ধা রা বা হি ক আ ত্ম জী ব নী: মায়াপারাবার (পর্ব-৮)

পর্ব-১।। পর্ব-২।। পর্ব-৩।। পর্ব-৪।। পর্ব-৫।। পর্ব-৬।। পর্ব-৭

পাপড়ি রহমান

মৎসরূপ ক্যারক্যারি!

আমার আব্বার ছিল নানান খেয়াল। তার সাধ ছিল অনেক কিন্তু সাধ্য ছিল সিমীত। নিজে যেটুকু সৎভাবে আয় করতেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। পরের হাজার বিত্ত বা ধনদৌলতে কখনো তাকে পরশ্রীকাতর হতে দেখিনি। মোটকথা তিনি ছিলেন নির্লোভ। এবং আমাদের খুব কঠিন শাসনে বড় করেছিলেন। প্রায়ই আমাদের ডেকে বলতেন–

‘কখনো পরের জিনিসে লোভ করবা না’
‘সজ্ঞানে মিথ্যাকথা বলবা না’
‘বিনয়ী থাকলে সে তোমাকে এনে দেবে জয়ের মালা’
‘ধৈর্য তোমাকে করবে মহিয়ান’
‘ত্যাগের মাঝেই খুঁজে পাবে সার্থকতা’

শিশুবেলায় এইসব সুশীল বাক্য শিখে বড় হওয়ার খেসারত আমাকে পলে পলে দিতে হয়েছে। বিশেষ করে আমি কাউকে ‘ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে’ দেখলে সে ভাবে আমি দূর্বল! এবং এই ভেবে সে আমার প্রতি ক্রমাগত অন্যায় করে যেতে থাকে। এইভাবে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে যেতে আজ আমার মনে হয়, আব্বার দেয়া সমস্ত শিক্ষাই ভুল ছিল। কি হলো তাঁর যত শিক্ষা মেনে চলে? সত্যবাদিতা, আদর্শ আর ভালোমানুষীর জন্য আমাকে তুমুল খেসারত দিতে হয়েছে। নানান ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। সেসব কথা অন্য কোথাও বলা যাবে। আজ আর এখানে নয়।

তো আব্বার নানান খেয়ালের মাঝে ছিল পোলাপানদের খুশি করা। যখনই ঢাকা থেকে বাড়ি আসতেন, আমাদের জন্য নানা ধরনের চমক নিয়ে আসতেন। হয়তো নিয়ে এলেন দুই টিন ভর্তি ক্রীম বিস্কুট। অথবা দারুণ সুস্বাদু টফি। আমরা এক অদ্ভুত কায়দায় ক্রিম বিস্কুট খেতাম। বিস্কুটটা দুইভাগ করে শুধু ক্রীম চাটতে থাকতাম। ক্রিম চেটেপুটে খেয়ে শেষ করার পর বিস্কুট খেতাম। অবশ্য আমাদের এমন করে খেতে হতো বড়দের চোখের আড়ালে। তারা দেখলে কষে লাগাতেন এক ধমক। রেগেমেগে বলতেন–

‘এই রকম ছ্যাদড়ের মতো কেউ বিস্কুট খায় নাকি?’

আমাদের আরো বেশি বেশি চমকে দেয়ার জন্য আব্বা নিয়ে আসতেন মাখন, পনির, ক্রিম, পাউরুটি, জ্যাম, জেলি ইত্যাদি। একবার তো এত বড় একটা চিতল মাছ কিনে আনলেন যে সেটা লম্বায় আমার চাইতেও বড়। সেই চিতল মাছের কাঁটা দিয়ে ছোটফুপু আমার পুতুলের জন্য উল বুনে দিলেন। শুধু খাবারের জিনিস নয়, আব্বা কিনে আনতেন খেলনা গাড়ি, বল, এরোপ্লেন, ছোট ছোট সুন্দর গাড়িসহ আরো কত কিছু।

এর মাঝে একদিন এক অদ্ভুত সুন্দর খেলনা কিনে আনলেন আমাদের জন্য। আমরা কেউ-ই এই রকম খেলনা দেখিনি বা নামও শুনিনি। ফলে আমরা নিজেরাই এর নাম দিয়ে দিলাম-‘ক্যারক্যারি’ ! কারণ ওটা ঘুরালেই ক্যারক্যার শব্দ করতো। খেলনাটা ছিল একটা সুদৃশ্য মাছ। মাছের শরীরে নানা রঙের ছবি আঁকা। মাছের ঠিক লেজের নিচে হাতে ধরার ডাণ্ডা। ওই ডাণ্ডা ধরে ঘুরালেই মাথার দিকটা চরকির মতো ঘুরতে শুরু করতো। আর ঘুরতে ঘুরতে ক্যার ক্যার শব্দ করতো। আমাদের সাতজনের হাতে সাতটা ক্যারক্যারি। একসঙ্গে যখন ঘুরাতাম বড়রা তেড়েমেরে আসতো। এত বিশ্রী শব্দ হতো যে বলার নয়। এক পর্যায়ে বড়রা এতটাই বিরক্ত হলো যে ক্যারক্যারি মাছ হাতে নিলেই চড়-থাপ্পড় খাওয়া অবধারিত ছিল। ফলে ভয়ে ও ভাবনায় আমার এত সুন্দর ও সখের ক্যারক্যারিটা তুলে রাখলাম উঁচু একটা তাকের উপর। ক্রমে ক্রমে সবার ক্যারক্যারি ভেঙে গেল বা হারিয়ে গেল বা বেহাত হয়ে গেল। আর বড়রাও নিস্তার পেল শব্দের জ্বালাতন থেকে।

অনেক অনেক দিন বাদে আমি খুশি মনে পেড়ে আনলাম আমার মৎসরূপ ক্যারক্যারি। উদ্দেশ্য সবারটা তো হাওয়া আমার একারটা আর কত জোরে শব্দ করবে? কিন্তু বিধি বাম। তাকিয়ে দেখি আমার সোনালি মাছের জৌলুস ম্লান হয়ে গেছে। মাছের সারা গায়ে মরিচা পড়া। ডাণ্ডা ধরে ঘুরাতে গেলাম বিদঘুটে ক্যারক্যার শব্দ করে চিরতরে সে থেমে গেল। ক্যারক্যারির ভেতরের হুইলে মরিচা পড়ে ওটার ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছে। আমি অবস্থা দেখে প্রায় কেঁদে ফেললাম।
অতি যত্নে রাখা জিনিস বুঝি এভাবেই দাগা দেয়?

শব্দহীন, মরিচাধরা খেলনাটা আমাকে একেবারে কাঁদিয়ে নিভন্ত করে তুললো। আমি ওই রকম মৎস  আকৃতির খেলনা আর কোথাও দেখিনি। ফলে ওটার দুঃখ ভোলা আমার জন্য কঠিনই ছিল বটে…

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।