ধা রা বা হি ক আ ত্ম জী ব নী: মায়াপারাবার (পর্ব-৬)


পর্ব-১।। পর্ব-২।। পর্ব-৩।। পর্ব-৪।। পর্ব-৫

পাপড়ি রহমান

মা মনসার নাতনী-পুতনীদের খবর!

বাড়ির চারপাশে জলা-জংলার অভাব নাই। ফলে মা মনসার নাতনী-পুতনীরা অনায়াসে তাদের রাম-রাজত্ব কায়েম করে আছে। তাদের রাজ্য তো আছেই। নিজরাজ্য ছেড়ে তারা যে লোকালয়ে আসেনা এমন নয়। কাহাতক আর ভালো লাগে জঙ্গলের ভেতর থাকতে? বিশেষ করে গরমকালে। গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে তারা নেমে পড়ে আমাদের পুকুরের জলে। জলকেলি করে ক্লান্ত হলে বিশ্রামের জন্য উঠে আসে আমাদের বাইরবাড়িতে। বাংলাঘরে। ভেতরবাড়িতে। ঘরের পৈঠায়। অনেকে আবার ঘরের ভেতরও ঠাঁই করে নেয়। ঘরে যারা থাকে তাদের বলে ‘ঘরগিন্নী’। মানুষের গিন্নীপনায় হয়না-মনসাদেবীর বংশধর গিন্নীপনা করতে ঢুকে পড়ে আমাদের সংসারে।

আমার বড়চাচীমা বরাবর সৌখিন মানুষ। গরমকালে বিছানায় পেতে শোয়ার জন্য সুদূর সিলেট থেকে আনিয়েছেন শীতলপাটি। একদিন দুপুর বেলায় যাবতীয় আলস্য মেখে শুয়ে আছেন আধো ঘুম, আধো জাগরণে। হঠাৎ করে ঘরের সিলিং থেকে থপ করে কি যেন তার বুকের কাছে পড়লো! তিনি শুয়েছিলেন কাত হয়ে। তেমনিভাবে শুয়েই চোখবুজে ‘পড়া’ বস্তুটাকে হাত দিয়ে খাটের নিচে ফেলে দিলেন। হাতের স্পর্শে টের পেলেন বেশ খসখসে ও ঠাণ্ডা এই ‘পড়া’ বস্তু। ফলে তিনি চোখ মেলে তাকালেন এবং জোরে চিৎকার দিলেন-

‘সাপ! সাপ! সাপ!’

না, তেমন কিছু নয়। একটা ঘরগিন্নী সিলিং থেকে পড়েছিল পাটির উপর। বড়চাচীমা তাকে হাত দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছে। ফলে সে মন খারাপ করে দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল!

বাড়ির বড়দের ধারণা আমরা যারা পোলাপান, তারা নিজে নিজে গোসল সারলে অপরিছন্ন থাকা হয়! ফলে প্রতিদিনই আমাদের দলাই-মলাই করে গোসল করানোর জন্য আম্মা, বড়চাচীমা বা সেজকাকা আছেন। কখনো কখনো দিদিও এই দলাই মলাইয়ের কাজে হাত লাগান।

তখনতো বিশুদ্ধ পানি বলতে কুয়া। কুয়া ছাড়া পেয় জল পাওয়া দুস্কর! কোনো কোনো বাড়িতে দুই একটা টিউবয়েল হতে শুরু করেছে। বেশিরভাগ বাড়িতেই কুয়ার পাশেই পাটখড়ি বা টিনের ঘের দিয়ে লাগোয়া গোসলখানা–এতে পানি টানার কষ্ট কিছটা লাঘব হয়।

সেদিন আম্মাই দলাই-মলাই করছেন আমাদের। বড়চাচীমার কনিষ্ট ছেলে শিপুর আপাদমস্তক সাবানের ফেনায় ভরপুর। আমি গোসলখানার ভেতর দাঁড়িয়েই ওর গোসল দেখছি। কারণ শিপুর পরেই আমার পালা। গতর পরিস্কারের নামে এতক্ষণ ধরে সাবান-পানিতে ডলাডলি আমাদের খুব অপছন্দের বিষয় ছিল। কিন্তু পরিত্রানের উপায় ছিল না।

