ইউ.জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৬


ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ১ ।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ২ ।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৩ ।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৪।। ইউ. জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৫

 

ধর্মভাবনাই মানুষের ট্র্যাজেডির জন্যে দায়ী

বাংলা অনুবাদ: নান্নু মাহবুব

 

১.
সাক্ষাৎকারগ্রাহক: তোমার এমন একটা বিষাদময় জগৎদৃষ্টি হলো কীভাবে?

ইউ জী: সব ধরনের ধর্মীয় লোকজন দিয়ে আমি পরিবেষ্টিত ছিলাম। মনে হতো তাঁদের আচরণে হাস্যকর কিছু আছে। তাঁদের বিশ্বাস আর তাঁদের জীবনযাপনে বিশাল ফারাক ছিলো। তাতে আমি সবসময়ই বিরক্ত হতাম। তবে তাঁরা সবাই-ই যে কপট ছিলেন সেকথা বলবো না। আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘‘তাঁদের বিশ্বাসেই কোনো সমস্যা আছে। গলদটা হয়তো গোড়াতেই।’’ মানবজাতির সকল গুরু, বিশেষ করে ধর্মীয় গুরুরা, নিজেদেরকে প্রবঞ্চনা করেছেন আর প্রবঞ্চনা করেছেন সমগ্র মানবজাতিকে। সুতরাং আমার নিজেকেই সেটা খুঁজে বার করতে হবে আর─যতক্ষণ পর্যন্ত আমি কারো ওপর নির্ভর করছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমার কিছুই খুঁজে বার করার উপায় নেই।

দেখলাম যা-কিছু আমি চেয়েছি সেটা হলো─আমার মাধ্যমে তাঁরা [ধর্মীয় লোকেরা] যা চেয়েছেন। যা-কিছু আমি ভেবেছি সেটা হলো যা তাঁরা আমাকে ভাবাতে চেয়েছেন। তো এর বাইরে বেরোবার পথ ছিল না। একপর্যায়ে কিছু একটা আমাকে ধাক্কা দিলো: ‘‘সেখানে রূপান্তরের কিছু নেই, সেখানে পরিবর্তনের কিছু নেই। অনুধাবন করার জন্যে সেখানে কোনো মন নেই, কোনো অহম্ও নেই। আমি কী ছাই করে যাচ্ছি?’’ এই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আমাকে আঘাত করলো একটা বজ্রবিদ্যুতের মতো, একটা ভূমিকম্পের মতো। আমার চিন্তার সমগ্র কাঠামোটা বিধ্বস্ত হয়ে গেলো, যা-কিছু সেখানে ছিলো, সমস্ত সাংস্কৃতিক ইনপুট─ধ্বংস হয়ে গেলো। খুবই অদ্ভুতভাবে সেটা আমাকে ধাক্কা দিলো। আগের প্রত্যেকটি মানুষের যা-কিছু চিন্তা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতা আমার মনুষ্যদেহ থেকে সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়ে গেলো। একদিক দিয়ে, সেটা আমার মনটাকেও পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দিলো, যে মনটা আসলে মানুষের অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানের সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। সেটা আমার পরিচিতিটাও ধ্বংস করে দিলো। পরিচিতিটা দেখ সেখানে [ইউ জী’র মধ্যে] সাংস্কৃতিক ইনপুট ছাড়া আর কিছু নয়।

একটা সময় মনুষ্যচেতনায় আত্মচৈতন্যের উদ্ভব হয়। (‘আত্ম’ শব্দটা ব্যবহার করে আমি এই কথা বলতে চাইছি যে সেখানে কোনো আত্মা বা কেন্দ্রবিন্দু আছে।) ওই চৈতন্য মানুষকে জগৎসমগ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। শুরুতে মানুষ ছিলো একটা সন্ত্রস্ত সত্তা। অনিয়ন্ত্রণীয় সবকিছুই সে ঐশ্বরিক বা মহাজাগতিক কিছু একটা বানিয়ে নিয়ে উপাসনা করতে থাকে। ওই মানসিক অবস্থাতেই সে সৃষ্টি করে ‘‘ঈশ্বর’’। কাজেই, তুমি যা-ই হও না কেন, তার জন্যে দায়ী হলো সংস্কৃতি। আমি বলি যে আজ আমাদের সকল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ভাবাদর্শ মানুষের ওই ধর্মভাবনারই উপবৃদ্ধি। মানবজাতির আজকের বেদনাদায়ক পরিস্থিতির জন্যে এক অর্থে আধ্যাত্মিক গুরুরাই দায়ী। আজ আমরা এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে আমাদের ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করা দরকার এবং আমাদের কিছু করার আছে কিনা সেটা খুঁজে বার করা দরকার ।

দুনিয়াটা যেভাবে চলছে তাতে মনে হয় না কোনো আশা আছে। মানবজাতির নিজের সৃষ্ট নৈরাজ্য থেকে যদি তাকে মুক্ত হতে হয়, তাহলে মানুষকে অন্য রাস্তা খুঁজে বার করতে হবে। আমি যা দেখি, সমগ্র ব্যাপারটা এমন একটা লক্ষ্যের অভিমুখে যেটা থামাবার বা উল্টোদিকে নেবার কোনো উপায় নেই।

সেদিন একজনের সাথে কথা হচ্ছিল, তিনি জানতে চাইলেন, ‘‘তুমি উদ্বিগ্ন নও কেন?’’ আমি কাউকে উদ্ধারে আগ্রহী নই। সত্যি কথা বলতে কি, সকল উদ্ধারকর্তাদের হাত থেকে জগতটাকে উদ্ধার করা দরকার, সেই আর্জিই আমি করি। কোনো কিছু পাল্টাতে, বদলাতে বা উল্টোদিকে নিতে ব্যক্তিগতভাবে তোমার বোধহয় কিছুই করার নেই। আর ‘সমষ্টিগতভাবে’ মানেই হলো যুদ্ধ। দুর্ভাগ্যক্রমে, রাজনীতিকদের আমরা ক্ষমতার গদিতে বসিয়েছি। আমাদের আছে শুধু রাজনৈতিক সচেতনতা। অথচ ধর্মীয় লোকেরা এখনো ঐশীতা, মানবতা, প্রাচীন সভ্যতা, রামরাজ্য, এটা-ওটা নিয়ে বলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নির্বাচনের স্বার্থে রাজনীতিকরাও এইসমস্ত ব্যবহার করেন, এইভাবেই জনগণকে তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই যা মৃত, আমরা যদি সেইদিক দিয়েই ভাবতে থাকি, চিন্তাভাবনা করার জন্যে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সেইজন্যেই লোকজন আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘‘গর্বাচেভকে নিয়ে কি ভাবছো?’’ গর্বাচেভ কমিউনিজমের জন্যে একজন বিশ্বাসঘাতক। কমিউনিজমের জন্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আর এখন যদি সে তার সমস্যার সমাধানের জন্যে পশ্চিমের দিকে তাকায়, কোথাও কোনো গোলমাল আছে। সোভিয়েট কাঠামোর মধ্য থেকেই সমাধানটা খুঁজে বার করতে হবে । ম্যাকডোনাল্ড’স বা জৈব প্রযুক্তিতে উৎপাদিত আলু বা পেপসি কোলা ছাড়া পশ্চিম তাকে আর কিছুই দেবার অবস্থায় নেই। ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মানবতার ধারণা নয়, সেখানে আসলে পরিবর্তন ঘটিয়েছে পেপসি কোলা। পেপসি কোলা রাশিয়া জয় করেছে। আর চীনে ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলেছে কোকা-কোলা।

আমি যা বলতে চাইছি─আমাদের ওপর চিন্তার নিয়ন্ত্রণ সাংঘাতিক। চিন্তা তার জন্মে, আধেয়ে, প্রকাশে এবং কাজে, ফ্যাসিস্ট। সবকিছুই এটা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এবং চিন্তা সেই অস্ত্র নয় যা আজ আমরা যে-সমস্যার মুখোমুখি সেটার সমাধানে কাজে লাগবে। আমরা শুধু প্রশ্ন করতে পারি এবং কোনো মীমাংসা আছে কিনা সেটা ব্যক্তিগতভাবে খুঁজে দেখতে পারি। সমষ্টিগতভাবে মানেই হলো দেখ, আমার একটা ধারণা, তোমার আরেকটা ধারণা, এবং আমাদের মধ্যে লড়াই আসন্ন।

আমরা যে পরিচিতিটা গড়ে তুলেছি, ওই সংস্কৃতি যে পরিচিতিটা আমাদের ভেতরে গড়ে দিয়েছে, সেটাই সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আমাদের গণ্য করতে হয়। যদি এই পরিচিতিতে (যা আসলে সংস্কৃতিরই উৎপাদন) আমরা গুরুত্ব দিতেই থাকি, আমাদের পরিণতি হবে আলঝাইমার্স ব্যাধি। স্মৃতি এবং মস্তিষ্ককে আমরা এমন কাজে নিয়োজিত করেছি যা এর অভিপ্রেত নয়। একই কাজ কম্পিউটার অনেক দক্ষতার সাথে করতে সক্ষম।

কেবল অবিরাম স্মৃতি ব্যবহারের মাধ্যমেই আমাদের পরিচিতিটা বজায় রাখা সম্ভব। মনুষ্যপ্রাণীটাকে এটা পুরোপুরি পরিশ্রান্ত করে ফেলে, দুনিয়ার সমস্যা বিহিতে এর আর সামান্যই শক্তি অবশিষ্ট থাকে। তুমি নিশ্চয় সম্প্রতি আমেরিকান একটা ম্যাগাজিনে পরিসংখ্যানটা দেখে থাকবে। ষাট বছর বয়সীদের প্রতি তিনজনে একজন এই ব্যাধিতে আক্রান্ত। এই ব্যাধির প্রকৃতিটাই এমন যে এটা মন আর পরিচিতি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ইংল্যান্ডে আশির বৃত্তে প্রতি দুইজনে একজন─প্রায় ছয় লক্ষ মানুষ আক্রান্ত, তার ভেতরে দুইজন নোবেল বিজেতাও আছেন। বিশ্ব জুড়ে শত শত হাজার হাজার মানুষ এতে আক্রান্ত। ঠিক কত সংখ্যক মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছেন তার কোনো রেকর্ড আমাদের হাতে নেই। হয়তো নতুন করে আরো ভালো কিছু সৃষ্টির জন্যে আমাদের সবাইকে উদ্ভিদ বানাতে [মুচকি হাসি] এটাই প্রকৃতির পন্থা। আমিও যে-কারোর মতোই ভালোমন্দ মতামত দিয়ে যাচ্ছি। আমি আমার কথা বলছি।

তোমার অধিকাংশ কথার সাথে আমি একমত। কিন্তু তারপরও কিছু উচ্ছেদের কাজ, ধুলোবালি পরিষ্কারের কাজ থেকেই যায়। এইসমস্ত ধর্মপ্রচারক আর সাধুবাবারা…

যখনই কোনো সাধুবাবা মঞ্চে আবির্ভূত হন, ইতিমধ্যে যত নৈরাজ্য রয়েছে সেটারই ভরবেগ বাড়িয়ে তোলেন, এবং আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাই।

হ্যাঁ, আমি সেটাই বলতে চাইছি।

আমরা সবাই ঈশ্বরবিরোধী হয়ে যাবো, সবকিছু ধ্বংস করে দেবো, সেটা নয়। আমি যখন কোনো সামগ্রিক নৈরাজ্যের কথা বলছি, সেটা অস্তিত্বের একটা দশা, কোনো কর্মকাণ্ডের দশা নয়। সেখানে কোনো ক্রিয়া নেই। হয়তো সেখান থেকে নতুন কিছু বেরিয়ে আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের এক আগ্নেয়গিরির কাছে এক নতুন ধরনের জীবনের কথা শোনা যাচ্ছে। হয়তো নতুন কিছু জন্ম নেবে। এমন নয় যে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি চিন্তিত। মানবজাতি যদি বিদায় নেয়, তুমি-আমিও তার সাথে বিদায়। তোমাকে বা আমাকে কে মানবজাতি রক্ষার আজ্ঞা দিয়েছে? আমি এই দুনিয়ার একটা অংশ। আমার কথা যদি বলো এই দুনিয়ার সাথে আমি নিখুঁত ঐক্যে থাকি। এটা যেমন আছে তেমনই আমি এটাকে পছন্দ করি। এর সাথে আমি কোনো দ্বন্দ্বে নেই। এর কোনো রকমফের হতে পারে না। তোমরাই সমগ্র জিনিসটাকে পাল্টাতে চাও─ ‘‘আরো ভালো এবং আরো সুখী একটা বিশ্ব’’। আমি তোমার মতো ওইরকম বিশ্ব সৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা দেখি না। অবশ্যই সেই প্রশ্নই আমরা করবো যা আগে কখনো করা হয় নাই, কারণ এতকাল আমরা যত প্রশ্ন করেছি সেই সমস্ত প্রশ্নেরই জন্ম হয়েছে ইতিমধ্যে-থাকা উত্তরগুলি থেকেই।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, এইসমস্ত লোকেদের একমাত্র সমাধান হলো ভারতের মহান ঐতিহ্যে প্রত্যাবর্তন। আমরাই ভারতীয় মহান ঐতিহ্যের ফসল। কিন্তু আমরা যা করেছি তা যদি এই হয়ে থাকে, এবং আমরা যদি সেটাই হয়ে থাকি যা আজ আমরা, ভারতের মহান ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হওয়ার জায়গাটা কোথায়? কেন তুমি আমাদের ফেরাতে চাও? এই মহান ঐতিহ্য এমন একটা কিছু যা আমাদের কোনো কাজে লাগে নাই। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে আমরা কী করতে পারি? সমাধানটা কী? হয়তো তোমার কাছে কোনো সমাধান আছে, তার কাছে কোনো সমাধান আছে। তাদেরকেই আমি জিজ্ঞেস করি, যেহেতু কোনো পরিবর্তন ঘটাতে চাইছে তারাই। পরিবর্তনের কিছু নেই। যতকাল তুমি নিজের ভেতরে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে চাইবে ততকাল তুমি দুনিয়াটা পাল্টানো নিয়ে কথাবার্তা বলতে থাকবে। যখনই তুমি নিজের ভেতরে কোনো পরিবর্তন ঘটানোর চাহিদা থেকে মুক্ত হয়ে যাচ্ছো, জগতে কোনো পরিবর্তন ঘটানোর দাবিটাও শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সকল বিপ্লবই আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া আর কিছু নয়। তুমি শুধু একটা পদ্ধতির জায়গায় আরেকটা পদ্ধতি স্থাপন করছো। কিন্তু মূলত কোনো পদ্ধতিই প্রতিস্থাপিত পদ্ধতির থেকে খুব-একটা ভিন্ন কিছু হবে না।

তারপরও ‘জানতে চাওয়া’র আকুতিটা থেকেই যাচ্ছে। ঈশ্বর আমি নাকচ করে দিই, আমি একজন অজ্ঞেয়বাদী। তারপরও অধিকাংশ মানুষের সাধারণ যেসব প্রশ্ন: ‘‘কেন আমরা এখানে? আমাদের মৃত্যুর পর কী ঘটবে?’’ আমার কাছে এসবের কোনো উত্তর নেই। আমার একমাত্র উত্তর হলো আমার কাছে কোনো উত্তর নেই। আমি জানি না। কিন্তু আমরা তাতে সন্তুষ্ট নই। সেজন্যেই আমরা তোমার মতো লোকেদের কাছে যাই।

আমি বলবো, গুরুদের কাছে ফিরে যাও, তাঁরা তোমাকে কিছু স্বস্তি দেবেন….

কিন্তু তাঁরা যেসব গল্প বলেন, যুক্তিবাদী মানুষের কাছে তার কোনো অর্থ দাঁড়ায় না।

তাঁরা তাঁদের সমস্যার সমাধান করতে চান না। আমি কী করতে পারি?

আমি সেটা বলছি না। প্রশ্নটা খুবই সরল। কোথা থেকে শুরু আর উদ্দেশ্যই বা কী আর…

তোমার কি মনে হয় না এই জানতে চাওয়াটাই আসলে সমস্যা? এই ‘জানতে চাওয়া’টাই তৈরি করেছে আমাদের এই পরিচিতি।

এটা কি দমন করা যায় না?

না। আমি তোমাকে এটা দমন করতে বলছি না। আমি বলছি ‘জানতে চাওয়া’টা হয়তো কোনো সমাধান নয়। আরো আরো জানতে চাওয়াটা শুধু সেই জিনিসটাই শক্তিশালী আর দুর্ভেদ্য করে যে জিনিসটা ব্যক্তিগতভাবে বা সমষ্টিগতভাবে আমাদের সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে নাই। আমি শুধু ওই প্রশ্নটা করছি। ‘জানা’টা কোনো রহস্যময় বা মরমি ব্যাপার নয়। এটা একটা চেয়ার, বা আমি সুখী বা অসুখী─এটা শুধু এইগুলি জানার উপায়। দেখ, দুনিয়ার বাস্তবতাটা যেভাবে আমাদের ওপর চাপানো সেটা আমাদের মেনে নিতে হবে। যদিও প্রশ্নসাপেক্ষ, তবুও এই বাস্তবতা মূল্যমানের দিক দিয়ে প্রায়োগিক। এইভাবেই শুধু আমরা সুস্থভাবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ক্রিয়া করতে পারি।

মূর্ত বস্তু জানার ব্যাপারটা আলাদা। কিন্তু আমার ভাবনাটা অনেকটা আদি শঙ্করের প্রশ্নের মতো। নিজেকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, খুব স্পষ্ট ভাষায়, ‘‘আমি কোত্থেকে এলাম?’’

আমার কাছে ওই প্রশ্নটা অবান্তর কারণ আমরা নিজেদেরকে যে পরিস্থিতিতে দেখতে পাচ্ছি সেটা বুঝতে ওই প্রশ্ন কোনো সহায়তা করে না, যেহেতু চিন্তার সক্রিয়তা শুধু কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক গড়তেই আগ্রহী।

তুমি ওই প্রশ্নটা নাকচ করে দিচ্ছো?

নাকচ করে দিচ্ছি যেহেতু প্রশ্নটার ভিত্তি হলো ‘সবকিছুরই একটা কারণ রয়েছে’ এই অনুমান। আমার কাছে প্রত্যেকটি ঘটনাই একেকটি স্বাধীন একক। আমার এক বন্ধু মি. মহেশ ভাট, একজন সিনেমা পরিচালক, তাঁর বন্ধু ইউ জী কৃষ্ণমূর্তির জীবনী লেখার জন্যে পেঙ্গুইন বুকসের সাথে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। আমি তাঁকে বললাম, বলার মতো কোনো কাহিনি নেই। আমি বলি যে, যা-কিছুই আমার ঘটেছে তা কারণরহিত। যা-কিছু ঘটেছে, সেটা আমার কৃত যাবতীয় কর্ম সত্ত্বেও ঘটেছে। এর [ইউ জী’র ‘দুর্দৈব’] আগের সমস্ত ঘটনার সাথে এটা সম্পর্কহীন। সমস্তটাই আমরা সংযুক্ত করতে চাই এবং সেসব থেকে একটা কাহিনি বা একটা দার্শনিক পরিকাঠামো সৃষ্টি করি, তারপর বলি যে একজন মানুষের জীবনের কোনো ঘটনাই আপতিক নয় বরং কোনো অদৃষ্টই হয়তো ঘটনার রূপায়ণ করছে, একজন মানুষের জীবনের রূপায়ণ করছে। আমার মনে হয় না আমরা ওইভাবে ক্রিয়াশীল। আমাদের নিজেদের উৎপত্তির কারণ বা জগতের উৎপত্তির কারণ, যেটাই জানতে চাই না কেন, এই জানতে চাওয়াটাই হলো নিরর্থক একটা চাওয়া, এর উত্তর যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, বেঁচে থাকার সমস্যা বিহিতে এর কোনো গুরুত্ব নেই।

মৃত্যুর ক্ষেত্রেও ওই একই প্রশ্ন আসে: মৃত্যুর পর কী ঘটে? মৃত্যুর অর্থ কী?

কেবল সত্তর বা আশি বছরই আমরা বাঁচতে পারি, এই কঠিন সত্যটা আমরা মানতে চাই না। ওই সময়কালের ভেতরে যা-কিছু আমরা অর্জন করি মৃত্যুতে সেটা শেষ হয়ে যায়। ওইটাই যে শেষ অবস্থা, সেটা মানতে না চেয়ে আমরা পরকালের কথা ভাবি, এবং সবরকম উদ্ভট কল্পনার জন্ম দিই। ওই প্রশ্নটার ক্ষেত্রে আমার উত্তর হলো, এখন সেখানে কী আছে বলে তোমার মনে হয় যা এই দেহের মৃত্যুর পরও চলতে থাকবে? দেহের কথা বললে সেখানে জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। আমরা যাকে মৃত্যু বলি সেটা পরমাণুর একটা পুনর্বিন্যাস ছাড়া আর কিছু নয়, এবং পরমাণুর পুনর্বিন্যাস ঘটে যেহেতু এই বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকতে হয়। এই কারণেই, এই শক্তির ভারসাম্য রক্ষার্থেই, মহাবিপর্যয়ে ওই লক্ষ লক্ষ মানুষ বিলীন হয়ে যায়। প্রকৃতির কাছে এটা কোনো বিপর্যয় নয়। অন্য যেকোনো গ্রহিক ক্রিয়াকাণ্ডের মতো ভূমিকম্পও সমান আবশ্যক। (যারা তাদের আপনজন বা নিকটজন বা সহায়সম্পত্তি হারিয়েছেন তাদের জন্যে এটা অবশ্যই কোনো সান্ত্বনা নয়। ভূমিকম্পে মানবজাতির একটা বিরাট অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।) সুতরাং ওইসব প্রশ্নের উত্তর বের করার চেষ্টাটা দ্বান্দ্বিক চিন্তাভাবনা ছাড়া আর কিছু নয়। মানবজাতি যে সমস্যার মুখোমুখি তার সমাধানে এসব কোনো কাজে লাগবে না।

……………….

ওইসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা অর্থহীন যেহেতু এর কোনো শেষ নেই। কোনো শুরু নেই এবং কোনো শেষ নেই। প্রকৃতিতে এইভাবে ঘটনা ঘটে না। যা-কিছু জন্ম নেয় সেটা ধ্বংস হয়ে যায়। জন্ম এবং মৃত্যু একটা যুগপৎ পদ্ধতি। চিন্তার ধারাবাহিকতা বা যাকে আমরা পরিচিতি বলি, সেটা রক্ষার্থে, একই জিনিসের বারবার অভিজ্ঞতা নেওয়ার চাহিদাটা যখন আর থাকছে না, বারবার যে প্রশ্নগুলি আমরা করেই চলেছি সেগুলিও শেষ হয়ে যাচ্ছে। চিন্তা যেভাবে জন্ম নেয় এবং আবার শক্তিরূপে বিলীন হয়ে যায়─সেটাই জীবনের ধরন। প্রাকৃতিক বিধিগুলিতে আমার বিশেষ কোনো প্রজ্ঞা রয়েছে এমন নয়, কিন্তু প্রাকৃতিক বিধি আমরা যা-ই আবিষ্কার করি সেটাই ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। যে সামান্য উপকারটুকু পাওয়া যায় সেটা পায় এই গ্রহের খুবই নগন্যসংখ্যক লোকজন। সাধারণ মানুষের স্তর পর্যন্ত সেটা পৌঁছায় না। কেন আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আমরা এত অভিভূত? আমরা তাঁদেরকে নোবেল পুরস্কার দিতে পারি। আমরা তাঁদেরকে মর্যাদাপূর্ণ খেতাব দিতে পারি। কিন্তু কীভাবে এটা [এই গবেষণা] সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করবে? যখনই কেউ এসে আমার দরোজায় নক করে, আমি বলি, ‘‘তোমার প্রধানমন্ত্রির কাছে যাও। তিনি সেখানেই আছেন। তুমিই তাঁকে নির্বাচিত করেছো। তোমার অন্ন-বস্ত্র-আশ্রয়ের জন্যেই তুমি তাঁকে সেখানে বসিয়েছো।’’ তুমি যদি কোনো ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও, সেটাই সবচেয়ে অশ্লীল কাজ। তোমার আত্মসিদ্ধির জন্যেই তুমি ওইজাতীয় কাজ করছো। তুমি আছো একটা মানবদরদির ঘোরে, তুমি মানছো না যে তুমি একটা আত্মকেন্দ্রিক মানুষ।

সমস্যার বিহিতে আমরা কিছুই করছি না। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারো, ‘‘তুমি কী করছো?’’ সেটা একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন। আমি দেখ এখানে এই দেশের কাজ করার জন্যে নেই। স্বাদেশিকতা, স্বদেশপ্রেম, বা ওইজাতীয় কোনো জিনিস─স্কুলে যা আমাদের শিক্ষকেরা শেখান─ওইসব দিয়ে আমি কোনোভাবে প্রভাবিত নই। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষক বলো আর আধ্যাত্মিক শিক্ষক বলো তাঁদের কারো কাছ থেকেই আমি কখনো কিছু শিখি নাই। যদিও আমি থেকেছি শ্রেষ্ঠ চিন্তাশীল লোকজনদের সাথে, অক্সফোর্ড আর কেমব্রিজ-ফেরতদের সাথে, কিন্তু তাদের সঙ্গে থেকে আমার কোনো লাভ হয় নাই।

একটা বিশেষ কাঠামোর মধ্যে ঈশ্বর আর পরজন্মে বিশ্বাসী একজন মানুষ হিসেবে, এবং একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি দুনিয়ার অন্যায়-অবিচার বিষয়ে জানতে চাই।

কারো উত্তরই সন্তোষজনক নয়। উত্তরগুলো কোনোভাবেই দুঃখ-দারিদ্রের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না। স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পরও তুমি এখানকার [ভারতের] পরিস্থিতির জন্যে বৃটিশদের দায়ী করে যেতে পারো না। তোমার ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির গুণকীর্তন কোরো না। একটা বিষ্ফোরণেই সমস্ত ব্যাপারটা উড়ে যাওয়া উচিৎ। সমস্ত ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার শক্তিও তাদের নেই। সবরকম ধাপ্পা আর আবোলতাবোল তোমাকে গেলানো হয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তুমি পরজন্ম-বিশ্বাসের প্রভাবে থেকেছো। তুমি বিশ্বাস করো পূর্বজন্মে ভয়ানক কিছু করেছিলে বলেই এই জন্মে তুমি তোমার দুঃখকষ্ট, বঞ্চনা আর দারিদ্র ভোগ করছো। এবং পরের জন্মে আরো ভালো থাকবে বলে আশায় আশায় আছো। তাহলে আর এ নিয়ে দুঃখ করার কী আছে? শত শত বৎসর ধরে এইসমস্ত জিনিস বিশ্বাস করাতে জনগণের মগজ ধোলাই করা হয়েছে। তা ছাড়া, ওইসমস্ত অবতারদের বক্তব্যের সত্যতা বা যৌক্তিকতা যাচাই করারও কোনো উপায় তোমার নেই। কেউ একজন বলবেন গতজন্মে তিনি শির্দি সাঁইবাবা ছিলেন, এই জন্মে তিনি সত্যবাবা, পরের জন্মে তিনিই আবার ঈশ্বরই জানেন কী যেন একটা হতে যাচ্ছেন! আমাদের এইসব দাবি যাচাই করার কোনো উপায় নেই। সেইটা যাচাই করতে তুমি সেখানে যাচ্ছো না। যারা পরজন্ম নিয়ে প্রশ্ন করে, আমি তাদেরকে বলি, যারা এতে বিশ্বাস করে তাদের জন্যে পরজন্ম আছে, এবং যারা বিশ্বাস করে না তাদের জন্যে কোনো পরজন্ম নেই। কিন্তু তুমি যদি বলো, ‘‘অভিকর্ষ বিধির মতো প্রকৃতিতে কি পরজন্ম বলে কিছু আছে?’’ আমার উত্তর হলো, ‘‘না।’’ কিছু কিছু লোকের এইটা বিশ্বাস করার একটা তাড়না রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই। [পরজন্মে] বিশ্বাসটা হয়তো তাদের জন্যে একটা সান্ত্বনা বা স্বস্তি।

কিন্তু সার্বিকভাবে দেখতে গেলে জগতে অবিচার আছে। একটা শিশু যখন অঙ্গহীন হয়ে জন্মায়…

পূর্বজন্মে তুমি কিছু একটা করেছিলে বলেই এমনটা ঘটেছে এই ব্যাখ্যাটা একটা স্বস্তিদায়ক চিন্তা। এটা একটা মাদক, পরিস্থিতি মোকাবিলায় যা তোমার কাজে লাগে।

তারপরও এরকম সমস্যার উত্তর পাবো কীভাবে?

আমরা জানি না। আমাদের সন্তোষজনক কোনো উত্তর নেই। নিজেকে আধ্যাত্মিক বলে দাবি করেন এরকম কেউ যদি তাঁর কাছে উত্তর আছে বলে ভান করেন, সেটা আমাদের স্বস্তি দেয়।

ঠিক আছে, আমি সেটা ছাইভস্ম বলে বাতিল করে দিচ্ছি।

আমিও তাই করি। কিন্তু এরকম জিনিস যে বিশ্বাস করে তার কী হবে? তার জন্যে এটা একটা স্বস্তি। কিছুক্ষণের জন্যে সবকিছু ভুলে থাকতে তুমি তো একটা মাদকও নিতে পারো।

ধর্মকে তাহলে জনগণের আফিম ঠিকই বলা হয়।

হ্যাঁ, তাই। কিন্তু ওই আফিমে উপশমও আছে। দেহের ওপর আমরা যতরকম ধ্যানের পদ্ধতি চাপাই দেহ তা সহ্য করতে পারে না। এটা [ধ্যান] এই প্রাণীটার রসায়নে একটা ভারসাম্যহীনতা ঘটায়। এই সবকিছুই সেখানে [আমাদের ভেতরে] সাংস্কৃতিক ইনপুট, যা সমগ্র পদ্ধতিটার সংবেদনশীলতা ধ্বংস করে দিচ্ছে। তোমার ওই শ্বাসনিয়ন্ত্রণ আর যোগের মতো কর্মকাণ্ড সংবেদজ প্রত্যক্ষণের সংবেদনশীলতা ভোঁতা করে দেয়। এই সবকিছুই আসলে প্রাণীটির একটা প্রতিপক্ষ।

আমি যেমনটি বলছিলাম, বিবর্তন প্রক্রিয়ার (বিবর্তনেও আমি সন্দেহ করি; জানি না আদৌ বিবর্তন বলে কিছু আছে কিনা) কোনো-একখানে ঘটেছে যে আত্মচৈতন্যবোধ সেটাই মানবজাতিকে প্রকৃতি-সমগ্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এই গ্রহের অন্য সমস্ত প্রজাতির তুলনায় মনুষ্যপ্রজাতি মহত্তর উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছে─এই বোধের জন্যে সেটাই [আত্মচৈতন্যবোধ] দায়ী। এত্থেকে এইরকম অনুভূতি হয় যে সমগ্র সৃষ্টি মানুষের কল্যাণার্থেই সৃষ্ট। এইভাবেই আমরা এইসমস্ত পরিবেশগত সমস্যা আর অন্য সমস্ত রকমের সমস্যা সৃষ্টি করেছি। প্রকৃতির সবকিছু থেকে আমাদের সুবিধা নেওয়ার প্রচেষ্টাটাই হলো সমস্যার উৎস। আর ওই সময়টাতেই আমরা যাকে বলি ‘পরিচিতি’, সেইটা জন্ম নিয়েছে। যে কারণেই হোক আমরা বোধহয় ওই পরিচিতিটা ধরে রাখতে বাধ্য।

এই সমস্তকিছুর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ভূমিকাটা কী?

মস্তিষ্ক কোনো স্রষ্টা নয়। এই বক্তব্য হয়তো বহু মানুষ মেনে নেবে না, তবে এটাই আমার আবিষ্কার। চিন্তা আসে বাইরে থেকে। আদৌ কোনো ব্যক্তিমানুষ নেই। সংস্কৃতি, সমাজ, বা যা-ই নাম দাও, সেটাই তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একমাত্র উদ্দেশ্যে আমাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছে। সাথে সাথে সেটা এই ধারণাও সৃষ্টি করেছে যে, তুমি যা, তোমাকে অবশ্যই তার থেকে ভিন্ন-কিছু হতে হবে। সেজন্যেই তুমি নিজেকে আরো ভালো করতে চাইছো, উন্নত করতে চাইছো। তুমি যা, তুমি তার থেকে অন্যকিছু হতে চাও। সেটাই এই বাতিকগ্রস্ত অবস্থাটা সৃষ্টি করেছে।

মনুষ্যপ্রজাতিতে বাতিক পুরোপুরি অপরিহার্য। এই সমাজে ক্রিয়াশীল থাকতে এই বাতিক আমাদের রক্ষা করতেই হবে। আশায় আশায় থাকা আর আশায় আশায় মরা ছাড়া আমাদের এই সমাজে কাজকর্ম করার কোনো উপায় নেই। কিছু লোক আছে যারা হাল ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু আমরা তাদেরকে আমাদের সৃষ্টি এই নৈতিক মূল্যবোধে প্রায়োগিক হতে বাধ্য করি। এমনকি পাছে তারা ম্যানিক-ডিপ্রেসিভ হয়ে যায় সেই ভয়ে আমরা তাদেরকে আত্মহননের পথেও ঠেলে দিই। সামগ্রিকভাবে এইসব লোকেদের আমরা এমন একটা পরিস্থিতিতে নিয়ে যাবার জন্যে দায়ী যেখানে তারা নিজেদেরকে শেষ করে দিতে বাধ্য হয়। তারা এখানে প্রায়োগিক হতে চায় না। তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে। সে কারণেই আমি বলি যে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হলেন এই সমাজে প্রতিপক্ষ। কারণ হাল ছেড়ে দেওয়া যাবতীয় লোকেদের তাঁরা এই নৈতিক মূল্যবোধে খাপ খাওয়াতে বাধ্য করে যাচ্ছেন। মনুষ্যসভ্যতা আমাদের জন্যে যে মারাত্মক জিনিসটা করেছে তা হলো সেটা আমাদের সামনে একটা আদর্শ মানুষের ধারণা দাঁড় করিয়েছে। মহান আধ্যাত্মিক গুরুদের আদলে সৃষ্টি হয়েছে এই আদর্শ মানুষ।

২.
তুমি যাকে নৈতিক মূল্যবোধ বলছো সেটা কি আরেকটু বিস্তারিত বলা যায়?

আমাদের সামনের এই আদর্শে নিজেদের খাপ খাওয়ানোর চাহিদা থেকেই সমগ্র নৈতিক মূল্যবোধের সৃষ্টি। আমরা নিজেদেরকে আদর্শ মানুষ করে তুলতে চাই। আমাদের ভেতরের নিরন্তর এই যুদ্ধ নৈতিক মূল্যবোধেরই সৃষ্টি। আমরা কখনো সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলি না। নৈতিক মূল্যবোধ মিথ্যা এবং এটা আমাদের মেকি বানাচ্ছে। প্রকৃতির প্রচেষ্টা অসাধারণ কিছু সৃষ্টি করা, নিখুঁত প্রজাতি সৃষ্টি করা। সেই কারণেই প্রত্যেকটি ব্যক্তি অনন্য। এই সাংস্কৃতিক ইনপুটের কারণেই এই প্রাণীটির অনন্যতা প্রদর্শন অসম্ভব হয়ে গেছে। প্রকৃতি যা করতে পারতো সেই সম্ভাবনা আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। শুধু মানুষ নয়, এই গ্রহের সমস্ত প্রজাতিসহ প্রকৃতিসৃষ্ট এই স্বর্গ তুমি কেবল ব্যবহারই করে যাচ্ছো। যে নৈরাজ্য মানবজাতি সৃষ্টি করেছে তার জন্যে সম্পূর্ণভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে আমরাই দায়ী, এবং এর থেকে [এই নৈরাজ্য থেকে] বোধহয় বেরোবার কোনো উপায় নেই। যখনই কোনো তথাকথিত পরিত্রাতা এসে হাজির হন, বলেন যে, তিনি একজন অবতার এবং তিনিই আমাদের সকল সমস্যার উত্তর। এই যে তাঁর দাবি যে─তিনিই হলেন সমাধান, এই জিনিসটাই বিদ্যমান নৈরাজ্যের ভরবেগ বাড়িয়ে দেয়। আগে কখনো যে প্রশ্নটা করা হয় নাই, থেমে গিয়ে সেই প্রশ্ন করাটা আমাদের পক্ষে অসম্ভব করে দিচ্ছে ওইটাই। এই প্রশ্নগুলিই আমাদের করা দরকার, কারণ এতকাল আমরা যে প্রশ্ন করে এসেছি, ইতিমধ্যেই-থাকা উত্তর থেকেই সে-সমস্ত প্রশ্নের জন্ম। কিন্তু যারা বলছেন আমাদের ‘ফিরে যাওয়া’ উচিৎ তাঁদের কারো কাছেই আদৌ আমাদের সমস্যার কোনো সমাধান নেই। এবং এই পরিস্থিতিটাই আমাদের পক্ষে নতুন কিছু সৃষ্টি করা অসম্ভব করে দিচ্ছে। এইভাবে আমরা আমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারবো না। এই ‘‘ফিরে চলো’’ আর ‘‘পুনর্জাগরিত করো’’ চিৎকার হলো একটা নিরর্থ শ্লোগান।

ভারতের মহান ঐতিহ্য আর যাই হোক, রাজনীতিকদের ব্যবহারের জন্যে আর লোকেদের অন্তরে আশা জাগিয়ে তোলার জন্যে ভালোই। কিন্তু আমরা সবাই ওই মহান ঐতিহ্যেরই ফলাফল, এবং আজ এই দেশের মানুষকে নিয়ে গর্বিত হওয়ার কিছু নেই। শত শত বছর ধরে আমরা জীবনের অখণ্ডতা আর ঐক্য নিয়ে কথা বলে যাচ্ছি। তাহলে কেন সেখানে এই দারিদ্র? কেন সেখানে এই দুর্ভোগ? সকলের সন্তোষে এই সমস্যা সমাধানে কেন আমরা কিছুই করি নাই? বেয়াল্লিশ বছর স্বাধীনতার পরও কেন আজও আমরা সমস্যার জন্যে বৃটিশদের দায়ী করে যাচ্ছি? আমি শুধু প্রশ্ন করতে পারি। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করতেই পারো, ‘‘তুমি কেন কিছু করছো না?’’ কিন্তু আমি এই দেশের জন্যে কাজ করছি না এবং কীভাবে এটা চালাতে হবে সেটা এই দেশের নেতাদেরকে আমার বলার দরকার নেই। আজ আমরা এমন একটা পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে আমাদেরকে কেবল রাজনৈতিক সচেতনতা মোকাবিলা করতে হবে। ধর্ম মৃত, কিন্তু ধর্মবাদীরা এখনো পেছনের সারিতে বসতে প্রস্তুত নয়, যে প্রচুর নষ্টামী তারা এই দেশে করেছে সেটা তারা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয় এবং সবকিছু যে এখন আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিৎ সেটা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। আমি বলি যে সমাজতন্ত্রসহ আমাদের আজকের সকল রাজনৈতিক ব্যবস্থা, মানুষের ধর্মভাবনারই টিউমারের মতো উপবৃদ্ধি ছাড়া আর কিছু নয়।

খুবই অদ্ভুত ব্যাপার হলো লোকজন আমার কাছে জানতে চায়, ‘‘গর্বাচেভকে নিয়ে কী ভাবছো?’’ [রাশানদের] আমি যা বলতে চাই, তোমাদের পদ্ধতি ব্যর্থ, কিন্তু তোমাকে ওই কাঠামোর মধ্যেই সমাধান খুঁজতে হবে এবং পশ্চিমে তোমার সমস্যার সমাধান খুঁজো না। পশ্চিম আজ এক দুঃখজনক বিভ্রান্তিতে। তাঁদের নিজেদের সমস্যার সমাধানই তাঁদের হাতে নেই। যত বিজ্ঞানী আর মনোবিদ আমার সাথে দেখা করতে আসেন, তাঁদের সবাইকেই আমি বলি যে তাঁরা তাঁদের শক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। মীমাংসা খুঁজতে চাইলে তাঁদের বেদান্তে বা জেন বুদ্ধবাদে তাকানো উচিৎ নয়। ওইসমস্ত মার্গে তাঁদের সমস্যার কোনো সমাধান নেই। বিজ্ঞানী আর মনোবিদদের তাঁদের নিজস্ব কাঠামোর মধ্যেই কোনো সমাধান আছে কিনা খুঁজে দেখতে হবে। শুধুমাত্র তখনই তাঁরা মানবজাতিকে ভিন্নভাবে দুনিয়াটা দেখতে সাহায্য করতে পারবেন। কিন্তু তোমার ফিরে যাবার বা কোনো কিছু পুনর্জাগরিত করার উপায় নেই।

আমাদের কী করা উচিৎ?

মনে হয় না আমাদের সমস্যার কোনো সমাধান আছে। সম্মিলিত সমাধানের কথা যদি বলো, আমাদের তেমন কিছু করার নেই। আর এককভাবে কিছুই করার নেই। কিছুই না। আমরা কী করতে পারি? অন্তত সেই প্রশ্নগুলো করতে পারি, কখনোই যে প্রশ্নগুলো করা হয় নাই, কারণ এতকাল যে প্রশ্নগুলো আমরা করেছি, ইতিমধ্যেই-থাকা উত্তরগুলো থেকেই সেসবের জন্ম। কিন্তু তাতে আমাদের কোনো কাজ হয় নাই।

……………………

তোমার চেহারায় একটা লাবণ্য, একটা দ্যুতি আছে।

আমার অর্ধেক নারী। এটা একটা অস্বাভাবিক জিনিস। এটা দেহের একটা অস্বাভাবিক অবস্থা যাকে তুমি রহস্যময় কিছু বানিয়ে রহস্যমণ্ডিত করছো এবং তারপর বলছো এটা একটা বোধিপ্রাপ্ত সত্তা। একবার যখন এইজাতীয় কোনো ব্যাপার ঘটে, সমস্ত হরমোনজনিত ভারসাম্যটা পাল্টে যায়। সুতরাং কে স্বাভাবিক আর কে অস্বাভাবিক? তোমার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা [নিজেকে নির্দেশ করে] একটা অস্বাভাবিক ব্যক্তি। কিন্তু তোমাকে আমি কোনো অস্বাভাবিক ব্যক্তি বলছি না।

একবার এক সাধু আমার সাথে দেখা করতে এলেন। চল্লিশের কোঠায় বয়স। মানুষের অধ্যাত্ম ভবিষ্যতের জন্যে ব্রহ্মচর্য খুবই জরুরী বলে তিনি দাবি করছিলেন। আমি বললাম, ‘‘এটা হলো প্রকৃতির বিরুদ্ধে একটা অপরাধ। তোমার ব্রহ্মচর্য প্রকৃতির অভিপ্রেত নয়।’’ তিনি উঠে চলে গেলেন। তো এই অস্বাভাবিক অবস্থাটা কীভাবে সমস্ত অধ্যাত্মকামীদের আদর্শ হতে পারে? এবং কেন তাদেরকে অত্যাচার করেই যাচ্ছো? কেন ব্রহ্মচর্যকে এই দেশে এবং পশ্চিমেও, বোধির ভিত্তি বানানো হয়েছে? ওইটার [ব্রহ্মচর্যের] বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা প্রতিক্রিয়া হিসেবে, যাকে বলে তান্ত্রিক পদ্ধতি, এই দেশে আবির্ভূত হয়েছে। যখন এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, তখন তারা এই মরমি জিনিস, ‘‘বাম’’ এবং ‘‘ডান’’ তন্ত্র উদ্ভাবন করেছে। সেজন্যেই কিছু ভাঁড় আজ বলছে যে আধ্যাত্মিক স্বর্গসুখ, বোধি, সমস্তকিছু অর্জনের একমাত্র উপায় হলো তান্ত্রিক যৌনতা।

‘তোমার অর্ধেক নারী’, এই কথা বলে তুমি কী বুঝাতে চাও?

সেটা বলেছি কারণ আমার যা-ই ঘটে থাকুক সেটা আমার সমগ্র হরমোনজনিত ভারসাম্যটা পাল্টে দিয়েছে। এই ব্যক্তির পক্ষে [ইউ জী’র পক্ষে] আর শারীরিকভাবে যৌনক্রিয়া করাটা ঠিক সম্ভব নয়। দেহের সমস্ত রসায়নটা অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে। আমি এটাকে অস্বাভাবিক বলি যেহেতু এটা সম্ভবত প্রকৃতির অভিপ্রেত নয়। দুইটা জিনিসে এই প্রাণীটির আগ্রহ─টিকে থাকা আর নিজের অনুরূপ বংশবিস্তার করা। এমনকি প্রকৃতিও এই দেহটাকে বাতিল করে দিয়েছে কারণ সেটা আর তার দরকার নেই। অথচ তুমি সেটাকে একটা আধ্যাত্মিক কিছু বানিয়ে নিয়েছো। সেজন্যেই তারা বলে যে ব্রহ্মচর্য মানুষের অধ্যাত্মলাভের জন্যে খুবই জরুরী। আমি যা বলতে চাইছি─তারা যাকে বোধি বলে তার সাথে ব্রহ্মচর্য বা যথেচ্ছ যৌনাচার, কোনটারই সম্পর্ক নেই।

তুমি কি মনে করো যৌনতা করতে চিন্তার দরকার?

অবশ্যই; তা নাহলে এটা হবে কীভাবে? চিন্তা ছাড়া যৌনতার ‘‘প্রবর্ধন’’ই সম্ভব নয়। অবিরাম চিন্তনই কোনো সমন্বয়কের ভ্রান্তি দিচ্ছে। কিন্তু এখানে [নিজেকে নির্দেশ করে] এমন কেউ নেই যে এই সংবেদজ কর্মকাণ্ড সমন্বয় করছে। এত দ্রুত সংবেদন ঘটছে যে, স্মৃতির পক্ষে সেটা তার কাঠামোতে ধারণ করে এই কথা বলার কোনো উপায় নেই যে, ‘‘এইটা এই।’’ তুমি কোনো সুন্দরী নারীর দিকে তাকালে এবং পরমুহূর্তেই সে যখন তার মুখখানা খুললো, তার দাঁতগুলো হয়তো এতো কুৎসিত যে তুমি কোনোদিন সেরকমটি দেখোনি বা যা তোমার কল্পনাতেও নেই। তুমি তার সুন্দর মুখ থেকে তার কুৎসিত দাঁতের দিকে তাকালে, তারপর অন্য কোথাও অন্য কিছু ঘটছে, সেখানে তাকালে।

একটা জিনিস আমি বলবো: কোনো কিছুতে আকর্ষিত হওয়াটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। আকর্ষিত না হলে তুমি একটা পাথর। সংবেদনসহ দেহ কোনো পাথর নয়। চারপাশে যা ঘটছে সেটাতে তার সাড়া দিতে হবে। যা এই দেহকে স্পর্শ করছে সেটা তোমার ধর্মনিষ্ঠা বা নীরবতা নয়, বরঞ্চ তোমার রাগ, কামনা বা আর যা যা সেখানে ঘটছে। আমি এইসব সাড়ার কথাই বলছি। আমি অনুবাদ করি না। এখানে যা ঘটছে, সেটা যৌনতাড়না না অনুরাগ না ক্রোধ না লালসা, আমি সেটাও জানি না। এখানকার কোনো কিছুই এটা-ওটা হিসেবে চিন্তার দ্বারা অনূদিত নয়। এখানে কোনো কাল নেই। সেইজন্যে আমি সবসময় চলচ্চিত্রের একটা উদাহরণ দিই। তুমি যদি এখান থেকে ওখানে চলমান একটা হাতের চলচ্চিত্র ধারণ করো, সেখানে অনেকগুলি ফ্রেম। পর্দায় তুমি যা দেখ সেটা একটা কৃত্রিম জিনিস। পর্দায় ওই ক্রিয়া বা গতি সৃষ্টি করতে তোমার একটা প্রজেক্টর দরকার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা ওই হাতের এখান থেকে ওখানে চলমানতা নয়। হাতের চলাচলের একটা সমন্বিত প্রভাব তৈরি করতে তোমাকে হাতের পৃথক পৃথক নড়াচড়াগুলি সমন্বয় করতে হবে। এইভাবেই মনুষ্যপ্রাণীটি ক্রিয়াশীল। যখন তুমি টেপে ধারণকৃত কোনো সংগীত শুনছো, দুইটা স্বরের মাঝখানের দূরত্বটা তুমি শুনতে পাচ্ছো না। কিন্তু ইন্দ্রিয়গুলি দূরত্বটা রেকর্ড করছে এবং শুনে যাচ্ছে। এমনকি তুমি যখন কোনো একটা ভাষা বলছো তখনও ব্যাপারটা তাই। ভাষা আসলে কী? দুটো স্বর বা সুরের মাঝখানের দূরত্ব বৈ ভাষা আর কিছুই নয়। ভাষাটা শিখলে তুমি তখন জানো কীভাবে কনকানি, ফ্রেন্স বা জার্মান বলতে হয়। সেসব শুধুই কোলাহল।

তোমার জন্ম কোথায়?

অন্ধ্র প্রদেশে বিজয়ওয়াড়ার কাছে…

তোমার পরিবার কি খুব রক্ষণশীল ছিলো?

আমার দাদু আর আমার পরিবারের অন্যান্যরা থিয়োসফিক্যাল সোসাইটির খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অন্ধ্র থেকে বেশি সময় আমি মাদ্রাজেই থেকেছি। তেলুগুর থেকে তামিল আমি ভালো বলতে পারি। তামিল আমি লিখতে পড়তে পারি না, তবে মাতৃভাষার চাইতে তামিলই আমার সহজে আসে। আমার বেড়ে ওঠার সমস্ত সময়টাই আমি মাদ্রাজ থিয়োসফিক্যাল সোসাইটির সঙ্গে কাটিয়েছি।

কেমন সঙ্গীত তোমার পছন্দ?

সেটা বলা খুব কঠিন। ‘আমি এই সঙ্গীত পছন্দ করি’, ‘আমি ওই সঙ্গীত পছন্দ করি না’ ─এইভাবে আমি বলতে পারি না। কি জানি! আমি যা-ই বলবো, তুমি তার থেকে একটা তত্ত্ব দাঁড় করাতে চাইবে এবং তার ওপর কিছু একটা চাপাতে চাইবে। আমার হয়তো নিজস্ব পছন্দ আছে, কিন্তু ওই সমস্ত পছন্দই আমার বেড়ে ওঠার সাথে সাথে নির্ধারিত হয়ে গেছে। তোমার অভ্যস্ততা থেকে তোমার মুক্ত হবার কোনো উপায় নেই। ‘অভ্যস্ততামুক্ত মনের’ কথা বলাটা চরম মূর্খতা। তবে আমার অভ্যস্ততা আমার ক্রিয়াকর্মে সমস্যা করে না। যেমন আমি হয়তো কোনো লোকের কর্মকাণ্ড দেখে বললাম, ‘নোংরা’, বা সে একটা নোংরা লোক। এটা কোনো নীতিগত বিচার নয়। এটা বরং তোমার কাঠামোর মধ্যে তার কর্মকাণ্ডের একটা বর্ণনামূলক ফিরিস্তি। কিন্তু এইটা আমাকে কোনোভাবে প্রভাবিত করছে না বা পাল্টে দিচ্ছে না যাতে করে পরবর্তীতে তার প্রতি কোনো প্রতিক্রিয়া হবে। সে যা করছে তাতে আমি লিপ্ত নই। পরমুহূর্তে যখন সেখানে অন্য কোনো লোক, আমি হয়তো বলছি এই লোকটা চমৎকার। কিন্তু সেটা ওই একই ব্যাপার। নোংরা লোক বা চমৎকার লোক বলে আমি আসলে কিছুই বুঝাচ্ছি না। কোনোভাবেই আমি তার কর্মকাণ্ডে লিপ্ত নই।

কেমন নারী তোমার পছন্দ, স্যার?

জানি না, এই হলো উত্তর।

নারীদেরকে তুমি পছন্দই করো না?

তাদেরকে আর আমার প্রয়োজন নেই।

কেন?

একটু আগেই যা বলছিলাম, তাদের সঙ্গ আমি পছন্দ করি। এটা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন।

সেটা অস্বাভাবিক নয়?

সেটাই বলছিলাম। কোনো নারীর হাত ধরি বা কোনো চেয়ারের হাতল ধরি, শারীরিক সাড়াটা অবিকল একই। হুবহু একই। সাড়াটা বলছে না যে এইটা কোনো কোমল প্রিয়ার হাত বা এটা কোনো টিক-হাতলের চেয়ার। প্লিজ আমাকে ভুল বুঝো না। এমন নয় যে এইসমস্ত জিনিস আমি কোনো বিশেষ পদ্ধতিতে বর্ণনা করছি বা সবকিছু একই স্তরে ফেলছি। আমি কী বলতে চাচ্ছি সেটা তোমাকে বুঝতে হবে।

কিন্তু তুমিই বলছো দেহকে কোনো না কোনোভাবে সবকিছুতে সাড়া দিতেই হবে।

সেখানে যা চলছে, বা তুমি যে প্রতিক্রিয়ার কথা বলছো, সেটা এমন একটা কিছু যা আমার পক্ষে কোনোভাবে প্রেরণ করার বা অনুভব করার উপায় নেই। তোমাকে বলতে পারি যে আমি যৌনতা করেছি। কখনো কখনো আমার সেই স্মৃতি মনে পড়ে। যখনই আমার সেই স্মৃতি মনে পড়ে সেটা অন্য যেকোনো স্মৃতির মতই। সেটা এখানে শেকড় গাড়তে পারে না কারণ সবকিছুই এখানে [নিজের মাথা নির্দেশ করে] আঁটসাঁট থাকায় সেটার [স্মৃতিটার] পক্ষে দীর্ঘসময় ধরে চলাটা অসম্ভব হয়ে যায়। পরমুহূর্তে আমি যখন কালো কুকুরটা দেখতে থাকবো, আগের জিনিসটার ফ্রেম আর নেই─পুরো জিনিসটাই আর নেই। আমি হয়তো এখন অপরূপ সুন্দরী দুর্দান্ত কোনো নারীর দিকে তাকিয়ে আছি, পরমুহূর্তে হয়তো সেখানে একটা কালো কুকুর। এগুলো সবই ভিন্ন ভিন্ন ফ্রেম। সেজন্যেই আমি বলি, ‘‘কে এখানে অস্বাভাবিক? তুমি না আমি? কে কোন্ দিকে পড়ে?’’ আমার কর্মকাণ্ড অস্বাভাবিক মানুষের কর্মকাণ্ড নয়। আমি নারীবিদ্বেষী নই। নারীদের আমি ঘৃণা করি না। তাঁদেরকে আমি পছন্দ করি। সবসময়ই আমার সঙ্গে নারীরা থেকেছেন। কিন্তু আমার চারপাশের সবকিছুর সাথে আমার সম্পর্ক আমার অস্তিত্বের প্রত্যেকটি মুহূর্তে গড়ে উঠছে আর ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। আমি চাই না তুমি আমাকে কোনো বিশেষ খাঁচায় রাখো; আদৌ তুমি সফল হবে না।

তুমি কি বিবাহিত?

বিবাহিত ছিলাম; আমার চারটি সন্তান ছিলো। আমার স্ত্রী ছিলেন তখনকার সুন্দরীতমাদের একজন। তিনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরও সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে ছিলেন। আমার কন্যারা এখনো সেখানে [ভারতে]। তারা সবাই বড় হয়ে গেছে। কেউ কেউ বলে যে আমাকে আমার কন্যার থেকে বয়স্ক দেখায় না।

এর মানে কী? এর মধ্যে কোনো রহস্য আছে?

মনে হয় না কোনো রহস্য আছে। আমার দেহে আমি কোনো মনোযোগ দিই না। যখন আমার তোমার মতো বয়স ছিলো─খুবই তরুণ, আমি ছিলাম নির্বোধ। ‘আধ্যাত্মিক সাধনা’ বলতে যা যা বুঝায় সবই আমি করেছি। কিন্তু কোথাও আমি পৌঁছাই নাই, এবং সে সবকিছুই আমি বাতিল করে দিয়েছি। আমি কোনো হেলথ ফুড খাই না। বরং আমি বলি যে ওই সবই হলো আবর্জনা।

আমার মেয়েদের জন্যে আমি কিছুই করি নাই। আমার সঙ্গে থাকলে তাদের যে কী হতো কে জানে! তারা আমার আত্মীয়দের কাছে বড় হয়েছে। আমার এক ছেলে আমেরিকায় থাকে। আরেক ছেলে ক্যান্সারে মারা গেছে। সে বোম্বেতে একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করতো। তার পোলিও ছিলো, সে যুক্তরাষ্ট্রেও গিয়েছিলো। যুক্তরাষ্ট্রে আমি ভাগ্য পরীক্ষা করেছি, আমেরিকায় যারা টাকা বানাতে যায় তাদের মতো করে নয়। আমি আবার তাকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে চেয়েছিলাম। হাজার হাজার ডলার আমি ব্যয় করেছি। ভীষণ মেধাবী ছিলো সে।

অত টাকা তুমি পেলে কোথায়?

