ফেরদৌস নাহার: পৃথিবীর স্তন
আমার বয়স এখন দুহাজার বছর। আমি জেগেই থাকি, ঘুম খুব কম। দুহাজার বছর আগেও নিয়ম করে ঘুম হত বলে মনে হয় না। তখনকার মতো এখনো আমাকে সারারাত জাগিয়ে রাখে। কে যে ভেতরে কড়া নেড়ে ডেকে যায়, ওঠো চাঁদের আলোয় ভেসে …
আমার বয়স এখন দুহাজার বছর। আমি জেগেই থাকি, ঘুম খুব কম। দুহাজার বছর আগেও নিয়ম করে ঘুম হত বলে মনে হয় না। তখনকার মতো এখনো আমাকে সারারাত জাগিয়ে রাখে। কে যে ভেতরে কড়া নেড়ে ডেকে যায়, ওঠো চাঁদের আলোয় ভেসে …
ইন্সটাগ্রামে কোন গাছ নাই বলা হলো, বেশি বেশি গ্রামে ফিরে যাও। তারা গেলো দ্রুতলয়ে ইন্সটাগ্রামে! অথচ এ গ্রামে কোন গাছ নাই, মাছ নাই, নাই মেঠোপথ। এমনকি নাই কোন ডাহুকের সচকিত চোখ। বলা হলো, প্রিয় বুকে গুঁজে রেখো মুখ। তারা মুখ …
সবুজ পাতা জানে সবই আম গাছে খুব মুকুল আসছে এবার গাছে গাছে সবুজ পাতার উঁকি তোমার জন্য সবচে’ নরম পঙক্তিগুলো সাজাবো আজ চোখের সামনে ছবির ভেতর বন্দী খাঁচার পাখিটিকে উড়িয়ে দেবো দিকচেতনায়। রঙের তুলি লেপ্টালেপ্টি কিছু রঙ তো যাবেই মেখে …
১. আষাঢ়ের প্রথম দিন থেকেই আকাশের মুখ ভার। সকাল থেকে একটানা বৃষ্টি হয়ে চলেছে। থামাথামির নাম নেই। এমন বৃষ্টি মাথায় করে কে আসবে চা খেতে! মোড়ের চায়ের দোকানি কদম আলী শেষমেশ একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুলা নিভিয়ে কেতলিটা নামিয়ে রাখল। …
ফেরা ছুটির পর থেকে আনমনা হাঁটছি— হয়ত কোনো এক প্রেমিক যুগলের হাসির স্ফটিকে বিকেল চৌচির; নয়তো উসখুস কোনো দম্পতির ভসকা আতরের হাওয়া মেখে নিচ্ছে মুখর পার্কের কোণার নিমগাছ। দূরের ঝাউবনে— বাদল বাতাসের শিরশিরানি মিড়ে আনন্দ কাকার একাকিত্ব সুর; রঙ্গনের ঝোপে …
১. ফিউশন কালো একটি বিড়াল- যেভাবে ছায়ার মধ্যে ছায়া হয়ে, সাদা একটি বিড়াল- যেভাবে রোদের মধ্যে রোদ হয়ে, নীল একটি মন যেভাবে পাখির ডানায় পাখি হয়ে- উড়ছে তো উড়ছেই, ভাবছে তো ভাবছেই, দেখছে তো দেখছেই; সেভাবেই, শ্যামা একটি আমি- তোমার …
ধূসর সন্ধ্যায় শীত চলে যায় নীল ধূসর ডানায় উত্তরের হিমবাহ মনে হয় কম কীভাবে ক্ষুরের ক্রোধ ধীরে থেমে যায় ও বাতাস অসম্ভব আলিঙ্গন দম। ঠান্ডা অদ্ভুত বাতাস রোদের নীরব দোলনচাঁপার গন্ধ কুয়াশার মতো ভোরের রঙিন ঠোঁট যে মুখাবয়ব হাত ইশারায় …
অবলাকান্ত কলম ধরিয়া লিখিলেন, “পাঠকগণ, আজিকে আমরা ‘বিশ্বায়ন’ লইয়া আলোচনা করিব। আমার বাটির সম্মুখের বহুতল ফ্ল্যাটবাড়িটির বাসিন্দা মিত্রসাহেব — যাঁহার সহিত আমি কচিৎ কদাচিৎ পাড়ার পার্কে মিলিত হইয়া থাকি এবং মিলনকালে যিনি আমাকে কৃপাদৃষ্টিপূর্বক বহুবিধ জ্ঞান প্রদান করিয়া থাকেন — …
তার্কিশ এয়ারে টি কে সেভেন টু থ্রি ফ্লাইট ঢাকা ছাড়বে রাত দশটা পাঁচে। চেক ইন শেষ সাড়ে নয়টায়। আমি আকাশসমান উদ্বেগ নিয়ে বসে আছি খিলক্ষেত ফ্লাইওভারের দশচক্করের জ্যামে। জীবনের এন্তার উড়ালে জাহাজ ফেল হওয়ার ঘটনা মনে পড়ে না। তা আজ …
চারপাশে বেঁচে থাকার শব্দ। রাস্তায় মানুষের কোলাহল। ভিখিরির হাত। রিকশার জ্যাম। নিরন্তর জীবনসংগ্রাম। এইসব পেরিয়ে রোজ কলেজ যায় সে। একটি কলেজের শিক্ষিকা হিমিকা। মানুষের ইতিহাস শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী হিমিকা তা জানে। মাঝে মাঝেই মনে পড়ে উন্মাতাল ভার্সিটি জীবন। মিছিলের …
আবার যদি যাদের নিয়ে সাঁতার কাটো রোজ তাদের মুখের আদল বদলে যায় দুনিয়াসুদ্ধ সবাই জানে আপন ভিতর থেকে সুবাস কোথায় যায়? আদরগুলো মুঠোয় কাঁদে একা কার জন্য ঘুমের ঘোরেও ভাবো? মিথ্যে দিয়ে যে জামাটি পরো শরীর তাকে কতটুকুই চায়? এই …
জন্মান্তর ৭০০ বছর বয়সী গাছের চা পান করবো আর সেই খবর পেয়ে আমার চৈনিক বন্ধু আমাকে জীবিত করার জন্য পৃথিবীতে ফিরে আসছেন বাঁশের তৈরি বাষ্পযানে চড়ে; প্রায় চাঁদের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন তিনি, ঠিক ততদূর থেকে একটা ইউটার্ন নিয়ে পতপত শব্দ …
“আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা। তার উপরে সদর কোঠা আয়নামহল তায়।“ আমার ঘরে কোনো আয়না রাখিনি। কে আগ বাড়িয়ে নিজের মুখোমুখি হতে চায় বলুন! আয়নায় নিজেকে দেখতে পেলেই নিজের কাছে কত জবাবদিহিতা বেড়ে যেত। বিধাতার মতো …
[ভারতীয় কবি, লেখক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অশ্বিনী কুমার মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস (টিআইএসএস)-এর একজন জনপ্রিয় ও পরিচিত অধ্যাপক। গীতল ও বিধ্বংসী লেখার শৈলীর জন্য বিখ্যাত এই কবির কবিতা বিভিন্ন ভারতীয় ও বিদেশী ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যসংকলনের …
দূরাভিলাষী মৃত্যু পৃথিবী মরে যাচ্ছে মরীচিকার ঘ্রাণে সন্ধ্যার হলুদ তারা তীব্র সারস অথবা লালচে শকুন মিলে নিয়েছে গ্লানি তার মরীচিকার ভার; পৃথিবী মরে যাক আমারও আগে সূর্যের মতো ডুবে যাক আমায় একা ফেলে সন্ধ্যার ছাদে নায়াগ্রা ভেবে ভেতরের ধারায় বন্য …
অতীতের সাথে বাবা মারা গেছেন কুড়ি বছর আগে। পুরো এক বছর বিছানায় পড়ে থেকে চলে যাবার দিন তিনেক আগে একদিন কাছে ডেকে বলেছিলেন, ‘সুমন, বাড়িটা যেনো বিক্রি করে দিস না বাবা।’ ‘এ সব কথা বলার সময় এখন নয়। তা ছাড়া …
হন্তারক নি:সঙ্গতার মৃদু ছায়াবনে আমার অসুখ বেয়ে সরসর নামে হন্তারক সাপ। আমাকে জ্যোৎস্নায় ফেলে বধ করে হাঁসফাঁস শরীরী পিপাসা শুষে নেয় দীর্ঘশ্বাসে। জড়িয়ে ডুবিয়ে দেয় আশ্চর্য নির্মেদ ক্ষতে তুমি কী জানো— তার কাছে কতোটা মুমূর্ষু আমি? সাঁকোটা নাড়ায় সে আমি …
আবদুর রব [হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর বিখ্যাত সৃষ্টি ‘দ্য অরিজিন্স অফ হাফ-হিউম্যান, হাফ-অ্যানিম্যাল ক্রিচার্স’ (The Origins of Half-Human, Half-Animal Creatures)-এর সেই অদ্ভুত প্রাণীদের নিয়ে লেখা আমার চারটি (সেন্টর, মিনোটর, সাইরেন, স্ফিংস) কবিতার একটি সিরিজ।] সেন্টর অর্ধেক অশ্বশক্তি, অর্ধেক মানুষের নিউরোসিস— জ্যামিতি …
ভাষান্তর ও ভূমিকা: সাবেরা তাবাসসুম আমেরিকান কবি শ্যারন ওল্ডসের কবিতার সাথে আমার প্রথম পরিচয় কবি শামস আল মমীন অনূদিত ‘সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা’র বইয়ের পাতায়। শ্যারনের প্রথম কবিতা পাঠের আবহ আমাকে চাবকে নিয়ে বেরিয়েছিল, মনে আছে। ভাবছিলাম, কী অকপট, কী সাংঘাতিক …
ফুলজীবন বেঁচে থাকার আনন্দে ডুবি আর ভাসি। ডুবি আর ভাসি আর ভাসি আর ডুবি আমি এক প্রজাপতি দুলছি বাতাসে যাচ্ছি ঢেউ কেটে ফুলের মনের কাছে। তোমার জলতরঙ্গ প্রবেশ করছে আমার ভেতর মাঠ নদী, হাওয়া, ,নবচরাচর প্রবেশ করছে পাখির সুর …
অভ্যুদয় স্টিমারের যে হুইসেল শুনে ঘর ছেড়েছিলাম তা আজও শুনতে পাই। সেদিন সে যেতে বলেছিল আর আজ সে কেবলই ডাকে। কিন্তু যে পাখির বাসা আমি ভেঙে এসেছিলাম তা আর কোনোদিন গড়ে দিতে পারব না। যে প্রেমের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তাও আর …
শান্তিময় মুখোপাধ্যায় “পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ লেখকই, বিশেষ করে সমকালে, কম আলোচিত হয়ে থাকে কিছু ভাগ্যবান লেখককে বাদ দিলে। তবে যারা phenomenon হয়ে যায় যেমন শেক্সপিয়র, দান্তে কিংবা রুমি তাদের কথা আলাদা”— ২০২০-র ১১ সেপ্টেম্বর দৈনিক যুগান্তরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সদ্য …
বেশ কয়েকটি কারণেই কবি শামস আল মমীনের কবিতা পড়তে আমার ভালো লাগে। প্রথম এবং সবচেয়ে বড় কারণ হল, তাঁর কবিতায় নিউ ইয়র্কের হাডসন নদীর বাতাসের ঘ্রাণ যেমন খুঁজে পাই আবার পাশাপাশি তাঁর কবিতা পড়লে বাংলার জলজধারার সংগীতটিও নাকে এসে লাগে। …
বয়স নিজেকে এখন এক বয়সশূন্য প্রান্তর মনে হয় তরুনীরা অজানা সন্দেহে ঠারে-ঠারে চায়। তরুনরা দূরত্ব রেখে তাকায়। আমিও চালকুমরো মোরোব্বা হয়ে টিকে থাকি বয়ামে-বয়ামে আমার দুচোখ— শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য ও যৌবনে আটকে থাকে এখনো দাড়ি না রেখে, ধর্ম-কর্মে সুমতি না …
জুনান নাশিত আনোয়ারা সৈয়দ হকের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় তাঁর `নিঃশব্দতার ভাঙচুর’ বইটি দিয়ে। আমি তখন স্কুলে নিচু ক্লাসের ছাত্রী। বইটির রাবেয়া চরিত্রটি আমার মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিল বেশ। এর পর একে একে লেখকের অনেক লেখাই পড়া হয়েছে। বিশেষ করে …
শাহনাজ নাসরীন ২০১১ এর ফেব্রুয়ারিতে শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল আনোয়ারা সৈয়দ হকের উপন্যাস ’ব্যবহৃতা’। স্টল থেকে লেখকের শুভেচ্ছাবাণীসহ বইটি কিনি প্রবল কৌতুহল নিয়ে। নাম থেকেই যেন চরিত্রগুলো ভেসে আসছিল চোখের সামনে। কত কত সমার্থক শব্দ ব্যবহার হয় তাদের পরিচয় দিতেÑ …
সাবেরা তাবাসসুম “এক জীবনেরই ফাঁকে অনেক জীবন একটি পুড়লে পরে আরও কটি থাকে, যদিও একটি আমি নরকে ঠেলেছি আরও কটি দূর থেকে হাত দিয়ে ডাকে!” অনেক জীবন আনোয়ারা সৈয়দ হক এক জীবনে অনেক জীবনের রস আস্বাদন খুব সহজ …
আমরা বেঁচে আছি সেইসব উলঙ্গ মানুষের ভিড়ে আমরা বেঁচে আছি সেইসব উলঙ্গ মানুষের ভিড়ে বরফাচ্ছাদিত নয় অথচ বরফে ছেয়ে গ্যাছে দেশ! ক্রমশ মানুষের অন্ধত্ববিলাস খেয়ে ফেলছে হৃৎপিণ্ড বিচিত্র ও বিবিধ মস্তিষ্কের অবিকশিত কল্পমূর্তি ধূসর অপ্রাসঙ্গিক যদিও তারপরও রক্তবর্ণ ক্ষত অট্টহাস্য …