সেলিম জাহানের গদ্য: তোমাকে দেখতে বড্ড ইচ্ছে করবে

দাপ্তরিক টেবিলের ওপরে ছোট্ট একটা চিরকুট। আমি আস্তে করে হাতে তুলে নিলাম। তা’তে গোটা গোটা অক্ষরে ইংরেজীতে সংক্ষিপ্ত একটি বার্তা – বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘সম্প্রতি আমার বিদায় সম্বর্ধনা সভায় তোমার বলা আমার হৃদয় ছুঁড়ে গেছে। বলার শেষে তুমি তোমার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে …

বদরুজ্জামান আলমগীরের গুচ্ছকবিতা

কাটা ঘুড্ডি গিমাই শাকের দেশে চিঠি জামপাতা কিছু কিছু মানুষ পোস্টম্যান হয়ে জন্মায়, দরজার চৌকাঠে শুভাশিস হয়ে শুয়ে থাকে। চিঠি আসুক কী না আসুক- ডাকপিয়ন আমাদের প্রতিদিন চিঠি বিলি করে যায়। চিঠির খাম নদীর কুর্তায় মোড়া। কাঁচা হলুদের গুঁড়া, একটি গমগমে হাসির লাইলাক। চিঠির উপর …

অপর্ণা হাওলাদারের গল্প: ছাত্রানং অধ্যয়নং তপঃ কিংবা রাজনৈতিক নিহিলিজম

উবু হয়ে বসে ঘাস ছিঁড়ছে তারেক। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ এর পশ্চিম কোণে, দুই সরু রাস্তা চলে গেছে তার একটু পাশের থেকে। এই কড়ই গাছের ছায়ায় বসে সে অনেকক্ষণ। ছায়াটা ছেড়ে দিলে মাঠের বেশির ভাগ জায়গা কড়া রোদ। দুরে জারুল, রাধাচূড়া আর কৃষ্ণচূড়া তিন ধরণের গাছেই থকে …

পলিয়ার ওয়াহিদের পাঁচটি কবিতা

মেসোপটেমিয়ার ছেলে এনহেদুয়ান্না, হে আমার প্রেমের দেবী দেবী তুমি জ্ঞানেরও কেউ না মানুক, আমি জানি, তুমি পৃথিবীর প্রথম কবি নও তোমার আগেও ছিল আমার পূর্বপুরুষ কে না জানে ইতিহাস ক্ষমতাচারিদের হাতেই লালিত তোমার রাজকন্যাময় চেহারা দেবতাকে খুশি করার স্তুতিপ্রলাপ কিংবা প্রার্থনা সংগীতের পবিত্রতম দানা দুনিয়াকে …

আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড ৩ রিজবে ১ আর্নল্ড রিজবের বাবা একজন কর্মকার। গনগনে উত্তপ্ত লোহাখণ্ডের অস্তমান সূর্যের মত আবীর রঙ তাকে মোহাবিষ্ট রাখে। একখণ্ড লোহা। আহা! আগুনের তাপে রং বদলে লাল টুকটুকে হচ্ছে; নরম হচ্ছে। তপ্ত নরম সেই লোহা পিটিয়ে পিটিয়ে ইচ্ছেমত মুচড়ে দুমড়ে নানান হাল-হাতিয়ার …

কচি রেজার একগুচ্ছ কবিতা

কোলাহল কোলাহল করেছ আর চুপ করে বসে রয়েছ চারপাশে নিঃশব্দতার ছায়া আমি প্রতিবিম্বের ভিতরে এবং ওপারে কবেযে আয়না ভেঙে ভয়াবহ হবে অন্ধকার আমি বেরিয়ে পড়ব কবরস্থান থেকে যেখানে আমার পিতামহ বর্ণনা করছন অন্তিম বিভ্রমে ভেঙ্গে আমি কি কোলাহল করেছি বুঝাতে পেরেছি যে ঘুমিয়ে পড়েছি ! …

সাদিয়া সুলতানার গল্প: যে দেশে মানুষ নেই

১. দলটি ক্রমশ কালো মাথায় ভারি হচ্ছে। কালো কালো শরীর এদের। তারচেয়ে বেশি কালো পথ। সময়টা শীতের বিকেল। ছায়াছন্ন বিভীষিকাময় সময়। শীতার্ত আকাশও আলো শূন্য। আকাশে মেঘেরা খোঁপাখোলা চুলের বিন্যাসে পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়েছে। মেঘের নতজানু ভাব দেখে বোঝা যায় জলের ভারে সামান্য স্ফীত হলে এরা …

