তে আস্তে প্রায় বিচ্ছিন্নই হয়ে গেছি সে সব থেকে।

আমার স্কুল জীবনের বন্ধু বেলাল বহু বছর বিদেশে ছিল। দেশের টানে ফিরে এসে থিতু হয়েছে ঢাকায়। ‘ছায়ানট’ এর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতো সে। মাঝে মাঝে আড্ডা দিতে যেতাম বেলালের ওখানে। ওর কাছ থেকেই পরে জানতে পারি, দশরথ বাংলাদেশের সেরা ঢোলবাদকদের একজন। ঢোল নাকি কথা বলে তার হাতে । দেশের নামীদামী শিল্পীদের সাথে বাজায় সে। সত্য বলতে গেলে, গান যখন শুনি, তখন কণ্ঠশিল্পীই মুখ্য থাকে আমাদের কাছে। বাহবা সব পাওনা হয় তারই। যন্ত্রশিল্পীদের খবর আর কে রাখে!

সে যাই হোক, দশরথ ভাল ঢোল বাজাক বা না বাজাক তাতে আমার কিবা আসে যায়! আমি তো আর শিল্পী নই। তার সাথে গানও গাইতে যাবো না কখনও। কিন্তু ঘটনা ঘটে গেল একটা। আর তাতেই চিনলাম দশরথকে। তাও আবার দেশের মাটিতে নয়, বিদেশে।

সালটা ছিল ২০১৩। তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী জি এম কাদের এর নেতৃত্বে গেলাম দক্ষিণ কোরিয়ার সমুদ্র উপকূলবর্তী ‘উসু’ শহরে। উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক সমুদ্র সম্মেলনে যোগদান করা। অসাধারণ আয়োজন। প্রতিদিন আমরা সম্মেলনের স্টলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখি। উপভোগ করি নানা প্রোগ্রাম। ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার নামকরা সব দেশের স্টল আছে মেলায়। আছে বাংলাদেশেরও একটা স্টল। চলছে সমুদ্র বিষয়ক নানা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম। আর প্রতিদিনই থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এক একদিন এক এক দেশ তুলে ধরে তাদের সংস্কৃতি। আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রী মহোদয়কে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তেমনই একটা সেমিনারের থার্ড সেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য। আর হবে ‘বাংলাদেশ নাইট’। সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি থাকবেন তিনি। ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন মোঃ শাহরিয়ার আলম, এমপি। বর্তমানে যিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

‘বাংলাদেশ নাইট’ মানে আয়োজক এবং অতিথি বর্গের দু’চারটা কথাবার্তা। প্রধান অতিথি, সভাপতির বক্তব্য। তারপর কালচারাল প্রোগ্রাম। বাংলাদেশ থেকে শিল্পকলা একাডেমির ব্যানারে এসেছেন দেশের নামকরা সব শিল্পীরা সেই প্রোগ্রামে অংশ নিতে। বেশিরভাগই লোকজ গানের শিল্পী। তাদের মধ্যে আছেন ফরিদা পারভীন, কিরণ রায়, চন্দনা মজুমদার। অন্যদের কথা আর মনে নেই। আছেন বংশীবাদক। আছেন অনেক নৃত্য শিল্পীও। তাদের মধ্যে ওয়ার্দা রিহাবের কথা মনে আছে শুধু।

‘বাংলাদেশ নাইট’ বলে কথা। এই অনুষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশের মান সম্মান জড়িত। অনুষ্ঠান সন্ধ্যার পর। কিন্তু, আমরা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে যাই বিকেলের মধ্যেই। সবাইকে নিয়ে বসে চলতে থাকে আলোচনা, কথাবার্তা। কিভাবে অনুষ্ঠানটিকে সুন্দর আর সার্থক করে তোলা যায়। মনের মধ্যে সংশয় জাগে, দর্শক হবে তো আমাদের অনুষ্ঠানে!

