তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়ের সিরিজ কবিতা

বৃত্তপথ ১ গল্পের অবাক পেটে বলি যাওয়া ভাষা পড়ে আছে। কী যে ফল, কী যে কর্ম, ইদানীং সমস্ত গোলায়। গোলায় ইতরের থান, মধুচক্রে ফুলের ভূগোল। ভাষার নীচের ঠোঁটে মাছি আসে, হাসাহাসি করে। পা মোছার এমন শিল্প অন্য কোনো পতঙ্গ শেখেনি। বিশাল মশলার বজরা ঢেউ তুলে …

অরণ্য: বোধনের ডায়েরি– টিনের ট্রাঙ্ক

বড়-সড় কালো একটা টিনের ট্রাঙ্ক আমাদের বাড়িতে ছিলো, যা সারাবছরই বন্ধ পড়ে থাকত, আর নিয়ম করে খোলা হতো শীত আসার আগে। ট্রাঙ্কটির বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা, এবং শোবার ঘরের এককোণ থেকে সারাবছর জানাতে থাকা তার নিভৃত, নির্জন অস্তিত্ব, যা আমরা কখনোই সেভাবে লক্ষ্য না করলেও …

শামস আল মমীনের তিনটি কবিতা

কেমন আছো তুমি তোমাকে দেখেই বুঝে নিতে পারি তুমি আছো কেমন। আজন্ম দুঃখের নোলক পরে কার্তিকের আকালের মতো ঘুরে ফিরে আসো তুমি। তোমার অ-বলা জিভ অকস্মাৎ রোদ ওঠা আকাশের চেয়ে তপ্ত। সক্রেটিসের কথার মতো তোমাকে আমরা বুকে বুকে রাখলাম। হেমলকে তুমি জান কোরবান করোনি। উনসত্তরে …

স্বপন নাগের তিনটি কবিতা

গাছের কাছে নদীর কাছে এই কথাটাই জানাতে চাই , জেনে রাখা ভালো : অন্ধকারকে আড়াল করছে সাজানো সব আলো ! এই যে এত আলোর বাহার, আলোর মেদুর স্রোতে বৃক্ষ দেখো মগ্ন কেমন স্বপ্ন এবং ব্রতে ! কোথায় ছুটে চলছে সবাই, ওদের ডেকে ব’লো- একটি দুটি …

সুধাংশু শেখর বিশ্বাসের ছোটগল্প: ইলেকশন

কুকুরটা বুঝে উঠতে পারে না, ঠিক কি হয়ে গেল। কিন্তু এটুকু অনুভব করল, একটা বেদনাবোধ যেন সাঁ করে তার পাঁজরের ভেতর দিয়ে ঢুকে গেছে। অবিশ্বাস্য বোবা দৃষ্টি মেলে সে সামনের লোকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বোঝার চেষ্টা করে বিষয়টা। হঠাৎ তার এই বোধের উদয় হয় …

পলিন কাউসারের গুচ্ছ কবিতা

চাঁদ ফোড়ন সাগরে ছিপ ফেলে একদিন চাঁদ ধরেছিলাম, ছোঁ মেরে ঢেউ নিয়ে গেলো চাঁদ, খুব দূরে, যেখানে ডুবে গিয়েছিলো একটি আস্ত মানুষ, সেখানে কি করে এলাম অমাবস্যা হয়ে, জানি না। ছেঁড়া উঠোন তোমার উঠোন গোছাও বাইরে ঝুলছে চৈত্র, শুকনো বনের লোভে ফুঁসে উঠছে হাওয়া, কি …

সাদাত হাসান মান্টোর গল্প: ফুলের বিদ্রোহ 

মূল থেকে অনুবাদ: জাভেদ হুসেন বাগানে সব ফুল বিদ্রোহ করলো। গোলাপের বুকে দপদপ করছিল বিদ্রোহ। তার শিরায় শিরায় জ্বলছিল আগুন। একদিন সে নিজের কাঁটা ভরা ঘাড় তুলে, ভাবনাচিন্তা একপাশে সরিয়ে নিজের সঙ্গীদের ডেকে বলল: “আমাদের ঘামে আয়েশ করার অধিকার অন্য কারো নেই। আমাদের জীবনের বসন্তের …

মাসুদুল হকের সাম্প্রতিক কবিতা

মুখ মুখের বিচিত্র ধরন; জিভ দিয়ে স্বাদ নেয় ঠোঁট ভরে চুমু। দাঁত দিয়ে কামড়ে খায় নাক দিয়ে ঘ্রাণ আর চোখ দিয়ে রঙ এ মুখের বিচিত্র শখ; কণ্ঠের ধ্বনি জিভ গলিয়ে ঠোঁট দিয়ে কথা বানায় নাক দিয়ে শ্বাস টেনে চোখে চোখে ইশারার ভাষা বোনে কিছু তার …

আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

জর্জিয়া ৪ কাকে সে বলতে পারে? ন্যাগ এবং লভিকে বিশ্বাস করা চলে। কিন্তু তার ভয় একমাত্র টেরেন্স। তাই কোরা সিদ্ধান্ত নিল শুধু তাকেই সে বলবে যে এমন ভাবনার কথা তাকে বলেছিল। কোরা আর দেরী করে নি। সেদিনই সে সিজারকে তার সিদ্ধান্ত জানাল। সে এমনভাবে উত্তর …

সরদার ফারুকের একগুচ্ছ কবিতা

শাহবাগ শেষমেশ কোথাও যাব না। রাক্ষসপুরীর এই দুর্ভেদ্য দেয়াল, প্রহরী, বন্দুক আমাকেও অসুখী করেছে পথের টহল কখনো থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘এত রাতে কুনখানে যাও?’ এর নাম শাহবাগ? আটটা না বাজতেই দোকানে দোকানে তালা, পানশালা বন্ধ রাখে ছুটির দিনেই! কেশমার্কা জনপদ, নাম তার মেগাসিটি! প্রবচন মনে …

সেলিম জাহান: কনে দেখা আলো

নদীর পাড় ধরে হেঁটে বাড়ী ফিরছিলাম। পড়ন্ত বিকেল, পূর্বী নদীতে মোলায়েম রোদের খেলা ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথায়। হঠাৎ করে দৃষ্টি ছড়িয়ে গেল নদী ছাড়িয়ে ওপারে ম্যানহ্যাটনের হর্ম্যরাজির ওপরে। আহা, ভারী নরম ‘কনে দেখা আলো’ র আভা ছড়িয়ে আছে সেখানে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল বহুদিন …

পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

পাতারপাহাড় ও রক্তবর্ণ হীম  বিউটিআপাদের ওই বাংলোর যে কোনো জায়গায় দাঁড়ালে বিস্তর সবুজের দেখা পাওয়া যায়। সেসব সবুজ বর্ণনা করার সাধ্য আমার নাই। যেদিকে তাকাই উঁচা উঁচা পাতারপাহাড়।  সেইসব পাহাড় বড় আয়েশ করে নীল আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! জোর হাওয়া বইলে পাহাড়েরা সামান্য …

নাজনীন খলিলের একগুচ্ছ কবিতা

মেয়েটা মেয়েটা আসতো মাঝেমধ্যে ছেলেটার খোঁজে। –এমন বললো পুরনো বাড়িওয়ালা। আসতো চোখভরা এক আকাশ মেঘ সাথে করে আচমকা বৃষ্টিতে চৌকাঠ ভিজে যেতো। সেই প্রবল বর্ষণের ভেতরে বিষণ্ণ পা টলোমলো করতে করতে ফিরে যেতো; তার কোন বর্ষাতি ছিলোনা। পুরনো ঠিকানায় রোজ মেয়েটার চিঠি।জমে জমে স্তূপ। স্থান …

কবীর হোসেন তাপসের একগুচ্ছ কবিতা

জীবন জীবন হলো বাসনা-মাখা সাবান স্নান করব বলে যেই নেমেছি জলে ফসকে গেল হাতের মুঠি গলে!   ফিরে যাওয়া তুমি ফিরে গেলে মাতাল হাওয়ার দেশে বাতাসের ফুঁয়ে নবীন পাতার বাঁশী শুনে শুনে হেঁটে যাবে। তুমি ফিরে গেলে কবিতাতপ্ত দেশে ভেতরের শীত শব্দ আগুনে ভেঙে ভেঙে …

সেলিম রেজা নিউটনের গুচ্ছ কবিতা

কামিনীর ফুলের ইশারা এই কান্না অত দূরে পৌঁছাবে কি, বলো? এই যে পাশের ঘরে যত দূরে কচি কষ্ট বুকে নিয়ে সন্তান ঘুমায় অথবা যতটা দূরে ভেসে যায় বিমানের ইঞ্জিনের ধ্বনি? আমি ঠিক শুনি, আমি ঠিকই শুনতে পাই যেভাবে শরীর গলে উপচে ওঠে অন্তরঙ্গ কান্নার উপায়। …

নভেরা হোসেনের গল্প: নির্জনতা

গত কয়েকদিন ধরেই লক্ষ করছি মানুষের সঙ্গ কেমন যেন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ঘর থেকে বের হওয়া মানেই তাদের সম্মুখীন হওয়া। এমনকী ঘরেও আপনি যত চেষ্টাই করুন না কেন একা হতে পারবেন না, লোকজন আপনাকে চারপাশ থেকে সাঁড়াশি দিয়ে টেনে ধরবে। যখন আপনি নিজের ঘরে নির্জন …

আঞ্জুমান রোজী: বিমুর্তধারার অনন্য শিল্পী জর্জিয়া ও’কিফ

জর্জিয়া ও’কিফ (Georgia O’Keeffe) আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পীদের অন্যতম এবং বিশ্বে আর্টজগতের এক বিস্ময়। বর্ণাঢ্য শিল্পজীবনের অধিকারী ও’কিফ আর্টজগতকে দিয়েছেন ভিন্নমাত্রার এক শৈল্পিক চেতনা। তিনি অবহেলিত ক্ষুদ্রাকারের ফুলকে বড় আকারের ক্যানভাসে তুলে আনেন। তাতে ক্ষুদ্র ফুলগুলোর নান্দনিক গুরুত্ব বহুলাংশে বেড়ে যায়। তাছাড়া, নিউইয়র্কের উঁচুউঁচু তলার …

রিয়াদ চৌধুরীর গুচ্ছকবিতা

চিড়িয়াখানা চিড়িয়াখানায় প্রায়ই যাই বানরের খেলা দেখি, জিরাফের গলা দেখি গন্ডারের নিস্পৃহ দাঁড়িয়ে থাকা দেখি গাছ-গাছালির ভিড়ে সন্ধ্যাদেরও নামতে দেখি। মাঝে মাঝে কিছুই দেখি না কোন বেঞ্চিতে বসে অপেক্ষা করি যদি কোন বাঘ খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে পড়ে।   আমার ও আমাদের কবিতা ১. ক্রিয়াপদে …

শামীম আজাদের স্মৃতিগদ্য: নানীভাই

আমার নানীর বিয়ে হয় ন’বছর বয়সে! শুনেছি শাশুড়িকে পাননি তিনি। শ্বশুরই তাঁকে মাতৃস্নেহে বড় করেছেন, শাড়ি পরা শিখেছেন, পড়িয়েছেন। হয়ত সে কারণেই আমাদের সমাজের পুরুষদের মতই ছিল তার আত্ম নির্ভরতা ও প্রতিপত্তি। আমরা তাকে একটু ভয়ই পেতাম। সৈয়দা কমরুন্নেছা খাতুন যখন বই থেকে মুখ তুলে …

মাহমুদ হাফিজের ভ্রমণগদ্য: ফ্লোরেন্স গর্জন মুখর প্রশান্ত-সৈকত

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তায় সাদারঙের ‘শেভরোলে’ যখন ছুটতে শুরু করলো, শক্ত করে সিটবেল্ট বেঁধে আমরা তখন আল্লাহ আল্লাহ জিকির করছি। দুদিকেই আকাশমুখী পাহাড়। ঢালে বৃক্ষ-আচ্ছাদিত ঘনজঙ্গল। নিচে আগাছায় ঘেরা গিরিখাত দিয়ে কোন কোন জায়গায় কলকল বয়ে যাচ্ছে অনাবিষ্কৃত ঝর্ণাধারা। গাড়ির গতি থেকে থেকে একশ’ কিলোমিটার ছাড়াচ্ছে। …

আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

জর্জিয়া ৩ বস্তিতে এবছর সাতজন মেয়ে। সবার বড় মেরী। সে মৃগী রোগী। নোংরা জঞ্জালের মধ্যে পড়ে শরীর মোচড়াচ্ছে বারবার আর মুখ দিয়ে পাগলা কুকুরের মত ফেনা উগরাচ্ছে। চোখদুটো দেখাচ্ছে যেন বুনো। বার্থা নামে একটা মেয়ের সাথে ক’ বছর আগে তার জুতো নিয়ে একটা ঝামেলা হয়েছিল। …

পাভেল চৌধুরীর ছোটগল্প: বনের ডাক

(১) বন ডাকে। কেমন সে ডাক, ভীতিকর নাকি প্রীতিকর, বিকট-বীভৎস নাকি শ্রুতিমধুর, উচ্চগ্রামের নাকি মৃদু লয়ের– এসব বর্ণনা করে বোঝানো যাবে না। এমনই অবর্ণনীয়, ব্যাখ্যাতীত, অব্যক্ত সে ডাক। সময়ও অনির্ধারিত। প্রত্যুষে কিংবা সাঁঝে, গভীর রাতে কিংবা ভরদুপুরে অথবা হঠাৎ কর্মব্যস্ততার সময়ও হয়, অকস্মাৎ, একেবারে বনের …

বাবলী হকের ছোটগল্প: ইতিময় নেতিকথা   

বৃষ্টি থেমে গেছে। অনেকক্ষণ। গাড়ি থেকে নেমে মাধবীলতার ঘন ঝাড় পেরিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকতেই কেমন গা ছমছম করে উঠল। মাধবীলতার ঘ্রাণ ছাড়িয়ে, মাটির সোঁদা গন্ধ টপকে ঘাসের ওপর স্নিকার্স পরা পা ঘষি। ঘোড়া দাঁড়িয়ে থাকলে কিছুক্ষণ পরপর মাটিতে যেমন এক পা ঘষে। মার্চের শেষ সপ্তাহ …

পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

উষ্ণ বয়সী ব্ল্যাকবোর্ড  সুদীর্ঘ ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে দেখি ছিমছাম এক বাংলো। অত্যন্ত মনোরম আর্কিটেক্টচারে একতলা বিল্ডিং। বাংলোতে ঢোকার মুখে ফুলের বাগান । নানা প্রজাতির ফুলের সমারোহ। একটা ঝুমকোজবা গাছে ঝেঁকে লাল লাল ফুল ধরে আছে। গাছের ডাল ঝুমকোর ভারে মাটির দিকে অবনত। নানান …

তৈমুর খানের কবিতা: ঈশ্বরপুত্র

একদিন বিকেল শেষ হলে চলে যাব মুক্তপুরুষ। বেদির উপর ফুল ও বেলপাতা পড়ে থাকবে। সিঁদুর রঙের মেঘে লুকিয়ে যাবে দিন। রাতের বিছানা পেতে শোবে সাজু ও রূপাই। হে বাংলা ভাষা, ঘরে ঘরে বাংলাদেশ পাঠাও। সত্যের অভাবে সব মিথ্যা কিনে নেয় পোশাক-আশাকে দেশ কেন আজ ধর্মীয় …

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি কবিতা

দিগন্তে শুকতারা মেঘলা দিনের দুঃখ মাথা ছাড়িয়ে একবারে আকাশ ধরে ফেলে আর তখনই চোখে পড়ে যায় মায়ের রেখে যাওয়া সবুজ নদী গতকাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছিল আজ সকালে সে জল সাদা রঙে অন্য ঘরে সারাজীবন যে জল গুছিয়ে রেখেছে মা আজও তার সমীকরণ সকলের কাছে অপঠিত …

সৈয়দ আফসারের কবিতা

সংসার গন্তব্য এক হয় না আমাদের, মতের অবস্থা চৌচির। নীরবতার আড়ি পরস্পর, কথার ভিতর থেকে কথা টেনে নিতে তৎপর। কোণঠাসা সোফায় বসা আমার জড়োসড়ো শরীর, পুজোর পাথর… আমরা যেন দু-মেরুর বাঁধ। সে দিনে আলো ছড়ালে আমি রাতে-পূর্ণিমার চাঁদ। সব অধিকার তোমার, অধীনতা, দায়ভার, কেবল আমার …

মানিক বৈরাগীর গল্প: ইঁদুর

সেমি পাকা দেড় কামরার কলোনিতে রোজিনার সংসার। রোজিনা কর্মজীবী। একটি কেজি স্কুলে পড়ায় আর টানাপড়েন সংসারের হাল ধরতে গিয়ে টিউশনিও করতে হয় তাকে। অবসর কি সে জানেনা। ঘরের বদ্ধ হাওয়ার একঘেয়েমি কাটানোর জন্য কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাবা তার কাছে বিলাসীতা। রোজিনা নিরলস এক সংসার …

Back to Top