শোলার গোসলখানার উপরে অবারিত আসমান। সেই আসমান ঢেকে দিয়ে আছে আম-কাঁঠালের ঝাঁকড়া মাথা। আর বাঁশের কঞ্চি। বাঁশের মাথা-পাতা। কোথা থেকে কেমন করে তিনি সুরৎ করে নামলেন- আল্লা-মালুম! নেমেই সে কি রাগ তার! একেবারে ফণা তুলে ফোঁসফোঁস করতে লাগলেন! ছোট্ট একেবারে-দৈর্ঘ্যে একহাত। প্রস্থে আধ ইঞ্চি। কিন্তু মেজাজ তার চরম খারাপ! একেবারে বিষে ভরপুর। নাম তার দেহের মতোই ‘সুতানলি’। আমরা বলি ‘সুতানড়ি’!

‘ওরে বাপরে! সাপ!সাপ!সাপ!’

প্রচণ্ড চিৎকার দিয়ে আমাদের তো ফিট পড়ার দশা! আম্মাকে দেখি শিপুর হাত ধরে মুহূর্তে হাওয়া হয়েছেন। আর আমি জিম্মি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছি তার উদ্যত ফণার সম্মুখে!

বড়চাচীমা হাউমাউ করে নেমে এসেছেন উঠানের মাঝখানে। আর ক্রমাগত চেচাচ্ছেন–

‘আমার পুলা কই? আমার পুলা কই?’

পুলা তো তার নিরাপদেই আছে, কিন্তু আমার অবস্থা কি?

আমাদের গোসলখানার সামনে বাড়ির প্রায় সকলেই জড়ো হয়ে গেছে। সে এক ভয়াবহ কাণ্ড! মাহমুদ চাচা(আব্বার চাচাতো ভাই, আম্মা আর চাচীমারা বলেন ‘মাকমুদ’) মোটা একটা বাঁশ হাতে ছুটে এলেন। তারপর খুব কৌশলে এক বাড়িতে ফণাটা চ্যাপ্টা করে দিলেন।

আমি তখনো গোসলখানার ভেতর দাঁড়ানো। অল্প অল্প কাঁপছি। কোথাও যে সরে যাবো সে উপায় ছিলনা। তিনি তো আমাকেই দেখছিলেন! কেন যে ছোবল মারেননি তা তিনিই জানেন। তবে তার ওই দয়ার অর্থ আমি আজও খুঁজে পাইনা! হয়তো আজকে আমি তার কথা এমন করে লিখব বলে তিনি আমাকে অই ছাড় দিয়েছিলেন। এই পৃথিবীই তো রহস্যের আকর!

বর্ষাকালে মানুষ যেমন আশ্রয় সন্ধান করে, মা-মনসার বংশধররাও আশ্রয় সন্ধান করে। কারণ তারাও নিশ্চয়ই জানে

মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই…

আসলেই তো মানবজাতি না থাকলে তাদের নিয়ে কে এমন করে মাথা ঘামাত? তাদের কথা হরহামেশা লিখতই বা কে? তাদের নিয়ে এরূপ ত্রাসে থাকতো কে?
তো আমাদের ভুরুঙ্গিরও ছিল তাদের নিয়ে ত্রাস। এবং তার এই ত্রাস খানিকটা বেশিই। ভুরুঙ্গির ছিল আরেকটা বাতিক যখন তখন নিজের পশ্চাৎদেশ উদোম করা। আর এ বাড়ি সে বাড়ি ঢুলকি বাওয়া।

সেবারও ঘোর বর্ষা। আমাদের বাড়িটাই কেবল কচ্ছপের পিঠ হয়ে আছে। চারপাশ জলে জলমগ্ন। ভুরুঙ্গি এসেছিল আমাদের বাড়িতে ঢুলকি বাইতে। তার পরবর্তী যাত্রা কাজিবাড়ি। এবং সে কাজিবাড়ির উদ্দেশে পা বাড়ায় কি বাড়ায়নি, হঠাৎ বিকট চিৎকার!