এরা তো আর বাংলা বোঝে না। তাহলে কে আসবে বাংলা গানের অনুষ্ঠান উপভোগ করতে! যদি দর্শক শূন্য থাকে অডিটোরিয়াম, তাহলে তো জমবে না আসর। আকর্ষণ কি করে বাড়ানো যায়- চলতে থাকে সেই শলা পরামর্শ। মন্ত্রী মহোদয় বললেন, ভাল কোন উপায় বের করো।

সামনেই কাঁধে ঢোল ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দশরথ। দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ টিমের সদস্য, শিল্পী, কলা কুশলীরা। আমি একটু চেষ্টা করে দেখবো স্যার? এগিয়ে এসে বলেন দশরথ। সবাই তাকায় তার মুখের দিকে। অবাক হয়। তাচ্ছিল্য মেশানো দৃষ্টিতে যেন বুঝিয়ে দিতে চায়, ‘হাতিঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল’।
কিন্তু, কিভাবে? জানতে চাইলেন মন্ত্রী।
ঢোল বাজাবো স্যার। অডিটোরিয়ামের বাইরে রাস্তায় ঢোল বাজাতে বাজাতে এমাথা থেকে ওমাথা যাবো। আবার ওমাথা থেকে এমাথায় আসবো। বাদ্যের শব্দে মানুষ দাঁড়িয়ে যাবে। আপনারা তাদেরকে অনুরোধ করবেন অডিটোরিয়ামে ঢুকে আমাদের অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য।

বাংলাদেশের মান সম্মান বলে কথা। চেষ্টা করতে দোষ কি! দ্যাখো কি করতে পারো! সম্মতি দিলেন মন্ত্রী মহোদয়।

ঢোলে বাড়ি দিল দশরথ। সম্মেলনে ঘুরে বেড়ানো লোকজন বাদ্যের শব্দে আকৃষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। নেচে নেচে দশরথ রাস্তার এমাথা থেকে ওমাথা যায়। আবার ফিরে আসে নাচতে নাচতে। ঢোলের বাদ্য শুনে আসছি সেই ছোটবেলা থেকে। ঢোলের বাজনার সাথে একাত্ম হয়ে বেড়ে উঠেছি। শরত মানেই ঢোলের বাদ্য। সার্বজনীন শারদীয় উৎসব। মায়ের আগমন। দূরে মাঠে মাঠে কাশবন, সাদা ফুলের সারি।

কিন্তু আজকের বাদ্য একেবারেই অন্যরকম। দেশের সীমানা অতিক্রম করে, নদী-সমুদ্র পেরিয়ে বাঙ্গালীর সেই প্রাণের বাদ্য ঢোলের তালে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে ভিন দেশী, ভিন্ন ভাষাভাষীর কত মানুষ। বাংলা তারা বোঝে না। কিন্তু বাংলার ঢোলের বাদ্য সার্বজনীন। সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না কারো। ভাষা, চিন্তা, মনন কোনটাই বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। ঢোলের তালে মাতাল হয় সবাই।

আমাদের নৃত্যশিল্পীরা কখন নেমে পড়েছে দশরথের সাথে। মঞ্চে নয় তারা নাচতে শুরু করে দেয় রাস্তার উপরেই। তাদের সাথে নেমে পড়ে বেশ কিছু কোরিয়ান এবং ভিনদেশী ছেলেমেয়েরা। হাতে তালি দিয়ে উৎসাহ যোগাই আমরাও। সে এক অসাধারণ পরিবেশ। দশরথের ঢোলের যাদুতে আশেপাশের সমস্ত মানুষ এগিয়ে আসে। অডিটোরিয়ামের ভিতর থেকে ‘বাংলাদেশ নাইট’ লেখা একটা ব্যানার নিয়ে এলো কে যেন। সেই ব্যানারটার দুইপাশে দু’জন ধরে দাঁড়িয়ে গেল। আমাদের লোকজন সবাই যে যেভাবে পারে, সে সেভাবেই উপস্থিত লোকজনকে অনুরোধ করতে লাগলো অডিটোরিয়ামের ভিতরে গিয়ে আসন গ্রহণ করার জন্য।

মেলার মানুষ দুজন, চারজন করে ঢুকে যেতে থাকে অডিটোরিয়ামের ভিতরে। আমাদের অনুষ্ঠান শুরুর সময় ঘনিয়ে আসে। দশরথ আবার তার কারিশমা দেখালো। তার ঢোল বেজে উঠলো নতুন মাত্রায়। সেই বাজনার তালে নেচে নেচে দশরথ এগোতে থাকে অডিটোরিয়ামের প্রবেশ মুখের দিকে। তার পেছন পেছন নাচতে নাচতে দলে দলে মানুষ ঢুকে পড়তে থাকে অডিটোরিয়ামের ভিতরে। যেন হেমিলনের বাঁশীওয়ালা সে। তার বাঁশিরূপী ঢোলের তালে মন্ত্রমুগ্ধ নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। চলেছে যেন তারা আচিনপুরে নিরুদ্দেশ যাত্রায়।

দেখতে দেখতে কানায় কানায় ভরে যায় অডিটোরিয়াম। তারপরও উপচে পড়ে দর্শক। গ্যালারির মাঝখানের সিঁড়িতে বসে পড়ে অনেকে। পেছনে এবং পাশে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে থাকে অনেক দর্শক। আমাদের শিল্পীদের মনে জেগে ওঠে বিপুল উৎসাহ আর উদ্দীপনা।

আনন্দে উদ্বেলিত বাণিজ্য মন্ত্রী মহোদয়। উদ্দীপ্ত এমপি শাহরিয়ার সাহেব। উদ্দীপ্ত আমরা। দশরথ ভিতরে ঢুকেও থেমে যায় না। সে স্টেজ ছেড়ে চলে আসে অডিয়েন্সে। মাথার চুল ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে নাচতে নাচতে বাজাতে থাকে ঢোল। জমে গেল আমাদের বাংলাদেশ নাইট। দেশের গান আর নৃত্যের তালে তালে দর্শকরাও নাচতে শুরু করে। বাঁশির সুরে মুগ্ধ হলো তারা। পল্লীগীতি, ভাটিয়ালীর উঁচু লয়ের মহনীয় টানে হলো মোহিত। দক্ষিণ কোরিয়ার সমুদ্র উপকূলের উসু শহরে সুরের তালে মাথা উঁচু করে গান আর নাচের তালে জেগে রইলো বাংলাদেশ। গর্বে আনন্দে চোখ ভিজে এলো আমাদের।

 

সুধাংশু শেখর বিশ্বাস

জন্ম ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার প্রত্যন্ত বিলের মধ্যে মধুপুর গ্রামে। পড়াশুনা  করেছেন অর্থনীতিতে এমএ। বিসিএস ১৯৮৪ ব্যাচের সহকারী সচিব হিসেবে কর্মজীবন শুরু। মাঠ পর্যায়ে ছিলেন ইউএনও, এডিসি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরডিএ, বগুড়ার পরিচালক। কাজ করেছেন উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। অবসর নিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে। সরকারি কাজে ঘুরেছেন বহু দেশ। অবসর জীবন কাটে ঘোরাঘুরি আর লেখালিখি করে।

প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আঠারো। ভ্রমণ কাহিণি-৬ (সাগিনো ভ্যালি, হোটেল সিয়াম, মস্কোর ঘন্টা, হোয়াইট চ্যাপেল, ঘুরে দেখা আমেরিকা),

ছোটগল্প-১ (স্ট্যাটাস),  

গবেষণা গ্রন্থ-১ (বিলের জীবনঃ নমশূদ্রদের বার মাসের তের পার্বণ), ২ নমসপুত্র আর ৩ নমস উপাখ্যান। এই দু’টি গ্রন্থের জন্য  তিনি অত্যন্ত সুপরিচিত। 

কিশোর উপন্যাস-১ (সুরুজ দ্য গ্রেট) স্মৃতিগল্প-৩ (সোনালী ডানার চিল- শৈশব, কৈশোর, যৌবন)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।