সোনার চামচ মুখে নিয়ে আমার জন্ম হয়।

তোমাকে কাজ করতে হতো না?

না। বিত্তবান একটা পরিবারে আমার জন্ম। আমি বিপুল টাকা বানাই। সুইজারল্যান্ডের ব্যাঙ্কাররা সেটা আমার জন্যে বানায়। সেইজন্যেই আমি একজন অনাবাসী ভারতীয়, যদিও আমি একটা ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে ঘুরি। আমার সুইস টাকা কোনো গোপন টাকা নয়। পরে এই সুইস মহিলার সাথে আমার দেখা হয়। যখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে তখন তিনি এলেন। অসাধারণ এক মহিলা ছিলেন তিনি। এখন তিনি স্মৃতিভ্রষ্ট আর তাঁর বয়স হলো উননব্বই। [১৯৯১ ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়।] এই হলো মানবজাতির ভবিতব্য, আমি বলছি। এটা হলো আলঝাইমার্স ব্যাধি। যদি তুমি ঠিক না হও, যদি তোমার পরিচিতি তুমি রক্ষা করতেই থাকো, তোমার বিপদ। প্রকৃতি জনতার মন আর পরিচিতি বিধ্বস্ত করে দেবে এবং আমরা সবাই উদ্ভিদ হয়ে যাবো। প্রকৃতি তখন এইসব মনুষ্যদেহ পুনর্বিন্যাস করে নতুন কোনো প্রজাতি সৃষ্টি করবে। মনুষ্যপ্রজাতি বাতিলযোগ্য। তোমার রক্তশোষা মশাটা যে কারণে সৃষ্ট তার থেকে কোনো মহত্তম উদ্দেশ্যে আমরা সৃষ্ট হই নাই।

তুমি কি সন্ন্যাসী?

কেন আমাকে সন্ন্যাসী বলবে কে জানে। আমাকে কি সন্ন্যাসীর মতো দেখায়?

আধুনিক সন্ন্যাসী।

আমি তা নই। আমি কারো জন্যে আদর্শ নই। গতকালই কিছু সাংবাদিক জোরাজুরি করছিলেন, ‘‘তুমি কোনো গুরু বা সাধু হলে নাহয় বুঝতাম, কিন্তু আমরা বুঝতে পারছি না তুমি কী। কোনো খাঁচাতেই আমরা তোমাকে রাখতে পারছি না। এই হলো সমস্যা। আমরা জানি না।’’ … আমি যা-ই হই না কেন কখনোই কোনো নৈতিক মূল্যবোধে আমি খাপ খাই না। এর কোনো উৎস বা ধারাবাহিকতা নেই। দুনিয়াটাকে আরো ভালো একটা জায়গা বানাতে এটা কোনো কাজে লাগে না। যে মুহূর্তে তুমি বুঝতে পারবে আমি ঠিক কী বলতে চাইছি, যে ‘তুমি’ বলে তুমি নিজেকে চেনো, যে ‘তুমি’ বলে তুমি নিজেকে অনুভব করো, সেটার ইতি হয়ে যাবে। অন্যথায়, আমি যা-ই বলি না কেন সেটাকে তুমি একটা হুমকি হিসেবে নেবে, কারণ আমি যা বলছি সেটা শুধু ভারতীয় ভাবনা নয়, মানবভাবনার ভিত্তিটাকেও ধ্বংস করে দেয়। এবং তখন হয়তো তুমি আমাকেও বিনাশ করে দেবে।

তুমি বলতে চাও ভারতীয় ঐতিহ্য শুধু আমাদের আজকালকার রাজনীতিকদের মতো লোকজন তৈরি করেছে?

তারা কোনো ব্যাপারই নয়। যা ঘটছে, তা সে এই ভারত বা আমেরিকা বা যেখানেই হোক, হুবহু একই। খেলোয়াড় আলাদা, কিন্তু খেলাটা একই। অভিনেতা আলাদা কিন্তু নাটকটা একই। এই দেশের চল্লিশ বছর আগেকার কোনো খবরের কাগজ হাতে নিলে, আমার বিশ্বাস তুমি আশ্চর্য হয়ে যাবে যে, যা-কিছু তারা বলেছিল তা-ই আজ আবার এইসমস্ত লোকেদের মাধ্যমে পুনরাবৃত্ত হচ্ছে। হুবহু একই কথাবার্তা। নতুন কোনো খবরের কাগজ ছাপতে হবে না। শুধু ওই পুরোনোগুলো নেবে আর তার ওপর নতুন নাম আর তারিখ বসিয়ে আবার ছেপে দেবে। এখন তুমি যা করছো সেটা কী? অবিকল সেই জিনিসই তুমি করছো।

ভারতে?

ভারত কীভাবে বিশ্বের আদর্শ হতে পারে? তুমি তোমার আধ্যাত্মিকতা নিয়ে কথাবার্তা বলো আর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে লোকজনকে শোষণ করো। কিন্তু ভারত কী ধরনের আদর্শ দিতে পারে? ভারত বিশ্বে কী কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে? তুমি ঠিক সেটাই করছো যেটা তারা [আমেরিকানরা] করছে। তুমি যে ‘মহান’ সভ্যতার কথা বলছো সেটা আসলে কী? এতো বছর পরও এই দেশে কীভাবে দারিদ্র থাকে? আমি জানতে চাই। তুমি ‘‘জীবনের অখণ্ডতা’’, ‘‘জীবনের ঐক্যের’’ কথা বলো। কোথায় সেই জীবনের ঐক্য? এটা একটা ‘‘পুন্যভূমি’’ ─এই কথা বিশ্বাস করাতে শত শত বৎসর ধরে আমাদের মগজ ধোলাই করা হয়েছে। কখনোই আমি এই আখ্যা মেনে নিই নাই। কোথায় সেই ‘‘পুন্যভূমি?’’

তোমার মধ্যে কোনো সামাজিক সচেতনতা আছে বলেও মনে হয় না। যখন তোমার ভেতরে কোনো ভ্রাতৃত্ববোধই নেই তখন আধ্যাত্মিকতা নিয়ে কথা বলার কী মানে হয়? মৌলিক চাহিদা! সেসবের সুরক্ষায় তোমাকে কিছুই উৎসর্গ করতে হবে না, কিছুই বিসর্জন দিতে হবে না। এই সম্পদে দরিদ্র লোকটার একটা অধিকার আছে। সেজন্যেই আমি বলি দানখয়রাত হলো অশ্লীল, পাপাচার। যা সবার, তার সবটুকু তুমি আত্মসাৎ করছো, তারপর তাকে দানখয়রাত করছো। কীসের জন্যে? তার একটা অধিকার রয়েছে। তুমি আমাকে প্রশ্ন করতেই পারো, বলতেই পারো, ‘‘তুমি কী করছো?’’ তোমার পক্ষে আমাকে এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়াটা সহজ। আমি এখানে এই দেশের কাজ করার জন্যে নেই। ক্ষমতায় থাকলে আমি সবাইকে সবকিছু দিয়ে দিতাম। যে যা চাইতো। কিন্তু তুমি আমাকে কখনো ক্ষমতায় বসাবে না। তারা শান্তিতে থাকতে চায় না। একইসাথে আমিও কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যোগ দিয়ে এই দেশটাকে ভাঙতে যাবো না। আমার কোনো আগ্রহ নেই, যেহেতু আমার তেলুগু দেশম, কন্নড দেশম বা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হবার কোনো ইচ্ছে নেই। তোমার পদ্ধতিটাই এতো নষ্ট যে, যে-কেউ, যত ‘‘মিষ্টার ক্লিন’’ই তিনি হোন না কেন, নষ্ট হয়ে যাবেন। তোমার পদ্ধতি নষ্ট, তুমি নষ্ট। ধর্মভাবনায় তুমি নষ্ট।

তুমি কি নষ্ট?

না।

কেন নয়?

আমি বলছি না যে আমি অদূষ্য বা ওইরকম কিছু। আদৌ আমি সেটা [নষ্টামী] স্পর্শ করি না কারণ চিন্তা এখানে [নিজেকে নির্দেশ করে] কোনো কিছু স্পর্শ করতে পারে না এবং নষ্ট করতে পারে না। তোমার সমস্ত ঐতিহ্যই এখানে [নিজেকে নির্দেশ করে] একটা দূষণ। আমার মনুষ্যদেহ থেকে সেটা দূরীভূত হয়ে গেছে। সমস্ত গুরুর দীক্ষাই একটা দূষণ। কিন্তু তুমি ওইসমস্ত খুব পবিত্র হিসেবে গণ্য করছো আর দিনের পর দিন ওইসমস্ত ফাঁকা শব্দ, ফাঁকা বুলি আওড়ে যাচ্ছো। দীক্ষা তোমার জীবনে কোনো কাজ করে না। কোনো ঈশ্বর যদি থেকে থাকেন, তোমাকে কিছু বলতে হবে না, লোকজন দেখুক ঈশ্বর তোমাকে কী বানিয়েছেন। প্রেমে, করুণায় আর ওইসবে ঈশ্বর পরিপূর্ণ, এইসমস্ত তোমাকে বলতে হবে না। লোকজন তোমার মধ্যে সেইটা দেখতে পাবে। তো তোমার এই সংস্কৃতির কথা বলে লাভটা কী? আমি জানতে চাই। লোকজন যখন আমার কাছে এইসমস্ত বড় বড় বুলি ঝাড়ে, আমি তাদেরকে এইসবই বলি।