‘ওরে বাপরে হাপে খাইয়া ফালাইল রে!’

ভুরুঙ্গি যত জোরে চেঁচায় তার চেয়েও দ্রুত পরনের শাড়ি-সায়া মাথায় তোলে। ভুরুঙ্গির বেদশা দেখে বাড়ির পুরুষরা আগাতে পারেনা। কিন্তু কেউ সাপের মুখে আছে, তা শুনে পেছাতেও পারেনা। একেবারে যাকে বলে ত্রিশংকু অবস্থা! এদিকে সাপটা যে কই তাও কেউ ঠাহর করতে পারছে না! কি আর করা? ফের দিদিই ভরসা। দিদি চেঁচিয়ে বলতে লাগলো-

‘অই রে বেহুদা মাগী, পাছার কাপড় তো মাথায় তুইল্যা থুইছস, কাপড় আগে নামা। তুই এমুন নাঙ্গা হইলে পুরুষ মানুষ আগাইব কেমনে?’
দিদির কথা তার কানে যায় কিনা বুঝা যায় না। সে ক্রমাগত চেঁচাতেই থাকে–

‘ওরে বাবারে, আমারে…’

ভুরুঙ্গির মাথার কাপড় নামার কোনো নিশানা দেখা যায় না।কি আর করা পুরুষরা প্রায় নাক/চোখ বুঁজে সাপের সন্ধানে নেমে পড়ে। সত্যিই বিশাল এক সাপ ডুমুর গাছে পেঁচিয়ে আছে। জল বাড়ন্ত দেখে সেও হয়তো আশ্রয় নিয়েছে।

আজদাহা দাঁড়াশ সাপ! তীব্র বিষাক্ত। কিন্তু কে তাকে মারবে? কিভাবেই বা মারবে?

জমিদারবাড়ির বন্দুক এনে ওই সাপ মারা হলো। এরপরে শহীদচাচা (আব্বার চাচাতো ভাই) নিজেই দু’নলা বন্দুক কিনে আনলেন। যাতে সাপ ও ডাকাত দুইটাই তাড়ানো যায়।

সে এক বিশাল বড় সাপ ছিল।৬-৭ ফুট লম্বা।মৃত সাপ দেখতে দশ গ্রামের মানুষ ভীড় করে দাঁড়ালো। পরে অই সাপকে গোর দেয়া হয়।

মা মনসার বংশধরদের মাঝে ঢোড়ার রাজত্ব ছিল সব চাইতে বেশি। খালপাড়, পুকুরপাড়, কুয়ারপাড়, সামান্য জংলা, বাঁশছোপ কিছুই সে বাদ রাখতো না! ঢোড়ার ঘুরাঘুরি সর্বত্র। ফলে সে মারাও পড়তো সর্বত্র। সে নাকি আবার নির্বিষ! কিন্তু তবুও তাকে মরতে হতো। ওই যে সর্প বলে কথা!বিষ না নির্বিষ পরের বিবেচ্য।
সর্প পাইলে তারে নিধন কর এবং নিরাপদ থাকো-মনুষ্য জাতির জন্য বেদবাক্য।

সর্পও তো মানুষ পেলেই ছোবল মারে, মারবেই। স্বভাব।

ঢোড়ার মতো সহজদেখ্য সাপ ছিল গুঁই। কত যে তাদের দেখেছি। এমন বিশ্রী দেখতে! দেখলেই গা ঘিনঘিন করতো! আরো আছে একটা- টিকটিকির মতো চেহারা কিন্তু বিষাক্ত! নাম ‘রক্তচোষা’। সে সর্প প্রজাতির কিনা জানিনা, তবে তার চেহারা-সুরত ছিল অতি ভয়ংকর!

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *