নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-২৫

কুমকুম টিভিরুমের সামনে নিধিকে পাকড়াও করে,´এই মেয়ে তোকে দেখিনা কেন? আয় আমার সঙ্গে’। নিধির তখন টেলিভিশনে সন্ধ্যেবেলার খবর দেখার সময়। কিন্ত কে শোনে কার কথা! তির তির করে সান্ধ্যকালীন গুঞ্জনধ্বনি ছড়ায় আঙ্গিনায়। করিডোর ধরে সে গুঞ্জনের রেশ কুমকুমের রুম অব্ধি পৌঁছায় না। ওর ঘরের জানালায় …

ট্রান্সট্রোমারের কবিতা: পর্ব-৫ (শেষ)

  দিনরাত্রির পালা কাঠপিঁপড়েটা শূন্যদৃষ্টিতে নিঃশব্দে পাহারা দিয়ে যাচ্ছিল। অন্ধকার পত্রালির পড়া ফোঁটা ফোঁটা শব্দ এবং গ্রীষ্মের গিরিখাতের গভীরের রাত্রির মর্মর ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। ফারগাছটা ঘড়ির একটা কাঁটার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে, কাঁটাময়। পাহাড়ের ছায়ায় পিঁপড়েটা জ্বলছিল। পাখির চিৎকার! এবং অবশেষে─ মেঘের বহর …

ললিতা: ভ্লাদিমির নভোকভ

৭. এরপর সিদ্ধান্ত নিই এবার সত্যি বিয়ে করে ফেলব। বিয়ের চিন্তা মাথায় আসতেই ভাল-মন্দ দিকগুলো ভাবতে শুরু করলাম। যদিও এ ব্যাপারে কারো সাথে আমার আলোচনা করার সুযোগ ছিল না। সিদ্ধান্ত যা নেবার আমাকেই নিতে হয়েছে। ভেবেচিন্তে মনে হল, আমার আসলেই বিয়ে করা উচিত। বিয়ের ফলে …

ফেরদৌস নাহার: ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা; সে আমার স্মৃতিকাতর মুখে একটি চুম্বন

ফেরদৌস নাহার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা; সে আমার স্মৃতিকাতর মুখে একটি চুম্বন কমরেড, কমরেড! চলো কমরেড চলো, আজ রাতে জ্বলন্ত জ্বলে যাই এসো! আরেকবার নতুন চোখে তোমার দিকে তাকাতে চাই। না, পুবের নদী মেখলা দেশের নরম মাটির মতো করে নয়, ইউরোপের পাহাড়ি সৌন্দর্যের দৃঢ়তা নিয়ে, চোখে …

সেলিম জাহান: দেখা হয় নাই হৃদয় খুলিয়া

আস্তে আস্তে ভোর হচ্ছে— ফিকে অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। ঘরের বাইরে রাস্তার ফুটপাতে জোড়া জুতোর শব্দ—কারা বোধহয় কাজে যাচ্ছে, নিশ্চয়ই অপরিহার্য কাজ। কোভিডের প্রকোপ যুক্তরাজ্যে নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় পথ-ঘাটে মানুষের চলাচলও সীমিত হয়ে এসেছে। এখন তো এমনই হয়, কোভিড সঙ্কটের জন্যে একান্ত প্রয়োজন না হলে …

অনুগল্প: অভিশাপ

সকালের ঘড়ির কাঁটা গড়াতে গড়াতে দশটা ছুঁতেই নড়েচড়ে বসলাম। বাইরে ঝাঁ চকচকে রোদ। সুখিয়াকে ডাক দিয়ে প্রস্তত হতে নির্দেশ দিয়ে চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে আরাম চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। শামীম বাংলো থেকে বেরোবার সময় বারবার সতর্ক করে গেছে। কিন্তু এতো আমার নতুন নয়। শিকারের …

কামরুল হাসানের ছোটগল্প: কুকুর

জন্তুটা হাঁটছিল আনমনে, একরোখা সড়কটির উপর এলোমেলো পদক্ষেপে, যেন মাটিতে ছায়ার টুকরো খুঁজে বেড়াচ্ছিল সে। শুকতে শুকতে সন্দেহ বোঝাই পা নিয়ে চলছিল সড়কের উপর পড়ে থাকা পাতায় খসখস একটা শব্দ হচ্ছিল, মৃদু ধুলো উড়ছিল যদিও আবছা আঁধারের ভেতর দেখা যাচ্চিল না কিছুই । একটা জমাট …

নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-২৪

-‘আমি একটা শর্ট কার্ট জানি, চল ঐ দিক দিয়া শাহবাগ যাই রিক্সা নিয়া’- ইউসুফ বলে। আবারো গাউসিয়ার ফুটপাতের জুতার দোকানগুলি ডিঙ্গিয়ে এপাশে আসে, হকার্স মার্কেটের ধার ঘেষে রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে একটা তেছরা গলিতে ঢুকে যায় দু’জন। আর সব গলির মতই এই গলি। ঢোকার মুখে ফার্মেসী, …

হামিদুল ইসলামের কবিতা

অশ্বশক্তি ভবঘুরে স্মৃতিগুলো ফেলে আসি দূরে রঙময় জীবন সারি সারি মেঘ নিঝুম রাত্রি বুজে আসে দুচোখের পাতায় শব্দরা এখন জবানবন্দি পোয়াতি স্বপ্নগুলো সেই থেকে বরাবর রোদ মাখে গায়ে অসাড় বিকেল ছন্দহারা জীবন নিত‍্য ভাঙে নিরেট ক্লান্তিমুখ দূরত্বে ব‍্যবধান পাল্টায় হিসেবের জীবন তছনছ দুহাতের মুঠোয় ঘুণপোকা …

ক্ষমা মাহমুদের গল্প: সমুদ্রের কাছে দুঃখ জমা রাখি

একদম কাক ডাকা এক ভোরে গ্রীনলাইনের নন এসি বাসটা এসে কলাতলি বাসস্ট্যান্ডে আস্তে আস্তে থামলো। বাসের যাত্রীরা মোটামুটি সবাই এখনও ঘুমের ঘোরে থাকলেও সুপারভাইজারের ডাকে একটু একটু করে নড়তে চড়তে শুরু করলো। তারেক আলী চোখ দুটো পিটপিট করতে করতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা …

ললিতা: ভ্লাদিমির নভোকভ

৬. আমি প্রায়ই ভেবে অবাক হতাম এই নিমফেটদের এরপর কী হয়? মানে নিমফেট বয়স শেষ হবার পরে এদের জন্য কী অপেক্ষা করছে? সাংঘাতিক কিছু? এমন কিছু যে ব্যাপারগুলো ওরা ভাবতেই পারেনি? আমি যে ওদের ভেতরের স্পন্দন, নিমফেট স্বাদটুকু চুরি করে নিচ্ছি ওদের পরের বয়সটাতে এর …

ট্রান্সট্রোমারের কবিতা: পর্ব-৪

  সকালবেলার পাখি গাড়িটাকে জাগিয়ে তুললাম যার উইন্ডশিল্ডটা ঢেকে ছিল পরাগরেণুতে। সানগ্লাসটা চোখে দিলাম। পাখির কূজন অন্ধকার হয়ে এল। যখন আরেকটা লোক রেলস্টেশনে একটা বিশাল মালবাহী ওয়াগনের কাছে দাঁড়িয়ে একটা খবরের কাগজ কিনছিল, যে ওয়াগনটা মর্চে ধরে পুরোদস্তুর লাল হয়ে গিয়েছিল আর রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে ঝিকমিক …

সেলিম জাহানের মুক্তগদ্য: আমার সত্তা, আমার ধর্ম

একজন মানুষের নানান সত্তা থাকে, থাকে নানান পরিচয়। এই যে আমি— আমি তো একজন বহুধা সত্তাসম্পন্ন মানুষ। আমি দক্ষিণ এশীয়, আমি বাঙালি, আমি একটি নির্দ্দিষ্ট বয়ঃক্রমের, আমি পুরুষ, আমি একজন শিল্প-সাহিত্য রসিক, আমি দু’কন্যার জনক ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার এই বহুধা পরিচয়ের নানান মাত্রিকতা আছে। তার …

নাহার তৃণার নভেলা: অদ্বৈত পারাবার-পর্ব-৮ (শেষ)

সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতে যাবার মুখে একটা সম্মিলিত খিলখিল হাসির শব্দে থমকে যেতে হয় খাদিজা খানমকে। শব্দটা নীচতলার ফারুকের ঘর থেকে আসছে। অভ্রের কঁচি কণ্ঠের সাথে পাল্লা দিয়ে আসমা- জুলেখার সাথে অপরিচিত আরো একটা গলা কি এক অপার্থিব আনন্দে খিল খিল হাসিতে ভেঙে পড়ছে। স্বভাবতই …

মালেক মুস্তাকিমের প্রেমের কবিতা  

ফিরিয়ে নাও, গোলাপকাঁটা      সব উপেক্ষা ফিরিয়ে নাও ফিরিয়ে নাও পায়ে হাঁটা সব পথ, অনিদ্রারাত ফিরিয়ে নাও মুখের দিকে চেয়ে থাকা যাবতীয় বিস্ময়, অপেক্ষার সব নদী ও গাছ সেই কবে উড়ে গেছে নিছক হাওয়া এঁকে দিয়ে পতনের পাটাতন, কিছু ভুল অপেক্ষা করতে করতে পাথর হয়ে …

তৌহীদা ইয়াকুবের দুটি অণুগল্প

নিউ ইয়ার নিধা স্মার্ট উচ্চ শিক্ষিত আর ভাল বেতনে বেসরকারি চাকুরীজীবী। উত্তরার ৫ তলা একটি ফ্লাটে থাকে। ফ্ল্যাটটা খুব সুন্দর। শুধু রান্না ঘরের পিছনে একটা এক্সট্রা বারান্দা। সেখানে দাঁড়ালে নোংরা গন্ধ আর বস্তি জীবনের অনেক খানি দেখতে পাওয়া যায়। প্রায়ই খিস্তি শোনা যায়। এ ছাড়া …

নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-২৩

একদিন রানু আপার শাড়ি পরে ক্লাসে গেল নিধি। লাল কালোর ব্রাশ ষ্ট্রোকে ছাপা রাজশাহী সিল্ক। নিধির একটাই লাল ব্লাউজ। শাড়ি পরার কায়দা শেখাতে গিয়ে রানু আপা নিধির সরু কোমরে কাপড় গুজে খুশী হয়ে ওঠে,– ‘কি সুন্দর ফিগাররে তোর নিধি। যত্ন করিস’। -‘কি যত্ন করবো’? -‘ব্যায়াম …

ললিতা: ভ্লাদিমির নভোকভ

৫. আমার যৌবনের দিনগুলোর কথা মনে করলে শীতল একটা অনুভূতি জাগে। নিস্তব্ধ, শান্ত সময়ের মত সেই অনুভূতি। তখন মেয়েদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল অনেকটা বাস্তববাদী ধরণের, চাঁচাছোলা কথা, যতটুকু যার সাথে মানায় ঠিক ততটুকুই। যখন যতটুকু দূরত্ব রাখা প্রয়োজন ছিল ঠিক ততটুকুই দূরত্ব রেখেছি। কলেজ …

আঞ্জুমান রোজীর গল্প: জীবনের চরাচরে

দিনের শুরুতে সূর্যতাপের অতিমাত্রাটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। ক’দিন ধরেই গরমের প্রচণ্ডতায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে আছে। মানুষের জীবিকার তাড়নায় চারদিকে রৌদ্রস্নাত দিন জেগে উঠছে। রাস্তায় বের হলেই দেখা যায় জীবনের গতি। কতটা গতি নিয়ে মানুষ ছুটে চলে; তা রাস্তার মানুষের গতিবিধি লক্ষ্য করলে বেশ বোঝা যায়। …

কেয়া ওয়াহিদের কবিতা

অখণ্ড প্রেম প্রহরে প্রহরে ঝরা পাতার নৃত্য গাছেরা সেজেছে রঙিন পার্লারে লাল, কমলা, হলুদ, মেরুন ঢঙে। নির্জন বনতলে আমরা দুজন আর পাখিদের কুহু কুহু কুঞ্জন, হেমন্তের প্রণয়ে বিলাসী বসন্ত সুরার কাপের নেশাতুর ভালোবাসা অবিরত ঢালে ব্যথাতুর নীলকণ্ঠে— বিহ্বল চোখে একফোঁটা জল, হাতে হাত রেখে, দ্বাদশী …

ট্রান্সট্রোমারের কবিতা: পর্ব-৩

  রাত্রিগীতি রাতে একটা গ্রামের ভেতর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম, আর ঘরবাড়িগুলো হেডলাইটের আলোয় সামনে উঠে আসছিল─ তারা জেগে আছে, তারা পান করতে চায়। ঘরবাড়ি, গোলাবাড়ি, সাইনবোর্ড, পরিত্যক্ত গাড়ি─ তারা এখন গায়ে জীবন জড়িয়ে নিয়েছে। ─মানুষেরা ঘুমিয়ে আছে: কিছু মানুষ শান্তিতেই ঘুমায়, বাকিদের মুখগুলো টানটান …

সেলিম জাহানের মুক্তগদ্য: রাষ্ট্রের ধর্ম বনাম ধর্মের রাষ্ট্র

‘ধর্ম’ শব্দটির দু’টো মাত্রিকতা আছে – একটি হচ্ছে ‘বৈশিষ্ট্য’ এবং অন্যটি হচ্ছে ‘বিশ্বাস’।ধর্ম শব্দটি যেমন বৈশিষ্ট্য বোঝায়, তেমনি বোঝায় বিশ্বাস। এই যেমন, পাঠ্যপুস্তকে লেখা থাকে, ‘জলের ধর্ম হচ্ছে যে পাত্রে রাখা হয়, তার আকার ধারন করা’, কিংবা ‘আগুনের ধর্ম হচ্ছে জ্বালানো’। অথবা আমরাও কথা প্রসঙ্গেই …

ফরিদুর রহমানের দুটি ছোটগল্প

ঘুষখোর বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা এলোমেলো চেহারার লোকটাকে আমি প্রথম লক্ষ করেছিলাম এক বর্ষার দিনে। সারারাতের তুমুল বৃষ্টিতে রাস্তায় জল জমেছিল, ফলে অফিসের গাড়িটা এসেছে পনের মিনিট পরে। সাত সকালে প্রায় জনমানবহীন বাসস্ট্যান্ডে চত্বর ঘেষে দাঁড়াবার ফলে শাড়ি বাঁচিয়ে নোংরা পানিতে পা না …

নাহার তৃণার নভেলা: অদ্বৈত পারাবার-পর্ব-৭

মালী তালিব আলী কে অবাক করে দিয়ে বদিউর রহমান ঘোষণা দেন কালই যেন সে একটা কাঠগোলাপের চারা জোগাড় করে। বাড়ির সামনের খালি জায়গাতে সেটা লাগানো হবে। অপরিচিত মেয়েটা তাঁর বাড়িতে কাঠগোলাপের গাছ আছে কিনা জানতে চাওয়ার পর থেকে মনটা কেমন খচ খচ করছে। চেনা নেই …

শামান সাত্ত্বিকের কবিতা

যাবার সময় সময় হয়ে যায় আস্তে আস্তে কেমন করে যে সময় হয়ে যায় কেউ বোঝে না বিদায় নিতে গেলেই ফ্যাসাদ বাধে রাতে রাতে অনেক আহার হয়ে গেছে একেবারে পানাহার স্বভাব দোষে আমি ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠি যাবার সময় আটকাতে নেই যা যাবেই তাকে যেতে দিতে হয়।। …

সেলিম জাহানের মুক্তগদ্য: নববর্ষ উদযাপন—আমাদের কালে

এই তো আর ক’দিন পরেই পহেলা বৈশাখ এসে যাবে আমাদের দোরগোড়ায়। জানি, বাংলাদেশ এখন অবরুদ্ধ কোভিডের কারনে। অন্যবারের মতো বালাদেশের আনাচ-কানাচ রং আর রেখায় ভরে যাবে না।হয়তো রং উঠে আসবে না মেয়েদের শাড়ীতে, ছেলেদের পাঞ্জাবীতে, নানান ফুলের সমাহারে, তোরনের বর্নচ্ছটায়। রেখা তার স্হান করে নেবে …

নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-২২

চেইন টেনে নেমে যাওয়ার ইচ্ছা আরেকদিন হয়েছিল নিধির, আর্ট কলেজে পড়ার সময়। সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে খালেদ ইউসুফের বাসায় গিয়ে থেকেছিল, সারাটা দুপুর। ছেলে মেয়ে সবাই সিগারেট টেনেছিল। নিধি ততদিনে চুলে ব্যান্ডানা বাঁধে, নিজের হাত খরচা গায়ে হলুদের মঞ্চ, নববর্ষের কার্ড ইত্যাদি বানিয়ে নিজেই যোগাড় করে। …

আফরোজা সোমার একগুচ্ছ কবিতা

হিয়ার পরশ লাগি তোমার যৌনতা চাই না মরদ— আশ্বিনের এই তুমুল তপ্ত দুপুরে এমন কথা কী করে বলি! চাই— তোমার ঘোরলাগা চোখ উঠানের ওপার দেখে আমাকে দেখুক; ঘুঘুর ডাক পড়ে থাক আম গাছের ছায়ায় তুমি রোদে পোড়া তণুর তৃষ্ণা নিয়ে বিড়ালের মতন আমার পায়ে-পায়ে থাকো। …

Back to Top