তোমাকে কোনো কাজ করতে হয় না বলেই তুমি এইরকম বলতে পারো।

কাজ আমি করতে পারি, কিন্তু তাহলে তুমি সেখানে থাকবে না। কালই তোমার চাকরি যাবে। একজন সাংবাদিক হিসেবেও তুমি আমার সাথে প্রতিযোগিতা করে পারবে না।

এখন আর সেটা নয়।

যেকোনো সময়। যে রাস্তাই আমি পছন্দ করেছি সেটারই আমি শিখর স্পর্শ করেছি। একুশ বছর বয়সে আমি থিয়োসফিক্যাল সোসাইটির নেতা ছিলাম। একশো ডলার থেকে আমি মিলিয়ন ডলার বানিয়েছি। এই জীবন বেছে নিয়েছি মানে এই নয় যে আমি একটা সম্পূর্ণ ব্যর্থ বা পরাজিত। এই জীবন বেছে নিয়েছি কারণ আমি [কেন মানুষ এরকম করে, তার] উৎস শনাক্ত করতে চেয়েছিলাম। ‘‘কেন মানুষের ভেতরে এই বৈপরীত্য? তারা বলে এক জিনিস, করে আরেক জিনিস। হাস্যকর কোনো ব্যাপার আছে।’’ মানুষজনকে আমি প্রতারক বলে গালমন্দ করি নাই। আমি বলেছি, ‘‘গলদটা হয়তো গোড়ায়। যিনি দীক্ষা দিয়েছেন তিনিই হয়তো ভুল। তিনিই হয়তো নিজেকে ভাঁওতা দিয়েছেন এবং ভাঁওতা দিয়েছেন সবাইকে।’’ আমি বুঝতে চাইলাম। আজ আমি জানি তাঁরা সবাই নিজেকে ভাঁওতা দিয়েছেন, এবং সমগ্র মানবজাতিকে ভাঁওতা দিয়েছেন। আমিও নিজেকে ভাঁওতা দিয়েছি। আমি তাঁদেরকে বিশ্বাস করেছি। আমি তাঁদের ওপর আস্থা রেখেছি কিন্তু তাঁরা আমাকে কোথাও নেন নাই। এইটা জেনে, আমি সেটাই করতে পারি না যেটা তাঁরা সমগ্র মানবজাতির ওপর করেছেন। আমি শুধু দেখাতে পারি, ‘‘দেখ! তাঁরা আমাদের সবাইকে ভুল পথে এনে ফেলেছেন। যদি তুমি নিজেনিজেই দেখতে চাও, এগিয়ে গিয়ে দেখ।’’ আমি কাউকে উদ্ধার করার জন্যে এখানে নেই। এখানে আমার বন্ধুকে আমি বলি, ‘‘নরকে যাও! সেখানেই থাকো আর পচো তার ভেতরে। তোমার সাহায্যে আমি কড়ে আঙুলটাও দেবো না কারণ তুমি তোমার নরক উপভোগ করছো। সেটাকেই তুমি ভালোবাসো।’’ আমি তোমাকে উদ্ধার করার কে? যখনই তোমার নিজের ভেতরে কোনো পরিবর্তন ঘটানোর চাহিদা নেই, দুনিয়ার কোনো পরিবর্তন ঘটানোর চাহিদাও নেই। এই দুনিয়ার সমস্যাটা কী? এটা কোনোভাবে অন্যরকম হতে পারে না। মানুষ যেমন তেমনই, কোনোভাবে সে অন্যরকম হতে পারে না। এই বিশ্বের সাথে আমি কোনো দ্বন্দ্বে নেই। কারণ কাল তুমি আমাকে একটা স্বপ্নরাষ্ট্র দিতে চাইবে, পরশু কোনো রামরাজ্য দিতে চাইবে। কিন্তু এই রামরাজ্যই তারা আমাদের দিতে চেয়েছিলো। এক্ষুনি তুমি সেটা দেখে নিতে পারো। আমি শুধু তখনই এসব দেখাই যখন লোকজন আমার কাছে বড় বড় বুলি আওড়ায়।

কিন্তু দুনিয়া জুড়ে কোথাও কি শান্তি নেই?

যুদ্ধ করে তুমি কীভাবে শান্তি সৃষ্টি করবে? যুদ্ধের উৎস কী? এই শান্তিই হলো যুদ্ধ। যুদ্ধের মাধ্যমে তুমি আমাকে শান্তি দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছো। ধ্যানের মাধ্যমে তুমি আমাকে মনের শান্তি দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছো, যে ধ্যান আসলে যুদ্ধ। খুব অল্প বয়সে আমি এইসমস্ত আবিষ্কার করেছি। যুদ্ধ করে কি তুমি শান্তি স্থাপন করতে পারবে? বিশ্বযুদ্ধের মধ্যিখানে যে শান্তি সেটা মিথ্যা। তুমি যুদ্ধক্লান্ত এবং তুমি আরেকটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছো। যুদ্ধের বিপক্ষে আমি কিছুই বলছি না। আমি কোনো শান্তিবাদী নই, যুদ্ধবাজ তো নই-ই।

 

……………………………………..
১. আলঝাইমার্স ব্যাধি: Alzheimer’s disease; মস্তিষ্কের মারাত্মক একটি ব্যাধি, যাতে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্ম ব্যাহত হয়, স্মৃতিভ্রষ্টতা দেখা দেয়, স্পষ্টভাবে কথা বলায় অক্ষমতা দেখা দেয়, ইত্যাদি; স্মৃতিভ্রংশ রোগ। (সাম্প্রতিক তথ্য হলো─ আলঝাইমার্স রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রায় ৫ দশমিক ১ মিলিয়ন মার্কিনির আলঝাইমার্স ব্যাধি রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৭০ সেকেন্ডে একজন এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ১৯ মে, ২০০৯।)
২. গ্রহিক: planetory.
৩. ম্যানিক-ডিপ্রেসিভ: manic-depressive; খেদোন্মত্ত। [পর্যায়ক্রমে আনন্দ-উচ্ছ্বাস এবং অবসাদে কাল অতিবাহিত হয় এমন (ব্যক্তি)।]
৪. নৈতিক মূল্যবোধ: value system; (ব্যক্তিক ও সামাজিক মূল্যবোধ।)
৫. হেলথ ফুড: health food. (কৃত্রিম রাসায়নিক দ্রব্যাদি-মুক্ত পুষ্টিকর খাদ্য।)

………………………..
[Conversation with U.G. Krishnamurti: 6; এটি No Way Out গ্রন্থের Religious Thinking Is Responsible For Man’s Tragedy পর্বটির বাংলা অনুবাদ। এই সাক্ষাৎকারপর্বটি ১৯৮৯ সালে গৃহীত হয়। অনুবাদের স্বত্ব সংরক্ষিত।]

 

 

Facebook Comments

3 Comments:

  1. আলতাফ হোসেন

    “দুনিয়াটা যেভাবে চলছে তাতে মনে হয় না কোনো আশা আছে। মানবজাতির নিজের সৃষ্ট নৈরাজ্য থেকে যদি তাকে মুক্ত হতে হয়, তাহলে মানুষকে অন্য রাস্তা খুঁজে বার করতে হবে। আমি যা দেখি, সমগ্র ব্যাপারটা এমন একটা লক্ষ্যের অভিমুখে যেটা থামাবার বা উল্টোদিকে নেবার কোনো উপায় নেই।”

    “সেদিন একজনের সাথে কথা হচ্ছিল, তিনি জানতে চাইলেন, ‘‘আপনি উদ্বিগ্ন নন কেন?’’ আমি কাউকে উদ্ধারে আগ্রহী নই। সত্যি কথা বলতে কি, সকল উদ্ধারকর্তাদের হাত থেকে জগতটাকে উদ্ধার করা দরকার, সেই আর্জিই আমি করি। কোনো কিছু পাল্টাতে, বদলাতে বা উল্টোদিকে নিতে ব্যক্তিগতভাবে আপনার বোধহয় কিছুই করার নেই। আর ‘সমষ্টিগতভাবে’ মানেই হলো যুদ্ধ। দুর্ভাগ্যক্রমে, রাজনীতিকদের আমরা ক্ষমতার গদিতে বসিয়েছি। আমাদের আছে শুধু রাজনৈতিক সচেতনতা। অথচ ধর্মীয় লোকেরা এখনো ঐশীতা, মানবতা, প্রাচীন সভ্যতা, রামরাজ্য, এটা-ওটা নিয়ে বলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নির্বাচনের স্বার্থে রাজনীতিকরাও এইসমস্ত ব্যবহার করেন, এইভাবেই জনগণকে তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন।”

  2. Pingback: ইউ.জী. কৃষ্ণমূর্তির সাথে কথোপকথন: ৭ » সাহিত্য ক্যাফে

  3. ”যুদ্ধ করে তুমি কীভাবে শান্তি সৃষ্টি করবে? যুদ্ধের উৎস কী? এই শান্তিই হলো যুদ্ধ। যুদ্ধের মাধ্যমে তুমি আমাকে শান্তি দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছো। ধ্যানের মাধ্যমে তুমি আমাকে মনের শান্তি দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছো, যে ধ্যান আসলে যুদ্ধ। খুব অল্প বয়সে আমি এইসমস্ত আবিষ্কার করেছি। যুদ্ধ করে কি তুমি শান্তি স্থাপন করতে পারবে? বিশ্বযুদ্ধের মধ্যিখানে যে শান্তি সেটা মিথ্যা। তুমি যুদ্ধক্লান্ত এবং তুমি আরেকটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছো। যুদ্ধের বিপক্ষে আমি কিছুই বলছি না। আমি কোনো শান্তিবাদী নই, যুদ্ধবাজ তো নই-ই।”………..!

Leave a Reply to bidan shil Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *