গাজী তানজিয়ার গল্প: একগুচ্ছ রেইনট্রি ফুল

পাভেল হিমিকার কম্পনটা ঠিক বুঝতে পেরেছে। ওর হাতে ফুলটা দিতে ও যেন একটু চমকে উঠল। ফুলটা নেয়ার সময় আঙ্গুলগুলো কি একটু কাঁপছিল না! কি হয়েছে হিমিকা? কই, কিছু না-তো! আমাকে বললেই হলো, না! কিছু একটা তো হয়েছে। আচ্ছা তুমি এই ফুল কোথায় পেলে? ওহ্ এই …

কামাল রাহমানের গল্প: ডাউকি

মাঝবয়সে পৌঁছে ছয়ফুলের জীবনে একটু একটু করে সোনালি রং ধরতে শুরু করে। অগ্রহায়ণের শালি ধানের মতো বিচিত্র রঙের ছটা ছড়ায় ওটা। সেই সঙ্গে ওর মনে হতে থাকে যে ধীরে ধীরে কিছু একটা যেন খোয়া যেতে শুরু করেছে ওর জীবন থেকে। প্রথম দিকে ওসব ধরে রাখার …

লুনা রাহনুমার গল্প: সুগার

“সুবিমল, একবার চোখ বুঁজে ভাবো দেকিনে, ময়রার হাতে ঘণ্টা ঘণ্টা কচলানোর পর গরম সিরায় জ্বাল দিয়ে তোলা নরম একটি রসগোল্লা টপ করে মুখে ফেললে কেমন সুরার মতন রস লাগে প্রাণে!” “ভায়া, আমাদের সৈয়দপুর বাজারের পেহেলওয়ান মিষ্টান্নের একখানি রসগোল্লা যদি খেতে একদিন! বুঝলে, তোমার এই শরীরে …

অপর্ণা হাওলাদারের গল্প: ছাত্রানং অধ্যয়নং তপঃ কিংবা রাজনৈতিক নিহিলিজম

উবু হয়ে বসে ঘাস ছিঁড়ছে তারেক। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ এর পশ্চিম কোণে, দুই সরু রাস্তা চলে গেছে তার একটু পাশের থেকে। এই কড়ই গাছের ছায়ায় বসে সে অনেকক্ষণ। ছায়াটা ছেড়ে দিলে মাঠের বেশির ভাগ জায়গা কড়া রোদ। দুরে জারুল, রাধাচূড়া আর কৃষ্ণচূড়া তিন ধরণের গাছেই থকে …

সাদিয়া সুলতানার গল্প: যে দেশে মানুষ নেই

১. দলটি ক্রমশ কালো মাথায় ভারি হচ্ছে। কালো কালো শরীর এদের। তারচেয়ে বেশি কালো পথ। সময়টা শীতের বিকেল। ছায়াছন্ন বিভীষিকাময় সময়। শীতার্ত আকাশও আলো শূন্য। আকাশে মেঘেরা খোঁপাখোলা চুলের বিন্যাসে পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়েছে। মেঘের নতজানু ভাব দেখে বোঝা যায় জলের ভারে সামান্য স্ফীত হলে এরা …

হারুকি মুরাকামির গল্প: যে রাজ্য ব্যর্থ হয়েছিল

অনুবাদ: জেসমিন আরা [বর্তমান সময়ে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক ও গল্পকার হারুকি মুরাকামির জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে জাপানের কিয়োটোতে। তাঁর সাবলীল ও সরল ভাষায় লেখা গদ্য অনায়াসেই টেনে নেয় যেকোনো স্তরের সাহিত্য পাঠককে। ভাষার এ সরলতা এতটাই জাদুকরি যে দুর্বোধ্য বিষয়কেও সরল অনুভূতিতে রূপান্তরিত করতে …

শান্তা মারিয়ার গল্প: রাস্তাটা আলীকদমের দিকে গেছে

‘রাস্তাটা সোজা আলীকদমের দিকে গেছে’। এই কথাই বারে বারে বলেছিল লোকটা। আরও বলেছিল বেশিক্ষণ হাঁটতে হবে না। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই রেস্ট হাউজে পৌঁছানো যাবে। এই রেস্ট হাউজ ওদের কোম্পানির নিজস্ব। আগেও একবার এখানে এসেছিলেন জাহেদুল ইসলাম। সে অনেক বছর আগে। তখন ছোট্ট একটা কটেজ ছিল। এখন …

নাহার তৃণার গল্প: নাম লেখা নেই আগুন কিংবা জলে

ক্রমাগত ভুলে ভরা, পিছিয়ে পড়া মানুষটার জন্য বুকের একটা কোণ খুব সন্তর্পণে শীতল পাটি বিছিয়ে রেখেছিল। বাইরের ছুটন্ত পৃথিবী কিংবা গৃহের নিরন্তর উত্তপ্ত বাতাবরণ এড়িয়ে মুখোমুখি বসবার খানিক অবসর পেলে হয়ত মানুষটা দু’দণ্ড শান্তির ছোঁয়া পেলেও পেতে পারতো। সর্বদা মাটির দিকে চোখ রেখে চলা মানুষ …

দিলশাদ চৌধুরীর অনুবাদ:  ল্যু স্যুনের গল্প- একটি ঘটনা

[লেখক পরিচিতিঃ ল্যু স্যুন (১৮৮১ – ১৯৩৬) ছিলেন একইসাথে চীনের একজন লেখক, প্রাবন্ধিক, কবি এবং সাহিত্য সমালোচক। তিনি ছিলেন আধুনিক চীনা সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। আধুনিক ছাপচিত্রের ইতিহাসেও তার নাম উল্লেখযোগ্য। প্রচলিত চীনা পদ্ধতি এবং ইউরোপীয় সাহিত্যের আভা, দুয়েরই সমাবেশ ঘটে তার লেখায়। “একটি অপ্রয়োজনীয় ঘটনা” …

সুধাংশু শেখর বিশ্বাসের ছোটগল্প: ইলেকশন

কুকুরটা বুঝে উঠতে পারে না, ঠিক কি হয়ে গেল। কিন্তু এটুকু অনুভব করল, একটা বেদনাবোধ যেন সাঁ করে তার পাঁজরের ভেতর দিয়ে ঢুকে গেছে। অবিশ্বাস্য বোবা দৃষ্টি মেলে সে সামনের লোকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বোঝার চেষ্টা করে বিষয়টা। হঠাৎ তার এই বোধের উদয় হয় …

সাদাত হাসান মান্টোর গল্প: ফুলের বিদ্রোহ 

মূল থেকে অনুবাদ: জাভেদ হুসেন বাগানে সব ফুল বিদ্রোহ করলো। গোলাপের বুকে দপদপ করছিল বিদ্রোহ। তার শিরায় শিরায় জ্বলছিল আগুন। একদিন সে নিজের কাঁটা ভরা ঘাড় তুলে, ভাবনাচিন্তা একপাশে সরিয়ে নিজের সঙ্গীদের ডেকে বলল: “আমাদের ঘামে আয়েশ করার অধিকার অন্য কারো নেই। আমাদের জীবনের বসন্তের …

নভেরা হোসেনের গল্প: নির্জনতা

গত কয়েকদিন ধরেই লক্ষ করছি মানুষের সঙ্গ কেমন যেন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ঘর থেকে বের হওয়া মানেই তাদের সম্মুখীন হওয়া। এমনকী ঘরেও আপনি যত চেষ্টাই করুন না কেন একা হতে পারবেন না, লোকজন আপনাকে চারপাশ থেকে সাঁড়াশি দিয়ে টেনে ধরবে। যখন আপনি নিজের ঘরে নির্জন …

পাভেল চৌধুরীর ছোটগল্প: বনের ডাক

(১) বন ডাকে। কেমন সে ডাক, ভীতিকর নাকি প্রীতিকর, বিকট-বীভৎস নাকি শ্রুতিমধুর, উচ্চগ্রামের নাকি মৃদু লয়ের– এসব বর্ণনা করে বোঝানো যাবে না। এমনই অবর্ণনীয়, ব্যাখ্যাতীত, অব্যক্ত সে ডাক। সময়ও অনির্ধারিত। প্রত্যুষে কিংবা সাঁঝে, গভীর রাতে কিংবা ভরদুপুরে অথবা হঠাৎ কর্মব্যস্ততার সময়ও হয়, অকস্মাৎ, একেবারে বনের …

বাবলী হকের ছোটগল্প: ইতিময় নেতিকথা   

বৃষ্টি থেমে গেছে। অনেকক্ষণ। গাড়ি থেকে নেমে মাধবীলতার ঘন ঝাড় পেরিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকতেই কেমন গা ছমছম করে উঠল। মাধবীলতার ঘ্রাণ ছাড়িয়ে, মাটির সোঁদা গন্ধ টপকে ঘাসের ওপর স্নিকার্স পরা পা ঘষি। ঘোড়া দাঁড়িয়ে থাকলে কিছুক্ষণ পরপর মাটিতে যেমন এক পা ঘষে। মার্চের শেষ সপ্তাহ …

মানিক বৈরাগীর গল্প: ইঁদুর

সেমি পাকা দেড় কামরার কলোনিতে রোজিনার সংসার। রোজিনা কর্মজীবী। একটি কেজি স্কুলে পড়ায় আর টানাপড়েন সংসারের হাল ধরতে গিয়ে টিউশনিও করতে হয় তাকে। অবসর কি সে জানেনা। ঘরের বদ্ধ হাওয়ার একঘেয়েমি কাটানোর জন্য কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাবা তার কাছে বিলাসীতা। রোজিনা নিরলস এক সংসার …

জাহিদ হায়দারের ছোটগল্প: বৈচিত্র্যের সংগ্রাহক

দ্বিতীয়বার ভদ্রমহিলাকে আবার দেখলাম। প্রথম দেখেছি প্রায় দু’মাস আগে।  মধ্য এপ্রিলে। পয়লা বৈশাখের দুই দিন পর। ছিল শুক্রবার। সেদিন সকালে উত্তর-আকাশে মেঘ ছিল। আবির কম্পিউটার হাউজের বাইরে পনেরো ফিট চওড়া ভালোমন্দ পিচের রাস্তায় রিকশ’র বেল, গাড়ির হর্ন এবং মানুষের কথা ও চলাফেরার শব্দ থামছে না। …

মাহবুব আলীর গল্পঃ র‍্যাঁদা

মকসেদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। মেজাজ সপ্তমে। অনেকক্ষণ ধরে দোকানের বারান্দায় বসে আছে। একটি বিড়ি ধরিয়েছে কখন, সেটিও অর্ধেক হয়ে গেল। অম্বরিশ স্টোর থেকে বেরোয় না। ভেতরে ছুঁড়িও আছে। কী করছে কে জানে! ঘরের মধ্যে শুধু খসমশ শব্দ। ব্যাটার এতক্ষণ লাগে? শেষে হারামি ঘুমিয়ে পড়ল …

সুমী সিকানদারের গল্প:বহু বাসনায়

গতকাল হাঁটুর নিচে পায়ের মাঝখানে একটা চুলকানি মতো ছিলো। আমল দেবার মতো কিছু না। আজ ভুলে তাতে ঘ্যাঁচ করে চুলকে দিতেই দরদর করে রক্ত বেরিয়েয়ে গড়িয়ে একসা। কিছু না পেয়ে পরনের স্কার্ট দিয়ে মুছতে গিয়ে আঠাআঠা হয়ে গেল। কি আর করা বাধ্য হয়ে খুঁজে পেতে …

নভেরা হোসেনের গল্প: আলাউদ্দিন রোডের সেই মেয়েটি

(তনুর জন্য, যে কখনো হারিয়ে যাবে না। প্রতি মূহুর্তে একটা জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে জ্বলতে থাকবে সকলের মনের দরজায়) বিকেল হতেই বাইরে রোদ ঝলমল করছে। বারান্দার কোণে বৃক্ষমেলা থেকে কিনে আনা জুঁইয়ের চারায় ফুল এসেছে। বাড়ির গেটের কাছে লাগানো হাস্নাহেনার ঝাড় থেকে ফুলের তীব্র ঘ্রাণ ভেসে …

রিয়াদ চৌধুরীর গল্প: নিরীহ, ক্লান্ত ও মর্মান্বেষীদের গান

তারা– হীরের মত জ্বলজ্বল করছে পুরোটা আকাশ জুড়ে। চাঁদও আছে, আকাশের এক কোণে, অর্ধেকটর মতন। সেই অর্ধেক চাঁদের ম্লান আলো এসে পড়েছে ঘুম-ঘুম শহরটার বাতি নেভানো ঘর-বাড়িগুলোর উপর। চারপাশে বাতাসের বয়ে চলার শব্দ ছাড়া আর কোন সাড়া-শব্দ নেই। চাঁদের আবছা আলোয় ভুতুড়ে ছবির মতন লাগছে …

শাহনাজ নাসরীনের গল্প: ভাঙ্গারি

শাহনাজ নাসরীন কাঁধে একটা চটের বস্তা নিয়ে হন হন করে হাঁটে সালমা। হাঁটে আর গালাগাল করে। খানকির পুত, চুতমারানির পুত, বাঞ্চোৎ বলে যার গুষ্ঠি উদ্ধার করে, যাকে কিনা তার জীবনের সব যন্ত্রণার জন্য দায়ী করে সে কাল রাতে তার জমানো টাকা চুরি করে পালিয়েছে। এখন …