সাজ্জাদ সাঈফের একগুচ্ছ কবিতা

হঠাৎ মৃত্যুযুগ হীরক-রোদের উত্তরে এসে মাটিমাখা ভাষার গোধূলি পাবো, সে আমি নিজেই ভাবিনি! ছায়া মেলে দুলছে পাতারা, গাছে- ধানী গন্ধের পাথারে ডেকে, ঈর্ষাকে, ঘোড়ায় এনে বসাই গম্ভীর দাবার ছকে এসে, মহামারী, ইশারা পাঠালো কি যে! অনেকটা হেঁটে এসে পা রাখি দ্বিধাচিহ্নে- এইদিকে মৃত্যুও, ভ্রাতৃপ্রতীম; আর …

পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

ধুসর গোধূলি চানাচুর-ফুকল-আইসক্রীম-সিংগারা-তেঁতুল-অড়বড়ই-আমলকী নিত্য কিনে খেয়ে, বন্ধুদের খাইয়েও আমার হাতে প্রতি হপ্তাতেই কিছু পয়সা উদ্বৃত্ত থেকে যেত। দুই-তিন-হপ্তা বাদেই দেখতাম হাতে পাঁচ-দশটাকা জমে গেছে! এত টাকা কই বা কীভাবে খরচ করব তাল পেতাম না। রিক্সা ও নৌকাভাড়া দেয়া ছাড়া আমার নিজের কোনো খরচই ছিলনা। আমার …

জিললুর রহমানের পাঁচটি কবিতা

সামনে সমুদ্র বটে কতো বর্ষা কেটে যায় কতো সন্ধ্যা হয়েছে আঁধার, আমার সময় নেই ঘরে বসে নিরালায় দুদণ্ড কাঁদার। বুকের ভেতর কতো জমিয়ে রেখেছি বারুদের ক্ষোভ তাল তাল, দেশলাই খুঁজে ফিরি অনন্ত আঁধারে যতো ঝোপঝাড় বাড়ির চাতাল। যতোই এগোই পুবে অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে যতো যাই …

মোনালিসা চট্টোপাধ্যায়ের সিরিজ কবিতা: ঈশ্বরজন্ম

ঈশ্বরজন্ম ১৬ স্বরের নিজস্ব এক দ্যুতি আছে যা আমিই জেনেছি বহু বিলম্বিত গেয়ে গেয়ে আলাপ বিস্তারে । কথা যদি বিন্যাসের ভেতর শ্রাবণ জারি করে আজ মনসায় বিয়ে হোক তোমার আমার । পাজি শব্দ নিয়ে খুশি আছি, বেশ ভেষজ ব্যাপার। টুং ফুং ছেড়ে বেরিয়ে পড়েই গাড়ি …

হারুকি মুরাকামির গল্প: যে রাজ্য ব্যর্থ হয়েছিল

অনুবাদ: জেসমিন আরা [বর্তমান সময়ে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক ও গল্পকার হারুকি মুরাকামির জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে জাপানের কিয়োটোতে। তাঁর সাবলীল ও সরল ভাষায় লেখা গদ্য অনায়াসেই টেনে নেয় যেকোনো স্তরের সাহিত্য পাঠককে। ভাষার এ সরলতা এতটাই জাদুকরি যে দুর্বোধ্য বিষয়কেও সরল অনুভূতিতে রূপান্তরিত করতে …

দারা মাহমুদ: কোভিড কবিতা

দুনিয়া যখন কোয়ারেনটিনে রঙিন শপিংমল বন্ধ, রাস্তাগুলো নিজেরাই একা একা হেঁটে যাচ্ছে লৌকিক গলির দিকে— এই সঙ্গ নিরোধকালে কোনো ক্যাফে নেই সব ক্যাফে বেড়াতে গিয়েছে সুন্দরবনের চৌপদী জঙ্গলে দুনিয়ার সব ভয়ংকর রোগ ঢুকে পড়ছে মানুষের মনোলোকে তরুণ-তরুণী মেঘ উড়ে যাচ্ছে প্রেমহীন শূন্যতার দিকে— এই তালাবদ্ধ …

শান্তা মারিয়ার গল্প: রাস্তাটা আলীকদমের দিকে গেছে

‘রাস্তাটা সোজা আলীকদমের দিকে গেছে’। এই কথাই বারে বারে বলেছিল লোকটা। আরও বলেছিল বেশিক্ষণ হাঁটতে হবে না। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই রেস্ট হাউজে পৌঁছানো যাবে। এই রেস্ট হাউজ ওদের কোম্পানির নিজস্ব। আগেও একবার এখানে এসেছিলেন জাহেদুল ইসলাম। সে অনেক বছর আগে। তখন ছোট্ট একটা কটেজ ছিল। এখন …

নাহার তৃণার গল্প: নাম লেখা নেই আগুন কিংবা জলে

ক্রমাগত ভুলে ভরা, পিছিয়ে পড়া মানুষটার জন্য বুকের একটা কোণ খুব সন্তর্পণে শীতল পাটি বিছিয়ে রেখেছিল। বাইরের ছুটন্ত পৃথিবী কিংবা গৃহের নিরন্তর উত্তপ্ত বাতাবরণ এড়িয়ে মুখোমুখি বসবার খানিক অবসর পেলে হয়ত মানুষটা দু’দণ্ড শান্তির ছোঁয়া পেলেও পেতে পারতো। সর্বদা মাটির দিকে চোখ রেখে চলা মানুষ …

শুভম চক্রবর্তীর একগুচ্ছ কবিতা

শ্রীচৈতন্য সমুদ্রে ছড়ালো জাল। উঠে এ’ল ইয়া লম্বা দেহ। আজানুলম্বিত হাত। ধপধপে সমূহ শরীর। কষ বেয়ে রক্ত নামে। গোঁ গোঁ ক’রে এমন চেঁচায়। তাতেই বিদীর্ণ যেন নীলজল আর নীলাকাশ। সমুদ্রে ফেলেছে জাল, আর জেলে পেয়ে গেছে ভয়। এ’লোক সামান্য নয় ভূতপ্রেত হবেই নিশ্চয়। ‘ যাই …

আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

জর্জিয়া ৫ একটা নিরাপদ জায়গা দেখে তারা গাছে চড়ে বিশ্রাম করার চিন্তা করল। রেকুনের মত তারা গাছে ঘুমিয়ে নিল। কোরার ঘুম ভাঙল। তখন সূর্যটা বেশ উপরে উঠে এসেছে। দুটো পাইন গাছের আঁড়ালে সিজার আপন মনে কী যেন বলছে। কোরা গাছ থেকে নেমে এলো। তার হাত-পা …

সৌমনা দাশগুপ্তের কবিতা

রামধনু  সমস্ত করমর্দনের মাঝখানে একটি অন্ধকার থাকে করমর্দন করতে গিয়ে তুমি আসলে একটি অন্ধকার ছুঁয়ে ফেলছ। বিনিময়ের আগে এবং পরেও রামধনু। অন্ধকার বিলি হয়ে যাবার পর পড়ে থাকে শুধু একটা রামধনু   বরাহ-অবতার ভাঙো জরা ভাঙো জন্ম এই সুড়ঙ্গ আদিমাতৃকা গভীর টানেল জুড়ে স্ট্যালাকটাইট, নুন-গাছ …

আসমা চৌধুরীর তিনটি কবিতা

বামপাশ এখনো বামদিকে কাত হয়ে শুই বামদিকে ঘণ্টা ধরে ধুকপুক শব্দের কৌটায় রাখি তোমার নাম। পাশ-ফিরে আলস্য ভেঙে উঠে যেতে চাই, কে যেন মৃদু স্বরে বলে, ঘুম শেষ হলো? বাম পাশে হাত রাখি, খালি হয়ে যায় ৩৬৫ দিন।   সুবিচার কোনদিন সুবিচার পাবো এই ভেবে …

দিলশাদ চৌধুরীর অনুবাদ:  ল্যু স্যুনের গল্প- একটি ঘটনা

[লেখক পরিচিতিঃ ল্যু স্যুন (১৮৮১ – ১৯৩৬) ছিলেন একইসাথে চীনের একজন লেখক, প্রাবন্ধিক, কবি এবং সাহিত্য সমালোচক। তিনি ছিলেন আধুনিক চীনা সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। আধুনিক ছাপচিত্রের ইতিহাসেও তার নাম উল্লেখযোগ্য। প্রচলিত চীনা পদ্ধতি এবং ইউরোপীয় সাহিত্যের আভা, দুয়েরই সমাবেশ ঘটে তার লেখায়। “একটি অপ্রয়োজনীয় ঘটনা” …

পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

অচ্ছুৎ অসুখের দিনরাত্রি ততদিনে আম্মার ট্রাংকে লুকিয়ে রাখা প্রায় সবগুলি নিষিদ্ধ বই-ই আমি পড়ে ফেলেছি। ভালো করে বুঝি বা না বুঝি পড়তে ইচ্ছে করেছে, ব্যস পড়ে ফেলেছি। ওইসব আউট বইয়ের মাঝে নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধাও’ ছিল। প্রচণ্ড কাশির তোড়ে যখন আমার কচি বুক থেকে সিঁদুরের মতো লাল …

মহিউদ্দীন মোহাম্মদের কবিতা: অধুনা দিনের কাসিদা

এক. মানুষে মানুষের এতযে পূজা চান; বুঝেনি আগে আমি,তাইতো বিস্ময়। প্রেম ও ভালবাসা উড়ছে কর্পুরে। পুষ্প তরতাজা, তৈল শরিষায়- লোকেরা হতে চান খুশিতে গদ গদ। দাসের পাঠ নিয়ে, মঞ্চে প্রভু সাজ; মুচকি হাসি পায়, বলি না আর কারও। নিখিলে বড় ভয়, কী থেকে কীযে হয়; …

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়ের সিরিজ কবিতা

বৃত্তপথ ১ গল্পের অবাক পেটে বলি যাওয়া ভাষা পড়ে আছে। কী যে ফল, কী যে কর্ম, ইদানীং সমস্ত গোলায়। গোলায় ইতরের থান, মধুচক্রে ফুলের ভূগোল। ভাষার নীচের ঠোঁটে মাছি আসে, হাসাহাসি করে। পা মোছার এমন শিল্প অন্য কোনো পতঙ্গ শেখেনি। বিশাল মশলার বজরা ঢেউ তুলে …

অরণ্য: বোধনের ডায়েরি– টিনের ট্রাঙ্ক

বড়-সড় কালো একটা টিনের ট্রাঙ্ক আমাদের বাড়িতে ছিলো, যা সারাবছরই বন্ধ পড়ে থাকত, আর নিয়ম করে খোলা হতো শীত আসার আগে। ট্রাঙ্কটির বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা, এবং শোবার ঘরের এককোণ থেকে সারাবছর জানাতে থাকা তার নিভৃত, নির্জন অস্তিত্ব, যা আমরা কখনোই সেভাবে লক্ষ্য না করলেও …

শামস আল মমীনের তিনটি কবিতা

কেমন আছো তুমি তোমাকে দেখেই বুঝে নিতে পারি তুমি আছো কেমন। আজন্ম দুঃখের নোলক পরে কার্তিকের আকালের মতো ঘুরে ফিরে আসো তুমি। তোমার অ-বলা জিভ অকস্মাৎ রোদ ওঠা আকাশের চেয়ে তপ্ত। সক্রেটিসের কথার মতো তোমাকে আমরা বুকে বুকে রাখলাম। হেমলকে তুমি জান কোরবান করোনি। উনসত্তরে …

স্বপন নাগের তিনটি কবিতা

গাছের কাছে নদীর কাছে এই কথাটাই জানাতে চাই , জেনে রাখা ভালো : অন্ধকারকে আড়াল করছে সাজানো সব আলো ! এই যে এত আলোর বাহার, আলোর মেদুর স্রোতে বৃক্ষ দেখো মগ্ন কেমন স্বপ্ন এবং ব্রতে ! কোথায় ছুটে চলছে সবাই, ওদের ডেকে ব’লো- একটি দুটি …

সুধাংশু শেখর বিশ্বাসের ছোটগল্প: ইলেকশন

কুকুরটা বুঝে উঠতে পারে না, ঠিক কি হয়ে গেল। কিন্তু এটুকু অনুভব করল, একটা বেদনাবোধ যেন সাঁ করে তার পাঁজরের ভেতর দিয়ে ঢুকে গেছে। অবিশ্বাস্য বোবা দৃষ্টি মেলে সে সামনের লোকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বোঝার চেষ্টা করে বিষয়টা। হঠাৎ তার এই বোধের উদয় হয় …

পলিন কাউসারের গুচ্ছ কবিতা

চাঁদ ফোড়ন সাগরে ছিপ ফেলে একদিন চাঁদ ধরেছিলাম, ছোঁ মেরে ঢেউ নিয়ে গেলো চাঁদ, খুব দূরে, যেখানে ডুবে গিয়েছিলো একটি আস্ত মানুষ, সেখানে কি করে এলাম অমাবস্যা হয়ে, জানি না। ছেঁড়া উঠোন তোমার উঠোন গোছাও বাইরে ঝুলছে চৈত্র, শুকনো বনের লোভে ফুঁসে উঠছে হাওয়া, কি …

Back to Top