সেলিম জাহানের গল্প: সেদিন দু’জনে

সেলিম জাহান ছেলেটির হাতে মেয়েটির হাত ধরা– ছেলেটির ভারী পছন্দের মেয়েটির নরম ছোট্ট হাতদুটো। মেয়েটি তা জানে আর তাই ভারী মিষ্টি করে ছেলেটির মুখের দিকে তাকায়–তার মনের মানুষটির দিকে। রাস্তার এ পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে দু’জনে – রাস্তা পার হবে। তুলতুলে নরম রোদের ঝকঝকে একটা সকাল– …

আসমা চৌধুরীর গল্প: বৈকালি স্টুডিও

আসমা চৌধুরী উপজেলা শহর তখনো হয়নি। চিঠি লেখার খামে ঠিকানায় লিখতে হতো থানা,মেহেন্দিগঞ্জ।এখানে একটাই ফটো তোলার স্টুডিও ছিলো। বিত্তবান লোকেরা স্টুডিওর মালিক রমাপদ বাবুকে খবর দিয়ে বাড়ি নিয়ে গিয়ে পারিবারিক ছবি তুলতো।সেসব ছবি তোলার দারুণ এক মজার ব্যাপার ছিলো। একজনকে ছাতা ধরতে হতো রমাপদ বাবুর …

দারা মাহমুদের গল্প: জীবন গাছ

দারা মাহমুদ হাটের শেষ বাতিটা যখন নিবল তখন রাত বারটা। গ্রামদেশে বারটা মানে গভীর রাত। পুরো এলাকায় বিদঘুটে অন্ধকার, আর রাতের শব্দ। তারা পাঁচ দোকানি গল্প করতে করতে গ্রামের রাস্তা ধরল। গল্প আর কি! কার কিরকম বিক্রি বাট্টা হলো। এভাবে চললে দেশের কি হবে, অথবা …

মাহবুব আলীর গল্প: কেন মুক্তিযোদ্ধা হতে পারোনি

মাহবুব আলী যতটুকু নস্টালজিক পুলক কখনো মনের কোণায় জেগে উঠছিল, রিকশা থেকে নেমে সব স্তব্ধ। অফিস পাওয়া গেছে। লোকজনের ভিড়। জানা গেল, পাবনা আর বগুড়া চলছে। কতজন পেন্ডিং? প্রায় পঞ্চাশ-ষাট। অতপর কী আর করবেন? সব জায়গায় এই সিস্টেম। লোডশেডিং…ওভারলোড। অবশেষে সিদ্ধান্ত, এই ফাঁকে লাঞ্চ সেরে …

রাত পাহারা চোখ

মাহবুব আলী এই মধ্য বৈশাখে তপ্ত রোদের ভেতর, হাঁটতে হাঁটতে কুদ্দুসের জিহ্বা আধহাত বের হয়ে আসে। বলতে গেলে বিনে পয়সায় বা আধা-মাগনা পেটে-ভাতে নাইট ডিউটি। সে কাজে ফাঁকি নেই। সারারাত প্রায় জেগেই থাকে। আজ ভোর ভোর সকাল থেকে দুচোখ ঢুলু ঢুলু। মাথা টলমল করছে। হলুদ …

প্রতিবন্ধী

মাহবুব আলী এখন কারও করুণ দৃষ্টি তাকে কাবু করতে পারে না। রিনি দুচোখ অন্যদিকে সরিয়ে নেয়। বিছানার উপর বড় এক স্যুটকেস। সেখানে মোটামুটি সবকিছু নেয়া হয়ে গেছে। মঈন ভোর রাতে প্যাকেটে ভরে দিয়েছে একুশ ইঞ্চি টেলিভিশন। দরজার সামনে বারান্দায় পড়ে আছে ওটা। রিনি কী করবে? …

বঙ্গীয় আর্দ্রতা উদ্‌যাপন

যশোধরা রায়চৌধুরী নিতাইবাবু কাঁদিয়া ফেলিলেন। অথচ সেইদিন অশ্রুসংবরণ করিয়াছিলেন। কন্যাবিদায়ের মুহূর্তে তাঁহার চক্ষুদুইটি শুষ্ক ছিল। চার-পাঁচদিন পূর্বে কন্যা চলিয়া গিয়াছে , কন্যা-জামাতার চাঁদমুখ পর্যবেক্ষণ করিয়া গিন্নি সুলতাদেবী ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিয়াছিলেন, কন্যার অনিষ্টকামনা করিবেন না বলিয়া সরিয়া গিয়াছলেন কিচেনের এক কোণে। কন্যা টিনাও , যথাবিহিত অশ্রুছলছল …

Back to Top